Tuesday, November 10, 2015

ঐক্যহীনতার বিষবৃক্ষ



ঐক্যহীনতার বিষবৃক্ষ

 0


মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে সম্পাদিত:
দীর্ঘ দু’শো বছর যে ঔপনিবেশিক শক্তিটি দাপটের সাথে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল শাসন করল, বলা হয়ে থাকে যে তারা এতদঞ্চলের মানুষদের চাপের মুখে বিতাড়িত হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে এটা আংশিক সত্য মাত্র। মূলত এরা নিজেরা নিজেরা গত শতাব্দীতে দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ করে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে তাদের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোতে তাদের শাসনের ব্যাপারে মানুষ বিদ্রোহীও হয়ে উঠেছিল। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যে শক্তিটি অর্ধ-দুনিয়া শাসন করল তারা অবশ্যই সর্বদিক দিয়ে সচেতন একটি জাতি। তাই তারা আগাম বুঝতে পেরেছিল তাদের ঔপনিবেশিক আমল শেষের দিকে। হয়তো এসব অঞ্চলকে আর বেশি দিন এভাবে দাবিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু ঐ সময়ের জন্য এটাও বাস্তব ছিল যে, তারা যদি চাইতো তাহোলে জোর করে আরো বেশ কিছুটা সময় শাসন করতে পারতো। কিন্তু বুদ্ধিমত্তায় এগিয়ে থাকায় এই শক্তিটি আপসে এদেশীয় জনতার একটি অংশের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আলগোছে সরে পড়ে। তারা জানত শতাব্দীর পর শতাব্দী এইভাবে মানুষকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। একদিন না একদিন তাদেরকে এই সব অঞ্চল থেকে বিদায় নিতেই হবে। তাই তারা নিজেদের স্বার্থ কায়েম রাখার জন্য একটি শয়তানি ফন্দি করল।
প্রথমত তারা ঐ সময়ের সকল শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করে দিল এবং দুইটি ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা চালু করল। এর একটি অংশ ধর্মীয় অংশ এবং অন্যটি সাধারণ শিক্ষা। উপমহাদেশের বড়লাট লর্ড ওয়ারেন হেসটিংস ১৭৮০ সনে ভারতের তদানীন্তন রাজধানী কলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করল। এই মাদ্রাসায় ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য খ্রিষ্টান পন্ডিতরা বহু গবেষণা করে একটি নতুন ইসলাম দাঁড় করালেন যে ইসলামের বাহ্যিক দৃশ্য প্রকৃত ইসলামের মতোই কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটার আকিদা এবং চলার পথ আল্লাহর রসুলের ইসলামের ঠিক বিপরীত।
এই শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাসে অংক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির কোনো কিছুই রাখা হলো না, যেন মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে এসে আলেমদের রুজি-রোজগার করে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই দীন, ধর্ম বিক্রি করে রোজগার করা ছাড়া আর কোন পথ না থাকে। খ্রিষ্টানরা এটা এই উদ্দেশ্যে করল যে তাদের মাদ্রাসায় শিক্ষিত এই মানুষগুলো যাতে বাধ্য হয় দীন বিক্রি করে উপার্জন করতে এবং তাদের ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে বিকৃত ইসলামটা এই জনগোষ্ঠির মন-মগজে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। খ্রিষ্টানরা তাদের এই পরিকল্পনায় শতভাগ সাফল্য লাভ করল। এই মাদ্রাসা প্রকল্পের মাধ্যমে দীনব্যবসা ব্যাপক বিস্তার লাভ করল এবং এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যেও অন্যান্য ধর্মের মতো একটি স্বতন্ত্র পুরোহিত শ্রেণি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করল। তারা দীনের বহু বিতর্কিত বিষয় নিয়ে তর্ক-বাহাশ এবং ফলশ্রুতিতে বিভেদ-অনৈক্যের সৃষ্টি করতে থাকল, যার দরুন জাতি খ্রিষ্টান প্রভুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলল। এই পুরোহিত শ্রেণির কর্মকাণ্ডের ফলে তাদেরকে অনুসরণকারী বৃহত্তর দরিদ্র জনগোষ্ঠির চরিত্র প্রকৃতপক্ষেই পরাধীন দাস জাতির চরিত্রে পরিণত হলো, কোনদিন তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার চিন্তা করারও শক্তি রোইল না। ফলে তারা চিরতরে নৈতিক মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মুখাপেক্ষি হয়ে রোইল।
এভাবেই খ্রিষ্টান পন্ডিতরা নিজেরা অধ্যক্ষ থেকে ১৯২৭ সন পর্যন্ত ১৪৬ বছর ধোরে এই মুসলিম জাতিকে এই বিকৃত ইসলাম শেখালো। অতপর তারা যখন নিশ্চিত হলো যে, তাদের তৈরি করা বিকৃত ইসলামটা তারা এ জাতির হাড়-মজ্জায় ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এবং আর তারা কখনও এটা থেকে বের হতে পারবে না তখন তারা ১৯২৭ সনে তাদের আলীয়া মাদ্রাসা থেকেই শিক্ষিত মওলানা শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন আহমেদ (এম.এ.আই.আই.এস) এর কাছে অধ্যক্ষ পদটি ছেড়ে দিল (আলীয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, মূল- আঃ সাত্তার, অনুবাদ- মোস্তফা হারুণ, ইসলামী ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ, Reports on Islamic Education and Madrasah Education in Bengal” by Dr. Sekander Ali Ibrahimy (Islami Faundation Bangladesh), মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার ইতিহাস, মাওলানা মমতাজ উদ্দীন আহমদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)।
অপরদিকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অংশটিতে এই বিরাট এলাকা শাসন করতে যে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কেরাণীর কাজ করার জনশক্তি প্রয়োজন সেই উপযুক্ত জনশক্তি তৈরি করার বন্দোবস্ত করা হলো। তারা এতে ইংরেজি ভাষা, সুদভিত্তিক অংক, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক, প্রযুক্তিবিদ্যা অর্থাৎ পার্থিব জীবনে যা যা প্রয়োজন হয় তা শেখানোর বন্দোবস্ত রাখলো। এখানে আল্লাহ, রসুল, আখেরাত ও দীন সম্বন্ধে প্রায় কিছুই রাখা হলো না। ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের পরিবর্তে ইউরোপ-আমেরিকার রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস, তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কাহিনীই শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ফলে এই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিটি মনে-প্রাণে প্রভুদের সম্বন্ধে একধরনের ভক্তি ও নিজেদের অতীত সম্বন্ধে হীনমন্যতায় ভুগতে লাগলো। বাস্তবতা এমন দাঁড়ালো যে তারা নিজেদের প্রপিতামহের নাম বলতে না পারলেও ইউরোপীয় শাসক, কবি, সাহিত্যিকদের তস্য-তস্য পিতাদের নামও মুখস্ত করে ফেললো। নিজেদের সোনালী অতীত ভুলে যাওয়ায় তাদের অস্থিমজ্জায় এটা প্রবেশ করল যে সর্বদিক দিয়ে প্রভুরাই শ্রেষ্ঠ।
