Tuesday, November 10, 2015

সংকটে বাংলাদেশ: আমরা নির্বিকার থাকতে পারি না


সংকটে বাংলাদেশ: আমরা নির্বিকার থাকতে পারি না

 0


 -রিয়াদুল হাসান
আমাদের দেশের হাজারো সমস্যা, গুনে শেষ করা যাবে না। জীবনের প্রতিটি অঙ্গন ভয়াবহ রকমের অব্যবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে। নিত্যব্যবহার্য পণ্য, খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক, প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষা-চিকিৎসা সবকিছুর বাণিজ্যকরণ, সীমাহীন দুর্নীতি, ঘুষ, অবিচার ইত্যাদি মানুষের জীবনকে নিদারুণ অসহায় করে তুলেছে। প্রতিটি মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে, সবাইকে তাড়া করে ফিরছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভাবনা। টাকাই যেন সব, টাকা ছাড়া কোনো মানুষের মূল্য নেই। পশ্চিমা বস্তুবাদী জীবনধারা ধীরে ধীরে মানবজাতির মনুষ্যত্বকে গ্রাস করে নিয়ে তাদেরকে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক আর অর্থপিশাচ বানিয়ে ফেলেছে।
রোগ বহুরকম আছে কিন্তু প্রাণঘাতী রোগ হলে মানুষ যেমন ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসার জন্য সবকিছু বাজি রাখে, তেমনি আমাদের এই ১৬ কোটি মানুষ যারা হাজারো সমস্যায় আক্রান্ত, তাদেরকে এখন বুঝতে হবে যে এই ব্যাধিগুলোর মধ্যে কোন ব্যাধিটি অবশ্যই তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা নিছক সম্ভাবনার কথা বলছি না, বলছি দাঁড়াবেই। সেগুলো হচ্ছে (১) বৈদেশিক ষড়যন্ত্র (২) ধর্মীয় উগ্রপন্থা (৩) রাজনীতির নামে শত্র“তা (৪) তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কথায় বলে বিপদ একা আসে না। এই সমস্যাগুলোও একে অপরের হাত ধরাধরি করে আছে। ডাক্তার যদি সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করতে পারে তাহলে রোগীর যেমন দফারফা হয়, তেমনি আমাদের অস্তিত্বের সংকট কোনটি তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ মঙ্গল গ্রহে অবস্থিত নয়, পৃথিবীতে অবস্থিত। আর বর্তমানে গোটা পৃথিবী একটি গ্রামের মতো। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে যে সময় লাগতো, এখন সেই সময়ে পৃথিবীর অপর প্রান্তে চলে যাওয়া যায়। একটি সংবাদ সেকেন্ডের মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বহির্বিশ্ব কথাটি এই বিশ্বায়নের যুগে অবান্তর হয়ে গেছে। তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যা ফেরানোর কোনো পথ এখনো পাওয়া যায় নি, সেই যুদ্ধ শুরু হলে আমরাও তা থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখতে পারব না। জাতিসংঘ শান্তি মিশন ইত্যাদিতে আমাদের সেনাবাহিনী নাম কুড়িয়েছে। এ থেকে আমরা সুনাম, সম্মান বা অর্থ লাভ করলেও আমরা যখন বিপদে পড়ব তখন ঔ পশ্চিমারা এই গরিব দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় কতটুকু সক্রিয় হবে সে বিষয়ে সন্দেহের কারণ আছে, বিগত ৫০ বছরে তাদের কূটনীতি-রাজনীতি ও সামরিক কর্মকাণ্ড মুসলিম নামধারী জাতিকে কী দিয়েচে তা বিবেচনা করলেই সন্দেহের কারণ বুঝতে কষ্ট হবে না। আসন্ন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা বা রাশিয়া কোনো একপক্ষে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশকে জড়াতেই হবে। বিশেষ করে জীবন দেওয়ার জন্য দাসদেরকেই তারা অগ্রাধিকার দেয়।
নদীর তট থাকে কিন্তু বন্যার কোনো তট থাকে না। বিশ্বযুদ্ধ এমনই এক বন্যা যা কাউকে তটে দাঁড়িয়ে ঢেউ গোনার সুযোগ দেবে না। সবাইকে ডুবিয়ে ছাড়বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নব্বই পর্যন্ত যে শীতল যুদ্ধ চলেছে ক্রেমলিনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের তা বাস্তবযুদ্ধে পরিণত হতে পারে নি উভয়পক্ষের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকার দরুন। আমি গুলি করলে আমাকেও সে গুলি করবে- এই চিন্তা থেকেই দুই অস্ত্রধারী রাষ্ট্র একে অপরের দিকে অস্ত্র তুলে যুগের পর যুগ কাটিয়ে দিয়েছে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানের পর মনে হয়েছিল যে, বাঁচা গেল। কিন্তু এভাবে বাঁচা যায় না। গত তিন যুগে আমেরিকা একদিনও যুদ্ধ ছাড়া থাকে নি। যুদ্ধই তাদের পররাষ্ট্রনীতি, অস্ত্রব্যবসাই তাদের মূল ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের বাজেটের অধিকাংশ অর্থ বরাদ্দ সামরিক খাতে। এদিকে রাশিয়া কোনো যুদ্ধ করে নি, তারা শক্তি ও মনোবল সঞ্চয় করেছে। অযাচিত মোড়লিপনা, স্বৈরাচারিতা, আধিপত্যবাদ, জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানো এবং তাদের নিয়ে ন্যাজে খেলা ইত্যাদি কারণে আমেরিকার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। তাই আবার অস্ত্র তুলে নিয়েছে রাশিয়া, বিশ্বে ভারসাম্য ফেরানোর স্বপ্ন দেখছে পতিত কম্যুনিস্ট বেল্ট। আমেরিকাও এখন ন্যাটোর শক্তিতে বলিয়ান। কেউ বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী ছাড় দেবে না। একগুঁয়ে হঠকারি বাশার আল আসাদ আর ধর্মোন্মাদ আই.এস ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী এই যুদ্ধের ইন্ধনমাত্র। যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে আরববিশ্ব-মধ্যপ্রাচ্য আর বলির পাঠা বা পাটার মরিচ হচ্ছে নিরীহ বেসামরিক জনগণ। সেখান থেকে বিস্তার লাভ করবে অন্যান্য দেশগুলোতে। লক্ষ্যভেদী মিসাইলের যুগ, বোমা ফেলতে কাউকে বিমানও পাঠাতে হবে না। বাংলাদেশ যে পক্ষেই সমর্থন দিক অপরপক্ষের মিসাইলের টার্গেটে পরিণত হবে। আমাদের এই ছোট একটি দেশ ধ্বংস করতে কয়টা মিসাইল লাগবে সেটা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন।
যদি পরিস্থিতির বড় কোনো ‘পরিবর্তন’ সাধন না করা যায় তাহলে বাংলাদেশেরও পরিণতি সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশের মতো হবে এক কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ:
(১) আমাদের দেশে ১৫ কোটি মুসলিম নামধারী জনগোষ্ঠী বাস করে। আফগানযুদ্ধ ফেরত জঙ্গিরা নব্বইয়ের দশকে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জঙ্গি দল গড়ে তোলে। আমাদের দেশেও ইসলামের নামে এই মারাত্মক পথভ্রষ্টতা ছড়িয়ে পড়ে। তারা কোর’আন হাদিস থেকে জেহাদ ও কেতালের আয়াত, রসুলাল্লাহর যুদ্ধপূর্ণ জীবনের নানা ঘটনার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে এই উপসংহারে উপনীত হয়েছে যে, এখনই জেহাদের সময়। তাদের ওয়াজে হাজার হাজার মানুষ গোপনে জঙ্গি দলগুলোর সদস্য হয়েছে। গত দেড়যুগে এই সব দলের অগণিত সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। এটা ঠিক যে অনেকে প্রপাগান্ডারও স্বীকার হয়েছে। আমাদের দেশে জঙ্গি হামলায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। আদালতে, ভিন্নধর্মের উপাসনালয়ে, সিনেমা হলে, উদিচির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, রমনা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, পল্টনে গ্রেনেড হামলা ইত্যাদি বহু ঘটনা আমাদের দেশে ঘটেছে যার জন্য এই ধর্মান্ধগোষ্ঠীকেই দায়ী করা হয়। এরা সশস্ত্র পন্থায় প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে তাদের দৃষ্টিতে ‘ইসলাম’ কায়েম করতে চায়, যদিও তারা যেটাকে ইসলাম মনে করছে সেটা ইসলাম নয়, ইসলামের নামে একটি ভয়ংকর বিকৃতি মাত্র। এই বিকৃতিকে সরকার অপনোদন করতে পারে নি, শুধু জোর করে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কোনোদিন জোর কোরে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, কোনোদিন সম্ভব হয় নি এবং হবেও না।
