Monday, October 12, 2015

প্রকৃত জ্ঞানী কে?

প্রকৃত জ্ঞানী কে?

 0

আরশাদ আলি
প্রকৃত জ্ঞানী তাকেই বলা হয় যিনি জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে কোনো সীমানা খুঁজেন না। আকাশ-পাতালের, দৃশ্য-অদৃশ্যের সকল বস্তু, প্রাণী বা সত্ত্বা সম্পর্কে যার কৌতুহল বিদ্যমান। কাউকে অবহেলা করা, নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা বা অহংবোধ প্রকাশ করা কোনো জ্ঞানীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। ঘরের চার দেওয়ালের ভেতরে আবদ্ধ থেকে এই বিশাল-বিস্তৃত ব্রহ্মাণ্ডের আদ্য-পান্ত রূপ-মাধুর্য অবলোকন করা যেমন অসম্ভব, তেমনই মনের কুঠোরে কোনোরূপ সংকীর্ণতা, অন্ধত্ব বা সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্রয় দিয়ে জ্ঞানের উচ্চশিখরে আরোহণ করাও অসম্ভব। জ্ঞানীরা তাই সকল প্রকার ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থাকতে পছন্দ করেন। তারা ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল মানবসম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য কাজ করেন। আর সে কারণেই তারা বিবেচিত হন সমস্ত বিশ্বের, সমস্ত মানবজাতির সম্পদ হিসেবে।
জ্ঞান দুই প্রকার। একটি হলো স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান, যা ঐশ্বরিক; অপরটি-মানুষের অর্জিত জ্ঞান, তথা পার্থিব। এই দুই জ্ঞানের মিলন ঘটে যে সত্ত্বায় তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত জ্ঞানী। তার দ্বারা মানবতার কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু সম্ভব নয়। আর যার মধ্যে এই ভারসাম্য থাকে না, অর্থাৎ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানকেই একমাত্র জ্ঞান মনে করেন, এর বাইরের কিছুকে মূল্যায়ন করেন না তিনি প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানী নন। তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ, সংকীর্ণ, ক্ষুদ্রতায় আবদ্ধ। অন্যদিকে যিনি স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র মানুষের গবেষণালব্ধ বা অর্জিত জ্ঞানকেই একমাত্র জ্ঞান মনে করেন তিনিও ভারসাম্যহীন, প্রকৃত জ্ঞানী নন। তার এই জ্ঞান মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের পথেই বেশি ব্যয় হয়। তাই এই উভয় প্রকার জ্ঞানই মূল্যহীন, অর্থহীন। সুশ্রী এক পক্ষীর ডানাযুগল হতে একটি ডানা বিকল হয়ে গেলে কার্যক্ষেত্রে বাকি ডানার কোনো মূল্য থাকে না। সে ডানা পক্ষীর পতন এক মুহূর্ত দীর্ঘায়িত করতে পারে বটে, কিন্তু পতন ঠেকাতে পারে না। আজকের পৃথিবীর কথিত জ্ঞানীদের অবস্থাও তাই। ভারসাম্যহীন একপেশে জ্ঞান তাদের পতন ঠেকাতে পারছে না। আজকে একটি শ্রেণি বেদ, কোর’আন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক ইত্যাদি নিয়ে নিরন্তর অধ্যাপনা করে চলেছে, চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে, গ্রন্থগুলোর প্রতিটি আয়াত, ভার্স বা শ্লোক নিয়ে গবেষণা করছে, বইয়ের পর বই রচনা করছে, নতুন নতুন তাফসির, টিকা-ভাষ্য রচনা করছে; কিন্তু পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এরা যা-ই করেন, যা-ই দেখেন সবই ঐ ধর্মগ্রন্থের আলোকে। এমনকি এর বাইরের জ্ঞানকে কেউ কেউ শয়তানের জ্ঞান বলেও অভিহিত করেন। এদের ধারণা অনেকটা এমন যে, ‘আমি যা জানি সেটাই যথেষ্ট। এর বাইরে অন্য কিছুর দরকার নেই। এটুকু জানলেই স্রষ্টা আমার প্রতি খুশি থাকবেন, জান্নাত-স্বর্গ বা হ্যাভেনে প্রবেশ করাবেন, বেশি বুঝলে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে, তাই আর কোনো জ্ঞানের দরকার নেই।’ ভারসাম্যহীন ধর্মীয় জ্ঞানকে পুঁজি করে তারা উপাধি বহন করেন আলেম, পুরোহিত, ফাদার, মাওলানা, মোফাসসের, মোজাদ্দেদ, কামেল ইত্যাদি। কিন্তু উপাধি যত বড়ই হোক কার্যক্ষেত্রে তাদেরকে থাকতে হয় ‘কুয়োর ব্যাঙ’ হয়ে। গতিশীল পৃথিবীর সাথে তাদের তেমন কোনো সমন্বয় থাকে না। পৃথিবী যখন নতুন নতুন আবিষ্কারে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উন্নতি করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে রাখে উপাসনালয়ের চার দেওয়ালের অভ্যন্তরে। স্রষ্টা প্রদত্ত মেধাকে, মননশীলতাকে, সৃজনশীলতাকে আবদ্ধ করে রাখে ধর্মগ্রন্থের পাতায়। তথাপি কোনো সমস্যা হবার কথা ছিল না। তাদের এই ব্যক্তিগত অজ্ঞতার কারণে বিরাট-বিশাল জনগোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়ার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু এরা শুধু এটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকে না। তারা তাদের ব্যক্তিগত অন্ধত্ব, ক্ষুদ্রতাকে জাতির ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে। ধর্মপ্রাণ মানুষ যেহেতু তাদেরকে ধর্মেরই ধারক-বাহক মনে করে তাই খুব সহজেই তারাও ঐ অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতায় দীক্ষিত হয়। তাছাড়াও এরা ধর্মগ্রন্থগুলোতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নতুন নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করে, জন্ম হয় নতুন মত-পথ তথা অনৈক্যের। এই অনৈক্য আবার জন্ম দেয় হানাহানি, রক্তপাত, সাম্প্রদায়িকতার। পরিশেষে কেবল অশান্তিই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তাদের এই মেধা-সৃজনশীলতাকে যদি তারা স্বাভাবিকভাবে কাজে লাগাত, ধর্মের অতি বিশ্লেষণ না করে যদি তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় ততটা সহজ রাখত, এবং পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নতি-সমৃদ্ধি, তথা মানবতার কল্যাণেও আত্মনিয়োগ করত তাহলে এই ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতো না, অশান্তি সৃষ্টি হতো না, অনৈক্য সৃষ্টি হতো না। তারা ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই সফলতা অর্জন করতে পারতেন। তাদের একুল-ওকুল দু’কুলেই রক্ষিত হতো।
আবার একটি শ্রেণি প্রতিটি সৃষ্টির অণু-পরমাণু, কার্যপদ্ধতি, গঠনপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছে, এরা গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছে, অনুজীব- যাকে খালি চোখে দেখা তো দূরের কথা যার অস্তিত্ব অনুভব করাই কষ্টসাধ্য এরা তার জীবনধারণের পদ্ধতি, খাদ্য, বংশবিস্তার ইত্যাদি অতি নিখুঁতভাবে বর্ণনা করছে, এরাই বিংশ শতাব্দীর দু’টি বিস্ময়কর বস্তু- রেডিও ও টেলিভিশন আবিষ্কার করেছে; এরা সৃষ্টির অতি সূক্ষ্মতম পদার্থেরও ধর্ম বা স্বভাব নির্ণয় করছে অতি সহজভাবে, পৃথিবী থেকে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ-নক্ষত্রের মেনে চলা নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার বর্ণনা দিচ্ছে; কিন্তু এত কিছু করলেও প্রতিটি বস্তুর অন্তর্নিহিত এই ধর্ম, এই শৃঙ্খলা যে কারও না কারও পরিকল্পনারই অংশ এবং তা যে কেউ না কেউ পরিচালনা করছে তারা তা দেখতে পাচ্ছেন না। তারা সৃষ্টি দেখে, সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ বিস্ময়কর স্বভাব বা গুণ দেখেও স্রষ্টার অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারছেন না। কারণ, তাদের একচোখ অন্ধ। তারা কেবল জড়, বস্তু ও দেহ-ই দেখতে পায়। জীবন, আত্মা ও আধ্যাত্মিকতা তাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। অর্থাৎ ঐ ভারসাম্যহীনতা। তাই তারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যা কিছু আবিষ্কার করছে, দেখা যাচ্ছে তার সবগুলোরই অপব্যবহার হচ্ছে। একটি পারমাণবিক বোমা হিরোসিমা-নাগাসাকিতে যে হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তাতে আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অপব্যবহার কতটা ভয়ানক হতে পারে তার কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, কোটি কোটি আদম সন্তান নৃশংসভাবে প্রাণত্যাগ করেছে, তবে মানবজাতি অস্তিত্বশূন্য হয় নি। দুঃসহ সেই স্মৃতিগুলো বহন করে আজও তারা দিনাতিপাত করছে, অনুশোচনা করছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হলে তারপর হয়তো চোখের পানি ফেলারও কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। কারণ সে যুদ্ধে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ অপব্যবহার পৃথিবীবাসী দেখবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান যেমন আবিষ্কারকে সহজ করেছে, সৃজনশীলতাকে বিকশিত করেছে, তেমনি ধ্বংসকেও অতি সহজ বিষয়ে পরিণত করেছে। কিন্তু যাদের হাতে সে ক্ষমতা তারা যদি বস্তুবাদী না হতেন, তাদের জ্ঞান যদি স্রষ্টাবর্জিত না হতো, অর্থাৎ ভারসাম্যযুক্ত হতো তাহলে পৃথিবীবাসী কখনই ধ্বংস দেখতো না, কেবল সৃজনশীলতারই চর্চা হতো। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষতা থেমে থাকতো না, থেমে থাকতো তার অপব্যবহার।
কাজেই জ্ঞানের বিকাশ ভারসাম্যে। স্রষ্টাহীন বস্তুবাদী ধ্যান ধারণা পোষণ করে যা কিছুই অর্জন করা হোক সেটা জ্ঞান নয়। ঐ জ্ঞান দিয়ে মানুষের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। আবার মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে তুচ্ছ মনে করে, অবহেলা প্রদর্শন করে শুধুই স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানের চর্চা করাও জড়বুদ্ধিতার শামিল। স্রষ্টা অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতার পক্ষপাতী নন। তিনি জ্ঞানার্জনকে পছন্দ করেন, ধর্মভীরুদের পছন্দ করেন, ধর্মান্ধদের নয়। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মানুষ স্রষ্টার পরিচয় জানবে, মানুষ হিসেবে তার কাজ কী, সে কোথা থেকে এসেছে সেসব প্রশ্নের উত্তর লাভ করবে। স্রষ্টার বিজ্ঞানময় সৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করে, গবেষণা করে তার মাধ্যমেও স্রষ্টাকে চিনবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানবতার কল্যাণ সাধনে স্বীয় অবদান রাখবে, মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করবে। যিনি এতে সফল হবেন তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। তিনি মানবতার সম্পদ, মানবজাতির সম্পদ।

