Thursday, February 25, 2016

সনাতন জীবনব্যবস্থাই ইসলাম

সনাতন জীবনব্যবস্থাই ইসলাম


সনাতন শব্দের অর্থ- নিত্য, চিরস্থায়ী, চিরন্তন, শাশ্বত এবং দীনুল কাইয়্যেমা শব্দের অর্থ- যা চিরদিন প্রবহমান, চিরন্তন ও শাশ্বত। এই অর্থে সনাতন এবং কাইয়্যেমা একার্থবোধক। অর্থাৎ যে নিয়ম, নীতি, পদ্ধতি লক্ষ বছর পূর্বে ছিল, এখন আছে এবং লক্ষ বছর পরেও যা সত্য থাকবে। যেমন লক্ষ বছর আগেও আগুন উত্তাপ দিত, এখনও আগুন উত্তাপ দেয় এবং লক্ষ বছর পরেও আগুন উত্তাপ দেবে- এটিই হলো চিরন্তন, শাশ্বত, সনাতন নীতি, পদ্ধতি। এরকম সনাতন, শাশ্বত নিয়ম, নীতি, পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে যে জীবনব্যবস্থা তাই হলো সনাতন জীবনব্যবস্থা বা দীনুল কাইয়্যেমা। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে ইসলামকে দীনুল কাইয়্যেমা বলেছেন (সুরা বাইয়েনাহ-৫, ইউসুফ-৪০)। অর্থাৎ সনাতন জীবনব্যবস্থাই ইসলাম।
আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষনবী (দ.) পর্যন্ত আল্লাহ যে জীবন বিধান মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন, স্থান, কাল ভেদে সেগুলোর নিয়ম-কানুনের মধ্যে প্রভেদ থাকলেও সর্বক্ষণ ভিত্তি থেকেছে তওহীদ এবং মৌলিক বিষয়গুলিতেও কোনো পরিবর্তন আনা হয় নি। এই জীবনব্যবস্থার ভিত্তি এবং মৌলিক বিষয়গুলি সানাতন, শাশ্বত, কাইয়্যেমা, যা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। যেমন ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ, একমাত্র প্রভু, একমাত্র বিধাতা (বিধানদাতা) আল্লাহ। যার আদেশ নির্দেশ, আইন-কানুন ছাড়া অন্য কারো আদেশ, নির্দেশ, আইন-কানুন কিছুই না মানা। আল্লাহ মানুষের কাছে এইটুকুই মাত্র চান। কারণ তিনি জানেন যে, মানুষ যদি সমষ্টিগতভাবে তিনি ছাড়া অন্য কারো তৈরি আইন কানুন না মানে, শুধু তারই আইন-কানুন মানে তবে শয়তান তার ঘোষিত উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে দিয়ে অশান্তি, অন্যায় আর রক্তপাত অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং মানুষ সুবিচারে, শান্তিতে (ইসলামে) পৃথিবীতে বসবাস করতে পারবে- অর্থাৎ আল্লাহ যা চান। কত সহজ। আল্লাহ এই দীনুল কাইয়্যেমার কথা বলে বলছেন- এর বেশি তো আমি আদেশ করি নি (সুরা আল বাইয়েনাহ ৫)।
এই সনাতন জীবনব্যবস্থাই ইসলাম। যুগে যুগে এই জীবনব্যবস্থার মৌলিক রূপের কোনো পরিবর্তন হয় নি। হিন্দুরা যে ধর্মের অনুসারী সেটি যেমন সনাতন ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম, খ্রিস্টানরাও মূলত ঐ একই ধর্মের অনুসারী। আবার বৌদ্ধ, ইহুদি ও মুসলিম সকলেই একই সনাতন বা ইসলাম ধর্মের অনুসারী কারণ আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রসুলদের কাছে যে দীন পাঠিয়েছেন তার নাম ইসলাম। কিন্তু প্রতিটা ধর্মই তার অনুসারীদের মধ্যে থেকে কিছু অতিভক্তিবাদী শয়তান প্রকৃতির স্বার্থান্বেষী মানুষের এবং ধর্মব্যবসায়ীদের হস্তক্ষেপে মূল সনাতন রূপ হারিয়ে গেছে। এর ফলেই আজ নানা ধর্মের সৃষ্টি কিন্তু আদিতে, গোড়ায় এক।

পাথরের সামনে আগুন জ্বালালেই মিলবে ওয়াইফাই

পাথরের সামনে আগুন জ্বালালেই মিলবে ওয়াইফাই



 একে কলিযুগের ‘পরশ পাথর’ বললেও ভুল বলা হবে না। তবে এর ছোঁয়াতেই সব সোনা হয়ে যাবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই পাথরের অদ্ভুত কাজ মানুষকেও অবাক করে। জার্মানির এক মিউজিয়ামে রাখা অদ্ভুত এই পাথরের কাজ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে বেশ হইচই পড়ে গিয়েছে।
কী রয়েছে ওই পাথরে?
দেড় টন ওজনের ওই পাথরটি মিউজিয়ামের বাইরে রাখা রয়েছে। ওই পাথরের সামনে গিয়ে আগুন জ্বালালেই ওয়াইফাই সিগন্যাল চালু হয়ে যায়। শুনে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি।
মিউজিয়ামের বাইরে পড়ে থাকা ওই পাথরকে সাধারণ মানের বলেই ভ্রম হতে পারে। কিন্তু এর ক্ষমতা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। তবে পাথরের ক্ষমতাকে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়েছে। আর এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কেউ ধরতেই না পারেন পাথরের ভিতরে কিছু একটা রয়েছে।
এ বার আসল কথায় আসা যাক। যে পাথরকে নিয়ে এত হইচই আসলে সেটা একটা মামুলি পাথর। বিজ্ঞানীরা পাথরটিকে কেটে ওর ভিতরে একটি থার্মো ইলেক্ট্রিক জেনারেটর বসিয়ে দিয়েছেন। পাথরের গায়ের কাছে আগুন জ্বালালেই সেটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আর সেই তাপকে বিদ্যুতে পরিণত করে। আর এই বিদ্যুৎ মিলতেই মিউজিয়ামের ওয়াইফাই রাউটার চালু হয়ে যায়। সাধারণ পর্যটকেরা সেখানে গিয়ে আগুন জ্বালাচ্ছে আর ওয়াইফাই-এর মজা নিচ্ছেন।
কিন্তু এর আসল কারণ অনেকেরই অজানা। কী ভাবে চালু হচ্ছে ইন্টারনেট তা কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে পাথরটিকে। আর পাথরটির নাম দেওয়াও হয়েছে ‘কিপ এলাইভ’। আনন্দবাজার পত্রিকা।

মো’মেনের সংজ্ঞা কি???

