Saturday, November 14, 2015

এক হজ্বই বদলে দিতে পারত উম্মাহর চেহারা


এক হজ্বই বদলে দিতে পারত উম্মাহর চেহারা

 0


রাকীব আল হাসান
—————–
যারা নিজেদেরকে মুসলিম উম্মাহর সদস্য বলে মনে করেন তাদের প্রত্যেকেরই উচিত এই জাতির সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কম বেশি চিন্তা করা। বিশেষ করে যখন এই উম্মাহ অতিক্রম করছে এক ঘোর অন্ধকারময় ক্রান্তিকাল। একটি জীবন্ত জাতি হিসেবে মুসলিম উম্মাহর নেতা যখন জাতিটিকে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তৈরি করে যান তখনই তিনি জাতির উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে কী পদক্ষেপ নিতে হবে তা জানিয়ে গেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে জাতির দৃষ্টি যখন অন্ধ হয় তখন সবদিক থেকেই অন্ধ হয়ে যায়। কোনদিকের পথই সে তখন দেখতে পায় না। এটা লানতের একটা চিহ্ন। লানতের আরো একটি চিহ্ন এই যে ‘যেখানে সমাধান নেই সেখানেই সমাধান খোঁজা’। তাই দেখি আল্লাহ মো’মেনদেরকে যেসব ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন মো’মেন দাবিদার এই জাতি সেখানেই ঢু মারছে সমাধানের আশায়। আল্লাহ যাদের সাথে বন্ধুত্ব পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছেন, তারা তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করায় ব্যস্ত। শুধু ব্যস্তই নয়, বরং কে কার চাইতে বেশি নিজেকে বন্ধুত্বে উজাড় করে দিতে পারে তার প্রতিযোগিতা করছে। বাস্তবতা হচ্ছে, যেখানে তোমার জিনিস হারিয়ে গেছে সেখানেই তাকে খুঁজতে হবে। অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। দৃষ্টিভ্রম হলেই কেবল তা সম্ভব।
এই জাতির স্রষ্টা আল্লাহ এবং তাঁর রসুল জাতির জাতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিকভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য সমস্ত উপকরণ তৈরি করে রেখেছেন। যেমন যদি দুইজন সদস্যের মধ্যে কোন সমস্যা দেখা দেয় বা মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় তাহলে একই দিনে অন্ততঃ পাঁচবার সময় রয়েছে মসজিদে মিলিত হয়ে সমাধান করে নেওয়ার। কেউ যদি কোন কারণে একদিন জামায়াত ধরতে ব্যর্থ হয় তার জন্য তিন দিন সময় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হাজির হয়ে মিটমাট করে নেওয়ার। আর কারো অবস্থান যদি মসজিদ থেকে দূরবর্তী স্থানে হয় তাহলে সে সপ্তাহের একদিন অর্থাৎ শুক্রবার জুম’আর সালাতে হাজির হয়ে পারস্পরিক সমস্যা মিটমাট করে নেবে। এই ক্রম ধারার আন্তর্জাতিক রূপ হচ্ছে প্রতি বছর ক্বাবার প্রাঙ্গণে, বায়তুল্লায় হজ্বের জন্য হাজির হওয়া। এদিন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নেতাগণ হাজির হয়ে নিজেদের পারস্পরিক সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সমাধান করে নেবেন। এমন কি মুসলিম উম্মাহর কোথায় কোন সমস্যা, কোথায় কার কোন অভাব তা পূরণ করতে হবে ক্বাবার প্রাঙ্গণে হাজির হয়ে। অন্যদিকে উম্মাহর সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তও এখান থেকেই নেওয়া হবে। তাই হজ্বের এই নির্ধারিত দিনগুলোতে এই জাতির স্রষ্টা অমোসলেমদের প্রবেশ নিষেধ করে দিয়েছেন। দীর্ঘ চৌদ্দশ’ বছর পরেও সে আদেশ বলবৎ আছে। সারা আরবে অন্যজাতিরা প্রবেশ করলেও এমন কি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে সক্ষম হলেও মক্কায় প্রবেশ করতে পারে নি। কিন্তু এ জাতি আজ জানে না কেন এখানে অন্য জাতির প্রবেশ নিষেধ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাতি যদি একটিবার একটি মাত্র হজ্ব করতে সক্ষম হোত তাহলে এ জাতির কোন সমস্যা থাকতো বলে অন্তত আমি মনে করি না। কারণ এ এক অব্যর্থ ঔষধ। এটা আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের দেওয়া ঔষধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে এই জাতি এই ঔষধ গিলতে নারাজ। তারা বিদেশি মোশরেক প্রভুদের প্রেসক্রাইব করা ঔষধ গিলবে। প্রকৃতপক্ষে তাই যদি হয়, তাহলে কেন তারা পবিত্র ক্বাবার প্রাঙ্গণে যান? যে উদ্দেশ্যে যা তৈরি করা হয়েছে তাকে দিয়ে যদি তা না হয়, তাহলে ঐ জিনিসের কী দাম থাকতে পারে? হজ্বের মাঠে মিলিত হয়ে যদি জাতি তার ঐক্যই ফিরে না পায়, শিয়া-সুন্নির ব্যবধান বজায় রেখে যার যার মত আনুষ্ঠানিকতা করার মধ্য দিয়েই হজ্ব পালন করেন তাহলে মুসলিম জাতির ঐক্য আসবে কি করে?
বর্তমানের এই হাজ্বীদের প্রতি আমার একটি আবেদন আপনারা যদি সত্যিকার অর্থেই আল্লাহ এবং রসুল সন্তুষ্টি চান, এ জাতির ঐক্য চান তাহলে সেই হজ্ব করুন যা দিয়ে সমস্ত মুসলিম জাতি তাদের ভেদাভেদ ভুলে এক জাতি হয়ে যায়, রসুলাল্লাহর ঐ বাণী মোতাবেক জাতি এমন হয়ে যায়- পৃথিবীর একপ্রান্তের কোন একজনের সমস্যায় যেন অপরপ্রান্তের একজন সদস্য ঝাঁপিয়ে পড়ে, একজন নেতার অধীনে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে নিজেদের কোরবান করতে শেখে। আর যদি কেউ নিছক হাজ্বী উপাধি লাভের জন্য কিংবা ব্যক্তিগত সওয়াব লাভের জন্য হজ্ব-পালন করে থাকেন তাহলে আমার কোন কথা নেই। শুধু কথা একটাই থাকবে- অনৈক্যের বিষবাস্প আজ চারিদিকে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তা এক সময় কাউকে নিস্তার দেবে না।

ধর্মজাত ফেতনা-ফাসাদ থেকে মুক্তির উপায় কী?


ধর্মজাত ফেতনা-ফাসাদ থেকে মুক্তির উপায় কী?

