Saturday, May 30, 2015

কারা আজ আল্লাহর লা’নতের পাত্র

কারা আজ আল্লাহর লা’নতের পাত্র

egypt conflict5সাইদুর রহমান:
যে তওহীদের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর সমস্ত জীবন-ব্যবস্থা, দীন অবতীর্ণ হয়েছিল, সেই তওহীদ যেমন পৃথিবীর কোন জাতির মধ্যে নেই, তেমনি এই তথাকথিত ‘মুসলিম’ জাতির মধ্যেও নেই। অন্য সব ধর্ম ও জাতি যেমন এবং যতখানি বহুত্ববাদের (শিরক) ও নাস্তিক্যে ডুবে আছে এই জাতিও ততখানিই ডুবে আছে। অন্য ধর্মের মানুষগুলোর মতো এই ধর্মের মানুষগুলোও বুঝছেনা, কেমন করে আজ আর তারা মুসলিম নেই। আকিদার বিকৃতিতে তওহীদ এদের কাছে শুধু মাটির, পাথরের তৈরি মূর্তিকে সাজদা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আল্লাহর শেষ রসুলের (সা.) মাধ্যমে প্রেরিত ইসলাম আর বর্তমানের “ইসলাম ধর্ম” দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী জিনিস।
যে জাতিকে আল্লাহ বলেছেন তোমরা যদি মুমিন হও তবে পৃথিবীর প্রভুত্ব, কর্তৃত্ব তোমাদের হাতে দেব (সুরা নূর ৫৫) এবং সত্যই রসুলাল্লাহর হাতে গড়া সেই ছোট্ট জাতির হাতে আল্লাহ তাই দিয়েছিলেন। বর্তমান মুসলিম জাতির হাতে পৃথিবীর কর্তৃত্ব তো দূরের কথা, এ জাতি আজ পৃথিবীর অন্য প্রত্যেক জাতি দিয়ে অপমানিত, অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, পরাজিত, এক কথায় নিকৃষ্টতম জাতি। আর নিজেদের মধ্যে অনৈক্য, শিয়া-সুন্নী দাঙ্গা, শাফেয়ী-হাম্বলী-ওয়াহাবী নিয়ে বাহাস, হানাহানি, যুদ্ধে লিপ্ত এবং ভয়াবহ কুসংস্কার ও দারিদ্র্যে নিমজ্জিত। তারা আজ আল্লাহর লা’নতের পাত্র। প্রশ্ন হলো- কেন এই লা’নত? এর জবাব হচ্ছে এই, আল্লাহ বলেছেন যারা আল্লাহ ও রসুলের উপর ঈমান এনে তারপর কুফরে প্রত্যাবর্তন করছে তাদের উপর আল্লাহ, আল্লাহর মালায়েকদের ও মানব জাতির সম্মিলিত লা’নত (অভিশাপ) (কোর’আন-সুরা আলে ইমরান ৮৬-৮৯)। তওহীদ অর্থ হচ্ছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনীতি ইত্যাদি সর্ব বিষয়ে বিশেষ করে সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে ও বিশ্বাস করে নেয়া। আল্লাহ বলছেন- মুমিন শুধু তারা যারা আল্লাহ ও তার রসুলকে বিশ্বাস করে (অর্থাৎ জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর বিধান ছাড়া আর কাউকে মানে না) তারপর তা থেকে বিচ্যুত হয় না এবং নিজেদের প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে (তা প্রতিষ্ঠার জন্য) আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম, জিহাদ করে (সুরা হুজরাত ১৫)। অর্থাৎ মুমিন হবার জন্য আল্লাহ দু’টি শর্ত ও সংজ্ঞা দিচ্ছেন। একটা জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার অর্থাৎ তওহীদ এবং দ্বিতীয়টি সেই তওহীদকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই দু’টোর যে কোন একটা বাদ গেলেই সে বা তারা আর মুমিন নয়। সারারাত তাহাজ্জুদ পড়লেও নয়, সারা বছর রোযা রাখলেও নয়। মুসলিম হবার দাবিদার এই জাতি বহু শতাব্দী আগেই তওহীদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছেড়ে দিয়েছে, যার ফলে আল্লাহ তার প্রতিশ্র“তি মোতাবেক এই জাতিকে খ্রিস্টান জাতিগুলির দাসে পরিণত করে দিয়েছেন। এ তওহীদকে (আল্লাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্ব) সার্বিক জীবন থেকে প্রত্যাখ্যান করে সমষ্টিগত জীবনে খ্রিস্টান, ইহুদিদের সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে শুধু ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ করায় অর্থাৎ শিরক ও কুফরে ফিরে যাওয়ায় এই জাতিকে লা’নত দিয়েছেন।

পৃথিবীর বুকে দু’টি জমজমাট ব্যবসা ‘ধর্মব্যবসা ও অস্ত্রব্যবসা’

পৃথিবীর বুকে দু’টি জমজমাট ব্যবসা ‘ধর্মব্যবসা ও অস্ত্রব্যবসা’