এই দুই অংশের বাইরে বাকী ছিল উভয়প্রকার শিক্ষাবঞ্চিত এক বিশাল জনসংখ্যা। এখন যখন প্রভুদের এদেশ ছেড়ে যাবার সময় হলো তখন তারা কাদের হাতে শাসনভার ছেড়ে যাবে তা নিয়ে মোটেও তাদের চিন্তা করতে হলো না। একে তো মাদ্রাসা শিক্ষিত শ্রেণিটি শাসন করার যোগ্য নয়, এমনকি শাসন করার ব্যাপারে আগ্রহীও নয় (বর্তমানেও এদের উত্তরসূরিদের একটা অংশ তাই মনে করে। এরা মনে করে শাসন যে-ই করুক, আমরা ধর্ম-কর্ম করতে পারলেই চোলবে), আর সাধারণ মূর্খ জনতার হাতে শাসনদণ্ড ছাড়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। তাই অবশ্যই বাকী থাকে সাধারণ শিক্ষিত অংশটি। এদের হাতে শাসনভার ছেড়ে যাওয়ার লাভ বহুমুখী। একে তো তারা প্রভু বলতে অজ্ঞান, তাছাড়া প্রভুরা না থাকলেও তারা যে প্রভুদের স্বার্থই রক্ষা করে চোলবে এ ব্যাপারে প্রভুরা একেবারেই নিশ্চিত ছিলেন।
এরাই যে প্রভুদের অনুপস্থিতিতে শাসনভার পাওয়ার অধিকারী এবং পাশ্চাত্য প্রভুরা আগে থেকেই তাদের জন্য এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত করে তুলেছে তার একটি বড় প্রমাণ তাদেরকে অধিকার আদায়ের পথ শিক্ষা দেওয়ার নামে তাদের পছন্দসই রাজনীতি শিক্ষা দেওয়া। এই প্রভুদেরই একজন, এলান অক্টাভিয়ান হিউম (Allan Octavian Hume. 1829-1912) নামে কথিত ‘ভারতপ্রেমী’ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (Indian National Congress) নামে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এদেশীয় শিক্ষিত শ্রেণিটিকে এদেশীয়দের অধিকার আদায়ের রাজনীতি শিক্ষা প্রদান করেন। অবাক করা ব্যাপার এই যে তিনি তাদের কাছে ‘ভারতপ্রেমী’ নামে পরিচিত। তারই শিক্ষায় শিক্ষিত এই রাজনীতিকরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রভুদের পছন্দসই রাজনীতি শিক্ষা লাভ করেছেন। বর্তমানে আমাদের দেশের সাধারণ জনগণের ঘৃণা কুড়ানো রাজনীতিকরা তাদেরই বর্তমান উত্তরসূরি।
কাল অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু আমাদের প্রতি প্রভুদের পূর্ব মানসিকতা এখনো যায় নি। আমাদের সম্পদ থেকে ভাগ নেওয়ার মানসিকতাও এখন পর্যন্ত তাদের দূর হয় নি। ঐ সময়ে নিয়েছে জোর করে আর এখন নেয় নেতা-নেত্রীদেরকে ক্ষমতা বসিয়ে দেওয়ার নামে আঁতাত করে। যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তারাই তাদের আনুকূল্য পায়। আর এই আনুকূল্যের রসদ হচ্ছে আমাদের নেতাদের বিভিন্ন দাসত্ব চুক্তি, দাসখত।
যাই হোক, গোলামি যুগে প্রভুরা আমাদেরকে যে রাজনীতি শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমরা নির্দ্ধিধায় আজও তা চর্চা করে যাচ্ছি। এর উপমা এই যে, জেল-পুলিশ জেল গেট খুলে চলে গেছে, কিন্তু কয়েদীরা এতই ভাল কয়েদী যে তারা জেল থেকে বের না হয়ে তাদের মধ্য থেকেই অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী লোকদেরকে পুলিশ বানিয়ে মনোযোগের সাথে জেল খাটা অব্যাহত রাখল। কোন কোন সচেতন কয়েদী তাদের এই দুরবস্থা দেখে এই জেল থেকে বের হওয়ার কথা বললে বরং তারা কয়েদীকে অবাধ্য ও বিদ্রোহী বলে মারতে লাগল।
তাদের শেখানো রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের মাধ্যম অর্থাৎ ‘গণতন্ত্র’ আসলে কি এ সম্বন্ধে এবার জানা যাক। গণতন্ত্র এমন একটি জীবনব্যবস্থা যার গোড়াতেই অনৈক্যের বীজ রোপণ করা। বহুদল, বহুমত হচ্ছে এর অন্যতম প্রধান উপাদান। যে যা খুশি বলবে, যে যা খুশি করবে, দাবি আদায়ের নামে মানুষের পথ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে, গাড়ি পোড়াবে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করবে, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারবে, পিটিয়ে মারবে, এই জাতীয় সকল কার্যক্রম গণতন্ত্র দ্বারা সিদ্ধ। এই সব কার্যক্রম যারা চালিয়ে যাবে তাদেরকে বলা হয় নিয়মতান্ত্রিক দল। এসব যারা করে না তারা অগণতান্ত্রিক, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই পরিত্যাজ্য। গণতন্ত্রে যতো দল সৃষ্টি হবে ততো নাকি গণতন্ত্র বিকশিত হয়। মূলতঃ গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিতেই অনৈক্য প্রোথিত হয়ে আছে। আর এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম যে ঐক্যই সমৃদ্ধি আর অনৈক্য ডেকে আনে ধ্বংস। বাস্তবতা হচ্ছে গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যা একমাত্র গোলামদের জন্যই প্রযোজ্য, অনুগত দাসদের বিদ্রোহ করার পরিবর্তে গোলামিতে ব্যস্ত রাখতে এটি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এ জন্যই এটি সাম্রাজ্যবাদীরা বার বার তাদের কাক্সিক্ষত ভূ-খণ্ডে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
গণতন্ত্রের এই সব বৈধ কার্যক্রম চর্চা করতে করতে পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৪২ বছর পর নানা উত্থান-পতনের মাধ্যমে এই জাতিটি আজ চূড়ান্ত গহ্বরে পতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই প্রভুরা আবারো ফিরে আসছেন স্ব-মূর্তিতে, প্রেমিকের বেশে। সবাইকে নিয়ে বসিয়ে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য একের পর এক জোরালো মিশন চোলছে। জোর করে ঔষধ গেলানোয় রোগী তা বমি করে উগরে দিচ্ছে, তাই আমাদের প্রভুরা বিশেষ ব্যবস্থায় তা গলধঃকরণ করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে এর বিকল্প কি?
এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, এর বিকল্প হচ্ছে আমাদেরকে একতাবদ্ধ হতে হবে। এদেশ আমাদের, সুতরাং এদেশ কিভাবে চোলবে, কোন জীবনব্যবস্থা এদেশের মানুষ গ্রহ করবে তা একান্তই আমাদের নিজস্ব ব্যাপার। আমাদেরকে সর্বপ্রথম নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান বিভেদ দূর করতে হবে। সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, আমরা বিদেশী মগজ দিয়ে চিন্তা কোরব না। এদেশের মাটি ও মানুষ যে স্বাভাবিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে জীবন ধারণ করে আসছিল তার মধ্যে যে অংশটুকু আমাদের ভুল ছিল তা খুঁজে বের করে অর্থাৎ ঐ ভুল শুধরিয়ে আমাদেরকে সামনে এগোতে হবে। এই দেশ বহুকাল আগে থেকেই ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল। তখন এই উপমহাদেশীয় অঞ্চলটিতে দুইটি প্রধান ধর্ম পাশাপাশি অবস্থান করলেও মানুষ সুখ, সমৃদ্ধি, ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে দিনাতিপাত করে আসছিল। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব এদেশে ঔপনিবেশিক আমলের আগে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে ব্রিটিশদের এদেশ দখল করার পর থেকেই। কারণ, তাদের মূল নীতিই ছিল ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’। এদেশীয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘাত লাগিয়ে তারা নিশ্চিন্তে তাদের শাসনদণ্ড আমাদের উপর ঘুরিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বর্তমান চলমান সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ১৯৭১ সালে শেষবার বাঙালি জাতি পাকিস্তানিদের দুঃশাসনের হাত থেকে মুক্তির জন্য একতাবদ্ধ হয়েছিল। আজ সে ঐক্যের বড় অভাব। জাতির এখন প্রয়োজন সকল বিভেদ-ব্যবধান ভুলে এক কাতারে দাঁড়ানো, সেই ঐক্যকে ফিরিয়ে আনা। তাহোলেই একমাত্র আমাদের দ্বারা সম্ভব পৃথিবীর বুকে আত্ম-মর্যাদাসম্পন্নভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া।