মো’মেনের সংজ্ঞা কি???


মো’মেন শব্দটি এসেছে ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাস থেকে। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ মো’মেনের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে,
“তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে এবং আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না এবং জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ। (সুরা হুজরাত ১৫)।
আল্লাহর দেয়া প্রকৃত মো’মেনের এই সংজ্ঞাটা ঠিক ভাবে বুঝতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে “যারা আল্লাহর ওপর ঈমানে”র অর্থ শুধু আল্লাহর অস্তিত্বে ও একত্বের ওপর ঈমান নয়, তাঁর উলুহিয়াতের ওপর, সার্বভৌমত্বের ওপর (Sovereignty) ঈমান, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন আদেশদাতা, হুকুমদাতা নেই এই বিশ্বাস করা অর্থাৎ তওহীদ।
আল্লাহর দেয়া মো’মেনের এই সংজ্ঞার দ্বিতীয় ভাগ হলো প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে জেহাদ করা। কি জন্য জেহাদ করা? আল্লাহর তওহীদের, সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত দীনটি যদি মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা, কার্যকর না হয় তবে ওটা অর্থহীন। কাজেই আল্লাহর তওহীদ ভিত্তিক ঐ দীনুল হক, সত্য জীবন-ব্যবস্থাটা মানব জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, জেহাদ। এই দু’টি একত্রে প্রকৃত মো’মেনের সংজ্ঞা। এই দু’টি যার মধ্যে আছে, আল্লাহর দেয়া সংজ্ঞা মোতাবেক সে প্রকৃত মো’মেন। এই সংজ্ঞায় আল্লাহ বলেন নি, যে সালাহ পড়বে সে মো’মেন, বা যে রোযা রাখবে সে মো’মেন, বা যে হজ্ব করবে, বা অন্য যে কোন পূণ্য, সওয়াবের কাজ করবে সে মো’মেন।
এ সংজ্ঞায় শুধু আল্লাহ ছাড়া আর সমস্ত রকম প্রভূত্ব, সার্বভৌমত্ব অস্বীকার ও আল্লাহর পথে জেহাদ। এর ঠিক বিপরীতে তিনি এ সতর্কবাণীও বলেছেন যে এ তওহীদে যে বা যারা থাকবে না, যারা তাদের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত জীবনের যে কোন একটি ভাগে, অঙ্গনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বা নিজেদের তৈরি আইন-কানুন, রীতি-নীতি গ্রহণ বা প্রয়োগ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ইলাহ বা সার্বভৌম হুকুমদাতা হিসাবে মানবে তারা শেরক করবে। আর শেরক ক্ষমা না করার জন্য আল্লাহ অঙ্গীকারাবদ্ধ (কোর’আন- সুরা নেসা ৪৮)।
মহান আল্লাহ মো’মেনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন আজ সারা পৃথিবীতে সেই সংজ্ঞা মোতাবেক মো’মেন আছে? নেই। আর মো’মেন নয় মানেই কাফের মোশরেক।

