Monday, November 16, 2015

কোন দোয়া আল্লাহর নিকট বর্জনীয়

কোন দোয়া আল্লাহর নিকট বর্জনীয় 


রিয়াদুল হাসান:
বর্তমান মুসলিম নামধারী জনসংখ্যার একটি বিশেষ কাজ হচ্ছে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়া। এর ধর্মীয় নেতারা, আলেম, মাশায়েখরা এই দোয়া চাওয়াকে বর্তমানে একটি আর্টে, শিল্পে পরিণত করে ফেলেছেন। লম্বা ফর্দ ধরে লম্বা সময় নিয়ে আল্লাহর কাছে এরা দোয়া করতে থাকেন। যেন এদের দোয়া মোতাবেক কাজ করার জন্য আল্লাহ অপেক্ষা করে বসে আছেন। মাঝে মাঝে বিশেষ (ঝঢ়বপরধষ) দোয়া ও মোনাজাতেরও ডাক দেওয়া হয় এবং তাতে এত লম্বা সময় ধরে মোনাজাত করা হয় যে হাত তুলে রাখতে রাখতে মানুষের হাত ব্যথা হয়ে যায়। অজ্ঞানতা ও বিকৃত আকিদার কারণে এরা ভুলে গেছেন যে কোন জিনিসের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা না করে শুধু তাঁর কাছে চাইলেই তিনি তা দেন না, ওরকম দোয়া তাঁর কাছে পৌঁছে না। আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ নবী (সা.) তাঁর হাবিবকে যে কাজের ভার দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন সে কাজ সম্পন্ন করতে তাঁকে কি অপরিসীম পরিশ্রম করতে হয়েছে, কত অপমান-বিদ্রুপ-নির্যাতন-পীড়ন সহ্য করতে হয়েছে- যুদ্ধ করতে হয়েছে- আহত হতে হয়েছে। তিনি ওসব না করে আমাদের ধর্মীয় নেতাদের মতো বসে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই তো পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, কারণ তিনি জানতেন যে প্রচেষ্টা (আমল-জিহাদ) ছাড়া দোয়ার কোন দাম আল্লাহর কাছে নেই। সেই সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (সা.) দোয়া যে করেন নি তা নয়; তিনি করেছেন, কিন্তু যথা সময়ে করেছেন অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রচেষ্টার পর, সর্বরকম কোরবানীর পর, জান বাজি রাখার পর যখন আমলের আর কিছু বাকি নেই তখন। বদরের যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগের মহূর্তে যখন মুজাহিদ আসহাব তাদের প্রাণ আল্লাহ ও রসুলের তরে কোরবানী করার জন্য তৈরি হয়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন, যুদ্ধ আরম্ভ হবার প্রাক্কালে, শুধু সেই সময় আল্লাহর হাবিব আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন তাঁর প্রভুর সাহায্য চেয়ে। ঐ দোয়ার পেছনে কী ছিল? ঐ দোয়ার পেছনে ছিল আল্লাহর নবীর (সা.) চৌদ্দ বছরের অক্লান্ত সাধনা, সীমাহীন কোরবানী, মাতৃভূমি ত্যাগ করে দেশত্যাগী হয়ে যাওয়া, পবিত্র দেহের রক্তপাত ও আরও বহু কিছু এবং শুধু তাঁর একার নয়, তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে ছিল তাঁদের আদর্শকে, দীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা, দ্বিধাহীন কোরবানী, নির্মম নির্যাতন সহ্য করা। প্রচেষ্টার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শেষ সম্বল প্রাণটুকু দেবার জন্য তৈরি হয়ে ঐ দোয়া করেছিলেন মহানবী (সা.)। ঐ রকম দোয়া আল্লাহ শোনেন, কবুল করেন, যেমন করেছিলেন বদরে। বদরের ঐ দোয়ার পর সকলে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, অনেকে জান দিয়েছিলেন; আর আমাদের ধর্মীয় নেতারা দোয়ার পর পোলাও কোর্মা খেতে যান। ঐ দোয়া ও এই দোয়া আসমান জমিনের তফাৎ।
আল্লাহ বলেছেন, “যে যতখানি চেষ্টা করবে তার বেশি তাকে দেয়া হবে না (কোর’আন, সুরা নজম, আয়াত-৩৯)।”
আমাদের দোয়া শিল্পীরা, আর্টিস্টরা লক্ষ লক্ষ লোকের এজতেমা, মাহফিলে দোয়া করেন- হে আল্লাহ! তুমি বায়তুল মোকাদ্দাস ইহুদিদের হাত থেকে উদ্ধার করে দাও এবং এ দোয়া করে যাচ্ছেন ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম থেকে, ঐ সময়ে যখন দোয়া করা শুরু করেছিলেন তখন দোয়াকারীরা আজকের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম ছিলেন এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তনও এখনকার চেয়ে অনেক ছোট ছিল। যেরুজালেম ও মসজিদে আকসা তখন ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই মহা মুসলিমদের প্রচেষ্টাহীন, আমলহীন দোয়া যতই বেশি লোকের সমাবেশে এবং যতই বেশি লম্বা সময় ধরে হতে লাগলো ইহুদিদের হাতে আরবরা ততই বেশি মার খেতে লাগলো আর ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তনও ততই বাড়তে লাগলো। আজ শুনি কোন জায়গায় নাকি ২০/২৫ লক্ষ মুসলিম একত্র হয়ে আসমানের দিকে দু’হাত তুলে দুনিয়ার মুসলিমের ঐক্য, উন্নতি ইত্যাদির সাথে তাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসের মুক্তির জন্য দোয়া করে। আর আজ ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তন প্রথম অবস্থার চেয়ে তিন গুণ বড় এবং পূর্ণ যেরুজালেম শহর বায়তুল মোকাদ্দাসসহ মসজিদে আকসা তাদের দখলে চলে গেছে এবং মুসলিম জাতির ঐক্যের আরও অবনতি হয়েছে এবং বর্তমান খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের হাতে আরও অপমানজনক মার খাচ্ছে। অর্থাৎ এক কথায় এরা এই বিরাট বিরাট মাহফিলে, এজতেমায়, মসজিদে, সম্মেলনে যা যা দোয়া করছেন, আল্লাহ তার ঠিক উল্টোটা করছেন। যত বেশি দোয়া হচ্ছে, তত উল্টো ফল হচ্ছে। সবচেয়ে হাস্যকর হয় যখন এই অতি মুসলিমরা গৎ বাঁধা দোয়া করতে করতে ‘ফানসুরনা আলাল কওমিল কাফিরিন’-এ আসেন। অর্থ হচ্ছে “হে আল্লাহ! অবিশ্বাসীদের (কাফেরদের) বিরুদ্ধে (সংগ্রামে) আমাদের সাহায্য কর (সুরা বাকারা-২৮৬)।” আল্লাহর সাথে কি বিদ্রুপ। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লেশমাত্র নেই, দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নেই, পৃথিবীর দু’চার জায়গায় কাফের মুশরিকদের সঙ্গে যা কিছু সংগ্রাম চলছে তাতে যোগ দেয়া দূরের কথা, তাতে কোন সাহায্য পর্যন্ত দেয়ার চেষ্টা নেই, শুধু তাই নয় গায়রুল্লাহর, মানবরচিত জীবনব্যবস্থা জাতীয় জীবনে গ্রহণ করে নিজেরা যে শিরক ও কুফরীর মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছেন, এমন কি তার বিরুদ্ধে যেখানে সংগ্রাম নেই সেখানে কুফরের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে? এ শুধু হাস্যকর নয়, আল্লাহর সাথে বিদ্রƒপও। তা না হলে দোয়ার উল্টো ফল হচ্ছে কেন? যারা দোয়া করাকে আর্টে পরিণত করে, কর্মহীন, প্রচেষ্টাহীন, আমলহীন, কোরবানীহীন, সংগ্রামহীন দোয়া করছেন তারা তাদের অজ্ঞতায় বুঝছেন না যে তারা তাদের ঐ দোয়ায় আল্লাহর ক্রোধ উদ্দীপ্ত করছেন, আর তাই দোয়ার ফল হচ্ছে উল্টো। তাই বলছি ঐ দোয়া করার চেয়ে দোয়া না করা নিরাপদ।