Saturday, October 24, 2015

ঐক্যের গুরুত্ব এবং অনৈক্যের পরিণাম

ঐক্যের গুরুত্ব এবং অনৈক্যের পরিণাম

 0

মো: হাসানুজ্জামান:
মানবজাতির পার্থিব ও পারলৌকিক অর্থাৎ যাবতীয় কল্যাণের উদ্দেশ্যে যুগে যুগে স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাঁর বার্তাবাহকগণ সত্যধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সকল ধর্মই সত্য, ন্যায়, কল্যাণ এবং মানবজাতির শান্তির পক্ষে কথা বলে। কারণ স্রষ্টা হলেন যাবতীয় সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের আধার। স্রষ্টা প্রেরিত সর্বশেষ দীন হলো দীনুল ইসলাম। পৃথিবী থেকে সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার, যুদ্ধ-রক্তপাত এক কথায় অশান্তিকে নির্মূল করে, মানবজাতিকে এক জাতিতে পরিণত করার উদ্দেশ্যেই শেষ নবীর আগমন। এ জন্য মানবজাতির মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। এ কারণে ইসলাম ঐক্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে অনৈক্য এই মহাপরিকল্পনার পথে প্রধান অন্তরায়। তাই এই দীনের বিধানগুলোও অনৈক্যের বিরুদ্ধে অতিশয় কঠিন।
সারা দুনিয়ার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, জাত-পাত, হিংসা-বিদ্বেষ লুপ্ত করে তাদেরকে এক কাতারে নিয়ে আসার মতো অসাধ্য সাধন করা যার উদ্দেশ্য, সেই মহামানব সর্বপ্রথম যে কাজটিতে মনোনিবেশ করেছিলেন তাহলো সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা। ইতিহাসে পাই- তদানীন্তন আরবের ৫ লাখের একটি জাতিকে তিনি (সা.) তাঁর জীবদ্দশাতেই ঐক্যবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। এর কারণও অতি সোজা। তিনি এটা ভালোভাবেই জানতেন যে- তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব এক জীবনে পূর্ণ করে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।
তাই তিনি তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জাতিটিকে হাতে কলমে এমন শিক্ষা দিয়ে গেলেন যাতে এই ঐক্যবদ্ধ জাতিটি তাঁর চলে যাওয়ার পরেও আপ্রাণ সংগ্রাম করে সমস্ত পৃথিবীকে ঐ শিক্ষা পৌঁছে দিয়ে মানবজাতিকে এক জাতিতে পরিণত করতে পারে। তিনি জানতেন এই কাজ এই জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারবে যতক্ষণ তাদের মধ্যে ঐক্য বজায় থাকবে। ঐক্যের হানি ঘটলেই জাতি তার চলার গতি হারিয়ে ফেলবে এবং এক সময় স্থবির হয়ে পড়বে- উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। এটা পৃথিবীর এক অমোঘ নিয়ম যে- একটি জাতি কিংবা একটি সংগঠন যত শক্তিশালীই হোক, ধনে-বলে যতই উন্নত হোক, যদি তাদের মধ্যে ঐক্য না থাকে তবে তারা কখনোই জয়ী হতে পারবে না। অতি দুর্বল শত্রুর কাছেও পরাজিত হবে। তাই আল্লাহ বহুবার কোর’আনে এই ঐক্য অটুট রাখার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। এই ঐক্য যাতে না ভাঙ্গে সে জন্য তাঁর রসুল (সা.) সদা শংকিত ও জাগ্রত থেকেছেন। ঐক্য নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে এমন কোন কথা বা কাজ যখনই কাউকে করতে দেখেছেন তখনই তিনি ভীষণ রেগে গেছেন।
রসুলাল্লাহর জীবনী যারা ভাসা ভাসাভাবেও পড়েছেন তারাও এটা অস্বীকার করতে পারবেন না যে- তাঁর নবী জীবনের ২৩ বছরে তিনি কত অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মক্কা ও তায়েফের মাটিতে তাঁকে মুশরিকদের ক্রীড়া-কৌতুকের পাত্র হতে হয়েছে, প্রস্তরাঘাতে পবিত্র দেহ থেকে রক্ত ঝরাতে হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র অস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি ঐ মুশরিকদের উপর রেগে গিয়েছেন বা তাদের অভিসম্পাত করেছেন এমন কোন নজীর কেউ দেখাতে পারবে না। বরং তিনি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাত কামনা করেছেন। কিন্তু সর্বরিপুজয়ী ঐ একই ব্যক্তির রাগও আমরা দেখতে পাই তাঁর পবিত্র জীবনীতে। না, সেটা মুশরিকদের জর্জরিত করা আঘাতের কারণে নয়, তাঁরই প্রাণপ্রিয় আসহাবদের মধ্যে কেউ যখন কোর’আনের কোন আয়াত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে দেখেছেন তখন তিনি রেগে লাল হয়ে গেছেন। তাঁর আসহাব এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মোতাবেক রসুলকে আমরা সর্বদাই একজন সদা হাস্যময় এবং শান্ত-সৌম্য মানুষ হিসেবে দেখতে পাই। অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া তাঁর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই মানুষটিও রেগে অগ্নিশর্মা হয়েছেন। কখন হয়েছেন? যখন তিনি কাউকে এমন কোন কাজ করতে দেখেছেন যার ফলে তিলে তিলে গড়ে তোলা তাঁর আজীবনের সাধনা, অর্থাৎ মহান আল্লাহ তাঁকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ যে কাজের ফলে তাঁর সারা জীবনের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তাঁর পবিত্র জীবনীতে আমরা পাই, একদিন দুপুরে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) রসুলাল্লাহর গৃহে গিয়ে দেখেন তাঁর মুখ মোবারক ক্রোধে লাল হয়ে আছে। কারণ তিনি দু’জন আসহাবকে কোর’আনের একটি আয়াত নিয়ে মতবিরোধ করতে দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি (সা.) বললেন- কোর’আনের আয়াতের অর্থ নিয়ে যে কোনরকম মতভেদ কুফর। নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ (উম্মাহ) তাদের (উপর অবতীর্ণ) কিতাবগুলোর (আয়াতের) অর্থ নিয়ে মতবিরোধের জন্য ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপর তিনি আরও বললেন (কোর’আনের) যে অংশ (পরিষ্কার) বোঝা যায় এবং ঐক্যমত আছে তা বল, যেগুলো বোঝা মুশকিল সেগুলোর অর্থ আল্লাহর কাছে ছেড়ে দাও (মতবিরোধ করো না) [হাদিস-আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে- মুসলিম, মেশকাত]।
এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম যে মতভেদ থেকেই অনৈক্যের সূত্রপাত। আর অনৈক্য মানেই ব্যর্থতা, দুর্বল শত্রুর কাছেও পরাজয়। সুতরাং সামান্য বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদের মাধ্যমে তাঁর পবিত্র জীবনের সব সংগ্রাম, ত্যাগ যদি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তবে তা কি করে তিনি মেনে নিতে পারেন? এ কারণেই আমরা সর্বরিপুজয়ী এই জিতেন্দ্রীয় মহামানবকেও রেগে লাল হতে দেখেছি।
তাই মুসলিম জাতির ঐক্যের গুরুত্ব কতখানি তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ইসলামের বিরুদ্ধে, রসুলাল্লাহর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের চেয়েও বড় অপরাধ হলো মুসলিম জাতির মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করা। কারণ জাতির মধ্যে যে কোন রকমের মতভেদের সূত্রপাতই অনৈক্য সৃষ্টি এবং পরিণামে জাতি ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। এ কারণে রসুলাল্লাহ ঐক্য নষ্ট হয় এমন কোন কথা, কাজ বা ইশারা-ইঙ্গিতকেও কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় এই যে জাতির অখণ্ডতা ও অবিভাজ্যতা সম্পর্কে আল্লাহ ও রসুলের এমন স্পষ্ট আদেশ-নিষেধ সত্ত্বেও মুসলিম জাতি আজ শরিয়াহগতভাবে শিয়া-সুন্নি, হানাফি, মালেকি, শাফেয়ী, হাম্বলী, আহলে হাদিস; আধ্যাত্মিকভাবে- কাদেরিয়া, নক্শবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, আহলে বাইত, ভৌগোলিকভাবে ৫৫ টিরও বেশি রাষ্ট্রে এবং ইহুদি খ্রিস্টানদের নকল করে রাজনীতিকভাবে কেউ গণতন্ত্রী, কেউ সমাজতন্ত্রী, কেউ সাম্যবাদী, কেউ রাজতন্ত্রী, কেউ পুঁজিবাদী ইত্যাদি হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত।
কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন- ‘সকল মুমিন ভাই ভাই।’ হাদিসে রসুলাল্লাহ বলেছেন- ‘উম্মতে মোহাম্মদী জাতি যেন একটি শরীর, তার একটি অঙ্গে ব্যথা পেলে সারা শরীরেই ব্যথা অনুভূত হয়।’ অথচ আজ আর তারা এক জাতি, ভাই-ভাই তো নয়-ই উপরন্তু নিজেরা নিজেরা মারামারি-হানাহানি, রক্তপাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বোমাবাজি করে চূড়ান্ত ঐক্যহীন ও শতধা বিচ্ছিন্ন একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর তাই রসুলাল্লাহ তাদেরকে যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সেই উদ্দেশ্য অর্জন করাও তাদের দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না।
শুধু শেষ রসুলের উম্মাহ হিসেবেই নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও যদি আমরা মানব জাতির কল্যাণ ও উন্নতি কামনা করি তাহলে মানুষকে সমস্ত প্রকার বিভক্তি- ব্যবধান ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মানুষ একই দম্পতি- বাবা আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) থেকে আগত, সুতরাং মানুষকে সেই আদি পরিচয়ে ফিরে যেতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