(২) আমাদের দেশে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করা ধর্মজীবীরা ধর্মের প্রকৃত রূপ না জানলেও তারাই ধর্মের ধ্বজাধারী। মানুষ তাদের কথায় প্রভাবিত হয়। এই ধর্মব্যবসায়ীরা মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট বা অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলে তাদেরকে দিয়ে বহু ধ্বংসাত্মক কাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা ব্লগ, কার্টুন, চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে কৃত ধর্ম অবমাননার ইস্যুতে সারা দেশে আন্দোলন করেছে, হরতাল-অবরোধ করেছে, গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও করেছে, এমন কি সরকারের পতন ঘটানোর প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে লক্ষ লক্ষ ‘তওহীদি জনতা’-র সমাবেশ ঘটিয়েছে। প্রতিবারই সরকার তার ক্ষমতা খাটিয়ে জোরপূর্বক তাদেরকে দমন করেছে, বহুলোক নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। তাদের ভেতরে ক্ষোভ দিনে দিনে পুঞ্জিভূত হচ্ছে। ভূ-অভ্যন্তরস্থ গ্যাসের চাপ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তা জ্বালামুখ নিজেই তৈরি করে নেয় এবং অগ্নুৎপাৎ ঘটায়। কেউ তা দাবিয়ে রাখতে পারে না।
(৩) আমাদের দেশে ইসলামের নামে স্বার্থের রাজনীতির পতন হয়ে গেছে। এদের নেতৃবৃন্দ অনেকেই কারাগারে। বাইরে যারা আছে তাদেরকে মামলার ভারে জর্জরিত করে ফেলা হয়েছে। ফলে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় চেতনার অপব্যবহার করে তারা স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল কিন্তু সেটাও ধর্মীয় চেতনাই। মেরে কেটে এই চেতনা মানুষের হৃদয় থেকে নির্মূল করা যায় না। বিশ্বে যতগুলো রাজনীতিক দল ইসলামের নামে গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি করেছে তাদেরকে দমন-পীড়ন করা হলে তারা জঙ্গি দলে যোগ দিয়েছে। ইখওয়ান যোগ দিয়েছে বোকো হারামে। আমাদের দেশেও একই যাত্রায় পৃথক ফল হবে না। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা জেহাদের চেতনা লালন করে, মুসলিম জাতির পুনর্জাগরণ আশা করে তারা আইএস-কে তাদের আশা ভরসার স্থল মনে করছে। কারণ আইএস পশ্চিমাদের মদদে এখন বড় একটি শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন যুদ্ধের পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাস কাজ করে তখন তা একজন যোদ্ধাকে অসীম শক্তির আধারে পরিণত করে। সে বিশ্বাস করে যে আমি এই যুদ্ধে যদি নিহত হই তাহলেই চূড়ান্ত সাফল্য পাব। এখানে মৃত্যুর মাধ্যমে সে কিছুই হারায় না বরং তার সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বস্তু আল্লাহর সান্নিধ্য হাসিল করে। এমন যোদ্ধাকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার চেতনা আরো বহু যোদ্ধার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এটা তাদের কাছে চাকরি না, এটা তাদের কাছে ধর্মযুদ্ধ। কিন্তু তাদের এই চেতনা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও ইসলামেরই বিরুদ্ধে। এতে লাভবান হচ্ছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা। তারা মুসলিমদের একটি দলকে আরেকটি দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করে দিয়ে সেখানে অস্ত্র বিক্রি করছে। মারছে মুসলিম মরছে মুসলিম উদ্বাস্তু হচ্ছে মুসলিম। তথাপি অবদমিত ইসলামিক চেতনাবাজ দলের কর্মীরা আইএসের বিজয়ে উদ্বেলিত হয়। এভাবে জঙ্গিবাদের আমদানি-রপ্তানি হয়। উদ্বেলিত হয় জঙ্গিদলগুলো, মাদ্রাসাশিক্ষিত বিরাট জনগোষ্ঠী এবং সেই সাথে লক্ষ-কোটি ধর্মবিশ্বাসী মানুষও। নজরুল লিখেছিলেন:
এই যৌবন জল-তরঙ্গ রোধিবি কী দিয়া বালির বাধ?
কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ?
এদিকে পশ্চিমা জড়বাদী ধর্মহীন আত্মাহীন ভোগবাদী সভ্যতার নামে প্রচলিত অসভ্যতা, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, একচক্ষু মিডিয়ার অবিশ্রান্ত প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম জাতির মধ্যে বিরাট একটি অংশ ধর্মবিদ্বেষী হয়ে গেছে। তারা প্রচলিত ধর্মের কূপমণ্ডূকতা, ধর্মব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক আচার-বিচার, ফতোয়াবাজি, অন্ধত্ব দেখে ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কেননা ধর্মের প্রকৃত রূপটি তাদের সামনে তুলে ধরা হয় না, কারণ প্রকৃত ধর্ম তো ১৩০০ বছর আগেই হারিয়ে গেছে। বর্তমানের প্রচলিত বিকৃত ধর্মগুলো আলোর বদলে এখন কালিই ছড়াচ্ছে। এই ধর্মবিদ্বেষী শ্রেণিটি প্রায়ই উস্কানিমূলক কথা বার্তা বলে ধর্মান্ধদের হাতে সহিংসতা ঘটানোর ইস্যু তুলে দেয়। ধর্মের অন্ধ বিদ্বেষ যেমন অকল্যাণকর, ধর্মের নামে অন্ধত্বও অনুরূপ জাতিবিনাশী- এ সত্যটি উভয় পক্ষকেই বোঝাতে হবে।
১৫ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসকে ভুল খাতে প্রবাহিত করার সম্ভাব্যতা যদি নির্মূল না করা যায় তাহলে অবশ্যই এখানেও ধর্মব্যবসায়ীরা রণক্ষেত্র তৈরি করে ছাড়বে। তারা না করলেও বৈদেশিক ষড়যন্ত্র বসে থাকবে না। একদিকে চলছে ব্লগার হত্যা, অপরদিকে বিদেশি নাগরিক হত্যা, গির্জার ফাদারকে হত্যা। আবার চলছে মন্দিরে সাম্প্রদায়িক হামলা, শিয়াদের হোসেনি দালানে বোমা হামলা। এসবের মাধ্যমে দেশকে একটি জঙ্গি-সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী রাষ্ট্ররূপে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাগী আসামি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সব দেশ আমাদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দিচ্ছে, সতর্কতা জারি করছে যা বাণিজ্যিক অবরোধেরই নামান্তর। এসবের উদ্দেশ্য বোঝা খুবই সহজ।