উপাসনা ও ধর্মের পার্থক্য

উপাসনা ও ধর্মের পার্থক্য

 0

মনিরুজ্জামান:
ধর্ম ও ধারণ একই শব্দ থেকে এসেছে। যে গুণ বা বৈশিষ্ট ধারণ করে কোনো বস্তু তার স্বকীয়তা, নিজস্বতা পায় তাকেই ঐ বস্তুর ধর্ম বলে। যেমন একটি লৌহদণ্ড আকর্ষণ করার গুণ ধারণ করে চুম্বকে পরিণত হয়। এই আকর্ষণ করার গুণটিই হলো ঐ চুম্বকের ধর্ম। যদি কোনো কারণে চুম্বক তার ধর্ম তথা আকর্ষণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তবে সেটি পুনরায় লৌহে পরিণত হয়, সেটি আর চুম্বক থাকে না। একটি লৌহকে চুম্বকে পরিণত করতে হলে নিরন্তর তাকে চুম্বক দিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘর্ষণ করতে হয়, এটি চুম্বকের ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। আবার পরিপূর্ণ চুম্বকও যদি আগুনে পোড়ানো যায় তবে সে তার ধর্ম হারিয়ে সাধারণ পদার্থে পরিণত হয়।
পানির ধর্ম হলো সে নিজে পবিত্র এবং সমস্ত কিছুকে ধৌত করে পবিত্র করে দেয়, তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা দূর করে নতুন জীবন দান করে। কিন্তু পানি যদি অপবিত্র, বিষাক্ত হয়ে যায় তবে সে অন্যকে না পবিত্র করতে পারে, না কারো তৃষ্ণা দূর করতে পারে। পানিকে পবিত্র করার জন্য, বিষমুক্ত করার জন্য আগুনে ফুটাতে হয়। এটিই পানির প্রকৃত ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। ধর্মহীন তথা বিষাক্ত, অপবিত্র পানি মানুষের জীবনের কারণ না হয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
মানুষও একটি সাধারণ প্রাণী হিসাবে জন্মগ্রহণ করে আস্তে আস্তে মনুষ্য ধর্ম প্রাপ্ত হয়ে মানুষের স্তরে ওঠে। এই মনুষ্য ধর্ম হলো মানবতা। এক পিতার মধ্যে সন্তানের প্রতি যে ভালোবাসা থাকে তা পিতৃধর্ম, ছেলে-মেয়ের প্রতি মায়ের মমতা হলো মাতৃধর্ম, ভায়ের প্রতি ভায়ের যে প্রেম তা ভ্রাতৃধর্ম। আর মানুষের প্রতি মানুষের যে প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, মমতা সেটি হলো মনুষ্যধর্ম। যার মধ্যে অন্য মানুষের প্রতি যত বেশি ভালোবাসা সে তত বড় ধার্মিক। সন্তান কষ্টে থাকলে মা-বাবার মনেও সুখ থাকে না, সন্তানের কষ্ট দূর করার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্ট করে। বাবা-মা হিসাবে এটা তাদের কর্তব্য। মানুষ কষ্টে থাকলে অপর মানুষও কষ্টে থাকবে, অপরের কষ্ট দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে- এটা মানুষ হিসাবে তার কর্তব্য, এটাই তার এবাদত। এই এবাদতের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের প্রতি ভালোবাসাই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা। সন্তানকে কষ্ট দিয়ে কি কখনো তার বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়া যায়? ঠিক একইভাবে আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে কষ্টে রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হলো- নামাজ, রোজা, পূজা, প্রার্থনা ইত্যাদি যে ধর্মীয় উপাসনাগুলো ধর্ম মনে করে, এবাদত মনে করে করা হয় সেগুলোর উদ্দেশ্য কী? একটি লৌহকে যেমন চুম্বকের ধর্ম প্রাপ্ত করার জন্য নিরন্তর চুম্বক দিয়ে ঘর্ষণ করতে হয়, পানিকে যেমন বিশুদ্ধ করার জন্য ফুটাতে হয় ঠিক তেমনই মানুষের আত্মায় সর্বদা মনুষ্য ধর্ম তথা অন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত রাখার জন্য নানা উপায়ে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, সেটাও আল্লাহ প্রদত্ত। মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্টই এমন যে, সে অসচেতনভাবেই নিজ স্বার্থচিন্তায় মগ্ন হয়ে অপরের কল্যাণের চিন্তা ভুলেই যায়। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতের মাধ্যমে সে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করবে, স্রষ্টাকে স্মরণ করবে, তার কর্তব্য তথা এবাদতের কথা স্মরণ করবে, সে নিজ স্বার্থ ভুলে জগৎসংসারের কল্যাণ চিন্তা করবে। অর্থাৎ উপাসনাগুলো হলো ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। যতবেশি উপাসনা করবে তত বেশি ধর্ম প্রাপ্ত হবে। এই উপাসনাগুলো সকল খারাপ কাজ থেকে, অকল্যাণকর কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় সালাহ (নামাজ) সকল প্রকার ফাহেশা তথা অকল্যাণকর কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত- ৪৫)। দিনরাত নামাজ-রোজায় মগ্ন থেকেও যদি কারো মধ্যে মনুষ্য ধর্ম জাগ্রত না হয়, অকল্যাণকর কাজ থেকে সে বিরত না হয়, মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য নিজের জীবন-সম্পদ ব্যয় করার মনোবৃত্তি সৃষ্টি না হয় তবে সকল প্রশিক্ষণ ব্যর্থ।