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মিসর, সিরিয়া, লিবিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেন-এই ৫টি দেশে গত ৫ বছরে ২০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি করেছে পশ্চিমারা। এসব অস্ত্র মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে জেনেও বিক্রি অব্যাহত রাখে তারা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মিসর, সিরিয়া, লিবিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেন-এই ৫টি দেশে গত ৫ বছরে ২০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি করেছে পশ্চিমারা। এসব অস্ত্র মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে জেনেও বিক্রি অব্যাহত রাখে তারা।
মোহাম্মদ আসাদ আলী:
বর্তমান বস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতার অনুগত পৃথিবীতে জমজমাট কয়েকটি ব্যবসার তালিকা করলে সর্বাগ্রে স্থান পাবে ধর্মব্যবসা ও অস্ত্রব্যবসা। রমরমা এ ব্যবসা দু’টির ফাঁদ থেকে কেউই মুক্ত নয়। পৃথিবীতে প্রচলিত সব কয়টি ধর্মেরই এমন পুরোহিত-যাজক শ্রেণি রয়েছে যারা অর্থের বিনিময়ে ধর্মের কার্যাদি সম্পন্ন করে থাকে। কেউবা রাজনীতির অঙ্গনে ধর্মকে ঢালসরূপ ব্যবহার করে। এটাই ধর্মব্যবসা। অন্যদিকে অস্ত্রব্যবসার সরল-শাব্দিক অর্থ ছাড়াও আরও একটি প্রায়োগিক অর্থ আছে। সেটা হলো আগে অস্ত্রের চাহিদা সৃষ্টি করা, অতঃপর অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রি করা। বিশ্বব্যাপী চলমান অস্ত্রব্যবসার মহাজন হচ্ছে বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ কথিত সব উন্নত সুপার পাওয়াররা। আর খাতকের ভূমিকা পালন করছে উন্নয়নশীল, অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো। অবশ্য স্বল্পন্নোত দেশগুলোও এ ব্যবসার দ্বারা কম নিপীড়িত হচ্ছে না। তারাও বিশ্ব অস্ত্রশক্তির তালিকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র মজুদ করতে গিয়ে ফতুর হচ্ছে।
প্রথমেই আসি ধর্মব্যবসার প্রসঙ্গে। ধর্মকে পার্থিব স্বার্থে ব্যবহার করা একটি সুস্পষ্ট প্রতারণা। এ প্রতারণার করালগ্রাস থেকে মুক্ত নয় আজকের কোনো ধর্মের মানুষই। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলাম ইত্যাদি পৃথিবীতে আজ যত ধর্ম প্রচলিত আছে তার সবই এখন ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে কুক্ষিগত। কেউ ধর্মের ধ্বজাধরে ধর্মীয় পুস্তকাদির মুখস্থ বিদ্যা আউড়িয়ে অর্থ উপার্জন করছে, আবার কেউ ধর্মকে বানাচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অন্যতম হাতিয়ার। এ সবগুলোই কার্যত ধর্মব্যবসা, যার নিষেধাজ্ঞা প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই মিলে। কিন্তু সে ধর্মগ্রন্থগুলোও তো ঐ ধর্মব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের জালে আবদ্ধ। কাজেই ধর্মব্যবসায়ীদের নিকৃষ্ট এই কর্ম সম্পর্কে আজকের দুনিয়ার অধিকাংশ ধর্মভীরু ব্যক্তিই অনবহিত। তারা ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা-পুরুত ও রাজনীতিকদেরকে ধর্মের হর্তকর্তা ভেবে কার্যত প্রতারণার পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে। আর সে হাওয়ায় ফুলে ফেঁপে উঠছে ধর্মব্যবসায়ী প্রতারকরা। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে দেশে ধর্মব্যবসায়ীদের জ্বালানো আগুনে দগ্ধ হচ্ছে অসংখ্য নিপীড়িত অসহায় আদম সন্তান। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে এর ভয়াবহতা সীমা অতিক্রম করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো এদের অপকর্ম দ্বারা সাধারণ মানুষ যতই নিপীড়িত হোক না কেন, প্রতারক ধর্মব্যবসায়ী মহাজনরা কিন্তু স্বল্প দিনের ব্যবসাতেই নাম কামিয়ে ফেলেন। তারা সমাজে পরিচিত হন মাওলানা, আলেম, ওলামা, মোফাসসের, পীর, কামেল, ওলি ইত্যাদি হিসেবে। এভাবে যুগ যুগ ধরে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা অব্যাহত থাকার পরিণাম এই হয়েছে যে, মানবতার মুক্তির পথ ধর্ম রূপ লাভ করেছে মোল্লাতন্ত্রে। সমাজে একটি যুবক আজ যতটা না তার পিতাকে সম্মান করে তার চেয়ে বেশি সম্মান করে কথিত মাওলানা সাহেবকে। স্ত্রী তার স্বামীর আনুগত্য না করলেও ঠিকই পীর সাহেবের আনুগত্য করেন। পিতা তার সন্তানকে না খাইয়ে রেখে সারা দিনের উপার্জনের টাকা মাজারের দানবাক্সে ফেলে আসে, মোল্লাকে নজরানা দেয়। বুভুক্ষ-হাড্ডিসার একজন ভিক্ষুককে অভুক্ত অবস্থায় বাইরে রেখে মোল্লা সাহেবকে গোস্ত পোলাও খাওয়ায়। এক কথায় প্রতারক ধর্মব্যবসায়ীদের ধর্মবাণিজ্য বর্তমানে জমজমাট রূপ লাভ করেছে।
একই অবস্থা অস্ত্র ব্যবসারও। অস্ত্র ব্যবসা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলিত। জমজমাট এই ব্যবসাটিও ধর্মব্যবসার মতোই সিন্ডিকেট নির্ভর। আর এ ব্যবসায় গুটিকতক পুঁজিপতি ব্যবসায়ীর ষড়যন্ত্রের বলি হয় পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি। বর্তমান পৃথিবীতে মূলত অস্ত্র ব্যবসার ঘুটি নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, জাপান, ফ্রান্স ইত্যাদি শক্তিধর দেশগুলো। কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে তথা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে অস্ত্র বিক্রির জন্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মোটামুটি কিছু অজুহাত ছিল। কিন্তু রাশিয়ার পতনের পর আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসা পড়ে বেকায়দায়। পরবর্তীতে বুশ (সিনিয়র) সে বেকায়দা থেকে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের রক্ষা করে ইরাক আক্রমণের মাধ্যমে। কিন্তু এরপর ক্লিংটনের আমলে তারা আবার বিপদে পড়ে। অস্ত্র ব্যবসায় ভাটা পড়ে যায়। কারণ ক্লিংটন যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত আগ্রাসী চরিত্রের সাথে মানানসই ছিলেন না। তিনি বহির্বিশ্ব নিয়ে ততটা মাথা ঘামাতেন না। বেশি মনোযোগ দিতেন নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র বেকারত্ব রোধে কিছুটা সফল হতে পারলেও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য তা ছিল অশনিসংকেত। তাছাড়া সে সময় বিশ্ব মোড়লীপনাতেও চরম ঘাটতি অনুভূত হয় যুক্তরাষ্ট্রের। অতঃপর বুশ (জুনিয়র) আসার পর অস্ত্র ব্যবসায়ীরা নড়ে চড়ে বসে ও বিশ্ব মোড়লীপনাতে গতি আসে। তার আমলে একটি ভালো মানের অজুহাত পাওয়া যায়। সেটা হলো- টুইন টাওয়ার ধ্বংস। অনেকেই মনে করেন অজুহাতটা তাদের নিজেদেরই তৈরি। এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দৃশ্যপটে কম্যুনিজমের স্থান দখল করে ইসলাম বা ইসলামী সন্ত্রাস। শুরু হয় আফগান, ইরাক ইত্যাদি স্থানে একের পর এক আক্রমণ। ওদিকে অস্ত্র ব্যবসায়ীরাও নড়ে চড়ে বসে। কিছুদিনের মধ্যেই চারিদিকে অস্ত্রের নতুন নতুন চাহিদা সৃষ্টি হতে থাকে। আর অস্ত্র বিক্রি করে লাভবান হয় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এখানে আরও একটি বিষয় আছে, যে কারণে কিছুটা লাভবান হলেও তাদের কাক্সিক্ষত সফলতা আসছিল না। সমস্যা দাঁড়িয়েছিল এই যে, যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিভিন্ন দেশ আক্রমণ করছে তখন তো তার মিত্র দেশগুলোর অস্ত্র কেনার দরকার পড়বে না। তাই এবারে পলিসিতে কিছুটা রদ-বদল আনা হলো। এবারে টার্গেট করা হলো ইরান, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশের প্রতি। সারা পৃথিবী থেকে বেছে বেছে এরকম কয়েকটি দেশকে নিয়ে শুরু হলো হুলুস্থুল। উপলক্ষ হিসেবে নেয়া হলো এ দেশগুলোর পরমাণু কর্মসূচি। ব্যাপক সাড়া পড়ে গেল পৃথিবীজুড়ে। তখন ইরানের জুজুর ভয় দেখিয়ে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইরানবিরোধী দেশগুলোতে অস্ত্রবিক্রি করা শুরু হলো। আবার উত্তর কোরিয়ার ভয় দেখিয়ে অস্ত্র বিক্রি করা হলো দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কাছে। আরব দেশগুলোর আছে পেট্রো ডলার, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের আছে বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃৃত্তের অর্থ। চীনের সাথে তাইওয়ানকে নিয়েও বেশ খেলা শুরু হলো। আর এভাবে কোনো প্রকার যুদ্ধ ছাড়াই শুধু প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের বাজার চাঙ্গা হয়ে গেল।
এরপর ২০১২ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন খেলা শুরু হয়। এখানেও মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা সুযোগে সদ্ব্যবহার করেছে। তিউনিসিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে সব সময়ই মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো। ২০১৩ সালের শেষ দিকে যখন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সরকার পতনের আন্দোলনে টালমাটাল অবস্থা তখন সুযোগ বুঝে পশ্চিমারা ওই সব দেশে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মিসর, সিরিয়া, লিবিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেন-এই ৫টি দেশে গত ৫ বছরে ২০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি করেছে পশ্চিমারা। এসব অস্ত্র মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে জেনেও বিক্রি অব্যাহত রাখে তারা।
শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রই এ খেলা চালাচ্ছে তা কিন্তু নয়। এ খেলার অপরদিকে আরেকটি পক্ষ রয়েছে যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে রাশিয়া, চীন ইত্যাদি দেশ। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ শক্তিধর দেশগুলোর রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পুঁজিপতি অস্ত্র ব্যবসায়ীদের দ্বারা। প্রকৃত লাভবানও হচ্ছে তারাই। আর এ অস্ত্র বাণিজ্যের বিপুল অর্থ যোগান দিতে হচ্ছে বিভিন্ন অনুন্নত দেশের দরিদ্র জনসংখ্যাকে। বিভিন্ন দরিদ্র রাষ্ট্রের সরকারগুলো অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে অস্ত্র কিনছে সে অর্থ দিয়ে খুব সহজেই সে দেশের দারিদ্র্য লাঘব করা যায়।
ধর্মব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসার মধ্যে মেলবন্ধন টানা যায় এভাবে যে, এ উভয় প্রকার ব্যবসাতেই সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করা হয়। তাদের তেলে তাদেরকেই ভাজা হয়। কিন্তু জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হলেও জনগণের কাছে তার কারণ অজানাই থেকে যায়। তারা নিজেরাও জানে না যে, ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা-পুরোহিতরা কীভাবে কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে। তারা জানে না কীভাবে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ তাদের অজান্তেই পশ্চিমা শোষককূলের ব্যাংকে জমা হচ্ছে আর বিনিময়ে তাদেরকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দরিদ্র্যতার ঘানি টানতে হচ্ছে।

কোনটি সব থেকে বড় এবাদত

সোনার গম্বুজওয়ালা মসজিদ বানানোর চেয়ে বড় ইবাদত হলো নিরন্নকে অন্ন, আশ্রয়হীনকে আশ্রয়দান

