Sunday, November 22, 2015

গৃহে যখন আগুন লাগে যজ্ঞে আহুতি দিয়ে তখন পুণ্যলাভ হয় না

গৃহে যখন আগুন লাগে যজ্ঞে আহুতি দিয়ে তখন পুণ্যলাভ হয় না


-রাকীব আল হাসান
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে শুধু মুসলিমই নয় বিরাট একটা জনসংখ্যা সনাতন ধর্মের অনুসারীও রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী। আমরা বিশ্বাস করি সকল ধর্মই একই স্রষ্টা মহান আল্লাহ পাকের নিকট থেকে আগত। প্রতিটি ধর্মই মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করে, মানবতা ও শান্তির কথা বলে। কাজেই আমরা সকল ধর্মের অনুসারীদের উদ্দেশ্যেই তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু সত্যবাক্য তুলে ধরে আলোচনা করবার চেষ্টা করব এই কলামে। আজ আলোচনা করব ‘মহাভারত’র একটি বাণী নিয়ে।
মহাভারতে একটি কথা আছে, “গৃহে যখন আগুন লাগে যজ্ঞে আহুতি দিয়ে তখন পুন্যলাভ হয় না”। অর্থাৎ গৃহে আগুন লাগলে প্রথম কর্তব্য সেই আগুন নিভিয়ে গৃহের সকলকে রক্ষা করা। কেউ যদি আগুন না নিভিয়ে তখন যজ্ঞে বসে থাকে তবে সেটিই হবে বড় অধর্ম। এই বাণীটি একটি সনাতন বাণী। অর্থাৎ এটি সকল ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কেউ আগুনে পুড়ছে আর আপনি তখন তাকে উদ্ধার না করে সালাহ (নামাজ) কায়েম করছেন, যজ্ঞ করছেন, জপমালা জপছেন, পূজা করছেন বা অন্য কোনো উপাসনা করছেন- এটা কখনোই ধর্ম হতে পারে না। বরং আপনি চরম অধর্ম করছেন। মানুষের জন্যই ধর্ম এসেছে, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। ধর্ম তো মানবতার কল্যাণের জন্য। সুতরাং মানবতার কল্যাণই সবচেয়ে বড় ধর্ম। তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া আর বিপদগ্রস্তকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার চেয়ে আর বড় ধর্ম তো কিছু থাকতে পারে না। অসহায় ব্যক্তি নাস্তিক হোক অথবা আস্তিক, বিধর্মী হোক অথবা স্বধর্মী, শত্র“ হোক অথবা বন্ধু তাকে সাহায্য করার মাঝেই তো রয়েছে প্রকৃত ধর্ম তথা সনাতন ধর্ম, মানবতার ধর্ম। ধর্ম কেবল মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা বা সিনাগগে থাকে না, ধর্ম থাকে আর্তপীড়িতের সেবায়, নিরন্ন, নির্বাসন মানুষের অন্ন-বস্ত্র দানের মধ্যে। প্রতিটা ধর্মের মূল উদ্দেশ্যই হলো একমাত্র স্রষ্টার হুকুম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। যুগে যুগে যখনই সমাজ বর্তমানের মতো অন্যায়, অবিচার আর অধর্মে পরিপূর্ণ হয়েছে তখনই আল্লাহ নবী-রসুল, অবতার পাঠিয়ে সেই অধর্মের বিনাশ করে স্রষ্টার বিধানে পুনরায় শান্তি ফিরিয়ে এনেছেন। নবী-রসুল বা অবতারগণ মসজিদ, মন্দির বা গীর্জায় বসেই জীবন পার করেন নি। যখন স্রষ্টার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি মানুষ (সে যে ধর্মেই বিশ্বাসী হোক অথবা ধর্মে অবিশ্বাসীই হোক) স্রষ্টার বিধান, শাস্ত্রের বিধান বাদ দিয়ে ইহুদি-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’ তথা দাজ্জালের বিধান মেনে নেওয়ার ফলে চরম অন্যায়, অবিচার, হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, রক্তপাত, হত্যা, ধর্ষণ তথা চরম অধর্মে লিপ্ত তখন আমাদের প্রধান কর্তব্যই হলো মানবজাতিকে এই চরম অশান্তি থেকে বাঁচানো। মানুষকে এই চরম অশান্তি থেকে বাঁচানোর কোন চেষ্টা না করে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যজ্ঞ, আরাধনা, পূজা-আর্চনা এক কথায় কোনো উপাসনাতেই পুণ্য মিলবে না। আর তাছাড়া এটা হবে সকল নবী-রসুল, অবতার, মহামানবদের শিক্ষারও বিপরীত। তাই আসুন আমরা দাজ্জালের তৈরি স্রষ্টাহীন, বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থা পরিত্যাগ করে স্রষ্টার বিধান, শাস্ত্রের বিধান অর্থাৎ কোর’আন, বেদ, বাইবেল, তওরাতের প্রকৃত শিক্ষা তথা সনাতন, শাশ্বত, চিরন্তন শিক্ষার উপর ভিত্তি করে আমরা সমগ্র মানবজাতিকে একজাতিতে পরিণত করি। পৃথিবীকে কিংডম অব হ্যাভেনে পরিণত করি, রামরাজত্বে যেরূপ শন্তি ছিল সেই শন্তিময় সত্যযুগ ফিরিয়ে আনি, ১৪০০ বছর পর আবারও স্বর্ণযুগের সূচনা করি।

প্যারিস হামলা’ আরেক ‘৯/১১’?

প্যারিস হামলা’ আরেক ‘৯/১১’?


