Thursday, August 6, 2015

কি হারালাম আর কি পেলাম?

কি হারালাম আর কি পেলাম?

এস.এম.সামসুল হুদা:
যে সময়ের কথা বোলছি তখন প্রকৃত এসলাম ছিলো না। প্রকৃত এসলাম হারিয়ে গেছে রসুলাল্লাহর দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণের ৬০/৭০ বছর পরেই যখন উম্মতে মোহাম্মদী আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ কোরেছে। আমরা বোলছি ১৪শ’ শতকের কথা। মোসলেম জাতির পায়ের নিচে তখন অর্ধেক দুনিয়া। অঢেল সম্পদের উত্তরাধিকার হোয়ে এই জাতিটির শাসকেরা অন্যান্য রাজা বাদশাহদের মতোই ভোগবিলাসে মত্ত। তবে তারা মোসলেম ছিলেন এ কথা অনস্বীকার্য। কারণ অর্ধ-পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তখনও আল্লাহর, সেখানে আইন-কানুন, অর্থনীতি, দণ্ডবিধি অর্থাৎ জীবনব্যবস্থা তখনও আল্লাহর। এই দীনের প্রভাবে সেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিলো অকল্পনীয় শান্তি। সমাজ থেকে অন্যায় অশান্তি, অপরাধ প্রায় নির্মূল হোয়ে গিয়েছিল। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছিলো চূড়ান্ত, মাসের পর মাস আদালতে অপরাধ সংক্রান্ত কোন মামলা আসতো না। মানুষ যাকাত ও সদকার অর্থ নিয়ে পথে পথে ঘুরতো কিন্তু গ্রহণ করার মতো কোন দরিদ্র মানুষ খুঁজে পেত না। একজন যুবতী নারী অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় সম্পূর্ণ একা শত শত মাইলের পথ পাড়ি দিতে পারতো, তার মনে কোনরূপ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও জাগ্রত হোত না। এমন একটি সময়ে পরিব্রাজক ইবনে বতুতা মোসলেম সভ্যতার প্রতিটি শহর পরিভ্রমণ করেন। তার লেখা থেকে সে সময়ের একটি সুস্পষ্ট চিত্র পরিস্ফুট হোয়ে ওঠে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রায় ৬০০ বছর পরে ১৩৩০ সনের কাছাকাছি সময়। মোসলেমরা ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে, হজ্বের উদ্দেশ্যে আরও বিভিন্ন কারণে দূর দূরান্তরে ভ্রমণ কোরতেন। তাদের যাত্রাবিরতি ও বিশ্রামের জন্য পথের বিভিন্ন স্থানে অতিথিশালা (ঈড়হাবহঃ) তৈরা করা হোত। যাদের নিজস্ব পরিবার পরিজন নেই, তারাও এসব অতিথিশালাতে অবস্থান কোরতেন। মক্কার অতিথিশালাগুলির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিলো রাবি কনভেন্ট। এখানে একটা পানির কূপ ছিলো, যার পানি এত মিষ্টি যে সারা মক্কায় তার কোনো তুলনা পাওয়া যেত না। যাঁরা এখানে থাকতো তাঁরা সবাই ছিলেন আল্লাহর জন্য সর্বত্যাগী মানুষ। হেজাজের মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতো রাবিকে। আমীরের নির্দেশে তায়েফের লোকেরা এটার অধিবাসীদের জন্য ফলমূল সরবরাহ কোরত। যার যে বাগান আছে- সে পাম গাছের হোক বা ডুমুর, আঙুর বা পিচেরই হোক, উৎপাদিত ফলের একটা অংশ তাকে এই অতিথিশালার অধিবাসীদের জন্য পাঠাতে হোত, নিজের উটে করে। তায়েফ থেকে মক্কা দু’ দিনের পথ। কেউ যদি গাফেলতি বা কৃপণতাবশত সময়মত ফল না পাঠাতো তাহোলে তার বাগানের ফলন কমে যেতো। এবং পরের বছর গাছ মরে বাগান উজাড় হোয়ে যেতো। একদিন মক্কার আমীরের কয়েকজন প্রতিনিধি কনভেন্ট পরিদর্শনে এলেন সরকারি ঘোড়ায় করে। ঘোড়াগুলোকে সেই কূপের পানি খাওয়ানো হয়। তার একটু পর পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হওয়ায় সমস্ত ঘোড়া মাটিতে গড়াগড়ি খেতে শুরু কোরল। খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে আমীর নিজে কনভেন্টে ছুটে আসলেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাদের একজনকে নিয়ে ঘোড়াশালে এলেন। কনভেন্টের ঐ অধিবাসী এসে ঘোড়াগুলির পেটে হাত বুলিয়ে দিতে বমি কোরল পশুগুলো, পেটের পানি বের হোয়ে যেতেই আস্তে আস্তে তারা সুস্থ হোয়ে উঠল।
এই ঘটনার কারণ বর্তমানের এই বস্তুবাদী সভ্যতার যুগে বোঝা খুবই কঠিন, উপলব্ধি করা তো প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। বস্তুতঃ আল্লাহর সত্যদীন যে স্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকে সে স্থানের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে আল্লাহর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকে। আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী যে শাসক শাসন করেন, সেই শাসককে আল্লাহই পরিচালিত করেন। এই ঘটনার মধ্যে তেমন একটি উদাহরণই পাওয়া যায়। কনভেন্টের অধিবাসীদের জন্য যাদের নিয়মিত ফলমূল পাঠানোর দায়িত্ব তারা যদি না পাঠাতো তাদের বাগানই উজাড় হোয়ে যেত। এটা আল্লাহ কোরতেন, শাসককে কোরতে হোত না। একে বলা হয় আল্লাহর অদৃশ্য প্রশাসন বা Inner Administration. কনভেন্টের কূপে পানি নির্দিষ্ট ছিলো সেখানকার অধিবাসীদের ব্যবহারের জন্য, সরকারি লোকদের ঘোড়ার জন্য নয়। তাই যখন ঘোড়াদেরকে সেই পানি খাওয়ানো হোল সেটা ছিলো একটি অন্যায় কাজ। তাই ঐ পানি পান করার পরে ঘোড়াগুলি অসুস্থ হোয়ে পড়ে। এ সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে মক্কার আমীরও বুঝতে পারেন যে তার প্রতিনিধিরা কি ভুল কোরেছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন এবং কনভেন্টের অধিবাসীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তারা যখন ঘোড়াগুলির পেটে হাত বুলিয়ে দেন সেগুলির পেট থেকে ঐ পানি বের হোয়ে যায় এবং তারা সুস্থ হোয়ে যায়। মূলতঃ এটা ছিলো আমীরের প্রতিনিধিদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। সেটা হোচ্ছে: কার কি অধিকার বা হক তা আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট করার পর কেউ যদি সেই হক নষ্ট করে তার ফল তাকে অবশ্যই পোহাতে হবে, অন্যরাও এজন্য ক্ষতির শিকার হবে। যেমন তারা কনভেন্ট অধিবাসীদের অধিকারভুক্ত পানির অপব্যবহারের কারণে কিছু নিরপরাধ প্রাণী কষ্ট পেল।- এ শান্তিময় সুন্দর সমাজ আমরা হারিয়েছি।
আর বিনিময়ে যা পেয়েছি তা হোল:- আল্লাহর সত্যদীনকে প্রত্যাখ্যান কোরে আজকে আমরা দাজ্জালের তৈরি মতবাদ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদি গ্রহণ কোরে নিয়েছি। প্রশ্ন হোল আমরা কিসের বিনিময়ে কি পেয়েছি? এইসব তন্ত্রমন্ত্রের গালভরা বুলি আছে কিন্তু তা অনাহারী মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারছে না। প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ না খেয়ে আছে। এই তন্ত্রমন্ত্রের প্রদত্ত মানবাধিকার সনদ অতি মানবিক, কিন্তু বাস্তবে দেখি পৃথিবীর কোটি কোটি মোসলেম নামধারী মানুষ গৃহহারা, তাদের জীবনের কোন মূল্য নেই, তাদের মেয়েদের ইজ্জতের কোন মূল্য নেই। এই সব তন্ত্রমন্ত্র মানুষকে স্বাধীনতার নামে দেয় দাসত্বের বেড়ি, অধিকারের নামে দেয় অপমান আর লাঞ্ছনা। অন্যায় আর অশান্তির দাবানলে প্রতি মুহূর্তে অঙ্গার হোচ্ছে মানুষ। জীবন ও সম্পদের ন্যূনতম নিরাপত্তাও মানুষের অবশিষ্ট নেই।
এই যে বিপর্যয় সৃষ্টি হোয়েছে তা আমাদেরই কর্মফল। যখনই মানুষ অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ কোরেছে তখনই জন্ম নিয়েছে অশান্তির। সেই অশান্তি আজ পুরো মানবজাতিকে গ্রাস কোরে নিয়েছে। ইহুদি খ্রিস্টান সভ্যতার প্রভাবে সকল মানুষই আজ অন্যায়ের শিকার, সকলেই তার অধিকার বঞ্চিত, সকলেই ক্ষুব্ধ। এমতাবস্থায় এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হোল, সেই হারানো সত্যদীনকে, স্রষ্টা প্রদত্ত জীবনব্যবস্থাকে আবার ফিরিয়ে আনা। প্রকৃত এসলাম ১৩০০ বছর আগেই হারিয়ে গেছে। কিন্তু তার প্রভাব যে কয় শতাব্দী পৃথিবীর বুকে ছিলো তার একটি নিদর্শন একটু আগেই উপস্থাপন কোরলাম। মহাকালের অথৈ সাগরে যেই ধনভাণ্ডারের চাবি আজ থেকে ১৩০০ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই চাবির কথা দূরে থাক ধনভাণ্ডারের অস্তিত্বই আজ মানুষ ভুলে গেছে। ফলে সেই ধনভাণ্ডার উদ্ধারের কোন আশাই আর ছিলো না। এমন সময় মহান আল্লাহ আবার মানবজাতিকে দয়া কোরলেন। তিনি তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া ধনভাণ্ডারের চাবি, তওহীদ মানবজাতির হাতে ফিরিয়ে দিলেন। যাঁর মাধ্যমে তিনি এই বিরাট সুযোগ মানবজাতিকে দান কোরলেন তিনি এই যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। সেই ধনভাণ্ডার হোচ্ছে আল্লাহর সত্যদীন। তিনি হেযবুত তওহীদের কাছে সেই ধনভাণ্ডার রেখে গেছেন। এখন হেযবুত তওহীদ মানবজাতিকে সর্বান্তকরণে আহ্বান কোরছে এই ধনভাণ্ডার গ্রহণ কোরে তাদের জীবনকে সমৃদ্ধ ও শান্তিময় করার জন্য।