সমগ্র মানবজাতি এক পিতা-মাতা থেকে আগত

সমগ্র মানবজাতি এক পিতা-মাতা থেকে আগত

 0

মিজানুর রহমান:
আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে মানুষ জ্ঞান-বুদ্ধি-যোগাযোগ-বিবেক-কৃষ্টি ইত্যাদি এক কথায় বিবর্তনের এমন একটা বিন্দুতে পৌঁছুল যে, তখন সমগ্র মানব জাতির জন্য একটি মাত্র জীবন-বিধান গ্রহণ করা সম্ভব অর্থাৎ সকলেই একই দীনের আওতায় আসা সম্ভব। এটা মহান স্রষ্টার মহা পরিকল্পনারই একটি অংশ, যে পরিকল্পনা তিনি তার প্রতিনিধি মানুষ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ই করেছিলেন। মানুষ বিবর্তনের এই বিন্দুতে পৌঁছামাত্র আল্লাহ পাঠালেন মোহাম্মদ বিন আব্দাল্লাহকে (সা.)। পূর্ববর্তী প্রেরিতদের মতো তাঁর মাধ্যমেও আল্লাহ পাঠালেন সেই দীনুল কাইয়্যেমা-সিরাতুল মুস্তাকীম অর্থাৎ আল্লাহকেই একমাত্র বিধাতা, সার্বভৌম হুকুমদাতা হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া। ঐ সিরাতুল মুস্তাকীমকে ভিত্তি করে যে সংবিধান এল সেটা এবার এল সমস্ত মানব জাতির জন্য (কোর’আন- সূরা আত-তাকভীর ২৭)। আগের মতো নির্দিষ্ট কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। এর পরিষ্কার অর্থ হলো এই যে আল্লাহ চান যে বিভক্ত বিচ্ছিন্ন মানব জাতি নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে আবার একটি মাত্র জাতিতে পরিণত হোক। কারণ, তারা আসলে গোড়ায় একই বাবা-মা, আদম-হাওয়ার (Adam-Eve) সন্তান অর্থাৎ একই জাতি। ভৌগোলিক পরিবেশ, বিপর্যয়, কালের বিবর্তন ইত্যাদি কারণে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল কিন্তু এখন আবার সময় এসেছে এক হয়ে শান্তিতে বসবাস করার অর্থাৎ আল্লাহ চান তাঁর এই প্রিয় সৃষ্টি বনি আদম আবার সকল বর্ণ, সকল ভেদাভেদ ভুলে একটি জাতিতে পরিণত হোক। একটি জাতিতে পরিণত করার জন্য তিনি এমন একটি জীবন-ব্যবস্থা দিলেন, যেটা সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতি নির্ভর অর্থাৎ দীনুল ফেতরাহ। প্রাকৃতিক উপাদান বায়ু থেকে অক্সিজেন, সূর্য থেকে উত্তাপ গ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি-বর্ণের মধ্যে কোনো বৈষম্য নেই, তেমনিভাবে এই দীনটিও সকল এলাকার সকল মানুষ সমানভাবে গ্রহণ করতে পারবে। এই জীবনব্যবস্থা সমানভাবে সকল এলাকার মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে। নতুন সংবিধানে তিনি বললেন, “হে মানব জাতি! আমি তোমাদের একটি মাত্র পুরুষ ও একটি মাত্র স্ত্রী থেকে সৃষ্টি করেছি। জাতি গোষ্ঠীতে তোমাদের পরিণত করেছি যাতে তোমরা নিজেদের চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে যে যত বেশি ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সতর্ক, অর্থাৎ মুত্তাকী আল্লাহর চোখে সে তত বেশি সম্মানিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুই জানেন। সব কিছুরই খবর রাখেন (কোর’আন- সূরা আল-হুজরাত ১৩)। এখানে আল্লাহ তিনটি কথা মানুষকে বলেছেন।
ক) মানুষকে তিনি এক-দম্পতি থেকে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ সমস্ত মানব জাতি একই বংশের একই রক্তের; সুতরাং একই জাতি।
খ) দেহের গঠনে, চামড়ার রংয়ে, ভাষায় ইত্যাদিতে যে বিভক্তি এ শুধু পরিচয়ের জন্য, তার বেশি কিছুই নয়।
এই কথাটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। একটি লোকের কয়েকটি সন্তান আছে। সন্তানরা কেউ কালো, কেউ ফর্সা, কেই বাদামী, কেউ লম্বা, কেউ খাটো, কেউ মোটা, কেউ পাতলা। এদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম রাখা হয়। কেন? নিশ্চয়ই পরিচিতির জন্য। আল্লাহ বলছেন ‘মানব জাতিকে শুধু ঐ পরিচিতির জন্যই বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীতে, গায়ের রংয়ে, ভাষায় ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তাছাড়া এটা আল্লাহর সৃষ্টি কৌশলতার এক অনন্য সৌন্দর্য। যদি সকল মানুষ সাদা হতো অথবা সকল মানুষ একই উচ্চতার হতো তাহলে সৌন্দর্যের কোনো মানদণ্ড থাকত না, যেমন হাতের ৫টি আঙ্গুল একেকটি একেক আকৃতির এবং প্রত্যেকটিরই আলাদা-আলাদা সৌন্দর্য এবং কার্যকারিতা রয়েছে। এর মানে এই নয় যে খাট আঙ্গুলটি শ্রীহীন ও কম গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে বিভিন্ন বর্ণের হলেও ঐ লোকটির সন্তানদের মতই পুরো মানবজাতি ভাই-বোন, একই জাতি। অর্থাৎ আল্লাহ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ-বৈষম্য মিটিয়ে দিচ্ছেন।
গ) মানুষে মানুষে তফাতের একটি মাত্র সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিলেন, সেটি হলো ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ দেখে যে যত সতর্কভাবে চলবে, কাজ করবে- অর্থাৎ যে যত বেশি উন্নত চরিত্রের- সে তত বেশি আল্লাহর কাছে সম্মানিত। এক কথায় আল্লাহ বলছেন মানুষ এক জাতি, কেউ কারো চেয়ে বড় নয়, ছোট নয়, সব সমান। ছোট-বড়র একটি মাত্র মাপকাঠি, সেটি হলো ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি। সেখানে চামড়ার রংয়ের, ভাষার, কোন্ দেশে কার জন্ম বা বাস এসবের কোনো স্থান নেই। এবং ঐ ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা হচ্ছে সেটা, যেটা আল্লাহ তার সংবিধান কোর’আনে দিয়ে দিয়েছেন। এই আয়াতটি ছাড়াও আল্লাহ কোর’আনের বিভিন্ন স্থানে বলেছেন একই আদম-হাওয়া থেকে সৃষ্ট বলে সমস্ত মানব জাতি একজাতি। সুতরাং এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, ভৌগোলিক বা গায়ের রং, ভাষা ইত্যাদি ভিত্তিক জাতি আল্লাহর দেয়া জীবন-ব্যবস্থার সরাসরি পরিপন্থী, উল্টো।
আজ সারা পৃথিবী জুড়ে চামড়ার রং, ভাষা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করা জাতিগুলি প্রত্যেকটি নিজেদের ছাড়া বাকি মানব গোষ্ঠী থেকে আলাদা, স্বতন্ত্রভাবে দেখে; শুধু স্বতন্ত্রভাবেই দেখে না বর্তমানে এক দেশ আর এক দেশের সঙ্গে শত্র“ভাবাপন্নে পরিণত হয়েছে। এর কারণ ঐ সব জাতিগুলির প্রত্যেকটির জাতীয় স্বার্থ বিভিন্ন অর্থাৎ একেক জাতির একেক স্বার্থ। তাদের প্রত্যেকেরই মনোভাব হচ্ছে যে কোনো উপায়েই হোক নিজের স্বার্থ রক্ষা করতেই হবে, এতে পাশ্ববর্তী দেশের কত মানুষ হত্যা করতে হবে, কত বাড়ী-ঘর, জনপথ ধ্বংস করা হবে তার কোনো হিসাব করার প্রয়োজন নাই, কোনো ন্যায়-নীতি, মানবতার বালাই নেই। নিজ দেশের সীমান্তে নদীর গতিপথে বাঁধ দিয়ে অন্যদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত করে নিয়েছে। মানুষ জীবিকা ও অন্য কোনো প্রয়োজনে এই সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা করলে সীমান্তরক্ষীদের গুলি তাদেরকে ঝাঁঝরা করে দেয়। অথচ পৃথিবীর এই মাটি থেকে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই মাটিতেই আবার সকল আদম সন্তানকে ফেরত যেতে হবে সুতরাং সৃষ্টিগতভাবেই এই মাটির উপর, এই পৃথিবীর উপর মানুষের পূর্ণ অধিকার, হক রয়েছে। মানুষ ইচ্ছা করলে এই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যেতে পারে, যে কোনো জায়গায় বসবাস করতে পারে। এই পৃথিবী আল্লাহ মানুষের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর বুকে তাঁর প্রতিনিধি, খলিফা। এখানে তিনি পৃথিবীর বুকে কোনো বিভক্তিরেখা আরোপ করেন নি। সুতরাং এই সম্পূর্ণ পৃথিবীর উপর প্রতিটি মানুষের সৃষ্টিগত অধিকার। সেই অধিকারবলে এই মাটির সর্বত্র সে যেতে পারে- এই পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় ন্যায়সঙ্গতভাবে ফসল ফলাতে পারে। এই পৃথিবীর বুকে আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা থেকে যার যা খেতে ইচ্ছা করবে তা খেতে পারে, কেউ বাধা দিতে পারে না। অন্যের কোনো ক্ষতি না করে, অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না হয় এমন সব কাজ সে করতে পারে। মানুষের স্রষ্টা, প্রভু, রব, মালিক আল্লাহ মানুষকে এই অধিকার দিয়ে রেখেছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতা এসে মানুষের যাবতীয় অধিকার হরণ করেছে বিভিন্ন সীমারেখা, বিধি-নিষেধ আরোপ করে। ফলে মানুষের মধ্যে স্থায়ী সংঘাত, সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে, এই সংঘর্ষের প্রবণতা সব চেয়ে বেশি প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে, একথা যে কোনো সময়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস লক্ষ্য করলেই পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। কারণ ঐ একই। ‘মানুষ এক জাতি’ আল্লাহর এই কথা অস্বীকার করে পৃথিবীর বুকের উপর খেয়াল খুশি মতো দাগ দিয়ে, লাইন টেনে, চামড়ার রংয়ের উপর ভাষার উপর ভিত্তি করে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে চিরস্থায়ী সংঘাত-সংঘর্ষ-রক্তপাত ও যুদ্ধের ব্যবস্থা করা। যতদিন মানুষের তৈরি এই জীবনব্যবস্থা পৃথিবীতে চালু থাকবে, ততদিন মানুষে-মানুষে, জাতিতে-জাতিতে অশান্তি, যুদ্ধ রক্তপাত কেউ বন্ধ করতে পারবেন না। শত লীগ অব নেশনসও (League of Nations) নয়, শত জাতিসংঘ ও (United Nations) নয়। মালায়েকরা মানুষ তৈরির বিরুদ্ধে যে যুক্তি দিয়েছিলেন; ইবলিস মানুষকে দিয়ে যা করাবে বলে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে- অর্থাৎ সেই ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা- অশান্তি, অন্যায়, রক্তপাত ও যুদ্ধ যাতে চলতে থাকে সেজন্য শয়তানের হাতে যত অস্ত্র আছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান অস্ত্র হচ্ছে এই ভূগোল, চামড়ার রং, ভাষা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে মানব জাতিকে বিভক্ত করা। এবং এই জন্যই এই ব্যবস্থা শেষ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই ব্যবস্থা মানুষ জাতির কত অশান্তি, অন্যায়, অবিচার, রক্তপাত, যুদ্ধ, অশ্র“ ও ভগ্ন হৃদয়ের কারণ হয়েছে- হচ্ছে, তা সমুদ্রের মতো সীমাহীন।