 0

মোহাম্মদ আসাদ আলী

ইদানীং এই জাতির সমাজচিন্তক ও জ্ঞানী-গুণী মানুষের মধ্যে হতাশা ও আবেগের প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। একদল মানুষ হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে বাস্তব জীবন থেকে কার্যত ইস্তফাই নিয়ে নিয়েছেন, তাদের ধারণা- তাদের আর কিছু করার নেই। জাতির ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। নিয়তির খেলা উপভোগ করাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। ওদিকে অন্যদল ভেসেছেন আবেগের সাগরে। তারা বাস্তবতাকেই অপাংক্তেয় করে রাখতে চান। কেননা বাস্তবতাকে দাম দিতে গেলে পথ হারিয়ে ফেলতে হয়। উচিত-অনুচিত, সফলতা-ব্যর্থতা, সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার সুতা মাপতে মাপতেই দিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতাকে এড়িয়ে কতদূর যাওয়া সম্ভব? দেখা যায় স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড়াতে গিয়ে বারবার তারা খেই হারিয়ে ফেলেন। অবশেষে ব্যর্থতার স্রোত এসে তাদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ধর্মীয় ইস্যুতেও এ জাতির জ্ঞানী-গুণী, সুশীল শ্রেণির অবস্থান বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এখানেও রয়েছে দু’টি ভাগ। একভাগের বক্তব্য হলো- ধর্ম নিয়ে যত নাড়াচাড়া করা হবে ততই নাকি তার প্রচারণা বাড়বে, মানুষ আরও ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে যাবে। অর্থাৎ সেটা ধর্ম সম্বন্ধীয় অশান্তির আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় বোকামী হবে। তাই ধর্ম সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকাই শ্রেয়। অন্যদিকে আরেক ভাগের বক্তব্য হলো- ধর্মকে যে করেই হোক মানুষের মন থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে। কেননা ধর্মবিশ্বাস আছে বলেই ধর্মকেন্দ্রিক ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হচ্ছে, ধর্মবিশ্বাস না থাকলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এরাই হলো পূর্বে বর্ণিত ওই ভাগটি যারা বাস্তবতাকে স্বীকার করেন না। যুক্তিকে ব্যবহার করেন না পরাজিত হবার পূর্বেই পরাজিত হয়ে যাবার ভয়ে। এই উভয় ভাগের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য হলো-
১. ধর্মকে মিসইউজ করতে দেওয়ার পরিণতি হবে খুবই খারাপ। ধর্মব্যবসা, ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি ও জঙ্গিবাদের যে ভয়াল থাবা সমস্ত পৃথিবীকে তটস্থ করে রেখেছে তা আরও ভয়ংকররূপে বিকাশিত হবে। হাতে ধরে তেমন অশান্তির সাগরে মানবজাতিকে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
২. অন্যদিকে খোদ ধর্মকেই বিদায় করে দেওয়ার ব্যাপারটা বাস্তবতার সাথে একেবারেই যায় না। এটা সম্ভবই না। ধর্মবিশ্বাস ইচ্ছে করলেই নির্মূল করে ফেলা যায় না। গেলে অনেক আগেই সেটা করা হতো। প্রচেষ্টা তো কম হয় নি। ধর্মহীন জীবন-ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে বহু শতাব্দী আগে। কিন্তু এখনও মানবজাতির মধ্য থেকে ধর্মের আবেদন কমে নি, বলা যায় অপরিবর্তনীয় আছে। এমতাবস্থায় ধর্মকে বিদায় করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালালে তার পরিণতিও খুব সুখকর হবে না। আমাদের দেশে নাস্তিক-আস্তিক ইস্যুটি নিশ্চয়ই সকলের মাথায় আছে। বিভিন্ন পরিস্থিতির সাপেক্ষে বাংলাদেশের ধর্মবিদ্বেষী নাস্তিকরা কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তাকে অভিজ্ঞতার পাল্লায় স্থান দিয়েই বাস্তবতাকে পরিমাপ করা উচিত।
এমতাবস্থায় সমাধান মাত্র একটাই হতে পারে- মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক পথে ব্যবহার করা। ধর্মব্যবসায়ীদের পেছন থেকে মানুষকে সরানো এবং এতদিন তারা ঈমানের ভুল প্রয়োগের কারণে যেভাবে অশান্তি সৃষ্টি করত, ঈমানের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে তার ঠিক উল্টোটা অর্থাৎ ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করা। এ ছাড়া অন্য কোনো পথে সমাধানের প্রচেষ্টা নিশ্চিত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এমন তো নয় যে, ধর্মে মানবতার কল্যাণে কাজ করার কোনো বার্তা নেই। বস্তুত প্রত্যেক ধর্মেরই মূল বা মর্মবাণী হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। কিন্তু ধর্মব্যবসায়ীরা সেই মর্মবাণীকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছতে দেয় না। ধর্মকে যদি তার অনাবীল রূপে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়া যায় এবং ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপারে তাদেরকে সজাগ ও সচেতন করে তেলা যায় তাহলে ধর্মবিশ্বাসই এই জাতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

Friday, November 13, 2015

রসুলাল্লাহর (স.) নির্দেশনা মোতাবেক- জাতীয় ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব

রসুলাল্লাহর (স.) নির্দেশনা মোতাবেক- জাতীয় ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব

 0

 শি’আবে আবু তালিবে রসুলাল্লাহর ভাষণ:

মহান আল্লাহর তস্বীহ ও পবিত্রতা ঘোষণা করার পর;
হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবের আনুগত্য কর এবং পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদ থেকে বিরত থাক। তা না হলে, তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। তোমরা কি এ সত্য সম্পর্কে অবগত নও যে, আল্লাহর জমিন যখন চতুর্দিক থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল, ‘শয়তানের এবাদত’ যখন ‘আল্লাহর এবাদাতের’ স্থান দখল করে নিয়েছিল, তখন মানবীয় নৈতিকতা মুছে গিয়েছিল, সর্বত্র ফেত্না-ফাসাদের তুফান প্রবাহিত ছিল। তোমরা সে যুগ প্রত্যক্ষ করেছ। এখানের বাসিন্দারা শত শত বছর হিংস্র প্রাণীর ন্যায় পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এ হানাহানি-খুনাখুনির জন্য দুনিয়ার কোথাও আরববাসীর সম্মান ছিল না। প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠী তাদেরকে নিকৃষ্ট ও লাঞ্ছিত মনে করত। যুদ্ধ-বিগ্রহ, শত্র“তা-দুশমনি ও ঘৃণা-বিদ্বেষ ছিল তাদের পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য। নিজেদের এ দুর্ভাগ্য সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অবস্থার ওপর রহম করেছেন। তোমাদের অন্তরে মহব্বত সৃষ্টি করেছেন এবং তার ফলে তোমরা ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়েছ। অতএব তোমরা এ মেহেরবানীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো না। পরস্পর মিলে মিশে থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা লক্ষ্য (কী লক্ষ্য? সমস্ত মানবজাতির সুখ-শান্তি এবং পরকালে জান্নাত) হাসিল করতে সক্ষম হও।
হে মানুষ! নিঃসন্দেহে সকল মো’মেন পরস্পর ভাই ভাই এবং সকল মো’মেন এক ব্যক্তি সদৃশ। তার শিরঃপীড়া উপস্থিত হলে সারাটা শরীর বেদনায় জর্জরিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এক মো’মেন অন্য মো’মেনের জন্য এমন এক বুনিয়াদ স্বরূপ, যার এক অংশ অন্য অংশের বোঝা বহনে সাহায্যকারী। আমি তোমাদের নসিহত করছি, প্রত্যেক মো’মেন পরস্পর ভাই, তাই কেউ যেন কারও প্রতি যুলুম (অন্যায় আচরণ) না করে এবং কোন একজনকে যেন একাকী বন্ধুহীন বা সাহায্যহীন ছেড়ে না দেয়া হয়। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দিবেন। যে ব্যক্তি মো’মেনের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করে দিবেন। যে ব্যক্তি অন্যের ত্র“টি গোপন করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার ত্র“টিও গোপন রাখবেন।
হে মানুষ! যথাসম্ভব ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন যাপন করো। পরস্পর ঝগড়া বিবাদ থেকে বিরত থাকো। তোমাদের রব তোমাদেরকে নিঃস্বার্থ কর্মের হুকুম দিচ্ছেন এবং ফেত্না-ফাসাদ ও খুনোখুনী নিষিদ্ধ করেছেন। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমরা মো’মেন না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর নিজের জন্য তোমরা যা পছন্দ করো, অপর ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ না করা পর্যন্ত তোমরা মো’মেন হতে পারবে না।
এবং হে মো’মেনগণ! অবশ্যই মহাপবিত্র আল্লাহ তোমাদের ওপর করুণা করেছেন, তিনি তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে হিংসা-বিদ্বেষের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। এ নেয়ামতের সম্মান করা তোমাদের কর্তব্য এবং তোমরা পরস্পরের সুখে দুঃখে অংশগ্রহণ করো। আমি ইতঃপূর্বে বলেছি যে এক মো’মেন অন্য মো’মেনের জন্য বুনিয়াদ স্বরূপ। তার অর্থ হলো; এক মো’মেন অন্য মো’মেনের জন্য দেওয়ালের ইটের মতো, যেন একে অপরকে আঁকড়ে থাকে। যেরূপ দেয়ালের এক ইট অপর ইটকে সংযুক্ত রাখে, সেরূপ পরস্পর ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য আমি তোমাদেরকে হেদায়াত করছি। তোমরা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন, একে অপরের সাহায্য করবে। আমি তোমাদের হুঁশিয়ার করছি যে, তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকো, একে অপরকে সাহায্য করো অর্থাৎ আশ্রয় দান করো, তাহলে তোমরা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত থাকবে। অন্যথায় তোমরা স্তুপীকৃত ইটের ন্যায় হবে, কোনো দৃঢ়তা থাকবে না এবং যে কেউ তা উড়িয়ে দিতে পারবে। আর তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য রয়েছে, সে যেন অবশ্যই তার ভাইয়ের উপকার করে এবং আমি পুনরায় তোমাদেরকে একথা বলছি যে, কোনো লোক ততক্ষণ পর্যন্ত মো’মেন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাই এর জন্যও তাই পছন্দ করে। আমি এ উদ্দেশ্যে বলছি যে, প্রত্যেক মো’মেন যেন লাভ-লোকসানের ব্যাপারে, অপর মো’মেনকে তার নিজের মত মনে করে এবং সে যা নিজের জন্য অপছন্দ করে, তা যেন তার ভাই এর জন্যও অপছন্দ করে। যতদূর সম্ভব এক মো’মেন ভাইকে যেন নিজের সত্ত্বার ন্যায় প্রিয় মনে করে। নিজের সত্ত্বাকে সে যেরূপ প্রিয় মনে করে, সেরূপ তার ভাইকেও প্রিয় মনে করে এবং নিজের সত্ত্বার প্রতি যে আচরণ করে, সেরূপ আচরণ যেন তার ভাইয়ের প্রতিও করে। কথাবার্তায় মোনাফেকও নিজেকে মো’মেন বলে থাকে। কিন্তু মো’মেন তো সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মো’মেন নিরাপদ থাকে।
হে মানুষ! মো’মেনের প্রত্যেক জিনিস অপর মো’মেনের জন্য হারাম। পরস্পরের রক্ত, ইজ্জত, আব্র“, সম্পদ এর কোনটারই ক্ষতি সাধন তোমরা করো না। মানুষের চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে এমন দু’টি গুণ রয়েছে যার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। এর প্রথমটি হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান, আর দ্বিতীয়টি মো’মেনদের উপকার সাধন। দোষাবলীর মধ্যেও এমন দু’টি দোষ রয়েছে, যার চেয়ে নিকৃষ্টতম আর কিছুই নেই। প্রথমটি, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, দ্বিতীয়টি কোন মো’মেনের ক্ষতি সাধন করা। কোন অবস্থাতেই মো’মেন ভাই এর ওপর যুলুম করা অন্য মো’মেনের জন্য বৈধ নয়। বিপদকালে মো’মেন ভাইকে সাধ্যমত সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য।
সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতাল্লাহে ওয়া বারাকাতুহ্।