মানব জনমের সার্থকতা


মানব জনমের সার্থকতা

 0

আমিরুল ইসলাম:


নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল,
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ, দগ্ধ হয়ে, করে পরে অন্নদান,
শস্য জন্মাইয়া, নাহি খায় জলধরে,
সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত-তরে।
রজনীকান্ত সেনের এই কবিতাটি আমাদের সকলেরই জানা। প্রকৃতির দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই- প্রতিটা প্রাণী, প্রতিটা বস্তুই নিজের জীবনকে, নিজের অস্তিত্বকে উৎসর্গ করে অন্যের জন্য। এভাবেই পৃথিবী টিকে থাকে, পৃথিবী সুন্দর হয়। সূর্য সমগ্র সৃষ্টিকে তাপ ও আলো দেয়, নদী-সমুদ্র পানি দেয়, গাছপালা ফলমূল আর অক্সিজেন দেয়, সাপ-ব্যাঙ ইত্যাদি ইকোসিস্টেম রক্ষা করে, কোনো কোনো প্রাণী মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু সৃষ্টি মানুষকে স্রষ্টা সম্পর্কে ভাবিয়ে তোলে, জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটায়, কেউ বা ঘটায় চিত্তবিনোদন। প্রতিটা সৃষ্টিরই উদ্দেশ্য থাকে। সার্বিকভাবে সমগ্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য মানবজীবনের সুখ-শান্তি। এজন্য সকল সৃষ্টিই মানুষের কল্যাণে কাজ করে। যদি কোনো সৃষ্টি মানুষের সেবায় কাজে আসে তবেই তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য সার্থক। যেমন একটি কলম দিয়ে যদি লেখা হয়, একটি মোবাইল ফোন দিয়ে যদি কথা বলা হয়, একটি বই যদি জ্ঞান সম্প্রচারে কাজে আসে, একটি সুর যদি মানবহৃদয়ে প্রশান্তি যোগায় তবেই সেগুলোর সৃষ্টি বা জন্ম সার্থক। একইভাবে একটি গরুর সার্থকতা তখনই যখন মানুষ তাকে দিয়ে নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে। তার দুগ্ধ পান করবে, তাকে দিয়ে হাল চাষ করাবে বা তাকে খেয়ে নিজের শরীরকে পুষ্ট করবে। এজন্যই আল্লাহ গরুকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং গরু-ছাগল-উট-মহিষ যে সমস্ত পশু আল্লাহর বিধানমতে কোরবানিযোগ্য সেগুলোকে কোরবানি করে হোক আর এমনিতে জবাই করে হোক, সেগুলো যদি মানুষের দ্বারা ভুক্ত হয় তবেই তাদের পশুজনম সার্থক হয়। এখন প্রশ্ন হল, মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? কিসে আসবে মানবজনমের সার্থকতা, কিসে হবে তার পরমার্থলাভ, মোক্ষ ও নির্বাণ? মানবজনম কিসে সার্থক হবে সেটা না জেনে, কেবল কোরবানি করে জীবন কাটিয়ে দিলে গরুর জীবন সার্থক হবে কিন্তু আপনার মানবজনম ব্যর্থ। কবি লিখেছেন –
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যে কেবল উদরপূর্তি, সংসারবৃদ্ধি ও দেহত্যাগ করা নয়। সে যদি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিজের জীবন নিয়েই বিব্রত থাকে তবে সেটা তো হীন পশুর জীবন। মানুষকে তো পশু হিসাবে সৃষ্টি করা হয় নি, সে আল্লাহর রূহ ধারণকারী, আল্লাহর নিজ হাতে সৃষ্ট আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছেন যে, মানুষ তার সমগ্র জীবনকালকে যদি আত্মস্বার্থ কোরবানি দিয়ে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারে তবেই তার মানবজন্মের সার্থকতা। কোরবানির শিক্ষা এটাই- পশু যেমন মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে জীবন সার্থক করল, তেমনি মানুষও মানবজাতির শান্তি প্রতিষ্ঠায় অর্থাৎ পরার্থে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে নিজের জীবনকে যেন সার্থক করতে পারে। মানুষ যদি এই প্রত্যয় করে যে, সে বাঁচবে মানবতার কল্যাণে, মরবে মানবতার কল্যাণে, জ্ঞান লাভ করবে মানুষকে দেওয়ার জন্য, জগতের উন্নতির জন্য দুটো পয়সা রোজগারের জন্য নয় তবেই এই পৃথিবীতে তার আসার উদ্দেশ্য সার্থক হল। অন্যথায় – কে বলে মানুষ তারে পশু সেই জন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ: পশ্চিমাদের স্বার্থ আদায়ের তন্ত্র – গণতন্ত্র!


আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ: পশ্চিমাদের স্বার্থ আদায়ের তন্ত্র – গণতন্ত্র!

 0

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’ কর্তৃক রূপায়িত নতুন যে বিশ্বব্যবস্থা কার্যকর কোরতে পশ্চিমারা এতদিন বদ্ধপরিকর ছিলো ইতোমধ্যেই সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে তারা পৌঁছে গেছে। সেটা হচ্ছে পৃথিবীব্যাপী একমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কোরে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখা। তাদের পূর্বকল্পিত বিশ্বব্যবস্থাই পৃথিবী গ্রহণ কোরেছে এবং নেতা হিসেবে গ্রহণ কোরেছে ঐ আধিপত্যবাদীদের। তারা যে উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে যেভাবে কর্মসম্পাদন কোরেছে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যেই ফলাফল আশা কোরেছে ঠিক তা-ই হোয়েছে এবং হোচ্ছে, এর কোথাও কোন বিচ্যুতি হয় নি। আর তাদের এই কর্মসম্পাদনা থেকে বার বার যেটা প্রমাণিত হোয়েছে যে- মানবাধিকার, স্বাধীনতা, মানবতা ইত্যাদি তাদের মুখের বুলি হোলেও কার্যক্ষেত্রে সেগুলোকে তারা ‘ছেলে ভুলানো গান’ মনে করে, তাদের কাছে এগুলো বিশ্ববাসীর চোখে ধূলি দিয়ে স্বার্থোদ্ধারের একটি পন্থা বৈ কিছু নয়। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার মোড়ল, অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার আশীর্বাদপুষ্ট দোসর রাষ্ট্রগুলিকে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বরাবরই গণতন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার কোরতে দেখা গেছে। বলা যায় এই গণতন্ত্রই তাদেরকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির পর ইউরোপ ও আমেরিকায় বর্তমানে গণতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠিত সরকার পদ্ধতি। গণতন্ত্র আজ তাদের মূলধনে পরিণত হোয়েছে এবং তাদের সংস্কৃতি-সভ্যতার অনুকূলে গড়ে ওঠা সেই শাসনব্যবস্থাকেই তারা সমস্ত পৃথিবীর জাতিগোষ্ঠিগুলোর ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এভাবেই পৃথিবীজুড়ে যে গতিতে এই শাসনব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো হোয়েছে তার সমান্তরালে পাশ্চাত্যের ভারসাম্যহীন সংস্কৃতি ও সভ্যতারও বিস্তার ঘটেছে, বিশ্ব হোয়ে উঠেছে আপাদমস্তক পশ্চিমানির্ভর। এতে কোরে খুব সহজেই নিজেদের স্বার্থকে আদায় করে নিতে পারছে মোড়ল রাষ্ট্রগুলি।
পশ্চিমাদের এই সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের ফলে পৃথিবীতে এখন গণতন্ত্রের জয়-জয়কার। পশ্চিমা ভাবাদর্শে পরিচালিত দেশীয় মিডিয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থার ফলে মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরছে যে গণতন্ত্রই একমাত্র গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা। এর বিকল্প হিসেবে অন্য কোন শাসনব্যবস্থার কথা পৃথিবীবাসী কল্পনাও কোরতে পারছে না, আর কল্পনা কোরলেও কোন লাভ হবে না। কারণ গণতন্ত্রের মধ্যেই পশ্চিমাদের স্বার্থ, গণতন্ত্রই তাদের শাসন-শোষণের হাতিয়ার। এটা ছাড়া অন্য কোন শাসনব্যবস্থাকে পশ্চিম মেনে নিতে দিবে না। যুক্তি আসতে পারে – অনেক দেশেই তো এখনো গণতন্ত্র চালু নেই, সে দেশের মানুষ অন্য শাসনব্যবস্থাকে এখনো ধরে নিয়ে আছে। তাহোলে সে সব দেশে কেন পশ্চিমারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কোরতে চেষ্টা কোরছে না? এর উত্তরে প্রথমেই বোলতে চাই – সে সব দেশে যে পশ্চিমা সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটে নি তা কিন্তু নয়। এটা বুঝতে হবে যে- আপাত দৃষ্টিতে পশ্চিমাদেরকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বোলতে দেখা গেলেও বাস্তবে তাদের কাছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা বা মানবাধিকারের কোন মূল্য নেই, এগুলো মূলত তাদের স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার। কাজেই যেখানে তাদের স্বার্থ পরিপন্থী কোন কাজ হয় না এবং হবার কোন সম্ভাবনাও নেই, বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না থাকলেও সে দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে তাদের হাতেই রোয়েছে সেখানে তারা কেন ঐ গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা কোরবে?
মধ্যপ্রাচ্যের যে আরব দেশগুলোতে এখনও রাজতন্ত্র চালু আছে সেখানকার অধিবাসীরা যে গণতন্ত্র চায় না তা কিন্তু নয়। বহির্বিশ্বের মত তাদেরকেও দেখা গেছে গণতন্ত্রের পক্ষে শ্লোগান তুলতে, রাজপথে নামতে। কিন্তু সে চেষ্টা কোন কাজে আসেনি, পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের কাছ থেকে কোন সাহায্য-সহায়তা আসেনি। কারণ ঐ দেশগুলোতে গণতন্ত্র চালু করার সাথে পশ্চিমা স্বার্থের কোন সম্পর্ক নেই। যদি থাকতো তবে বছরখানেকও বোধহয় লাগতো না তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়ার মত সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ইত্যাদি দেশগুলোতে গণতন্ত্র কায়েম হোতে। এখানেই বোঝা যায় – পশ্চিমাদের কাছে গণতন্ত্র আসলে কোন বিষয় নয়, আসল বিষয় হলো তাদের স্বার্থ। এই স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য তারা বহু পূর্ব থেকে চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। পৃথিবীব্যাপী অন্যায়-অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত নির্মূলের অভিপ্রায়ে ১৯৪৫ সালে যে জাতিসঙ্ঘকে জন্ম দেয়া হয় সেটাও ছিলো তাদের ঐ পরিকল্পনারই অংশবিশেষ।
পাশ্চাত্যের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাদের নিরাপত্তার ছাতা হিসেবে জাতিসঙ্ঘের ব্যবহার নতুন বিশ্বব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ কোরছে। জাতিসঙ্ঘ ১৯৩টি দেশের সঙ্ঘ হোলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়ার মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশ তা নিয়ন্ত্রণ করে। জাতিসঙ্ঘের সকল সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মূলত এই সব দেশের বিশেষ কোরে আজকের একক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে যা কোনভাবেই তাদের মুখের সর্বাধিক উচ্চারিত বুলি গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যাপারে জাতিসংঘের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সমর্থকদের যে আহ্বান ছিােলা বর্তমান অবস্থায় তা থেকে জাতিসঙ্ঘ অনেক দূরে অবস্থান কোরছে। এর কার্যক্রম এখন ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলোর জাতীয় পররাষ্ট্রনীতির নকশা অনুসরণ কোরে চলে। জাতিসঙ্ঘ ব্যবস্থার মোট খরচের সিংহভাগও তারাই বহন করে। কারণ গণতন্ত্রের মতো এটাও তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি বড় হাতিয়ার। যেখানে নিরাপত্তা পরিষদের সকল দেশ কোন একটি সিদ্ধান্তে একমত হবার পরে শুধুমাত্র একটি দেশ ভেটো দিলেই সেই সিদ্ধান্ত নাকচ হোয়ে যায় সেখানে “সংখ্যাগরিষ্ঠের মতোই চূড়ান্ত” – এই তত্ত্বের গণতন্ত্র কোথায় থাকে? আবার দেখা যায় কোন দেশ আক্রমণ কোরতে চাইলে অন্য সব দেশ বিরোধিতা কোরলেও যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের মতো কতিপয় দেশ কাউকে পাত্তা না দিয়ে আক্রমণ কোরে বসে, সেখানেও গণতন্ত্র কোন কাজে আসে না, গণতন্ত্রের ভাষ্য আর কৃতকর্মের মধ্যে কোন মিল পাওয়া যায় না। এর উত্তর একটিই – গণতন্ত্র পশ্চিমা আগ্রাসীদের কাছে কোন বিষয় নয়, আসল বিষয় হোল তাদের স্বার্থ। তারা গণতন্ত্র মানবে ততোক্ষণ, যতক্ষণ সেটা তাদের স্বার্থের অনুকূলে থাকবে।
কাজেই এটা স্পষ্ট যে- আজ পৃথিবীবাসী পশ্চিমের তাবেদারি কোরেই হোক আর তাদের গালভরা বুলিতে বিশ্বাস কোরেই হোক গণতন্ত্র নামক যে সিস্টেমটিকে তাদের চলার পাথেয় হিসেবে গণ্য কোরছে এবং সেটাকে বিকল্পহীন হিসেবে বিবেচনা কোরছে সেটা পশ্চিমাদের নিছক একটি পৃথিবীব্যাপী নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার ছাড়া কিছুই নয়। এই গণতন্ত্র আজ পর্যন্ত ঐ গুটিকতক আধিপত্যবাদীদের ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ছাড়া আর কোন জাতিকে শান্তি-সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে নি, পারার কোন সম্ভাবনাও নেই।