মানুষ দাজ্জালের এবাদত কোরছে

মানুষ দাজ্জালের এবাদত কোরছে

মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে সম্পাদিত:
পবিত্র কোর’আনে আল্লাহর ঘোষণা, আমি জ্বীন এবং এন্সানকে শুধুমাত্র আমার এবাদত করার জন্য সৃষ্টি কোরেছি (সুরা যারিয়াত ৫৬)। এই এবাদত বোলতে প্রায় সবাই সালাহ, সওম প্রভৃতি মনে করে। এই ধারণা সঠিক নয়। সালাহ, সওম ইত্যাদি হোচ্ছে প্রকৃত এবাদতের আনুষাঙ্গিক কাজ। আল্লাহ কোর’আনে এরশাদ কোরেছেন, আমি আল্লাহ, আমি ব্যতীত অন্য কোন এলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাহ কায়েম কর (সুরা ত্বাহা, আয়াত-১৪)। পবিত্র কোর’আনের এই আয়াতে আল্লাহ প্রথমে তাঁর সার্বভৌমত্বের মালিক, নিজেকে মানবজাতির একমাত্র হুকুমদাতা হিসাবে ঘোষণা দিলেন। এলাহ বোলতে বর্তমানে মনে করা হয় উপাস্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। এলাহ হোচ্ছেন সেই সত্তা যার হুকুম শুনতে হবে এবং পালন কোরতে হবে। এক কথায় জীবনের যে কোন অঙ্গনে যেখানে আল্লাহর কোন বক্তব্য আছে সেটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজৈেনতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি যে বিভাগেই হোক না কেন সেখানে আর কারও কোন বক্তব্য গ্রহণ করা যাবে না অর্থাৎ তওহীদ; আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। এরপর এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর এবাদত করার কথা বোললেন এবং পরিশেষে তাঁর স্মরণার্থে সালাহ কায়েমের কথা বোললেন। আলোচ্য আয়াতে এটা পরিষ্কার হোয়ে যাচ্ছে যে এবাদত ও সালাহ অর্থাৎ উপাসনা এক জিনিস নয়। 
তাহোলে এবাদত কি? এবাদত হোচ্ছে যে জিনিসকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হোয়েছে সেই কাজ করাই হোচ্ছে ঐ জিনিসের এবাদত। প্রশ্ন হোল- আল্লাহ আমাদের কি কাজের জন্য সৃষ্টি কোরেছেন? এর উত্তর আমরা পবিত্র কোর’আন থেকেই পাচ্ছি। কোর’আনের সুরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহর ঘোষণা, আমি মানুষকে আমার খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি কোরেছি। খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধির কাজ হোচ্ছে একজনের কাজ তিনি না কোরে তার হোয়ে আরেকজন করা। তাহোলে কোর’আনে আল্লাহ বোললেন তিনি আমাদেরকে খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি কোরেছেন। অর্থাৎ পৃথিবীতে আল্লাহ নিজে যে কাজটি কোরতেন সেই কাজটি তিনি না কোরে তা আমাদের দিয়ে কোরাবেন। এখন প্রশ্ন হোচ্ছে, আল্লাহর কি কাজ? তিনি কি নামাজ, রোজা করেন? নিশ্চয় না। তাঁর কাজ হোল: তাঁর সৃষ্টজগতকে শাসন করা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এ কাজটি নিজে না কোরে মানুষকে দিয়ে করাবেন। তাই তিনি কোর’আনে ঘোষণা কোরেছেন আমি মানুষকে আমার খলিফা হিসাবে সৃষ্টি কোরেছি। তাহোলে এবাদতের সংজ্ঞা অনুযায়ী আল্লাহ্র খেলাফত করাই হোচ্ছে মানুষের এবাদত। অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া বিধান দিয়ে পৃথিবী শাসন করাই হোচ্ছে খেলাফতের কাজ, কিন্তু মানুষ আজ এই খেলাফতের কাজ কোরছে না অর্থাৎ আল্লাহ্র এবাদত কোরছে না। অথচ আল্লাহ্ আমাদেরকে মূলত: তাঁর এবাদত করার জন্যই সৃষ্টি কোরেছেন। এই মোসলেম নামক জাতিটি আল্লাহর প্রকৃত এবাদত কি তা না জেনে, না বুঝে নামাজ রোজা কোরে ভাবছে খুব এবাদত কোরছি।
প্রকৃতপক্ষে তারা কার এবাদত কোরছে, কার প্রতিনিধিত্ব বা খেলাফত কোরছে? সত্য হোচ্ছে এই যে, মোসলেম নামধারী জনসংখ্যাটিসহ গোটা মানবজাতি এখন দাজ্জালের তৈরি আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থাৎ সামগ্রিক জীবন দাজ্জালের, তথা ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতার বিধান, মতবাদ অনুযায়ী পরিচালিত কোরছে। সুতরাং মানুষ এখন দাজ্জালেরই এবাদত কোরে চোলেছে।

ওয়াজ নসিহতে অপরাধ বন্ধ হবে না, এর জন্য প্রয়োজন জাতীয়ভাবে আল্লাহর হুকুমের বাস্তবায়ন

ওয়াজ নসিহতে অপরাধ বন্ধ হবে না, এর জন্য প্রয়োজন জাতীয়ভাবে আল্লাহর হুকুমের বাস্তবায়ন

যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী’র লেখা থেকে:

আজকের পৃথিবীতে শত শত নয়, হাজারে হাজারে প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো নানাভাবে মানুষকে অন্যায় থেকে, পাপ থেকে বিরত রাখতে, পুণ্য কাজ বা সওয়াবের কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যস্ত আছে। এই রকমের প্রতিষ্ঠান এসলাম, খ্রীস্ট, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি পৃথিবীর সব ধর্মেরই আছে। এরা সাধ্যমতো চেষ্টাও কোরে চলেছে মানুষকে অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে ন্যায় ও পূণ্যে ফিরিয়ে আনতে। পারছে কি? না, দশ বিশ বছর আগের পৃথিবীর অন্যায় অপরাধের অবস্থার সঙ্গে একটা পরিসংখ্যান তুলনা কোরলেই পরিষ্কার হোয়ে যাবে যে ঐসব মহৎ প্রচেষ্টা মানব জাতিকে সমষ্টিগতভাবে উন্নত কোরতে পারে নি, তাদের অন্যায়, অপরাধের সংখ্যা কমাতে পারে নি বরং তা বহু বেড়ে গেছে। দশ বিশ বছর আগের তুলনায় শুধু যে পৃথিবীময় অন্যায়, অপরাধ (চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষণ, ছিনতাই, খুন জখম ইত্যাদি) দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে তাই নয়, ঐসব মহতি প্রতিষ্ঠানগুলির অবিশ্রান্ত প্রচার সত্ত্বেও মানব জাতি আজ পারমাণবিক আত্মহত্যার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, আর মাত্র একটি পদক্ষেপ বাকি। কেন ঐসব মহতি প্রতিষ্ঠানগুলির চেষ্টার কোন ফল হোচ্ছে না? যদিও ঐ কাজ কোরতে বহু কোটি টাকা প্রতি বছর খরচ হোচ্ছে? তার কারণ শুধু শিক্ষা দিয়ে, উপদেশ দিয়ে মানুষকে শৃঙ্খলায় আনা যাবে না, যদি শিক্ষা উপদেশের পর তা ভঙ্গ কোরে অপরাধ কোরলে কঠিন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না থাকে বা না দেয়া যায়। বর্তমান মোসলেম দুনিয়াতেও অনেক প্রতিষ্ঠান, আনজুমান, জামাত ইত্যাদি আছে যেগুলো মোসলেমদের আরও ভালো ‘মোসলেম’ বানাবার জন্য প্রচার সভা-সমিতি এজতেমা ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদি কোরে কোটি কোটি টাকা খরচ করেন, বহু পরিশ্রম করেন। এরা পণ্ডশ্রম করেন। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলি বহু বছর থেকেই এই কাজ কোরছে, ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলির যে সংখ্যা ছিলো এবং যতলোক এগুলোতে শামিল ছিলো আজ তার চেয়ে অনেক বেশি আছে। কিন্তু একটি পরিসংখ্যান নিয়ে দেখুন ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে জনসংখ্যার অনুপাতে বিভিন্ন দেশে শতকরা যতভাগ চুরি, ডাকাতি, খুন, ব্যভিচার ইত্যাদি হোত আজ তার চেয়ে অনেক বেশি হোচ্ছে। একটি বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান আছে যেটার প্রচারিত উদ্দেশ্য হোচ্ছে এসলাম ধর্ম প্রচার ও শিক্ষা দেয়া। বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ঐ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থেকে ঐ কাজ করেন। এরা জোর দিয়ে প্রকাশ করেন যে তাদের প্রতিষ্ঠান নিছক ‘ধর্মীয়’ সুতরাং অরাজনৈতিক। একটি ‘মোসলেম’ প্রধান দেশে এরা বছরে একবার একত্রিত হন। বলা হয় এদের এই সমাবেশে হজ্বের চেয়েও বেশি লোক হয়। যেখানে ঐ বাৎসরিক সম্মেলন হয় ঐ দেশটাকেই ধরুন উদাহরণ স্বরূপ। ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে ঐ দেশটাতে জনসংখ্যার অনুপাতে যে অপরাধ হোত আজ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অপরাধ ঘটছে। শুধু তাই নয় তখন যত রকমের অপরাধ ঘটতো আজ তার চেয়ে অনেক বেশি নতুন নতুন ধরনের অপরাধ যোগ হোয়েছে। তাহোলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় কোরে হজ্বের পর পৃথিবীর বৃহত্তম ‘মোসলেম’ সম্মেলন কোরে, এত পরিশ্রম কোরে লাভটা কী হোল? সত্যিকার এসলামের কথা না হয় এখানে বাদই রাখলাম অন্যান্য ধর্মও যেটুকু কোরতে চেষ্টা করে, অর্থাৎ মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে অন্যায় অপরাধ থেকে বিরত রাখা, সেটুকুও তো তারা কোরতে ব্যর্থ হোয়েছেন। মসজিদ থেকে জুতা চুরিটুকুও তো তারা বন্ধ কোরতে পারেন নি, বরং জুতা চুরি চল্লিশ বছর আগের চেয়ে আজ অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, এখন মসজিদের দরজা ভেঙ্গে মাইক, ফ্যান, ঘড়িও চুরি হোয়ে যায়।
আগেই বোলেছি পণ্ডশ্রম, কিছুই হবে না। এই জন্য হবে না যে, অপরাধ কোরলে তার শাস্তি দেবার শক্তি না থাকলে শুধু ওয়াজ-নসিহত কোরে মানুষকে অপরাধ থেকে ফেরানো যাবে না এবং ঐ শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই রাষ্ট্রীয় ভাবে এসলাম প্রতিষ্ঠিত না হোলে সে এসলাম পূর্ণ এসলাম নয়, সেটা হবে আংশিক, কাজেই ব্যর্থ হবে এবং আংশিক এসলাম আল্লাহ গ্রহণ করেন না, কারণ তা শেরক। সামাজিক জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপারেও এসলামের নীতি বর্তমানের এসলামের নীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে শেষ নবী (দ:) প্রবর্তিত শেষ এসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে সামাজিক পর্যায়ে ইয়াতীমখানা, আনজুমানে মফিদুল এসলাম, পঙ্গু-আবাস, প্রতিবন্ধী-আবাস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কোনই প্রয়োজন হবে না, কারণ, এ সমস্ত দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই মহানবী (দ:) ঐ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন নি। যে ইয়াতীমদের সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তার কোর’আনে বহুবার উল্লেখ কোরেছেন; যে ইয়াতীমদের সম্বন্ধে বিশ্বনবী (দ:) এতবার বোলেছেন; সেই ইয়াতীমদের জন্য একটি ইয়াতীমখানা তিনি প্রতিষ্ঠা কোরতে পারতেন না? যে বিস্ময়কর মহাকর্মী পৃথিবীতে একটা মহাশক্তি সৃষ্টি কোরলেন তার সামান্য একটি নির্দেশেই তো শত শত ইয়াতীমখানা প্রতিষ্ঠিত হোয়ে যেতো। তিনি তা করেন নি, তা তার সুন্নাহ নয়, কারণ তিনি জানতেন যে, যে রাষ্ট্র তিনি প্রতিষ্ঠা কোরে গেলেন, যে জীবন ব্যবস্থা তিনি চালু কোরে গেলেন তা যদি মানুষ তাদের জীবনে চালু রাখে, বিকৃত না করে তবে ঐ সব জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠানের কোনই প্রয়োজন হবে না, রাষ্ট্রই সে দায়িত্ব নেবে।
আজ ‘মোসলেমদের’ আকিদায় রাষ্ট্রের কোন স্থান নেই। ‘ধর্ম’ বোলতে তাদের আকিদা ও খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ, জৈন, হিন্দু ইত্যাদির আকিদার সঙ্গে কোন প্রভেদ নেই। তাদের মতই এদের ‘ধর্ম’ ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ এসলাম, মহানবী (দ:) প্রবর্তিত এসলাম নয়। তার শেখানো এসলাম প্রথমেই আরবের বুকে রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা কোরেছিলেন। তারপর তার চলে যাবার পর সে এসলাম দুর্বার সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্ধেক দুনিয়ার রাষ্ট্রশক্তি অধিকার কোরেছিল, এটা সর্বসম্মত ইতিহাস। ঐ সময়ে ঐ এসলামে অন্য কোন মাযহাব ছিলো না, কোন ফেরকা ছিলো না, মসলা-মাসায়েল নিয়ে কোন মতভেদ ছিলো না, কোন পীর মুরীদ ছিলো না, খানকাহ, হুজরা, ছিলো না, মসলা মাসায়েল বিশ্লেষণকারী পুরোহিত যাজকশ্রেণি ছিলো না। ছিলো শুধুমাত্র দীনুল কাইয়্যেমা, সনাতন ধর্ম সেরাতুল মোস্তাকীম। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, সালাত ও যাকাত, এবং ঐ দীনুল কাইয়্যেমা, সেরাতুল মোস্তাকীমকে সমস্ত পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা কোরে মানব জাতির জীবনের প্রতি স্তরে শান্তি আনয়ন করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, জেহাদ। আর আজ ঐ দীনুল কাইয়্যেমার, সেরাতুল মোস্তাকীমের, সংবিধানের চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করা আছে, বহু মাযহাব বহু ফেরকায় বিভক্তি আছে, মসলা-মাসায়েল নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি আছে, যাজক শ্রেণি আছে, বহু রকম তরিকা আছে, বহু রকম পীর-মুরীদ আছে, খানকাহ আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসলাম নেই, ওখানে আল্লাহর ওয়াহদানীয়াত নেই এবং তা করার জেহাদও নেই। সুতরাং এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ঐ দুই এসলাম একেবারে ভিন্ন জিনিস, একটা অপরটার বিপরীতমুখী। যেহেতু মহানবীর (দ:) প্রবর্তিত এসলাম এবং বর্তমানের এসলাম ভিন্ন, সুতরাং ঐ ভিন্ন এসলামের উৎপাদিত জাতিগুলিও সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিপরীতমুখী। আল্লাহর রসুলের (দ:) এসলাম সৃষ্টি কোরেছিল এক অজেয় দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি, আজকের এসলাম সৃষ্টি করে কাপুরুষ-ভীতু, যারা যুদ্ধের-সংগ্রামের কাছ দিয়েও যায় না। মহানবীর (দ:) এসলাম সৃষ্টি কোরেছিল এক সিংহের জাতি, দীনের সামান্যতম বিপদে হুংকার দিয়ে শত্র“র উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো, আজকের এসলাম সৃষ্টি করে খরগোশ, বিপদের আভাস পাওয়া মাত্র যেগুলি পাগড়ীর লেজ হাওয়ায় উড়িয়ে তীব্রবেগে গর্তের ভেতর লুকায়। বিশ্বনবীর (দ:) এসলাম যে মোসলেম সৃষ্টি কোরেছিল তা সুদূর সিন্ধু দেশে একটি মোসলেম মেয়ের অপমানিত হবার খবর পেয়ে সেখানে মুজাহীদ বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিল, আজকের এসলাম যে ‘মোসলেম’ সৃষ্টি করে তা কয়েক মাইল দূরে তাদের মতই ‘মোসলেম’দের হত্যা করা হোচ্ছে খবর পেয়ে নির্বিকারভাবে ওজু কোরে টাখনুর উপর পাজামা পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে হাতে তসবিহ নিয়ে মসজিদে যায়। আল্লাহর রসুল (দ:) তার নবীজীবনের সংগ্রামের অতি প্রাথমিক সময়ে বোলেছিলেন “শীগগিরই সময় আসছে, যখন একা একটি মেয়ে মানুষ সানা থেকে হাদ্রামাউত পর্যন্ত (কয়েকশ’ মাইল) নির্ভয়ে চলাফেরা কোরতে পারবে ।” অর্থাৎ ঐ রকম নিরাপত্তা সৃষ্টি করা রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। তাই ইতিহাস এই যে কিছুদিন পরই তার (দ:) প্রবর্তিত এসলাম আরবের বুকে আল্লাহ’র তওহীদ ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কোরে তার ভবিষ্যতবাণীর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা কোরেছিল যদিও তখন ঐ এসলামের মোসলেম সংখ্যায় ছিলো মাত্র দু’তিন লাখ। আর আজকের এসলাম উৎপাদন করে যে ‘মোসলেম’ তারা বিশ-ত্রিশ লাখ একত্র হোয়ে এজতেমা করে। তাদের চারিদিকে চলে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ঘুষ, ছিনতাই। ত্রিশ-চল্লিশ লাখ একত্রিত হোয়ে হজ্ব করে আর দুনিয়াময় তাদেরই উপর চলে নির্মম নির্যাতন, যুদ্ধ, রক্তপাত, দেশ থেকে উচ্ছেদ-করণ তবুও তারা টু শব্দটি করার সাহস পায় না। এই সব হাজীদের রাষ্ট্রগুলি শাসিত হয় সেই আইন-কানুন দিয়ে যেগুলো ধ্বংস কোরে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা কোরতে বিশ্বনবী (দ:) প্রেরিত হোয়েছিলেন। বিশ্বনবীর (দ:) প্রবর্তিত এসলাম যে মোসলেম উৎপাদন কোরেছিল সে মোসলেমের আকিদা এই ছিলো যে, তাদের নেতা আল্লাহর রসুলের (দ:) জীবনের উদ্দেশ্য ছিলো সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে শেষ এসলাম সমস্ত মানব জাতির উপর কায়েম কোরে পৃথিবীময় শান্তি প্রতিষ্ঠা, আর আজ যে এসলাম প্রচলিত তা যে মোসলেম উৎপাদন করে তাদের আকিদা হোল এই যে আল্লাহ নবী রসুলদের নেতা, তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যার কোন তুলনা নেই তাকে পাঠানো হোয়েছিল মানুষকে টাখনুর উপর পাজামা পড়ার মত, মাথায় টুপি দেবার মত, দাঁত মাজার মত, কুলুখ নেয়ার মত, ডান পাশে শোয়ার মতো তুচ্ছ ব্যাপার শেখাতে। মানুষের ইতিহাসে বোধহয় কোন জাতি তার নেতার এমন অপমানকর অবমূল্যায়ন করে নি। কাহ্হার আল্লাহও তার শ্রেষ্ঠ ও প্রিয়তম রসুলের (দ:) এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে ছাড়েন নি। তিনি ইউরোপীয়ান খ্রিস্টান জাতিগুলি দিয়ে এদের লাইন কোরে দাঁড় কোরিয়ে মেশিনগান দিয়ে গুলি কোরিয়েছেন, বেয়নেট কোরে, জীবন্ত কবর দিয়ে, পুড়িয়ে, ট্যাংকের তলে পিষে মেরেছেন, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশুরাও বাদ যায় নি। এদের মেয়েদের ইউরোপের আফ্রিকার বেশ্যালয়ে বিক্রি কোরিয়েছেন এবং তারপর মাত্র চারটি ছোট দেশ বাদে মরক্কো, থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত এই বিশাল এলাকার সমস্তটুকুর রাষ্ট্রশক্তি এদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইউরোপীয়ান খ্রিস্টান জাতিগুলির হাতে দিয়ে দিয়েছেন এবং তারা এদের সর্বস্ব লুণ্ঠণ ও শোষণ কোরে দারিদ্র্যের চরম সীমায় নামিয়ে দিয়েছে, গৃহপালিত পশুর মতো এদের নিজেদের কাজে লাগিয়েছে, তাদের জুতা পরিষ্কার কোরিয়েছে।
পৃথিবীর রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে কিছুদিন আগে এই তথাকথিত মোসলেম নামের এই জাতি ইউরোপের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু মুক্তি তারা দিয়ে গেলেও এরা মুক্তি নেয়নি। এখনও স্বেচ্ছায় তাদের পূর্ব প্রভূদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সভ্যতার দাসত্ব কোরছে। আর যারা মহা মোসলেম তারা সেই আগের মতই ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী, যিনি মানব জাতির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তাকে টুপি, পাগড়ী, আর দাড়ি-মোচের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোরে তার চরম অপমান কোরে চলেছেন। এরা যদি আজও সেই পৃথিবী কাঁপানো ব্যক্তিত্বকে তাদের নিজেদের মতো গর্তের ভেতরে লুকানো মেরুদণ্ডহীন খরগোশ মনে কোরে তার অপমান কোরতে থাকেন তবে এরপর আল্লাহর শাস্তি হবে আরো কঠিন, তার প্রতিশোধ হবে আরও ভয়াবহ।
কাজেই শুরুতেই যে কথা বোলতে চেয়েছি তা হোল শুধু ওয়াজ নসিহত কোরে, উপদেশ বিতরণ কোরে, বাণী শুনিয়ে অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করা যাবে না। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব-ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন কোরে সেই রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল সকল অবিচার দূর করা সম্ভব। উপদেশবাণী, নীতিকথা শুনে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু ভালো মানুষ তৈরি হোলেও সমষ্টির চাপে, বৃহত্তর শক্তির চাপে ব্যক্তিগত ভাবে আর ভালো থাকা যায় না। কাজেই এসলাম ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় ও সমষ্টিক। শুধু আইন প্রয়োগ কোরে, শরিয়াহ্ প্রয়োগ কোরে যেমন শান্তি আনা যায় না ঠিক তেমনই শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষা, নসিহত কোরে, শান্তি আনা যায় না। দুটোই দরকার। এটাই ভারসাম্য, ওয়াসাতা; একদিক শরিয়াহ’র দণ্ডবিধি অন্যদিকে আল্লাহর ভয়ে অন্যায় না করার আত্মিক প্রশিক্ষণ।
[সমস্ত পৃথিবীতে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সনে এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী হেযবুত তওহীদ নামক আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই নিবন্ধটি লেখকের বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্য থেকে সম্পাদিত।