এদেশের দুটি প্রধান রাজনীতিক দল। সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনে সফল না হয়ে প্রভুরাষ্ট্র ব্রিটেনে আছেন। দেশে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কিংবা সৃষ্টির পরিকল্পনা কিংবা সম্ভাবনা থাকলে রাজনীতিক নেতানেত্রীরা বিদেশে গিয়ে সপরিবারে আশ্রয় নেন যেন দেশ ধ্বংস হয়ে গেলেও নিজে সুখে থাকতে পারেন। এই স্বার্থের রাজনীতিক ১৬ কোটি মানুষকে শত ভাগে বিভক্ত করে এককে অপরের শত্র“ বানিয়ে রেখেছে। জাতির যে কোনো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এক নম্বর শর্ত হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। আমরা জাতীয় ঐক্যের স্বাদ পেয়েছিলাম শেষ ১৯৭১ সনে। তারপর থেকে কেবল অনৈক্যের গরলই পান করে চলেছি। বছরের পর বছর নেতাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ, সংসদ ভবনে পারলে তারা মারামারি করেন, যদিও কয়েক বছর সংসদই কার্যত না থাকায় এই লজ্জাজনক দৃশ্য আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে না। ক্ষমতার লড়াই এমনই পাশবিক যে আমাদের নেতা-নেত্রীরা প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে একে নিজেদের ব্যক্তিগত শত্র“তায় পরিণত করেছেন। তাদের পারস্পরিক হানাহানিতে জনগণের প্রাণ ওষ্ঠাগত। তবু তারা হাস্যকরভাবে গণতন্ত্রমনা, অভ্যাসে ভোট দিয়ে যায়। না দিলেও অবশ্য এখন অসুবিধা হয় না, কেউ না কেউ জয়ী হয়ে যায়। রাজনীতিকরা এখন আর ভোটারের উপর নির্ভর করে না, ভাড়াটে সন্ত্রাসীর উপর নির্ভর করে।
রাজনীতিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মীরজাফরের মতো বিদেশি শত্র“দের সঙ্গে হাত মেলায়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না যে মীরজাফর দুই দিন নবাব থাকলেও ইতিহাসে তার ঠাঁই হয়েছিল বেঈমানের তালিকায়। এভাবে তারা নিজেদের দেশকে বিপন্ন করে ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়।
ক্ষোভ ও বিকৃত জঙ্গি মতবাদ দ্বারা প্রণোদিত হয়ে এভাবেই ক্রমশ জঙ্গিমনস্ক হয়ে উঠছে বিরাট সংখ্যক তরুণ যাদের মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষিত আছে, সাধারণ শিক্ষিতও আছে। তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে থাকলেও যে কোনো ইস্যুতে এক হয়ে যেতে সময় লাগবে না। জনপ্রিয়তা না থাকায় সরকার এখন দুর্বল, তারা নিজেরাও অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত। কেউ যদি এই বাস্তবতাকে গায়ের জোরে অস্বীকার করতে চান, কিছু করার নেই। ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলার জন্য সমুদ্র জয়, পদকপ্রাপ্তি ইত্যাদি সফলতার প্রদর্শনী যতই করা হোক, জনগণের কাছে এসবের তেমন কোনো মূল্য নেই। এগুলো বড় কোনো সংকট থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না। সামান্য নো ভ্যাট আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা যারা কোনোকালে রাজনীতি করে নি, তারা রাজধানী অচল করে দিয়ে সরকারকে বাধ্য করেছে তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে। একজন শিক্ষার্থীর গায়ে যদি পুলিশ হাত তুলতো কেউ আর সেই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। এখন এভাবে যে কেউ চাইলে দেশ অচল করে দিতে পারে, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেও সরকারবিরোধী শক্তি দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে। বেতন ভাতা দ্বিগুণ করে কোনোমতে সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে তাদেরকে। দুর্নীতি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকাংশেরই নৈতিকতা শেষ হয়ে গেছে, এটা তাদের কাছে কোনো অন্যায়ই নয়। এই প্রতিটি দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে দেশটি বর্তমানে কতটা ঠুনকো অবস্থায় আছে। বলা হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু নানা কারণে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কে অনেক অবনতি হয়েছে আমাদের, বাংলাদেশ রাশিয়াপন্থী হয়ে পড়েছে। এই মেরুবদলও দেশের জন্য অন্যতম হুমকি।
এগুলোই হচ্ছে সেই রোগ যা এদেশটিকে সিরিয়া-ইরাক বানিয়ে ফেলতে পারে যে কোনো সময়ে। তাই এখনো সময় আছে, এখনো যদি আমরা পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি, তাহলে এ রোগের নিরাময় হতে পারে। সেই নিরাময় হচ্ছে, দল-মত নির্বিশেষে ষোল কোটি মানুষকে দেশের স্বার্থে, অস্তিত্বের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এই ঐক্য হতে হবে অনৈক্যের বিরুদ্ধে। কী কী উপাদান দেশের বিপর্যয় ডেকে আনে তা পূর্বেই বলেছি- ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ, অপরাজনীতি, বৈদেশিক ষড়যন্ত্র।
আমরা যদি এই অপশক্তিগুলো বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই তাহলে আমরা শক্তিশালী একটি জাতিসত্ত্বায় পরিণত হবো। যদি কেউ ভাবে যে, ধর্মীয় চেতনাকে অস্বীকার করে দেশপ্রেমের বিভিন্ন চেতনায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করব তাহলে সেটা আর সম্ভব হবে না। কারণ দেশপ্রেম আর চেতনার নামে যে অনাচার আর হুজুগে বাণিজ্য হয়েছে এদেশের মানুষের কাছে ঐসব চেতনা তার গ্রহণযোগ্যতা আর আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইস্যু হচ্ছে ধর্ম। তাই ধর্মীয় চেতনাকে বিশুদ্ধ করে তা ধর্মব্যবসায়ীদের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। আমরা একটি দরিদ্র জাতি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে কোনো পরাশক্তির সামনে অস্ত্রধারণ করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। এখন একটাই বড় অস্ত্র আমাদের হতে পারে, তাহলো এই জাতিকে সীসার তৈরি প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ করে ফেলতে হবে। তারা প্রত্যেকে একেকজন সত্যের সৈনিকে পরিণত হবে। তারা ধর্মের অপব্যবহার দেখলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে। কেউ জাতিবিনাশী কোনো কাজ করতে গেলে জনগণই তাকে প্রতিহত করবে। এই যে জাতির জন্য কাজ করা এটাই যে প্রকৃত এবাদত, এই কাজ যারা করবে তারাই যে ধার্মিক এটা জাতির সামনে দলিল-প্রমাণ-যুক্তি ইত্যাদি দিয়ে তুলে ধরতে হবে। তাহলে তারা আর ধর্মব্যবসায়ীদের অন্ধ অনুসরণকে ধর্মজ্ঞান করবে না, ধর্মকে অনাবিলরূপে নতুন আলোয় জানবে। তারা এখনের মতো আত্মচিন্তায় গণ্ডিবদ্ধ থাকবে না। ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক খাতে নিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো চেতনাই এ জাতিকে রক্ষা করতে পারবে না– এ সত্যটি জাতির কর্ণধারেরা যত দ্রুত বুঝবেন ততই জাতি পরিত্রাণের দিকে অগ্রসর হবে। এটা করার জন্য যে আদর্শ দরকার তা আল্লাহর রহমে হেযবুত তওহীদকে আল্লাহ দান করেছেন। ধর্মবিশ্বাস আমাদের এত বৃহৎ একটি সম্পদ যা ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে মানুষের অকল্যাণে আর তাদের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। একে এখনই রোধ করতে হবে। পক্ষান্তরে যারা ধর্মপ্রাণ নয় কিন্তু মানবতার কল্যাণকামী তাদেরকেও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে, দেশের জন্য, নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ঐক্যবদ্ধ হবে।
এভাবে ষোল কোটি মানুষ যদি উল্লিখিত অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় তাহলে পৃথিবীর পরিস্থিতি যতই ঘোলাটে হোক, এদেশটিকে কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে পারবে না। আমরা এই ষোলো কোটি মানুষ বিশ্বের বুকে একমাত্র শান্তিময় দেশরূপে বিরাজ করব। সৃষ্টি করতে পারব সত্যিকার কল্যাণ রাষ্ট্রের উদাহরণ।