 জাঁকজমকপূর্ণ একেকটা মসজিদ নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তা দিয়ে হাজার হাজার নিরন্ন মানুষের আহার জুটতে পারে, দীন দরিদ্র্যের জীবনকে স্বচ্ছল করা যেতে পারে। আমাদের দেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের অলিতে গলিতে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ। শুধু মসজিদ নয় মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিও যে বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি হয় তাও মসজিদগুলির মতোই। এই ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণসহ সেখানকার ধর্মগুরুদের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষ ব্যয় করে থাকে তা যে কোনো সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়িত অর্থের বহুগুণ। অথচ ঐ উপাসনালয়গুলিতে শুধুমাত্র উপাসনা ভিন্ন অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজও হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় সেগুলি তালাবদ্ধ থাকে।
জাঁকজমকপূর্ণ একেকটা মসজিদ নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তা দিয়ে হাজার হাজার নিরন্ন মানুষের আহার জুটতে পারে, দীন দরিদ্র্যের জীবনকে স্বচ্ছল করা যেতে পারে। আমাদের দেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের অলিতে গলিতে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ। শুধু মসজিদ নয় মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিও যে বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি হয় তাও মসজিদগুলির মতোই। এই ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণসহ সেখানকার ধর্মগুরুদের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষ ব্যয় করে থাকে তা যে কোনো সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়িত অর্থের বহুগুণ। অথচ ঐ উপাসনালয়গুলিতে শুধুমাত্র উপাসনা ভিন্ন অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজও হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় সেগুলি তালাবদ্ধ থাকে।
 জাঁকজমকপূর্ণ একেকটা মসজিদ নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তা দিয়ে হাজার হাজার নিরন্ন মানুষের আহার জুটতে পারে, দীন দরিদ্র্যের জীবনকে স্বচ্ছল করা যেতে পারে। আমাদের দেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের অলিতে গলিতে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ। শুধু মসজিদ নয় মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিও যে বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি হয় তাও মসজিদগুলির মতোই। এই ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণসহ সেখানকার ধর্মগুরুদের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষ ব্যয় করে থাকে তা যে কোনো সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়িত অর্থের বহুগুণ। অথচ ঐ উপাসনালয়গুলিতে শুধুমাত্র উপাসনা ভিন্ন অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজও হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় সেগুলি তালাবদ্ধ থাকে।
জাঁকজমকপূর্ণ একেকটা মসজিদ নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তা দিয়ে হাজার হাজার নিরন্ন মানুষের আহার জুটতে পারে, দীন দরিদ্র্যের জীবনকে স্বচ্ছল করা যেতে পারে। আমাদের দেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের অলিতে গলিতে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ। শুধু মসজিদ নয় মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিও যে বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি হয় তাও মসজিদগুলির মতোই। এই ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণসহ সেখানকার ধর্মগুরুদের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষ ব্যয় করে থাকে তা যে কোনো সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়িত অর্থের বহুগুণ। অথচ ঐ উপাসনালয়গুলিতে শুধুমাত্র উপাসনা ভিন্ন অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজও হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় সেগুলি তালাবদ্ধ থাকে।
রাকীব আল হাসান :
আল্লাহর রসুল এবং প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী খেজুর পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির মসজিদ থেকে অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছেন, তাঁদের মসজিদসমূহ কোনোই জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তবু যে ভূখণ্ডে এই জাতি শাসন করেছেন সেখান থেকে সমস্ত অন্যায় অবিচার, যুদ্ধ রক্তপাত, ক্ষুধা দারিদ্র্য, শোষণ এক কথায় সর্ব প্রকার অন্যায় অশান্তি লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। অথচ বর্তমানে সারা দুনিয়াতে এমন বহু মসজিদ রয়েছে যার গম্বুজ সোনার তৈরি। মসজিদগুলির ভেতর, বাহির এতটাই জাঁকজমকপূর্ণ যে তা রাজপ্রসাদকেও হার মানায়। কিন্তু সমাজ অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ ও রক্তপাতে পরিপূর্ণ। আল্লাহর রসুল বর্তমানের এই সময়ের অবস্থাকেই বর্ণনা করে বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন- (১) ইসলাম শুধু নাম থাকবে, (২) কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, (৩) মসজিদসমূহ জাঁকজমকপূর্ণ ও লোকে লোকারণ্য হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না, (৪) আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব, (৫) তাদের তৈরি ফেতনা তাদের ওপর পতিত হবে। [আলী (রা:) থেকে বায়হাকী, মেশকাত]
আল্লাহর রসুলের পবিত্র মুখনিঃসৃত এই বাণীটি আজ অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে। জাঁকজমকপূর্ণ একেকটা মসজিদ নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তা দিয়ে হাজার হাজার নিরন্ন মানুষের আহার জুটতে পারে, দীন দরিদ্র্যের জীবনকে স্বচ্ছল করা যেতে পারে। আমাদের দেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের অলিতে গলিতে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ। শুধু মসজিদ নয় মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিও যে বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি হয় তাও মসজিদগুলির মতোই। এই ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণসহ সেখানকার ধর্মগুরুদের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষ ব্যয় করে থাকে তা যে কোনো সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়িত অর্থের বহুগুণ। অথচ ঐ উপাসনালয়গুলিতে শুধুমাত্র উপাসনা ভিন্ন অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজও হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় সেগুলি তালাবদ্ধ থাকে।
তবে কি স্রষ্টা আমাদের কাছে শুধুই উপাসনার কাঙাল? স্রষ্টা কি শুধুই উপাসনালয়ের মধ্যে থাকেন? মানুষের সকল কল্যাণ কি শুধু উপাসনার মধ্যেই নিহিত? সকল ধর্মের উদ্দেশ্যই কি মানুষকে উপাসনায় ব্যস্ত রাখা?
না, ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, মানবতার কল্যাণ করা। কিন্তু সকল ধর্মের মানুষই আজ মানবতার কল্যাণের পথ ছেড়ে শুধু উপাসনালয়ে পড়ে থাকাকেই ধর্ম জ্ঞান করছে, ইবাদত মনে করছে। যেহেতু আল্লাহ মানুষকে তার ইবাদত করা ভিন্ন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেন নি (সুরা যারিয়াত ৫৬) সেহেতু আমাদেরকে জানতে হবে ইবাদত কাকে বলে। নামাজ রোজা করা, পূজা-অর্চনা, জপমালা জপা, ধ্যানমগ্ন হয়ে সময় ব্যয় করা ইত্যাদি মানুষের প্রকৃত ইবাদত নয়। ইবাদত কথাটির অর্থ হচ্ছে যে জিনিসকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেই কাজ করা। একটি ঘড়ি তৈরি করা হয়েছে সময় দেখানোর জন্য, এটা করাই তার ইবাদত। সূর্য সৃষ্টি করা হয়েছে আলো ও তাপ দেওয়ার জন্য, এটা করাই তার ইবাদত। মানুষকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা আগে জানতে হবে। কারণ সেটা করাই তার ইবাদত। মানুষকে কি মসজিদে, মন্দিরে, গীর্জা, প্যাগোডায় গিয়ে বসে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? না। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীতে সত্য, ন্যায়, শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। পৃথিবী যখন অশান্তির জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড হয়ে আছে, মানুষের মুখে ভাত নেই, উপাসনালয় থেকে জুতা পর্যন্ত চুরি হয়, যে সমাজে চার বছরের শিশু কন্যা পর্যন্ত ধর্ষিত হয়, পৃথিবীর মাটি মানুষের রক্তে ভিজে আছে, সেখানে এক শ্রেণির লোক মসজিদে গিয়ে যিকির আজকার করেন আর মনে করেন ইবাদত করছেন, মন্দিরে গিয়ে দুধ-কলা দিয়ে মনে করেন যে উপাসনা হচ্ছে, মক্কায়-কাশিতে গিয়ে মনে করেন যে, তারা নিষ্পাপ হয়ে গেছেন। ধর্মগুরুদেরকে অর্থদান করে ভাবেন মহাপুণ্যের কাজ করছেন আসলে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে আছেন। তাদের ইবাদত করা হচ্ছে না। মানুষের প্রকৃত ইবাদত হলো মানবতার কল্যাণে কাজ করা। আল্লাহ বলেছেন, “পূর্ব এবং পশ্চিমদিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন পুণ্য নেই। কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, মালায়েকদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসুলগণের উপর ঈমান আনবে, আর আল্লাহরই প্রেমে স¤পদ ব্যয় করবে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও দাসমুক্তির জন্যে। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা স¤পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই মুত্তাকী (সুরা বাকারা ১৭৭)।
সুতরাং মানুষ কী করলে শান্তিতে থাকবে, দরজা খুলে ঘুমাবে সেই লক্ষ্যে কাজ করাই হলো ইবাদত। এটা সকল ধর্মের মানুষের জন্যই কর্তব্য বা ইবাদত। এই অর্থে যারা আইন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে আছেন তারা যদি কোনো দুর্নীতি না করে ন্যায়ের পক্ষে, সত্যের পক্ষে অবস্থান করেন, মানুষকে শান্তি দেওয়ার কাজ করেন তবে তারাই স্রষ্টার অধিক নিকটবর্তী হবেন। যারা মানবতার কল্যাণে এই কাজগুলি করবে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করবে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য, তাদের চরিত্র সৃষ্টি করার জন্য দরকার হলো নামাজ, রোজা, হজ্বসহ অন্যান্য ধর্মের উপাসনাগুলি। যেমন একটি বাড়িতে খুঁটি দেওয়া হয় ছাদকে ধরে রাখার জন্য। যদি ছাদই না দেওয়া হয়, তাহলে শুধু খুটি গেঁড়ে কোনো লাভ নেই। উপাসনাগুলি হচ্ছে এই খুঁটির মতো। তেমনি যারা শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করবে না, তাদের জন্য এই উপাসনাগুলি কোনো কাজে আসবে না। এগুলো তাদেরকে স্বর্গে বা জান্নাতে, হ্যাভেনে নিতে পারবে না। আমাদেরকে বুঝতে হবে, স্রষ্টা শুধু মসজিদে মন্দিরে থাকেন না। তিনি হাদিসে কুদসীতে বলেছেন, ‘আমি ভগ্ন-প্রাণ ব্যক্তিদের সন্নিকটে অবস্থান করি।’ অন্যত্র বলেছেন, ‘বিপদগ্রস্তদেরকে আমার আরশের নিকটবর্তী করে দাও। কারণ আমি তাদেরকে ভালোবাসি।’ (দায়লামী ও গাজ্জালী)।
রসুলাল্লাহ (সা.) সমগ্র জীবন ধরে যে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন তা কিসের জন্য? এই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। সমগ্র আরব উপদ্বীপ থেকে অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত, দুঃখ, দারিদ্র্য, সকল প্রকার বিভেদ দূর করে ঐক্য, শান্তি, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যক্ষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন এবং যাবার আগে এই শান্তি ও ঐক্য সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন তার হাতে গড়া জাতিটির উপর। ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানেই শান্তি প্রতিষ্ঠা। গৌতম বুদ্ধ (আ.) বুদ্ধত্ব অর্থাৎ নবুয়ত লাভ করার পর শিষ্যদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, “হে ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখ ও মঙ্গলের জন্য এমন ধর্ম প্রচার করো, যে ধর্মের আদি, মধ্য এবং অন্তে কল্যাণ।” সুতরাং বোঝা গেল, ধ্যান করে দুঃখ থেকে মুক্তিলাভ নয়, মানুষের সমষ্টিগত কল্যাণই ছিল বুদ্ধের (আ.) প্রচারিত ধর্মের প্রকৃত লক্ষ্য। একইভাবে ঈসা (আ.) ইহুদিদের প্রার্থনার দিন শনিবারে শরিয়াতের বিধান লঙ্ঘন করে অন্ধ, রুগ্ন, খঞ্জকে সুস্থ করে তুলেছেন। (নিউ টেস্টামেন্ট: মার্ক ৩, লুক ১৪)। সাবাথের দিনে তিনি কেন মানুষের এই কল্যাণগুলি করলেন, ধর্মজীবী রাব্বাই সাদ্দুসাইদের দৃষ্টিতে এটাই ছিল যীশুর মহাপাপ। তাই তারা তাঁকে ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষসহ রাষ্ট্রশক্তিকে উষ্কিয়ে দিয়ে তাঁকে একেবারে হত্যা করে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে। এভাবেই সকল নবী ও রসুল তাদের জীবন ও কর্ম দিয়ে মানুষের কষ্ট দূর করাকেই ধর্ম বলে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। মানুষের শান্তিই সকল ধর্মের আত্মা। ওঙ্কার ধ্বনীর অর্থ শান্তি, ইসলাম শব্দের অর্থও শান্তি, আবার বৌদ্ধ ধর্মেরও মূল লক্ষ্য “সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্ত- জগতের সকল প্রাণি সুখী হোক।” যে ধর্ম মানুষকে শান্তি দিতে পারে না, সেটা আত্মাহীন ধর্মের লাশ। প্রদীপের শিখা নিভে গেলে সেটা আর আলো দিতে পারে না, দিতে পারে শুধু কালি। তাই আজ সারা বিশ্বে যে ধর্মগুলি চালু আছে সেগুলোর বিকৃত অনুসারীরা মানুষকে আলোকিত করার বদলে কালিমালিপ্ত করছে, শান্তির বদলে বিস্তার করছে সন্ত্রাস। তারা ভুলেই গেছে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
ধর্মকে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদিতে ঢুকিয়েছে স্বার্থান্বেষী একশ্রেণির ধর্মজীবীর দল। এই পরাশ্রয়ী ধর্মজীবী শ্রেণিটি সকল ধর্মেই বিদ্যমান। এরা ধর্মকে বানিয়েছে তাদের বাণিজ্যের মূলধন, পুঁজি। নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে করেছে বিকৃত। এদের সামনে যত অধর্মই হোক, যত অন্যায়, অবিচার হোক এরা কোনো প্রতিবাদ না করে মাথা নিচু করে মসজিদে, মন্দিরে, প্যাগোডায়, গীর্জায় গিয়ে ঢুকবে। এদের গায়ে যেন ফুলের টোকাও না পড়ে এ জন্য এরা উপাসনালয়ে ঢুকে নিরাপদ ইবাদতে মশগুল থাকে। মানবতার কল্যাণ, মানবজাতির শান্তি নিয়ে এদের কোনো চিন্তা নেই, যত বেশি মানুষ নামাজ পড়বে, যত বেশি মানুষ পূজা করবে ততই এদের লাভ। দানবাক্স ভর্তি হবে, তাদের সম্মান বৃদ্ধি পাবে। এজন্যই তারা নির্যাতিত মানুষের শান্তি-অশান্তির দায়িত্ব শয়তান, অত্যাচারী দুর্বৃত্তদের হাতে ছেড়ে দিয়ে মসজিদে, মন্দিরে, গীর্জায়, প্যগোডায় ঢুকেছেন। তারা ধর্মকে বাস্তবজীবন থেকে অপসারণ করে উপাসনা, পূজা-প্রার্থনার বস্তুতে পরিণত করেছেন।
ধর্ম ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই, কিন্তু আত্মাহীন ধর্মও মানুষকে মুক্তি দিতে অক্ষম। কাজেই এখন মানবতার কল্যাণের জন্য, মানবজাতির ঐক্যের জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ধর্মকে চার দেয়ালের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সোনার গম্বুজওয়ালা মসজিদ, জাঁকজমকপূর্ণ গীর্জা, প্যাগোডা, আলিশান মন্দির নির্মাণের চেয়ে মানবতার কল্যাণ করা এখন জরুরি। নিরন্নকে অন্নদান, নির্বসনকে বস্ত্রদান, অসহায়, দরিদ্রকে সাহায্য করা এবং সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত ইত্যাদি বন্ধ করাই এখন আসল ইবাদত