কে মো’মেন কে কাফের?

কে মো’মেন কে কাফের?

রাকীব আল হাসান:
মো’মেন ও কাফের, অতি পরিচিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু’টি আরবি শব্দ। শব্দ দু’টির মাদ্দা, মাজদার, সিগা, বাব ইত্যাদি জটিল বৈয়াকরণীক প্যাঁচের মধ্যে না গিয়ে সরলভাবে বিশ্লেষণ করাই আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। প্রথমে জানা যাক শব্দ দু’টির শাব্দিক অর্থ। মো’মেন শব্দের আভিধানিক অর্থ- বিশ্বাসী। মো’মেন শব্দটি ঈমান শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ বিশ্বাস। কাফের শব্দের আভিধানিক অর্থ- অবিশ্বাসী। যারা কোর’আনের বাংলা অনুবাদ পড়েন তারা নিশ্চয় লক্ষ কোরে থাকবেন যে মো’মেন ও কাফেরের বাংলা অনুবাদ এ দু’টি শব্দেই করা হোয়েছে। যদিও আরও বেশ কিছু অর্থ রয়েছে। যতটুকু বোঝা গেল শব্দ দু’টি বিপরীত অর্থবোধক। অর্থাৎ একই সাথে কেউ মো’মেন ও কাফের থাকতে পারে না এবং প্রত্যেক ব্যক্তিই হয় মো’মেন নতুবা কাফের হবেই।
এবার জানা যাক শব্দ দু’টির পারিভাষিক অর্থ। পারিভাষিক অর্থে মো’মেন হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে এসলামের নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক বিষয়ে বিশ্বাস রাখে। আর কাফের হোল ঐ বিষয় গুলিতে যে বিশ্বাস রাখে না।
স্বাভাবিকভাবে আমরা যেটা জানি, কাফের হবার বিশেষ কোনো প্রক্রিয়া নাই। মো’মেন না হওয়া মানেই কাফের হওয়া, সুতরাং মো’মেন হবার একটি প্রক্রিয়া থাকতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি হোল তওহীদে বা কলেমাতে (লা এলাহা এল্লাল্লাহ্- মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ) মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মুখে তার স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেটা কাজে প্রতীয়মান করা। কেউ এই কলেমায় কৃত অঙ্গীকার থেকে সরে গেলে সে আর মো’মেন থাকলো না, মো’মেন থাকলো না মানেই কাফের হোয়ে গেল। সুতরাং এই কলেমাটিকে বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কলেমাতে দু’টি বিষয়ে আমাদের সাক্ষ্য দিতে হয়। ১. আল্লাহর উলুহিয়াত (লা এলাহা এল্লাল্লাহ্) এবং ২. মোহাম্মদ (দ:) বিন আব্দুল্লাহ’র রেসালাত (মোহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ)। আল্লাহর উলুহিয়াত হোচ্ছে জীবনের প্রতিটা অঙ্গনে (ব্যক্তিগত, জাতীয়, আন্তর্জাতিক সকল পর্যায়ে) আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে মানা। অর্থাৎ যেখানেই আল্লাহর কোনো বক্তব্য থাকবে সেখানে আর কারো বক্তব্যের প্রাধান্য না দিয়ে আল্লাহর বক্তব্যের বাস্তবায়ন করতে পারলেই কেবল আল্লাহকে এলাহ্ হিসাবে মানা হোল। আর মোহাম্মদ (দ:) কে আল্লাহর রসুল হিসাবে বিশ্বাস করা হোল তাঁর রেসালাতে বিশ্বাস। মোহাম্মদ (দ:) কে রসুল হিসাবে বিশ্বাস কোরলে ও মেনে নিলে স্বাভাবিক ভাবেই আল্লাহ ও তাঁর রসুল (দ:) নির্দেশিত পথে চলাও অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে।
এবার মো’মেন ও কাফেরের সংজ্ঞা জেনে নেওয়া যাক। কে মো’মেন এবং কে কাফের তাঁর সংজ্ঞা দেওয়ার এখতিয়ার আল্লাহ ছাড়া আর কারও থাকতে পারে না এবং নেই। আমি এখানে শুধু আল্লাহ পাকের দেওয়া সংজ্ঞা উদ্ধৃত কোরছি। আল্লাহ পাক সুরা হুজরাতের ১৫ নং আয়াতে এরশাদ কোরেছেন, “নিশ্চয় মো’মেন শুধুমাত্র তারা যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে, পরে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং সম্পদ ও জীবন দিয়ে (সত্যদীন এসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য) আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।” আল্লাহ এখানে মো’মেনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা পরিপূর্ণ সংজ্ঞা, এর বাইরে আর কোন সংজ্ঞা গ্রহণযোগ্য নয়। আমি মো’মেন শব্দটির আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং মো’মেন হবার যে প্রক্রিয়া ইতোপূর্বে বর্ণনা করেছি তার সঠিকতা বিচার কোরব আল্লাহ পাকের দেওয়া সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে।
আল্লাহ পাক প্রথমেই বোলেছেন “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে”। আল্লাহ পাক এখানে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনয়ন বোলতে কলেমার স্বীকৃতি প্রদানের কথা বুঝিয়েছেন অর্থাৎ আল্লাহর উলুহিয়াত ও রসুলের রেসালাতে ঈমান আনার কথা বুঝিয়েছেন। মো’মেন হবার জন্য, এসলামের গণ্ডিতে অন্তর্ভুক্ত থাকার জন্য এ পর্যন্তই যথেষ্ট। সুতরাং মো’মেন হবার জন্য শর্ত হোচ্ছে আল্লাহকে হুকুমদাতা এবং মোহাম্মদ (দ:) কে রসুল হিসাবে মেনে নেওয়া। কিন্তু বর্তমানে আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে কোথাও মানা হোচ্ছে না, শুধুমাত্র উপাস্য হিসাবে তাঁর উপাসনা করা হোচ্ছে। আর মো’মেন থাকার জন্য শর্ত হোচ্ছে বিশ্বাস আনয়নের পরে আর কোনো সন্দেহ পোষণ করা যাবে না এবং ঐ কলেমা (আল্লাহর উলুহিয়াত ও রসুলের রেসালাত) প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম কোরতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সংগ্রাম কতদিন কোরতে হবে বা কবে থেকে আর সংগ্রামের প্রয়োজন হবে না? এ বিষয়ে আল্লাহ বোলেছেন, “আমি আমার রসুলকে সঠিক পথ প্রদর্শন (হেদায়াহ্) এবং সত্যদিন দিয়ে প্রেরণ কোরলাম এই জন্য যে তিনি যেন একে (এই হেদায়াহ ও সত্যদিনকে) পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত জীবন ব্যবস্থার উপর বিজয়ী বা প্রতিষ্ঠিত করেন”- (সুরা আল ফাতাহ্- ২৮, সুরা তওবা- ৩৩ এবং সুরা আস সাফ- ৯)। এটাই যে রসুলের আগমনের উদ্দেশ্য তার সত্যায়ন পাওয়া যায় রসুলের ঘোষণাতেই। তিনি বোলেছেন- আমি আদিষ্ট হোয়েছি মানব জাতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম (কেতাল) চালিয়ে যেতে যে পর্যন্ত না সমস্ত মানুষ আল্লাহকে একমাত্র এলাহ (হুকুম দাতা) এবং আমাকে তাঁর রসুল বোলে মেনে নেয় (হাদিস- আবদাল্লাহ বিন ওমর (রা:) থেকে- বোখারী, মেশকাত)। রসুল (দ:) তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে এতটাই সচেতন ছিলেন যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এবং চোলে যাবার সময় এই দায়িত্ব দিয়ে গেলেন তাঁর হাতে গড়া উম্মাহ’র উপর। তাঁর উম্মাহও দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁদের মহান নেতার ওফাতের পরপরই সমস্ত কিছু ত্যাগ কোরে সংগ্রামে নেমেছিলেন ফলে মাত্র ৬০/৭০ বছরের মধ্যে অর্ধ পৃথিবী তাদের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল। এরপর দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতি দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা জেহাদ ছেড়ে দিল, যদিও তখনও অর্ধ পৃথিবী এসলামের ছায়াতলে আসা বাকি, অর্থাৎ রসুল (দ:) এর উপর অর্পিত দায়িত্ব পূর্ণ হয় নি। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে আল্লাহর দেয়া মো’মেনের সংজ্ঞা থেকে তারা কি বের হোয়ে গেলো না?
বর্তমানে পৃথিবীর এক ইঞ্চি জায়গাতেও আল্লাহকে এলাহ হিসাবে মানা হোচ্ছে না। অর্থাৎ আল্লাহর উলুহিয়াত (সার্বভৌমত্ব) ও মোহাম্মদ (দ:) এর আনীত কেতাব তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত নেই, এক কথায় এসলাম প্রতিষ্ঠিত নেই। তাহোলে জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করা এখনও মো’মেন থাকার প্রধান একটি শর্ত। এ শর্ত পূরণ না করে আল্লাহর সংজ্ঞা মোতাবেক মো’মেন থাকার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং বর্তমানে মো’মেন হওয়ার দাবিদার ১৬০ কোটির এই বিরাট জনসংখ্যা মোমেন নয়। আর মো’মেন না হওয়ার অর্থই কাফের হওয়া।