Wednesday, February 24, 2016

ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার উত্তরাধিকার

ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার উত্তরাধিকার




রিয়াদুল হাসান
মানবজাতির ইতিহাসে ধর্মের অধ্যায়টি বিরাট। এ বিরাট অধ্যায়ের দিকে তাকানোর জন্য আমাদের সামনে এখন দুটো চশমা রয়েছে। একটি ধর্মহীন চশমা, আরেকটি ধর্মের চশমা। এ দুটো চশমায় আমাদের অতীত দুটি ভিন্ন প্রকৃতি নিয়ে ধরা পড়ে।
ধর্মহীন চশমা বলছে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এমনিতেই সৃষ্টি হয়েছে, এর কোনো স্রষ্টা নেই। সকল জীব ও জড়ও এমনি এমনিই সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণীকুলের মধ্যে কেউ উন্নত, কেউ অনুন্নত যা নির্ণিত হয়েছে তাদের অভিযোজনের ক্ষমতার তারতম্য দ্বারা। মানুষ (খুব সম্ভবত) একটি বানরজাতীয় বিবর্তিত প্রাণী, যার আদিপিতা-পিতৃব্যরা গাছে থাকত, তাদের লেজ ছিল। খুলির আকৃতির পার্থক্য অনুযায়ী তারা নিগ্রয়েড, ককেশয়েড, মঙ্গলয়েড, অস্ট্রালয়েড ইত্যাদি শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত।
আর ধর্মের চশমা বলছে, এই বিশ্বজগৎ নিজে থেকে সৃষ্টি হয় নি, এর একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি নিরন্তর এটি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিপালন করছেন। তিনি বিশ্বজগতে এমন কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম, ব্যবস্থা বা চক্র আরোপ করেছেন যার দ্বারা সকল বস্তু ও প্রাণির সৃষ্টি, পালন, বাস্তুসংস্থান, ধ্বংস ইত্যাদি সাধিত হয়। মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ ও ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি যার উদ্ভব জান্নাতে, যার আদিপিতা আদম (আ.), আদিমাতা হাওয়া (আ.)। তাদের থেকেই আজকের সকল হিন্দু, সকল বৌদ্ধ, সকল মুসলিম, সকল খ্রিষ্টান, আর সকলেই।
একটি চশমা দিয়ে তাকালে দেখি নূহ (আ.), ইব্রাহীম (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.) ইত্যাদি বহু উজ্জ্বল নাম। অন্য চশমায় তাদেরকে দেখা যায় না, সেখানে আছে বস্তুবাদী দার্শনিক আর বিভিন্ন রাজবংশের নাম। একটি চশমা বলছে, মানব ইতিহাস নবী-রসুলদের মাধ্যমে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রামের ইতিহাস, ধর্মের দ্বারা মানবজাতির শান্তি পাওয়ার ইতিহাস। অন্য চশমাটি বলছে মানুষের অতীত অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল ধর্ম নামক কুসংস্কার ও বর্বরতা দ্বারা। বর্তমানে ধর্ম বিদায় নিয়েছে, মানুষ অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
বর্তমানে আমরা জাতি হিসাবে দ্বিধাগ্রস্ত, ধর্ম ও আধুনিকতা একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দণ্ডায়মান, দু নৌকায় পা দিয়ে আছি আমরা। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি উজ্জ্বল আকর্ষণ নিয়ে হাতছানি দিচ্ছে, ধর্ম ক্রমেই বিবর্ণ ও আকর্ষণহীন বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্তের কণিকায় মিশে আছে যা বাদ দেওয়া সহজ নয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টির যে প্রচেষ্টা বিগত শতাব্দীগুলোতে চালানো হয়েছে তা খুবই সফল হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এই দ্বিধা ও সন্দেহ সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। উপরে যে দুটো চশমার কথা বললাম, বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা, বিশেষ করে মুসলিম নামধারীরা এ দুটো চশমা দিয়েই নিজেদের ইতিহাসকে দেখতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তি থেকে জাতীয় জীবনের সর্বত্র।
এ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মকে রাখা হয়েছে নামে মাত্র। এস.এস.সি পর্যন্ত ধর্মের যেটুকু রাখা হয়েছে সেটুকুর উদ্দেশ্য নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান। কারণ এটা অস্বীকার করার মত অবস্থা এখনও সৃষ্টি হয় নি যে, সকল ভদ্রতা, শিষ্টাচার, সত্যনিষ্ঠা ধর্মেরই অবদান। ধর্ম বইতে বলা হচ্ছে সমস্ত কিছুর মালিক স্রষ্টা, অথচ অন্য সকল বইয়ে ‘আল্লাহ’ শব্দটিও খুঁজে পাওয়া মুশকিল, এমনভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বতে অস্বীকার করা হয়েছে। আর ধর্মকে সবচেয়ে গুরুত্বহীন বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যে ধর্ম সেখানে শেখানো হচ্ছে সেটাও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই আলোচনা করে, সামষ্টিক জীবন কীভাবে চলবে তা শেখানোর জন্য আছে অন্যান্য বিষয়সমূহ। এটা হচ্ছে মানবজাতিকে ধর্মবিমুখ করে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া। কিন্তু পাশ্চাত্যে নানা কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা সফল হলেও প্রাচ্যে এটি কয়েক শতাব্দী পরও খাপ খাচ্ছে না। বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে একটু গভীরে যেতে হবে।
‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ দর্শনটি উনিশ শতকে যুক্তরাজ্য থেকে প্রথমত উদ্ভূত হয়েছে। ১৮৪৬ সালে জর্জ জ্যাকব হোলিওক (George Jacob Holyoake) নামক এক ব্যক্তি সেকুলারিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। Oxford Dictionary-তে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism)-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, Belief that religion should not be involved in the organization of society, education, etc. অর্থাৎ সমাজ কাঠামোতে ধর্মকে সম্পৃক্ত করা যাবে না এমন বিশ্বাস পোষণ করাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এ মতবাদের অনুসারী (Secular) স¤পর্কে বলা হয়েছে, Not connected with spiritual or religious matter যিনি আধ্যাত্মিক বিষয় বা ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নন।
মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে যুক্তি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার নামে Enlightenment Movement-এর ফসল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এর উদ্ভব হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের মাধ্যমে এর অনুসারীরা মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মানবসভ্যতার ইতিহাসে স¤পূর্ণ নতুন দর্শন আমদানি করলেন যে, রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে ধর্মের কোনো স¤পর্ক নেই; ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অন্তরের ব্যাপার; অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা প্রভৃতি থেকে ধর্মকে দূরে রাখতে হবে। তাদের মূল বক্তব্য ছিল, যুক্তি (logic)-ই জীবন পরিচালনার ভিত্তি হবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহপ্রদত্ত নির্দেশনার (divine guidance) কোনো প্রয়োজন নেই। ইউরোপে এই আন্দোলনের সফলতার ফলে ধর্মহীন যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠল, তাতে মানুষ নিতান্তই স্বার্থপর হয়ে গেল, ভোগবাদী হয়ে পড়ল, পূর্বপুরুষ ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গেল। সর্বোপরি নীতিবোধের লোপ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ই এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে প্রকাশ পেল।
মূলত নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ ব্যতীত একটি কল্যাণকর মানবসমাজ কল্পনা করা যায় না। আর নৈতিক শিক্ষার মূল বিষয়টি ধর্মীয় শিক্ষা থেকে উৎসারিত। মানবসমাজে বিরাজিত সকল নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলো, অতিপ্রাকৃতিক শক্তি তথা সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস। এ বিশ্বাসই ব্যক্তিমানুষকে তাঁর আদেশ ও নিয়ম অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করে, পৃথিবীতে ও পরলোকে কু-কর্মের শাস্তি স¤পর্কে অবহিত করে এবং ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হতে উৎসাহ দেয়। স্রষ্টায় বিশ্বাসের কারণেই ব্যক্তি সবচেয়ে গোপন ও নিরাপদ জায়গাতেও শত প্রলোভন সত্ত্বেও অনৈতিক কোনো কাজে জড়িত হতে পারে না। কিন্তু এ বিশ্বাসের বীজ যার হৃদয়ে বপিত হয় নি তার কাছে নৈতিকতা অর্থহীন মনে হয়। ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত নৈতিক শিক্ষা ভঙ্গুর ও বিক্ষিপ্ত। এমন কি এগুলোর আদি উৎসও বিভিন্ন ধর্ম। ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে যে নৈতিক শিক্ষার কথা বলা হয় তাতে ব্যক্তি নিজের বিবেকের কাছে তার দায়বদ্ধতার কারণে নীতি মেনে চলে। ফলে ব্যক্তি যেকোনো দুর্বল মুহূর্তে প্রলোভনে পড়ে কিংবা মানবিক দুর্বলতার কারণে তার নৈতিক গণ্ডির বাইরে চলে যেতে পারে। সে তো পরকালীন শাস্তির ভয়ে নীতি মানছে না, তাই একবার ভাঙলে আবার তা গড়ে তোলার শক্তিশালী অনুপ্রেরণা পায় না। সে ভাবে যে, নশ্বর এই পৃথিবীতে ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে জীবন কেটে গেলেই হলো।
সুতরাং ধর্মকে কাজে লাগিয়েই সামষ্টিক মানুষের চারিত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করা সম্ভব, অন্যভাবে নয়। তাই শিশুকাল থেকেই এ চরিত্রগঠনের প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি যে, ব্যক্তির মানসিক গঠনের উপযুক্ত সময় তার শৈশব ও কৈশোর। এ সময় শিশুকে যেভাবে শিক্ষা দেয়া হবে তার গন্তব্যও সেদিকেই হবে। আমরা সবাই চাই, আমাদের শিশুরা জ্ঞানে-গুণে, যোগ্যতা-দক্ষতায় অনন্য হোক এবং তাদের সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কল্যাণকর কাজে ব্যবহৃত হোক। অথচ তাদেরকে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সকল নৈতিকতার উৎস ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার শিক্ষাই দিয়ে থাকি। আমরা কি দেখছি না যে, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই আজ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, চরিত্র বিকিয়ে টাকার মালিক হওয়ার প্রতিযোগিতা, মিথ্যা আর জালিয়াতির ছড়াছড়ি। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্য যেমন মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি সেই মানুষগুলোকে মনুষ্যত্বসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা। বিকৃত ধর্ম সমাজকে আরো দূষিত করবে। প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা যেমন পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে দিতে হবে তেমনি দিতে হবে রাষ্ট্রের উদ্যোগের মাধ্যমে। রাষ্ট্রই শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন করে। আর সকল পরিবারের পক্ষে সমভাবে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নির্দিষ্ট চারিত্রিক কাঠামোয় তৈরি করা সম্ভব নয়। পরিবারের অজ্ঞতা বা অসচেতনতার কারণে যেন শিশু সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য সমগ্র জাতিকে এ ভার নিতে হবে। নীতিহীন, চরিত্রহীন মানুষ একটি দানব ছাড়া আর কিছু নয়, বিশেষ করে যখন সে কোনো ধ্বংসাত্মক শক্তির অধিকারী হয়ে যায়। এটা উপলব্ধি করে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পর The Philosophy of the Modern Education গ্রন্থে অধ্যাপক বার্বাস বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, “বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অনুশীলন না করলে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কারণ, মানুষ ধ্বংসের উপকরণ অনেক বেশি জোগাড় করে ফেলেছে।”