দেশ সমাজ ও জাতি গঠনে গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রের ভূমিকা

দেশ সমাজ ও জাতি গঠনে গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রের ভূমিকা

 অপরিসীম। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একটি জাতির প্রকৃত চরিত্র প্রতিফলিত হয়। সেই সাথে জাতির চরিত্রের উপরও চলচ্চিত্র বিশেষ প্রভাব ফেলে। কিন্তু বর্তমানে নাটক, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও সাহিত্যের মাধ্যমে অসত্য, অশ্লীল কিছু কার্যক্রম এই মাধ্যমটিকে সমাজ ও ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এ সব অশ্লীলতার কারণে ধর্মাশ্রয়ী একটি শ্রেণি সঙ্গীত, সুর নৃত্যকে নাজায়েজ জ্ঞান করছে।
.
ভাবতেও অবাক লাগে, প্রকৃত ইসলামের যুগে যে মুসলিমরা দুর্দান্ত গতিতে অর্ধ পৃথিবী জয় করে সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করল; ধনে, জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, শিক্ষায়, সামরিক শক্তিতে সকল ক্ষেত্রে সবার ঊর্ধ্বে আরোহণ করল; সেই জাতি আজ সকল জাতির গোলামে পরিণত হয়ে অন্য জাতিগুলির দ্বারা অপমানিত, লাঞ্ছিত হচ্ছে। এই অপমান, লাঞ্ছনা থেকে পরিত্রাণের উপায় না খুঁজে তারা আজ অতি তুচ্ছ বিষয়গুলি নিয়ে জায়েজ, না’জায়েজের ফতোয়াবাজীতে ব্যস্ত; কূপমণ্ডূকতার গহ্বরে বসে প্রশ্ন করে, টিভি দেখা, ছবি তোলা, গান-বাজনা করা জায়েজ না না’জায়েজ। কী পরিহাস!
.
প্রকৃতপক্ষে ইসলাম কোনো সত্য ও সুন্দর, মানুষের সুকোমল বৃত্তি, প্রতিভা, সুর, সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক ইত্যাদিকে অবৈধ বলে না। অবৈধ হচ্ছে অসত্য, অশ্লীলতা এবং স্রষ্টার অবাধ্যতা। কোনো ধর্মই এসবকে নাজায়েজ করতে পারে না। কেননা স্বয়ং স্রষ্টাই সুর ও নৃত্য সৃষ্টি করেছেন। শেষ প্রেরিত গ্রন্থ আল কোর’আনকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন ছন্দবদ্ধ করে। কেবল কোর’আন নয়, যবুর, গীতা, পুরান, ত্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থও আল্লাহ পাঠিয়েছেন কাব্যময় করে। গীতা শব্দের অর্থই তো গান।
.
নৃত্য হচ্ছে শৃঙ্খলার অনুপম নিদর্শন। পাখি আকাশে ওড়ে- তাদের মধ্যে বিরাজ করে শৃঙ্খলা। পাখির দল যে দিকে ওড়ে এক সাথেই ওড়ে, দলপতির অনুসরণ করে সামনে যায়, ডানে বাঁয়ে ঘুরে ঘুরে উপরে উঠে, নিচে নামে- সব করে একতালে। পাখির কণ্ঠে তিনিই সুর ও সঙ্গীত দান করেছেন। সাগরের ঢেউয়েও আছে অপরূপ নৃত্য। সবুজ মাঠে ধানের শীষ যখন আন্দোলিত হয়- তাতেও দেখা যায় এক অপরূপ নৃত্যের নিদর্শন।
.
আযান ইসলামের এক অনন্য সঙ্গীত। সুতরাং যিনি সুরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সেই সুরকে নাজায়েজ করতে পারেন না। কিন্তু আজ পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের অনুসারী আত্মাহীন, নৈতিকতাহীন একদল মানুষ সুর সঙ্গীত ও নৃত্যকলাকে কলুষিত করছে। নাচ, গান, বাদ্যযন্ত্র, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য নির্মাণ ইত্যাদি সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড ও শিল্পকলা আল্লাহ কোথাও নিষেধ করেন নি।
.
সুতরাং মানুষ যত খুশি গান গাইতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পারে, কেউ বিকৃত ফতোয়ার চোখ রাঙানিতে তার সৃষ্টিশীলতার পথ রুদ্ধ করতে পারে না। প্রকৃত ইসলামের সময় এই সমস্ত ফতোয়াবাজি ছিল না। একটি সরল সত্য হলো, ইসলামের বৈধ-অবৈধ নির্ধারণের বেলায় মানদণ্ড হচ্ছে আল্লাহর আদেশ এবং নিষেধ অর্থাৎ আল-কোর’আন। রসুলাল্লাহ জানতেন যে, তাঁর বাণীকে ভবিষ্যতে বিকৃত করা হবে, অনেক বৈধ বিষয়কে অবৈধ ঘোষণার জন্য সেটিকে তাঁর উক্তি বলে চালিয়ে দেওয়া হবে, তাই তিনি বলে গেছেন, আমি তোমাদের জন্য সেটাই হালাল করেছি যেটা আল্লাহ হালাল করেছেন, সেটাই হারাম করেছি যেটা আল্লাহ হারাম করেছেন। তিনি আরও বলেন, আমার কোনো কথা কোর’আনের বিধানকে রদ করবে না, তবে কোর’আনের বিধান আমার কথাকে রদ করবে (হাদীস)।
.
সুতরাং যে কোনো জিনিস হারাম কিনা তা জানার জন্য আমাদেরকে আল্লাহর কেতাব দেখতে হবে। কোর’আনে যা কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেগুলি ছাড়া আর সবই বৈধ। এখন কোর’আন খুলে দেখুন গান, বাদ্যযন্ত্র, কবিতা, চলচ্চিত্র, নাট্যকলা, অভিনয়, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন, ভাষ্কর্য্য নির্মাণ ইত্যাদি আল্লাহ হারাম করেছেন কিনা? যদি না করে থাকেন তাহলে এগুলি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আল্লাহ যেটিকে বৈধ করেছেন, সেটিকে কোনো আলেম, মুফতি, ফকীহ, মোফাসসের হারাম করার অধিকার রাখেন না।
.