ঐক্যের গুরুত্ব এবং অনৈক্যের পরিণাম

ঐক্যের গুরুত্ব এবং অনৈক্যের পরিণাম

 0

মো: হাসানুজ্জামান:
মানবজাতির পার্থিব ও পারলৌকিক অর্থাৎ যাবতীয় কল্যাণের উদ্দেশ্যে যুগে যুগে স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাঁর বার্তাবাহকগণ সত্যধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সকল ধর্মই সত্য, ন্যায়, কল্যাণ এবং মানবজাতির শান্তির পক্ষে কথা বলে। কারণ স্রষ্টা হলেন যাবতীয় সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের আধার। স্রষ্টা প্রেরিত সর্বশেষ দীন হলো দীনুল ইসলাম। পৃথিবী থেকে সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার, যুদ্ধ-রক্তপাত এক কথায় অশান্তিকে নির্মূল করে, মানবজাতিকে এক জাতিতে পরিণত করার উদ্দেশ্যেই শেষ নবীর আগমন। এ জন্য মানবজাতির মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। এ কারণে ইসলাম ঐক্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে অনৈক্য এই মহাপরিকল্পনার পথে প্রধান অন্তরায়। তাই এই দীনের বিধানগুলোও অনৈক্যের বিরুদ্ধে অতিশয় কঠিন।
সারা দুনিয়ার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, জাত-পাত, হিংসা-বিদ্বেষ লুপ্ত করে তাদেরকে এক কাতারে নিয়ে আসার মতো অসাধ্য সাধন করা যার উদ্দেশ্য, সেই মহামানব সর্বপ্রথম যে কাজটিতে মনোনিবেশ করেছিলেন তাহলো সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা। ইতিহাসে পাই- তদানীন্তন আরবের ৫ লাখের একটি জাতিকে তিনি (সা.) তাঁর জীবদ্দশাতেই ঐক্যবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। এর কারণও অতি সোজা। তিনি এটা ভালোভাবেই জানতেন যে- তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব এক জীবনে পূর্ণ করে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।
তাই তিনি তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জাতিটিকে হাতে কলমে এমন শিক্ষা দিয়ে গেলেন যাতে এই ঐক্যবদ্ধ জাতিটি তাঁর চলে যাওয়ার পরেও আপ্রাণ সংগ্রাম করে সমস্ত পৃথিবীকে ঐ শিক্ষা পৌঁছে দিয়ে মানবজাতিকে এক জাতিতে পরিণত করতে পারে। তিনি জানতেন এই কাজ এই জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারবে যতক্ষণ তাদের মধ্যে ঐক্য বজায় থাকবে। ঐক্যের হানি ঘটলেই জাতি তার চলার গতি হারিয়ে ফেলবে এবং এক সময় স্থবির হয়ে পড়বে- উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। এটা পৃথিবীর এক অমোঘ নিয়ম যে- একটি জাতি কিংবা একটি সংগঠন যত শক্তিশালীই হোক, ধনে-বলে যতই উন্নত হোক, যদি তাদের মধ্যে ঐক্য না থাকে তবে তারা কখনোই জয়ী হতে পারবে না। অতি দুর্বল শত্রুর কাছেও পরাজিত হবে। তাই আল্লাহ বহুবার কোর’আনে এই ঐক্য অটুট রাখার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। এই ঐক্য যাতে না ভাঙ্গে সে জন্য তাঁর রসুল (সা.) সদা শংকিত ও জাগ্রত থেকেছেন। ঐক্য নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে এমন কোন কথা বা কাজ যখনই কাউকে করতে দেখেছেন তখনই তিনি ভীষণ রেগে গেছেন।
রসুলাল্লাহর জীবনী যারা ভাসা ভাসাভাবেও পড়েছেন তারাও এটা অস্বীকার করতে পারবেন না যে- তাঁর নবী জীবনের ২৩ বছরে তিনি কত অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মক্কা ও তায়েফের মাটিতে তাঁকে মুশরিকদের ক্রীড়া-কৌতুকের পাত্র হতে হয়েছে, প্রস্তরাঘাতে পবিত্র দেহ থেকে রক্ত ঝরাতে হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র অস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি ঐ মুশরিকদের উপর রেগে গিয়েছেন বা তাদের অভিসম্পাত করেছেন এমন কোন নজীর কেউ দেখাতে পারবে না। বরং তিনি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাত কামনা করেছেন। কিন্তু সর্বরিপুজয়ী ঐ একই ব্যক্তির রাগও আমরা দেখতে পাই তাঁর পবিত্র জীবনীতে। না, সেটা মুশরিকদের জর্জরিত করা আঘাতের কারণে নয়, তাঁরই প্রাণপ্রিয় আসহাবদের মধ্যে কেউ যখন কোর’আনের কোন আয়াত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে দেখেছেন তখন তিনি রেগে লাল হয়ে গেছেন। তাঁর আসহাব এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মোতাবেক রসুলকে আমরা সর্বদাই একজন সদা হাস্যময় এবং শান্ত-সৌম্য মানুষ হিসেবে দেখতে পাই। অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া তাঁর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই মানুষটিও রেগে অগ্নিশর্মা হয়েছেন। কখন হয়েছেন? যখন তিনি কাউকে এমন কোন কাজ করতে দেখেছেন যার ফলে তিলে তিলে গড়ে তোলা তাঁর আজীবনের সাধনা, অর্থাৎ মহান আল্লাহ তাঁকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ যে কাজের ফলে তাঁর সারা জীবনের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তাঁর পবিত্র জীবনীতে আমরা পাই, একদিন দুপুরে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) রসুলাল্লাহর গৃহে গিয়ে দেখেন তাঁর মুখ মোবারক ক্রোধে লাল হয়ে আছে। কারণ তিনি দু’জন আসহাবকে কোর’আনের একটি আয়াত নিয়ে মতবিরোধ করতে দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি (সা.) বললেন- কোর’আনের আয়াতের অর্থ নিয়ে যে কোনরকম মতভেদ কুফর। নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ (উম্মাহ) তাদের (উপর অবতীর্ণ) কিতাবগুলোর (আয়াতের) অর্থ নিয়ে মতবিরোধের জন্য ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপর তিনি আরও বললেন (কোর’আনের) যে অংশ (পরিষ্কার) বোঝা যায় এবং ঐক্যমত আছে তা বল, যেগুলো বোঝা মুশকিল সেগুলোর অর্থ আল্লাহর কাছে ছেড়ে দাও (মতবিরোধ করো না) [হাদিস-আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে- মুসলিম, মেশকাত]।
এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম যে মতভেদ থেকেই অনৈক্যের সূত্রপাত। আর অনৈক্য মানেই ব্যর্থতা, দুর্বল শত্রুর কাছেও পরাজয়। সুতরাং সামান্য বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদের মাধ্যমে তাঁর পবিত্র জীবনের সব সংগ্রাম, ত্যাগ যদি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তবে তা কি করে তিনি মেনে নিতে পারেন? এ কারণেই আমরা সর্বরিপুজয়ী এই জিতেন্দ্রীয় মহামানবকেও রেগে লাল হতে দেখেছি।
তাই মুসলিম জাতির ঐক্যের গুরুত্ব কতখানি তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ইসলামের বিরুদ্ধে, রসুলাল্লাহর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের চেয়েও বড় অপরাধ হলো মুসলিম জাতির মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করা। কারণ জাতির মধ্যে যে কোন রকমের মতভেদের সূত্রপাতই অনৈক্য সৃষ্টি এবং পরিণামে জাতি ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। এ কারণে রসুলাল্লাহ ঐক্য নষ্ট হয় এমন কোন কথা, কাজ বা ইশারা-ইঙ্গিতকেও কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় এই যে জাতির অখণ্ডতা ও অবিভাজ্যতা সম্পর্কে আল্লাহ ও রসুলের এমন স্পষ্ট আদেশ-নিষেধ সত্ত্বেও মুসলিম জাতি আজ শরিয়াহগতভাবে শিয়া-সুন্নি, হানাফি, মালেকি, শাফেয়ী, হাম্বলী, আহলে হাদিস; আধ্যাত্মিকভাবে- কাদেরিয়া, নক্শবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, আহলে বাইত, ভৌগোলিকভাবে ৫৫ টিরও বেশি রাষ্ট্রে এবং ইহুদি খ্রিস্টানদের নকল করে রাজনীতিকভাবে কেউ গণতন্ত্রী, কেউ সমাজতন্ত্রী, কেউ সাম্যবাদী, কেউ রাজতন্ত্রী, কেউ পুঁজিবাদী ইত্যাদি হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত।
কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন- ‘সকল মুমিন ভাই ভাই।’ হাদিসে রসুলাল্লাহ বলেছেন- ‘উম্মতে মোহাম্মদী জাতি যেন একটি শরীর, তার একটি অঙ্গে ব্যথা পেলে সারা শরীরেই ব্যথা অনুভূত হয়।’ অথচ আজ আর তারা এক জাতি, ভাই-ভাই তো নয়-ই উপরন্তু নিজেরা নিজেরা মারামারি-হানাহানি, রক্তপাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বোমাবাজি করে চূড়ান্ত ঐক্যহীন ও শতধা বিচ্ছিন্ন একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর তাই রসুলাল্লাহ তাদেরকে যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সেই উদ্দেশ্য অর্জন করাও তাদের দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না।
শুধু শেষ রসুলের উম্মাহ হিসেবেই নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও যদি আমরা মানব জাতির কল্যাণ ও উন্নতি কামনা করি তাহলে মানুষকে সমস্ত প্রকার বিভক্তি- ব্যবধান ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মানুষ একই দম্পতি- বাবা আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) থেকে আগত, সুতরাং মানুষকে সেই আদি পরিচয়ে ফিরে যেতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