মাননীয় এমামুযযামানের পারিবারিক ইতিহাস

মাননীয় এমামুযযামানের পারিবারিক ইতিহাস








রাকীব আল হাসান:
মাননীয় এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর পরিবারের ইতিহাস অতি প্রাচীন। রসুলাল্লাহর প্রিয় সাহাবী এবং জামাতা, ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) এর বংশধারায় পন্নী বংশের উদ্ভব। তাঁর পূর্বপুরুষগণ সমগ্র পৃথিবীর বুকে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে উম্মতে মোহাম্মদীর সঙ্গে আরবভূমি থেকে বহির্গত হয়েছিলেন। ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় ৬৫২ সনে রসুলাল্লাহর সাহাবি আহনাফ ইবনে কায়েস (রা.) এর নেতৃত্বে পরিচালিত খোরাসান অভিযানের সেনানী হিসাবে পন্নী বংশের পূর্বপুরুষগণ আফগানিস্তানের হিরাত অঞ্চলে আগমন করেন এবং এখানে বাস করতে থাকেন। পরবর্তীতে ইসলাম যখন ভারতবর্ষে প্রবেশ করে, এই বংশেরই এক ব্যক্তি দিল্লিতে আগমন করেন। ততদিনে আল্লাহর দেওয়া প্রকৃত ইসলাম বিকৃত হয়ে এর মধ্যে বিকৃত অধ্যাত্মবাদ বা সুফিবাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। এমামুযযামানের পূর্বপুরুষগণের মধ্যেও জন্ম নেন অনেক আধ্যাত্মিক সাধক, সুফি ও দরবেশ যার মধ্যে ভারতের বিখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ খাজা মোহাম্মদ হোসাইনী গেসুদারাজ বন্দে নেওয়াজ (র.) (১৩২১-১৪২২ খ্রি.) অন্যতম। তিনি ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তিনি কাররানী (মূল গোত্র কাকার) নামক পাঠান গোত্রে বিবাহ করেন। এই কারণে পরবর্তীতে তার বংশধরগণ তাদের নামের শেষে কাররানি ব্যবহার করতেন। কাররানী স্ত্রীর গর্ভে সৈয়দ খাজা মোহাম্মদ হোসাইনী (র.) এর একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে যার নাম পান্নী (উচ্চারণভেদে হান্নি)। তার বংশধরেরা নামের শেষে কাররানি বা পন্নী দুটোই ব্যবহার করতেন। এ বংশেই জন্ম নেন তাজ খান কররানি যিনি ষোড়শ শতাব্দীতে বঙ্গভূমিতে কাররানী রাজবংশের [Karrani dynasty (1564-1576)] পত্তন করেন। প্রবাদপ্রতিম বীর যোদ্ধা কালাপাহাড় ছিলেন তারই সেনাপতি। বাংলা, বিহার, গৌড়, উড়িষ্যা, ভারতের উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তৃত করেন কররানি বংশীয় শাসকবর্গ। তারা নিজ নামে খোতবা প্রদান ও মুদ্রা প্রবর্তন করেন এবং পুরো ভারতবর্ষ মোগল সম্রাট আকবরের প্রভাবাধীন থাকা সত্ত্বেও দাউদ খান কররানি নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা দিয়ে দিল্লির সঙ্গে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটান। ১৫৭২-১৫৭৬ পর্যন্ত বার বার মোগল বাহিনী বাংলা আক্রমণ করে কিন্তু একবারও নিরঙ্কুশ জয়লাভ করতে পারে নি, একবার আপাত জয়ী হলেও কিছুদিন বাদেই দাউদ খান কররানি তা পুনরুদ্ধার করেন। অতঃপর সাতমাসের রক্তক্ষয়ী রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানি দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন দিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান হিসাবে ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নেন। কররানি রাজবংশের অধীনে যে জমিদারগণ বাস করতেন তারা ইতিহাসে বারভূঁইয়া নামে খ্যাত। তাদের প্রতিরোধের কারণে মোগল সাম্রাজ্য এ অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গরূপে শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন নি দীর্ঘ দিন যাবত। ১৭১৬ পর্যন্ত সাঁইত্রিশজন মোগল সুবাদার বাংলায় শাসন করেন, তারা কেউই শান্তিপূর্ণরূপে শাসন করতে সক্ষম হন নি।
তাজখান কররানির ভাই সুলায়মান খান কররানি তার শাসনামলে জনৈক সুফি সাধক আলী শাহান শাহ্ বাবা আদম কাশ্মিরী (র.)-কে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে টাঙ্গাইল জেলার জায়গিরদার নিয়োগ দান করলে তিনি এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন; এলাকাটি আতিয়া পরগনা বলে খ্যাত হয়, কারণ আতা শব্দের অর্থ দান। পরবর্তীতে বাবা আদম কাশ্মিরী সম্রাট জাহাঙ্গীরকে পরামর্শ দেন কররানি বংশীয় বায়াজীদ খান পন্নীর (সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কাররানির বড় ভাই) সন্তান সাঈদ খান পন্নীকে আতিয়া পরগণার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করার জন্য, সম্রাট জাহাঙ্গীরও সাঈদ খান পন্নীর গুণমুগ্ধ ছিলেন বলে সানন্দে তিনি এ প্রস্তাবে রাজি হন। এই সাঈদ খান পন্নীই করটিয়ার জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। ১৬০৯ সালে বাবা আদম কাশ্মিরীর কবরের সন্নিকটে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মুদ্রিত ১০ (দশ) টাকা মূল্যমানের নোটের একপার্শ্বে আতিয়া মসজিদের ছবি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষই ব্রিটিশ শাসনের অধীন হয়। তখনও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-বগুড়া অঞ্চলে এ ক্ষয়িষ্ণু রাজপরিবারের জমিদারি বজায় থাকে। প্রজাহিতৈষীতা ও ধর্মপরায়ণতার জন্য তারা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করতে তারা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। এক কথায় মাননীয় এমামুযযামানের পরিবারের সঙ্গে আবহমান বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এক সূত্রে গাঁথা।
এই ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারেরই উত্তর পুরুষ মাননীয় এমামুযযামানেরও রয়েছে এক কর্মময় বর্ণাঢ্য জীবন-ইতিহাস। তিনি একাধারে ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম একজন বিপ্লবী, দক্ষ শিকারী, অলিম্পিকে চান্সপ্রাপ্ত রাইফেল শ্যুটার, প্রখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান আবু সাঈদ চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি তাঁর রোগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ নজরুল একাডেমির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
১৯৬৩ সনে এমামুযযামান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য অর্থাৎ এম.পি. নির্বাচিত হন। সমাজসেবায় তাঁর ছিল অনন্য অবদান। ১৯৬৩ সনে তিনি করটিয়ায় হায়দার আলী রেডক্রস ম্যাটার্নিটি এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার হসপিটাল প্রতিষ্ঠা করেন যার দ্বারা এখনও উক্ত এলাকার বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। পরবর্তীতে তিনি সা’দাত ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন নামে প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নের জন্য একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন সত্যের মূর্ত প্রতীক। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন সত্য সন্ধান এবং সত্যের জন্য লড়াই করে গেছেন। তাঁর ৮৬ বছরের জীবনে একবারের জন্যও আইনভঙ্গের কোন রেকর্ড নেই, নৈতিক স্খলনের কোন নজির নেই। আধ্যাত্মিক ও মানবিক চরিত্রে বলীয়ান এ মহামানব সারাজীবনে একটিও মিথ্যা শব্দ উচ্চারণ করেন নাই।
তিনি ছোট বেলা থেকেই দেখেন আমরা মুসলিম জাতি হয়েও ব্রিটিশ খ্রিষ্টানদের দাসে পরিণত হয়ে আছি। যে জাতির হওয়ার কথা ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি সেই আজ সারা পৃথিবীতে নিকৃষ্ট গোলামের জাতিতে পরিণত হয়ে আছে। তিনি এটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। পরিণত বয়সে এসে মহান আল্লাহ তাঁকে বোঝালেন যে মুসলিম দাবিদার এই জাতি তওহীদ (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) ও সত্যদীন ত্যাগ করে কার্যতঃ কাফের-মোশরেকে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ মাননীয় এমামুযযামানকে সত্যের জ্ঞান দান করলেন, হেদায়াহ দান করলেন। তিনি সেই সত্য প্রচারের জন্য, সত্য প্রতিষ্ঠা করবার জন্য ১৯৯৫ সালে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংস্কারমূলক আন্দোলন হেযবুত তওহীদ প্রতিষ্ঠা করলেন। অকুতভয় একদল মোজাহেদ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে হেযবুত তওহীদে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করলেন এবং সত্য প্রচারে, মানবতার কল্যাণে নিজেদের জীবন-সম্পদ উৎসর্গ করে ২০ বৎসর যাবৎ কাজ করে যাচ্ছেন।