আল্লাহ মো’মেনদের সম্পর্কে বোলেছেন, “তোমরা যদি মো’মেন হও তবে পৃথিবীর কর্তৃত্ব তোমাদের হাতে দেব যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের দিয়েছিলাম (সুরা নূর- ৫৫)।” আবার আল্লাহ বোলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে অর্থাৎ মো’মেন হয়েছে তাদের অভিভাবক নিশ্চয় আল্লাহ আর অবিশ্বাসীদের (কাফেরদের) কোনো অভিভাবক নেই।” (সুরা মুহাম্মাদ- ১১)। এখন যারা নিজেদেরকে মো’মেন বলে দাবি করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনাদের হাতে কি এই পৃথিবীর কর্তৃত্ব আছে? রূঢ় বাস্তবতা হোচ্ছে এই যে, পৃথিবীর কর্তৃত্ব তো দূরের কথা আপনারা পৃথিবীর সর্বত্র অন্য সব জাতি দ্বারা পরাজিত, অপমানিত, অবহেলিত, নিগৃহিত এবং প্রতিটি জাতির লাথি খাচ্ছেন, সব জাতি আপনাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখছে, আপনাদের রাষ্ট্রগুলি আক্রমণ কোরে দখল কোরে নিচ্ছে (যদিও প্রকৃত এসলামে ভৌগোলিক জাতিরাষ্ট্রের কোন ধারণা নেই, সুতরাং তা শেরক)। ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’ তথা দাজ্জালের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত্র পুরো মোসলেম নামক এই জাতি, আরব অনারব নির্বিশেষে সকলে ভয়ে তাদের পায়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মো’মেন এর প্রতি আল্লাহর উল্লেখিত অঙ্গীকার থেকে বাস্তবতার দূরত্ব লক্ষ যোজন। সুতরাং যদি আল্লাহ সত্যি অঙ্গীকার রক্ষাকারী হোয়ে থাকেন, তাহোলে আপনারা মো’মেন হোতে পারেন না, এবং মো’মেন না হওয়ার মানেই কাফের হওয়া। আল্লাহ যদি আপনাদের অভিভাবকই হবেন তবে আপনাদের এই করুণ দুর্দশা কেন? আল্লাহ যাদের অভিভাবক নয় তারা কি মো’মেন? নিশ্চয় না।
এবার একটু সত্যিকারের মো’মেনদের সাথে অর্থাৎ রসুলাল্লাহর আসহাবদের সঙ্গে আজকের মো’মেন দাবিদারদের চরিত্র মিলিয়ে দেখি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সর্বোৎকৃষ্ট মো’মেন ছিলেন রসুলাল্লাহ’র আসহাবগণ। তাদের জীবন যাত্রার সাথে আমাদের জীবন যাত্রা একটু মিলিয়ে দেখি। আম্মা খাদীজা (রা:), আবু বকর (রা:), ওমর (রা:), ওসমান (রা:), আলী (রা:), বেলাল (রা:), আম্মার (রা:), আবু ওবায়দা (রা:), খালেদ বিন ওলিদ (রা:) প্রমুখ রসুলাল্লাহর সাহাবীরা তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতার (দ:) কাছ থেকে এসলাম শিখে তাঁরা সেটিকে অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থাকে সমস্ত দুনিয়াময় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবজাতির সামষ্টিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের বাড়ি-ঘর, স্ত্রী, পুত্র, সহায় সম্পত্তি সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে অবশেষে নিজের প্রাণটুকু বিসর্জন দেওয়ার জন্য দুনিয়ার বুকে বহির্গত হোয়ে গিয়েছেন। এই অধিকাংশ সাহাবীর কবর হোয়েছে বিদেশের মাটিতে। তারা এসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ কোরতে গিয়ে পার্থিব বিনিময় নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না বরং তারা অবর্ণনীয় নির্যাতন ও দুঃখ কষ্টের শিকার হোয়েছেন। তারা জান দিয়ে জাতির ঐক্য রক্ষা কোরেছেন, আল্লাহর রসুলের হুকুমের বিপরীতে কোন শক্তির কাছে মাথা নত করেন নি। তাদের এই অতুলনীয় কোরবানির বিনিময়ে আটলান্টিকের তীর থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত অর্ধ পৃথিবীতে আল্লাহ রসুলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হোয়েছিল। কোন শক্তি দুনিয়াতে ছিল না যে এই জাতির দিকে চোখ তুলে তাকায়। জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে সকল জাতির শিক্ষকের আসনে অধিষ্ঠিত হোয়েছিলেন। আল্লাহর রসুলের এসলাম যে জাতি গঠন কোরেছিল সে জাতির চরিত্রের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যোদ্ধার চরিত্র, তার প্রমাণ জাতির নেতা আল্লাহর রসুল (দ:) সহ সমস্ত জাতির মধ্যে এমন একটা লোকও বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যেত না যার শরীরে অস্ত্রের আঘাত নেই। সেই মো’মেনদের অভিভাবক ছিলেন আল্লাহ্, আল্লাহ্ তাদের কাছে ওয়াদা রক্ষা কোরেছিলেন অর্থাৎ কর্তৃত্ব তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, প্রমাণ কোরেছিলেন আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্র“তির ব্যতিক্রম করেন না।
আমার কথাগুলো হয়তো অনেকের কাছে রূঢ় মনে হোতে পারে, কিন্তু আমি নিরূপায়, আমি যা বোলছি তা সত্যের খাতিরেই আমাকে বোলতে হোচ্ছে, নয়তো আল্লাহর কাছে আমি দায়ী থাকবো। আমি শুধু বলতে চাই আল্লাহর রসুল যে জাতি রেখে গেছেন, সে জাতির সঙ্গে বর্তমানের এই জাতিকে একটু মিলিয়ে দেখুন, তাহোলেই আমাদের আজকের এই হীনতা, এই লাঞ্ছনা, অনৈক্য পরিশেষে ইহুদি খ্রিস্টান সভ্যতার নিকৃষ্ট দাসত্বের কারণ দেখতে পাবেন।
বর্তমানের এসলাম যে জাতি গঠন করে তার চরিত্রের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হোচ্ছে কাপুরুষতা, ছোট বড় সমস্ত রকম সংঘর্ষ, বিপদ আপদ থেকে পলায়নপর মনোবৃত্তি। যে যতো বড় মো’মেন হবার দাবিদার সে তত বেশি কাপুরুষ; অস্ত্রের আঘাত তো দুরের কথা, এদের গায়ে সুঁচের খোঁচারও দাগ নেই। তসবীহ হাতে মসজিদে, খানকায় বোসে থাকে এবং কোন রকম বিপদের আভাষ পেলেই হাওয়ার বেগে ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে যায়। সম্প্রতি আমাদের দেশে একটি ঘটনা ঘোটেছে। আল্লাহ ও রসুলের অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল কোরতে গিয়ে পুলিসের ধাওয়া খেয়ে হাজার হাজার মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক এমাম সাহেবরা এমনভাবে পালিয়েছেন যে পালাতে গিয়ে দিশেহারা হোয়ে কয়েকজন ঝাঁপ দিয়েছেন পদ্মানদীতে। এর তিনদিন পরে এক মাদ্রাসা ছাত্রের লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয় (২৬ ফেব্র“য়ারি ২০১৩- দৈনিক ইত্তেফাক)। আজকে মো’মেন হবার দাবিদার এই জাতি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, তারা অন্য জাতি গুলির কাছে ফুটবলের মতো লাথি খাচ্ছে; লাঞ্ছনা, অপমান এদের গা সওয়া হোয়ে গেছে। আমরা এটুকু নির্দ্বিধায় বোলতে পারি যে, রসুলাল্লাহর হাতে গড়া সেই জাতি আর আজকের মো’মেনের দাবিদার এই জাতি এক তো নয়ই বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। সুতরাং আজকের এই জাতিকে যদি আপনি মো’মেন বলেন আবশ্যই আপনাকে স্বীকার কোরতে হবে যে, রসুলাল্লাহর হাতে গড়া জাতিটি মো’মেন ছিলো না (নাউযুবিল্লাহ)।
আমি প্রথমেই বলে এসেছি যে মো’মেন ও কাফের বিপরীত শব্দ, যেমন সাদা-কালো, দিন-রাত, জান্নাতি-জাহান্নামী, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি। আপনি জান্নাতি না মানেই আপনি জাহান্নামী, আপনি সত্যবাদী না মানেই মিথ্যাবাদী; ঠিক একইভাবে আপনি মো’মেন না মানেই আপনি কাফের। কাফেরের আল্লাহ প্রদত্ত সংজ্ঞা হোচ্ছে- “যারা আল্লাহর নাজেল করা বিধান (কোর’আন) অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা ও শাসনকার্য পরিচালনা (হুকুম) করে না তারা কাফের।”- (সুরা মায়েদা-৪৪)
পৃথিবীর কোথায় কোর’আন অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালিত হোচ্ছে কেউ বোলতে পারেন? পৃথিবীর এক ইঞ্চি জায়গাতেও আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ আল্লাহর নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও তাঁর নাযেলকৃত বিধান প্রতিষ্ঠিত নেই। তাহোলে আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী (মো’মেন, মোসলেমের দাবিদার) এ জাতি কি কাফের নয়?
কি সাংঘাতিক প্রশ্নের সামনে আপনাদের দাঁড় করালাম! এই উত্তরের মধ্যেই আপনি খুঁজে পাবেন আপনার পরিচয় আপনি মোমেন না কাফের, আপনি জান্নাতি না জাহান্নামী, আপনার নামাজ, রোজা ইত্যাদি কবুল হয় নাকি ব্যর্থ হয়, সবগুলি প্রশ্নের জবাব।