অশুভ শক্তির কবল থেকে মানুষকে উদ্ধার করাই আমার ধর্ম“

অশুভ শক্তির কবল থেকে মানুষকে উদ্ধার করাই আমার ধর্ম“

 0
Untitled-117-300x188মোহাম্মদ আসাদ আলী
আমি শাস্ত্র জানি, শ্র“তি জানি, মন্ত্র জানি, কেতাব জানি, বিধান জানি- তাই আমি ধর্মজ্ঞানী আলেম-পুরোহিত; সকলে আমার কাছে ধর্ম শিক্ষা করে। টুপি পরেছি, আলখেল্লা পরেছি, গেরুয়া বসন পরেছি, তিলক-চন্দন লাগিয়েছি, বুকে ডেভিডের স্টার ঝুলিয়েছি, গলায় ক্রুস ঝুলিয়েছি- তাই আমি ধার্মিক; সমাজ আমাকে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে। মন্দিরে ঢুকেছি, মসজিদে ঢুকেছি, গীর্জায় ঢুকেছি, প্যাগোডায় ঢুকেছি, প্রার্থনা-জিকির করেছি, উপাসনা করেছি, ঠাকুরকে দুধ কলা দিয়েছি- তাই আমি ধর্মভীরু, স্রষ্টাভক্ত। আমার প্রার্থনারত নিশ্চঞ্চল বদনে নাকি সকলে স্বর্গের ছাপ দেখতে পায়। আমি মক্কায় গিয়েছি, মদীনায় গিয়েছি, গয়ায় গিয়েছি, কাশিতে গিয়েছি, রোমে গিয়েছি, বেথেলহামে গিয়েছি- তাই আমি নির্মোহ, প্রভুভক্ত, ধার্মিক, সত্যনিষ্ঠ, দুনিয়াত্যাগী, সন্ন্যাসী। আমাকে খুশি করে, সন্তুষ্ট করে অন্যরা পরকালীন মুক্তির পথ প্রশস্ত করতে ব্যস্ত। ধর্মভীরু মানুষ দলে দলে আমার শরণাপন্ন হয়, মস্তক নত করে সালাম-প্রণাম ঠুকে। মসজিদ-মন্দির-গীর্জা-মাদ্রাসা-মক্তবে আমি তাদেরকে সকাল সন্ধ্যা কেতাব, শাস্ত্র, শ্র“তি, এক কথায় ধর্ম শিক্ষা দেই। আমার সারাটা দিন কাটে ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান বা গডের উপাসনা-আরাধনায়। উপাসনালয় আমার কাছে স্বর্গসদৃশ। এই স্বর্গের বাইরে বেরিয়ে কোনোরকম দুনিয়াদারীতে জড়ানো আমার শোভা পায় না। দুনিয়ায় কতই না অশান্তি-অধর্ম! চারিদিকে শুধু নির্যাতন, বর্বরতা, গালাগালি, হত্যা, ধর্ষণ, বীভৎসতা, অন্যায়-অবিচার, যুদ্ধ-সংঘাত। এসবে জড়ালে ধর্মরক্ষা হয় না (!) আমি তো ধার্মিক। তাই চারদিকের অশান্তি-অধর্ম থেকে গা বাঁচিয়ে যত দূরে থাকা যায় ততই আমার মঙ্গল।”
এতদিন এই ছিল আমার ধর্ম, এই ছিল আমার বিশ্বাস। এতদিন আমি এরকমই একজন ধার্মিক ছিলাম। কিন্তু আজ আমি অন্য ধার্মিক। আজ আমি শিখেছি- মানুষের ধর্ম হচ্ছে তার মানবতা, মনুষ্যত্ব, পরোপকারিতা, অপরের দুঃখে দুঃখ অনুভব করা, অপরের সুখে আনন্দিত হওয়া, মানবতার কল্যাণে মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিজেকে নিয়োজিত করা। আমি বুঝেছি- যতক্ষণ আমি ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তা ভেদ করে মানবকল্যাণে অবদান রাখতে না পারছি, মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিতে না পারছি ততদিন নিজেকে ধার্মিক পরিচয় দেওয়ার অধিকার আমার নেই। ততদিন আমার ঐ নামাজ-রোজা, উপাসনা, ইবাদত, প্রার্থনা, বেশ-ভূষা ইত্যাদির কোনোই মূল্য নেই। কী লাভ হচ্ছে ঐ প্রার্থনায়? কী লাভ হচ্ছে ঐ ব্যক্তিগত ধর্ম-কর্মে? এত ইবাদত-উপাসনা কি মানুষকে শান্তি দিতে পেরেছে?
আমার মতো কোটি কোটি মানুষ নিয়মিত উপাসনালয়ে যাচ্ছে, প্রার্থনা করছে, উপাসনা করছে, পূজা-যজ্ঞ অনুষ্ঠান করছে। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও মানবতা মনুষ্যত্ব হারিয়ে আজ মানুষ জন্তু জানোয়ারে পরিণত হয়েছে। স্বার্থের প্রয়োজনে এরা করছে না এমন কোনো কাজ নেই। পাশবিকতায়, অমানবিকতায় এরা পশুকেও হার মানিয়েছে। আজ বাতাসে শুধুই নির্যাতিত, অত্যাচারিত, অতিষ্ঠ, বেদনায় ভারাক্রান্ত মানুষের করুণ আর্তি প্রকম্পিত হচ্ছে। এমন কোনো শব্দ, কোনো বাক্য, কোনো ভাষা নেই যার দ্বারা মানবজাতির এই বীভৎস, পাশবিক চিত্র বর্ণনা করা যায়। যেখানে দুই বছরের শিশুকন্যা ধর্ষিত হচ্ছে, দুধের শিশুকে মেরে মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে, ভাই ভাইকে, পিতা-পুত্রকে, পুত্র পিতাকে নির্মম-নৃশংসভাবে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীর গলায় ছুরি চালাচ্ছে, স্বামী স্ত্রীকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করছে, মা তার পেটের সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছে; অন্যায়ভাবে মিথ্যা-বানোয়াট গল্প-কাহিনী বানিয়ে একটার পর একটা দেশ, জনপদ, নগর-বন্দর বোমা মেরে ধ্বংস করে বিরানভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে, মাটি-পানি-বাতাস দূষিত হচ্ছে, যখন কোটি কোটি বনী আদম সন্তান বোমার আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, ক্ষুধার তাড়নায় আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষ জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে, কচুরিপাতার নিচে জন্মপরিচয়হীন নবজাতকের নি®প্রাণ দেহ পঁচে গন্ধ ছড়াচ্ছে, বস্তাবন্দী লাশ ডাস্টবিনে পড়ে থাকছে, তখন আমার নামাজ-রোজা-পূজা-উপাসনার কী মূল্য থাকতে পারে? বস্তুত এই অরাজক পরিস্থিতিই প্রমাণ করছে যে, আমার ধর্ম শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছে, এ ধর্ম প্রকৃত ধর্ম নয়, এটা মানবতাহীন লেবাসসর্বস্ব মেকি ধর্ম। এমতাবস্থায় আমার সর্বাপেক্ষা বড় ধর্ম হয়ে দাঁড়ায় এই বীভৎসতা থেকে সকলকে রক্ষা করা। এটা না করে আমি যতই উপাসনা-ইবাদত করি, পূজা-প্রার্থনা করি, হজ্বে বা তীর্থে গমন করি, উপবাস বা রোজা রেখে শরীর শুকিয়ে ফেলি- স্রষ্টার সন্তুষ্টি আসবে না। সবই বৃথা যাবে। স্রষ্টা আমার উপাসনা-ইবাদতের কাঙাল নন যে উপাসনা না করলে তাঁর অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। বরং তিনি অমুখাপেক্ষী। আমি পূজা-উপাসনা করি বা না করি তাতে তাঁর কিছুই যায় আসে না। পূজার বেদিতে অর্পিত প্রসাদ তিনি ভক্ষণ করেন না। যজ্ঞে দেওয়া আহুতি তাঁর কোনো কাজে লাগে না। তিনি তো আনুষ্ঠানিকতার নির্দেশ দিয়েছেন আমারই কল্যাণের জন্য, আমার মধ্যে ত্যাগ¯প্রীহা, পরোপকারিতা, সহিষ্ণুতা ও মানবতাবোধ জাগ্রত রাখার জন্য। কাজেই আজ যখন মানুষের মধ্য থেকে ঐ মানবতাবোধ হারিয়ে গেছে, মানবজাতির ঐক্য ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে, মানুষরূপী নরপশুরা হীন থেকে হীনতর কর্মকাণ্ড করে চলেছে, স্বার্থের কাছে বিবেক পরাজিত হয়েছে তখন আমার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, মানবকল্যাণে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করা। এখন উপাসনালয়ের চার দেওয়ালের অভ্যন্তরে নিজেকে বন্দী করে রাখার সময় নয়। এখন সময় সকল প্রকার অন্তর্মুখিতা, স্থবিরতা, ভীরুতাকে পরাজিত করে সামনে এগিয়ে চলার, সমাজ পরিবর্তনে স্বীয় অবদান রাখার, নব বিপ্লবের মন্ত্রে মানুষকে উজ্জীবিত করার। এই তো ধর্ম! আমার প্রকৃত ধর্ম!

ইব্রাহীম (আ.) ও উপনিষদের ঋষির শিক্ষা


ইব্রাহীম (আ.) ও উপনিষদের ঋষির শিক্ষা

 0


-রিয়াদুল হাসান
প্রতিটি কাজের মধ্যে দু’টি অংশ থাকে। একটি বাহ্যিক একটি আত্মিক। যেমন আপনি কাউকে খেতে দিলেন। এর মধ্যে আহার হচ্ছে বাহ্যিক আর আন্তরিকতা হচ্ছে আত্মিক। উভয়ের যে কোনো একটির অভাবে পুরো কাজটিই অর্থহীন হয়ে যাবে।
বৈষয়িক জীবন আর ধর্ম এভাবেই একে অপরকে অর্থপূর্ণ করে।
আমরা যাকাত দিতে দেখি, ত্রাণকার্য দেখি। আবার মানুষ মসজিদ-মন্দিরেও দান করে, ভিক্ষুককে দান করে। এগুলো সবই দান। যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে কিছুদিন আগে সাতাশ জন মানুষ পদপিষ্ঠ হয়ে মারা গেল। দান বা ত্যাগ মানুষের আত্মাকে শুদ্ধ করার জন্য করা হয়। কিন্তু এই দানের মধ্যে কি আত্মার সংযোগ ছিল?
সনাতন ধর্মের গ্রন্থ তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে শ্রিয়া দেয়ম্। মানে বাংলায় অপভ্রংশে ছিরি অর্থাৎ দান করার মধ্যে যেন ছিরি-ছাঁদ থাকে। ফেলিয়ে-ছড়িয়ে, ছুঁড়ে ফেলে নয়। সেই দানের মধ্যে যেন সৌন্দর্য আর মর্যাদা ফুটে ওঠে।
আরো বলছে, হ্রিয়া দেয়ম্। হ্রী মানে লজ্জা। দানের মধ্যে যেন লজ্জা থাকে। অর্থাৎ দিচ্ছি বলে যেন কোনো ঔদ্ধত্য তৈরি না হয়। নিজের অহমিকা ও আত্মসচেতনতা নিজেই লাঘব করে দান করতে হবে।
তৃতীয় কথা- শ্রদ্ধয়া দেয়ম্- শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবে। দান গ্রহণকারী ব্যক্তির প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা নিয়ে দিতে হবে। আর যদি অশ্রদ্ধা থাকে, তবে উপনিষদ পরিষ্কার নিষেধ করে দিয়েছে- অশ্রদ্ধয়া অদেয়ম্- অর্থাৎ শ্রদ্ধা না থাকলে দিও না, সেও অনেক ভালো। কিন্তু দিতে যদি হয়, তবে ঐ সৌন্দর্য, অহমিকাহীনতা এবং শ্রদ্ধা এই তিনটিই থাকা দরকার। আর এই সবগুলি মিলিয়েই হয় আন্তরিকতা যা দানের আত্মা।
দানকারীকে এটি মনে রাখতে হবে যে, তার দানকার্য থেকে সে নিজেই অধিক উপকৃত হচ্ছে, তার আত্মার পবিত্রতা ও সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। যে দান গ্রহণ করছে সে কিছু অর্থ-সম্পদ লাভ করলেও তার আত্মিক হানি ঘটছে।
বর্তমানে ত্যাগ করা হয় ভোগের জন্য, খ্যাতির জন্য। প্রকৃত ত্যাগ তো সেটাই যে করতে মানুষের আত্মায় ব্যাথা অনুভূত হবে। যেমন বৃদ্ধ বয়সের সন্তানকে জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ.) কোরবানি দিতে আদিষ্ট হয়েছিলেন এবং তা পূর্ণ করেছিলেন। এর মানে তিনি তাঁর মিল্লাত বা জাতির সবাইকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করে গেছেন। কারণ মানুষের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন ও সম্পদ কোরবান করা অনিবার্য।
সবাই যদি ব্যক্তিজীবন যাপন করে তাহলে কখনোই মানবজাতির সামষ্টিক জীবনে শান্তি আসবে না। যুদ্ধ রক্তপাত বন্ধ হবে না, সমাজ থেকে অন্যায় অপরাধ হ্রাস পাবে না, কেউ নিরাপত্তায় থাকবে না। তাই মো’মেনদেরকে ব্যক্তিজীবনকে প্রাধান্য না দিয়ে সমাজের প্রতিটি দুঃখী, আর্ত, নিপীড়িত মানুষের দুঃখকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে এবং অন্যায়ে বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই কাজে যদি তাকে জীবন দিতে হয় সেটাই হবে প্রকৃত কোরবানি।