আমরা অতীতের দিকে তাকালে দেখতে পাই রসুলের আনীত ইসলাম অর্ধদুনিয়ায় কায়েমের ফলে পরবর্তী মুসলিম জাতিটি সর্বদিক দিয়ে পৃথিবীর শিক্ষকের আসনে আসীন হন। কি সঙ্গীত, কি কাব্য, কি নতুন নতুন সুর রচনায়- কোথায় নেই তারা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সুন্দর সুন্দর কবিতা, গান লিখে গেছেন। সেসব আজও সমাদৃত। যারা সঙ্গীতকে নাজায়েজ মনে করেন তারাও ওয়াজের মধ্যে কবি সাহিত্যিকদের সুর ছন্দ নির্দ্বীধায় ব্যবহার করেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আজকে সঙ্গীত বৈধ কি অবৈধ, নৃত্য বৈধ কি অবৈধ তার প্রশ্ন উঠছে।
.
এর কারণ হচ্ছে জাতি গঠনে এগুলো আজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈতিক পদস্খলনের হাতিয়ারে এসব পরিণত হচ্ছে। কাব্যের নামে, নৃত্যের নামে আজ অশ্লীলতা, বেহায়াপনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে- যে কোন কিছুর সাথেই হোক অশ্লীলতা, বেহায়াপনা- যা মানুষের ক্ষতি করে তাকে কোন ধর্মই বৈধতা দিতে পারে না। অশ্লীলতার প্রসারে সমাজে কীভাবে অপরাধ বৃদ্ধি পায় তা প্রত্যক্ষ করে ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশেও অশ্লীলতা-বিরোধী উদ্যোগ নিচ্ছে, আইন-পাশ করছে।
.
আশা করি কোন সুস্থ মানুষই গণমাধ্যম তথা চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, সাহিত্যের এই নেতিবাচক দিকটিকে অস্বীকার করতে পারবেন না। তাই বলে কাব্যকে, সঙ্গীতকে, নৃত্যকে, সাহিত্যকেই একচেটিয়াভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতার সামিল। মাথায় ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা কোন সমাধান নয়, বরং সঠিক চিকিৎসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যারা এই সব নাজায়েজ বলে ফতোয়া দিয়ে জাতির সকল চিন্তাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে চায় তারা কিন্তু সবচাইতে নাজায়েজ অর্থাৎ অবৈধ কাজটিই করছে, আর তা হলো ধর্মকে নিয়ে ব্যাবসা, যা আল্লাহ সরাসরি আগুন খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন (সুরা বাকারা- ১৭৪)। নামাজ পড়িয়ে, তারাবীহ পড়িয়ে, মুর্দা দাফন করে, ওয়াজ করে, মিলাদ পড়িয়ে ধর্মের নামে আরও বিভিন্ন কায়দায় ব্যাবসা করছে, এটা কিন্তু সবচাইতে বড় অবৈধ কাজ।
.
আমাদের মনে রাখতে হবে একই সুরে, একই কবিতায় আমরা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মহিমা প্রচার করতে পারি, সমাজে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে পারি- আবার সেই সুর দিয়ে, সেই কথা দিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যও করতে পারি। ভাল কি মন্দ তা নির্ভর করে এর ফল ব্যবহার এবং ফল কী দাঁড়াচ্ছে এর উপর। একটি বন্দুক দিয়ে আপনি ডাকাতকে প্রতিরোধ করতে পারেন আবার সেই বন্দুক দিয়ে নিরীহ মানুষকে খুনও করতে পারেন। বন্দুক এখানে শুধু একটা মাধ্যম। এটি দিয়ে কি করা হচ্ছে- ভালো করা হচ্ছে না কি মন্দ করা হচ্ছে তা-ই বিবেচ্য বিষয়। তেমনি সঙ্গীতে আপনি সুন্দর সমাজ গঠনের কথা বলবেন, ভালো কাজকে উৎসাহ দিবেন- নাকি বেহায়াপনা করবেন, না কি অশ্লীলতার বিস্তার ঘটাবেন সেটাই বিচার্য। সাহিত্যে আপনি সমাজ সংস্কার করবেন নাকি, মানুষকে অরাজকতা করতে উষ্কে দিবেন, মানুষকে স্রষ্টামুখী করবেন, নাকি মানুষকে স্রষ্টাবিমুখ করবেন- এটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মানুষ হিসেবে সকলের উচিত চলচ্চিত্র, নাটক, গান, সাহিত্যের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য ও সুন্দরকে তুলে ধরা।
__________রাকীব আল হাসান

Sunday, November 15, 2015

ওবামাই আইএস সৃষ্টি করেছেন: রিক স্যান্টোরাম

আইএসআইএল বা আইএস সৃষ্টির জন্য বারাক ওবামাকে দায়ী করেছেন আমেরিকার সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রিক স্যান্টোরাম। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ হামলার দায় আইএস স্বীকার করার পর এ মন্তব্য করলেন রিপাবলিকান দলের এই নেতা।
rick santorum
শুক্রবার রাতের ওই হামলায় প্যারিসের ছয়টি স্থানে একযোগে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় এখন পর্যন্ত ১২৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছে প্রায় ৩৫২ জন। বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসে এটাই সবচেয়ে বড় হামলা। হামলার পর দায় স্বীকার করে বিবৃতি পরদান করেছে আইএস।
এদিকে শনিবার আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ওরল্যান্ডোতে রিপাবলিকান দলের এক সভায় সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী স্যান্টোরাম বলেন, সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আইএস সৃষ্টির জন্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন দায়ী। তিনি দাবি করেন, মার্কিন জেনারেল ও সামরিক উপদেষ্টাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে হিলারি ও ওবামা এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সৃষ্টি করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এই আইএস সৃষ্টির মাধ্যমে ওবামা ও হিলারি আমাদের দেশের নিরাপত্তা এবং বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছেন।