পবিত্র কোর’আনের আলোকে- মো’মেনদের প্রতি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস্তবচিত্র

পবিত্র কোর’আনের আলোকে- মো’মেনদের প্রতি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস্তবচিত্র

 0


সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তাঁর মো’মেন বান্দাদের উদ্দেশে অনেক কথা বলেছেন ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পবিত্র কোর’আন থেকে তার কিছু অংশ উল্লেখ করা হলো।
১. আল্লাহ মো’মেনদের ওলী (অভিভাবক)। (বাকারা- ২৫৭)
২. তোমরা হীনবল এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মো’মেন হও। (আল এমরান-১৩৯)
৩. মো’মেনদের শ্রমফল আল্লাহ নষ্ট করেন না। (আল এমরান-১৭১)
৪. মো’মেনদের বন্ধু শুধুমাত্র আল্লাহ, তাঁর রসুল এবং মো’মেনগণ। (মায়েদা-৫৫)
৫. মো’মেনদের জীবন-সম্পদ আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। (তওবা-১১১)
৬. আল্লাহ মো’মেনদের পার্থিব জীবনের হীনতাজনক শাস্তি দূর করবেন। (ইউনুস-৯৮)
৭. মো’মেনদেরকে উদ্ধার করা আল্লাহর দায়িত্ব। (ইউনুস-১০৩)
৮. আল্লাহ মো’মেনদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবেন। (হজ্জ-৩৮)
৯. তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও আমলে সালেহ করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেনই, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য সুদৃঢ় করবেন তাদের দীনকে, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন। এবং ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে, আমার কোন শরীক করবে না, অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা তো সত্যত্যাগী। (নূর-৫৫)
১০. মো’মেনদেরকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব। (রূম-৪৭)
১১. আল্লাহ মো’মেনদের প্রতি পরম দয়ালু। (আহযাব-৪৩)
১২. আল্লাহ মো’মেনদের অভিভাবক। (মুহাম্মদ-১১)
১৩. তোমরা হীনবল হয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না, তোমরাই প্রবল, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি তোমাদের কর্মফল কখনও ক্ষুন্ন করবেন না। (মুহাম্মদ-৩৫)
১৪. আল্লাহ মো’মেনদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন ও তাদের পাপ মোচন করবেন। (ফাত্হ-৫)
১৫. মো’মেনগণ আল্লাহর উপর নির্ভর করুক। (তাগাবুন-১৩)
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ মো’মেনদেরকে শেষ্ঠত্ব, কর্তৃত্ব ও সাহায্যের যে প্রতিশ্র“তিগুলো দান করেছেন সেগুলো বর্তমানের মো’মেন দাবিদার জাতিগুলোর ক্ষেত্রে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটা বিবেচনা করুন। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে মো’মেন মুসলিম দাবিদার জাতিটি সকল জাতির দ্বারা পরাজিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত। তারা নিজেরাও শিক্ষাদীক্ষা, মানবিক বৈশিষ্ট্য, ঐক্য-শৃঙ্খলা-ভ্রাতৃত্ব সর্বদিকে চরম অবনতির শিকার। তাহলে কি ঐ আয়াতগুলো সত্য নয়? নাউযুবিল্লাহ। আয়াতগুলো অবশ্যই সত্য কিন্তু এ জাতিই মো’মেন নয়। তাই আল্লাহর ঐ প্রতিশ্রুতিগুলো এ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য নয়। এরা মো’মেন নয়, কারণ মো’মেন হওয়ার যে সংজ্ঞা আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে দান করেছেন এটা সেই সংজ্ঞা পূরণ করে নি।
আল্লাহ বলেন; ‘তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান আনে, পরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করে না এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ।’ (সুরা হুজরাত: ১৫)