-মোহাম্মদ আসাদ আলী
ফ্রান্সে শার্লি হেবদো পত্রিকা অফিসে হামলার পর এবার দেশটির ইতিহাসের ভয়ংকরতম জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী ১২৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছে আরও ১৮০ জন। প্যারিসের অন্তত তিনটি জনবহুল স্থানে হামলা হয়েছে। তার মধ্যে এক কনসার্ট হলে জিম্মি করেই হত্যা করা হয়েছে ৮০ জনকে। সমস্ত ফ্রান্স জুড়ে সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের কাজে সহযোগিতার জন্য প্যারিসে দেড় হাজার সেনা মোতায়েনের খবরও পাওয়া গেছে। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দেশটিতে ‘কার্ফ্যু’ জারি করা হলো। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামলাকে ‘পরিকল্পিত’ বলে মতামত দিয়েছেন এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, আইএস জঙ্গিরা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফ্রাঁসোয়া অঁল্যাদের এই বক্তব্যে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ফ্রান্স বিষয়টাকে কতটা গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। ফ্রান্স নেতৃত্বও সেটা বিশ্বাস করছে, তবে তাদের ধারণা শুধু বহিঃর্বিশ্বের উদ্যোগেই এত বড় হামলা ঘটে নি, এর সাথে সে দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসীদেরও সহযোগিতা আছে। বলতে বাধা নেই, তারা অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী বলতে দেশটিতে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর দিকেই ইঙ্গিত করছেন। বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘ফ্রান্সে এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনগোষ্ঠী বাস করে এবং একইসাথে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ইহুদী জনগোষ্ঠীও ফ্রান্সে। গত কিছুদিন যাবত সেখানে আমরা এন্টি সেমিটিজম এবং ইসলামোফোবিয়া বাড়তে দেখেছি, সেইসাথে যোগ হয়েছে রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান এবং শরণার্থী সংকট। এই সব মিলিয়ে সেখানে একটি অস্থির মিশ্রণ তৈরি হয়েছে।’
অধ্যাপক আলী রিয়াজ ফ্রান্সের যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র এঁকেছেন তার ভিত্তিতে বলা যায়, এ হামলার পরিণতিতে ফ্রান্সে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং দেশটিতে নতুন করে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা শুরু হতে পারে। সব কিছুর জন্য ইসলাম ও মুসলিম জাতিকে দোষারোপ করার যে প্রবণতা ইউরোপে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তার পালে হাওয়া লাগল এ ঘটনায়। এতে করে ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত শরণার্থীদের উপর নেমে আসতে পারে নতুন কোনো বিপর্যয়। সবচাইতে বড় বিষয় হলো- এখন দেখতে হবে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ ভর করছে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা নতুন কোনো মাত্রা লাভ করে কিনা।
বাস্তবতা হলো- এই হামলার সাথে যতটা না ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্ক, তার চেয়েও বেশি সম্পর্ক সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের। কিন্তু সেটা কি ইউরোপের জনগণ উপলব্ধি করতে পারবে? অতীতে পারে নি, হয়তো এখনও পারবে না। তাদেরকে বুঝতে হবে যে, আইএস ইসলামের ধারক নয়, মুসলিম জাতির ‘প্রতিনিধিত্ব’ তারা করে না। তারা প্রতিনিধিত্ব করে সাম্রাজ্যবাদের। সাম্রাজ্যবাদের লীলাভূমি থেকেই আইএস নামক বিষবৃক্ষ মাথা তুলে দাঁড়ায়। আইএস কারা তৈরি করল? কারা প্রসার ঘটাল? আইএসের হাতে যে অস্ত্র, যে ট্যাংক-গোলাবারুদ আছে তা সরবারহ করেছিল কারা? কেন করেছিল? কী স্বার্থ ছিল তার পেছনে? কিছুদিন আগেই টনি ব্লেয়ার স্বীকার করেছেন যে, ‘যুক্তরাষ্টের ইরাক আক্রমণের কারণেই আজকে আইএসের উত্থান ঘটেছে।’ আসলে ‘ঘটেছে’ বললে সত্যের অপনোদন করা হয়, বলতে হবে ঘটানো হয়েছে। আইএসের উত্থান একসময় পরিকল্পনা করে ঘটানো হয়েছে যেভাবে আল কায়েদা ও তালেবানের উত্থান ঘটানো হয়েছিল। তারপর তাকে অস্ত্র, গোলা-বারুদ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করে সাম্রাজ্যবাদকে লাভবান করার জন্য। আর এ কাজে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতির সঙ্গি হয়ে থেকেছে যে দেশটি তাহলো- ফ্রান্স। মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্ত ও তৎপরবর্তী ‘আইএস’ নিয়ে যে ভাঙ্গা-গড়া শুরু হয় তাতে সব সময়ই ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের লেজ ধরে হেঁটেছে। ফ্রান্সকে কি আজ তারই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে? এই হামলা কি তবে ফ্রান্সের ‘৯/১১’? এখান থেকে যাত্রা শুরু করবে নতুন কোনো ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’? ফ্যাঁসোয়া ওঁল্যাদ কিন্তু আইএসের এ হামলাকে ‘যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই।
জঙ্গি হামলার ব্যাপারে লিখতে বসলে একটি কমন প্রশ্ন করতেই হয় যে, কার লাভ হলো? জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড যারা করছে, ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন- তাতে কার লাভ হয়? আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের কোনো লাভ হয়? মুসলিম জাতির কোনো লাভ হয়? ইসলামের কোনো লাভ হয়? বস্তুত এ ধরনের কর্মকাণ্ড দ্বারা লাভবান হয় একমাত্র সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ। আর দুনিয়াব্যাপী ইসলাম ও মুসলিম জাতির ভাগ্যে জোটে নতুন নতুন কলঙ্ক। এ কারণেই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো তালেবান, আল কায়েদা ও আইএস জন্ম দেয়, লালন-পালন করে। তারপর তাদের লাভের অংশ কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেয়। সাথে হতভাগা মুসলিম জাতির ক্ষতির ব্যাপারটাও নিশ্চিত করে। সুতরাং সম্প্রতি প্যারিস হামলার ঘটনায় যারা ইসলামের দিকে আঙ্গুল তুলতে চলেছেন তাদেরকে আগে এটা পরিমাপ করা প্রয়োজন যে, এ জঙ্গি হামলার সাথে ইসলাম ও মুসলিম জাতির সম্পর্ক কতখানি আর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের সম্পর্ক কতখানি।

