Sunday, February 28, 2016

নারী

নারী


রুম্মানা খানম কণিকা:
সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদানকে উল্লেখ না করে কোনো উপায় নেই। অধিকাংশ মহৎ কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কার পুরুষ সগৌরবে গ্রহণ করলেও তার সাফল্যের জন্য পর্দার অন্তরালে থেকে নীরবে কাজ করে গেছে কোনো না কোনো নারী, অন্ধ সমাজের দৃষ্টি খুব কমই সেই নারীর দিকে আকৃষ্ট হয়। নজরুল লিখেছেন:
কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি, কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোনো কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।
কোনো স্বীকৃতি তো নেইই- উল্টো আজকের এই সভ্যতার মুখোস পরা সমাজে নারীরা পদে পদে হচ্ছেন নির্যাতিত, নিষ্পেষিত। আজকের সমাজ যেন ১৪০০ বছর আগের আরবের সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছে। সে সময় অনেকে সদ্যজাত কন্যা শিশুকে মাটিচাপা দিয়ে দিত। পিতা-মাতার সম্পত্তিতে তাদের কোন অধিকার স্বীকৃত ছিল না। নারীর চরম অবমাননার এই যুগে ইসলাম এসেছিল নারীর মুক্তির বার্তা নিয়ে। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রের সর্বত্র নারীর অবাধ বিচরণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলাম যা আজ থেকে এক শতাব্দী আগে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেও ছিল অচিন্ত্যনীয়। আল্লাহ তাঁর কাছে যে জীবনব্যবস্থা পাঠিয়েছিলেন সেটা বাস্তবায়নের ফলেই অর্ধ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল চূড়ান্ত ন্যায়, সুবিচার, নিরাপত্তা ও অনাবিল শান্তি। তবে সেই ইসলাম আর আজকের ইসলাম এক নয়। এ কারণে তার ফলও সম্পূর্ণ বিপরীত, চরম অশান্তি।
নারী সৃষ্টিগতভাবে শান্তির আধার:
নারী ও পুরুষ উভয়কেই আল্লাহ তাঁর প্রতিনিধি বা খলিফা হিসাবে সৃষ্টি করলেও তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পৃথক। আল্লাহ আদমকে সৃষ্টির পর জান্নাতের অঢেল সুখ ও শান্তিময় পরিবেশে বসবাস করতে দিলেন। সেখানে তাঁর ছিল যেখানে খুশি যাওয়ার, যা খুশি খাওয়ার, যা খুশি করার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। কিন্তু জান্নাতের এত সুখ-সম্ভোগ ও রঙ-রূপ-রসও তাঁকে আনন্দ দিতে পারছিল না, সব কিছু অর্থহীন, বিবর্ণ, নিরস মনে হচ্ছিল। তখন আল্লাহ তাঁরই পাঁজড়ের হাড় থেকে সৃষ্টি করলেন তাঁর সঙ্গিনী এবং সাহায্যকারী হাওয়াকে (বাইবেল- জেনেসিস ২:২২)। মা হাওয়াকে পেয়ে শান্তির সুধারসে আদমের হৃদয় পূর্ণ হয়ে গেল। এরপর আল্লাহর একটি হুকুম অমান্য করায় আল্লাহ তাঁদের উভয়কে শাস্তি-স্বরূপ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। শাস্তি হলো, পুরুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করে পরিবারের ভরণপোষণ করবে আর নারী গর্ভযাতনা সহ্য করবে, সন্তান লালন পালন করবে (বাইবেল- জেনেসিস ৩:১৬-১৭)। আর আল্লাহর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সঙ্গী হিসাবে তার পাশে থাকবে। অর্থাৎ আল্লাহ নারীকে সৃষ্টিই করেছেন রহমত, বরকত ও নেয়ামত হিসাবে। তিনি বলেছেন, “আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া।” (আর-রূম ৩০:২১) আর আল্লাহর রসুল বলেছেন, সমগ্র পৃথিবী আল্লাহর নেয়ামত আর সম্পদরাশিতে পূর্ণ এবং সেই সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে মঙ্গলময় সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ ও নেয়ামত হচ্ছে সেই স্ত্রী যে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি সদা সতর্ক (সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড ৩৪৫৬)। সুতরাং যে কর্মকাণ্ডে নারী নেই সেটা প্রাণহীন। তাদের আগমনেই মানবজীবনের প্রতিটি অঙ্গন শান্তিময় হয়ে উঠবে।
আদমের (আ.) পর থেকে পৃথিবীতে যখন মানুষের বিস্তার হলো আল্লাহ তাদের শান্তিতে জীবনযাপনের জন্য নবী রসুলদের মাধ্যমে তাঁর বিধান পাঠাতে থাকলেন। সেই বিধানগুলি মানুষ যখন মেনে চোলত তাদের সমাজে অনাবিল শান্তি বিরাজ করত। কিন্তু নবীদের প্রস্থানের পর একটি শ্রেণির জন্ম হয়েছে প্রতিটি জাতির মধ্যে যারা ঐ বিধানের অর্থাৎ ধর্মের ধারক বাহক সেজে বসেছে। তারা নিজেদের পার্থিব স্বার্থে আল্লাহর বিধানকে বিকৃত করে ভারসাম্যহীন করে ফেলেছে। ফলে ধর্মই হয়ে দাঁড়িয়েছে নিষ্ঠুর নির্যাতনের কল। সেই বিকৃত বিধানের ফলে সমাজের শান্তিময় পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। কোমলমতি নারীরা স্বভাবতই সামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে।
দাজ্জাল অর্থাৎ ইহুদি খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’র বস্তুবাদী জীবনের আকর্ষণ, সম-অধিকার, স্বাধীনতা জাতীয় প্রহেলিকামূলক মতবাদ, আর্থিক উৎকর্ষের পেছনে ছুটে ছুটে আমাদের নারী সমাজের বড় একটি অংশও তাদের সৃষ্টিগত আত্মিক ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য হারিয়েছেন, তাদের সৌন্দর্য, করুণা, দয়া-মায়া, শিষ্টাচার, নম্রতা, লাজ-লজ্জা সবই প্রায় খুইয়েছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ স্নেহবঞ্চিত নিরাশ্রয় নারীকে রুজি রোজগারের জন্য কঠোর পরিশ্রমের কাজের দিকে, প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলার দিকে ঠেলে দেয়। আমাদের গ্রাম বাংলার অনেক নারী কৃষিক্ষেত্রে দিনমজুরী করছেন। একজন পুরুষ দিনমজুর সারাদিন রৌদ্রে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে পরিশ্রমের কাজগুলি করেন একজন নারী দিনমজুরও সমান পরিশ্রমের কাজ করেন। তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং নারী হিসাবে তাদের যে জীবন প্রাপ্য ছিল তা থেকেও বঞ্চিত। পাশাপাশি পুরুষালি কাজগুলি করে তারা তাদের নারীসুলভ চারিত্রিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যও হারাচ্ছেন।