Tuesday, November 10, 2015

জোয়ান অব আর্ক যাকে তিনবার ভষ্মীভূত করা হয়



জোয়ান অব আর্ক যাকে তিনবার ভষ্মীভূত করা হয়

 0

zoan-aob-ark-195x300
[ইউরোপে ধর্মীয় উল্লাসে জুডিশিয়াল কিলিং]
স্বামী বিবেকানন্দ ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ পুস্তকের ১১৮ পৃষ্ঠায় ভারতবর্ষে হিন্দু জাতির উদাহরণ টেনে বলেছেন, ‘দেখা যাবে এসলাম যেথায় গিয়েছে, সেথায়ই আদিম নিবাসীদের রক্ষা কোরেছে। সেসব জাত সেথায় বর্তমান। তাদের ভাষা, জাতীয়ত্ব আজও বর্তমান।” এর তুলনায় ইউরোপিয়ানদের রেড ইন্ডিয়ানদের উপর গণহত্যা চালিয়ে আমেরিকা দখলের ইতিহাস, ইনকা সভ্যতা ধ্বংস করে পেরু দখলের ইতিহাস তুলনা করলে বোঝা যাবে খ্রিস্টানরাই তাদের ধর্মকে কিভাবে নির্যাতনের কলে পরিণত করেছিল। অথচ তারাই তাদের রচিত বিকৃত ইতিহাসগুলিতে এসলামকে তলোয়ারের ধর্ম হিসাবে তুলে ধরার অপপ্রয়াস পেয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মেও প্রথমে এ নীতিই প্রকাশ হয় যে, ‘ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কাউকে বাধ্য করা যাবে না।’ কিন্তু ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন দ্যা গ্রেটের হাত ধোরে ধর্মের সাথে যেদিন রাজশক্তি যোগ হোল সেদিনই এই সহিষ্ণুতার পরিসমাপ্তি ঘটলো। তখন থেকে অ-খ্রিস্টানরা সাধারণ অপরাধীদের চেয়েও বড় অপরাধী বলে গণ্য হোতে আরম্ভ করল, তাদের উপর চালাতে আরম্ভ করল বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যা। এই গণহত্যার একটি উপায় জুডিশিয়াল কিলিং বা বিচার বিভাগীয় হত্যাকাণ্ড। অবশ্য চার্চ বা যাজকরা নির্যাতন বা হত্যাটা স্বহস্তে করত না, কে খ্রিস্টান সেটা বিচারের পরে অপরাধীকে তুলে দেয়া হোত রাষ্ট্রীয় বা পৌর কর্তৃপক্ষের হাতে। যীশুখ্রিস্ট মানুষের রক্তপাত ঘটাতে নিষেধ কোরে গেছেন, তাই নর-রক্তপাত খ্রিস্টান ধর্মে নিষেধ। সেই জন্য বিশাল কড়াই-এ হত্যা আগুনে পুড়িয়ে করা হোত তাতে মানুষ মারাও হোত অথচ রক্তপাত হোত না।
১৪৩১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মে ফ্রান্সের রোয়েনে ফরাসি বীরকন্যা জোয়ান অব আর্ককে ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯। ৩০ শে মে ফরাসি বীরকন্যা জোয়ান অব আর্কের (১৪১২-১৪৩১) হত্যার ৫৮৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী। জোয়ানের পিতা জ্যাক ডি আর্ক ও মাতা ইসাবেল রোমিই। জন্মস্থান ডোমাঁয়েই ।
জোয়ানের জন্মের সময়কালে ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস উন্মাদ হয়ে যান ও রাজ্য পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েন। তখন রাজার ভাই ডিউক লুইস অব অর্ল্যান্স এবং রাজার চাচাতো ভাই জন দ্যা ফিয়ারলেস, বার্গুন্ডির ডিউক রাজক্ষমতার জন্য কলহে লিপ্ত হন এবং রাজবংশ ও রাজকীয় পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে ব্যাপক বিরোধ জন্ম নেয়। এই দ্বিধা বিভক্ত রাজ্যের অনুসারীরা আরমাগনাস ও বার্গুনডিয়ানস নামে বিভক্ত হয়ে পরে। ইংলিশ রাজা পঞ্চম হেনরী এর পুরো সুযোগ নিয়ে ১৪১৫ সালে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের শহরগুলো দখল করে নেন। এদিকে সপ্তম চার্লসের চার ভাই মারা গেলে, তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। আর বার্গুন্ডিয়ানরা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়।
কথিত আছে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাঠে ভেড়ার পাল চরানোর সময় কৃষককন্যা জোয়ান দৈববাণী শুনতে পান যে, তাকে মাতৃভূমির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও ফ্রান্সের প্রকৃত রাজাকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এর আগে প্রায় শতবর্ষ ধরে ধরে চলা যুদ্ধে (১৩৩৭-১৪৫৩) ফরাসিদের অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। ব্রিটিশদের রণকৌশলের কাছে একের পর এক ফরাসিরা পরাস্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে ব্রিটিশরা প্রায় দু’টি রাজতন্ত্রের অধিকারী হতে চলে পাশাপাশি ফরাসিরা কয়েক প্রজন্ম ধরে কোন ধরনের যুদ্ধজয়ের মুখই দেখলো না। জোয়ানের শোনা সেই দৈববাণীর সংবাদ জানতে পেরে একজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি তাকে মুকুটবিহিন সম্রাট সপ্তম চার্লসের কাছে নিয়ে যান। সেখানে যাবার পথে শত্র“ভূমি বার্গুন্ডিয়ানদের অধিকৃত অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে হয়। সেখান দিয়ে জোয়ান পুরুষ ছদ্মবেশে গমন করেন। রাজা তার কথা শুনে হেসেই অস্থির হয়ে যান। প্রথমে অবজ্ঞা প্রদর্শন করলেও ধর্মব্যবসায়ী যাজক সম্প্রদায়ের পরামর্শে পরবর্তীতে তিনি জোয়ানকে সৈন্য সাহায্য দিতে সম্মত হন। এর পরে জোয়ান পুরুষ নাইটদের পোশাক পরিধান করে একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে পঞ্চক্রুশধারী তরবারি হাতে ৪০০০ সৈন্য নিয়ে ১৪২৯ সালের ২৮শে এপ্রিল অবরুদ্ধ নগরী অর্ল্যান্ডে প্রবেশ করেন। তিনি তৎকালীন ফ্রেঞ্চ নেতৃত্বের রক্ষণাত্মক রণকৌশল পরিহার করে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে অর্ল্যান্ডকে মুক্ত করেন।
এরপর তাদের একের পর এক সাফল্য আসতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা ইংরেজ সৈন্যদের কবল থেকে তুরেলবুরুজ শহর উদ্ধার করেন। এর পর পাতে’র যুদ্ধেও ইংরেজরা পরাজিত হয়। জুন মাসে জোয়ান তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শত্র“দের ব্যূহ ভেদ করে রীমস নগরী অধিকার করেন। এরপর ১৬ই জুলাই সপ্তম চার্লস ফ্রান্সের রাজা হিসেবে আবার সিংহাসনে অভিষিক্ত হন এবং জোয়ানকে তার অসামান্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদ দেয়া হয়। যদিও জোয়ান শিক্ষিত ছিলেন না তদুপরি তার মেধা এবং অসম্ভব বীরত্বের জন্য ফ্রান্স রাজসভার অন্যান্য পুরুষ সদস্যগণ তাকে মনে মনে হিংসা ও অপছন্দ করতে শুরু করলো। তারা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভয় পেয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো কেননা রাজা সপ্তম চার্লস জোয়ানকে ভীষণ পছন্দ এবং বিশ্বাস করতেন।
ধর্মব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র:
জোয়ান অব আর্কের সকল যুদ্ধের পেছনেই ধর্মীয় চেতনা ছিল। এরপর জোয়ান ইংরেজদের সাথে একটি যুদ্ধে লিপ্ত হলে রাজসভার ধর্মব্যবসায়ী যাজকরা রাজাকে বোঝান যে জোয়ানের এই ধর্মযুদ্ধ রাজাকে ফরাসিদের কাছে ‘ডেভিল’ এ পরিণত করবে। তৎক্ষনাৎ রাজা জোয়ানকে ডেকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজদের সাথে সমঝোতায় আসতে বলেন। কিন্তু একরোখা এবং জেদী জোয়ান রাজার আদেশ অমান্য করেই যুদ্ধ চালিয়ে যান। ইংরেজরা যখন জানতে পারে রাজার কথা অমান্য করে জোয়ান যুদ্ধ করছে তখন রাজসভার অন্যান্য সদস্যদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা জোয়ানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। কঁপিএন শহরের বহির্ভাগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ডিউক অব বেডফোর্ডের নেতৃত্বে লড়াই করছিল, ১৫ অগাস্ট তারা ফরাসি বাহিনীর মুখোমুখি হয়। প্যারিসে উভয়পক্ষের লড়াই হয়। জোয়ান এক পায়ে আঘাত পান। আঘাত নিয়েই তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান।
গ্রেফতার এবং প্রহসনের
বিচারে মৃত্যুদণ্ড
২৩শে মে ১৪৩০ তারিখে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে আটক করে ফেলে, বার্গুন্ডিয়ানরা তাকে ঘিরে ঘোড়া থেকে নামতে বাধ্য করে। প্রাথমিকভাবে তিনি আত্মসমর্পণ করেন নি। আটক অবস্থায় জোয়ান কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেন। একবার তিনি ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে নীচের মাটিতে লাফিয়ে পড়ে বার্গুন্ডিয়ান শহর আরাসে পালিয়ে যান। ব্রিটিশ সরকার তাকে বার্গুন্ডিয়ান ডিউক ফিলিপের কাছ থেকে কিনে নেয়।
এক ইংরেজ ধর্মজীবী পাদ্রির অধীনে ১৪৩১ সালের ৯ই জানুয়ারী তার বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়। প্রহসনের এ বিচারে তাকে কোন আইনজীবী দেয়া হয় নি। বিচারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ‘তার উপর ঈশ্বরের বিশেষ দয়া আছে’ তিনি এমন বিশ্বাস পোষণ করেন কিনা। জবাবে জোয়ান বলেছিলেন “যদি আমি তা বিশ্বাস না করি তবে ঈশ্বর যেন আমাকে যেখানে আছি সেখানেই রেখে দেন, আর যদি বিশ্বাস করি তবে ঈশ্বর যেন আমাকে রক্ষা করেন।” আসলে এই প্রশ্নটিই ছিল সাংঘাতিক চালাকিপূর্ণ। যদি জোয়ান বলতেন ‘হ্যাঁ করি’, তবে তাকে ধর্মের বিরুদ্ধে যাবার অভিযোগ আনতেন আর যদি জোয়ান বলতেন ‘না’ তবে বলা হতো তিনি নিজের অভিযোগ নিজেই স্বীকার করেছেন।
ছলচাতুরি বিচারে আদালত তাকে ১২ নম্বর আর্টিকেল অনুযায়ী দোষি সাব্যস্ত করে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করা হয়। তার কোন আইনজীবি না থাকাতে জোয়ানকে রায় বিস্তারিত পড়ে শোনানো হয় নি। জোয়ান তখন বুঝতেও পারেন নি, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। কারাগারে জোয়ানকে মেয়েদের পোশাক পরতে হয়। ক’দিন পর তাকে কারাগারের ভেতরেই লর্ড উপাধিধারী এক ‘সম্ভ্রান্ত’ ইংরেজ ধর্ষণ করা হয়। জোয়ান আবার পুরুষদের পোশাক পরিধান শুরু করেন। এর পেছনে মূল কারণ ছিল ছেলেদের পোষাকে নিরাপত্তা বেশি পাওয়া যেতে পারে, তাছাড়া তার পরার জন্য অন্য কোন বস্ত্র ও অবশিষ্ট ছিল না।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য
তাকে একটি পিলারের সাথে বেঁধে ফেলা হয়। জোয়ান গীর্জার যাজকদের কাছে একটি ক্রুশ চান। জনৈক চাষী একটি ছোট ক্রুস তৈরি করে জোয়ানের পোষাকের সামনে ঝুলিয়ে দেন। জোয়ানের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরকে প্রদর্শন করে যাতে কেউ কোনদিন দাবি না করতে পারে জোয়ান বেঁচে পালিয়ে গেছে। এরপর তার শরীর আরো দু’বার পোড়ানো হয় যাতে তার ছাইগুলো এতো মিহি হয়ে যায় যে কেউ তা সংগ্রহ করতে না পারে।
তার মৃত্যুর ২৫ বছর পর পোপ ক্যালিক্সটাস-৩ তার এই হত্যাকান্ডের বিচারকাজ নতুন করে শুরু করেন এবং সেই বিচারে জোয়ান নিস্পাপ ও সন্ত (Saint) এবং শহীদ প্রমাণিত হয়। মৃত্যুপরবর্তী বিচারে জোয়ান নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে সন্ত বা সেইন্ট ঘোষণার সাথে সাথে তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে ফরাসিরা ফ্রান্স থেকে চিরতরে ইংরেজদের সকল অধিকার ও চিহ্ন মুছে দেয়ার প্রয়াস পায়। তার স্মরণে পরে ফ্রান্সে অনেক স্মৃতিসৌধও নির্মিত হয়েছে।