কোনো ধর্মেই অতি বিশ্লেষণের জায়গা নেই

কোনো ধর্মেই অতি বিশ্লেষণের জায়গা নেই

 0
 
-রাকীব আল হাসান
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে শুধু মুসলিমই নয় বিরাট একটা জনসংখ্যা সনাতন ধর্মের অনুসারীও রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী। আমরা বিশ্বাস করি সকল ধর্মই একই স্রষ্টা মহান আল্লাহ পাকের নিকট থেকে আগত। প্রতিটি ধর্মই মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করে, মানবতা ও শান্তির কথা বলে। কাজেই আমরা সকল ধর্মের অনুসারীদের উদ্দেশ্যেই তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু সত্যবাক্য তুলে ধরে আলোচনা করবার চেষ্টা করব এই কলামে। আজ সকল ধর্মের মূল শিক্ষা ও ইহুদিদের বাড়াবাড়ি নিয়ে আলোচনা করব।
…
আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষনবী (সা.) পর্যন্ত আল্লাহ যে জীবন বিধান মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন, স্থান, কাল ভেদে সেগুলোর নিয়ম-কানুনের মধ্যে প্রভেদ থাকলেও সর্বক্ষণ ভিত্তি থেকেছে একটি মাত্র। সেটা হচ্ছে তওহীদ, একমাত্র প্রভু, একমাত্র বিধাতা (বিধানদাতা) আল্লাহ। যার আদেশ নির্দেশ, আইন-কানুন ছাড়া অন্য কারো আদেশ, নির্দেশ, আইন-কানুন কিছুই না মানা। একেই আল্লাহ কোর’আনে বলছেন দীনুল কাইয়্যেমা। আল্লাহ মানুষের কাছে এইটুকুই মাত্র চান। কারণ তিনি জানেন যে, মানুষ যদি সমষ্টিগতভাবে তিনি ছাড়া অন্য কারো তৈরি আইন কানুন না মানে, শুধু তারই আইন-কানুন মানে তবে শয়তান তার ঘোষিত উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে দিয়ে অশান্তি, অন্যায় আর রক্তপাত অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং মানুষ সুবিচারে, শান্তিতে (ইসলামে) পৃথিবীতে বসবাস করতে পারবে- অর্থাৎ আল্লাহ যা চান। কত সহজ। কাইয়্যেমা শব্দটা এসেছে কায়েম থেকে যার অর্থ চিরন্তন, শাশ্বত, সনাতন। আল্লাহ এই দীনুল কাইয়্যেমার কথা বলে বলছেন- এর বেশি তো আমি আদেশ করি নি (সুরা আল বাইয়েনাহ ৫)। ‘এর বেশি তো আমি আদেশ করি নি’ তিনি বলছেন এই জন্য যে, তিনি জানেন যে, ঐটুকু করলেই অর্থাৎ তার বিধান ছাড়া অন্য কোন বিধান মানুষ না মানলেই মানব জাতির মধ্যে পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সামান্য দাবিটুকুই তিনি মানুষের কাছে আদম থেকে আজ পর্যন্ত করে আসছেন। পূর্ববর্তী বিকৃত জীবন-ব্যবস্থাগুলিতেও আল্লাহর দাবি ছিলো ঐ সহজ সরল দাবি- দীনুল কাইয়্যেমা, তওহীদ। ভারতীয় ধর্মের অনুসারীদের তারা কোন ধর্মে বিশ্বাসী জিজ্ঞাসা করলে তার জবাব দেবেন সনাতন ধর্ম। সনাতন এবং কাইয়্যেমা একার্থবোধক- যা চিরদিন প্রবাহমান, চিরন্তন ও শাশ্বত এবং তা ঐ তওহীদ। এর গুরুত্ব এত বেশি যে একে আল্লাহ আমাদের জন্য শুধু প্রতি সালাতে নয় প্রতি রাকাতে অবশ্য করে দিয়েছেন সুরা ফাতেহার মধ্যে। “আমাদের সেরাতাল মোস্তাকীমে চালাও” মোস্তাকীম অর্থ সহজ, সরল ও শাশ্বত।
এইখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এসে যায়, তাহলো আল্লাহ কোর’আনে আমাদের বলে দিলেন যে, আমি তোমাদের একটি ভারসাম্যযুক্ত জাতি বানালাম (সুরা বাকারা ১৪৩)। এই ভারসাম্যের সাথে সেরাতাল মোস্তাকীম ও দীনুল কাইয়্যেমা সংশ্লিষ্ট ও সম্বন্ধযুক্ত (জবষধঃবফ, পড়হহপবঃবফ)। সহজ, সরল চিরন্তন ছাড়াও সেরাতাল মোস্তাকীম শব্দের এক অর্থ হলো, মধ্যবর্তী, মাঝামাঝি- ঐ ভারসাম্যেরই অন্য অর্থ। আল্লামা ইউসুফ আলী এর অনুবাদ করেছেন ১) ঝঃৎধরমযঃ (সরল) ২) ঝঃধহফধৎফ (মাঝামাঝি, মধ্যপন্থী) ৩) উবভরহরঃব (স্থির, নিশ্চিত) চবৎসধহবহঃ (চিরস্থায়ী শাশ্বত) ।
ঝঃধহফধৎফ অর্থটির দিকে লক্ষ্য করুন। এই অর্থ হলো মধ্যবর্তী, মাঝামাঝি, মানে সর্বোৎকৃষ্টও নয়, সর্বনিুও নয়, সেই মধ্যপন্থী, ভারসাম্যযুক্ত। অর্থাৎ দীনুল কাইয়্যেমা, সেরাতাল মোস্তাকীম আল্লাহ আমাদের দিয়ে আসছেন মানুষ সৃষ্টির প্রথম থেকে যা হচ্ছে- ১) অত্যন্ত সহজ ও সরল, ২) মধ্যপন্থী ৩) চিরস্থায়ী শাশ্বত। এবং যে জাতি একে গ্রহণ করবে সে জাতি হবে ভারসাম্যযুক্ত (উম্মাতাও ওয়াসাতা)। একটা জাতির মধ্যে জ্ঞানী, চালাক, বোকা, সর্ব রকম মানুষই থাকবে, সব নিয়েই একটি জাতি। সুতরাং লক্ষ্য যদি জটিল হয় তবে সবার তা বোধগম্য হবে না। জাতির যে অংশটুকু শিক্ষিত ও মেধাবী, শুধু তাদেরই বোধগম্য হবে- সমগ্র জাতি একতাবদ্ধ হয়ে ঐ লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রাম করতে পারবে না। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (সা.) যে জাতি সৃষ্টি করলেন তার ভিত্তি করলেন অতি সহজ ও সরল-তওহীদ, একমাত্র প্রভু হিসাবে তাকেই স্বীকার করে নেওয়া। এর নাম দিলেন দীনুল কাইয়্যেমা ও সেরাতাল মোস্তাকীম, চিরন্তন, সহজ সরল পথ। এটাই যে সব কিছু তা বোঝাবার জন্য অবশ্য কর্তব্য (ফরজ) করে দিলেন প্রতি রাকাতে ঐ সেরাতাল মোস্তাকীমে চালাবার প্রার্থনা করা, যাতে প্রতিটি মুসলিমের সর্বক্ষণ এ সহজ সরল পথের কথা মনে থাকে এবং ঐ সহজ সরলতার ভিত্তি ছেড়ে জটিলতার দিকে সরে না যায়। এবং জাতির লক্ষ্যও স্থির করে দিলেন অতি সহজ ও সরল-ঐ দীনুল কাইয়্যেমাকে, সেরাতাল মোস্তাকীমকে সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীতে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করা। দুটোই বুঝতে সহজ। সহজ বলেই বিশ্বনবীর (সা.) সৃষ্ট অত্যন্ত অশিক্ষিত জাতিটি, যার মধ্যে লেখাপড়া জানা লোকের সংখ্যা হাতে গোনা-যেতো তারাও ভিত্তি ও লক্ষ্য পরিস্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা থেকে চ্যুত হন নি এবং তারা সফলভাবে আল্লাহ রসুলের (সা.) উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে বহু দূর অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু অতি বিশ্লেষণের বিষময় ফলে ঐ দীনুল কাইয়্যেমা, সেরাতাল মোস্তাকীম হয়ে গেলো অত্যন্ত জটিল, দুর্বোধ্য এক জীবন-বিধান, যেটা সম্পূর্ণ শিক্ষা করাই মানুষের এক জীবনের মধ্যে সম্ভব নয়- সেটাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তো বহু দূরের কথা। জাতি লক্ষ্যচ্যুত তো আগেই হয়ে গিয়েছিল, তারপর ফকিহ ও মুফাস্সিরদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ফলে জাতির মধ্যে ভয়াবহ বিভেদ সৃষ্টি হয়ে, বিভিন্ন মাজহাব ও ফেরকা সৃষ্টি হয়ে যে অনৈক্য সৃষ্টি হলো তার ফলে পুনরায় একতাবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেলো। এই জন্য রসুলাল্লাহ (সা.) বলেছিলেন আমার উম্মাহর আয়ু ৬০/৭০ বছর।
অতি বিশ্লেষণ করে দীনের প্রাণশক্তি বিনষ্ট করে দেওয়ার কাজটা নতুন নয়, আমাদের পণ্ডিতরাই শুধু এ কাজ করেন নি। পূর্ববর্তী দীনগুলোতেও অতি-ধার্মিকরা গজিয়েছেন ও পাণ্ডিত্য জাহির করে তাদের দীনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন তার নবী মূসার (আ.) জীবনী থেকে যেখানে আল্লাহ বনী ইসরাইলদের একটি গরু কোরবানি করতে আদেশ দিলেন। মূসা (আ.) যখন এই কোরবানির আদেশ বনী ইসরাইলদের জানিয়ে দিলেন তখন যদি তারা মোটামুটি ভাল একটি গরু এনে কোরবানি করে দিত তাহলে তাতেই কাজ হয়ে যেত। কারণ কোরবানির গরুটা কেমন হবে সে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন শর্ত দেন নি। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে বলছেন- বনী ইসরাইল তা করে নি। তারা মুসার (আ.) মাধ্যমে আল্লাহকে প্রশ্ন করতে লাগলো- গরুটার বয়স কত হবে, গায়ের রং কি হবে, সেটা জমি চাষের জন্য শিক্ষিত কিনা, জমিতে পানি দেয়ার জন্য শিক্ষিত কিনা, ওটার গায়ে কোন খুঁত থাকতে পারবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি । তারা প্রশ্ন করে যেতে লাগলো আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। তারপর যখন প্রশ্ন করার মতো আর কিছুই রইল না তখন স্বভাবতঃই ঠিক অমন একটি গরু পাওয়া দূরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একটা সহজ সরল আদেশ- “একটা গরু কোরবানি করো” এটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এমন কঠিন করে ফেলা হলো যে, অমন গরু আর পাওয়া যায় না। এই জাতির মহা পণ্ডিতরাও বিশ্বনবীর (সা.) ওফাতের ৬০/৭০ বছর পর ঠিক ঐ কাজটাই মহা ধুমধামের সাথে আরম্ভ করলেন। দু’টি মাত্র আদেশ- আমাকে ছাড়া কাউকে মানবে না আমার দেয়া জীবন-বিধান ছাড়া আর কোন বিধান মানবে না, আর এই জীবন-বিধানকে সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করবে। সহজ, সরল দু’টি আদেশ। বিশ্বনবীর (সা.) উম্মাহ ইস্পাতের মতো কঠিন ঐক্য নিয়ে ঐ কাজ করতে আরব থেকে বের হয়ে অবিশ্বাস্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। পূর্ববর্তী দীনের পণ্ডিতদের মতো এ উম্মাহর পণ্ডিতরাও একে ধ্বংস করে দিলেন।