চরমপন্থী মুসলিমদের ভুলগুলো

চরমপন্থী মুসলিমদের ভুলগুলো

রিয়াদুল হাসান
যারা আল্লাহর রসুলের বিরুদ্ধে, কোর’আনের বিরুদ্ধে কোনো অবমাননা দেখলেই বিক্ষুব্ধ হয়ে সহিংসতা শুরু করেন তাদেরকেই বলছি। লক্ষ করুন, দেশের সব মানুষ কিন্তু নাস্তিক হয়ে যায় নি, কিন্তু ধর্মবিদ্বেষী (মুখে ধর্মনিরপেক্ষ) পাশ্চাত্য সভ্যতা সারা পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, দর্শন দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নিজেদেরকে আধুনিকমনস্ক, প্রগতিশীল প্রমাণ করার জন্য আমাদের দেশেও একটি বড় সংখ্যার মানুষ আল্লাহ রসুলকে অবজ্ঞা করে গালি দিচ্ছে। তাদের এই সব ‘বেয়াদবিকে’ আপনারা সহ্য করতে না পেরে ক্ষেপে উঠছেন। তাদের ঘৃণার জবাব কেউ চাপাতি দিয়ে দিচ্ছেন, কেউ মিছিল, হরতাল, ভাঙচুর ইত্যাদি পন্থায় প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
আপনাদেরকে একটি বাস্তবতা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, বাঘ খাঁচায় বন্দী হলে তাকে খোঁচা দেওয়ার লোকের অভাব হয় না। বন্দী বাঘের তর্জন গর্জনই সার, সে যত ক্ষিপ্ত হয় তাকে নিয়ে ততই আমোদ প্রমোদ করা হয়। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে দু একটি মানুষের কল্লা ফেলে দিয়ে লাভ নেই, মুসলিম জাতিকে তার বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করার জন্য আল্লাহর দেওয়া পন্থায় অগ্রসর হতে হবে।
যারা বাস্তবতা স্বীকার না করে আবেগের দ্বারা সিদ্ধান্ত নেয় তারা তো অন্ধ। পুঁজিবাদী ভোগবাদী জীবনব্যবস্থা মানুষকে কোন স্তরে নামিয়ে দিয়েছে তা কি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না? পিতা আজ পুত্রকে হত্যা করছে, সন্তান বাবা-মাকে হত্যা করছে, ছাত্র শিক্ষককে জুতা মারছে, সেখানে হাজার হাজার বছর আগের নবী-রসুলদেরকে এই বস্তুবাদী সভ্যতার মানুষ সম্মান করবে তা কী করে আশা করেন। ফেসবুকে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি, শিল্পে, কাব্যে, গানে নোংরামিতে পূর্ণ। প্রতিটি নৈতিক মূল্যবোধকে অশ্রদ্ধা করা ফ্যাশন বলে মনে করা হচ্ছে। একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য দুটি চক্রান্ত চিরন্তন- একটি মাদক আরেকটি অশ্লীলতায় আসক্তি। এর আক্রমণে জাতির তারুণ্য নিস্তেজ হয়ে যায়, অন্যায়বিরোধী মনোভাব হারিয়ে জুবুথুবু হয়ে যায় অথবা কামনার পূজারি হয়ে যায়। আজ সেটাই করে দেওয়া হয়েছে।
অন্য ধর্মের নবী রসুল অবতার বা ধর্মগ্রন্থগুলিকে নিয়ে যারা ব্যঙ্গচিত্র আঁকে বা চলচ্চিত্র বানায়, এই কাজগুলো যারা করে তারা আসলে সুস্থ মানুষ না। তারা সমাজের শত্র“ মানবতার শত্র“। যে কারও বাবা-মাকে নিয়ে অশোভন উক্তি করলে মানুষ তাতে ক্ষুব্ধ হবে এটা যেমন যুক্তিযুক্ত তেমনি প্রাণাধিক প্রিয় নবীকে নিয়ে কটূক্তি করলেও যারা তাঁর অনুসারী তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে, এটাও যুক্তিযুক্ত। তবুও যারা এটা করে তারা মূলত একটি দাঙ্গাময় পরিস্থিতি সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যে কাজটি করে। পরে যখন কেউ সহিংসতা ঘটিয়ে ফেলে তখন পুরো মুসলিম জাতির উপর সন্ত্রাসের লেবেল এঁটে দেওয়া হয়। একটি ঘটনা যখন ঘটে তখন সেটা চলে যায় রাজনৈতিক ধান্ধাবাজদের নিয়ন্ত্রণে, তারা এর থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। আমাদের কথা হচ্ছে, ভিন্ন ধর্মের কোনো বিষয় নিয়ে কারো বক্তব্য থাকলে সেটাকে যৌক্তিক তথ্য উপাত্ত ইতিহাস দিয়ে তুলে ধরার সব পথ খোলা আছে। কিন্তু তা না করে এভাবে কটাক্ষ করা হয় শুধুমাত্র একটি ইস্যু সৃষ্টির জন্য। শার্লি হেবদো পত্রিকাটি ছিল পেছনের সারির একটি অখ্যাত সাপ্তাহিক, সেটার নাম এখন বিশ্বের সবাই জানে, ৬০ লক্ষ কপিও নাকি ছাপা হয়েছে। এটাই হলো ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার। আসুন, আমরা এসব কাজের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই, জনসাধারণের ঐক্যের চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই।
পক্ষান্তরে যারা রসুলাল্লাহকে অপমান করলেই ফুঁসে উঠে হামলা চালিয়ে বসেন তাদেরকে আমরা রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শ স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। রসুলাল্লাহর আড়ালে নয় একেবারে সামনে গালাগালি করা হয়েছে শত শতবার, তাঁর গায়ে থুথু ছেটানো হয়েছে, তাঁর পিঠে উটের নাড়ি-ভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁকে মুরতাদ, কাফের, পাগল, জাদুকর, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি বলে অপবাদ প্রচার করা হয়েছে। আল্লাহর রসুল কি পারতেন না তাঁর আসহাবদেরকে নির্দেশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে আবু জেহেল, আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে, বা তাদেরকে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে হত্যা করে ফেলতে? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর অত্যাচারিত, নির্যাতিত হয়েও যুক্তি দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে গেছেন যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারও হুকুমে শান্তি আসবে না। এক সময় সত্যিই তাঁর আহ্বান মানুষ মেনে নিল, একদিন যারা তাঁর বিরোধিতা করেছে তারাই নবীর ডান হাত বাঁ হাতে পরিণত হলো। জোর করে রাষ্ট্রশক্তি দখল করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, সেখানে শান্তি আসে না। বার বার বিদ্রোহ হয়। কিন্তু মন জয় করার মধ্যে কৃতিত্ব আছে। রসুলাল্লাহ সেটা করেছিলেন, এজন্য আজও তাঁর জন্য মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত, আর ঐ আবু জেহেলদের বংশ নির্বংশ হয়ে গেছে। এই সত্যটি এসব জঙ্গিবাদীদেরকে বুঝতে হবে যে তারা রসুলাল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে যা করছেন তাতে না ইসলামের কোনো উপকার হচ্ছে, না উম্মাহর কোনো উপকার হচ্ছে। উল্টো বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে দেশে দেশে মুসলমানরা নিজেদের বাসে ট্রেনে আগুন দিয়ে নিজেদের স¤পদই ধ্বংস করে ফেলছে, নিজের পায়ে কুড়াল মারা আর কাকে বলে? এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কী হতে পারে। সুতরাং এটা সঠিক পন্থা নয়। আগে তাদের নিজেদেরকে সত্যের পক্ষে, হকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। তারপর প্রতিপক্ষের এ মন্তব্যগুলিকে যুক্তি দিয়ে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিহত করা, মিথ্যা অভিযোগ খণ্ডন করা। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া যেহেতু প্রচলিত আইনেও বৈধ নয়, যারা এমন কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয়ও নেয়া যেতে পারে।
যতদিন আল্লাহর রসুল রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করেন নি, ততদিন তিনি কাউকে দণ্ডও দেন নি, কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা অভিযানও প্রেরণ করেন নি। কেননা দণ্ডদান, যুদ্ধ ইত্যাদি সার্বভৌম ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন তিনি মদীনার রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন, তখন রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা, জাতির ঐক্য-সংহতি রক্ষার জন্য যে কোনো পদক্ষেপ তিনি অবশ্যই গ্রহণ করতে পারেন।
এই মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ করে মুসলিম দেশে আগ্রাসন চালানোর প্রতিবাদে। কিন্তু তারা নিজেরাই যে নিজেদেরকে ধ্বংস করছে গত ১৩০০ বছর ধরে, এর সমাধান কে করবে? সিরিয়াতে কে কাকে মারছে, ইরাকে কে কাকে মারছে? সেখানে তো মুসলমান মুসলামনের বুকে গুলি চালাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে সিরিয়াতে মারা গেল আড়াই লক্ষ মুসলমান। এই শিয়া বনাম সুন্নি দাঙ্গায় ইরাকে, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে কত কোটি মানুষ মারা গেছে আজ পর্যন্ত তার ইয়ত্তা নেই। এই চরমপন্থী জঙ্গিবাদীদের প্রতি কথা হচ্ছে, আগে দয়া করে ১৬০ কোটি মুসলিম জাতির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করুন, শিয়া-সুন্নি, হানাফি-হাম্বলী নিয়ে হানাহানি বন্ধ করুন, সবাইকে নিয়ে একটি ই¯পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলুন, দেখবেন এসব কার্টুন আঁকা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এই জাতিটি ১৪০০ বছর আগে যখন একটি অখণ্ড জাতি ছিল তখন কি কেউ রসুলাল্লাহর বিরুদ্ধে কটূক্তি করার সাহস পেত? এটা হচ্ছে কবিগুরুর ভাষায়, নির্বিষ সর্পের ব্যর্থ ফণা আস্ফালন।
অনেকে অভিযোগ করেন, আমরা হেযবুত তওহীদ কেন কোনো প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করি না? করি না, কারণ আমাদের দৃষ্টিতে এগুলো অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন। ১০০ বছর আগেও রসুলাল্লাহর নামে বহু অপপ্রচার করা হয়েছে, তখনো অনেক বিক্ষোভ হয়েছে। এখনো হয়। এসব করে কি অপপ্রচার কমেছে? না। বরং আরো বেড়েছে। তাই এ পথে আরো হাজার বছর চেষ্টা চালিয়ে লাভ হবে না, উল্টো ক্ষতি হবে। আমরা মনে করি, সত্যটা তুলে ধরা, সত্যের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই আমাদের মুখ্য কর্তব্য। আর যারা ধর্মব্যবসা করেন তাদের তো রসুলাল্লাহর পবিত্র নামই মুখে আনা উচিত নয়। যে কাজ আল্লাহ হারাম করেছেন তারা সেটাকেই ধর্ম বানিয়ে নিয়েছেন। তারা যখন রসুলাল্লাহকে অবমাননা করার প্রতিবাদ করে সেটাকে বক ধার্মিকতা আর নিজেদের জাহির করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই আমরা মনে করি না।
এখন তাহলে মুসলিম জাতির করণীয় কী? সেটা হচ্ছে নিজেরা আগে সত্যকে বোঝা, ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য বোঝা, নিজেদেরকে সত্য মিথ্যার মানদণ্ড সম্পর্কে, ধর্ম-অধর্ম, ইসলাম-অইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নয়তো কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তা মাসলা-মাসায়েলের গোলকধাঁধায় গুলিয়ে ফেলব। ইসলাম আজ বহুরূপে আমাদের সামনে উপস্থিত, কিন্তু এক সত্যের বিবিধ রূপ হতে পারে না। পীর সাহেব যেটা বলবে সেটাও সত্য, দরবারী আলেম যেটা বলবে সেটাও সত্য, জঙ্গিবাদী আলেম সাহেব যেটা বলবে সেটাও সত্য, ভোটবাদী ইসলামিক দল যেটা বলবে সেটাও সত্য এটা হতে পারে না। সত্যের রূপ সব সময় একটিই হয়। সেই সত্যকে চিনতে হবে, তারপর সেই সত্যের উপর দণ্ডায়মান হতে হবে। সেই সত্য আল্লাহ হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। জ্ঞানের অহঙ্কারে মদমত্ত না হয়ে স্থির মস্তিষ্কে, সত্যসন্ধানের উদার হৃদয় নিয়ে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য জানুন।
মানবজাতি যখন এমন বড় কোনো সংকটে পতিত হয় যে তা থেকে সবাই মিলে শত চেষ্টা করেও আর উন্নীত হতে পারে না, তখন আল্লাহ স্বয়ং হস্তক্ষেপ করেন। ধর্মসমূহের বিকৃতি আর পাশ্চাত্যের বস্তুবাদ-ধর্মহীনতার শত শতবর্ষব্যাপী দ্বন্দ্বের পরিণামে মানবজাতি আজ এমনই সঙ্কটে পতিত হয়েছে যা বর্তমানে তাদেরকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে এসেছে।
আল্লহর শোকর যে এই চরম ক্রান্তিকালে বিশ্ব মানবতার মুক্তির জন্য তিনি স্বয়ং হস্তক্ষেপ করেছেন। হেযবুত তওহীদ হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীতে স্বয়ং আল্লাহর হস্তক্ষেপ, আল্লাহর প্রকাশ। আল্লাহর নবী রসুলদেরকেও মানুষ প্রথমে গ্রহণ করে নি, তবে এক সময় করেছে। সেই নবী-রসুলদের সঠিক আদর্শ প্রচারকারী হেযবুত তওহীদকেও মানুষ বহু বিরোধিতার পর ২০ বছর পরে এসে বুঝতে পারছে এবং গ্রহণ করে নিচ্ছে।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি।