Sunday, October 11, 2015

প্রকৃত এবাদত কী?

প্রকৃত এবাদত কী?

 0

রাকীব আল হাসান:
আল্লাহ বলেছেন যে তিনি মানুষকে এবাদত করা ভিন্ন অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেন নি। তাহলে কী সেই এবাদত? বর্তমানে আলেমরা ওয়াজে নসিহতে মানুষকে কেবল নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদি করার জন্য উপদেশ দেন, এগুলিকেই তারা এবাদত ও ধর্মকর্ম বলে মনে করেন। নামাজ রোজা করা মানুষের প্রকৃত এবাদত নয়। এবাদত কথাটির অর্থ হচ্ছে যে জিনিসকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেই কাজ করা। একটি ঘড়ি তৈরি করা হয়েছে সময় দেখানোর জন্য, এটা করাই তার এবাদত। সূর্য সৃষ্টি করা হয়েছে আলো, তাপ ইত্যাদি দেওয়ার জন্য, এগুলি দেওয়াই তার এবাদত। মানুষকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা আগে জানতে হবে। কারণ সেটা করাই তার এবাদত। মানুষকে কি মসজিদে, মন্দিরে, গির্জা, প্যাগোডায় গিয়ে বসে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? না। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীতে সত্য ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, এটা প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। পৃথিবী যখন অশান্তির জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড হয়ে আছে, মানুষের মুখে ভাত নেই, মসজিদ থেকে পর্যন্ত জুতা চুরি হয়, যে সমাজে চার বছরের শিশু কন্যা পর্যন্ত ধর্ষিত হয় সেখানে এক শ্রেণির লোক মসজিদে গিয়ে পড়ে থাকে, মনে করে এবাদত করছে, মন্দিরে গিয়ে দুধ-কলা দেন মনে করেন যে উপাসনা করছেন, মক্কায় গিয়ে মনে করেন যে, এবাদত করছেন। আসলে তাদের এবাদত করা হচ্ছে না। মানুষের প্রকৃত এবাদত হলো মানবতার কল্যাণে কাজ করা। আল্লাহ বলেছেন, পূর্ব এবং পশ্চিমদিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন পুণ্য নেই। কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, মালায়েকদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসুলগণের উপর ঈমান আনবে, আর আল্লাহরই প্রেমে স¤পদ ব্যয় করবে আতœীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও দাসমুক্তির জন্যে। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা স¤পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই মুত্তাকী (সুরা বাকারা ১৭৭)। সুতরাং মানুষ কী করলে শান্তিতে থাকবে, দরজা খুলে ঘুমাবে সেই লক্ষ্যে কাজ করাই হলো এবাদত। যারা মানবতার কল্যাণে এই কাজগুলি করবে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করবে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য, তাদের চরিত্র সৃষ্টি করার জন্য দরকার হলো নামাজ, রোজা ইত্যাদি। যেমন একটি বাড়িতে খুঁটি দেওয়া হয় ছাদকে ধরে রাখার জন্য। যদি ছাদই না দেওয়া হয়, তাহলে শুধু খুটি গেঁড়ে কোন লাভ নেই। নামাজ রোজা হচ্ছে এই খুঁটির মত। তেমনি যারা শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করবে না, তাদের জন্য এই নামাজ-রোজা কোনো কাজে আসবে না। এগুলো তাদেরকে স্বর্গে বা জান্নাতে নিতে পারবে না। এর অর্থ কেউ যদি এই বুঝে থাকেন যে, আমি আপনাদের মসজিদে, মন্দিরে, প্যাগোডা, গীর্জায় যেতে নিষেধ কোরছি তাহলে আমি আপনাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমি বলছি প্রধান কাজ হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা, কাজেই আসুন শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখি, মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করি। মানবজীবন তখনই সার্থক হবে যখন মানুষ নিজেকে অন্যের কল্যাণে নিয়োজিত করবে।
যারা আইন-শৃঙ্খলার কাজে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নিয়জিত তারা যদি সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, মানবতার কল্যাণে নিস্বার্থভাবে এই কাজ করে তবে তাদের এই কাজ আল্লাহর প্রকৃত এবাদত বলে গণ্য হবে, সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সকলকে পূর্ণ নিরাপত্ত দান করাই ইসলামের প্রধান কাজ। তাদেরকে বুঝতে হবে এই কাজ স্রষ্টার অতি প্রিয় কাজ। যুগে যুগে নবী-রসুলগণ সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতেই পৃথিবীতে আগমন করেছেন।

শিয়া-সুন্নী বৈষ্ণব-শাক্ত ক্যাথোলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট হীনযান-মহাযান এক হোক

শিয়া-সুন্নী বৈষ্ণব-শাক্ত ক্যাথোলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট হীনযান-মহাযান এক হোক