এসলাম কোন অর্থে শান্তি

এসলাম কোন অর্থে শান্তি

এসলাম “শান্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা” এ কথার প্রকৃত অর্থ হোল- আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে (ঈড়হংবয়ঁবহপব) পৃথিবীতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হবে যেখানে কোন মারামারি, কাটাকাটি, অন্যায়, অশান্তি, রক্তপাত, অবিচার থাকবে না, এক কথায় সর্বাঙ্গীন শান্তিময় একটি পরিবেশ বিরাজ কোরবে, এই অবস্থার নামই হোচ্ছে এসলাম, আক্ষরিক অর্থেই শান্তি।

এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীঃ


এসলাম “শান্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা” এ কথার প্রকৃত অর্থ হোল- আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে পৃথিবীতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হবে যেখানে কোন মারামারি, কাটাকাটি, অন্যায়, অশান্তি, রক্তপাত, অবিচার থাকবে না, এক কথায় সর্বাঙ্গীন শান্তিময় একটি পরিবেশ বিরাজ কোরবে, এই অবস্থার নামই হোচ্ছে এসলাম, আক্ষরিক অর্থেই শান্তি।
বর্তমানে এসলাম সম্বন্ধে দু’টি ভুল ধারণা প্রচলিত। একটি হলো মুসলিম বোলে পরিচিত জাতিটি যে ধর্মে বিশ্বাস করে, এটিকে বলা হয় এসলাম এবং অন্যান্য ধর্মকে অন্য বিভিন্ন নাম দেয়া হোয়েছে। কিন্তু আসলে আল্লাহ আদম (আ:) থেকে শুরু কোরে শেষ নবী (দ:) পর্যন্ত যতবার যতভাবে জীবন-বিধান পাঠিয়েছেন সবগুলোই ঐ একই নাম এসলাম, শান্তি অর্থাৎ যে জীবন-বিধান অনুসরণ কোরে চোললে মানুষ শান্তিতে সুখে বাস কোরতে পারবে আর অস্বীকার কোরলে তার অবধারিত পরিণতি অশান্তি, রক্তারক্তি, অবিচার। রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবিচার- যা মালায়েকরা বোলেছিলেন (সুরা বাকারা-৩০)।
দ্বিতীয়টি হলো এই ধারণা (আকীদা) যে, আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের নাম এসলাম। এটাও ভুল। কারণ আল্লাহ ইচ্ছা কোরলে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ তাঁকে বিশ্বাস কোরবে। কোন অবিশ্বাসী, কোন সন্দেহকারী, কোন মোশরেক বা মোনাফেক থাকবে না (সূরা আল আনা’ম ৩৫, সূরা ইউনুস ১০০)। কাজেই তা নয়। আল্লাহ মানুষের মধ্যে তাঁর নিজের আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন অর্থ মানুষের মধ্যে যুক্তির শক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান ও সর্বোপরি স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দিয়েছেন, দিয়ে নবী পাঠিয়ে তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন, যে পথে চোললে সে নিজেদের মধ্যে মারামারি, রক্তারক্তি না কোরে শান্তিতে থাকে। এরপর তিনি দেখবেন কে বা কারা তাঁর দেখানো পথে চোলবে আর কে বা কারা তা চোলবে না।
কাজেই আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের নাম এসলাম নয়। তাঁর দেয়া জীবন-ব্যবস্থাকে গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা করার ফল হিসাবে যে শান্তি সেই শান্তির নাম এসলাম। মানুষ যদি যেসব নিয়ম, আইনের মধ্যে এই জগত সৃষ্টি করা হোয়েছে ও চোলছে তা সব জানতো তবে হয়তো মানুষই নিজেদের জন্য এমন জীবন-ব্যবস্থা, ধর্ম তৈরী কোরে নিতে পারতো যা মেনে চোললেও ঐ শান্তি এসলাম আসতে পারতো। কিন্তু মানুষ তা জানে না- তাকে আল্লাহ অতখানি জ্ঞান দেন নি। তাই স্রষ্টা তাকে বোলে দিয়েছেন কোন পথে চোললে, কেমন জীবনব্যবস্থা গ্রহণ কোরলে ঐ অভীষ্ট শান্তি, এসলাম আসবে। বোলে দিয়েছেন তার নবীদের মাধ্যমে। কোন প্রাণী হত্যা কোরব না (বৌদ্ধ ধর্ম), কেউ আমার কোট চুরি কোরলে তাকে জোব্বাটাও দিয়ে দিবো, একগালে চড় দিলে অন্য গাল পেতে দিবো (খ্রিস্ট ধর্ম), এ অর্থে এ এসলাম নয়। যেসব ধর্ম ঐ শিক্ষা প্রচার করে তারা সংখ্যায় পৃথিবীতে অন্য সব ধর্মের চেয়ে বেশী কিন্তু সমস্ত পৃথিবী আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী অশান্তি আর রক্তারক্তিতে লিপ্ত। শুধু তাই নয় ঐ মতে বিশ্বাসীরা এই শতাব্দীতেই দু’বার নিজেদের মধ্যে মহাযুদ্ধ বাঁধিয়ে প্রায় পনের কোটি মানুষ হত্যা কোরেছে, হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর দু’টি কয়েক লক্ষ মানুষসহ ধ্বংস কোরেছে এবং আজ পারামাণবিক অস্ত্র দিয়ে সম্পূর্ণ মানব জাতিটাকেই ধ্বংস করার মুখে এনে দাঁড় কোরিয়েছে।
মানুষকে নিজেদের মধ্যে অশান্তি, অবিচার, মারামারি না কোরে শান্তিতে, এসলামে থাকার জন্য জীবন বিধান দিয়ে আল্লাহ যুগে যুগে পৃথিবীর প্রতি স্থানে, প্রতি জনপদে, প্রতি জাতিতে তাঁর প্রেরিতদের, নবীদের পাঠিয়েছেন (কোর’আন- সুরা আন নহল ৩৬)। মানুষ জাতির কিছু অংশ তা গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা কোরেছে, কিছু অংশ করে নি। যারা গ্রহণ কোরেছে তাদের সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি জীবনের সমস্ত কিছুই ঐ ব্যবস্থার নির্দেশে পরিচালিত হোয়েছে। তাদের সমাজের আইনের উৎস শুধু ঐ জীবন-বিধান বা ধর্মই ছিলো না ঐ বিধানই আইন ছিলো, ওর বাহিরের কোন আইন সমাজ গ্রহণ কোরত না। অনেক কারণে (বিকৃতির কারণগুলো পেছনে বোলে এসেছি) আল্লাহর দেয়া জীবন-বিধান বদলিয়ে ফেলে বা ইচ্ছামত তার ভুল ব্যাখ্যা কোরে তা চালানো হোয়েছে। কিন্তু ঐ ভুল ও অন্যায় আইনকেও সেই ধর্ম বা দীনের আইন বোলেই চালানো হোয়েছে। তার বাহিরের, মানুষের তৈরী বোলে চালানো যায় নি। পৃথিবীর ইতিহাসকে না তোলিয়ে, শুধু এক নজরে যারা পোড়েছেন তারাও এ কথা অস্বীকার কোরতে পারবেন না যে মানব সমাজ চিরদিন শাসিত হোয়ে এসেছে ধর্মের আইন দিয়ে। যখন যেখানে যে নবী ধর্ম বা জীবন-বিধান প্রতিষ্ঠা কোরেছেন, সেখানে রাজা বা শাসনকর্তা শাসন কোরেছেন সেই আইন দিয়ে- অন্য কোন কিছু দিয়ে নয়। আইনের নির্দেশ, উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা কোরেছেন সমাজের বিজ্ঞেরা, পুরোহিতরা, আর তাকে প্রয়োগ কোরেছেন রাজারা, শাসকরা। ওর বাইরের কোন আইন, আদেশ চালাবার চেষ্টা কোরলে সমাজ তা গ্রহণ কোরত না, প্রয়োজনে বিদ্রোহ কোরত। উদাহরণ হিসাবে পশ্চিম এশিয়া