হেদায়াহ্হীন তাকওয়া অর্থহীন


মোফাজ্জল হোসাইন সর্দার
দীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদী বিষয় আকিদা ও ঈমানকে যেমন একই বিষয় করে ফেলা হয়েছে তেমনি হেদায়াহ ও তাকওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে এ দু’টি বিষয়কেও এক করে ফেলা হয়েছে।
আমাদের বর্তমান বিকৃত আকিদায় আমরা ইসলামকে যে দৃষ্টিতে দেখি তাতে ‘ধর্মকর্ম’ করে না এমন একটি লোককে যদি উপদেশ দিয়ে নামাজ রোজা করানো যায়, যাকাত দেয়ানো যায়, মিথ্যা পরিহার করানো যায়, সত্য কথা বলানো যায়, এক কথায় সব রকম অন্যায়-মিথ্যাচার থেকে তাকে বাঁচিয়ে পবিত্র জীবন-যাপন করানো যায়, তবে বলা হয় লোকটি হেদায়েত হয়েছে। ভুল বলা হয়, সে হেদায়াত হয় নি, সে তাকওয়া অবলম্বন করেছে অর্থাৎ মুত্তাকী হয়েছে। হেদায়াত ও তাকওয়া দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। হেদায়াত অর্থ সঠিক পথে চলা। আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) যে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যে গন্তব্য স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন সেই পথে চলা। সেটা কোন্ পথ? সেটা হলো ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’’ সহজ-সরল পথ। ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ কী তা তাকওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করল যে মাটি দিয়ে তৈরি তোমার খলিফা আদমকে (মানবজাতিকে) তোমার দেখানো পথ থেকে বিচ্যুত করে তাকে তার নিজের তৈরি করা পথে নিয়ে যাবো যে পথে চলার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে মানুষের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে অশান্তি, অবিচার এবং যুদ্ধ ও রক্তপাত (ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা)। আল্লাহ ইবলিসের ঐ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন এবং তাকে বললেন, আমি মানুষ জাতির মধ্যে আমার নবী-রসুল পাঠিয়ে এমন পথ দেখাব- যে পথে চললে তারা তোমার ঐ অশান্তি-অবিচার, অত্যাচার ও রক্তপাতের মধ্যে যেয়ে পড়বে না। আমার নবী-রসুলদের দেখানো পথে চললে তারা সুবিচার ও শান্তির মধ্যে বাস করবে। এই পথের নাম দিলেন তিনি সিরাতুল মুস্তাকীম; সহজ সরল পথ। এই সহজ সরল পথ কী? এটা হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ, হুকুমদাতা, বিধানদাতা নেই; উপাস্য নেই, প্রভু নেই, কাজেই আর কারো আদেশ নিষেধ না মানা; জীবনের কোনো ক্ষেত্রে আর কারো আইন-কানুন না মানা অর্থাৎ প্রকৃত তওহীদ। আল্লাহ তার প্রদর্শিত পথ এত সহজ কেন করলেন? এই জন্য করলেন যে মানুষ যদি তার আইন, আদেশ নিষেধ ছাড়া অন্য কোনো আইন, জীবন-বিধান না মানে তবেই ইবলিস পরাজিত হবে। সে আর মানুষকে অন্য কোনো পথে পরিচালিত করতে পারবে না এবং মানুষও অশান্তি, অবিচার আর রক্তপাতের মধ্যে পতিত হবে না। কাজেই মানবজাতির মধ্যে যারা এই সিরাতুল মুস্তাকীমে চলবে তারা আল্লাহর দলে, আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোনো জীবন-বিধানকে স্বীকার করবে সেটা সম্পূর্ণই হোক বা আংশিকই হোক, তারা ইবলিসের দলে। বিকৃত আকিদায় তারা ব্যক্তি জীবনে সারারাত নামাজ পড়লেও সারা বছর রোজা থাকলেও সেই ইবলিসের দলে। এই সহজ সরলতাকে বোঝাবার জন্য রসুলাল্লাহ (সা.) বলেছেন- মানুষের সাথে আল্লাহর চুক্তি হচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ইলাহ বলে স্বীকার করবে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে চুক্তি হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাকে জান্নাত দেবেন। এখানে নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদির কোনো শর্ত আল্লাহ রাখেন নি। এই হলো সহজ সরল পথ, সিরাতুল মুস্তাকীম। এই পথে চলা হলো হেদায়াতের পথে চলা, এই হলো আল্লাহর দেয়া দিক-নির্দেশনা।
এখন তাকওয়া অর্থ কী? তাকওয়ার অর্থ সাবধানে জীবনের পথ চলা। কোথায় পা ফেলছেন তা দেখে পথ চলা। অর্থাৎ জীবনের পথ চলায় ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-অঠিক দেখে চলা, অসৎ কাজ পরিহার করে সৎ কাজ করে চলা। কোর’আনের অনুবাদগুলিতে তাকওয়া শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে, ‘আল্লাহভীতি’ দিয়ে, ইংরেজিতে “Fear of God” দিয়ে। তাতে প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পায় না। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় এর মাপকাঠি আসবে কোথা থেকে? এর মাপকাঠি অবশ্যই আল্লাহ ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি দিয়েছেন সেইটা, অন্য কোনো মাপকাঠি নয়। কাজেই সে হিসাবে আল্লাহভীতি এবং Fear of God শব্দগুলো চলে এবং সেই হিসাবেই তাকওয়া শব্দের অনুবাদে ওগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদে আল্লামা ইউসুফ আলী অনুবাদ করেছেন Fear of God বলে এবং মোহাম্মদ মারমাডিউক পিকথল করেছেন Mindful of duty to Allah অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে চেতনা বলে। প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া শব্দের মর্ম হলো আল্লাহ ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, সেই মাপকাঠি মোতাবেক জীবনের পথে চলা। যারা অমন সাবধানতার সঙ্গে পথ চলেন তাদের বলা হয় মুত্তাকী। তাহলে দেখা যাচ্ছে তাকওয়া ও হেদায়াত দু’টো আলাদা বিষয়। তাকওয়া হচ্ছে সাবধানে পথ চলা আর হেদায়াত হচ্ছে সঠিক পথে চলা। আরও পরিষ্কার করার চেষ্টা করছি। আপনি আপনার গন্তব্য স্থানের দিকে দু’ভাবে যেতে পারেন। অতি সাবধানে পথের কাদা, নোংরা জিনিস এড়িয়ে, গর্ত থাকলে গর্তে পা না দিয়ে, কাঁটার উপর পা না ফেলে চলতে পারেন। ওভাবে চললে আপনার গায়ে ময়লা লাগবে না, আছড়ে পড়ে কাপড়ে কাদামাটি লাগবে না। আবার পথের ময়লা, গর্ত, কাঁটা ইত্যাদির কোনো পরওয়া না করে সোজা চলে যেতে পারেন। ওভাবে গেলে আপনি আছাড় খাবেন, গায়ে-কাপড়ে ময়লা কাদামাটি লাগবে। আর হেদায়াত হচ্ছে আপনি এ উভয়ভাবের যে কোনও ভাবে যে পথে চলছেন সে পথ সঠিক হওয়া, অর্থাৎ সে পথ আপনাকে আপনার প্রকৃত গন্তব্য স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিনা। পথ যদি সঠিক না হয়ে থাকে অর্থাৎ হেদায়াত না থাকে তবে আপনার শত সাবধানে পথ চলা অর্থাৎ শত তাকওয়া সম্পূর্ণ বিফল, কারণ আপনি আপনার গন্তব্যস্থানে পৌঁছবেন না। আর যদি সঠিক পথে অর্থাৎ হেদায়াতে থাকেন ও চলেন তবে তাকওয়া না করেও গায়ের কাপড়ে কাঁদামাটি লাগিয়ে আপনি আপনার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যাবেন আপনি সফলকাম হবেন। অর্থাৎ তাকওয়া এবং হেদায়াতের মধ্যে বুনিয়াদেই পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সেই সাথে এটাও দেখা যাচ্ছে যে- হেদায়াহ না থাকলে তাকওয়া অর্থহীন এবং সেই হেদায়াত, সঠিক পথটি হলো সিরাতুল মুস্তাকীম, সহজ সরল পথ, জীবনের কোনো ক্ষেত্রে এক আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান না মানা, তওহীদ।
[মতামতের জন্য: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৯৩৩৭৬৭৭২৫, ০১৭৮২১৮৮২৩৭, ০১৬৭০১৭৪৬৪৩]