যুলুম শব্দের সঠিক অর্থ

যুলুম শব্দের সঠিক অর্থ

মসীহ উর রহমান
পবিত্র কোরআনে ‘যুলুম’ শব্দটি আল্লাহ অনেকবার ব্যবহার করেছেন। এর প্রকৃত অর্থ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এর অর্থ করা হয় অত্যাচার, মারধর ইত্যাদি দ্বারা। কোরআনের সব ইংরেজি অনুবাদেও এই শব্দকে (Tyranny, Oppression) অনুবাদ করা হয়েছে। আসলে ‘যুলুম’ শব্দের অর্থ এর থেকে অনেক ব্যাপক। আল্লাহ যে অর্থে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন তা সংক্ষেপে এই- যা হওয়া বা করা উচিৎ নয়, তা হওয়া বা করা এবং যা হওয়া বা করা উচিৎ তা না হওয়া বা না করা। এক কথায় অন্যায়। প্রশ্ন হতে পারে, ন্যায়- অন্যায়ের মাপকাঠি কী? উত্তর হচ্ছে স্রষ্টা যে মাপকাঠি ঠিক করে দিয়েছেন সেই মাপকাঠি মোতাবেক যেটা ন্যায় এবং যেটা অন্যায়। আল্লাহ যে জীবন-ব্যবস্থা, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি মানুষকে দিয়েছেন সেই মাপকাঠি দিয়ে না মেপে মানুষের কাজকে যদি মানুষের গড়া মাপকাঠি দিয়ে মাপা হয় তবে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে অন্যায়-যুলুম। জীবনের যে অঙ্গনেই তা করা হবে সেই অঙ্গনেই অন্যায় হবে, যুলুম হবে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন- যা অবতীর্ণ করা হয়েছে (কোর’আন) সেই মোতাবেক যারা শাসন- বিচার করে না তারা যালেম (সুরা মায়েদা,আয়াত-৪৫)। অর্থাৎ বিচার ও শাসনে ন্যায়- অন্যায়ের মাপকাঠি হিসাবে আল্লাহর দেয়া মাপকাঠি কোর’আনকে যারা নেয় না, নিজেরা ইচ্ছামত মাপকাঠি তৈরি করে নেয় তারা যালেম অর্থাৎ অন্যায়কারী কারণ তাদের কাজের ফলে অন্যায় সংঘটিত হবে, অবিচার সংঘটিত হবে। উদাহরণ স্বরূপ ধরুন-দুটি দেশ; একটি দেশের শাসনকর্তা স্রষ্টার দেয়া ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি দিয়ে বিচার করেন, স্রষ্টার দেয়া দণ্ডবিধি অনুসারে শাস্তি ও পুরস্কার দেন, শাস্তির ব্যাপারে কাউকে ক্ষমা করেন না, কঠিন শাস্তিকে লঘুও করেন না। আপাতঃদৃষ্টিতে তিনি নির্দয়, যালেম। অন্য দেশটির শাসক স্রষ্টার দেয়া ব্যবস্থাকে অতি কঠোর মনে করে নিজের তৈরি ব্যবস্থায় বিচার করেন, অপরাধীদের লঘুদণ্ড দেন বা মাফই করে দেন। আপাতঃদৃষ্টিতে তিনি একজন সহৃদয় শাসনকর্তা। কিন্তু কোরআনের সংজ্ঞা অনুযায়ী আল্লাহ্র দৃষ্টিতে প্রথম জন ন্যায়বান ও দ্বিতীয় জন যালেম। কারণ, প্রথম জনের দ্বারা স্রষ্টার নির্ধারিত বিচার ও শাাস্তি প্রয়োগের ফলে সমাজ থেকে অপরাধ প্রায় নির্মূল হয়ে যাবে, মানুষ নিরাপত্তা ও শান্তিতে বাস করতে পারবে। দ্বিতীয় জনের সহৃদয়তায়, লঘু শাস্তির ফলে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে দেশে অপরাধ বাড়বে এবং বহু লোক অপরাধের শিকার বা মজলুম হবে; অর্থাৎ ঐ সহৃদয় শাসকের কাজের ফলে সমাজের উপর যুলুম, অন্যায় হবে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা আমার নাজেলকৃত আয়াত দ্বারা বিচার করে না, তারা যালেম (সুরা মায়েদা ৪৫)।’
নিজ বাবা-মা ও আত্মীয়বর্গের প্রতি মানুষের কর্তব্য পালন করা অপরিহার্য্য এবং কর্তব্যে অবহেলা করা অনুচিত ও অমানবিক। যারা তা করে আমরা তাদেরকে যালেম বলে আখ্যায়িত করি। কিন্তু যখন দেখা যায় সেই ঘনিষ্ঠজনেরা আল্লাহ ও রসুলের বিরুদ্ধাচারী তখন তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করাই ন্যায় এবং আন্তরিক সম্পর্ক রক্ষা করাই যুলুম। এ ব্যাপারে আল্লাহ্র ঘোষণা, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতা যদি ঈমানের মোকাবেলায় কুফরিকে শ্রেয় জ্ঞান করে তবে উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে, তাহারাই যালেম’ (কোর’আন, সুরা তওবা, আয়াত-২৩)। আজকে আল্লাহ্র দেয়া জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে মানব জাতি এখন সেই ইহুদি-খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র দেওয়া জীবনব্যবস্থা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদি গ্রহণ করে নিয়েছে, এভাবে তারা নিজেরাও ঐ জাতিগুলির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এর ফলে মানবজাতি যে অন্যায় বা যুলুমের শিকার হয়েছে তার কদর্য রূপ আমরা বর্তমান দুনিয়ার দিকে তাকালে দেখতে পাই। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারে, দরিদ্রের উপর ধনীর বঞ্চনায়-শোষণে, শাসিতের উপর শাসকের অবিচারে, ন্যায়ের উপর অন্যায়ের বিজয়ে, সরলের উপর ধূর্তের বঞ্চনায় পৃথিবী আজ মানুষের বাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য।