নিন। ইহুদিদের আগে ওখানে আমন বা রা দেবতা থেকে শুরু কোরে অনেক রকম দেব- দেবীর ধর্মের আইন চোলতো। ওগুলোও পূর্বতন কোন নবীর আনা দীনের বিকৃতির ফল ছিলো। ইব্রাহীম (আ:) আবার আল্লাহর একত্ববাদ, তওহীদ প্রতিষ্ঠা করার পর ইহুদীরা যতোদিন মধ্য এশিয়ায় ছিলো ততোদিন ঐ আল্লাহ প্রেরিত দীনই ছিলো তাদের জাতির আইন। ভারতের কথা ধোরুন। রামায়ন, মহাভারতসহ ইতিহাস পড়ূন। দেখবেন রাজারা শাসন কোরেছেন শাস্ত্রানুযায়ী- অর্থাৎ ওটাই ছিলো শাসনতন্ত্র (Constitution)। ঐশ্বরিক বইয়ের (Scripture) উপর ভিত্তি কোরে শাস্ত্র, সেই শাস্ত্রের বিধান দিতেন ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা এবং বিধান বা আইন জনগণের উপর প্রয়োগ ও তার রক্ষার দায়িত্ব ছিলো ক্ষত্রিয় রাজাদের উপর। এই শাস্ত্রীয় বিধানের বিরুদ্ধে কোন আদেশ, নির্দেশ দেয়া রাজা বা শাসকের সাধ্য ছিলো না। ইউরোপের অবস্থাও তাই ছিলো। পোপের নির্দেশে রাজ্য শাসন কোরতেন রাজারা। কোন রাজা পোপের নির্দেশ অমান্য কোরতে পারতেন না- কোরলে তার দুরাবস্থার সীমা থাকতো না। মোট কথা পৃথিবীর কোথাও আইনের উৎস ধর্ম ছাড়া আর কোন কিছুকে গ্রহণ করা হয় নি।
যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য আল্লাহর নির্দেশে তাঁর শেষ রসুল এই জাতিটিকে, এই উম্মাহটি গঠন কোরেছিলেন, আর সেটি হোল জীবন ও সম্পদ দিয়ে সংগ্রাম কোরে সমস্ত পৃথিবীতে আল্লাহর আইন-কানুন অর্থাৎ দীন প্রতিষ্ঠা ও কার্যকরী কোরে মানব জাতির ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সমস্ত অন্যায়, অবিচার, শোষণ, অত্যাচার নিঃশেষ কোরে দিয়ে ন্যায়, সুবিচার, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আর এই জন্যই এই দীনের নাম এসলাম, আক্ষরিক অর্থেই শান্তি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, আদম (আঃ) থেকে মোহাম্মদ (দঃ) পর্যন্ত ঐ একই নাম, এসলাম বা শান্তি। আজ আমাদের ধর্মীয় ও অধর্মীয় (অর্থাৎ রাজনৈতিক) নেতারা যে অর্থে এসলামকে শান্তির ধর্ম বলেন তার ঠিক বিপরীত অর্থ। তারা শান্তির ধর্ম বোলতে বোঝেন যে ধর্মের অনুসারীরা হবেন অতি শান্তিপ্রিয়, মৃদুভাষী। কোন অন্যায়ের তারা প্রতিবাদ কোরবে না, সব অপমান, লাঞ্ছনা, নির্যাতন মুখ বুজে ধৈর্যসহকারে সহ্য কোরে যাবেন, নির্যাতনকারীকে ক্ষমা কোরে দিবেন আর ভালাবাসবেন। তারা কোন কিছুর জন্য সংগ্রাম বা যুদ্ধ কোরবেন না। কিন্তু প্রকৃত অর্থে একজন মোসলেমের কখনই এরূপ কাপুরুষ হওয়া সম্ভব নয়, যদি হয় তবে তিনি আল্লাহর শেষ রসুলের উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হোতে পারেন না। এসলাম “শান্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা” এ কথার প্রকৃত অর্থ হোল- আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে (Consequence) পৃথিবীতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হবে যেখানে কোন মারামারি, কাটাকাটি, অন্যায়, অশান্তি, রক্তপাত, অবিচার থাকবে না, এক কথায় সর্বাঙ্গীন শান্তিময় একটি পরিবেশ বিরাজ কোরবে, এই অবস্থার নামই হোচ্ছে এসলাম, আক্ষরিক অর্থেই শান্তি।

যে বেদাতে সবাই নিমজ্জিত

যে বেদাতে সবাই নিমজ্জিত

1461554_675355319163471_1779367149_n
মুসলিম বলে পরিচিত জনসংখ্যাটি ইসলামের মূল ভিত্তি তওহীদ থেকে সরে গিয়ে আল্লাহর আইন-কানুনকে তাদের সামষ্টিক জীবন থেকে বাদ দিয়ে ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র তৈরি অর্থাৎ মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থাকে তাদের দীন হিসাবে গ্রহণ করেছে।
বেদা’ত এর শাব্দিক অর্থ সংযোজন। আর এর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, মহানবীর (দ:) সময় এই দীন, ইসলাম যা ছিল, এবং এই জীবন ব্যবস্থাকে তিনি যে অবস্থায় ছেড়ে গেছেন তাতে অতিরিক্ত কোন কিছু যোগ, সংযোজন করাই হোল বেদা’ত। আল্লাহ এই বেদা’তকে শেরকের সমপর্যায়ের গোনাহ বলে বর্ণনা করেছেন। আর আল্লাহ শেরক ও কুফরকে কখনো মাফ না করার প্রতিজ্ঞা করেছে। অর্থাৎ শেরকের সাথে বেদা’তও ক্ষমার অযোগ্য গোনাহ হয়ে গেলো। বর্তমানের বিকৃত ইসলামের অনেক আলেম মাজার পূজা, পীর পূজা, কবরে মোমবাতি দেওয়া ইত্যাদিকে বেদাতি কাজ বলে আখ্যা দিয়ে থাকে, ওগুলি নিঃসন্দেহে বে’দাতি কাজ তবে প্রকৃত যে বে’দাতকে রসুলাল্লাহ শেরকের সমতুল্য ঘষণা করলেন, সেই বেদাত এগুলি নয়। যে বেদা’ত সম্পর্কে রসুলাল্লাহ বলেছেন সেটা হোল ‘আল্লাহর তৈরি এই জীবন ব্যবস্থা, দীনের জাতীয় বিধানগুলির মধ্যে অন্যের, গায়রুল্লাহর তৈরি বিধান-আইন ইত্যাদি সংযোজন করা।’ আর এটাই আসল বেদা’ত। রসুলাল্লাহ বলেছেন ভবিষ্যতে ইসলামের ওপর যে সব বিপদ আসবে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিপদ হবে বেদা’ত। এখানে তিনি কোন্ বিপদের কথা বলেছেন, নিশ্চয়ই মাজার পূজার কথা নয়?
রসুলাল্লাহ যে দীন পৃথিবীতে রেখে গেলেন সেই দীনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপূর্ণ দিক-অর্থাৎ জাতীয় দিকটার কোন কিছু বদলিয়ে মানুষের তৈরি কোন কিছু যদি তাতে যোগ করা হয় তবে রসুলাল্লাহর উম্মাহর জীবনে তারচেয়ে বড় বিপদ আর কি হতে পারে? এটাই সবচেয়ে বড় বে’দাত। এই বেদা’তের কারণে মুসলিম বলে পরিচিত জনসংখ্যাটি ইসলামের মূল ভিত্তি তওহীদ থেকে সরে গিয়ে আল্লাহর আইন-কানুনকে তাদের সামষ্টিক জীবন থেকে বাদ দিয়ে ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র তৈরি অর্থাৎ মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থাকে তাদের দীন হিসাবে গ্রহণ করেছে। আল্লাহ যা দেন নাই, এমন কি নিষেধ করেছেন সেই বিধানগুলিই এখন দীনের অর্থাৎ আমাদের জীবন-ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এর চেয়ে বড় আর কোন বে’দাত হতে পারে না, বেদা’তের এই সংজ্ঞা অনুযায়ী এই মুসলিম নামধারি জাতিটি আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি তন্ত্র-মন্ত্র বা জীবনব্যবস্থা গ্রহণ কোরে নিয়ে সবচেয়ে বড় বেদা’তের মধ্যে ডুবে আছে। যার অনিবার্য ফল বর্তমান পৃথিবীর এই অসহনীয় অশান্তি।

জাতিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে

জাতিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে

জাতিসংঘের হিসাবমতে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরও অন্তত ৭০ লাখ। বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। শিক্ষাহীনভাবে বেড়ে উঠছে শিশুরা। দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে তাদের জীবন।
জাতিসংঘের হিসাবমতে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরও অন্তত ৭০ লাখ। বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। শিক্ষাহীনভাবে বেড়ে উঠছে শিশুরা। দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে তাদের জীবন।
মোহাম্মদ আসাদ আলী:
“আমরা কেউই আসলে ভাবতে পারিনি এ সংকট আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে নিয়ে আসবে। শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে সরকারের কঠোর পদক্ষেপই একে সহিংস লড়াইয়ে পরিণত করে। এর পরিণতি আজ ভয়ংকর হয়ে দেখা দিয়েছে। এখান থেকে উত্তরণে কোনো আশার আলো আর নেই।” সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের ৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দেশটির ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে এভাবেই অভিমত ব্যক্ত করেন সিরীয় শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক মারওয়ান কাবালান। দেশটির ভয়াবহতার চিত্র এককথায় হৃদয়বিদারক। প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই সেখানে। একেকটি দিন পার হওয়া মানেই একেকটি নতুন জীবন। সেখানে জীবন মানেই যুদ্ধ। ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের যুদ্ধ। ৪ বছর অতিক্রম হওয়া সত্ত্বেও সংকট সমাধানের ক্ষীণ আশাও দেখছেন না গৃহযুদ্ধ পীড়িত দেশটির জনগণ।
জাতিসংঘের হিসাবমতে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরও অন্তত ৭০ লাখ। বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। শিক্ষাহীনভাবে বেড়ে উঠছে শিশুরা। দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে তাদের জীবন। বিশ্ব দাতা সংস্থাগুলো বলছে, সংকট নিরসনে জাতিসংঘ পুরোপুরি ব্যর্থ। খুবই স্বাভাবিক। একটি জাতি যখন নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয়, একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার প্রতিজ্ঞা করে তখন সে জাতিকে নিশ্চিত ধ্বংসের পথ থেকে ফেরানোর সাধ্য কারও থাকে না।
সিরিয়ার এই ধ্বংসলীলা কীভাবে শুরু হয়েছিল? মধ্যপ্রাচ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা কথিত আরব বসন্ত আন্দোলনের রেশ ধরে সিরিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু করে পশ্চিমা মদদপ্রাপ্ত বিরোধী পক্ষ। বিরোধীরা ক্রমেই উগ্রপন্থার দিকে অগ্রসর হলে সরকারও ক্রমশ কঠোরতা প্রদর্শন করতে থাকে। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের উপর অস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য হয় সরকার। দমননীতি গ্রহণের স্বাভাবিক পরিণতিই হচ্ছে সহিংসতা বৃদ্ধি। মুহূর্তের মধ্যে গণজাগরণমূলক আন্দোলনটির সঙ্গে সরকার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সুযোগ পেয়ে বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা দিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলি এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলো। শুরু হয় ধ্বংসের পথে হতভাগা সিরীয়দের রক্তাক্ত যাত্রা।
মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী দেশ ইরাক। সাম্রাজ্যবাদের নির্মম আঘাতের দগদগে ঘা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল দেশটি। কিন্তু অনৈক্য, শিয়া-সুন্নি সংঘাত এবং সাম্রাজ্যবাদের কূটচাল ধ্বংসপ্রাপ্ত সিরিয়ার পাশে দাঁড় করাল ইরাককেও। আবারও পশ্চিমাদের পদতলে দলিত হবার পথে এগোচ্ছে দেশটি। এদিকে লিবিয়ার অবস্থাও ভয়াবহ। আরব বসন্তের রেশ ধরে সেখানেও সরকারবিরোধী গোষ্ঠী গাদ্দাফী সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দিলে সরকার অস্ত্রের ভাষায় তার জবাব দেয়। আর সেই সুযোগে বিরোধীদের হাতে অস্ত্র উঠিয়ে দেয় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। গাদ্দাফী সরকার উৎখাত হয়, কিন্তু যুদ্ধ থেমে থাকে না। বর্তমানে লিবিয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠিত সরকার নেই। একেক অঞ্চল শাসন করছে একেক গোষ্ঠী। সারাক্ষণ গুম, খুন, বোমা হামলা, অপহরণের আশঙ্কায় তটস্থ থাকতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ জনগণকে। লিবিয়ার মানুষের জন্য পশ্চিমাদের উতলে পড়া দরদ আজ উবে গেছে। তারা এখন ভুলেও লিবিয়ার কথা মুখে আনে না। বস্তুত দীর্ঘদিনের জমে থাকা জাতীয় অনৈক্য, মানুষের তীব্র সরকারবিরোধী মনোভাব এবং ঐক্য গঠনের পরিবর্তে সরকারি দমন-পীড়নই লিবিয়ার এ দুর্দশার জন্য দায়ী।
জাতীয় অনৈক্যের পরিণতিতে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই এবং পশ্চিমাদের স্বার্থ উদ্ধারের এই স্রোতে সর্বশেষ গা ভাসিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী দেশ ইয়েমেন। দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী মতাদর্শীদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ চূড়ান্তভাবে যুদ্ধের সূচনা করেছে। পশ্চিমা জোট দেশটির ভাগ্য নিয়ে নতুন খেলা আরম্ভ করেছে। আর সে খেলায় ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করছে সৌদি আরবসহ পশ্চিমা কৃপাভাজন আরব রাষ্ট্রগুলো। সব মিলিয়ে ইয়েমেন পরিণত হতে যাচ্ছে নতুন সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক বা আফগানিস্তানে। বিশ্লেষকরা এই সব কিছুর জন্য দেশটির বহু বছর ধরে লালিত জাতীয় অনৈক্য, ঐক্যপ্রচেষ্টায় উদাসীনতা, এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষকে দমন-পীড়ন-নির্যাতন এবং পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকে দায়ী করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ঘটনাপূঞ্জি থেকে আমাদেরকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশেও আজকে কথিত গণতন্ত্রের দাবিতেই সরকারবিরোধীরা আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাদের আন্দোলনও বিভিন্ন সময় নাশকতায় রূপ নিচ্ছে। হতাহত হচ্ছে শত-সহস্র নিরীহ-নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সহিংস সরকারবিরোধী আন্দোলনে শুধু আগুনে পুড়েই নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে একশ’রও বেশি মানুষ। জীবন্ত দগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছে অনেকেই। আর সরকার যথারীতি সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কঠোরহস্তে বিরোধীদের দমনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। গণপিটুনি ও ক্রসফায়ারের নামে চলছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। কেউ উগ্রতা দেখায় গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য, কেউ দেখায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। উভয়ই চলে জনতার নামে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বিরোধীপক্ষটি সহিংস কর্মসূচি থেকে বিরত রয়েছে, কিন্তু তার মানেই এই নয় যে, সকল সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশের এই সহিংসতা সংঘটনকারী দলগুলোকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলো।
সিরিয়া, ইরাক বা ইয়েমেনের সাথে বাংলাদেশের পার্থক্য হচ্ছে আমাদের এখানে সহিংসতার পটভূমি রচিত হয়েছে রাজনীতিকে ঘিরে, ধর্মীয় বিষয় এখানে মুখ্য নয়। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ইস্যুকে ধর্মীয় ইস্যুতে কনভার্ট করতেও খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শাহবাগ আন্দোলন ও হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ, আস্তিক-নাস্তিক বিরোধ এবং ক্রমাগত নাস্তিক ব্লগার হত্যার মতো ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, বিভিন্ন রাজনীতিক ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশে ধর্মীয় ইস্যুও সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো ভেতরে ভেতরে ক্রিয়াশীল আছে, যা যে কোনো সময় যে কোনো দিকে প্রবাহিত হতে পারে।
আজ আমাদের রাজনীতিকরা এক অশুভ দানবের ইশারায় ক্রীড়নক হয়ে খেলছেন মাত্র। জাতির ভবিষ্যতকে তারা কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন সে দিকে কোনো খেয়াল নেই তাদের। আজ যদি এই রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণ নিজেদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এতটাই অপরিণামদর্শী থেকে যান, দেশের স্বার্থ চিন্তা না করে কেবলই নগদ স্বার্থের হিসাব করেন, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমাদেরও কেউ একজন সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলার ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে মারওয়ান কাবালানের ন্যায় বলবেন, “আমরা কেউই আসলে ভাবতে পারিনি এ সংকট আমাদের আজকের এই মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে নিয়ে আসবে। আজ এখান থেকে উত্তরণের কোনো আশার আলোই আর নেই।”

পশ্চিমা প্রিজমে দেখলে হেযবুত তওহীদকে চেনা যাবে না

পশ্চিমা প্রিজমে দেখলে হেযবুত তওহীদকে চেনা যাবে না -রুফায়দাহ পন্নী, উপদেষ্টা, দৈনিক বজ্রশক্তি