দাজ্জালকে না চেনার কারণ

দাজ্জালকে না চেনার কারণ

এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর লেখা থেকে সম্পাদিত:
চৌদ্দশ’ বছর থেকে মোসলেম উম্মাহর ঘরে ঘরে দাজ্জাল সম্বন্ধে আলোচনা চোলে আসছে। আল্লাহর শেষ রসুল মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে যেসব কথা বোলে গেছেন, পৃথিবীতে কি কি ঘটনা ঘোটবে সেগুলোর সম্বন্ধে আভাষ ও সরাসরি যা জানিয়ে দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে দাজ্জাল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যেমন চিত্তাকর্ষক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বিগ্নকর। উদ্বিগ্নকর ও ভীতিপ্রদ এই জন্য যে দাজ্জালের শক্তি, প্রভাব ও প্রতিপত্তি সমগ্র মানবজাতির উপর প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার কোরে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, সমস্ত মানবজাতিকে বিপথে চালাবার চেষ্টা কোরবে। শুধু তাই নয়, বেশ কিছু সময়ের জন্য দাজ্জাল তার শক্তি ও প্রভাব বিস্তার কোরে গোটা মানবজাতিকেই বিপথে পরিচালিত কোরবে। কাজেই দাজ্জালকে কোনোভাবেই ছোট কোরে দেখার বা অবজ্ঞা করার উপায় নেই।
আলাহর রসুলের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে একত্রে নিলে যা দাঁড়ায় তাহোল, দাজ্জাল মানবজাতিকে বোলবে তাকে রব বোলে মেনে নিতে। তার কাছে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো দুইটি জিনিস থাকবে। যারা তাকে রব বোলে মেনে নেবে তাদেরকে সে তার তৈরি জান্নাতে স্থান দেবে আর যারা তাকে রব বোলে মানবে না তাদেরকে সে তার তৈরি জাহান্নামে নিক্ষেপ কোরবে। তার কাছে রেজেকের বিশাল ভাণ্ডার থাকবে। যারা তাকে রব বোলে মানবে তাকে সে সেখান থেকে দান কোরবে আর যারা তাকে মানবে না তাদেরকে সে তার রেজেকের ভাণ্ডার থেকে দান কোরবে না। দাজ্জালের আদেশে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, মাটির গভীর থেকে সম্পদ উপরে উঠে আসবে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কি হোচ্ছে দাজ্জাল তা দেখতে ও শুনতে পারবে। সমস্ত পৃথিবীর এক ইঞ্চি মাটি বা পানি থাকবে না যা দাজ্জালের প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকবে। দাজ্জালের ফেতনা যে কতখানি ভয়ানক হবে তা বোঝা যায় তখনই যখন রসুলাল্লাহ নিজেই এই দাজ্জালের ফেতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হোচ্ছে এই এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপারে আমরা কতটুকু সচেতন? বাস্তব অবস্থা হোল এই যে আমরা মোটেও সচেতন নই। আর সচেতন নই বোলেই আমরা বুঝছিনা যে আজ থেকে ৪৭৫ বছর আগেই মানবজাতির মহাবিপদের ঘণ্টা বাজিয়ে মানবতার মহাশত্র“, এবলিসের চূড়ান্ত রূপ দাজ্জালের জন্ম হোয়েছে। বর্তমানে সে তার শৈশব, কৈশোর পার কোরে যৌবনে উপনীত হোয়েছে এবং দোর্দণ্ড প্রতাপে সারা পৃথিবীকে পদদলিত কোরে চোলেছে। আমরা এও বুঝছিনা যে সমস্ত পৃথিবীসহ আমরা মোসলেমরাও দাজ্জালকে রব, প্রভু বোলে স্বীকার কোরে নিয়েছি ও তার পায়ে সাজদায় পোড়ে আছি। হেযবুত তওহীদের এমাম, এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী কোর’আন-হাদিস-বাইবেল এবং বিজ্ঞানের আলোকে ষ্পষ্টভাবে প্রমাণ কোরেছেন যে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতাই হোচ্ছে রসুলাল্লাহ বর্ণিত সেই ভয়ংকর দানব দাজ্জাল। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে দাজ্জালকে আমরা কেউ চিনছিনা কেনো? আমরা তো নিজেদেরকে মো’মেন, মোসলেম, উম্মতে মোহাম্মদী দাবি কোরি, আমাদের মাঝে লক্ষ লক্ষ কোর’আনের হাফেজ, আলেম, মোহাদ্দেস, মোফাসসের রোয়েছেন যারা সারা জীবন ধরে কষ্ট কোরে এসলামের অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে গবেষণা কোরে পাণ্ডিত্য জাহের কোরছেন। আমাদের মাঝে লক্ষ লক্ষ পীর মুরীদ রোয়েছেন, যারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই তাদের আত্মা পরিষ্কার কোরতে সদা ব্যস্ত থাকেন। তাছাড়াও রোয়েছেন হাজার হাজার আলেম, মাওলানা, মাশায়েখ, মোহাদ্দীস ইত্যাদি ধর্মের ধারক-বাহকরা। তাহোলে এত বড় একটা বিষয়ে তারা নীরব কেনো? তারা কেনো দাজ্জালকে দাজ্জাল বোলে চিনতে পারছেন না? সত্যান্বেষী মনে এই প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে দিতে হবে না, স্বয়ং রসুলাল্লাহই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বোলেছেন, “দাজ্জালের দুই চোখের মাঝখানে কাফের লেখা থাকবে। শুধু মো’মেন, বিশ্বাসীরাই তা দেখতে এবং পড়তে পারবে; যারা মো’মেন নয় তারা পড়তে পারবে না” [ আবু হোরায়রা (রা:), আবু হোযায়ফা(রা:) এবং আনাস (রা:) থেকে বোখারী ও মোসলেম]
এই হাদিসটি শুধু অর্থবহ এবং আকর্ষণীয়ই নয়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণও বটে। মো’মেন হোলে লেখাপড়া না জানলেও, নিরক্ষর হোলেও তারা পড়তে পারবেন আর মো’মেন না হোলে শিক্ষিত হোলেও, পণ্ডিত হোলেও দাজ্জালের কপালে কাফের লেখা দেখতে ও পড়তে পারবেন না, এই কথা থেকেই বোঝা যায় যে দাজ্জালের কপালের এই লেখা কাফ, ফে, রে এই অক্ষরগুলো দিয়ে লেখা নয়। মো’মেনরা নিরক্ষর হোলেও ঐ লেখাগুলো দেখতে ও পোড়তে পারবেন। মো’মেন কারা? আল্লাহ কোর’আনে বোলছেন- শুধু তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে বিশ্বাস করে, তারপর আর তাতে কোনো সন্দেহ করে না, এবং নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে; তারাই হোল খাঁটি (সুরা হুজরাত ১৫)।”
এখানে মনে রাখতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে বিশ্বাস করা অর্থ হোল ব্যক্তিগত এবং জাতীয় জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে বিশ্বাস করা এবং জীবনের কোনো অঙ্গনে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে না মানা। আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার কোরে দাজ্জালের সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়ার ফলে মোসলেম দাবিদার এই জাতি কার্যতঃ মোশরেক ও কাফের হোয়ে গেছে, তাদের রব এখন আল্লাহর পরিবর্তে দাজ্জাল। কাজেই বৃহত্তর জীবনে দাজ্জালের কপালের কাফের লেখা অর্থাৎ দাজ্জাল যে সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকারকারী কাফের এরা তা দেখতেও পাননা সুতরাং পড়তেও পারেন না। তাই আমরা দেখি মোসলেম বোলে পরিচিত এই জাতিটির প্রায় সমস্ত মানুষ দাজ্জালকে রব বোলে স্বীকার কোরে নিয়েছে কিন্তু ওদিকে মহা পরহেযগার, মুত্তাকি। এমন কি এই জাতির মধ্যে কয়েকটি দেশ আছে যাদের শীর্ষস্থানীয় নেত্রীদের কপালে সাজদার কালো দাগ আছে কিন্তু তারা দাজ্জালের আশ্রয়ে থেকে, দাজ্জালের কাছে থেকে অস্ত্রসহ সবরকম সাহায্য নিয়ে তাদের দেশের মধ্যে যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, তওহীদ প্রতিষ্ঠা কোরতে চান তাদের বন্দি কোরছেন, নির্যাতন কোরছেন, গুলী কোরে ফাঁসি দিয়ে হত্যা কোরছেন। এর কারণ এসব নেতাসহ মোসলেম বিশ্ব দাজ্জালের শেখানো এই কথা বিশ্বাস কোরে নিয়েছেন যে ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, সমষ্টিগত নয়, তাই তারা দাজ্জালের কপালে কাফের লেখা দেখতে ও পড়তে পারেন না।

Tuesday, June 30, 2015

প্রকৃত ইসলামে নারীর ক্ষমতায়ন

প্রকৃত ইসলামে নারীর ক্ষমতায়ন
রাকীব আল হাসান

আজকের পৃথিবীতে বিভিন্নভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, খুটিয়ে খুটিয়ে ইসলামের ত্র“টি বের কোরে এর বদনাম করা হয়। কিন্তু আজকে যে ইসলামটা দুনিয়াময় চালু আছে, এটা আল্লাহ ও রসুলের (দ:) প্রকৃত ইসলাম নয়। বিগত ১৩০০ বছরের কাল পরিক্রমায় বিকৃত হতে হতে ইসলাম আজ চূড়ান্তভাবে বিকৃত। আর এই চূড়ান্ত বিকৃতির সূত্রপাত ঘটায় ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা ঔপনিবেশিক আমলে। তারা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা কোরে খ্রিস্টান প্রিন্সিপালদের তত্ত্বাবধানে তাদের নিজেদের তৈরি করা একটা বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দেয় এবং জাতির মধ্যে একটি ধর্মব্যবসায়ী আলেম-মোল্লা শ্রেণির উদ্ভব ঘটায়। এই ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা শ্রেণিটি সেই বিকৃত ইসলামটাই মাদ্রাসা থেকে শিখে এসে মসজিদে, মাদ্রাসায়, খানকায়, ওয়াজ নসীহতে সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেয়। এভাবে গত কয়েক শতাব্দী ধরে ব্রিটিশদের তৈরি করা বিকৃত ইসলামটিই এই জাতির মধ্যে চর্চিত হচ্ছে। আজকে যে বিভিন্ন মহল থেকে ইসলামের বদনাম করা হচ্ছে, ইসলামকে পশ্চাদপদ, বর্বর ধর্ম বলে গালি দেওয়া হচ্ছে সেটা এই বিকৃত ইসলামের রূপটিকে দেখেই করা হচ্ছে। যারা গালি দিচ্ছেন তারা প্রকৃত ইসলাম দেখেন নি, তারা তাদের সামনে ইসলাম হিসাবে যেটাকে দেখছেন সেটাকেই গালাগালি করছেন।
সত্যিকার অর্থেই বিকৃত ইসলামের এই ধারক বাহক তথা আলেম মোল্লা শ্রেণির মনোভাব সাংঘাতিক পশ্চাদপদ, বিকৃত। নারীদের ব্যাপারে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি আমরা দেখতে পাই তা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, এটা তাদের নিজস্ব বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার কারণে পশ্চিমা প্রভাবাধীন গণমাধ্যমগুলি বিকৃত ইসলামের কূপমণ্ডূকতার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে যে ইসলাম নারীদের অবরুদ্ধ কোরে রাখে, মানুষের বাক-স্বাধীনতায়, চিন্তার স্বাধীনতায়, চলাফেরার স্বাধীনতায় বিঘœ ঘটায়, তাই যে কোনভাবেই হোক ইসলামের উত্থানকে রোধ করতে হবে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, শাশ্বত ও প্রাকৃতিক দীন। সুতরাং ইসলামের প্রতিটি বিধি-বিধান প্রাকৃতিক, যৌক্তিক ও চিরন্তন। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের সাথে বর্তমানের কূপমণ্ডূক ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে কুক্ষীগত বিকৃত ও বিপরীতমুখী ইসলামের তুলনা করা নিতান্তই বোকামী হবে। ১৩০০বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আল্লাহ রসুলের সেই প্রকৃত ইসলামে নারীদের ক্ষমতায়ন ও বর্তমানে বিকৃত ইসলামের ধ্বজাধারীরা নারীদেরকে কিভাবে গৃহবন্দী কোরে রেখেছে তা তুলে ধরাই আমার আজকের আলোচ্য বিষয়।