সাধু সাবধান! ঐক্য পুনরুদ্ধার না হলে দলের অস্তিত্ব থাকবে না

সাধু সাবধান! ঐক্য পুনরুদ্ধার না হলে দলের অস্তিত্ব থাকবে না

 0


শরিফুল ইসলাম
আমীর, হেযবুত তওহীদ, মেহেরপুর
ঐক্যের বন্ধন যে কোনো বস্তুর অস্তিত্বের প্রধান শর্ত। পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো একে অপরের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকে বলেই বস্তু পদার্থ গঠিত হয়। পদার্থের অণুগুলোর মধ্যে বিরাজিত আকর্ষণ শক্তির নাম আন্তআণবিক শক্তি যা তাপ প্রয়োগে হ্রাস পায়। ফলে পদার্থটির অবস্থা পরিবর্তিত হয়। যেমন এক পাত্র পানিকে যদি চুলায় উত্তপ্ত করা হয় এক সময় পানির অণুগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব বেড়ে যায় এবং একটা পর্যায়ে পানি বাষ্প হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
তেমনিভাবে স্বার্থ হচ্ছে জাহান্নামের আগুনের মতো যা মানুষের মধ্যকার সব মানবিক গুণাবলীকে ভস্ম করে দেয়, বলা যায় আন্ত-মানবিক শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। পরিণামে মানুষের সাথে মানুষের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি যা একটি সংগঠনের ভিত্তি তা ভেঙে পড়ে। সেটা যে কোনো দেশের সরকারি দলই হোক বা বিরোধী দলই হোক বা একটি পরিবারই হোক – প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রাকৃতিক নিয়মটি প্রযোজ্য।
এ দেশের ঐতিহ্যবাহী দলটির সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস এক সূত্রে গাঁথা – এ সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু মানুষ বাস করে বর্তমানে, তাই গৌরবের ইতিহাসের চেয়ে তাদের বর্তমান ভূমিকাই অধিক তাৎপর্যের। দীর্ঘদিন ধরে নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যে স্বার্থ নিয়ে বিশ্রী হানাহানি, ঈর্ষা, শত্রুতা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
পদের জন্য বা মনোনয়নের জন্য নিজের দলের কর্মীদেরকে তারা হত্যা করছে। বিরোধীদের দ্বারা তাদের যত কর্মী নিহত হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি নিহত হয়েছে নিজের দলের লোকের হাতে। রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দলের পক্ষে এহেন কলঙ্ক থেকে তারা কীভাবে মুক্তি পাবেন? তাদের কর্মীদের স্বার্থ নিয়ে এই দ্বন্দ্ব দ্বারা তারা স্বয়ং বঙ্গবন্ধুকেও কলঙ্কিত করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এ কলঙ্ক তাদের একার উপরে বর্তালে আমার কোনো বক্তব্য ছিল না। কিন্তু তাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, তারা যেহেতু জনগণের সমবায়ে গঠিত রাষ্ট্রটির পরিচালন তাই, জনগণের রক্ষণের প্রতি তারা দায়বদ্ধ, শুধু মধু আহরণ করার সুযোগ দিতে তাদেরকে নির্বাচিত করে নি। একাত্তর সনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি এসবই দলটির জনপ্রিয়তার ভিত্তি। বঙ্গবন্ধু অমর হয়েছেন জাতির মুক্তির জন্য তার নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা আর অপরিসীম ত্যাগের জন্য। অমরত্বের মূলমন্ত্র অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের উপলব্ধি করতে হবে।
একাত্তর সালে পুরো জাতি তাদের উপর জাতির পরিচালনা ও রক্ষণের দায়বদ্ধতা সোপর্দ করেছিল। বর্তমান সরকারি দল হিসাবেও তা থেকে তারা মুখ ফেরাতে পারে না। কিন্তু স্বার্থের আগুনে তাদের যাবতীয় গুণাবলী বা®পীভূত হয়ে যাচ্ছে, তাদের সাংগঠনিক ঐক্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
এটা চিরন্তন সত্য যে, ক্ষমতা কারো চিরকাল থাকে না। তাই স্বার্থ নয় জনভিত্তিই রাজনীতিকদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। দলীয় ঐক্য আর মানুষের ভালোবাসা থাকলে কোনো গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগকে অতিক্রম করতে পারবে না। এজন্য সর্বপ্রথম তাদেরকে নিঃস্বার্থ হয়ে প্রকৃত জনসেবার মানসিকতা নিয়ে (বুলি নয়) কাজ করতে হবে, কেননা স্বার্থই তাদেরকে অন্তর্কোন্দলের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এমন অবস্থায় পানি যেমন বা®প হয়ে যায়, তেমনি আওয়ামী লীগ কেন, যে কোনো দলই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। কীভাবে মিলিয়ে যাবে তা বুঝতে হলে প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের বাথ পার্টির দিকে দৃষ্টিপাত করুন অথবা কর্নেল গাদ্দাফির কথা ভাবুন। তাদের পার্টি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, নেতাদের কবর পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে গেছে।
কোনো জাতির মধ্যে যখন রাজনীতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত, সংঘর্ষ চলতে থাকে তখন জনতাও বিভক্ত হয়ে যায়। মানুষের শান্তি নিরাপত্তা ব্যহত হয়, অপরাধ বাড়তে বাড়তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায়, সরকারের জনভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন স্বার্থবাজ, অপরাজনীতিক, ধর্মব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদীরা তাদের অভিসন্ধি পূরণের সুযোগসন্ধানে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জঙ্গিদের আধিপত্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে প্রতিটি দেশে থাকা তাদের সমর্থকরাও উজ্জীবিত হয়ে উঠছে। যুদ্ধের পরিণতিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে ভিনদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, সাগরে ডুবে মরছে। তাদেরও সব ছিল কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিতে পারার কারণে আজ তারা সব হারিয়েছে। আমাদের দেশেও জঙ্গিবাদের প্রবল হুমকি আছে। এ থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য ষোল কোটি মানুষকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করা অপরিহার্য। এ কাজটি করার জন্য দায়িত্ব রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে সরকারের ও সরকারি দলের। তারা যদি এ কর্তব্যকে উপেক্ষা করে স্বার্থচিন্তায় মগ্ন থাকে, একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত থাকে তবে অচিরে তারাও ইতিহাসে পরিণত হবে এ কথা বলতে ভবিষ্যদ্বক্তা হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