কোন দোয়া আল্লাহর নিকট বর্জনীয়

কোন দোয়া আল্লাহর নিকট বর্জনীয়

 0

রিয়াদুল হাসান:
বর্তমান মুসলিম নামধারী জনসংখ্যার একটি বিশেষ কাজ হচ্ছে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়া। এর ধর্মীয় নেতারা, আলেম, মাশায়েখরা এই দোয়া চাওয়াকে বর্তমানে একটি আর্টে, শিল্পে পরিণত করে ফেলেছেন। লম্বা ফর্দ ধরে লম্বা সময় নিয়ে আল্লাহর কাছে এরা দোয়া করতে থাকেন। যেন এদের দোয়া মোতাবেক কাজ করার জন্য আল্লাহ অপেক্ষা করে বসে আছেন। মাঝে মাঝে বিশেষ (ঝঢ়বপরধষ) দোয়া ও মোনাজাতেরও ডাক দেওয়া হয় এবং তাতে এত লম্বা সময় ধরে মোনাজাত করা হয় যে হাত তুলে রাখতে রাখতে মানুষের হাত ব্যথা হয়ে যায়। অজ্ঞানতা ও বিকৃত আকিদার কারণে এরা ভুলে গেছেন যে কোন জিনিসের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা না করে শুধু তাঁর কাছে চাইলেই তিনি তা দেন না, ওরকম দোয়া তাঁর কাছে পৌঁছে না। আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ নবী (সা.) তাঁর হাবিবকে যে কাজের ভার দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন সে কাজ সম্পন্ন করতে তাঁকে কি অপরিসীম পরিশ্রম করতে হয়েছে, কত অপমান-বিদ্রুপ-নির্যাতন-পীড়ন সহ্য করতে হয়েছে- যুদ্ধ করতে হয়েছে- আহত হতে হয়েছে। তিনি ওসব না করে আমাদের ধর্মীয় নেতাদের মতো বসে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই তো পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, কারণ তিনি জানতেন যে প্রচেষ্টা (আমল-জিহাদ) ছাড়া দোয়ার কোন দাম আল্লাহর কাছে নেই। সেই সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (সা.) দোয়া যে করেন নি তা নয়; তিনি করেছেন, কিন্তু যথা সময়ে করেছেন অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রচেষ্টার পর, সর্বরকম কোরবানীর পর, জান বাজি রাখার পর যখন আমলের আর কিছু বাকি নেই তখন। বদরের যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগের মহূর্তে যখন মুজাহিদ আসহাব তাদের প্রাণ আল্লাহ ও রসুলের তরে কোরবানী করার জন্য তৈরি হয়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন, যুদ্ধ আরম্ভ হবার প্রাক্কালে, শুধু সেই সময় আল্লাহর হাবিব আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন তাঁর প্রভুর সাহায্য চেয়ে। ঐ দোয়ার পেছনে কী ছিল? ঐ দোয়ার পেছনে ছিল আল্লাহর নবীর (সা.) চৌদ্দ বছরের অক্লান্ত সাধনা, সীমাহীন কোরবানী, মাতৃভূমি ত্যাগ করে দেশত্যাগী হয়ে যাওয়া, পবিত্র দেহের রক্তপাত ও আরও বহু কিছু এবং শুধু তাঁর একার নয়, তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে ছিল তাঁদের আদর্শকে, দীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা, দ্বিধাহীন কোরবানী, নির্মম নির্যাতন সহ্য করা। প্রচেষ্টার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শেষ সম্বল প্রাণটুকু দেবার জন্য তৈরি হয়ে ঐ দোয়া করেছিলেন মহানবী (সা.)। ঐ রকম দোয়া আল্লাহ শোনেন, কবুল করেন, যেমন করেছিলেন বদরে। বদরের ঐ দোয়ার পর সকলে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, অনেকে জান দিয়েছিলেন; আর আমাদের ধর্মীয় নেতারা দোয়ার পর পোলাও কোর্মা খেতে যান। ঐ দোয়া ও এই দোয়া আসমান জমিনের তফাৎ।
আল্লাহ বলেছেন, “যে যতখানি চেষ্টা করবে তার বেশি তাকে দেয়া হবে না (কোর’আন, সুরা নজম, আয়াত-৩৯)।”
আমাদের দোয়া শিল্পীরা, আর্টিস্টরা লক্ষ লক্ষ লোকের এজতেমা, মাহফিলে দোয়া করেন- হে আল্লাহ! তুমি বায়তুল মোকাদ্দাস ইহুদিদের হাত থেকে উদ্ধার করে দাও এবং এ দোয়া করে যাচ্ছেন ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম থেকে, ঐ সময়ে যখন দোয়া করা শুরু করেছিলেন তখন দোয়াকারীরা আজকের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম ছিলেন এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তনও এখনকার চেয়ে অনেক ছোট ছিল। যেরুজালেম ও মসজিদে আকসা তখন ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই মহা মুসলিমদের প্রচেষ্টাহীন, আমলহীন দোয়া যতই বেশি লোকের সমাবেশে এবং যতই বেশি লম্বা সময় ধরে হতে লাগলো ইহুদিদের হাতে আরবরা ততই বেশি মার খেতে লাগলো আর ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তনও ততই বাড়তে লাগলো। আজ শুনি কোন জায়গায় নাকি ২০/২৫ লক্ষ মুসলিম একত্র হয়ে আসমানের দিকে দু’হাত তুলে দুনিয়ার মুসলিমের ঐক্য, উন্নতি ইত্যাদির সাথে তাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসের মুক্তির জন্য দোয়া করে। আর আজ ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তন প্রথম অবস্থার চেয়ে তিন গুণ বড় এবং পূর্ণ যেরুজালেম শহর বায়তুল মোকাদ্দাসসহ মসজিদে আকসা তাদের দখলে চলে গেছে এবং মুসলিম জাতির ঐক্যের আরও অবনতি হয়েছে এবং বর্তমান খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের হাতে আরও অপমানজনক মার খাচ্ছে। অর্থাৎ এক কথায় এরা এই বিরাট বিরাট মাহফিলে, এজতেমায়, মসজিদে, সম্মেলনে যা যা দোয়া করছেন, আল্লাহ তার ঠিক উল্টোটা করছেন। যত বেশি দোয়া হচ্ছে, তত উল্টো ফল হচ্ছে। সবচেয়ে হাস্যকর হয় যখন এই অতি মুসলিমরা গৎ বাঁধা দোয়া করতে করতে ‘ফানসুরনা আলাল কওমিল কাফিরিন’-এ আসেন। অর্থ হচ্ছে “হে আল্লাহ! অবিশ্বাসীদের (কাফেরদের) বিরুদ্ধে (সংগ্রামে) আমাদের সাহায্য কর (সুরা বাকারা-২৮৬)।” আল্লাহর সাথে কি বিদ্রুপ। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লেশমাত্র নেই, দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নেই, পৃথিবীর দু’চার জায়গায় কাফের মুশরিকদের সঙ্গে যা কিছু সংগ্রাম চলছে তাতে যোগ দেয়া দূরের কথা, তাতে কোন সাহায্য পর্যন্ত দেয়ার চেষ্টা নেই, শুধু তাই নয় গায়রুল্লাহর, মানবরচিত জীবনব্যবস্থা জাতীয় জীবনে গ্রহণ করে নিজেরা যে শিরক ও কুফরীর মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছেন, এমন কি তার বিরুদ্ধে যেখানে সংগ্রাম নেই সেখানে কুফরের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে? এ শুধু হাস্যকর নয়, আল্লাহর সাথে বিদ্রƒপও। তা না হলে দোয়ার উল্টো ফল হচ্ছে কেন? যারা দোয়া করাকে আর্টে পরিণত করে, কর্মহীন, প্রচেষ্টাহীন, আমলহীন, কোরবানীহীন, সংগ্রামহীন দোয়া করছেন তারা তাদের অজ্ঞতায় বুঝছেন না যে তারা তাদের ঐ দোয়ায় আল্লাহর ক্রোধ উদ্দীপ্ত করছেন, আর তাই দোয়ার ফল হচ্ছে উল্টো। তাই বলছি ঐ দোয়া করার চেয়ে দোয়া না করা নিরাপদ।