 0

সকল মহাপুরুষই চান মানবজাতির ঐক্য, কারণ তারা জানেন যে ঐক্যের মধ্যে কল্যাণ নিহিত। তা সত্ত্বেও ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি ধর্মকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখার জন্য বিভিন্ন মনগড়া প্রথাকে ধর্মের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। তাদের প্রচারের গুণে হিন্দুধর্মের মধ্যে আচার-বিচার, জাত-পাত এবং ছোঁয়াছুঁয়িটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। মহামানবদের শিক্ষা বইয়ের পাতায় মুদ্রিত থাকলেও বাস্তবে হিন্দু অর্থাৎ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের মধ্যে অনেকগুলি সম্প্রদায়ে বিভক্ত যেমন: বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর, গাণপত্য ইত্যাদি। এই সম্প্রদায়গুলির মধ্যেও আছে নানা উপদল। এছাড়া আছে প্রাচীনকাল থেকে চলমান ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, কায়স্থ, শুদ্র ইত্যাদি বর্ণভেদ। একত্ববাদী ব্রাহ্মরাও কম নয়। এতসব বিভক্তি বজায় রেখে একটি জাতি খুব বড় কিছু করতে পারে না।
এক গৌতম বুদ্ধের অনুসারীরাও হীনযান, মহাযান, বজ্রযান, তন্ত্রযান ইত্যাদি উপদলে বিভক্ত। দেশ ও অঞ্চলভেদে ছোটবড় বিভক্তিও আছে অসংখ্য। খ্রিস্টানদের মধ্যেও আছে প্রধান দুই ভাগ- প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথোলিক; উইকিপিডিয়ার ‘অসম্পূর্ণ’ তালিকা অনুযায়ী খ্রিস্টধর্মের মোট উপদলের সংখ্যা ৪১,০০০। তথ্যটি অবিশ্বাস্য হলেও অসত্য নয়। ইউরোপের মধ্যযুগে এই ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট বিবাদ চরম আকার ধারণ করেছিল। ত্রিশ বর্ষব্যাপী (১৬১৮-১৬৪৮) এক বিরাট যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সমগ্র ইউরোপজুড়ে, যার মূল যুদ্ধক্ষেত্র ছিল মধ্য ইউরোপ যেখানে আজকের জার্মান রাষ্ট্রটি অবস্থিত। ইউরোপের প্রায় সকল দেশই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এবং আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কেবল সুইডিশ সেনাবাহিনীর হাতে জার্মানের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ নিহত হয়েছিল, দুর্গ ধ্বংস হয়েছিল ২,০০০টি, ১৮,০০০ গ্রাম ১,৫০০ শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল।
আজ আমরা হিন্দু-মোসলেম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই পাশ্চাত্য পরাশক্তিগুলির চাপিয়ে দেওয়া সিস্টেমের ফাঁদে পড়ে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি, অন্যায়, দুর্নীতি, অবিচার ইত্যাদির মধ্যে নিজেদেরকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ১৯৪৭ সনে ব্রিটিশদের হাত থেকে আমরা এই উপমহাদেশের বাসিন্দারা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল আমরা স্বাধীন হই নি। ১৯৭১ সনে আবারও আমরা সবাই মিলে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ নামক আরেকটি ভূখণ্ড লাভ করেছি কিন্তু যে জন্য এত সংগ্রাম অর্থাৎ অন্যায় অবিচারহীন একটি সমাজগঠন, সেটা কি আমরা করতে সক্ষম হয়েছি? না। আমরা দিন দিন আরও বেশি করে পাশ্চাত্যের পদানত গোলামে পরিণত হোচ্ছি।
আল্লাহর শেষ নবী ও রসুল মোহাম্মদ (দ:) আরবের গোত্রের সঙ্গে গোত্রের সংঘাত নিরসন করে, গোত্র, বর্ণ, বংশ, আভিজাত্য প্রথা নির্মূল করে বৃহত্তর জাতি গঠন করেছিলেন, সেই মোসলেমরাও মানব সৃষ্ট মতবাদের অনুসরণ আর ফেরকাবাজির কারণে শত শত মাজহাবে, তরিকায় বিভক্ত। এই শিয়া-সুন্নী যুদ্ধে গত কয়েক শতাব্দী ধরে কত লক্ষ মোসলেম নিহত হয়েছে এবং আজও এই দ্বন্দ্বে শহর-বন্দর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার হিসাব মেলানোই কঠিন। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য আজ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে এই ফেরকাবাজির ফলে। কথায় কথায় মোসলেমরা পাশ্চাত্য সভ্যতাকে গালি দিয়ে থাকেন মোসলেমদের উপর নানামুখি নির্যাতন, অত্যাচারের কারণে, শোষণ-বঞ্চনার কারণে। কিন্তু একবারের জন্যও মোসলেম নামক এই জাতিটি ভেবে দেখে না যে, নিজেরাই নিজেদের মধ্যে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে নানা তর্ক, বাহাস করে শত শত মাজহাব, তরিকায় বিভক্ত হয়ে জাতি হিসাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে তারা। আর তাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতা। শত্র“রা দুর্বলতার সুযোগ নেবে এটাই স্বাভাবিক। এটা তো শত্র“র দোষ নয়, বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা। কাজেই মোসলেমদের অধঃপতনের পেছনে পাশ্চাত্যরা যতটা দায়ী তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী তারা নিজেরাই। আমরা হেযবুত তওহীদ, যামানার এমামের অনুসারীরা চেষ্টা করে যাচ্ছি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষকে একটি মহাসত্যের উপর ঐক্যবদ্ধ করতে যে, আপনারা সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি, একই বাবা-মায়ের সন্তান। আপনারা যে যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন, সব ধর্মই চায় মানুষ তার নিজের কল্যাণের জন্য ঐক্যবদ্ধ হোক।
আমরা চাই মোসলেমরা শিয়া-সুন্নী বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হোক, হিন্দু-মোসলেম একতাবদ্ধ হোক, বৈষ্ণব-শাক্ত একতাবদ্ধ হোক, হীনযান-মহাযান এক হোক, প্রোটেস্ট্যান্ট-ক্যাথোলিক এক হোক। তারা ধর্মের ছোটখাটো বিষয়গুলি নিয়ে নিজেদের মতভেদগুলি পাশে সরিয়ে রেখে ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলির উপর একতাবদ্ধ হোক। আসুন, আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলি ৭০০ কোটি আদমসন্তানের এক বিশাল ভ্রাতৃসমাজ।