Friday, February 26, 2016

তন্ত্র-মন্ত্রের পূজা ছেড়ে তওহীদে ফিরে আসার আহ্বান

তন্ত্র-মন্ত্রের পূজা ছেড়ে তওহীদে ফিরে আসার আহ্বান

মনিরুজ্জামান মনির
আল্লাহ আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যতো নবী ও রসুল পৃথিবীর বিভিন্ন মানব সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করেছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি একটি অভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা হলো বালাগ। নবী ও রসুলগণ প্রত্যেকে তাঁদের স্ব স্ব সম্প্রদায়কে বলেছেন, “আমাদের দায়িত্ব তো কেবলমাত্র সুস্পষ্টভাবে সংবাদ পৌঁছে দেয়া” (সুরা ইয়াসীন ১৭)। এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন “বালাগুল মুবীন” যার অর্থ সুস্পষ্টভাবে পৌঁছানো। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন কিছুর সংবাদ পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দেওয়াই ছিল নবী-রসুলদের একমাত্র কাজ, কে সেটা গ্রহণ করবে আর কে প্রত্যাখ্যান করবে সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়, সেটা আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।
ইসলামের বালাগ কাদের প্রতি:
মক্কার ১৩ বছরের জীবনে রসুলাল্লাহ ও তাঁর সঙ্গীরা কাফের মোশরেকদেরকে সালাহ, সওম ইত্যাদি কোন আমলের দিকে আহ্বান করেন নি, তাঁরা আহ্বান করেছেন কেবলমাত্র কলেমার দিকে, তওহীদের দিকে। অনেকে মনে করেন মক্কার সেই কাফেরদের আল্লাহর প্রতি এবং আল্লাহর একত্বের প্রতি ঈমান ছিল না। এ ধারণাটি সঠিক নয়। সেই মোশরেকরাও আল্লাহর একত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, কিন্তু তারা আল্লাহর হুকুম, বিধান মানতো না অর্থাৎ তারা আল্লাহর আনুগত্য করত না। তখনকার আরবরা বিশ্বাস করত যে তারা আল্লাহর নবী ইবরাহীমের (আ.) উম্মাহ। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বলে, পালনকারী বলে বিশ্বাস করত, নামাজ পড়ত, কাবা শরীফকে আল্লাহর ঘর বলে বিশ্বাস করত, ঐ কাবাকে কেন্দ্র করে বাৎসরিক হজ্ব করত, কোরবানি করত, রোজা রাখত, আল্লাহর নামে কসম করত, এমনকি খাৎনাও করত। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় দলিল, বিয়ে শাদীর কাবিন ইত্যাদি সমস্ত কিছু লেখার আগে আমরা যেমন ‘বিসমিল্লাহ’ লেখি তেমনি তারাও আল্লাহর নাম লিখত। আরবের মোশরেকরা যে আমাদের মতোই আল্লাহয় বিশ্বাসী ছিল এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। কোর’আনে তিনি তাঁর রসুলকে বলছেন- তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করো, আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা অবশ্যই জবাব দেবে- সেই সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী (আল্লাহ) (সুরা যুখরুফ- ৯)। অন্যত্র বলেছেন- তুমি যদি তাদের প্রশ্ন করো আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন এবং কে সূর্য ও চন্দ্রকে তাদের (কর্তব্য কাজে) নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণ করছেন, তবে তারা নিশ্চয়ই জবাব দেবে- আল্লাহ (সুরা আনকাবুত- ৬১)।
এমন আরও অনেকগুলি আয়াত এবং ইতিহাস থেকে দেখা যায় সেই মোশরেকদের আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের ওপর ঈমান ছিল। তারা মূর্তিপূজা করত ঠিকই কিন্তু ওগুলোকে তারা স্রষ্টা বলে মানতো না। তারা বিশ্বাস করত যে ঐ দেব-দেবীকে মানবে, ওগুলোর পূজা করবে তাদের জন্য ঐ দেব-দেবীরা আল্লাহর কাছেই সুপারিশ করবে (সুরা ইউনুস- ১৮, সুরা যুমার ৩)। এত ঈমান সত্ত্বেও তারা কাফের ছিল কারণ তারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন নিজেদের মনগড়া নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালনা করত। যেহেতু তারা আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম মানতো না, তাই তাদের ঐ ঈমান ছিল অর্থহীন, নিষ্ফল এবং স্বভাবতই আল্লাহর হুকুম না মানার পরিণতিতে তাদের সমাজ অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা, সংঘর্ষ ও রক্তপাতে পরিপূর্ণ ছিল। ঠিক আজকেও আল্লাহর প্রতি আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস থাকলেও আল্লাহর হুকুম, আইন, বিধান অমান্য করার ফলে আমাদের সমসাময়িক পৃথিবীও চরম অন্যায় ও অশান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
একইভাবে বর্তমানে ‘মুসলিম’ বলে পরিচিত জনসংখ্যাটি তদানীন্তন আরবের মানুষের মতোই আল্লাহকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, তাকে স্রষ্টা বলে, জীবন-মরণের প্রভু বলে মানে, কিন্তু আরবের ঐ মোশরেকদের মতই তাঁর দেয়া দীন, জীবন-বিধান মোতাবেক সমষ্টিগত, জাতীয় জীবন পরিচালনা করে না। আরবের মোশরেকরা দেব-দেবীর পুরোহিতদের দেয়া বিধান অনুযায়ী তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা করত, বর্তমানের মুসলিম দুনিয়া নতুন দেব-দেবী গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্রের পুরোহিত ইহুদি-খ্রিস্টানদের তৈরি করা জীবন-বিধান অনুযায়ী তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা করছে। তফাৎ শুধু এইটুকু যে আরবদের হাবল, লা’ত, মানাতের মূর্তিগুলি ছিল কাঠ এবং পাথর দিয়ে তৈরি, বর্তমানের মূর্তিগুলি কাঠ পাথরের নয়, তন্ত্রের মূর্তি। বরং এই তন্ত্রের মূর্তিগুলোর পূজা ঐ কাঠ পাথরের মূর্তিপূজার চেয়েও বড় র্শেক ও কুফর। তাহলে বিশ্বনবী যাদের মধ্যে আবির্ভুত হয়েছিলেন আরবের সেই আল্লাহয় বিশ্বাসী অথচ মোশরেক কাফেরদের সঙ্গে বর্তমানের আল্লাহয় বিশ্বাসী কিন্তু কার্যতঃ মোশরেক ‘মুসলিম’ জনসংখ্যার তফাৎ কোথায়? এজন্যই আল্লাহর রসুল মক্কার ঐ আল্লাহ-বিশ্বাসী কাফের মোশরেকদেরকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ তওহীদের বালাগ দিয়েছিলেন, আর একই কারণে মাননীয় এমামুয্যামান মানবজাতিকে তওহীদ মেনে নেওয়ার আহ্বান করেছেন।