ধর্মজাত ফেতনা-ফাসাদ থেকে মুক্তির উপায় কী?

ধর্মজাত ফেতনা-ফাসাদ থেকে মুক্তির উপায় কী?

 0


মোহাম্মদ আসাদ আলী

ইদানীং এই জাতির সমাজচিন্তক ও জ্ঞানী-গুণী মানুষের মধ্যে হতাশা ও আবেগের প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। একদল মানুষ হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে বাস্তব জীবন থেকে কার্যত ইস্তফাই নিয়ে নিয়েছেন, তাদের ধারণা- তাদের আর কিছু করার নেই। জাতির ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। নিয়তির খেলা উপভোগ করাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। ওদিকে অন্যদল ভেসেছেন আবেগের সাগরে। তারা বাস্তবতাকেই অপাংক্তেয় করে রাখতে চান। কেননা বাস্তবতাকে দাম দিতে গেলে পথ হারিয়ে ফেলতে হয়। উচিত-অনুচিত, সফলতা-ব্যর্থতা, সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার সুতা মাপতে মাপতেই দিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতাকে এড়িয়ে কতদূর যাওয়া সম্ভব? দেখা যায় স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড়াতে গিয়ে বারবার তারা খেই হারিয়ে ফেলেন। অবশেষে ব্যর্থতার স্রোত এসে তাদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ধর্মীয় ইস্যুতেও এ জাতির জ্ঞানী-গুণী, সুশীল শ্রেণির অবস্থান বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এখানেও রয়েছে দু’টি ভাগ। একভাগের বক্তব্য হলো- ধর্ম নিয়ে যত নাড়াচাড়া করা হবে ততই নাকি তার প্রচারণা বাড়বে, মানুষ আরও ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে যাবে। অর্থাৎ সেটা ধর্ম সম্বন্ধীয় অশান্তির আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় বোকামী হবে। তাই ধর্ম সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকাই শ্রেয়। অন্যদিকে আরেক ভাগের বক্তব্য হলো- ধর্মকে যে করেই হোক মানুষের মন থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে। কেননা ধর্মবিশ্বাস আছে বলেই ধর্মকেন্দ্রিক ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হচ্ছে, ধর্মবিশ্বাস না থাকলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এরাই হলো পূর্বে বর্ণিত ওই ভাগটি যারা বাস্তবতাকে স্বীকার করেন না। যুক্তিকে ব্যবহার করেন না পরাজিত হবার পূর্বেই পরাজিত হয়ে যাবার ভয়ে। এই উভয় ভাগের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য হলো-
১. ধর্মকে মিসইউজ করতে দেওয়ার পরিণতি হবে খুবই খারাপ। ধর্মব্যবসা, ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি ও জঙ্গিবাদের যে ভয়াল থাবা সমস্ত পৃথিবীকে তটস্থ করে রেখেছে তা আরও ভয়ংকররূপে বিকাশিত হবে। হাতে ধরে তেমন অশান্তির সাগরে মানবজাতিকে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
২. অন্যদিকে খোদ ধর্মকেই বিদায় করে দেওয়ার ব্যাপারটা বাস্তবতার সাথে একেবারেই যায় না। এটা সম্ভবই না। ধর্মবিশ্বাস ইচ্ছে করলেই নির্মূল করে ফেলা যায় না। গেলে অনেক আগেই সেটা করা হতো। প্রচেষ্টা তো কম হয় নি। ধর্মহীন জীবন-ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে বহু শতাব্দী আগে। কিন্তু এখনও মানবজাতির মধ্য থেকে ধর্মের আবেদন কমে নি, বলা যায় অপরিবর্তনীয় আছে। এমতাবস্থায় ধর্মকে বিদায় করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালালে তার পরিণতিও খুব সুখকর হবে না। আমাদের দেশে নাস্তিক-আস্তিক ইস্যুটি নিশ্চয়ই সকলের মাথায় আছে। বিভিন্ন পরিস্থিতির সাপেক্ষে বাংলাদেশের ধর্মবিদ্বেষী নাস্তিকরা কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তাকে অভিজ্ঞতার পাল্লায় স্থান দিয়েই বাস্তবতাকে পরিমাপ করা উচিত।
এমতাবস্থায় সমাধান মাত্র একটাই হতে পারে- মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক পথে ব্যবহার করা। ধর্মব্যবসায়ীদের পেছন থেকে মানুষকে সরানো এবং এতদিন তারা ঈমানের ভুল প্রয়োগের কারণে যেভাবে অশান্তি সৃষ্টি করত, ঈমানের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে তার ঠিক উল্টোটা অর্থাৎ ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করা। এ ছাড়া অন্য কোনো পথে সমাধানের প্রচেষ্টা নিশ্চিত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এমন তো নয় যে, ধর্মে মানবতার কল্যাণে কাজ করার কোনো বার্তা নেই। বস্তুত প্রত্যেক ধর্মেরই মূল বা মর্মবাণী হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। কিন্তু ধর্মব্যবসায়ীরা সেই মর্মবাণীকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছতে দেয় না। ধর্মকে যদি তার অনাবীল রূপে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়া যায় এবং ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপারে তাদেরকে সজাগ ও সচেতন করে তেলা যায় তাহলে ধর্মবিশ্বাসই এই জাতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন

প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন

 0

ওবাইদুল হক বাদল:
ব্রিটেনের বিচার মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পরিসংখ্যান বিভাগ কিছুদিন আগে এক ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর ইংল্যান্ডে ৮৫ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া আরও ৪ লাখ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, ২০১২/১৩ সালে ৩৫ ভাগ যৌন অপরাধ ঘটেছে শিশুদের বিরুদ্ধে, যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের ৯০ ভাগ নারীই পরিচিত লোকদের লালসার শিকার। শুধু খোদ ব্রিটেন নয় পশ্চিমা সভ্যতার ধারক-বাহক প্রায় দেশেই একই অবস্থা। আমেরিকার জাতীয় আইন বিভাগের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতি বছর ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৮৬৮ জন নারী ধর্ষিত হয়। উপরোক্ত পরিসংখ্যান যে কোন সুস্থ ও চিন্তাশীল মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আর মানবজাতির জন্য এ এক বিরাট লজ্জা। এই অবস্থার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্মার্ট ফোন ও ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। ৫৪ ভাগ কিশোর পর্নোগ্রাফিতে মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক প্রযুক্তি একদিকে যেমন জীবনকে সহজলভ্য করছে অন্যদিকে এর অপব্যবহার মানুষকে পশুবৎ আচরণ করতে বাধ্য করছে। কোন জিনিস ভালো কি মন্দ তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই জিনিসের ব্যবহারের ওপর। একটা অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি বা খুন করা যায়, সেই অস্ত্রই খুনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে অসহায়কে রক্ষা করা যায়। অস্ত্র নিজে দায়ী নয়, যে সেটাকে ব্যবহার করবে সে দায়ী। পাশ্চাত্য সভ্যতা বর্তমানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে অন্যায়ভাবে। রেডিও-টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মানুষকে ভালো অনেক কিছুই শিক্ষা দিতে পারত কিন্তু এগুলি বর্তমানে মানুষকে হত্যা, সহিংসতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপরাধ, নগ্ন যৌনতা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে তাকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে দিচ্ছে। এই যৌনতা, নগ্নতা, বেহায়পনা, শিশু নির্যাতন-এক কথায় সমস্ত রকম অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধের জন্য অনেক সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র‌্যালি, সমাবেশ, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টকশো প্রভৃতি করা হচ্ছে, বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, প্রচলিত আইন কঠোর থেকে কঠোরতর করা হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে দিন দিন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলোচকগণের সামনে ভয়ঙ্কর রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তারা প্রচলিত মূল্যবোধের বাইরে কোন কথা বলেন না। প্রচলিত মূল্যবোধে কখনও বর্তমানের এ সমস্ত অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধ হবে না। তার প্রমাণ পরিসংখ্যান। অথচ আমরা যদি একটু পিছন দিকে তাকাই, যে সময় স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ পৃথিবীতে কার্যকর ছিল তখন যুবতী নারী গায়ে স্বর্ণের অলঙ্কার আচ্ছাদিত করে শত শত মাইল নির্ভয়ে অতিক্রম করত। বর্তমানে যা কল্পনাও করা যায় না। কল্পনা করা যাক বা না যাক, স্বীকার করা হোক বা নো হোক- এর পরিণতি থেকে আমরা রেহাই পাচ্ছি না। বাইরে আমরা খুবই চাকচিক্য চেহারা আর সুখী সুখী ভাব দেখালেও অন্তরের দিক থেকে চূড়ান্ত দৈন্যতায় ভুগছি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর আত্মহত্যার তালিকার দিকে তাকালেই আমরা এই বাস্তবতা টের পাই। মানুষ সাধারণত পরিসংখ্যান দেখে চোখ ছানাবড়া করে ফেলে, কিন্তু পরিবেশের সাথে মিশে থাকায় উপলব্ধি করে কম। যার কারণে মানুষের ঐ শক্তিটুকু ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যায়। কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে এই সভ্যতার ভেতরটা এতই ফাঁপা হয়ে গেছে যে সামান্য বাতাসেই এটি যে কোন সময় ধূলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে নৈতিকতাহীনতার এই নারকীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে, সভ্যতাকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রচলিত মূল্যবোধ ত্যাগ করে মানুষের সামনে স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই।

ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার উত্তরাধিকার

ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার উত্তরাধিকার

 0

রিয়াদুল হাসান:
মানবজাতির ইতিহাসে ধর্মের অধ্যায়টি বিরাট। এ বিরাট অধ্যায়ের দিকে তাকানোর জন্য আমাদের সামনে এখন দুটো চশমা রয়েছে। একটি ধর্মহীন চশমা, আরেকটি ধর্মের চশমা। এ দুটো চশমায় আমাদের অতীত দুটি ভিন্ন প্রকৃতি নিয়ে ধরা পড়ে।
ধর্মহীন চশমা বলছে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এমনিতেই সৃষ্টি হয়েছে, এর কোনো স্রষ্টা নেই। সকল জীব ও জড়ও এমনি এমনিই সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণীকুলের মধ্যে কেউ উন্নত, কেউ অনুন্নত যা নির্ণীত হয়েছে তাদের অভিযোজনের ক্ষমতার তারতম্য দ্বারা। মানুষ (খুব সম্ভবত) একটি বানরজাতীয় বিবর্তিত প্রাণী, যার আদিপিতা-পিতৃব্যরা গাছে থাকত, তাদের লেজ ছিল। খুলির আকৃতির পার্থক্য অনুযায়ী তারা নিগ্রয়েড, ককেশয়েড, মঙ্গলয়েড, অস্ট্রালয়েড ইত্যাদি শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত।
আর ধর্মের চশমা বলছে, এই বিশ্বজগৎ নিজে থেকে সৃষ্টি হয় নি, এর একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি নিরন্তর এটি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিপালন করছেন। তিনি বিশ্বজগতে এমন কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম, ব্যবস্থা বা চক্র আরোপ করেছেন যার দ্বারা সকল বস্তু ও প্রাণির সৃষ্টি, পালন, বাস্তুসংস্থান, ধ্বংস ইত্যাদি সাধিত হয়। মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ ও ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি যার উদ্ভব জান্নাতে, যার আদিপিতা আদম (আ.), আদিমাতা হাওয়া (আ.)। তাদের থেকেই আজকের সকল হিন্দু, সকল বৌদ্ধ, সকল মুসলিম, সকল খ্রিষ্টান, আর সকলেই
একটি চশমা দিয়ে তাকালে দেখি নূহ (আ.), ইব্রাহীম (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.) ইত্যাদি বহু উজ্জ্বল নাম। অন্য চশমায় তাদেরকে দেখা যায় না, সেখানে আছে বস্তুবাদী দার্শনিক আর বিভিন্ন রাজবংশের নাম। একটি চশমা বলছে, মানব ইতিহাস নবী-রসুলদের মাধ্যমে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রামের ইতিহাস, ধর্মের দ্বারা মানবজাতির শান্তি পাওয়ার ইতিহাস। অন্য চশমাটি বলছে মানুষের অতীত অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল ধর্ম নামক কুসংস্কার ও বর্বরতা দ্বারা। বর্তমানে ধর্ম বিদায় নিয়েছে, মানুষ অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
বর্তমানে আমরা জাতি হিসাবে দ্বিধাগ্রস্ত, ধর্ম ও আধুনিকতা একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দণ্ডায়মান, দু নৌকায় পা দিয়ে আছি আমরা। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি উজ্জ্বল আকর্ষণ নিয়ে হাতছানি দিচ্ছে, ধর্ম ক্রমেই বিবর্ণ ও আকর্ষণহীন বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্তের কণিকায় মিশে আছে যা বাদ দেওয়া সহজ নয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টির যে প্রচেষ্টা বিগত শতাব্দীগুলোতে চালানো হয়েছে তা খুবই সফল হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এই দ্বিধা ও সন্দেহ সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। উপরে যে দুটো চশমার কথা বললাম, বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা, বিশেষ করে মুসলিম নামধারীরা এ দুটো চশমা দিয়েই নিজেদের ইতিহাসকে দেখতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তি থেকে জাতীয় জীবনের সর্বত্র।
এ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মকে রাখা হয়েছে নামে মাত্র। এস.এস.সি পর্যন্ত ধর্মের যেটুকু রাখা হয়েছে সেটুকুর উদ্দেশ্য নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান। কারণ এটা অস্বীকার করার মতো অবস্থা এখনও সৃষ্টি হয় নি যে, সকল ভদ্রতা, শিষ্টাচার, সত্যনিষ্ঠা ধর্মেরই অবদান। ধর্ম বইতে বলা হচ্ছে সমস্ত কিছুর মালিক স্রষ্টা, অথচ অন্য সকল বইয়ে ‘আল্লাহ’ শব্দটিও খুঁজে পাওয়া মুশকিল, এমনভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বতে অস্বীকার করা হয়েছে। আর ধর্মকে সবচেয়ে গুরুত্বহীন বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যে ধর্ম সেখানে শেখানো হচ্ছে সেটাও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই আলোচনা করে, সামষ্টিক জীবন কীভাবে চলবে তা শেখানোর জন্য আছে অন্যান্য বিষয়সমূহ। এটা হচ্ছে মানবজাতিকে ধর্মবিমুখ করে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া। কিন্তু পাশ্চাত্যে নানা কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা সফল হলেও প্রাচ্যে এটি কয়েক শতাব্দী পরও খাপ খাচ্ছে না। বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে একটু গভীরে যেতে হবে।
‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ দর্শনটি উনিশ শতকে যুক্তরাজ্য থেকে প্রথমত উদ্ভূত হয়েছে। ১৮৪৬ সালে জর্জ জ্যাকব হোলিওক (George Jacob Holyoake) নামক এক ব্যক্তি সেকুলারিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। Oxford Dictionary-তে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism)-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, Belief that religion should not be involved in the organization of society, education, etc. অর্থাৎ সমাজ কাঠামোতে ধর্মকে সম্পৃক্ত করা যাবে না এমন বিশ্বাস পোষণ করাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এ মতবাদের অনুসারী (Secular) স¤পর্কে বলা হয়েছে, Not connected with spiritual or religious matter. যিনি আধ্যাত্মিক বিষয় বা ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নন।
মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে যুক্তি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার নামে Enlightenment Movement-এর ফসল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এর উদ্ভব হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের মাধ্যমে এর অনুসারীরা মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন দর্শন আমদানি করলেন যে, রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই; ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অন্তরের ব্যাপার; অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা প্রভৃতি থেকে ধর্মকে দূরে রাখতে হবে। তাদের মূল বক্তব্য ছিল, যুক্তি (logic)-ই জীবন পরিচালনার ভিত্তি হবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহপ্রদত্ত নির্দেশনার (divine guidance) কোনো প্রয়োজন নেই। ইউরোপে এই আন্দোলনের সফলতার ফলে ধর্মহীন যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠল, তাতে মানুষ নিতান্তই স্বার্থপর হয়ে গেল, ভোগবাদী হয়ে পড়ল, পূর্বপুরুষ ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গেল। সর্বোপরি নীতিবোধের লোপ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ই এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে প্রকাশ পেল।
মূলত নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ ব্যতীত একটি কল্যাণকর মানবসমাজ কল্পনা করা যায় না। আর নৈতিক শিক্ষার মূল বিষয়টি ধর্মীয় শিক্ষা থেকে উৎসারিত। মানবসমাজে বিরাজিত সকল নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলো, অতিপ্রাকৃতিক শক্তি তথা সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস। এ বিশ্বাসই ব্যক্তিমানুষকে তাঁর আদেশ ও নিয়ম অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করে, পৃথিবীতে ও পরলোকে কু-কর্মের শাস্তি স¤পর্কে অবহিত করে এবং ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হতে উৎসাহ দেয়। স্রষ্টায় বিশ্বাসের কারণেই ব্যক্তি সবচেয়ে গোপন ও নিরাপদ জায়গাতেও শত প্রলোভন সত্ত্বেও অনৈতিক কোনো কাজে জড়িত হতে পারে না। কিন্তু এ বিশ্বাসের বীজ যার হৃদয়ে বপিত হয় নি তার কাছে নৈতিকতা অর্থহীন মনে হয়। ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত নৈতিক শিক্ষা ভঙ্গুর ও বিক্ষিপ্ত। এমন কি এগুলোর আদি উৎসও বিভিন্ন ধর্ম। ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে যে নৈতিক শিক্ষার কথা বলা হয় তাতে ব্যক্তি নিজের বিবেকের কাছে তার দায়বদ্ধতার কারণে নীতি মেনে চলে। ফলে ব্যক্তি যেকোনো দুর্বল মুহূর্তে প্রলোভনে পড়ে কিংবা মানবিক দুর্বলতার কারণে তার নৈতিক গণ্ডির বাইরে চলে যেতে পারে। সে তো পরকালীন শাস্তির ভয়ে নীতি মানছে না, তাই একবার ভাঙলে আবার তা গড়ে তোলার শক্তিশালী অনুপ্রেরণা পায় না। সে ভাবে যে, নশ্বর এই পৃথিবীতে ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে জীবন কেটে গেলেই হলো।
সুতরাং ধর্মকে কাজে লাগিয়েই সামষ্টিক মানুষের চারিত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করা সম্ভব, অন্যভাবে নয়। তাই শিশুকাল থেকেই এ চরিত্রগঠনের প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি যে, ব্যক্তির মানসিক গঠনের উপযুক্ত সময় তার শৈশব ও কৈশোর। এ সময় শিশুকে যেভাবে শিক্ষা দেয়া হবে তার গন্তব্যও সেদিকেই হবে। আমরা সবাই চাই, আমাদের শিশুরা জ্ঞানে-গুণে, যোগ্যতা-দক্ষতায় অনন্য হোক এবং তাদের সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কল্যাণকর কাজে ব্যবহৃত হোক। অথচ তাদেরকে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সকল নৈতিকতার উৎস ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার শিক্ষাই দিয়ে থাকি। আমরা কি দেখছি না যে, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই আজ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, চরিত্র বিকিয়ে টাকার মালিক হওয়ার প্রতিযোগিতা, মিথ্যা আর জালিয়াতির ছড়াছড়ি। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্য যেমন মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি সেই মানুষগুলোকে মনুষ্যত্বসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা। বিকৃত ধর্ম সমাজকে আরো দূষিত করবে। প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা যেমন পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে দিতে হবে তেমনি দিতে হবে রাষ্ট্রের উদ্যোগের মাধ্যমে। রাষ্ট্রই শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন করে। আর সকল পরিবারের পক্ষে সমভাবে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নির্দিষ্ট চারিত্রিক কাঠামোয় তৈরি করা সম্ভব নয়। পরিবারের অজ্ঞতা বা অসচেতনতার কারণে যেন শিশু সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য সমগ্র জাতিকে এ ভার নিতে হবে। নীতিহীন, চরিত্রহীন মানুষ একটি দানব ছাড়া আর কিছু নয়, বিশেষ করে যখন সে কোনো ধ্বংসাত্মক শক্তির অধিকারী হয়ে যায়। এটা উপলব্ধি করে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পর The Philosophy of the Modern Education গ্রন্থে অধ্যাপক বার্বাস বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, “বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অনুশীলন না করলে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কারণ, মানুষ ধ্বংসের উপকরণ অনেক বেশি জোগাড় করে ফেলেছে।”