উপায় এখন একটাই

উপায় এখন একটাই

 0

DSC04812মানুষ শুধু দেহসর্বস্ব প্রাণী নয়, তার একটি আত্মাও আছে। সেই আত্মা হলো আল্লাহর রূহ। অর্থাৎ মানুষ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক জীব। মানুষ নামক এই জীবের জীবনকে সুখকর, শান্তিময় ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করার জন্য এমন একটি জীবনব্যবস্থা দরকার, যে জীবনব্যবস্থাটাও শরীয়াহ ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ হবে। যেখানে শরীয়াহগতভাবে অন্যায়ের শাস্তি যেমন থাকবে তেমনি অন্যায় না করার জন্য আত্মিক প্রশিক্ষণ তথা ন্যায়নীতিবোধ, পারলৌকিক মুক্তির চিন্তা, স্রষ্টার প্রতি পূর্ণ আনুগত্যবোধ ইত্যাদি সৃষ্টির প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। সমগ্র মানবজাতিকে একটি জাতিতে পরিণত করার জন্য, সমস্ত পৃথিবীকে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তিতে পরিপূর্ণ করার জন্য যে দীনটি আল্লাহ পাঠিয়েছেন, সেই দীনটি প্রাকৃতিক নিয়মের উপরে, আমাদের দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। স্রষ্টার দেওয়া ব্যবস্থাতে উপরোক্ত দু’টি দিকই আছে, ভারসাম্যপূর্ণভাবে। ১৪০০ বছর আগে যেটা অর্ধ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে মানুষ দেখেছিল শান্তি ও পূর্ণ নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে যখন এই জাতির একটি বিশেষ শ্রেণি তাদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এর ভারসাম্য বিনষ্ট কোরল এবং ক্রমে ক্রমে এটি প্রত্যাখ্যান কোরল তখন থেকে সমাজে সৃষ্টি হলো অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা এক কথায় চরম অশান্তি। এক পর্যায়ে মানুষ নিজেই তার জীবনব্যবস্থা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলো, জন্ম হলো দাজ্জালের। দাজ্জাল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদির নামে এমন ভারসাম্যহীন জীবনব্যবস্থা কায়েম কোরল যেখানে মানুষের আত্মিক ভাগটা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অপরাধ দমনের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও অপরাধ না করার জন্য যে আত্মিক প্রশিক্ষণ দরকার অর্থাৎ স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্যবোধ, ভীতি কিছুই সেখানে রোইল না; এই ব্যবস্থাটি হলো সম্পূর্ণ স্রষ্টাহীন, আত্মাহীন, জড়বাদী, ভোগবিলাসী এক সভ্যতা যার মূলনীতিই হলো খাও-দাও ফূর্তি করো। মানুষ ধীরে ধীরে আত্মাহীন হয়ে পোড়ল। আত্মাই যখন অনুপস্থিত সুতরাং মানুষের ভেতরে আত্মা থেকে সৃষ্ট- দয়া-মায়া, সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়নীতিবোধ, সততা, সত্যবাদিতা, বিবেক, ঐক্য, শৃঙ্খলাবোধ ইত্যাদি সৎগুণাবলীও অনুপস্থিত হতে লাগলো। ফলে সমাজে সৃষ্টি হলো চরম অরাজকতা, অন্যায়, অশান্তি। তারা সম্মিলিতভাবে স্রষ্টার এই দুনিয়াটাকে সাক্ষাৎ এক নরকপূরীতে পরিণত করেছে। এখন শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে, শাস্তির বিধান তৈরি করে আর সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। আগুনের মধ্যে লাফ দিলে আগুন আপনাকে দগ্ধ করবেই, বাঁচতে হলে আগে আগুন থেকে বের হতে হবে, আগুনের মধ্যে থেকে বাঁচার উপায় খোঁজা নিতান্তই বোকামী। তাই এখন বাঁচতে হলে স্রষ্টা আল্লাহর দেওয়া সেই নিঁখুত জীবনব্যবস্থা (দীন) গ্রহণ করা ছাড়া পথ নেই। সেই নিঁখুত ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা কোথায় পাওয়া যাবে। হেযবুত তওহীদ আল্লাহর রহমে মানবজাতির সামনে এটা উপস্থাপন করছে।
হেযবুত তওহীদ

তাদের নিশানা ইসলামের দিকে!

তাদের নিশানা ইসলামের দিকে!