সংকটে বাংলাদেশ: আমরা নির্বিকার থাকতে পারি না


সংকটে বাংলাদেশ: আমরা নির্বিকার থাকতে পারি না

 0


 -রিয়াদুল হাসান
আমাদের দেশের হাজারো সমস্যা, গুনে শেষ করা যাবে না। জীবনের প্রতিটি অঙ্গন ভয়াবহ রকমের অব্যবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে। নিত্যব্যবহার্য পণ্য, খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক, প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষা-চিকিৎসা সবকিছুর বাণিজ্যকরণ, সীমাহীন দুর্নীতি, ঘুষ, অবিচার ইত্যাদি মানুষের জীবনকে নিদারুণ অসহায় করে তুলেছে। প্রতিটি মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে, সবাইকে তাড়া করে ফিরছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভাবনা। টাকাই যেন সব, টাকা ছাড়া কোনো মানুষের মূল্য নেই। পশ্চিমা বস্তুবাদী জীবনধারা ধীরে ধীরে মানবজাতির মনুষ্যত্বকে গ্রাস করে নিয়ে তাদেরকে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক আর অর্থপিশাচ বানিয়ে ফেলেছে।
রোগ বহুরকম আছে কিন্তু প্রাণঘাতী রোগ হলে মানুষ যেমন ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসার জন্য সবকিছু বাজি রাখে, তেমনি আমাদের এই ১৬ কোটি মানুষ যারা হাজারো সমস্যায় আক্রান্ত, তাদেরকে এখন বুঝতে হবে যে এই ব্যাধিগুলোর মধ্যে কোন ব্যাধিটি অবশ্যই তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা নিছক সম্ভাবনার কথা বলছি না, বলছি দাঁড়াবেই। সেগুলো হচ্ছে (১) বৈদেশিক ষড়যন্ত্র (২) ধর্মীয় উগ্রপন্থা (৩) রাজনীতির নামে শত্র“তা (৪) তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কথায় বলে বিপদ একা আসে না। এই সমস্যাগুলোও একে অপরের হাত ধরাধরি করে আছে। ডাক্তার যদি সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করতে পারে তাহলে রোগীর যেমন দফারফা হয়, তেমনি আমাদের অস্তিত্বের সংকট কোনটি তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ মঙ্গল গ্রহে অবস্থিত নয়, পৃথিবীতে অবস্থিত। আর বর্তমানে গোটা পৃথিবী একটি গ্রামের মতো। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে যে সময় লাগতো, এখন সেই সময়ে পৃথিবীর অপর প্রান্তে চলে যাওয়া যায়। একটি সংবাদ সেকেন্ডের মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বহির্বিশ্ব কথাটি এই বিশ্বায়নের যুগে অবান্তর হয়ে গেছে। তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যা ফেরানোর কোনো পথ এখনো পাওয়া যায় নি, সেই যুদ্ধ শুরু হলে আমরাও তা থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখতে পারব না। জাতিসংঘ শান্তি মিশন ইত্যাদিতে আমাদের সেনাবাহিনী নাম কুড়িয়েছে। এ থেকে আমরা সুনাম, সম্মান বা অর্থ লাভ করলেও আমরা যখন বিপদে পড়ব তখন ঔ পশ্চিমারা এই গরিব দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় কতটুকু সক্রিয় হবে সে বিষয়ে সন্দেহের কারণ আছে, বিগত ৫০ বছরে তাদের কূটনীতি-রাজনীতি ও সামরিক কর্মকাণ্ড মুসলিম নামধারী জাতিকে কী দিয়েচে তা বিবেচনা করলেই সন্দেহের কারণ বুঝতে কষ্ট হবে না। আসন্ন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা বা রাশিয়া কোনো একপক্ষে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশকে জড়াতেই হবে। বিশেষ করে জীবন দেওয়ার জন্য দাসদেরকেই তারা অগ্রাধিকার দেয়।
নদীর তট থাকে কিন্তু বন্যার কোনো তট থাকে না। বিশ্বযুদ্ধ এমনই এক বন্যা যা কাউকে তটে দাঁড়িয়ে ঢেউ গোনার সুযোগ দেবে না। সবাইকে ডুবিয়ে ছাড়বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নব্বই পর্যন্ত যে শীতল যুদ্ধ চলেছে ক্রেমলিনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের তা বাস্তবযুদ্ধে পরিণত হতে পারে নি উভয়পক্ষের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকার দরুন। আমি গুলি করলে আমাকেও সে গুলি করবে- এই চিন্তা থেকেই দুই অস্ত্রধারী রাষ্ট্র একে অপরের দিকে অস্ত্র তুলে যুগের পর যুগ কাটিয়ে দিয়েছে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানের পর মনে হয়েছিল যে, বাঁচা গেল। কিন্তু এভাবে বাঁচা যায় না। গত তিন যুগে আমেরিকা একদিনও যুদ্ধ ছাড়া থাকে নি। যুদ্ধই তাদের পররাষ্ট্রনীতি, অস্ত্রব্যবসাই তাদের মূল ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের বাজেটের অধিকাংশ অর্থ বরাদ্দ সামরিক খাতে। এদিকে রাশিয়া কোনো যুদ্ধ করে নি, তারা শক্তি ও মনোবল সঞ্চয় করেছে। অযাচিত মোড়লিপনা, স্বৈরাচারিতা, আধিপত্যবাদ, জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানো এবং তাদের নিয়ে ন্যাজে খেলা ইত্যাদি কারণে আমেরিকার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। তাই আবার অস্ত্র তুলে নিয়েছে রাশিয়া, বিশ্বে ভারসাম্য ফেরানোর স্বপ্ন দেখছে পতিত কম্যুনিস্ট বেল্ট। আমেরিকাও এখন ন্যাটোর শক্তিতে বলিয়ান। কেউ বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী ছাড় দেবে না। একগুঁয়ে হঠকারি বাশার আল আসাদ আর ধর্মোন্মাদ আই.এস ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী এই যুদ্ধের ইন্ধনমাত্র। যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে আরববিশ্ব-মধ্যপ্রাচ্য আর বলির পাঠা বা পাটার মরিচ হচ্ছে নিরীহ বেসামরিক জনগণ। সেখান থেকে বিস্তার লাভ করবে অন্যান্য দেশগুলোতে। লক্ষ্যভেদী মিসাইলের যুগ, বোমা ফেলতে কাউকে বিমানও পাঠাতে হবে না। বাংলাদেশ যে পক্ষেই সমর্থন দিক অপরপক্ষের মিসাইলের টার্গেটে পরিণত হবে। আমাদের এই ছোট একটি দেশ ধ্বংস করতে কয়টা মিসাইল লাগবে সেটা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন।
যদি পরিস্থিতির বড় কোনো ‘পরিবর্তন’ সাধন না করা যায় তাহলে বাংলাদেশেরও পরিণতি সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশের মতো হবে এক কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ:
(১) আমাদের দেশে ১৫ কোটি মুসলিম নামধারী জনগোষ্ঠী বাস করে। আফগানযুদ্ধ ফেরত জঙ্গিরা নব্বইয়ের দশকে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জঙ্গি দল গড়ে তোলে। আমাদের দেশেও ইসলামের নামে এই মারাত্মক পথভ্রষ্টতা ছড়িয়ে পড়ে। তারা কোর’আন হাদিস থেকে জেহাদ ও কেতালের আয়াত, রসুলাল্লাহর যুদ্ধপূর্ণ জীবনের নানা ঘটনার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে এই উপসংহারে উপনীত হয়েছে যে, এখনই জেহাদের সময়। তাদের ওয়াজে হাজার হাজার মানুষ গোপনে জঙ্গি দলগুলোর সদস্য হয়েছে। গত দেড়যুগে এই সব দলের অগণিত সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। এটা ঠিক যে অনেকে প্রপাগান্ডারও স্বীকার হয়েছে। আমাদের দেশে জঙ্গি হামলায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। আদালতে, ভিন্নধর্মের উপাসনালয়ে, সিনেমা হলে, উদিচির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, রমনা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, পল্টনে গ্রেনেড হামলা ইত্যাদি বহু ঘটনা আমাদের দেশে ঘটেছে যার জন্য এই ধর্মান্ধগোষ্ঠীকেই দায়ী করা হয়। এরা সশস্ত্র পন্থায় প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে তাদের দৃষ্টিতে ‘ইসলাম’ কায়েম করতে চায়, যদিও তারা যেটাকে ইসলাম মনে করছে সেটা ইসলাম নয়, ইসলামের নামে একটি ভয়ংকর বিকৃতি মাত্র। এই বিকৃতিকে সরকার অপনোদন করতে পারে নি, শুধু জোর করে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কোনোদিন জোর কোরে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, কোনোদিন সম্ভব হয় নি এবং হবেও না।