মহাভারতের কথা: ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?




মহাভারতের কথা: ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?

 0


রাকীব আল হাসান:
—————–
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে শুধু মুসলিমই নয় বিরাট একটা জনসংখ্যা সনাতন ধর্মের অনুসারীও রয়েছেন। কাজেই এখানে তাদের উদ্দেশ্যে সনাতন ধর্মগ্রন্থ মহাভারত থেকে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, বলিদান বা কোরবানির মাহাত্ম কী, মানুষের প্রকৃত ধর্ম কী হওয়া উচিত ইত্যাদি প্রসঙ্গে অবতার শ্রীকৃষ্ণের (অনেকেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন) অমীয় বাণী থেকে কিছু কথা সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিণতি কী হবে সেটা জানতে চাইলে মহারানী দ্রৌপদীকে অবতার শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যুদ্ধ তো সর্বদাই বিনাশ আনে, রণভূমিতে পীড়া আর দুঃখই জন্ম নেয়। তুমি কেমন করে ভেবে নিলে যে, তোমার জন্য সুখ থাকবে সেখানে? হ্যাঁ তোমার পঞ্চ স্বামী ব্যতীত মহারাজ শান্তনুর বংশের সমগ্র প্রদীপ নিভে যাবে, সমগ্র বংশের নাশ হয়ে যাবে এই যুদ্ধে। তখন মহারানী দ্রৌপদী জিজ্ঞাসা করেন, মহারাজ শান্তনুর সমগ্র বংশের নাশ হয়ে যাবে? আমাদের সন্তানেরা সংঘর্ষের সময় যাদের স্মরণ করে আমরা শক্তি পেয়েছি, যাদের জন্ম আমাদের নতুন রূপে জন্ম দিয়েছিল, তাদের মৃত্যু হয়ে যাবে? অর্থাৎ প্রতিদিন অদম্য উৎসাহে যে যুদ্ধের জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি, সেকি নিজেদের সন্তানের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছি? তখন তার উত্তরে অবতার শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মানুষ জীবনের প্রত্যেক ক্ষণে মৃত্যুর দিকেই পা বাড়ায়। বাস্তবে সে যা করে তাকি মৃত্যুর জন্যই করে না? বসন্তে বিকশিত প্রত্যেক পত্র কি হেমন্তে ঝরে যাওয়ার জন্যই বিকশিত হয় না? তাহলে তার বিকাশ লাভ, সূর্যকিরণ পান করা আর বায়ুতে আন্দোলিত হয়ে মধুর ধ্বনি উৎপন্ন করা- সবই কি ব্যর্থ? ঘুর্ণিঝড় যখন বৃক্ষকে আন্দোলিত করে তখন সেই বৃক্ষের প্রত্যেক পাতা সমস্ত শক্তি লাগিয়ে সেই বৃক্ষের সাথে লেগে থাকার প্রয়াস করে। আর যখন পিত বর্ণ ধারণ করে তখন শুকিয়ে ঝরে যায়। সৃষ্টিও এক বিশাল বৃক্ষ, আর প্রত্যেক মানুষ, প্রত্যেক পশু-পক্ষী এই বৃক্ষের উদ্গোমিত ও মোচনপ্রাপ্ত পত্র স্বরূপ। পত্র মোচন অনিবার্য। কিন্তু যতক্ষণ সে বৃক্ষে লেগে থাকে ততক্ষণ সংঘর্ষ ও শান্তি দুইয়ের আনন্দ নেওয়া আবশ্যক। (মহারানী দ্রৌপদী- আমি কোনো আনন্দ দেখতে পাচ্ছি না গোবিন্দ) কারণ তুমি মোহজালে আবদ্ধ। (মহারানী দ্রৌপদী- হ্যাঁ, আমি মোহজালে আবদ্ধ। এই যুদ্ধে আমাদের যদি বিজয় প্রাপ্তিও হয় তবুও আমার তো কোনো সুখ প্রাপ্তি হবে না।) সুখের জন্য যুদ্ধ করার কথা কখন বলেছি আমি? সম্মান প্রাপ্তি, প্রতিশোধ এসবের জন্য যুদ্ধ করার পরামর্শ কবে দিয়েছি আমি? এ যুদ্ধ তো সমাজের সুখের জন্য করতে হবে। অধর্মের নাশ করার জন্য আর ধর্মের স্থাপনা করার জন্য আমাদের এ যুদ্ধ করতেই হবে। (মহারানী দ্রৌপদী- এত বড় বলিদান আমাকেই কেন দিতে হবে গবিন্দ।) শোন শখি, মনুষ্য সমাজ কর্তৃক প্রস্তুত নীতি, আদর্শ ও ধর্ম এ তিন সমুদ্র তটে নির্মিত বালুকণার ভবনের ন্যায়। সময়ের ঝাপটাই নিরন্তর ভাঙতে থাকে, এর নিরন্তর নির্মাণ করতে হয়, অন্যথা নীতি, আদর্শ ও ধর্ম এ সমস্তই নাশ হয়ে যায়। কিছু মানুষকে ঈশ্বর এই শক্তি দেন যে ধর্মের পুনস্থাপনা করতে পারে। আর যার কাছে সে শক্তি থাকে সে নিজের সমস্ত বলিদান দিয়েও ধর্মের জন্য সংঘর্ষ করতে থাকে। সে ভগবান রামচন্দ্রই হোন আর ভগবান পরশুরামই হোন অথবা বিষ্ণুর বামন অবতার- ধর্মের পুনঃস্থাপন করার জন্য সংঘর্ষকারীরই পূজা করে এই সংসার। একটা কথা জেনে রাখ শখি। ধর্মের জন্য সংঘর্ষ করা কারো কর্তব্য নয়, এ এক সিদ্ধান্ত, এক সংকল্প মাত্র। তোমার জন্যও যুদ্ধ কোনো কর্তব্য নয়। সমাজের কারণে কৃত এক সংকল্প মাত্র। তুমি যখন ইচ্ছে এ সংকল্প পরিত্যাগ করতে পার। কদাপি তুমি পতি, পুত্র, পৌত্র, আদির সুখ পেয়েই যাবে। কিন্তু কটি কটি মানুষের ন্যায় সময়ের প্রবাহে তলিয়ে যাবে, তোমার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে। তোমার কারণে কারোর কোনো লাভ প্রাপ্তি হবে না। ঈশ্বর তোমাকে যে বিশেষ শক্তি দান করেছেন সেই ঈশ্বরের বিশ্বাস ভঙ্গ হবে। সিদ্ধান্ত তুমি নাও সখি।