 0

আলী হোসেন:
আজকে আমাদের দেশের প্রত্যেকটা নাগরিককে দেশ ও সমাজকে নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদেরকে আর ক্ষুদ্রস্বার্থে, ব্যক্তিচিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকলে চলবে না। এক শ্রেণির মিডিয়ার প্রচারণা, বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও পশ্চিমা সংস্কৃতি, রোজগারমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংকীর্ণ ধর্ম, ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা ধর্মের নামে অধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক আমাদের দৃষ্টিকে এতটাই নিুমুখী, ক্ষুদ্র ও হীন করে রেখেছে যে, আমরা কিছুতেই ব্যক্তির গণ্ডির বাইরে চিন্তাও করতে পারছি না। আমরা চোখ তুলে তাকাই না বিশ্বে কী হচ্ছে, বিশ্বে কী তুমুল কাণ্ড ঘটে চলেছে, কী ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেখানে। সেই পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আছে কিনা, এ পরিস্থিতি দ্বারা আমরা আক্রান্ত হতে পারি কিনা, তা আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে কিনা, যদি সৃষ্টি হয় তখন আমাদের কী করণীয়, আমাদের পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে কিনা, কোন কোন ক্ষেত্রে তা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমাদের কৃষক নেতৃবৃন্দ, শ্রমিকশ্রেণী থেকে শুরু করে প্রত্যেকের ভাবার আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তা নিয়ে ভাবি না। সেটা যে আমার ভাবনার বিষয়বস্তু হতে পারে সেটাও আমাদের জ্ঞানে আসে না। অচৈতন্যকে, অসচেতনতাকে আমরা আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য বানিয়ে নিয়েছি। আমরা ভাবি ওসব ভাবার জন্য সরকার আছে, বড় বড় মাথাওয়ালা বুদ্ধিজীবী আছে, এরা আছে, তারা আছে। আমি একজন ভুক্তভোগী হয়েও নিষ্পৃহ নির্বিকার দর্শকমাত্র। নির্বিকার থাকাই আমাদের শেখানো হয়েছে ঠিক যেমন চিড়িয়াখানার বাঘটি দীর্ঘ বন্দীদশায় একসময় নির্বিকার হয়ে যায়। আমাদেরকে মিডিয়াগুলো একটা সামান্য পৌরসভার মেয়র নির্বাচন নিয়ে এমনভাবে প্রচার-প্রচারণা চালায় তাতে মানুষও এটা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। আমাদের সকল জাতীয় চেতনার সমাধি ঘটানো হয় অপ্রয়োজনীয়, অর্থহীন ঘটনাবলীর চোরাবালিতে। এই যে অসার বিষয় নিয়ে মগ্ন করে রাখার প্রয়াস, এটা একটি বিরাট আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, তা হচ্ছে আমাদেরকে জাতীয়ভাবে কূপমণ্ডূকতা, কুয়োর ব্যাঙ করে রাখা। এ ষড়যন্ত্র চলছে সেই ঔপনিবেশিক যুগ থেকে দু’টি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থার নামে।
১৫ কোটি মুসলমান এই দেশে বাস করে। এই বিরাট জনগোষ্ঠীর কত ভাগ মানুষ এটা অনুধাবন করতে পারছি যে, ইসলাম তথা মুসলমানদের দিকেই বন্দুক তাক করা হয়েছে, লাইন অব ফায়ারে বাংলাদেশও আছে। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব তাদের আধিপত্যকে নিরঙ্কুশ করার জন্য প্রতিপক্ষ হিসাবে গ্রহণ করেছে ইসলামকে। এই লক্ষ্যেই তালেবান, আল কায়েদা,আই.এস, বোকো হারাম ইত্যাদি দলের উদ্ভব ঘটিয়ে, রাজনীতিক দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিয়ে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাস দমন, মানবাধিকার ইত্যাদি অজুহাত ধরে একের পর এক ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়ামেন ইত্যাদি দেশকে ধ্বংস¯তূপে পরিণত করা হলো। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে সৃষ্টি করা হলো আরব বসন্ত, যার আদলে যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও ধর্ম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আমাদের দেশেও সৃষ্টি করা হয়েছে যথাক্রমে শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের আন্দোলন। এগুলোর ধারাবাহিকতায় ও রাজনীতিক দ্বন্দ্বের পরিণামে আমাদের দেশে বার বার গৃহযুদ্ধের আবহ সৃষ্টি হয়েছে যা কোনোরকমে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সারা দুনিয়ায় শতমুখী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ইসলামকে সন্ত্রাসের ধর্ম, আল্লাহর রসুলকে সন্ত্রাসী নবী (নাউযুবিল্লাহ) বলে প্রতিষ্ঠা করে ফেলা হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে আবার চলে প্রতিশোধপরায়ণদের জঙ্গি তৎপরতা। বিশ্বময় যতগুলো মুসলিমপ্রধান দেশ আছে প্রায় প্রতিটি দেশেই জঙ্গি কর্মকাণ্ড ঘটছে। তাদেরকে দমন করতে জোরদার করা হচ্ছে আইন, কেনা হচ্ছে নতুন নতুন অস্ত্র, তৈরি করা হচ্ছে নতুন নতুন নামের বাহিনী। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীরা জঙ্গি দমনের অজুহাতে যে কোনো দেশে যে কোনো সময় প্রবেশ করতে পারে, হামলা চালাতে পারে। ঐ দেশের সরকারের অনুমতি বা প্রটোকল রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করে না, যে কোনো ছুতানাতা পেলে একটি দেশের উপর অবরোধ আরোপ করতে পারে, নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে, সর্ববিধ উপায়ে মারার ব্যবস্থা করতে পারে। আমাদের ভাগ্যে এ জাতীয় কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না তা সেটা আমাদেরকে ভেবে দেখা উচিত। এটা ১৬ কোটি মানুষের জীবনের ও তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত বিষয়। কেননা একটি দেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার চিকিৎসার জন্য পশ্চিমারা ডাক্তার সেজে ওষুধ নিয়ে উড়ে আসেন সেই পরিস্থিতি যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে এই ১৬ কোটি মানুষকেই। কেবল একটা নির্দিষ্ট সরকারের পক্ষে সেটা সম্ভব হবে না। যে দেশে জনগণের মধ্যে ঐক্য নেই, পারস্পরিক হানাহানি, বিদ্বেষ লেগেই থাকে সেখানে কোনো সরকারই তা করতে পারবে না। তার প্রতিটি সৎ উদ্যোগ পদে পদে বিঘ্নিত হবে।
আমাদের দেশের ৯০% মুসলমান, এর মধ্যে মাদ্রাসার লক্ষ লক্ষ ছাত্র আছে, এখানে প্রভাবশালী ইসলামী দল আছে যারা ক্ষমতার অংশীদার হয়েছেন, লক্ষ লক্ষ তরুণ সমাজ আছে যারা ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত, তারা এতটাই উজ্জীবিত যে তাদের চেতনাকে ভুল পথে চালিতে করে বার বার দেশের অর্থনীতির চরম ক্ষতি করেছে, শত শত মানুষ হত্যা করা হয়েছে, অর্থাৎ ধর্ম চেতনা এখানে প্রবল। এখানে নাস্তিকতাবাদের ইস্যু নিয়ে বার বার রাজপথ প্রকম্পিত করে লক্ষ লক্ষ লোক বের হয়ে এসে বিক্ষোভ করেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিক দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ আরোপ করে, কুফর শক্তির উৎখাতের নামে জনরোষ ও জনবিক্ষোভ সৃষ্টির প্রচেষ্টা করে থাকে। একেও জঙ্গিবাদ আখ্যা দিয়ে আমাদের দেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র বলে চিহ্নিত করে থাকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন। এই অসন্তোষকে প্রতিহত করার জন্য বিদেশিদের পাঁয়তারার কোনো কমতি নেই। কিছুদিন আগে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সন্ত্রাস দমনে দৃঢ়তার জন্য সাধুবাদ জানিয়ে গেছেন যার মাধ্যমে তিনি এটাও প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন যে এদেশে সন্ত্রাসবাদের অস্তিত্ব ব্যাপক হারে আছে। সুতরাং যে কোনো সময়ে এখানে একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কি করণীয় এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের খুব ভাবতে হবে। এ পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হতে পারে সেজন্য ষোল কোটি মানুষকে প্রণোদিত (Motivate) করতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, একদল মাদক ব্যবসায়ীর যেমন মানুষের ক্ষতি বা উপকার নিয়ে চিন্তা থাকে না, তারা কেবল মাদকদ্রব্য বিক্রি করতেই সচেষ্ট থাকে তেমনি আন্তর্জাতিক অস্ত্রব্যবসাকে যারা নিজেদের অর্থনীতির ভিত্তি বানিয়ে নিয়েছে তারা কেবল অস্ত্রই বিক্রি করতে সচেষ্ট আছে। অস্ত্রের প্রয়োগ হয় রণাঙ্গনে, তাই তারা সারা বিশ্বেই রণাঙ্গন সৃষ্টি করতে চায়। তাদের শান্তির প্রয়োজন নেই, শান্তি তাদের দু চোখের বিষ। তারা চায় যুদ্ধ, দাঙ্গা, গোলোযোগ কারণ আমাদের যেমন কৃষি অর্থনীতি, তেমনিভাবে তাদের হলো যুদ্ধ অর্থনীতি (War economy)। কাজেই মানুষ বাঁচল কি মরল তা নিয়ে তাদের চিন্তা নেই, পৃথিবীতে এমনিই জনসংখ্যা সমস্যা বিকট দানবের আকৃতি নিয়ে মানবজাতিকে ভয়াবহ সংকটে নিক্ষেপ করেছে। যুদ্ধ সৃষ্টি করে যদি এই জনসংখ্যা থেকে একশ ষাট কোটি মানুষও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাতে তেমন ইতরবিশেষ তারতম্য হবে না, বরং এতে তাদের লাভই হবে। তাদের একাধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, তাদের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, আরো বেশি ভোগবিলাসে জীবনযাপন করবে। কাজেই আমাদের ভাবনা এখন আমাদেরকেই ভাবতে হবে। জনগণকে এই ভাবনা কেউ ভাবায় না, না রাজনীতিকগণ, না মিডিয়া। এমতাবস্থায় জাতির জন্য একটু ভাবার জন্য হেযবুত তওহীদ কড়া নাড়ছে প্রত্যেকের মনের দরজায়, ঘরের দরজায়। আমরা জনগণের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, “আমাদের দেশে দেশপ্রেমিক দাবিদার অসংখ্য। কিন্তু এমন কোনো দেশপ্রেমিক কি আপনারা দেখেছেন যারা সত্যিই জনগণের কল্যাণ অকল্যাণ নিয়ে চিন্তা করেন? নাকি তারা স্বার্থচিন্তায় মগ্ন?” এর উত্তর কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, দেশপ্রেম ও ধর্মের নামে স্বার্থহাসিল সবচেয়ে বড় অধর্ম। এটা সাধারণ জ্ঞান যে, রাজার অধর্ম আর প্রজার অধর্ম সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিরিয়াতে বাশার আল আসাদ তার ক্ষমতার মোহে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে দেশের এই পরিণতি তিনি কস্মিনকালেও ভাবতে পারেন নি। তিনি বিরুদ্ধপক্ষের বিরুদ্ধে দমন পীড়ন চালিয়েছেন। জনগণও দর্শকের ভূমিকায় বসে নাটক দেখেছে। তারা সচেতন হয় নি। আজ সেই হাজার হাজার বছরের সিরিয়া যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বহু সভ্যতা ও ইতিহাস, সেই সিরিয়া মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সেই জনগণের থেকেই আড়াই লক্ষ মানুষ মাটির সাথে মিশে গেছে। আর বাকি ৪০ লক্ষ নিজেদের আরবীয় কায়দার ভোগবিলাসপূর্ণ জীবন ফেলে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর মধ্যে শরণার্থী শিবিরে থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের করুণা ভিক্ষা করছেন (সূত্র: বিবিসি রিপোর্ট)। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য, মসজিদ, মাজার, মাদ্রাসা, শহর সব বিরান হয়ে গেছে। ঠিকানা পর্যন্ত মুছে ফেলা হয়েছে। ইরাকে নিহত হয়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ। আজ সময় এসেছে আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে চিন্তা করার, নিজের সমাজ নিয়ে, মাটি নিয়ে চিন্তা করার।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি (Representative) হিসাবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ যেমন সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে প্রতিপালন করেন, আমাদের দায়িত্ব এই মানবজাতির শান্তিরক্ষা ও প্রতিপালন। পৃথিবীর দূরতম প্রান্তেও কোনো মানুষ যদি কষ্ট পায় সেটা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। তার কষ্ট আমাদের হৃদয়েও দোলা দেবে। এই অনুভূতি যার নেই সে আকৃতিতে মানুষ হলেও মানুষের ধর্ম থেকে সে বিচ্যুত, সে ধর্মহীন, কাফের। যারা ব্যক্তিগত ধর্মপালনের মাধ্যমে কোনো রকমে দুনিয়া থেকে পালিয়ে জান্নাতে চলে যেতে চান, তাদের জন্য বলছি। জান্নাতে যেতে হলে ধর্মকর্ম করার আগে মোমেন হতে হবে। যে সমাজে মানুষ অন্যায় অশান্তির মধ্যে বাস করে সেখানে কারো কোনো ধর্মকর্ম কবুল হয় না। সেখানে আসল ধর্ম হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এর চেয়ে বড় দেশপ্রেম নেই, এর চেয়ে বড় ধর্মও নেই।
আমাদের রাজনীতিক নেত-নেত্রীদের মধ্যে একটি বড় অংশ আছেন যারা দেশে কোনো চূড়ান্ত দুর্যোগ হানা দিলে তারা আগে থেকেই পাসপোর্ট, ভিসা তৈরি করে রেখেছেন চম্পট দেওয়ার জন্য। কিন্তু পালিয়ে গিয়েও শান্তি পাবেন না, কারণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশও এখন মন্দাক্রান্ত্র, বিপর্যস্ত, অধঃপতিত। কাজেই এখন একটিই উপায়, ১৯৭১ সনে লক্ষ লক্ষ প্রাণের চরম ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে যে ভূখণ্ডটি মহান আল্লাহ আমাদেরকে দান করেছেন, নিজের মাতৃভূমি সেই মাতৃভূমিকে আগে টেকসই শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। নিজেদের মধ্যেকার সব কোন্দল, রেষারেষি মিটিয়ে ষোল কোটি মানুষের সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যেন কেউ এ জাতির গায়ে দাঁত বসাতে না পারে।
লেখক: আমীর, হেযবুত তওহীদ, ঢাকা মহানগরী।