সত্যবাণী: ঐক্যই শক্তির আধার

সত্যবাণী: ঐক্যই শক্তির আধার


রাকীব আল হাসান
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে শুধু মুসলিমই নয় বিরাট একটা জনসংখ্যা সনাতন ধর্মের অনুসারীও রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছেন বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী। আমরা বিশ্বাস করি উল্লেখযোগ্য সকল ধর্মই একই স্রষ্টা মহান আল্লাহ পাকের নিকট থেকে আগত। প্রতিটি ধর্মই মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করে, মানবতা ও শান্তির কথা বলে। কাজেই আমরা সকল ধর্মের অনুসারীদের উদ্দেশ্যেই তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু সত্যবাক্য তুলে ধরে আলোচনা করবার চেষ্টা করব এই কলামে। আজ বিভিন্ন ধর্মে ঐক্যের ব্যাপারে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা আলোচনা করব।
আল্লাহ যে সকল নিয়ম দিয়ে তাঁর সৃষ্টিজগৎ পরিচালনা করেন সেগুলো প্রাকৃতিক এবং চিরন্তন, শাশ্বত (Etarnal) নিয়ম। বাহ্যিক চোখে আমরা অনেকে বস্তুর পরিবর্তন হতে দেখলেও প্রকৃতপক্ষে ঐ নিয়মগুলোর কখনোই কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন আগুনের ধর্ম হচ্ছে সে সবকিছু পুড়িয়ে দেবে। এটা হাজার বছর আগে যেমন সত্য ছিল তেমনি হাজার বছর পরেও একইরকম থাকবে। আবার পানিকে মুক্ত করে দিলে সে নিু ভূমিতে ছড়িয়ে পড়বে- এটাও প্রাকৃতিক নিয়ম। আল্লাহ মানবজাতিকে শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধিতে বসবাস করার জন্য দয়াপরবশ হয়ে এমনই কতগুলো নিয়ামক দান করেছেন। এর মধ্যে মতভেদ ও বিভক্তি না করে ঐক্যবদ্ধ থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। এ জন্য তিনি প্রত্যেক নবী-রসুলদের মাধ্যমে পাঠানো জীবনব্যবস্থায় মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার হুকুম দিয়েছেন। তিনি কোর’আনে বলেছেন, “আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করে (সুরা সওফ-৪), গলিত সীসার দেয়ালে একটি সূঁচ ঢোকার জায়গাও থাকে না। সুরা আল ইমরানের ১০৩নং আয়াতে বলেছেন- ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জু (হেদায়াহ, দীন) ধরে রাখতে, বিচ্ছিন্ন না হতে। যাদের কাজে, কথায় ঐক্য নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন কঠিন শাস্তি, আযাব। কোর’আনের বহু স্থানে তার উল্লেখ রয়েছে। যে সব কাজে ও কথায় উম্মাহর ঐক্য নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে সে সব কাজকে আল্লাহর রসুল সরাসরি কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কেবল শেষ দীনেই নয়, ইতোপূর্বে আল্লাহ যত নবী রসুল পাঠিয়েছেন এবং তাদের প্রতি যত কিতাব নাজিল করেছেন সর্বত্র জাতির ঐক্যের বিষয়ে বিরাট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বাইবেলে যিশু (ঈসা আ.) বলেছেন, “যে রাজ্য আত্মকলহে নিজেদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, সেই রাজ্য ধ্বংস হয়? আবার কোন পরিবার যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, তবে সেই পরিবারও ভেঙ্গে যায়” (বাইবেল- লূক ১১: ১৭)। এখানেও ঐক্যহীন হতে নিষেধ করা হয়েছে। ঐক্য ছাড়া কোনো অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। প্রকৃতির দিকে তাকালেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঐক্যের নিদর্শন।
সনাতন ধর্মের গ্রন্থগুলিতেও ঐক্যের বিষয়ে বলা আছে। যেমন মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে মহাত্মা বিদুর বলেছিলেন, “দৃঢ়বদ্ধমূল অতিমহৎ একমাত্র মহীরুহ সমীরণভরে অনায়াসে মর্দিত ও পতিত হইয়া থাকে, কিন্তু বহু বৃক্ষ একত্র মিলিত ও বদ্ধমূল হইলে অক্লেশে প্রবল বায়ুবেগ সহ্য করিতে পারে; এইরূপ গুণসমন্বিত ব্যক্তিও একাকী হইলে শত্রুগণ তাঁহাকে পরাজয় করা অনায়াসসাধ্য মনে করিয়া থাকে।” সরল বাংলায় বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে যদি বিরাট কোনো বৃক্ষ একাকী দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে প্রবল ঝড়ে সেটা উপড়ে পড়ে যায়। পক্ষান্তরে বহুসংখ্যক বৃক্ষ একত্রিতভাবে থাকলে প্রবল ঝড়েও তাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। একইভাবে অতি বড় বীরও একা থাকলে শত্রুরা তাকে পরাজিত করাকে সহজ মনে করে। ঐক্যের শক্তি কত বিরাট তা এই প্রাকৃতিক ঘটনাটির মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
আজ আমাদের দেশের এই ষোল কোটি মানুষ শত সহস্রভাবে বিভক্ত হয়ে আছে। তারা বিচ্ছিন্ন গাছের মতো একাকী ও শক্তিহীন। তাই যে কোনো হালকা ঝড়েও তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যায়।

তওহীদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা

তওহীদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা


মাহবুব আলী
মহানবী (সা.) বলেছেন- “জান্নাতের চাবি হচ্ছে- আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই” (মুয়াজ বিন জাবাল থেকে আহমদ, মেশকাত)। অপর হাদিসে এসেছে- যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে “আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই এবং মোহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রেরিত” তার জন্য জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে। (ওবাদাহ বিন সামিত থেকে মুসলিম, মেশকাত)। এছাড়াও অনেক হাদীস থেকে দেখানো যাবে যে, তওহীদই জান্নাতের চাবি। কালিমা তথা তওহীদের স্বীকৃতি না দিলে যেমন মুমিন মুসলিম থাকা যায় না ঠিক তেমনই স্বীকৃতি দানের পর আবার তওহীদের ওপর থেকে সরে গেলেও আর মুমিন মুসলিম থাকা যায় না, আর এটা সবাই জানে যে, মুমিন মুসলিম না থাকলে সে জান্নাতে যেতে পারবে না, সে যতই ইবাদত করুক। দীনুল হকের ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এই কালিমাটি, এ নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তওহীদ ব্যতীত কোনো ইসলামই হতে পারে না, তওহীদই ইসলামের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটি তওহীদ সম্পর্কে যে ধারণা করে (আকিদা) তা ভুল। তাদের কাছে তওহীদ মানে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা এবং তাঁর ইবাদত বা উপাসনা করা। ‘তওহীদ’ এবং ‘ওয়াহদানিয়াহ্’ এই আরবি শব্দ দু’টি একই মূল থেকে উৎপন্ন হলেও এদের অর্থ এক নয়। ‘ওয়াহদানিয়াহ্’ বলতে বোঝায় মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ যে একজন তা বিশ্বাস করা (একত্ববাদ-Monotheism), পক্ষান্তরে ‘তওহীদ’ মানে ঐ এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া, তাঁর ও কেবলমাত্র তাঁরই নিঃশর্ত আনুগত্য করা। আরবের যে মুশরিকদের মধ্যে আল্লাহর শেষ রসুল এসেছিলেন, সেই মুশরিকরাও আল্লাহর একত্বে, ওয়াহদানিয়াতে বিশ্বাস করত, কিন্তু তারা আল্লাহর হুকুম, বিধান মানত না অর্থাৎ তারা আল্লাহর আনুগত্য করত না। তারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন নিজেদের মনগড়া নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালনা করত। এই আইনকানুন ও জীবন ব্যবস্থার উৎস ও অধিপতি হিসাবে ছিল বায়তুল্লাহ, কা’বার কুরায়িশ পুরোহিতগণ। মূর্তিপূজারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের এই ঈমান ছিল যে, এ বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ একজনই এবং তাদের এই ঈমান বর্তমানে যারা নিজেদেরকে মুমিন মুসলিম বলে জানে এবং দাবি করে তাদের চেয়ে কোনো অংশে দুর্বল ছিল না (সুরা যুখরুফ ৯, আনকাবুত ৬১, লুকমান ২৫)। কিন্তু যেহেতু তারা আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম মানত না, তাই তাদের ঐ ঈমান ছিল অর্থহীন, নিষ্ফল এবং স্বভাবতঃই আল্লাহর হুকুম না মানার পরিণতিতে তাদের সমাজ অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা, সংঘর্ষ ও রক্তপাতে পরিপূর্ণ ছিল, এ জন্য আরবের ঐ সময়টাকে আইয়্যামে জাহেলিয়াত বলা হয়। আল্লাহর হুকুমের প্রতি ফিরিয়ে আনার জন্যই তাদের মধ্যে রসুল প্রেরিত হয়েছিলেন। রসুলও সে কাজটিই করেছিলেন, ফলশ্র“তিতে অন্যায় অশান্তিতে নিমজ্জিত সেই সমাজটি নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুখ-সমৃদ্ধিতে পূর্ণ শান্তিময় (ইসলাম অর্থই শান্তি) একটি সমাজে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং আল্লাহর আনুগত্য না করাই ছিল তাদের কাফের মুশরিক হওয়ার প্রকৃত কারণ। বর্তমানের মুসলিমরা উপলব্ধি করতে পারছে না যে প্রাক-ইসলামিক যুগের আরবের কাঠ পাথরের মূর্তিগুলিই এখন গণতন্ত্র, সাম্যবাদ, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদির রূপ ধরে আবির্ভূত হয়েছে এবং মুসলিম জনসংখ্যাটি আল্লাহর পরিবর্তে এদের তথা এদের প্রবর্তক ও পুরোধা ‘পুরোহিতদের’ আনুগত্য করে যাচ্ছে। এই প্রতিটি তন্ত্র আলাদা আলাদা একেকটি দীন (জীবনব্যবস্থা), ঠিক যেমন দীনুল হক ‘ইসলাম’ও একটি জীবনব্যবস্থা। পার্থক্য হলো, এই মানবরচিত দীনগুলি মানবজীবনের বিশেষ কিছু অঙ্গনের, বিশেষ কিছু বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে, কিন্তু সঠিক সমাধান দিতে পারে না আর ইসলাম মানবজীবনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় থেকে শুরু করে সামষ্টিক অঙ্গনের সকল বিষয়ে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা দিয়ে থাকে। বর্তমানের মুসলিম নামক জনসংখ্যাটি এই সকল মানবরচিত তন্ত্রের প্রতিমার আনুগত্য করে সেই পৌত্তলিক আরবদের মতই মুশরিক ও কাফেরে পরিণত হয়েছে। আল্লাহর রসুল এসে মুশরিক আরবদেরকে আল্লাহর তওহীদের ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সেখানে আল্লাহর একত্ববাদ (ওয়াহদানিয়াত) প্রতিষ্ঠা করেন নি, কারণ আল্লাহর একত্ববাদের বিষয়ে সেই মুশরিকদের আগে থেকেই সুদৃঢ় ঈমান ছিল (সুরা ইউসুফ- ১০৬)। তারা তাদের দেবদেবীর কোনোটিকেই আল্লাহ মনে করত না, স্রষ্টা বা প্রভুও ভাবত না, তারা সেগুলির পূজা করত এই বিশ্বাসে যে সেগুলি তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করবে এবং তাদের হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে (সুরা ইউনুস- ১৮, সুরা যুমার- ৩)। সুতরাং মূর্তি পূজার নেপথ্যে তাদের প্রকৃত উপাস্য আল্লাহই ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যে মতবাদগুলির আনুগত্য করা হচ্ছে এর মধ্যে কোথাও আল্লাহর স্থান নেই, এগুলি আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কেই সম্পূর্ণ নির্বিকার। ফলে বর্তমানের মুমিন মুসলিম হবার দাবিদারগণ যে শেরক ও কুফরে লিপ্ত তা নিঃসন্দেহে ১৪০০ বছর আগের আরবদের শেরক ও কুফরের চেয়েও নিকৃষ্টতর।
‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ যে ‘আনুগত্য করা’, উপাসনা করা নয় তা কোর’আনের বহু আয়াত থেকে বোঝা যায়। সুরা ফাতাহ’র ১৭নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘যে আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ এখানে জান্নাতে যাওয়ার পূর্বশর্ত আল্লাহ দিলেন, যে আনুগত্য করে, বললেন না যে, ‘ইবাদত, উপাসনা করে।’ এখানে তিনি অন্য কোনো আমলের কথাও বললেন না, না সালাহ কায়েম, না যাকাত প্রদান, না হজ্ব, না সওম, অন্যান্য ছোটখাটো আমলের তো কথাই নেই। তিনি জান্নাত প্রদানের ওয়াদা করলেন শুধুই তাঁর এবং তাঁর রসুলের আনুগত্যের বিনিময়ে। সুরা নেসার ৬৯নং আয়াতটি দেখুন, আল্লাহ বলছেন, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের হুকুম মান্য করবে সে নবী, শহীদ, সিদ্দিক ও সালেহীনদের সঙ্গে (অর্থাৎ জান্নাতে) থাকবে।’ এখানেও ‘আনুগত্য করা’ ছাড়া আর কোনো শর্ত আল্লাহ দেন নি। সুতরাং কালিমায় ব্যবহৃত ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ ‘উপাস্য’ হওয়া সম্ভব নয়, এর অর্থ অবশ্যই ‘যার আনুগত্য করা হয়, হুকুম পালন করা হয়’। আল্লাহর দাবি হচ্ছে, প্রথমে মানুষকে এই অঙ্গীকারে আবদ্ধ হতে হবে যে আল্লাহ যা হুকুম করবেন তাই সে মেনে নিবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে। তারপর এই চুক্তি বাস্তবায়নকল্পেই সে আল্লাহর ইবাদত করতে বাধ্য, কারণ আল্লাহর হুকুম হচ্ছে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা। তাহলে বোঝা গেল, প্রথম কাজ আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেওয়া, তারপরে তাঁর ইবাদত করা। সুরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটি দেখুন, আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই, সুতরাং তাঁর ইবাদত করো।” যদি ইবাদত করাই প্রথম ও প্রধান কাজ হোত তাহলে আয়াতটি হোত এমন যে, “আল্লাহ ছাড়া মা’বুদ (ইবাদত, বন্দনা পাওয়ার অধিকারী) কেউ নয়, সুতরাং তাঁরই আনুগত্য করো”, আরবিতে লা মা’বুদ ইল্লাল্লাহ, ফা আত্তাবিয়্যুহু। কিন্তু কোর’আনে এমনটা একবারও বলা হয় নি। সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ‘ইলাহ’ এবং ‘মা’বুদ’ শব্দ দু’টি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন কারণ এদের অর্থও সম্পূর্ণ আলাদা।
মোটকথা, এই ১৫০ কোটির জনসংখ্যাটি, যারা নিজেদেরকে কেবল মুসলিমই নয়, একেবারে মুমিন ও উম্মতে মোহাম্মদী বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, তারা এগুলির কোনোটিই নয়, তারা কার্যত মুশরিক এবং কাফের। আল্লাহ বলছেন, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা হুকুম (বিচার ফায়সালা) করে না তারা কাফের, জালেম, ফাসেক (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এই আয়াতগুলিতে ‘হুকুম’ শব্দটি দিয়ে কেবল আদালতের বিচারকার্যই বোঝায় না, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অর্থাৎ সামগ্রিক জীবন তাঁর নাযিল করা বিধান অর্থাৎ কোর’আন (এবং সুন্নাহ) মোতাবেক পরিচালনা করাকেও বোঝায়। মুমিন মুসলিম হবার দাবিদারগণ এখন আর একটি সু-সংহত উম্মাহরূপে নেই, তারা ভৌগোলিকভাবে পঞ্চাশটিরও বেশী জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের দাসে পরিণত হয়েছে, তাই তারা তাদের সামষ্টিক কার্যাবলী আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করে না। ফলশ্র“তিতে তারা ফাসেক (অবাধ্য), জালেম (অন্যায়কারী) এবং কাফেরে (প্রত্যাখ্যানকারী) পরিণত হয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত বিধানগুলিকে অপাংক্তেয় করে রেখে তারা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের আইন, কানুনগুলি নিজেদের দেশে প্রবর্তন করে তা দিয়ে সামষ্টিক কার্যাবলী পরিচালনা করছে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমরা পরিস্কারভাবে বুঝতে পেরেছি যে তওহীদ ও দীন যে দুটি ভিন্ন বিষয় এবং এ দুটির তফাৎ কী। তওহীদ হচ্ছে ভিত্তি এবং দীন হচ্ছে এই ভিত্তির উপর নির্মিত অবকাঠামো, দালান। তওহীদ হচ্ছে, “একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করা এবং প্রতিটি বিষয়ে তাঁর হুকুমের আনুগত্য করা। সংক্ষেপে জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর ও তাঁর রসুলের (স:) হুকুম মানা, প্রতিটি বিষয়ে যেখানেই তাঁর কোনো বক্তব্য আছে তা বিনা প্রশ্নে, বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া। যে বিষয়ে তাঁর অথবা তাঁর রসুলের কোনো বক্তব্য নেই সে বিষয়ে, তা ব্যক্তিগত হোক বা সমষ্টিগত, আমরা স্বাধীনভাবে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি।”
এখন আমরা যদি মুক্তি পেতে চাই, জান্নাতে যেতে চাই, মুমিন-মুসলিম হতে চাই তবে আমাদের আগে কালিমাতে ফিরে আসতে হবে, আমাদেরকে আগে স্বীকৃতি দিতে হবে, “যেখানেই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোনো হুকুম, নির্দেশনা আছে সেখানে আর কারো হুকুম মানি না।” আর এই কালিমার ভিত্তির উপর আমাদের একতাবদ্ধ হতে হবে।