সংসারে যখন দুঃখ বৃদ্ধি পায়, সংসারে স্বল্প মানুষ সুখ অনুভব করে আর অধিকতর মানুষ দুঃখ অনুভব করে তখন সংসার রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরূপ সময় সেই রোগের নিরাময় করতেই হয়। নিজে নিজেকে বলিদান দিয়েও অধর্মের বিনাশ করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। এরূপ সময় না সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ আর না প্রেম গুরুত্বপূর্ণ। না তো স্বার্থ দেখতে হয় আর না সুখের আশা করতে হয়। এইরূপই সময় এখন আপনাদের সবার সামনে। সিদ্ধান্ত আপনাদের সবার। ফলের স্বাদ বৃক্ষের প্রাপ্তি হয় না, কদাচিৎ সেইরূপে এই বলিদান থেকে আপনাদের লাভ নাও হতে পারে। নিজের হৃদয়ে উকি দাও, এতটা করুণা কি রয়েছে ওখানে, এতটাই কি ধর্ম রয়েছে আত্মায় যে, সমগ্র সমাজের জন্য নিজের বলিদান নিশ্চিত করতে পার। এই বিষয়ে আপনারা সবাই চিন্তা করুন।
দান তাকেই বলে যাতে দানী হারায় আর যাচক প্রাপ্তিলাভ করে কিন্তু বলিদান (এই অর্থে ইসলাম ধর্মে বলিদানকেই কোরবানি বলে) সেটাই হয় যা দানী দেয় আর সমগ্র জগৎ প্রাপ্ত করে।
পাপ ও পুণ্যের দুই রূপ, মালার ন্যায় থাকে। যে প্রকার একটি মুক্তা তার পরের মুক্তাকে আকর্ষণ করে ঠিক সেইরূপ এক পুণ্য অপর পুণ্যের সৃষ্টি করে আর এক পাপ অবশ্যই অপর পাপ করায়। পাপ মানুষের অহংকারকে সুখ প্রদান করে। মানুষকে স্বয়ং দ্বিতীয় পাপ করা থেকে তখনই রক্ষা করা যায় যখন ঐ পাপ ভয়াবহ ফল দেয়। কিন্তু অহংকারে অন্ধ মানুষ সেই ফল দেখতেই পায় না। অধর্ম ও অপরাধের পরম্পরা নির্মিত করতেই থাকে। সমাজ কত বঞ্চনা, কত ছল, কত অপরাধ সহ্য করতে পারে, কত অপরাধকে ক্ষমা প্রদান করতে পারে এর নির্ণয় সমাজই করে থাকে। আর সমাজে যার কাছে দণ্ড দেওয়ার শক্তি থাকে তাকে সেই নির্ণয় করতে হয়। (পঞ্চপাণ্ডবের এক পুত্র প্রতিবিন্দের এক প্রশ্নের জবাবে কৃষ্ণের বাবা-মা সম্পর্কে) প্রথম বালকের মৃত্যুর পর মাতা দেবকী ও পিতা বাসুদেবের মুখে কখনো হাসি আসে নি। বাস্তবে এই বালকদের বলি প্রদান করা হয় নি পুত্র, অধর্মের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ওরা বীরগতি (ইসলাম ধর্মে- ধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গকে শাহাদাত বলে) প্রাপ্ত হয়েছে। বলিদান তো আমার মাতা আর পিতার সুখের হয়েছিল। (কিন্তু এত বড় বলিদান কেন, সূতকর্মের এমন প্রশ্নের উত্তরে) পুত্র সূতকর্ম, ধর্মের স্থাপনা করার প্রয়াসকারীর মর্যাদা কিরূপ হয় জান তুমি? পাপীদের পাপের মর্যাদাই তাদের বলিদানের মর্যাদা। অর্থাৎ পাপী ও পাপ সম্পূর্ণ বিনষ্ট না হয় ততদিন ধর্মপ্রিয় মানুষদের বলিদান কী প্রকারে পূর্ণ হতে পারে?

প্যারিস হামলার পেছনে তিনটি দল জড়িত ছিল

প্যারিস হামলার পেছনে তিনটি দল জড়িত ছিল বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের তদন্তকারীরা। তারা আলাদাভাবে হামলা করেছে, বলছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
অন্তত একজন হামলাকারীর পরিচয় পেয়েছে ফরাসি পুলিশ। সে প্যারিসেরই একটি শহরতলীর বাসিন্দা, যার বিরুদ্ধে আগেও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। আরেকজন হামলাকারীর কাছে সিরিয়ার পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। ওমর ইসমাইল মোস্তফা নামের ওই হামলাকারীর স্বজনদের আটক করেছে পুলিশ। তার বাড়িতেও তল্লাশী চালানো হয়েছে। প্রসিকিউটর ফাঁসোয়া মোলিস বলেন, তারা কিভাবে এবং কোন খান থেকে এসেছেন, তাদের কারা অর্থ দিয়েছে, সেগুলো আমরা খুঁজে বের করব।
প্রসিকিউটর বলছেন, ওই হামলায় নিহত সাতজন ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিলেন।
এদিকে, শনিবার ভোরে সীমান্ত অতিক্রমের সময় তিনজন ফরাসি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে বেলজিয়াম পুলিশ। প্যারিস হামলার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটা যাচাই করছে বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ।
এদের অন্তত একজন শুক্রবার সন্ধ্যায় প্যারিসে ছিলেন বলে বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। হামলার পর প্যারিসে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে
শুক্রবারের ওই হামলায় ১২৯জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩৫০জন। এই সন্ত্রাসী হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে ইসলামিক স্টেট। , বাটাক্লাঁ কনসার্ট হলের কাছাকাছি বেলজিয়ামের লাইসেন্স প্লেট রয়েছে এমন একটি ভক্সওয়াগন পোলো গাড়ি দেখা যাওয়ার পর অভিযান শুরু করেছে বেলজিয়ামের পুলিশ।
বেলজিয়ামে বসবাসকারী একজন ফরাসি নাগরিক ওই গাড়িটি ভাড়া করেছিলেন। কিন্তু অন্য একটি গাড়িতে করে শনিবার ভোরে সীমান্ত অতিক্রমের সময় তাকে আটক করে বেলজিয়াম পুলিশ। হামলার পর শুক্রবারই ফ্রান্সে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার প্যারিসে কারফিউ জারি করা হয়েছে, বন্ধ করা হয়েছে সীমান্ত। হামলার পর ফ্রান্সে আড়াই হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শহরে সব ধরণের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিস বন্ধ রয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আইফেল টাওয়ার। বিবিসি।