(২) আমাদের দেশে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করা ধর্মজীবীরা ধর্মের প্রকৃত রূপ না জানলেও তারাই ধর্মের ধ্বজাধারী। মানুষ তাদের কথায় প্রভাবিত হয়। এই ধর্মব্যবসায়ীরা মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট বা অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলে তাদেরকে দিয়ে বহু ধ্বংসাত্মক কাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা ব্লগ, কার্টুন, চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে কৃত ধর্ম অবমাননার ইস্যুতে সারা দেশে আন্দোলন করেছে, হরতাল-অবরোধ করেছে, গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও করেছে, এমন কি সরকারের পতন ঘটানোর প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে লক্ষ লক্ষ ‘তওহীদি জনতা’-র সমাবেশ ঘটিয়েছে। প্রতিবারই সরকার তার ক্ষমতা খাটিয়ে জোরপূর্বক তাদেরকে দমন করেছে, বহুলোক নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। তাদের ভেতরে ক্ষোভ দিনে দিনে পুঞ্জিভূত হচ্ছে। ভূ-অভ্যন্তরস্থ গ্যাসের চাপ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তা জ্বালামুখ নিজেই তৈরি করে নেয় এবং অগ্নুৎপাৎ ঘটায়। কেউ তা দাবিয়ে রাখতে পারে না।
(৩) আমাদের দেশে ইসলামের নামে স্বার্থের রাজনীতির পতন হয়ে গেছে। এদের নেতৃবৃন্দ অনেকেই কারাগারে। বাইরে যারা আছে তাদেরকে মামলার ভারে জর্জরিত করে ফেলা হয়েছে। ফলে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় চেতনার অপব্যবহার করে তারা স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল কিন্তু সেটাও ধর্মীয় চেতনাই। মেরে কেটে এই চেতনা মানুষের হৃদয় থেকে নির্মূল করা যায় না। বিশ্বে যতগুলো রাজনীতিক দল ইসলামের নামে গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি করেছে তাদেরকে দমন-পীড়ন করা হলে তারা জঙ্গি দলে যোগ দিয়েছে। ইখওয়ান যোগ দিয়েছে বোকো হারামে। আমাদের দেশেও একই যাত্রায় পৃথক ফল হবে না। মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা জেহাদের চেতনা লালন করে, মুসলিম জাতির পুনর্জাগরণ আশা করে তারা আইএস-কে তাদের আশা ভরসার স্থল মনে করছে। কারণ আইএস পশ্চিমাদের মদদে এখন বড় একটি শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন যুদ্ধের পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাস কাজ করে তখন তা একজন যোদ্ধাকে অসীম শক্তির আধারে পরিণত করে। সে বিশ্বাস করে যে আমি এই যুদ্ধে যদি নিহত হই তাহলেই চূড়ান্ত সাফল্য পাব। এখানে মৃত্যুর মাধ্যমে সে কিছুই হারায় না বরং তার সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বস্তু আল্লাহর সান্নিধ্য হাসিল করে। এমন যোদ্ধাকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার চেতনা আরো বহু যোদ্ধার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এটা তাদের কাছে চাকরি না, এটা তাদের কাছে ধর্মযুদ্ধ। কিন্তু তাদের এই চেতনা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও ইসলামেরই বিরুদ্ধে। এতে লাভবান হচ্ছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা। তারা মুসলিমদের একটি দলকে আরেকটি দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করে দিয়ে সেখানে অস্ত্র বিক্রি করছে। মারছে মুসলিম মরছে মুসলিম উদ্বাস্তু হচ্ছে মুসলিম। তথাপি অবদমিত ইসলামিক চেতনাবাজ দলের কর্মীরা আইএসের বিজয়ে উদ্বেলিত হয়। এভাবে জঙ্গিবাদের আমদানি-রপ্তানি হয়। উদ্বেলিত হয় জঙ্গিদলগুলো, মাদ্রাসাশিক্ষিত বিরাট জনগোষ্ঠী এবং সেই সাথে লক্ষ-কোটি ধর্মবিশ্বাসী মানুষও। নজরুল লিখেছিলেন:
এই যৌবন জল-তরঙ্গ রোধিবি কী দিয়া বালির বাধ?
কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ?
এদিকে পশ্চিমা জড়বাদী ধর্মহীন আত্মাহীন ভোগবাদী সভ্যতার নামে প্রচলিত অসভ্যতা, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, একচক্ষু মিডিয়ার অবিশ্রান্ত প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম জাতির মধ্যে বিরাট একটি অংশ ধর্মবিদ্বেষী হয়ে গেছে। তারা প্রচলিত ধর্মের কূপমণ্ডূকতা, ধর্মব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক আচার-বিচার, ফতোয়াবাজি, অন্ধত্ব দেখে ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কেননা ধর্মের প্রকৃত রূপটি তাদের সামনে তুলে ধরা হয় না, কারণ প্রকৃত ধর্ম তো ১৩০০ বছর আগেই হারিয়ে গেছে। বর্তমানের প্রচলিত বিকৃত ধর্মগুলো আলোর বদলে এখন কালিই ছড়াচ্ছে। এই ধর্মবিদ্বেষী শ্রেণিটি প্রায়ই উস্কানিমূলক কথা বার্তা বলে ধর্মান্ধদের হাতে সহিংসতা ঘটানোর ইস্যু তুলে দেয়। ধর্মের অন্ধ বিদ্বেষ যেমন অকল্যাণকর, ধর্মের নামে অন্ধত্বও অনুরূপ জাতিবিনাশী- এ সত্যটি উভয় পক্ষকেই বোঝাতে হবে।
১৫ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসকে ভুল খাতে প্রবাহিত করার সম্ভাব্যতা যদি নির্মূল না করা যায় তাহলে অবশ্যই এখানেও ধর্মব্যবসায়ীরা রণক্ষেত্র তৈরি করে ছাড়বে। তারা না করলেও বৈদেশিক ষড়যন্ত্র বসে থাকবে না। একদিকে চলছে ব্লগার হত্যা, অপরদিকে বিদেশি নাগরিক হত্যা, গির্জার ফাদারকে হত্যা। আবার চলছে মন্দিরে সাম্প্রদায়িক হামলা, শিয়াদের হোসেনি দালানে বোমা হামলা। এসবের মাধ্যমে দেশকে একটি জঙ্গি-সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী রাষ্ট্ররূপে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাগী আসামি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সব দেশ আমাদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দিচ্ছে, সতর্কতা জারি করছে যা বাণিজ্যিক অবরোধেরই নামান্তর। এসবের উদ্দেশ্য বোঝা খুবই সহজ।