তাহাজ্জুদ যখন ঘুম নষ্ট রোজা যখন উপবাস

তাহাজ্জুদ যখন ঘুম নষ্ট রোজা যখন উপবাস

মূল: এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী
ভবিষ্যতে মুসলিম নামধারী এই জাতিটির কতখানি আকীদা বিচ্যুতি ঘটবে এবং তার দরুন তারা যে ইসলামের গণ্ডি থেকেই বহিরাগত হয়ে যাবে তা বোঝাতে গিয়ে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে রসুলাল্লাহ (সা.) বলেন- ‘এমন সময় আসবে যখন ইসলাম শুধু নাম থাকবে, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, মসজিদসমূহ লোকে লোকারণ্য হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না, আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে সর্বনিকৃষ্ট জীব, তাদের তৈরি ফেতনা তাদের উপরই পতিত হবে। (আলী (রা.) থেকে বায়হাকী, মেশকাত)। কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে- এই কথাটি কীভাবে অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে তা বর্তমানে এই জাতির দিকে লক্ষ করলেই পরিষ্কার। কোর’আনের হুকুম এবং শিক্ষা এই জাতি প্রত্যাখ্যান করে দাজ্জালের হুকুম, বিধান মেনে নিয়েছে। কাজেই বর্তমানে কোর’আন শুধুু অক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আবার একই বক্তব্যের সমর্থনে তিনি অপর একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, “এমন সময় আসবে যখন মানুষ রোজা থাকবে কিন্তু তা হবে না খেয়ে থাকা, রাত জেগে নামাজ পড়বে কিন্তু তা হবে কেবল ঘুম নষ্ট করা (অর্থাৎ তাহাজ্জুদ হবে না)। (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, তাবারানী, দারিমি, মেশকাত)।” এই হাদিসগুলোতে মহানবী (সা.) কাদের বোঝাচ্ছেন? প্রথম হাদিসে বলা হয়েছে- ইসলাম শুধু নাম থাকবে। অর্থাৎ ইসলাম শুধুমাত্র নামের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কার্যত ইসলামের নামে যেটা চলবে সেটা প্রকৃত ইসলাম হবে না। আর যেটা প্রকৃত ইসলাম নয় তার অনুসারীরাও যে প্রকৃত মুসলিম নন- তা বোঝা যায় সাধারণ জ্ঞানেই। আবার একই হাদিসে তিনি বলেছেন- মসজিদসমূহ লোকে লোকারণ্য হবে, কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না। এখানেও একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ মানুষ মসজিদে যাবে, সেখানে গিয়ে আল্লাহর এবাদত করবে, নামাজ পড়বে কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও তাদের মধ্যে হেদায়াত থাকবে না। আর হেদায়াত না থাকার মানেই হলো তারা হবে পথভ্রষ্ট।
আবার দ্বিতীয় হাদিসে তিনি মানুষ বলতে তাদেরই বোঝাচ্ছেন যারা নিজেদের মুসলিম বলে মনে করে। কারণ তিনি অন্য নবীদের উম্মত খ্রিষ্টান-ইহুদিদের সম্বন্ধে বলছেন না। দ্বিতীয় কথা হলো হাজারো রকমের এবাদতের মধ্য থেকে মাত্র দু’টি তিনি বেছে নিয়েছেন। একটি রোজা অন্যটি তাহাজ্জুদ। তৃতীয় হলো এর একটা ফরদ-বাধ্যতামূলক, অন্যটি নফল- নিজের ইচ্ছাধীন। বিশ্বনবী (সা.) পাঁচটি বাধ্যতামূলক ফরজ এবাদত থেকে একটি এবং শত শত নফল এবাদত থেকে একটি বেছে নেয়ার উদ্দেশ্য হলো এই মনস্তত্ত্বের দিক দিয়ে আল্লাহ রসুল ও দীনের উপর পরিপূর্ণ (মোকাম্মেল) ঈমান ছাড়া কারো পক্ষে এক মাস রোজা রাখা বা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব নয়। এমনকি মোকাম্মেল ঈমান আছে এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা তাহাজ্জুদ পড়েন না। অর্থাৎ রসুলাল্লাহ বোঝাচ্ছেন তাদের যাদের পরিপূর্ণ দৃঢ় ঈমান আছে আল্লাহ-রসুল-কোর’আন ও ইসলামের উপর। এই হাদিসে তিনি মোনাফেক বা লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ রিয়াকারীদের বোঝান নি। কারণ যে সব এবাদত লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ মসজিদে যেয়ে নামাজ-হজ্ব-যাকাত ইত্যাদি একটিও উল্লেখ করেন নি। মোনাফেক রিয়াকারী বোঝালে তিনি অবশ্যই এগুলো উল্লেখ করতেন যেগুলো লোক দেখিয়ে করা যায়। তিনি ঠিক সেই দু’টি এবাদত উল্লেখ করলেন যে দুটি মোনাফেক ও রিয়াকারীর পক্ষে অসম্ভব, যে দু’টি লোকজন দেখিয়ে করাই যায় না, যে দুটি পরিপূর্ণ ঈমান নিয়েও সবাই করতে পারে না। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি ভবিষ্যত বাণী করেছেন যে এমন সময় আসবে যখন আমার উম্মতের মানুষ পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হয়ে নামাজ-রোজা-হজ্ব-যাকাত-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি সর্ববিধ এবাদত করবে কিন্তু কোন কিছুই হবে না, কোন এবাদত গৃহীত-কবুল হবে না। যদি দীর্ঘ এক মাসের কঠিন রোজা এবং মাসের পর মাস বছরের পর বছর শীত-গ্রীষ্মের গভীর রাত্রে শয্যা ত্যাগ করা তাহাজ্জুদ নিষ্ফল হয়, তবে অন্যান্য সব এবাদত অবশ্যই বৃথা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা শুধু পরিপূর্ণ বিশ্বাসী অর্থাৎ মোকাম্মল ঈমানদারই নয়, রোজাদার ও তাহাজ্জুদীও, তাদের এবাদত নিষ্ফল কেন? তাছাড়া তাদের এবাদতই যদি বৃথা হয় তবে অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের এবাদতের কী দশা?
মহানবীর (সা.) ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর একমাত্র সম্ভাব্য উত্তর হচ্ছে এই যে, তিনি যাদের কথা বলছেন তারা গত কয়েক শতাব্দী ও আজকের দুনিয়ার মুসলিম নামধারী জাতি। আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) এই জাতির সম্মুখে যে উদ্দেশ্য স্থাপন করে দিয়েছিলেন সটা হলো আল্লাহর দেওয়া সত্যদীন, দীনুল হক পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠা করে মানবজীবন থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই আকিদার বিকৃতিতে জাতি তা বদলিয়ে অন্য উদ্দেশ্য স্থাপন করে নিয়েছে। আল্লাহ রসুলের (সা.) স্থাপিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, আনুগত্যশীল, দুর্জেয় সংগ্রামী চরিত্রের প্রয়োজন, সেই চরিত্র তৈরির জন্য যে প্রশিক্ষণ- সেই প্রশিক্ষণ (অর্থাৎ সালাহ, সওম বা নামাজ, রোজা) এবং আরও অন্যান্য ব্যাপারকে ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্যই যেখানে নেই বা বিকৃত সেখানে প্রশিক্ষণের আর কোন দাম, অর্থ থাকতে পারে না। কাজেই ঐসব প্রশিক্ষণ অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি সর্ব প্রকার এবাদত আজ নিষ্ফল, অর্থহীন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে আমার এই কথায় বর্তমানের এই জাতিটি- যেটা নিজেকে শুধু মুসলিম নয় একেবারে উম্মতে মোহাম্মদী বলে মনে করে- এই জাতি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে। বিশেষ করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে এই জাতির সেই অংশ যেটা আল্লাহ রসুলের কঠোর সতর্ক বাণী ও নিষেধ অগ্রাহ্য করে, সেরাতুল মোস্তাকীম ও দীনুল কাইয়্যেমা (জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর দেয়া বিধান ছাড়া সমগ্র বিধান অস্বীকার, সালাহ ও যাকাত প্রতিষ্ঠা) ত্যাগ করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফতোয়াবাজী করে জাতিকে শত টুকরোয় ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছেন এবং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে সেই অন্য অংশটি যেটা আত্মার উৎকর্ষ ও আল্লাহর সান্নিধ্যের নাম করে জাতির সম্মুখে আল্লাহ ও রসুলের (সা.) স্থাপিত উদ্দেশ্য (মানবতার কল্যাণ) বদলিয়ে অন্য উদ্দেশ্য স্থাপন করেছেন, যে জাতিকে বিশ্বনবী (সা.) মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সে জাতিকে সংগ্রাম ভুলিয়ে হাতে তসবিহ ধরিয়ে দিয়ে টেনে খানকায় বসিয়ে দিয়েছেন, জাতির বর্হিমুখী দৃষ্টিভঙ্গীকে অন্তর্মুখী করে তাকে কাপুরুষে পরিণত করেছেন, সিংহকে ইদুরে পরিণত করেছেন।
অকপট সত্যান্বেষী মন নিয়ে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন যে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থাকে জাতীয় জীবনে অস্বীকার করে মানুষের তৈরি জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিণতিতে পৃথিবীতে যে অন্যায়-অবিচার শোষণ-রক্তপাত হচ্ছে সে সবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে সে সব থেকে মুখ ফিরিয়ে যারা মহা এবাদতে মশগুল হয়ে আছেন যাবতীয় অন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে যারা প্রচণ্ড বিরোধ গড়ে তুলছেন না, যারা নানাভাবে জাতির ঐক্য ধ্বংস করে যাচ্ছেন তারাই হচ্ছেন রসুলাল্লাহর (সা.) ঐ ভবিষ্যতবাণীর লক্ষ্য। আল্লাহ এই জাতিকে লক্ষ্য করে বলছেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি (উম্মাহ) কারণ মানবজাতির মধ্যে থেকে তোমাদিগকে উত্থিত করা হয়েছে এই জন্য যে (তোমরা মানুষকে) সৎ কার্য করার আদেশ দান এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত করবে, আল্লাহকে বিশ্বাস করবে (কোর’আন- সুরা আলে-ইমরান ১১০)।” অর্থাৎ এই উম্মাহকে মানব জাতির মধ্য থেকে সৃষ্টিই করা হয়েছে মানুষকে অসৎ কাজ (আল্লাহর বিধানের বিরোধী কাজ অর্থাৎ যে কাজে মানুষের অকল্যাণ হয় তাই হলো অসৎ কাজ) থেকে নিবৃত্ত করা ও সৎ কাজ (আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কাজ অর্থাৎ যে কাজ করলে মানুষের কল্যাণ হয় তাই হচ্ছে সৎকাজ) করার আদেশ করার জন্য এবং এই কাজ করার জন্যই সে জাতি শ্রেষ্ঠ জাতি। যে বা যারা এবাদতের নাম করে আল্লাহর যিকরের নাম করে বা যে কোন ছুতোয় বিরোধিতার ভয়ে, পার্থিব ক্ষতির ভয়ে, যে জন্য তাদের মানব জাতির মধ্য থেকে উত্থিত করা সেই কাজ থেকে পালায় তবে সে বা তারা আর সেই শ্রেষ্ঠ জাতির মধ্যেই নেই সুতরাং তাদের সব রকম এবাদত অর্থহীন, নিষ্ফল। (যখন সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার দায়িত্ব পালন ত্যাগ করা হয় তখন মানুষের কোন আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। হাদিস তিরবানী।)
এইখানে আরও একটি কথা বুঝে নেয়া প্রয়োজন। কোর’আনের এই আয়াতে আল্লাহ সৎকাজের জন্য যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটা হলো আদেশ, আরবিতে ‘আমর’। আদেশ তখনই করা যায় যখন সে আদেশকে কাজে পরিণত করা যায়, অর্থাৎ কাজে পরিণত করার শক্তি থাকে, নইলে খুব জোর অনুরোধ করা যায়। অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত করার ব্যাপারেও তাই। মানুষকে অর্থাৎ সমাজকে সৎকাজ করার আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার শক্তি শুধু রাষ্ট্রের থাকে অন্য কারো নয়। অন্য যে কেউ করতে গেলে তাকে শুধু অনুরোধ বা কাকুতি-মিনতি করতে হবে। কিন্তু আল্লাহ অনুরোধ শব্দ ব্যবহার করেন নি, করেছেন ‘আমর’ আদেশ অর্থাৎ ঐ কাজ করতে হবে রাষ্ট্রশক্তিতে। উপদেশ ও অনুরোধে যে ও কাজ হবে না তার প্রমাণ বর্তমান মানব সমাজ। এই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ, অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা যে আল্লাহ উপদেশ, অনুরোধের মাধ্যমে করা বোঝান নি তা পরিষ্কার হয়ে যায় তার কোর’আনের আরেকটি আয়াতে। তিনি বলেছেন- এরা (মো’মেন) তারা, যাদের আমি তাদের পৃথিবীতে (বা পৃথিবীর যে কোন অংশে) ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করলে সালাত (নামাজ) কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং ন্যায়, সৎ কাজের আদেশ দেয়, এবং অন্যায়, অসৎ কাজ থেকে বিরত করে (কোর’আন- সুরা আল-হজ ৪১)। এখানে লক্ষ্য করুন-মানুষকে ন্যায় কাজের আদেশ এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখার জন্য আল্লাহ কী পূর্বশর্ত দিচ্ছেন। তিনি বলছেন আমি তাদের পৃথিবীতে (বা পৃথিবীর যে কোন অংশে) ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার পর, কারণ তিনি ভালো করেই জানেন যে, ন্যায় কাজের আদেশ ও মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা এ দু’টোর কোনটাই সম্ভব নয় রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া। সুতরাং যারা অনুরোধ, উপদেশ, কাকুতি-মিনতি করে ঐ কাজ করতে চেষ্টা করছেন তারা পণ্ডশ্রম করছেন। কাজেই রাষ্ট্রশক্তি যাদের নিয়ন্ত্রণে তাদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্যই হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত হওয়া এবং জাতিকে বিরত রাখা। এর জন্য যে সঠিক আদর্শ দরকার তাই আমরা তুলে ধরছি।
[মতামতের জন্য ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৯৩৩৭৬৭৭২৫, ০১৭৮২১৮৮২৩৭, ০১৬৭০১৭৪৬৪৩]