Untitled-48-622x336বর্তমানে ইসলামের অনেকগুলো প্যাটার্ন বা রকমফের আমরা দেখতে পাই। একেক দেশে একেকরকম ইসলামের চর্চা হয়। ইন্দো-মালয় অঞ্চলে একরকম, আরবে একরকম, ইরানে একরকম, আফ্রিকায় একরকম, ভারতে একরকম, বাংলাদেশে আরেকরকম। আমাদের এখানে ইসলামের নামে অনেক কিছুই চলে যা আরবেরা জানেই না। অর্থাৎ হালবিহীন নৌকা যেমন যেদিকের বাতাস পায় সেদিকেই ঘুরে যায় ইসলামের অবস্থাটা সেই রকম দাঁড়িয়েছে। ইসলামের নামে অনেক যুক্তিহীন অবৈজ্ঞানিক চর্চা, কুসংস্কার, ধ্যান ধারণা ইত্যাদি চলছে যা দেখে অনেক মানুষ কেবল ধর্ম অস্বীকারকারী নয়, ধর্মবিদ্বেষীই হয়ে যাচ্ছেন। এ হলো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা, এর বাইরে যারা ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের মধ্যেও অনেকগুলো ডাইমেনশন আছে। ইসলামী দলগুলোর ক্ষেত্রে মতবাদ ও কৌশলগত শ্রেণিভেদে যে শব্দগুলো আমরা পশ্চিমা মিডিয়ায় বেশি ব্যবহৃত হতে দেখছি তার কয়েকটি হচ্ছে:
১. মিলিট্যান্ট ইসলাম, ২. পলিটিক্যাল ইসলাম, ৩. মডারেট ইসলাম, ৪. লিবার‌্যাল ইসলাম, ৫. সুফিস্টিক ইসলাম, ৬. এক্স-ট্রিমিস্ট ইসলাম, ৭. কনজারভেটিভ ইসলাম, ৮. র‌্যাডিকেল ইসলাম, ৯. ফান্ডমেন্টালিস্ট ইসলাম, ১০. জিয়োলট্রিক ইসলাম, ১১. প্যান ইসলামিজম, ১২. ফ্যানাটিক ইসলাম, ১৩. কম্যুনিস্ট ইসলাম
এই প্রকারভেদের কোনো কোনোটির মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম, কোথাও মোটা। যে কোনো ইসলামপন্থী ব্যক্তি ও আন্দোলনকে এর যে কোনো পর্যায়ভুক্ত (ঈধঃবমড়ৎরবং) করে বিবেচনা করা হয়। এখানে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, আল্লাহর রসুল ও তাঁর সাহাবিরা উপরের কোন শ্রেণিভাগে পড়েন? প্রত্যেক দলের লোক তাদের নিজেদের দলেই আল্লাহ-রসুলকে টানতে চাইবেন, তাই এ প্রশ্নের সমাধান হওয়া অতীব জরুরি হলেও সহজ নয়।
এই প্রকারভেদগুলো কীভাবে আসলো, কারা করল, কখন থেকে এগুলো শুরু হলো? এই ইতিহাস সবাই জানেন যে, ইসলামপূর্ব আরব জনগোষ্ঠী কেমন ঐক্যহীন, বিশৃঙ্খল, শিক্ষাদীক্ষাহীন, পারস্পরিক বংশানুক্রমিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত, হতদরিদ্র অর্থাৎ এক কথায় দারুণ অন্যায়-অবিচার, বর্বরতায় পূর্ণ ছিল। এমন একটি অধঃপতিত জনগোষ্ঠীকে আল্লাহর রসুল এমন একটি মহান জাতিতে পরিণত করলেন যারা পরবর্তী মানবজাতির ইতিহাসের গতিই বদলে দিল। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক শক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সমৃদ্ধি এক কথায় সর্ব বিষয়ে তারা অন্য জাতির শিক্ষকের আসনে প্রতিষ্ঠিত হল। এই ধারাটি অব্যাহত রাখার দায়িত্ব ছিল পরবর্তী উম্মতে মোহাম্মদীর বা পরবর্তী প্রজন্মগুলোর। কিন্তু তারা অর্ধ-দুনিয়ার অধীশ্বর হয়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে গেল। আর্ত-অসহায় মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম ত্যাগ করে তারা পারস্য ও রোমান রাজা বাদশাহদের অনুকরণে মালিক-সুলতান সেজে রাজত্ব করতে লাগল। জাতি হয়ে গেল স্থবির। বদ্ধ পুকুরের জল যেমন দূষিত হয় তেমনি ইসলামও দূষিত হতে শুরু করল। প্রায় এক হাজার বছর এই পচনক্রিয়া চলল।
এই বি¯তৃত সময়কালে একদিকে মোফাসসের, আলেম, ফকীহ, বিবিধ মজহাবের ইমাম, মোহাদ্দেস, তার্কিকদের অতি বিশ্লেষণে ইসলাম জটিল, দুর্বোধ্য মাসলা মাসায়েলের জালে বন্দী হয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের বাইরে চলে গেল, অপরদিকে পীর, মাশায়েখ ও বিকৃত সুফিবাদের প্রভাবে উম্মাহর বহির্মুখী চরিত্র অন্তর্মুখী, ঘরমুখী হয়ে গেল। তারা সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী ও প্রতিবাদী চরিত্র হারিয়ে নির্বিরোধী সুফি, মুত্তাকি, পরহেজগার বান্দা হওয়ার দিকে মুখ ফেরাল। অর্থাৎ এই জাতির ধর্মই (গুণ বা বৈশিষ্ট্য) পাল্টে গেল। এরই মাঝে ইসলামের যে একক জাতিসত্ত্বা রসুলাল্লাহ নির্মাণ করে গিয়েছিলেন তার ধারণাও লুপ্ত হয়ে গেল। শত সহস্র ফেরকা, মজহাব, তরিকায় বিভক্ত হয়ে জাতিটি আল্লাহর দৃষ্টিতে আর মো’মেন রইল না, উম্মতে মোহাম্মদী রইল না, হয়ে গেল উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, সেলজুক, মামলুক, তুর্কী, মোগল, পাঠান ইত্যাদি বংশীয় রাজতান্ত্রিক শাসক ও শাসিত। এই এক হাজার বছরে তারা যত যুদ্ধ করেছে তার প্রায় সবই করেছে সাম্রাজ্যবিস্তার ও পরসম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে যা ছিল আল্লাহর হুকুম ও রসুলাল্লাহর নীতিমালা পরিপন্থী। ইসলামের সবচেয়ে বেশি বদনাম হলো এজন্য যে, ঐ সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতালিপ্সু ভোগী রাজা বাদশাহরা নিজেদেরকে ধর্মে মুসলিম বলে পরিচয় দিতেন ফলে শেয়াল কুকুরের মতো সেই স্বার্থের হানাহানির ইতিহাসকেই আজ ইসলামের ইতিহাস বলে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের শিক্ষিত শ্রেণি ইসলাম সেই পারস্পরিক কামড়া-কামড়ি, ধর্মের নামে অধর্ম অনাচার, আর ভোগবিলাসের ইতিহাস পড়ে ইসলাম সম্পর্কে একটি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসছেন।
প্রাকৃতিক নিয়মেই সব কিছুর একটা শেষ আছে, পচনের পর পতন আছে। এই মুসলিম দাবিদার কার্যত কাফের (সত্য প্রত্যাখ্যানকারী) জনগোষ্ঠীরও পতন ঘটল অত্যন্ত করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে। ইউরোপীয় জাতিগুলো আল্লাহর শাস্তিরূপে এ জনগোষ্ঠীর উপর আপতিত হলো। তারা আটলান্টিকের তীর থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত তদানীন্তন অর্ধ পৃথিবীতে বিরাট সংখ্যা নিয়ে বিরাজিত ঐক্যহীন, লক্ষ্যহীন, বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন উম্মতে মোহাম্মদী দাবিদার কিন্তু কার্যত কাফের জনগোষ্ঠীকে সামরিক শক্তি দিয়ে পদানত করল। এ জাতি যেন কোনোদিনও আর মাথা তুলতে না পারে, পশ্চিমা সভ্যতাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ ও নিজেদেরকে নিকৃষ্ট বলে ভাবতে শেখে, দাসত্বকেই মর্যাদা বলে ভাবতে শেখে, ঔপনিবেশিক চাবুকের বিরুদ্ধে যেন ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, সেজন্য তারা একাধারে দুই প্রকার (মাদ্রাসা ও সাধারণ) শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করল। পরাজয়ের পর এই জাতির ভাগ্যে কী নির্মম পরিণতি নেমে এসেছিল সে ভয়াবহ, লোমহর্ষক ইতিহাস, যা বর্ণনা করতে গেলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে কিন্তু এক ক্ষুদ্রাংশের বর্ণনাও শেষ হবে না, সেই ঔপনিবেশিক নিষ্ঠুরতার ইতিহাস না শেখানো হচ্ছে আলেমদের, না শেখানো হচ্ছে শিক্ষিতদের। একটা পর্যায়ে এসে এ জাতির কিছু লোক গোলামির হাত থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। তারা কেউ জাতীয়বাদের চেতনায়, কেউ ধর্মীয় চেতনায় বিভিন্ন দল গড়ে তুলতে লাগল। এগুলির মধ্যে ছোট ছোট দল ও সংগঠনও আছে আবার মিশরের ইখওয়ানুল মুসলেমিন ও জেহাদ, আলজেরিয়ার ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট ও জাম’য়া, তিউনিশিয়ার আন-নাহদা, মালয়েশিয়ার আল আরকাম, ইন্দোনেশিয়ার দারুল ইসলাম ও এই উপমহাদেশের জামায়াতে ইসলামীর মত সংগঠনও আছে। এদের কোনোটি পাশ্চাত্যের ছকে বাঁধা রাজনীতিক পদ্ধতিতে নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, কোনোটি চরমপন্থা নিয়েছে। আর বর্তমানের জঙ্গিবাদ? সেটা তো রাশিয়া-আফগান যুদ্ধে মার্কিনদের সৃষ্টি করা আল কায়েদার মত দল যার সবগুলোই পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষণে গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে আছে তালেবান, বোকো হারাম, আল শাবাব, হামাস, হেযবুল্লাহ, হরকাতুল জেহাদ, লস্কর-ই-তাইয়্যেবা ইত্যাদি। আমাদের দেশেও তাদের বিভিন্ন নামে তাদের কর্মকাণ্ড আছে। এদের উদ্যোগগুলো দীর্ঘ সংগ্রামের পর ব্যর্থ হয়েছে, অনেকে এখনো চেষ্টা চালাচ্ছে, তারাও ব্যর্থ হবে। ব্যর্থতাই সেগুলোর স্বাভাবিক পরিণতি। কারণ তারা যে ইসলাম নিয়ে দাঁড়িয়েছে (বা দাঁড় করানো হয়েছে) সেটা আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম নয়। এ কারণে আল্লাহর কোনো সাহায্য তারা পায় নি, আর আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আল্লাহর রসুলের পক্ষেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না। যে ‘ইসলাম’ আদৌ ইসলমাই নয়, যা ১৩০০ বছরের অতি বিশ্লেষণকারী আলেম ওলামাদের মনগড়া বিকৃত বিধিবিধানের সমষ্টি সেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহ কেন সাহায্য করবেন? তাদের কারো কাছেই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা না থাকায় তারা যেখানেই ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে সেখানেই বিবেকহীন, অমানবিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মনে ভীতি, আতঙ্ক, ইসলামের ব্যাপারে তিক্ত মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বজোড়া সেই ধর্মান্ধতার অতিরঞ্জিত বিবরণ ইসলাম-বিদ্বেষের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে।