Saturday, November 14, 2015

অন্যায়ের ব্যাপারে জ্ঞানীদের নীরবতাই ধ্বংসের কারণ

অন্যায়ের ব্যাপারে জ্ঞানীদের নীরবতাই ধ্বংসের কারণ

 0
Untitled-413-276x300
রুফায়দাহ পন্নী
————–
আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে স¤পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত: ১১)। কিন্তু এ মর্যাদার বেলায় একজন সাধারণ মো’মেনের তুলনায় একজন জ্ঞানী মো’মেনের অর্থাৎ আলেমের মর্যাদা অনেক বেশি এ কথা আল্লাহর রসুল অনেকবার বলে গেছেন। আল্লাহও বলেছেন, ‘যারা জানে (আলেম) এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? (সুরা জুমার: ৯)।
সুতরাং আমরাও সত্যিকার আলেমদের শ্রদ্ধা করি। কিন্তু পেশাদার আলেমগণ অর্থাৎ ধর্মব্যবসায়ীদেরকে আল্লাহ অপবিত্র ও জাহান্নামী বলে ঘোষণা করেছেন বলে আমরাও তাদেরকে বলি, ধর্মব্যবসা পরিহার করে হালাল উপার্জন করার জন্য এবং তাদের জ্ঞানকে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য। কারণ এর মধ্যেই আলেমের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত। আল্লাহর রসুল বলেছেন, আলেমের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র। এর কারণ হচ্ছে, ঐ কলমের কালি মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গকারী অসংখ্য শহীদের জন্ম দিতে সক্ষম। কোনো আলেম দাবিদার যদি নিজেই নিজের জীবন সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় তথা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে অসম্মত হন, তাহলে তার ঐ জ্ঞানের দ্বারা মানবজাতির কোনো কল্যাণের সম্ভাবনা থাকে না। এমন আলেমকে জ্ঞানী না বলে জ্ঞানপাপী বলা হয়ে থাকে, তাদের এই জ্ঞান তামসিক জ্ঞান ছাড়া কিছুই নয়। আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে ধর্মব্যবসাকে হারাম করা সত্ত্বেও তারা জাহান্নামের আগুনের ব্যাপারে নির্লিপ্ত, আল্লাহর ভাষায়- ‘আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল।’ (সুরা বাকারা ১৭৪)। অথচ আলেমদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তারা আল্লাহকে, তথা আল্লাহর শাস্তিকে, জবাবদিহিকে ভয় করবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা আলেম তারাই তাঁকে অধিক ভয় করে (ফাতির : ২৮)।
বর্তমানে আমাদের সমাজে আলেম বলতে তাদেরকেই বোঝানো হয় যারা মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে দাখেল, ফাজেল, কামেল ইত্যাদি সার্টিফিকেট অর্জন করে মসজিদে মাদ্রাসায় চাকুরি করেন, দীনের মাসলা-মাসায়েলের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে জাতির মধ্যে ফেরকা-মাযহাবের বিভক্তি জিইয়ে রাখেন, ফতোয়াবাজির নামে অনধিকারচর্চা করেন, সুন্নতি লেবাসের নামে আরবীয় পোশাক আশাক পরেন, দাড়ি-টুপি ধারণ করেন, ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজ করেন ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে এরা প্রকৃত আলেম নন, তারা ধর্মব্যবসায়ী। সুতরাং সম্মান করার আগে সত্যিকার আলেমদেরকে চিনতে হবে।
বর্তমানে এক শ্রেণির আলেম দাবিদারদের অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। লেবাস, সুরত ধারণ করে এবং ধর্মগ্রন্থ মুখস্থ করে তারা নিজেদেরকে খুব জ্ঞানী ভাবতে শুরু করেন যা স্পষ্ট অহংকার। হেযবুত তওহীদের এমাম এবং সদস্য সদস্যারা অধিকাংশই মাদ্রাসা শিক্ষিত নন বলে ধর্মব্যবসায়ী আলেমগণ হেযবুত তওহীদের সত্য প্রতিষ্ঠার কাজের বিরোধিতা করেন, অথচ প্রকৃতপক্ষে আমরা যে কাজটি করছি সেই কাজ করার কথা ছিল তাদের। আমরা স্বীকার করি যে, তাদের ধর্মজ্ঞান আছে, কোর’আনের অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ও তাদের নখদর্পণে, হাদীসশাস্ত্রও মুখস্থ। ফিকাহ-তাফসীর সংক্রান্ত মাসলা-মাসায়েলের জ্ঞানের দিক দিয়েও আমাদের সঙ্গে তাদের তুলনা চলে না। তারা অতি নিষ্ঠাসহকারে নামাজ, রোজা, এবাদত-উপাসনা ইত্যাদি আমল করে থাকেন। কিন্তু আমাদের কথা হলো- এতকিছু সত্ত্বেও তাদের এই এলেম, আমল, এবাদত-উপাসনা অর্থহীন, কারণ মানুষের প্রকৃত এবাদত হচ্ছে মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, সে ব্যাপারে তাদের কোনো অবদান নেই। সমাজে যখন একজন নারীর শ্লীলতাহানি হয়, মানুষ যখন দু®কৃতকারীদের ভয়ে আতঙ্কে ঘরের বাইরে বের হয় না, তখন সেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই মুখ্য এবাদতে পরিণত হয়। এই এবাদত না করে যতই তাহাজ্জুদ পড়া হোক, ঈদ-কোরবানি, তারাবির নামাজ, রোজা, উপাসনা করা হোক তার কোনোই দাম থাকে না। ব্যক্তিগত এবাদত বন্দেগী করে জান্নাতে যাওয়ার তখন কোনো সুযোগ থাকে না। মনে রাখতে হবে, এলেম বা সত্যের জ্ঞান যখন কেউ প্রাপ্ত হয় সে আল্লাহর তরফ থেকেই প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ এই জ্ঞান কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকেই দান করেন। সৃষ্টির সূচনালগ্নে তিনি আদম (আ.) কে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন মানেই জ্ঞান দান করেছিলেন যে জ্ঞান কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর সন্তানদের মস্তিষ্কে একটু একটু করে বিকশিত হবে এবং যার দ্বারা মানবজাতি সমসাময়িক