Thursday, November 19, 2015

অনৈক্যের প্রধান কারণ পাশ্চাত্যের অনুকরণ

অনৈক্যের প্রধান কারণ পাশ্চাত্যের অনুকরণ

 0

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
পৃথিবীব্যাপী অনৈক্য নামক মহামারির যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে তার প্রধান রূপকার পশ্চিমা স্রষ্টাহীন, বস্তুবাদী সভ্যতা। পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’র রূপের ঝলকে পৃথিবীবাসী আজও মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের অনুসরণ করে মানুষ প্রতি পদে প্রতারিত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু এত অন্যায়-অবিচার, অশান্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, হত্যা-রক্তপাত, যুদ্ধ-বিগ্রহও তাদের সেই মোহ ভাঙতে ব্যর্থ হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষ এখনও তাদেরকে বিশ্বাস করে, তার কাছে শান্তির উপায় অন্বেষণ করে।
পাশ্চাত্য বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি জীবনব্যবস্থা মানবজাতির উপরে প্রয়োগ করেছে। যখন ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম হলো তখন দুনিয়াময় প্রতিষ্ঠিত ছিল রাজতন্ত্র। এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রাথমিকভাবে রাজতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে প্রযুক্ত হলেও এক সময় বাজতে আরম্ভ করে রাজতন্ত্রের বিদায়ঘণ্টা, জন্ম নেয় ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, যার মূলসূত্র পুঁজিবাদ। এই গণতন্ত্র ইউরোপে ধীরে ধীরে রূপ লাভ করল চরম ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রে। দেখা দিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবিচার, ধনী-দরিদ্র ব্যবধান। এই অর্থনৈতিক অন্যায় থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ইহুদি পণ্ডিত কার্ল মার্কস আবিষ্কার করলেন পুঁজিবাদবিরোধী সাম্যবাদ (Communism)। প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদভিত্তিক সামন্তবাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয় ইহুদি পণ্ডিত কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ। পাশাপাশি বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশে একনায়কতন্ত্র প্রবল হয়ে সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠল। বাকি দুনিয়া তাদেরকে আখ্যায়িত করল ফ্যাসিস্ট হিসাবে। এক পর্যায়ে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র আঁতাত করে দুটি বিশ্বযুদ্ধ করে হিটলার ও মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদ পরাজিত করল কিন্তু দুনিয়া থেকে একনায়কতন্ত্র একেবারে মুছে গেল না, পেছনের সারিতে গিয়ে অবস্থান নিল। তারপর পৃথিবী প্রধানত দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে গেল- এক প্রান্তে সমাজতন্ত্র অন্য প্রান্তে গণতন্ত্র। কোথাও কোথাও গণতন্ত্রের ধড়ের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের লেজ জুড়ে সাধারণ মানুষকে গিনিপিগ করে অদ্ভুত কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই মানুষকে কাক্সিক্ষত শান্তি দিতে সক্ষম হলো না। পুঁজিবাদে দেশের জনগণের অধিকাংশ সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, বঞ্চিত হয় অধিকাংশ মানুষ, সমাজতন্ত্রেও তাই। দেশের সব সম্পদ জড়ো হয় সরকারের তহবিলে, বঞ্চিত হয় সেই অধিকাংশ মানুষ। সুতরাং অবধারিতভাবে আবারও ঘটে সহিংস বিপ্লব, অভ্যুত্থান- যা কখনও সামরিক, কখনও বেসামরিক। বিংশ শতক জুড়ে চলে সমাজতন্ত্রের আধিপত্য যা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছে। অবশেষে নব্বইয়ের গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভক্তি ও জার্মানের বার্লিন প্রাচীর ধ্বংসের মাধ্যমে দ্বিতীয় কাতারে গিয়ে দাঁড়ায়, প্রথম সারিতে আসে গণতন্ত্র। বিশ্বের মোড়লিপনা থেকে ছিটকে পড়লেও সমাজতন্ত্র মতবাদ হিসাবে বেশ শক্তিশালী এখনও। সমাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে প্রবেশ করা যে কড়াই থেকে চুলাতে লাফ দেওয়া তা এখন সকলের সামনেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে অন্যায়, অশান্তি, অবিচারের লেলিহান শিখা প্রজ্জ্বলিত হয়ে আছে।
এ সবগুলি জীবনব্যবস্থা মানবজাতির মধ্যে এমন একটি হ-য-ব-র-ল পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে যে ভৌগোলিক রাষ্ট্রগুলি তো বটেই, এমনকি প্রত্যেকটি দেশের মানুষ পৃথক পৃথক মতবাদে বিশ্বাসী, একই মতবাদের মধ্যেও আবার রয়েছে দ্বিধাবিভক্তি। যেমন সমাজতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে মাওবাদ, লেনিনবাদ ইত্যাদি। গণতন্ত্রীদেরও ভাগ আছে যেমন- উদারপন্থী (Liberal), রক্ষণশীল (Conservative), প্রজাতান্ত্রিক (Republican) ইত্যাদি। এভাবে বিশ্বের কোনো দেশ গণতন্ত্র, কেউ রাজতন্ত্র, কেউ সমাজতন্ত্র, কেউ সাম্যবাদ ইত্যাদিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে সে দেশের জনগণ বহুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক ভাগের সাথে অপরভাগের দ্বন্দ্ব হয়েছে, সংঘর্ষ হয়েছে, চূড়ান্তভাবে জন্ম হয়েছে অশান্তিময় পরিস্থিতির।
পৃথিবীকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করার অনিবার্য পরিণতি হলো- এক পিতা মাতা আদম ও হাওয়া (আ:) থেকে আগত সন্তানদের মধ্যে সৃষ্টি হলো- আমি আমরা, তুমি তোমরা। তৈরি হলো সীমানা, প্রাচীর। তারা পরস্পর পরস্পরের জাতশত্র“তে পরিণত হলো। প্রত্যেকটা সীমানার মধ্যে এবার নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ভাগ, নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা চালু হলো। সীমানা তৈরি করলেই তা ভাঙ্গার প্রবণতা দেখা দেবে। প্রয়োজনই এই প্রবণতা সৃষ্টি করবে। হলোও তাই। আল্লাহ সবকিছু এক জায়গায় রাখেন নি, তাই একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় কিছু মানুষকে বন্দি করলে তারা তো সব কিছু সেখানে পাবে না, তাকে অন্য জায়গায় পাড়ি দিতেই হবে। এই বিভাজনের ফলে সম্পদের বণ্টন হলো ভারসাম্যহীন, এক স্থানে বিরাট সম্পদের অধিকারী অন্যস্থানে অস্বাভাবিক দারিদ্র্য। সৃষ্টি হলো মুদ্রার ফারাক- ডলার, রিয়াল, ইউরো, রুবল, টাকা, রুপি ইত্যাদি। মানুষের মতো মুদ্রাও সীমানায় আটকা পড়লো। সীমানা ডিঙ্গাতে গেলে তার মান-হানি হয়। এর ফলে উন্মুক্ত হলো অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা, মানি লন্ডারিং, মুদ্রা পাচার, চোরাকারবারী, ভিসা পাসপোর্ট জালিয়াতি, নোট জালিয়াতি ইত্যাদি অপরাধের দুয়ার।
আর্থিক ও সামাজিকভাবেও পশ্চিমা বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ পৃথিবীতে বৈষম্যের স্তর সৃষ্টি করল। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড, থার্ড ওয়ার্ল্ড, উন্নত বিশ্ব (Developed country), অনুন্নত বিশ্ব (Undeveloped country), উন্নয়নশীল বিশ্ব (Developing country) ইত্যাদি নাম দিয়ে বহুপ্রকার ভাগ করল। এক কথায় এই সভ্যতার গতিই হলো অনৈক্যমুখী।
দীর্ঘ চার শতাব্দীর অধিক সময়ব্যাপী পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা এভাবে মানবজাতির মধ্যে বিভেদের মন্ত্রণা ছড়িয়েছে, আজও ছড়াচ্ছে। এবং এটা নিঃসন্দেহে বলাই যায় যে, এ সভ্যতা যতদিন থাকবে ততদিন সে কেবল বিভেদের মন্ত্রই শেখাবে, একই স্রষ্টার সৃষ্টি, এক পিতা-মাতার সন্তান মানবজাতিকে কেবল শত্র“তা, বিদ্বেষ, হানাহানি, রক্তারক্তি আর যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যাপৃত রাখবে। এভাবে কোনো মানবসমাজ চলতে পারে না। যে কোনো জাতির টিকে থাকার জন্য, উন্নতি-প্রগতি-সমৃদ্ধির জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। তাই মানবজাতিকে এখন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, তারা আসলে ঐক্য চায় কি না? যদি পৃথিবীর মানুষ এখনও ঐক্যবদ্ধ না হয় তাহলে অচিরেই তাদের অস্তিত্ব ধুলোয় মিশে যাবে, আর যদি তারা ঐক্যবদ্ধ হতে চায় তাহলে সে ঐক্যের ভিত্তিই হতে হবে- পশ্চিমা ‘সভ্যতা’কে প্রত্যাখ্যান করা, স্রষ্টার বিধানকে বরণ করে নেওয়া।

জান্নাতের পূর্বশর্ত তওহীদ, সালাহ নয়

জান্নাতের পূর্বশর্ত তওহীদ, সালাহ নয়

 0

মোহাম্মদ জাকারিয়া হাবিব
সালাহ্ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে ৮০ বারেরও বেশি সালাহ্’এর কথা উল্লেখ করেছেন। ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে আকিদা অর্থাৎ ধারণা আজ বিকৃত হয়ে গেছে। কেউ একে মনে করছে ধ্যান, কেউ মনে করছে শারীরিক ব্যায়াম, কেউ মনে করছে আল্লাহর সামনে প্রণতি স্বীকারের পন্থাবিশেষ, কেউ কিছুই মনে করছে না, ভাবছেন আল্লাহ করতে বলেছেন তাই করতে হবে। অথচ একটি জিনিস সম্পর্কে যদি সঠিক ধারণাই না থাকে তাহলে সেটা থেকে কারও কোনো উপকার হাসিল করা সম্ভব নয়। যেমন আপনাকে একটি মোবাইল ফোন দেওয়া হলো যেটার মধ্যে আধুনিক সকল সুবিধা আছে কিন্তু সেগুলি কিভাবে ব্যবহার করতে হয় আপনি জানেন না, তাহলে কি সেই মোবাইলটি দিয়ে আপনি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন? তেমনি নামাজ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় এ থেকে কেউ কোনো উপকার লাভ করছে না, তবু আল্লাহ বলেছেন বিধায় পড়েই যাচ্ছে, পড়েই যাচ্ছে। সঠিক ধারণা না থাকার কারণে অনেক মিথ্যা কথা নামাজের পক্ষে চালু হয়ে আছে যা কোর’আনেও নেই হাদিসেও নেই। যেমন- বিভিন্ন জায়গায় লেখা দেখা যায়- ‘নামাজ জান্নাতের চাবি।’ অথচ এই কথাটি সঠিক নয়, জান্নাতের চাবি হচ্ছে তওহীদ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া জীবনের কোনো অঙ্গনে আর কারও বিধান মানি না এই সাক্ষ্য দেওয়া।
আরেকটি কথা ছোট কাল থেকে শুনে আসছি, বিশেষতঃ সমাজে একটি দল আছে যারা মানুষকে নামাজের দাওয়াত দেয়, তারা বলে, “এক ওয়াক্ত ফরজ নামাজ বিনা কারণে কাযা করলে এক হোব্বা বা ২ কোটি ৮৮ লক্ষ বছর জাহান্নামের দাউ দাউ করা আগুনে জ্বলতে হবে”। এই কথাটিও না আছে কোর’আনে, না আছে হাদিসে। ফাজায়েলে নামাজ নামক একটি গ্রন্থে এই কথাটি উল্লেখ আছে, সেখানে লেখক বলেছেন, ‘হাদিসে আছে’। কিন্তু তিনি বলেন নি যে, কোন হাদিসে আছে। কোন এবারত, সনদ কিছু ছাড়াই একটি কথাকে হাদিস বলে চালিয়ে দেওয়া কতটুকু গ্রহণযোগ্য? প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো হাদিস নয়, এটি তাদের মনগড়া কথা। এই মনগড়া কথাটি উপর্যুপরি প্রচারের ফলে মানুষের মনে গেঁথে গেছে যে, নামাজ পড়লেই জান্নাতে যাওয়া যাবে এবং না পড়লে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। এই জন্য অনেকেই অন্য কিছুর চিন্তা না করে শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েই নিজেদেরকে পাক্কা মুমিন ও জান্নাতি মনে করেন।
সালাহ্ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরদ অর্থাৎ অবশ্যকরণীয়। কিন্তু সালাহ্, যাকাহ্, হজ্ব, সওম এমনকি জিহাদ পর্যন্ত ইসলামের সকল কাজের পূর্ব শর্ত হচ্ছে আল্লাহকে একমাত্র এলাহ্ (হুকুমদাতা) হিসাবে গ্রহণ করে নেওয়া। এই লা-এলাহা এল্লা আল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া হুকুমদাতা নাই অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা তওহীদের ঘোষণা ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারে না। তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, এই তওহীদ বর্তমানের ব্যক্তি জীবনের আংশিক তওহীদ নয়, এ তওহীদ সার্বিক জীবনের তওহীদ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, শিক্ষা ইত্যাদি মানব জীবনের সর্ব অঙ্গনের তওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। অর্থাৎ জীবনের সর্ব অঙ্গনে যেখানে আল্লাহ ও তার রসুলের কোনো বক্তব্য আছে সেখানে আর কারও কোনো হুকুম না মানা। যে বা যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নিয়ে নবী রসুলদের মাধ্যমে পাঠানো আইন-কানুন, আদেশ-নিষেধকে তাদের সমষ্টিগত জীবনে প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগ করবে তাদের আমল তিনি গ্রহণ করবেন, ব্যক্তিগত সমস্ত অপরাধ, গোনাহ মাফ করে তাদের জান্নাতে স্থান দেবেন। এই প্রতিশ্রুতি সমগ্র কোর’আনে ও সহীহ হাদিসে ছড়িয়ে আছে। এটাকে আরও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেবার জন্য আল্লাহর রসুল তাঁর বিশিষ্ট সাহাবা আবু যরকে (রা.) বললেন-যে লোক মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর তওহীদের ওপর অটল থাকবে সে ব্যভিচারী ও চোর হলেও জান্নাতে প্রবেশ করবে (হাদিস-আবু যর গিফারী (রা.) থেকে বোখারী ও মুসলিম)।
অতএব জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ভর করছে তওহীদের উপরে; সালাহ্ করা আর না করার উপরে নয়। সালাহ্ কাদের জন্য তা আল্লাহ কোর’আনে ঘোষণা করেছেন, হে রসুল আমার বান্দাদের মধ্যে যারা মুমিন তাদেরকে তুমি বল সালাহ্ কায়েম করতে (সুরা-এব্রাহিম,আয়াত-৩১)। আর এই সালাহ্ হচ্ছে ঐ তওহীদ ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থাটি সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য যে চরিত্র দরকার সেই চরিত্র তৈরির প্রশিক্ষণ। এটা ইতিহাস যে, আল্লাহর রসুলের অনেক সাহাবী জীবনে এক ওয়াক্ত সালাহ্ কায়েম করার সুযোগ পাননি, রসুলের হাতে তওহীদের বায়াত গ্রহণ করেই জিহাদে, সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং শাহাদাত বরণ করে জান্নাতে চলে গেছেন। নামাজ বা সালাহ্ যদি জান্নাতের চাবি হতো তাহলে আল্লাহর রসুল নবুয়্যত পেয়েই মানুষকে বলতেন, ‘তোমরা নামাজ পড়’; তাহলেই তোমরা জান্নাতি হবে আর নামাজ যদি না পড় তাহলে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।’ কিন্তু তিনি কি তাঁর জীবনে একবার ও এমন কথা বলেছেন? বলেন নি। এমন কি পবিত্র কোর’আনে এমন একটি আয়াত ও নেই যেখানে বলা হয়েছে, ‘সালাহ্ কায়েম করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে, আর না করলে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।’ বরং জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ভর করে তওহীদের উপরে।
উম্মতে মোহাম্মদী সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্য- জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় দীন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করা। রসুলাল্লাহর ৬০/৭০ বছর পরে যখন জাতি সেই সংগ্রাম ত্যাগ করল, তখন আত্মপক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্যে বহু জাল হাদিস উদ্ভাবন করা হয়। “নামাজ বেহেস্তের চাবি”, “এক ওয়াক্ত নামাজ কাযা করলে এক হোব্বা বা ২ কোটি ৮৮ লক্ষ বছর জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে”- তেমনই দুইটি বানোয়াট হাদিস। যে অসৎ উদ্দেশ্যে এই হাদিস উদ্ভাবন করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্য শতভাগ সফল হয়েছে। যার প্রমাণ এই জনসংখ্যা এখন সম্পূর্ণ সংগ্রামবিমুখ এবং তাদের কাছে ইসলাম মানেই নামাজ। তাদের আকিদায় এখন জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুমের কোনো অস্তিত্ব নেই, প্রয়োজনও নেই। আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করারও কোনো দরকার নেই। তাদের দরকার শুধু নামাজ আর নামাজ। কুফর ও শিরক’র সাগরে নিমজ্জিত থেকেও তারা মনে করে যে শুধু নামাজ পড়েই তারা জান্নাতে চলে যাবেন।
সাবধান আমার কথা থেকে কেউ যেন এটা মনে না করে যে, আমি সালাহ্কে খাটো করছি। পূর্বেই বলেছি যে, মহান আল্লাহ তাঁর কোর’আনে ৮০ বারের ও অধিক সালাহ্র কথা বলেছেন। যে সালাহ্ পবিত্র মেরাজে নিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে শিক্ষা দিলেন, যে সালাহ্ দৈনিক ৫ বার ফরদ সে সালাহ্কে মুমিন খাটো করে দেখতে পারে না। আমি বলতে চেয়েছি, যেটা যে স্থানে থাকা দরকার সেটাকে সে স্থানে রাখাই ন্যায়সঙ্গত, অতিরঞ্জিত করা অন্যায়। তওহীদ ছাড়া সালাহ্র কোনো দামই নেই। নবী করিম (স:) মক্কার ১৩ বছর জীবনে শুধু তওহীদের বালাগ দিয়েছেন। নবুয়্যত প্রাপ্তির ১১ তম বৎসরে পবিত্র মেরাজে গিয়ে রসুল (দ:) সালাহ্ আনলেন, এর মধ্যে যারা শহীদ হয়েছিলেন অথবা মৃত্যু বরণ করেছিলেন তাঁরা তো শুধু তওহীদ নিয়েই জান্নাতে গেলেন। তাঁর নিকট প্রথমে কেউ আসলে তাকে শুধু তওহীদের দিকেই আহবান করতেন। যে তওহীদে আসবে তার জন্যেই সালাহ্। সালাহ্র কথা ৮০ বার কিন্তু তওহীদের কথা সহস্রবার বলা হয়েছে। পবিত্র কোর’আনে সবচাইতে আলোচিত বিষয় তওহীদ, সকল নবীর আনীত দীনের ভিত্তি এই তওহীদ। অথচ আজ সেই তওহীদ পৃথিবীর কোথাও নেই, মানবজাতি কার্যত কাফের ও মোশরেক হয়ে আছে, কিন্তু তা নিয়ে কারও কোনো চিন্তা নেই। তারা ভুলেই গেছে ইসলামের শুরু তওহীদ দিয়ে নামাজ দিয়ে নয়।