এদেশের দুটি প্রধান রাজনীতিক দল। সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনে সফল না হয়ে প্রভুরাষ্ট্র ব্রিটেনে আছেন। দেশে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কিংবা সৃষ্টির পরিকল্পনা কিংবা সম্ভাবনা থাকলে রাজনীতিক নেতানেত্রীরা বিদেশে গিয়ে সপরিবারে আশ্রয় নেন যেন দেশ ধ্বংস হয়ে গেলেও নিজে সুখে থাকতে পারেন। এই স্বার্থের রাজনীতিক ১৬ কোটি মানুষকে শত ভাগে বিভক্ত করে এককে অপরের শত্র“ বানিয়ে রেখেছে। জাতির যে কোনো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এক নম্বর শর্ত হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। আমরা জাতীয় ঐক্যের স্বাদ পেয়েছিলাম শেষ ১৯৭১ সনে। তারপর থেকে কেবল অনৈক্যের গরলই পান করে চলেছি। বছরের পর বছর নেতাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ, সংসদ ভবনে পারলে তারা মারামারি করেন, যদিও কয়েক বছর সংসদই কার্যত না থাকায় এই লজ্জাজনক দৃশ্য আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে না। ক্ষমতার লড়াই এমনই পাশবিক যে আমাদের নেতা-নেত্রীরা প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে একে নিজেদের ব্যক্তিগত শত্র“তায় পরিণত করেছেন। তাদের পারস্পরিক হানাহানিতে জনগণের প্রাণ ওষ্ঠাগত। তবু তারা হাস্যকরভাবে গণতন্ত্রমনা, অভ্যাসে ভোট দিয়ে যায়। না দিলেও অবশ্য এখন অসুবিধা হয় না, কেউ না কেউ জয়ী হয়ে যায়। রাজনীতিকরা এখন আর ভোটারের উপর নির্ভর করে না, ভাড়াটে সন্ত্রাসীর উপর নির্ভর করে।
রাজনীতিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মীরজাফরের মতো বিদেশি শত্র“দের সঙ্গে হাত মেলায়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না যে মীরজাফর দুই দিন নবাব থাকলেও ইতিহাসে তার ঠাঁই হয়েছিল বেঈমানের তালিকায়। এভাবে তারা নিজেদের দেশকে বিপন্ন করে ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়।
ক্ষোভ ও বিকৃত জঙ্গি মতবাদ দ্বারা প্রণোদিত হয়ে এভাবেই ক্রমশ জঙ্গিমনস্ক হয়ে উঠছে বিরাট সংখ্যক তরুণ যাদের মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষিত আছে, সাধারণ শিক্ষিতও আছে। তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে থাকলেও যে কোনো ইস্যুতে এক হয়ে যেতে সময় লাগবে না। জনপ্রিয়তা না থাকায় সরকার এখন দুর্বল, তারা নিজেরাও অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত। কেউ যদি এই বাস্তবতাকে গায়ের জোরে অস্বীকার করতে চান, কিছু করার নেই। ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলার জন্য সমুদ্র জয়, পদকপ্রাপ্তি ইত্যাদি সফলতার প্রদর্শনী যতই করা হোক, জনগণের কাছে এসবের তেমন কোনো মূল্য নেই। এগুলো বড় কোনো সংকট থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না। সামান্য নো ভ্যাট আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা যারা কোনোকালে রাজনীতি করে নি, তারা রাজধানী অচল করে দিয়ে সরকারকে বাধ্য করেছে তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে। একজন শিক্ষার্থীর গায়ে যদি পুলিশ হাত তুলতো কেউ আর সেই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। এখন এভাবে যে কেউ চাইলে দেশ অচল করে দিতে পারে, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেও সরকারবিরোধী শক্তি দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে। বেতন ভাতা দ্বিগুণ করে কোনোমতে সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে তাদেরকে। দুর্নীতি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকাংশেরই নৈতিকতা শেষ হয়ে গেছে, এটা তাদের কাছে কোনো অন্যায়ই নয়। এই প্রতিটি দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে দেশটি বর্তমানে কতটা ঠুনকো অবস্থায় আছে। বলা হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু নানা কারণে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কে অনেক অবনতি হয়েছে আমাদের, বাংলাদেশ রাশিয়াপন্থী হয়ে পড়েছে। এই মেরুবদলও দেশের জন্য অন্যতম হুমকি।
এগুলোই হচ্ছে সেই রোগ যা এদেশটিকে সিরিয়া-ইরাক বানিয়ে ফেলতে পারে যে কোনো সময়ে। তাই এখনো সময় আছে, এখনো যদি আমরা পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি, তাহলে এ রোগের নিরাময় হতে পারে। সেই নিরাময় হচ্ছে, দল-মত নির্বিশেষে ষোল কোটি মানুষকে দেশের স্বার্থে, অস্তিত্বের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এই ঐক্য হতে হবে অনৈক্যের বিরুদ্ধে। কী কী উপাদান দেশের বিপর্যয় ডেকে আনে তা পূর্বেই বলেছি- ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ, অপরাজনীতি, বৈদেশিক ষড়যন্ত্র।
আমরা যদি এই অপশক্তিগুলো বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই তাহলে আমরা শক্তিশালী একটি জাতিসত্ত্বায় পরিণত হবো। যদি কেউ ভাবে যে, ধর্মীয় চেতনাকে অস্বীকার করে দেশপ্রেমের বিভিন্ন চেতনায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করব তাহলে সেটা আর সম্ভব হবে না। কারণ দেশপ্রেম আর চেতনার নামে যে অনাচার আর হুজুগে বাণিজ্য হয়েছে এদেশের মানুষের কাছে ঐসব চেতনা তার গ্রহণযোগ্যতা আর আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইস্যু হচ্ছে ধর্ম। তাই ধর্মীয় চেতনাকে বিশুদ্ধ করে তা ধর্মব্যবসায়ীদের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। আমরা একটি দরিদ্র জাতি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে কোনো পরাশক্তির সামনে অস্ত্রধারণ করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। এখন একটাই বড় অস্ত্র আমাদের হতে পারে, তাহলো এই জাতিকে সীসার তৈরি প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ করে ফেলতে হবে। তারা প্রত্যেকে একেকজন সত্যের সৈনিকে পরিণত হবে। তারা ধর্মের অপব্যবহার দেখলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে। কেউ জাতিবিনাশী কোনো কাজ করতে গেলে জনগণই তাকে প্রতিহত করবে। এই যে জাতির জন্য কাজ করা এটাই যে প্রকৃত এবাদত, এই কাজ যারা করবে তারাই যে ধার্মিক এটা জাতির সামনে দলিল-প্রমাণ-যুক্তি ইত্যাদি দিয়ে তুলে ধরতে হবে। তাহলে তারা আর ধর্মব্যবসায়ীদের অন্ধ অনুসরণকে ধর্মজ্ঞান করবে না, ধর্মকে অনাবিলরূপে নতুন আলোয় জানবে। তারা এখনের মতো আত্মচিন্তায় গণ্ডিবদ্ধ থাকবে না। ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক খাতে নিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো চেতনাই এ জাতিকে রক্ষা করতে পারবে না– এ সত্যটি জাতির কর্ণধারেরা যত দ্রুত বুঝবেন ততই জাতি পরিত্রাণের দিকে অগ্রসর হবে। এটা করার জন্য যে আদর্শ দরকার তা আল্লাহর রহমে হেযবুত তওহীদকে আল্লাহ দান করেছেন। ধর্মবিশ্বাস আমাদের এত বৃহৎ একটি সম্পদ যা ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে মানুষের অকল্যাণে আর তাদের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। একে এখনই রোধ করতে হবে। পক্ষান্তরে যারা ধর্মপ্রাণ নয় কিন্তু মানবতার কল্যাণকামী তাদেরকেও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে, দেশের জন্য, নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ঐক্যবদ্ধ হবে।
এভাবে ষোল কোটি মানুষ যদি উল্লিখিত অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় তাহলে পৃথিবীর পরিস্থিতি যতই ঘোলাটে হোক, এদেশটিকে কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে পারবে না। আমরা এই ষোলো কোটি মানুষ বিশ্বের বুকে একমাত্র শান্তিময় দেশরূপে বিরাজ করব। সৃষ্টি করতে পারব সত্যিকার কল্যাণ রাষ্ট্রের উদাহরণ।