সমস্যার উত্তর খুঁজে পেয়ে কল্যাণপ্রাপ্ত হবে। একটি নদীর প্রবাহে যেমন কোনো ব্যক্তির মালিকানা স্বীকৃত হতে পারে না, তেমনি জ্ঞানও অনুরূপ প্রাকৃতিক তথা আল্লাহপ্রদত্ত সম্পদবিশেষ। এরও কোনো ব্যক্তি মালিকানা হতে পারে না। তাই জ্ঞান মানবজাতির আমানত, এই আমানত কুক্ষিগত করে কবরে চলে যাওয়া বিরাট অন্যায় এবং সে আল্লাহর গজবের পাত্র। তাই আলেমদের প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে, তার জ্ঞানকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কল্যাণের চেয়ে ধ্বংসাত্মক কাজেই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে, আর ধর্মীয় জ্ঞানকে ব্যবহার করা হচ্ছে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা, রঙ-বেরঙের ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ, জাতির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি, রাজনীতিক ফায়দা হাসিল করার কাজে। ধর্ম থেকে মানুষ না পাচ্ছে পার্থিব কল্যাণ, না পাবে পরকালীন মুক্তি। এর জন্য প্রধানতই দায়ী এই আলেম নামধারী জনগোষ্ঠী। এজন্যই রসুলাল্লাহ বলেছেন, আলেমদের মধ্যে যারা মুত্তাকী ও সৎ তারা সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, আর যারা অসৎ ও দুনিয়ার লোভী তারা সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট। [কিমিয়ায়ে সা’দাত-ইমাম গাজ্জালী (রহ.)]
আজকে সাধারণ মানুষ বিকৃত আকীদার কারণে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আলেমদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। ধর্মীয় জীবনে মানুষের চলার পথ আলেমরাই নির্দেশ করে থাকেন, আলেমরা কী বলেন সেদিকেই মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে, কেননা আল্লাহই বলেছেন আলেমদের কাছ থেকে অজানা বিষয় জেনে নিতে (নাহল : ৪৩)। সমাজে যখন হাজারো অধর্মের জয়জয়কার, তখন আলেমরাই যদি শত অন্যায় দেখেও নীরবতা পালন করেন, নির্লিপ্ত-নির্বিবাদী জীবনযাপন করেন তাহলে সাধারণ মানুষ তো স্বাভাবিকভাবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা ও সাহস পাবে না। বর্তমানে তেমনটাই হয়েছে। আলেমগণ অন্যায়, অবিচার, যুলুম, নির্যাতন হতে দেখেও নীরবতা পালন করে, নির্লিপ্ত-নির্বিবাদী হয়ে বেঁচে থেকে প্রকৃতপক্ষে দু®কৃতকারীদের চেয়েও বেশি পাপ করছেন। এর জন্য আল্লাহর কাছে তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে।
আল্লাহ আখেরি নবীর উম্মাহকে সকল জাতির মধ্যে যে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন সেটা শর্তযুক্ত, নিঃশর্ত নয় এবং জন্মগতও নয়। এই মর্যাদার কারণ এই জাতি মানুষকে ন্যায়কার্যের আদেশ করবে এবং অন্যায়কার্য থেকে প্রতিহত করবে (সুরা ইমরান ১১০)। আমাদের সমাজের আলেমরা সমাজের সকল অন্যায়ের প্রতি নীরব সম্মতি প্রদান করে, সকল অন্যায়কারীর কাছে মাথা নত করে, অপশক্তিগুলোর তোষামোদি করে কোনোমতে দাওয়াত খেয়ে, মাসোহারা নিয়ে জীবনযাপন করে যেতে পারলেই খুশি। নিজেদের দাড়ি, টুপি, জোব্বা আর আরবি ভাষার জ্ঞানের প্রদর্শনী করেই তারা সম্মান দাবি করেন, কিন্তু সম্মান পেতে হলে আল্লাহ যে শর্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে দিয়েছেন তারা সেই শর্তপূরণের ধারে কাছেও ঘেঁষতে চান না। কারণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে বিপদ আছে, চাকুরি হারাতে হতে পারে, নিশ্চিন্ত উপার্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এভাবে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে তারা সমাজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। এ কারণেই রসুলাল্লাহ তাঁর উম্মাহর আলেমদেরকে আসমানের নীচে নিকৃষ্টতম জীব বলে আখ্যায়িত করেছেন [আলী (রা.) থেকে বায়হাকী, মেশকাত]। সমাজের যখন অশান্তির বিস্তার ঘটে, তা দেখেও যে আলেমরা নীরব থাকেন তাদের সেই নীরবতাকে আল্লাহ ঘৃণা করেন। তিনি সুস্পষ্টভাষায় বলেছেন, আলেমরা কেন তাদেরকে (দুষ্কর্মকারীদের) পাপ কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করে না? (সুরা মায়েদা: ৬৩)।
আমরা চাই, আলেমরা কেবল ওয়াজের মাধ্যমে নয়, সঠিক কাজের মাধ্যমে, প্রকৃত এবাদতে নিজেদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রমাণ করুন। এটা করলেই তারা সত্যিকার অর্থেই ওরাসাতুল আম্বিয়া বা নবীদের উত্তরাধিকারী হতে পারবেন এবং মানবসমাজে ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন। মহানবী বলেন, কেবল দুই ব্যক্তির সাথে ঈর্ষা করা যায়। এক. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ স¤পদ দান করেছেন এবং সে সেই স¤পদ সত্য-ন্যায়ের পথে খরচ করে। দুই. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তার দীনের গভীর জ্ঞান দান করেছেন এবং তার দ্বারা তিনি রায় প্রদান করেন। (সহি বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি ও ইবনু মাজাহ)। সুতরাং মর্যাদা পেতে হলে জ্ঞানকে কুক্ষিগত করে রাখলে চলবে না, সেটাকে কাজে লাগিয়ে সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে হবে এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষাবলম্বন করতে হবে। হেযবুত তওহীদ এই আহ্বানই করছে।