Friday, October 23, 2015

মানুষের প্রকৃত ধর্ম কী?

মানুষের প্রকৃত ধর্ম কী?

 0

রাকীব আল হাসান
—————–
ধর্ম ও ধারণ একই শব্দ থেকে এসেছে। যে গুণ বা বৈশিষ্ট ধারণ করে কোনো বস্তু তার স্বকীয়তা, নিজস্বতা পায় তাকেই ঐ বস্তুর ধর্ম বলে। যেমন একটি লৌহদণ্ড আকর্ষণ করার গুণ ধারণ করে চুম্বকে পরিণত হয়। এই আকর্ষণ করার গুণটিই হলো ঐ চুম্বকের ধর্ম। যদি কোনো কারণে চুম্বক তার ধর্ম তথা আকর্ষণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তবে সেটি পুনরায় লৌহে পরিণত হয়, সেটি আর চুম্বক থাকে না। একটি লৌহকে চুম্বকে পরিণত করতে হলে নিরন্তর তাকে চুম্বক দিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘর্ষণ করতে হয়, এটি চুম্বকের ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। আবার পরিপূর্ণ চুম্বকও যদি আগুনে পোড়ানো যায় তবে সে তার ধর্ম হারিয়ে সাধারণ পদার্থে পরিণত হয়।
পানির ধর্ম হলো সে নিজে পবিত্র এবং সমস্ত কিছুকে ধৌত করে পবিত্র করে দেয়, তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা দূর করে নতুন জীবন দান করে। কিন্তু পানি যদি অপবিত্র, বিষাক্ত হয়ে যায় তবে সে অন্যকে না পবিত্র করতে পারে, না কারো তৃষ্ণা দূর করতে পারে। পানিকে পবিত্র করার জন্য, বিষমুক্ত করার জন্য আগুনে ফুটাতে হয়। এটিই পানির প্রকৃত ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। ধর্মহীন তথা বিষাক্ত, অপবিত্র পানি মানুষের জীবনের কারণ না হয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
মানুষও একটি সাধারণ প্রাণী হিসাবে জন্মগ্রহণ করে আস্তে আস্তে মনুষ্য ধর্ম প্রাপ্ত হয়ে মানুষের স্তরে ওঠে। এই মনুষ্য ধর্ম হলো মানবতা। এক পিতার মধ্যে সন্তানের প্রতি যে ভালোবাসা থাকে তা পিতৃধর্ম, ছেলে-মেয়ের প্রতি মায়ের মমতা হলো মাতৃধর্ম, ভায়ের প্রতি ভায়ের যে প্রেম তা ভ্রাতৃধর্ম। আর মানুষের প্রতি মানুষের যে প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, মমতা সেটি হলো মনুষ্যধর্ম। যার মধ্যে অন্য মানুষের প্রতি যত বেশি ভালোবাসা সে তত বড় ধার্মিক। সন্তান কষ্টে থাকলে মা-বাবার মনেও সুখ থাকে না, সন্তানের কষ্ট দূর করার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে। বাবা-মা হিসাবে এটা তাদের কর্তব্য। মানুষ কষ্টে থাকলে অপর মানুষও কষ্টে থাকবে, অপরের কষ্ট দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে- এটা মানুষ হিসাবে তার কর্তব্য, এটাই তার এবাদত। এই এবাদতের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের প্রতি ভালোবাসাই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা। সন্তানকে কষ্ট দিয়ে কি কখনো তার বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়া যায়? ঠিক একইভাবে আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে কষ্টে রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হলো- নামাজ, রোজা, পূজা, প্রার্থনা ইত্যাদি যে ধর্মীয় উপাসনাগুলি ধর্ম মনে করে, এবাদত মনে করে করা হয় সেগুলির উদ্দেশ্য কী? একটি লৌহকে যেমন চুম্বকের ধর্ম প্রাপ্ত করার জন্য নিরন্তর চুম্বক দিয়ে ঘর্ষণ করতে হয়, পানিকে যেমন বিশুদ্ধ করার জন্য ফুটাতে হয় ঠিক তেমনই মানুষের আত্মায় সর্বদা মনুষ্য ধর্ম তথা অন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত রাখার জন্য নানা উপাসনা করতে হয়। মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্টই এমন যে, সে অসচেতনভাবেই নিজ স্বার্থচিন্তায় মগ্ন হয়ে অপরের কল্যাণের চিন্তা ভুলেই যায়। নামাজ, রোজা, পূজা, প্রার্থনার মাধ্যমে সে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করবে, স্রষ্টাকে স্মরণ করবে, তার কর্তব্য তথা এবাদতের কথা স্মরণ করবে, সে নিজ স্বার্থ ভুলে জগৎসংসারের কল্যাণ চিন্তা করবে। অর্থাৎ উপাসনাগুলি হলো ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। যতবেশি উপাসনা করবে তত বেশি ধর্ম প্রাপ্ত হবে। এই উপাসনাগুলি সকল খারাপ কাজ থেকে, অকল্যাণকর কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় নামাজ সকল প্রকার ফাহেশা তথা অকল্যাণকর কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত- ৪৫)। দিনরাত উপাসনায় মগ্ন থেকেও যদি কারো মধ্যে মনুষ্য ধর্ম জাগ্রহ না হয়, অকল্যাণকর কাজ থেকে সে বিরত না হয়, মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য নিজের জীবন-সম্পদ ব্যয় করার মনোবৃত্তি সৃষ্টি না হয় তবে সকল উপসনালয় ব্যর্থ।