মানুষের কাছে আল্লাহর দাবি

মানুষের কাছে আল্লাহর দাবি

 0

মনিরুল ইসলাম:
আল্লাহর মানুষ সৃষ্টির পটভূমি (যা আমরা সুরা বাকারার ৩০ নং আয়াত থেকে জানতে পাই) বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায় তা হলো, আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট মালায়েকদের ডেকে বলেছিলেন যে, আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা সৃষ্টি করতে চাই। তিনি কিন্তু বলেন নি যে মানুষ সৃষ্টি করতে চাই। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, খলিফা সৃষ্টি করবেন। এই খলিফা শব্দের ভেতরেই রয়েছে আল্লাহর মানুষ সৃষ্টির রহস্য এবং পৃথিবীতে আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেওয়া মানবজাতির কাজ। সৃষ্টির (মানুষের) প্রতি স্রষ্টার (আল্লাহর) একমাত্র দাবি ফুটে উঠেছে এই শব্দের ভেতরেই। আসুন দেখে নেই আল্লাহ খলিফা বলতে কি বুঝিয়েছেন?
যে খেলাফত করে সেই খলিফা। মানবজাতি যখন আল্লাহর খেলাফত করবে তখনই তারা আল্লাহর খলিফা হিসেবে পরিগণিত হবে।
খেলাফত হচ্ছে কেউ তার নিজের কাজগুলো নিজে না করে যদি সে সেগুলি করার জন্য তাঁর পক্ষ থেকে অন্য কাউকে নিযুক্ত করে তবে তাকে খেলাফত অর্থাৎ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হলো এবং সেই নিযুক্ত লোকটি হলো খলিফা। আল্লাহ আদম (আ.) অর্থাৎ বনী আদম, মানবজাতিকে তাঁর খলিফা নিযুক্ত করলেন, এবং করলেন তাঁর মহাসৃষ্টির, মহাবিশ্বের মধ্য থেকে শুধু এই পৃথিবীতে।  বললেন – ‘ফিল আরদি খালিফাতুন’ অর্থাৎ পৃথিবীতে, অন্য কোথাও নয়। তাহলে খলিফা হিসেবে পৃথিবীতে মানবজাতির কাজ কী? কর্তব্য কী?
বনী আদমকে, মানুষকে তাঁর খলিফা, প্রতিনিধি নিযুক্ত না করলে আল্লাহর যে কাজ ছিল সেইটাই হলো মানুষের কাজ, কর্তব্য। কী সেই কাজ? আল্লাহর কী কাজ? আল্লাহর কাজ হলো শাসন। নিজের সৃষ্ট এই মহাবিশ্বকে শাসন করাই হলো তাঁর কাজ। পৃথিবীতে এই কাজটা তিনি নিজে না করে দায়িত্ব দিলেন মানুষকে; অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর হয়ে , তাঁর খলিফা, প্রতিনিধি হয়ে পৃথিবীতে শাসন করবে। কেমন করে করবে? আল্লাহ যেমন সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে মহাবিশ্ব শাসন করছেন, যে আইন-কানুন, নিয়মনীতি দিয়ে শাসন করছেন সেই আইন-কানুন, নিয়মনীতি তাঁর খলিফাকে দিয়ে বললেন – এইগুলি অনুযায়ী তোমরা তোমাদের শাসনকার্য পরিচালনা করবে। এটাই হলো তোমাদের ইবাদত যে জন্য তোমাদের আমি সৃষ্টি করেছি।
কাজেই মানবজাতির প্রতি আল্লাহর দাবি একটাই। আর তা হচ্ছে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর সার্বভৌমত্বভিত্তিক পাঠানো দ্বীন উল হক দিয়ে নিজেদের সমষ্টিগত জীবন পরিচালনা করা।
ঠিক এই দাবির বিপরীতে আজ দাঁড়িয়েছে পাশ্চাত্য সভ্যতা। আল্লাহর সার্বভৌমত্বভিত্তিক দ্বীনের বিপরীতে সে দাঁড়িয়েছে মানুষের সার্বভৌমত্বভিত্তিক দ্বীন তথা নানা তন্ত্র-মন্ত্রকে মেনে নেওয়ার দাবি নিয়ে। মানবজাতি ইতোমধ্যেই আল্লাহর দাবিকে (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) প্রত্যাখ্যান করে পাশ্চাত্যদের দাবিকে (মানুষের সার্বভৌমত্ব) মাথা পেতে নিয়েছে। বর্তমানে মানবজাতির রব পাশ্চাত্য ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতা। মুসলিম নামধারী এই জাতিটিসহ সমস্ত পৃথিবীর এক ইঞ্চি মাটি বা পানি নেই যা তাদের প্রভাব বলয়ের বাইরে। তারা অস্ত্রের শক্তিতে মহা-শক্তিধর হয়ে মানবজাতিকে বলছে, তোমরা আমাকে প্রভু (রব) বলে স্বীকার করো, আমার আদেশ পালন করো, এবং তোমরা স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব (উলুহিয়াহ্) ত্যাগ করে মানুষের সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করো। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব অনেক পুরানো ব্যাপার, ওটা অকেজো হয়ে গেছে। তবুও তোমরা যার যার ধর্ম পালন করো কোনো সমস্যা নেই। মুসলমান, তোমরা যত খুশি লম্বা দাড়ি রেখে, মোছ কেটে ফেলে, পাজামা হাঁটু পর্যন্ত টেনে উঠিয়ে মসজিদে দৌঁড়াও, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নামাজ পড়ো, আমার কোনো আপত্তি নেই; খ্রিস্টান, তুমি লম্বা জোব্বা পরে, গলায় ক্রুশ ঝুলিয়ে, গীর্জায় যেয়ে যত খুশি নীতি-বাক্য, বক্তৃতা করতে চাও করো, আমার কোনো আপত্তি নেই; বৌদ্ধ, তুমি গেরুয়া বসন গায়ে দিয়ে, মাথা ন্যাড়া করে, ভিক্ষা করে খাবার সংগ্রহ করে প্যাগোডায় যেয়ে বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে যত খুশি ‘বুদ্ধং’ স্বরণং গচ্ছামী, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামী’ গাও কোনো আপত্তি নেই; হিন্দু, তুমি নামাবলি গায়ে দিয়ে কপালে সিঁদুর আর চন্দনের ফোটা দিয়ে তোমাদের হাজারো রকম মন্দিরের যেটায় খুশি যেয়ে হাজারো রকম মূর্তির সামনে বসে ঘণ্টা বাজাও, কোনো আপত্তি নেই; ইহুদি, তোমরা লম্বা আলখাল্লা গায়ে দিয়ে মাথায় উঁচু টুপি পরে, বুকে ডেভিডের স্টার ঝুলিয়ে সিনাগগে যেয়ে প্রার্থনা করো, কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি তো নেই-ই, বরং এগুলো তোমরা যত বেশি করবে আমি তত খুশি হব; কারণ তোমরা ওগুলো নিয়ে যত বেশি ব্যস্ত থাকবে আমি তত নিরাপদ হব।
এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যেই মানবজাতি আল্লাহর একমাত্র দাবি অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এর ফল মানবজাতি এড়াতে পারছে না। সমস্ত পৃথিবীতে আজ অশান্তির দাবানল দাউ দাউ করে জ্বলছে। মানবজাতির ইতিহাসে তারা আজকের মত এত কঠিন পরিস্থিতির শিকার আর কখনও হয়নি। পৃথিবী নামক এই গ্রহটিতে মানবজাতির অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। এখনও যদি তারা তাদের সার্বিক জীবন থেকে পাশ্চাত্য ইহুদি-খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র সার্বভৌমত্বকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে তাদের জীবনে প্রতিষ্ঠা না করে তবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য।

Wednesday, November 18, 2015

আল্লাহর রাসুল বলেছেন - - -

আল্লাহর রাসুল বলেছেন - - -

শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগে তার পাওনা
পরিশোধ করো...........


যে মানুষদের পরিশ্রমের ঘামে রচিত আমাদের
এই সভ্যতা
তাদের সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে
আমাদের সবার মাঝে.....
আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে যাই যে , মজদুরের
ঘামে চলে পৃথিবীর চাকা.....
শ্রমিকদের প্রাপ্য পাওনা আর সম্মান দিতে ভুলে যায়
কিছু নাক উঁচু মানুষ.....
শ্রেনী বৈষম্য তৈরী করে সঠিক জ্ঞানের
অভাবে.....
অনেকেই ভুলে যায় শ্রমিকের হাত না পরলে এই
আধুনিক পৃথিবী
থাকতো শুধুই পরিকল্পনায় আর কাগজে কলমে....
শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা ফিরে পাক....
দূর হোক রানা প্লাজা ,, তাজনিন গার্মেন্টসের মত
অবাঞ্ছিত ঘটনা.....
পাশাপাশি শিশু শ্রমকে করা হোক নিষিদ্ধ....
তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক বই খাতা কলম...
ভালবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের
জীবন.....