মানবতার কল্যাণই প্রকৃত এবাদত

মানবতার কল্যাণই প্রকৃত এবাদত




মহান সৃষ্টিকর্তা উদ্দেশ্যহীনভাবে কিছুই সৃষ্টি করেননি। যাকে যে উদ্দেশ্যে বা যে কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন সেই কাজ করাই তার এবাদত। সূর্যকে সৃষ্টি করা হয়েছে আলো ও তাপ দেবার জন্য, এ কাজ করাই সূর্যের এবাদত। তেমনি ঘড়ির এবাদত সময় দেখানো, গাড়ির এবাদত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া। তাহলে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ সৃষ্টির পেছনেও স্রষ্টার কোনো মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগত যেভাবে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিচালনা করেন; ঠিক তেমনি পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং মানবতার কল্যাণ করার জন্য মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এটাই তার প্রকৃত এবাদত। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হলো সে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ বাদ দিয়ে, পৃথিবীকে অন্যায় অশান্তি ও রক্তারক্তির অন্ধকার কুয়ায় নিক্ষেপ করে মানুষ যার যার উপাসনালয়ে বসে স্রষ্টার গুণগানকে প্রধান এবাদত মনে করে খুব সাবধানতার সাথে পালন করে যাচ্ছে। মানবজাতি যে অন্যায় অশন্তির উত্তপ্ত সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে তাতে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ মানুষ জানেইনা কেন তাকে সৃষ্টি করা হলো? তাই বলে উপাসনা করা নিষেধ নয়। মানবতার কল্যাণে অবদান রাখার মতো মনোবল ও আত্মিক শক্তি অর্জনের জন্য উপাসনা প্রয়োজন।
আজ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এই চিন্তা নিয়ে ঘুম থেকে উঠে যে, পরের পকেটের টাকা কিভাবে নিজের পকেটে ঢুকাবে। এর জন্য তারা কোনো অন্যায় করতেও পিছপা হয় না। মানবতার কল্যাণ তো অনেক দূরের কথা। একটু কল্পনা করি তো এই ৭০০ কোটি মানুষ যদি এই চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুম থেকে উঠে যে, কিভাবে আমি মানুষের কল্যাণ করব, অন্যের দুঃখ-কষ্ট দূর করব, যে উদ্দেশ্যে স্রষ্টা আমাকে সৃষ্টি করলেন সেই কাজ করে স্রষ্টার এবাদত করব তাহলে এই অন্যায়-অশান্তি, ক্ষুধা-দারিদ্র এসব থাকবে? নিমিষেই সমাধান হবে এত বড় সমস্যা। কি আশ্চর্যের বিষয়, কত সহজ সমাধান! অথচ আমরা কখনও চিন্তাও করিনি। বর্তমানে শান্তির আশায় কত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, কত সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, লক্ষ লক্ষ কর্মীর শ্রম, কোটি কোটি ডলার ব্যায় করা হচ্ছে। কিন্তু শান্তি কি এসেছে? আসেনি, আসবেও না। কারণ প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য কেউই কাজ করছে না। সবাই মানবতার কল্যাণের ওসিলায় নিজের কল্যাণে ব্যস্ত। অন্যের সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে নিজে সুখে থাকার চেষ্টায় রত। আলিশান উপাসনালয়ে বসে উপাসনা করলে স্রষ্টা খুশী হবেন না, মানবজাতিও শান্তিতে থাকবে না। স্রষ্টা শুধু মসজিদ, মন্দির, উপাসনালয়ে থাকেন না। স্রষ্টা থাকেন ভগ্নপ্রাণ মানুষের কাছে, বিপদগ্রস্তদের কাছে। তাই মসজিদ মন্দিরে স্রষ্টাকে না খুঁজে, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা উচিত, গৃহহীনকে গৃহ নির্মান করে দেয়া উচিত। আর্ত পীড়িতের পাশে দাঁড়ানো উচিত। মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই প্রকৃত ধর্ম, প্রকৃত এবাদত। এতে স্রষ্টা সবচেয়ে বেশী খুশি হবেন, মানবজাতি শান্তিতে ও নিরাপত্তায় থাকবে। আর আমাদেরও মানবজনম সার্থক হবে।