Tuesday, October 20, 2015

সামাজিক অপরাধ দূরীকরণে প্রয়োজন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা

সামাজিক অপরাধ দূরীকরণে প্রয়োজন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা

 0
রাকীব আল হাসান:
সামাজিক অপরাধ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ধর্মব্যবসা ও অপরাজনীতির হীনচর্চা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল আমাদের দেশেই নয় সমগ্র বিশ্বেই সামাজিক অপরাধ, অন্যায়, অশান্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা খুললে যে নৃশংস হৃদয়বিদারী চিত্র চোখে ভেসে আসে, তা কোনো মানবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না। মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, অবিশ্বাস, কূটিলতা, স্বার্থপরায়ণতা ইত্যাদি যখন বৃদ্ধি পায়, এক কথায় মানুষের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন ঘটে তখন সে মনুষ্যত্ব হারায়। সমাজে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। মানুষের চারিত্রিক অবনতি ও অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পুলিশ পাহারা দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না, উপরন্তু যদি শান্তিরক্ষাকারীদের মধ্যেই দুর্নীতি প্রবিষ্ট হয় তখন শান্তি আসার শেষ পথটিও বন্ধ হয়ে যায়। তথাপি মানুষের শান্তির লক্ষ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, তাদেরকে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে আইন কঠোর থেকে কঠোরতর করা হচ্ছে। যে অপরাধের সাজা ছিল ১০ বছর, তা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যাবজ্জীবন, যে অপরাধের সাজা ছিল যাবজ্জীবন তা এখন মৃত্যুদণ্ড করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো দিনকে দিন মানুষের অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেই অপরাধ সংঘটন করছে। পুলিশ প্রহরায় রাস্তাঘাটে হয়তো অপরাধ সংঘটন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু বাড়ির মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, মেয়ে বাবা-মাকে হত্যা করছে, ভাই ভাইকে হত্যা করছে, পিতা-মাতা সন্তানকে হত্যা করছে, এই ভয়াবহ অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দোষারোপ করার কোনো যুক্তি নেই। সমস্ত পরিসংখ্যান বলছে, দিন দিন অপরাধ বাড়ছে, উদ্ভাবিত হচ্ছে অপরাধের নিত্য-নতুন কলাকৌশল। এ থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, শুধু শক্তি প্রয়োগ করে, দণ্ডবিধি দেখিয়ে মানুষকে অপরাধ থেকে ফিরিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মানুষ শুধু দেহসর্বস্ব প্রাণী নয়, তার একটা আত্মাও আছে। এই আত্মাই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই মানুষকে যদি আত্মিক শিক্ষা দেবার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করা হয়, তাদেরকে যদি নৈতিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তবে সে নিজেই আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে অপরাধ সংঘটন থেকে নিবৃত থাকবে। অপরাধ প্রবণতা থেকে মানুষেকে বিরত রাখার জন্য এটাই সর্বোত্তম পন্থা, পাশাপাশি অপরাধের জন্য কঠোর দণ্ডবিধিও থাকতে হবে।
আমাদের সমাজে যে ধর্ম প্রচলিত আছে তা একান্তই উপাসনাকেন্দ্রিক- সমাজকেন্দ্রিক নয়। এর নৈতিক শিক্ষাগুলি বহুবিধ কারণে মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারছে না। তাদের জন্য প্রয়োজন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা। মানুষকে শিক্ষা দিতে হবে প্রকৃত ধর্ম কী, প্রকৃত ইবাদত কী, মানুষের কাছে স্রষ্টার চাওয়া কী, কাজ ও কাজের পরিণতি (হাশর) কী, মানবজন্মের সার্থকতা কীসে, জান্নাতে বা স্বর্গে যাবে কারা ইত্যাদি। অতি সংক্ষেপে মূল কথাগুলো বলার চেষ্টা করছি:-
(১) ধর্ম কী? প্রকৃতপক্ষে ধর্ম হলো কোনো পদার্থ বা প্রাণীর প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। যেমন আগুনের ধর্ম পোড়ানো, পানির ধর্ম ভেজানো। ঠিক একইভাবে মানুষের ধর্ম হলো মানুষের অভ্যন্তরস্থ মানবীয় গুণাবলী। সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি, দয়া, মায়া, ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব, মানবতা, সৌহার্দ্য, বিবেক, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ইত্যাদি মানবীয় গুণাবলীই হলো মানুষের ধর্ম। যতক্ষণ একজন মানুষ অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হয়, অন্যের দুঃখে দুঃখী হয়, অন্যের আনন্দে আনন্দিত হয়, অপরকে সহযোগিতা করে, আর্তপীড়িতের পাশে দাঁড়ায় ততক্ষণ সে ব্যক্তি ধার্মিক হিসেবে পরিগণিত হবার যোগ্য, কেননা তার ভিতরে মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্যগুলি আছে। পক্ষান্তরে কেউ যদি নামায, রোযা, হজ, পূজা, অর্চনা, উপাসনা ইত্যাদি নিয়ে দিনরাত ব্যাপৃত থাকে কিন্তু তার ভিতরে মানবতার গুণাবলী না থাকে সে প্রকৃত ধার্মিক নয়, আল্লাহর প্রকৃত উপাসক নয়।
(২) প্রকৃত ইবাদত ও মানবজীবনের সার্থকতা: মানবজাতির শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য কাজ করাই মানুষের প্রকৃত ইবাদত। যখন কারো বাড়িতে আগুন লাগে তখন যারা সেই আগুন নেভাতে না গিয়ে মসজিদে নামাজ পড়ে তারা আসলে আল্লাহর ইবাদত করছে না। আমাদের এ কথা থেকে কেউ যেন মনে না করেন যে, আমরা নামাজ পড়াকে ছোট করে দেখছি। হ্যাঁ, মানুষ অবশ্যই নামাজ পড়বে, কারণ নামাজ তাকে মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ ও সংগ্রাম করার যে চরিত্র দরকার তা সৃষ্টি করবে। মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যে কেবল উদরপূর্তি, সংসারবৃদ্ধি ও দেহত্যাগ করা নয়, ওটা পশুর জীবন। মানুষ আল্লাহর রূহ ধারণকারী, আল্লাহর নিজ হাতে সৃষ্ট আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছেন যে, মানুষ যদি তার সমগ্র জীবনকালে স্বার্থকে কোরবানি দিয়ে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে তবেই তার মানবজনম সার্থক হবে। মানুষ যদি এই প্রত্যয় করে যে, সে বাঁচবে মানবতার কল্যাণে, মরবে মানবতার কল্যাণে, জ্ঞান লাভ করবে মানুষকে দেওয়া জন্য, জগতের উন্নতির জন্য, দুটো পয়সা রোজগারের জন্য নয় তবেই এই পৃথিবীতে তার আসার উদ্দেশ্য সার্থক হল।
(৩) হাশর: মানুষের জীবন কর্মফলের চক্রে বাঁধা। মানুষ যে কাজই করে তার ফল অবশ্যই তাকে ভোগ করতে হবে। এখানে যদি সে খারাপ কাজ, মন্দ কাজ, মানুষের জন্য অকল্যাণকর কাজ করে তবে পৃথিবীতেই তাকে তার কুফল ভোগ করতে হবে, হাশরের দিনও তার কষ্টদায়ক ফল ভোগ করতেই হবে। মানুষের পরিণতি বা হাশরের উপমা আল্লাহ, ঈশ্বর প্রকৃতিতে ছড়িয়ে রেখেছেন যেমন- বীজ থেকে অঙ্কুরিত হয় গাছ এবং আর গাছ থেকে হয় ফল। ফলই হচ্ছে সেই বীজের হাশর। এখন সেই বীজ যত ছোটই হোক বা যত বড়ই হোক, তিল, সরিষা, গম, সিম, সুপারি বা নারকেল যা-ই হোক না কেন। মানুষের কর্মও এমন বীজের মতই- তার একটি ফল আছেই। এটাই তার হাশর।
মানুষের আত্মিক এবং মানসিক পরিশুদ্ধির এই প্রশিক্ষণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাগুলির মধ্যেও নেই, ধর্মগুলির মধ্যেও অনুপস্থিত, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কৃতি সবই তো সম্পূর্ণ বস্তুবাদী ও ভোগবাদী। এ বিষয়গুলো যদি মানুষকে শিক্ষা দেয়া যায়, তাহলেই মানুষের মানসিক অবস্থার শুভ পরিবর্তন হবে এবং সামাজিক অপরাধ অনেকাংশেই বন্ধ হবে।