দুনিয়াজোড়া শত শত ইসলামী দলকে পশ্চিমা তাত্ত্বিক, সমাজবিদ, মিডিয়া বাহিনী শ্রেণিবিন্যাস করেছে। তাদেরই অনুকরণে এ দেশের সাংবাদিক, কলামিস্ট, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিকগণও ঐ একই ফ্রেমে এদেশের সংগঠন বা আন্দোলনগুলোকে ফেলে বিচার করেন। হেযবুত তওহীদকেও সেইভাবেই বিচার করা হয়েছে। যেহেতু হেযবুত তওহীদ সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (চূড়ান্ত সত্য ও ন্যায়) প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাই হেযবুত তওহীদকেও চরমপন্থী অথবা চরমপন্থী হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়।
বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য এমামুয্যামান প্রায়ই একটি উদাহরণ দিতেন। তিনি বলতেন, ধরুন- আমার আর আপনার দুজনেরই একটা করে নাক আছে, দুটো করে কান আছে, দুটো করে হাত পা আছে, এমনকি আপনার নামের সঙ্গে আমার নামেরও খানিকটা মিল আছে, দুজনেই খাই, দুজনেই ঘুমাই কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমি আর আপনি এক ব্যক্তি। কারণ আমাদের অমিলও আছে হাজারটা । জঙ্গিরাও আল্লাহ বিশ্বাস করে আমরাও বিশ্বাস করি, নিজেদেরকে রসুলের উম্মাহ দাবি করে আমরাও করি, তারা কোর’আনকে আল্লাহর কেতাব মনে করে আমরাও করি, তারা কাবাকে আল্লাহর ঘর মনে করে আমরাও করি, তারা হাশর-কেয়ামত বিশ্বাস করে আমরাও করি, এসব মিল থাকার মানেই এই নয় যে আমরা আর তারা এক হয়ে গেলাম। কারণ ঐ সংগঠনগুলোর লক্ষ্য ও আমাদের লক্ষ্য এক নয়, তাদের কর্মসূচি আমাদের কর্মসূচি এক নয়, তাদের কর্মকাণ্ড ও আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে আকাশ পাতাল ব্যবধান। তাদের আদর্শ এবং আমাদের আদর্শও এক নয়। এই পার্থক্য যে বুঝতে পারে না, সে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কোনো একটি ভূখণ্ড দীর্ঘদিন পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দী, কিছুতেই স্বাধীনতা আসছে না, তখন ইসলামের সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে স্বাধীনতার যুদ্ধকে জেহাদ-কেতাল বলে চালিয়ে দিচ্ছে কিংবা একটি সরকার পতনের আন্দোলনকে সফল করার জন্য ইসলামি সেন্টিমন্টের সাহায্য নিচ্ছে। আবার তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রী করছে পশ্চিমারা। এভাবেই আসছে জঙ্গিবাদ।
অন্যান্য দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ঐ জঙ্গি দলগুলো আসলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, কারণ ইসলাম অর্থ শান্তি। তারা চায় নারীদের বোরকা পরাতে, চায় পিটিয়ে নামাজ পড়াতে, পুরাকৃতি ভেঙে ফেলতে, শরীয়াহ আইনের নামে শিরোচ্ছেদ আর মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করতে, নারীদেরকে শিক্ষা ও বহির্জগতের কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত করতে, পুরুষদেরকে দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করতে, গান-বাদ্য, নাটক, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ইত্যাদিকে নিষিদ্ধ করতে। তারা ভাবে এগুলো করলে শান্তি আসবে। কিন্তু এভাবে কোথাও শান্তি আসে নি। প্রমাণ আফগানিস্তান, আই.এস শাষিত অঞ্চল, সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো। মূল বিষয় হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্ব চলমান সভ্যতার সংঘর্ষে পশ্চিমা সভ্যতার বিপরীতে যৌক্তিক কারণে ইসলামকে প্রতিপক্ষ হিসাবে গ্রহণ করেছে। তারাই বিভিন্ন দেশের এই ইসলামিক দলগুলোকে ব্যবহার করছে, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মুসলিমদেরকে দিয়ে মুসলিমদের ধ্বংস করার জন্য এবং মুসলিম দেশগুলোতে সামরিক (জঙ্গি) আগ্রাসন চালানোকে জায়েজ করণার্থে টুইন টাওয়ার জাতীয় কিছু ধ্বংসাত্মক নাটক মঞ্চস্থ করার জন্যই এই জঙ্গিগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটিয়েছে। অস্ত্র বাণিজ্যভিত্তিক যুদ্ধ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য জঙ্গিদেরকে পশ্চিমাদের প্রয়োজন। তাদের এ স্ব-স্বীকৃত তথ্য যা একটি ওপেন সিক্রেট তা সচেতন সকলেই অবগত আছেন। এই জঙ্গিবাদী দলগুলো জেহাদ ও কেতালের নামে সন্ত্রাস করছে, বোমাবাজি করছে আর এমামুয্যামান তাদের এই কাজগুলো কেন ইসলামসম্মত নয় সেটা তাঁর বইতে তুলে ধরছেন এবং হেযবুত তওহীদ সেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জীবনপণ সংগ্রাম করছে- এটাই হচ্ছে মোটাদাগে সেই জঙ্গি দলগুলোর সঙ্গে হেযবুত তওহীদের তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক অঙ্গনের পার্থক্য।
পক্ষান্তরে হেযবুত তওহীদ হচ্ছে সেই প্রকৃত ইসলাম যা আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী (দ.) পর্যন্ত সকল নবী-রসুল-অবতারগণ নিয়ে এসেছিলেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি মানবসমাজ প্রতিষ্ঠা যেখানে মানুষের চিন্তা, কথা, পছন্দ-অপছন্দ, চলাফেরা, গবেষণার স্বাধীনতা থাকবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষ হবে কিন্তু সেগুলো ব্যবহার হবে শুধু মানুষের কল্যাণে। প্রতিটি মানুষ দয়া-মায়া, সহযোগিতা, ঐক্য-শৃঙ্খলায় পূর্ণ থাকবে। এখন যেমন পুলিশের চোখ এড়াতে পারলেই জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় তখন তা হবে না, ধার্মিক ও নাস্তিক উভয়ের হৃদয়ে নৈতিকতার শক্তিশালী বোধ জাগ্রত হবে যার পরিণামে কেউ কারো অধিকারে হাত দেবে না, কাউকে দিতেও দেবে না। পরিণামে সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সমৃদ্ধি, ভালোবাসায় পূর্ণ একটি স্বর্গরাজ্য হবে এই মানবসমাজ। এটা কোনো সমাজতান্ত্রিকদের ইউটোপিয়া নয়। প্রকৃত ধর্ম দ্বারা, নবী-রসুলদের দ্বারা এমন স্বর্গরাজ্য অতীতে বার বার হয়েছে, এবার সেটাই হেযবুত তওহীদ প্রতিষ্ঠা করবে ইনশা’ল্লাহ। কারণ হেযবুত তওহীদ পৃথিবীতে আল্লাহর স্বাক্ষর, স্বয়ং আল্লাহ এ আন্দোলনের পরিচালক, সমগ্র মানবজাতিকে এক জাতিতে পরিণত করার জন্য আল্লাহর অভিপ্রায় বাস্তবায়িত হবে এই হেযবুত তওহীদের দ্বারা। তাই আল্লাহ প্রতি মুহূর্তে হেযবুত তওহীদকে সাহায্য করে যাচ্ছেন, এই মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার যুগেও অকাট্য সত্যের পক্ষে উন্নতশির ও অটল রেখেছেন। তাই হেযবুত তওহীদ পশ্চিমাদের বাঁধানো কোনো ছকেই পড়বে না। হেযবুত তওহীদ কী, এমামুয্যামান কী বলতে চেয়েছেন, তা হেযবুত তওহীদেরও অনেকেই পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে নি। তাই সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে হেযবুত তওহীদকে আরো গভীরভাবে জানুন। যে কোনো ব্যাপারে অস্পষ্টতা থাকলে যত ইচ্ছা আমাদেরকে প্রশ্ন করুন, এনশা’আল্লাহ জবাব দেওয়া হবে। আমরা সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছি, আমাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র বক্রতা নেই এবং সত্য বলার ক্ষেত্রে আমরা দ্বিধান্বিত বা বিব্রত নই যদি তা আমাদের বিরুদ্ধেও যায়।