তাহাজ্জুদ যখন ঘুম নষ্ট রোজা যখন উপবাস

তাহাজ্জুদ যখন ঘুম নষ্ট রোজা যখন উপবাস


মূল: এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী
ভবিষ্যতে মুসলিম নামধারী এই জাতিটির কতখানি আকীদা বিচ্যুতি ঘটবে এবং তার দরুন তারা যে ইসলামের গণ্ডি থেকেই বহিরাগত হয়ে যাবে তা বোঝাতে গিয়ে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে রসুলাল্লাহ (সা.) বলেন- ‘এমন সময় আসবে যখন ইসলাম শুধু নাম থাকবে, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, মসজিদসমূহ লোকে লোকারণ্য হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না, আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে সর্বনিকৃষ্ট জীব, তাদের তৈরি ফেতনা তাদের উপরই পতিত হবে। (আলী (রা.) থেকে বায়হাকী, মেশকাত)। কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে- এই কথাটি কীভাবে অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে তা বর্তমানে এই জাতির দিকে লক্ষ করলেই পরিষ্কার। কোর’আনের হুকুম এবং শিক্ষা এই জাতি প্রত্যাখ্যান করে দাজ্জালের হুকুম, বিধান মেনে নিয়েছে। কাজেই বর্তমানে কোর’আন শুধুু অক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আবার একই বক্তব্যের সমর্থনে তিনি অপর একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, “এমন সময় আসবে যখন মানুষ রোজা থাকবে কিন্তু তা হবে না খেয়ে থাকা, রাত জেগে নামাজ পড়বে কিন্তু তা হবে কেবল ঘুম নষ্ট করা (অর্থাৎ তাহাজ্জুদ হবে না)। (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, তাবারানী, দারিমি, মেশকাত)।” এই হাদিসগুলোতে মহানবী (সা.) কাদের বোঝাচ্ছেন? প্রথম হাদিসে বলা হয়েছে- ইসলাম শুধু নাম থাকবে। অর্থাৎ ইসলাম শুধুমাত্র নামের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কার্যত ইসলামের নামে যেটা চলবে সেটা প্রকৃত ইসলাম হবে না। আর যেটা প্রকৃত ইসলাম নয় তার অনুসারীরাও যে প্রকৃত মুসলিম নন- তা বোঝা যায় সাধারণ জ্ঞানেই। আবার একই হাদিসে তিনি বলেছেন- মসজিদসমূহ লোকে লোকারণ্য হবে, কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না। এখানেও একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ মানুষ মসজিদে যাবে, সেখানে গিয়ে আল্লাহর এবাদত করবে, নামাজ পড়বে কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও তাদের মধ্যে হেদায়াত থাকবে না। আর হেদায়াত না থাকার মানেই হলো তারা হবে পথভ্রষ্ট।
আবার দ্বিতীয় হাদিসে তিনি মানুষ বলতে তাদেরই বোঝাচ্ছেন যারা নিজেদের মুসলিম বলে মনে করে। কারণ তিনি অন্য নবীদের উম্মত খ্রিষ্টান-ইহুদিদের সম্বন্ধে বলছেন না। দ্বিতীয় কথা হলো হাজারো রকমের এবাদতের মধ্য থেকে মাত্র দু’টি তিনি বেছে নিয়েছেন। একটি রোজা অন্যটি তাহাজ্জুদ। তৃতীয় হলো এর একটা ফরদ-বাধ্যতামূলক, অন্যটি নফল- নিজের ইচ্ছাধীন। বিশ্বনবী (সা.) পাঁচটি বাধ্যতামূলক ফরজ এবাদত থেকে একটি এবং শত শত নফল এবাদত থেকে একটি বেছে নেয়ার উদ্দেশ্য হলো এই মনস্তত্ত্বের দিক দিয়ে আল্লাহ রসুল ও দীনের উপর পরিপূর্ণ (মোকাম্মেল) ঈমান ছাড়া কারো পক্ষে এক মাস রোজা রাখা বা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব নয়। এমনকি মোকাম্মেল ঈমান আছে এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা তাহাজ্জুদ পড়েন না। অর্থাৎ রসুলাল্লাহ বোঝাচ্ছেন তাদের যাদের পরিপূর্ণ দৃঢ় ঈমান আছে আল্লাহ-রসুল-কোর’আন ও ইসলামের উপর। এই হাদিসে তিনি মোনাফেক বা লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ রিয়াকারীদের বোঝান নি। কারণ যে সব এবাদত লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ মসজিদে যেয়ে নামাজ-হজ্ব-যাকাত ইত্যাদি একটিও উল্লেখ করেন নি। মোনাফেক রিয়াকারী বোঝালে তিনি অবশ্যই এগুলো উল্লেখ করতেন যেগুলো লোক দেখিয়ে করা যায়। তিনি ঠিক সেই দু’টি এবাদত উল্লেখ করলেন যে দুটি মোনাফেক ও রিয়াকারীর পক্ষে অসম্ভব, যে দু’টি লোকজন দেখিয়ে করাই যায় না, যে দুটি পরিপূর্ণ ঈমান নিয়েও সবাই করতে পারে না। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি ভবিষ্যত বাণী করেছেন যে এমন সময় আসবে যখন আমার উম্মতের মানুষ পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হয়ে নামাজ-রোজা-হজ্ব-যাকাত-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি সর্ববিধ এবাদত করবে কিন্তু কোন কিছুই হবে না, কোন এবাদত গৃহীত-কবুল হবে না। যদি দীর্ঘ এক মাসের কঠিন রোজা এবং মাসের পর মাস বছরের পর বছর শীত-গ্রীষ্মের গভীর রাত্রে শয্যা ত্যাগ করা তাহাজ্জুদ নিষ্ফল হয়, তবে অন্যান্য সব এবাদত অবশ্যই বৃথা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা শুধু পরিপূর্ণ বিশ্বাসী অর্থাৎ মোকাম্মল ঈমানদারই নয়, রোজাদার ও তাহাজ্জুদীও, তাদের এবাদত নিষ্ফল কেন? তাছাড়া তাদের এবাদতই যদি বৃথা হয় তবে অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের এবাদতের কী দশা?
মহানবীর (সা.) ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর একমাত্র সম্ভাব্য উত্তর হচ্ছে এই যে, তিনি যাদের কথা বলছেন তারা গত কয়েক শতাব্দী ও আজকের দুনিয়ার মুসলিম নামধারী জাতি। আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) এই জাতির সম্মুখে যে উদ্দেশ্য স্থাপন করে দিয়েছিলেন সটা হলো আল্লাহর দেওয়া সত্যদীন, দীনুল হক পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠা করে মানবজীবন থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই আকিদার বিকৃতিতে জাতি তা বদলিয়ে অন্য উদ্দেশ্য স্থাপন করে নিয়েছে। আল্লাহ রসুলের (সা.) স্থাপিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, আনুগত্যশীল, দুর্জেয় সংগ্রামী চরিত্রের প্রয়োজন, সেই চরিত্র তৈরির জন্য যে প্রশিক্ষণ- সেই প্রশিক্ষণ (অর্থাৎ সালাহ, সওম বা নামাজ, রোজা) এবং আরও অন্যান্য ব্যাপারকে ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্যই যেখানে নেই বা বিকৃত সেখানে প্রশিক্ষণের আর কোন দাম, অর্থ থাকতে পারে না। কাজেই ঐসব প্রশিক্ষণ অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি সর্ব প্রকার এবাদত আজ নিষ্ফল, অর্থহীন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে আমার এই কথায় বর্তমানের এই জাতিটি- যেটা নিজেকে শুধু মুসলিম নয় একেবারে উম্মতে মোহাম্মদী বলে মনে করে- এই জাতি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে। বিশেষ করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে এই জাতির সেই অংশ যেটা আল্লাহ রসুলের কঠোর সতর্ক বাণী ও নিষেধ অগ্রাহ্য করে, সেরাতুল মোস্তাকীম ও দীনুল কাইয়্যেমা (জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর দেয়া বিধান ছাড়া সমগ্র বিধান অস্বীকার, সালাহ ও যাকাত প্রতিষ্ঠা) ত্যাগ করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফতোয়াবাজী করে জাতিকে শত টুকরোয় ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছেন এবং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে সেই অন্য অংশটি যেটা আত্মার উৎকর্ষ ও আল্লাহর সান্নিধ্যের নাম করে জাতির সম্মুখে আল্লাহ ও রসুলের (সা.) স্থাপিত উদ্দেশ্য (মানবতার কল্যাণ) বদলিয়ে অন্য উদ্দেশ্য স্থাপন করেছেন, যে জাতিকে বিশ্বনবী (সা.) মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সে জাতিকে সংগ্রাম ভুলিয়ে হাতে তসবিহ ধরিয়ে দিয়ে টেনে খানকায় বসিয়ে দিয়েছেন, জাতির বর্হিমুখী দৃষ্টিভঙ্গীকে অন্তর্মুখী করে তাকে কাপুরুষে পরিণত করেছেন, সিংহকে ইদুরে পরিণত করেছেন।
অকপট সত্যান্বেষী মন নিয়ে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন যে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থাকে জাতীয় জীবনে অস্বীকার করে মানুষের তৈরি জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিণতিতে পৃথিবীতে যে অন্যায়-অবিচার শোষণ-রক্তপাত হচ্ছে সে সবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে সে সব থেকে মুখ ফিরিয়ে যারা মহা এবাদতে মশগুল হয়ে আছেন যাবতীয় অন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে যারা প্রচণ্ড বিরোধ গড়ে তুলছেন না, যারা নানাভাবে জাতির ঐক্য ধ্বংস করে যাচ্ছেন তারাই হচ্ছেন রসুলাল্লাহর (সা.) ঐ ভবিষ্যতবাণীর লক্ষ্য। আল্লাহ এই জাতিকে লক্ষ্য করে বলছেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি (উম্মাহ) কারণ মানবজাতির মধ্যে থেকে তোমাদিগকে উত্থিত করা হয়েছে এই জন্য যে (তোমরা মানুষকে) সৎ কার্য করার আদেশ দান এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত করবে, আল্লাহকে বিশ্বাস করবে (কোর’আন- সুরা আলে-ইমরান ১১০)।” অর্থাৎ এই উম্মাহকে মানব জাতির মধ্য থেকে সৃষ্টিই করা হয়েছে মানুষকে অসৎ কাজ (আল্লাহর বিধানের বিরোধী কাজ অর্থাৎ যে কাজে মানুষের অকল্যাণ হয় তাই হলো অসৎ কাজ) থেকে নিবৃত্ত করা ও সৎ কাজ (আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কাজ অর্থাৎ যে কাজ করলে মানুষের কল্যাণ হয় তাই হচ্ছে সৎকাজ) করার আদেশ করার জন্য এবং এই কাজ করার জন্যই সে জাতি শ্রেষ্ঠ জাতি। যে বা যারা এবাদতের নাম করে আল্লাহর যিকরের নাম করে বা যে কোন ছুতোয় বিরোধিতার ভয়ে, পার্থিব ক্ষতির ভয়ে, যে জন্য তাদের মানব জাতির মধ্য থেকে উত্থিত করা সেই কাজ থেকে পালায় তবে সে বা তারা আর সেই শ্রেষ্ঠ জাতির মধ্যেই নেই সুতরাং তাদের সব রকম এবাদত অর্থহীন, নিষ্ফল। (যখন সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার দায়িত্ব পালন ত্যাগ করা হয় তখন মানুষের কোন আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। হাদিস তিরবানী।)
এইখানে আরও একটি কথা বুঝে নেয়া প্রয়োজন। কোর’আনের এই আয়াতে আল্লাহ সৎকাজের জন্য যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটা হলো আদেশ, আরবিতে ‘আমর’। আদেশ তখনই করা যায় যখন সে আদেশকে কাজে পরিণত করা যায়, অর্থাৎ কাজে পরিণত করার শক্তি থাকে, নইলে খুব জোর অনুরোধ করা যায়। অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত করার ব্যাপারেও তাই। মানুষকে অর্থাৎ সমাজকে সৎকাজ করার আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার শক্তি শুধু রাষ্ট্রের থাকে অন্য কারো নয়। অন্য যে কেউ করতে গেলে তাকে শুধু অনুরোধ বা কাকুতি-মিনতি করতে হবে। কিন্তু আল্লাহ অনুরোধ শব্দ ব্যবহার করেন নি, করেছেন ‘আমর’ আদেশ অর্থাৎ ঐ কাজ করতে হবে রাষ্ট্রশক্তিতে। উপদেশ ও অনুরোধে যে ও কাজ হবে না তার প্রমাণ বর্তমান মানব সমাজ। এই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ, অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা যে আল্লাহ উপদেশ, অনুরোধের মাধ্যমে করা বোঝান নি তা পরিষ্কার হয়ে যায় তার কোর’আনের আরেকটি আয়াতে। তিনি বলেছেন- এরা (মো’মেন) তারা, যাদের আমি তাদের পৃথিবীতে (বা পৃথিবীর যে কোন অংশে) ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করলে সালাত (নামাজ) কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং ন্যায়, সৎ কাজের আদেশ দেয়, এবং অন্যায়, অসৎ কাজ থেকে বিরত করে (কোর’আন- সুরা আল-হজ ৪১)। এখানে লক্ষ্য করুন-মানুষকে ন্যায় কাজের আদেশ এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখার জন্য আল্লাহ কী পূর্বশর্ত দিচ্ছেন। তিনি বলছেন আমি তাদের পৃথিবীতে (বা পৃথিবীর যে কোন অংশে) ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার পর, কারণ তিনি ভালো করেই জানেন যে, ন্যায় কাজের আদেশ ও মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা এ দু’টোর কোনটাই সম্ভব নয় রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া। সুতরাং যারা অনুরোধ, উপদেশ, কাকুতি-মিনতি করে ঐ কাজ করতে চেষ্টা করছেন তারা পণ্ডশ্রম করছেন। কাজেই রাষ্ট্রশক্তি যাদের নিয়ন্ত্রণে তাদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্যই হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত হওয়া এবং জাতিকে বিরত রাখা। এর জন্য যে সঠিক আদর্শ দরকার তাই আমরা তুলে ধরছি।
[মতামতের জন্য ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৯৩৩৭৬৭৭২৫, ০১৭৮২১৮৮২৩৭, ০১৬৭০১৭৪৬৪৩]