বিকৃত ইসলামে নারীদের গৃহবন্দী অবস্থা:

আজকের বিকৃত ইসলামের কূপমণ্ডূক ধর্মজীবী আলেম-মোল্লারা নারীদের ব্যাপারে ইসলামের যে ধারণা প্রচার কোরে থাকে তা প্রকৃত ইসলামের একেবারে বিপরীত। তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের অধীন কোরে রাখার পক্ষে ফতোয়া দিয়ে থাকেন। তারা এটা বুঝতে সক্ষম নয় যে, যার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা বেশি সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে। অযোগ্য পুরুষকে নারীর কর্তা করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত ইসলাম সমর্থন করে না। যেমন একটি প্রতিষ্ঠানে এক হাজার জন কর্মকর্তা, কর্মচারী আছে। সেখানে যদি জ্ঞান, যোগ্যতা, দক্ষতায় কোন নারী অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকে সেখানে সেই নারীকে প্রধান অর্থাৎ নেতৃত্বদানকারী হিসাবে মেনে নিতে বাধা কোথায়? সেই হিসাবে একজন নারী কোন এলাকার রাজনৈতিক প্রশাসকও (এড়াবৎহড়ৎ) হতে পারেন। আজকের বিকৃত ইসলামের ধ্বজাধারীরা ইসলামে পুরুষ ও নারীর অবস্থানকে এমনভাবে ভারসাম্যহীন কোরে ফেলেছে যে তারা নতমস্তক নারীদের গায়ে বোরকা চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের গৃহবন্দী করেছে, অপরদিকে পুরুষকে দিয়েছে স্বৈরশাসকের অধিকার। তারা একবারও ভাবে না যে উম্মতে মোহাম্মদীর নারীরা রসুলের পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করলেন, এই রকম তাবুসদৃশ বোরখা গায়ে চাপিয়ে কি যুদ্ধ করা যায়, ঘোড়ায় চড়া যায়? বর্তমানে নারীর দিকে দৃষ্টিপাত করাকেও মারাত্মক গোনাহের কাজ বলে প্রচার করা হয়। এই সব মনগড়া, বুদ্ধিহীন, জাতিধ্বংসকারী ধারণাকে তারা ইসলামের উপরে চাপিয়ে দিয়েছে এবং এগুলির অনুকূলে হাজার হাজার বই লিখেছে, হাজার হাজার ফতোয়া ও মাসলা মাসায়েল বের করেছে। এই অন্ধত্ব আজ সমগ্র জাতির উপর জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসেছে। তথাকথিত প্রগতিশীলরাও মোল্লা শ্রেণির এইসব মুর্খতাকে অসার প্রমাণ করতে গিয়ে আল্লাহ-রসুলকেই দোষারোপ করছেন। প্রচলিত ইসলামের বোরখা পরিহিতা কিম্ভূতকিমাকার নারীমূর্তি দেখেই তারা ধরে নিয়েছেন যে ইসলাম নারীকে বুঝি এভাবেই অথর্ব, জড়বুদ্ধি, অচল, বিড়ম্বিত করেই রাখতে চায়। তারা নিজেরাও পাশ্চাত্য জড়বাদী ‘সভ্যতা’র প্রভাবে অন্ধ হয়ে আছেন। তাই ইসলামের বিরোধিতা করা তাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান তাদের লুপ্ত হয়ে গেছে। নইলে তারা বুঝতে পারতেন যে – এই ধর্মজীবী, ফতোয়াবাজ মাদ্রাসা শিক্ষিত আলেম মোল্লাদের সঙ্গে আল্লাহ রসুলের ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই, কেবল সম্পর্ক নেই নয়, এই মোল্লারাই ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্র“। তারা যে ইসলামটি বিক্রি কোরে খাচ্ছেন তার প্রতিটি দিক আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলামের বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছে। সত্য ইসলামের নারী কেমন ছিল সেটা তাদের ধারণারও বাইরে।
আজ ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র গলায় সুর মিলিয়ে নারীবাদীরা হিংস্র মুখভঙ্গি প্রদর্শন কোরে বলেন, নারীকে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার দিতে হবে। তারা জানেন না যে প্রকৃতপক্ষে ইসলাম নারীর অধিকার তো দিয়েছেই, তাদেরকে এমন সম্মানিত করেছে যে কোন জীবনব্যবস্থাতে এর ভগ্নাংশও দেওয়া হয় নি, অপরদিকে পশ্চিমা সভ্যতা বিজ্ঞাপনী প্রচারণা ও অশ্লীল সংস্কৃতির দ্বারা নারীদেহকে কর্পোরেট পণ্যে পরিণত করেছে।

প্রকৃত ইসলামে নারীর ক্ষমতায়ন:

যেহেতু উপার্জন করা পুরুষের কাজ, তাই বলা যায় জীবিকার যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েরা দ্বিতীয় সারির সৈনিক। কখনও কখনও যদি অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে গিয়ে জীবিকার লড়াইতে অবতীর্ণ হতে হয় সেটার সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। রসুলাল্লাহর অনেক নারী আসহাব পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় বা পুরুষ সদস্যরা জিহাদে অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ কোরে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন।
এবার আসা যাক সত্যিকার যুদ্ধ-ক্ষেত্রে। রসুলাল্লাহর সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। আনাস (রা:) ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “সেদিন আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা:) এবং উম্মে সুলাইমকে (রা:) দেখেছি, তাঁরা উভয়েই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের গোছা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পিঠে বহন করে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার চলে যেতেন এবং মশক ভরে পানি এনে লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন (বোখারী শরীফ, হাদিস নং ৩৭৬৭)। এখানে কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের সবচাইতে বিপদসঙ্কুল পরিবেশের কথা বলা হয়েছে, বাড়িঘরের স্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা বলা হয় নি। তাছাড়া মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী রুফায়দাহ (রা:)। কোন যোদ্ধাকে যদি রসদ ও এই সেবাগুলি দিয়ে সাহায্য না করা হয় তবে সে কখনও প্রথম লাইনে থেকে যুদ্ধ করতে পারবে না। যে কোন সামরিক বাহিনীর কাছে জিজ্ঞাস করে দেখতে পারেন এই কাজের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু এটুকুই না, যুদ্ধে এমন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন মেয়েদেরকেও অস্ত্র হাতে নিতে হয়, সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে হয় [সংসার সমরাঙ্গণেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নারীকেও প্রথম সারিতে অর্থাৎ উপার্জন ও পরিবার ভরণপোষণের কাজে নামতে হবে]। যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে যেন মেয়েরা এগিয়ে আসতে পারে এবং পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমানভাবে যুদ্ধ কোরে যেতে পারে সে সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। তার প্রমাণ ইতিহাস। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, বহু সাহাবী শহীদ হয়ে যান, স্বয়ং রসুলাল্লাহ মারাত্মকভাবে আহত হন, কাফেররা প্রচার কোরে দেয় যে, রসুলাল্লাহও শহীদ হয়ে গেছেন এমনই বিপজ্জনক মুহূর্তে মেয়েরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবী উম্মে আম্মারার (রা:) ভূমিকা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। এ সম্পর্কে রসুলাল্লাহর (সাঃ) উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাহকেই লড়াই করতে দেখেছি।’ তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন তা নজিরবিহীন। এক শত্র“ সৈন্যের তরবারির কোপ পড়ল তার মাথায়। তিনি ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করলেন। তিনি আঘাত করলেন তার ঘোড়ার পায়ের উপর। অশ্ব ও অশ্বারোহী দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। মহানবী এই দৃশ্য দেখে তার পুত্র আব্দুল্লাহকে (রাঃ) সাহায্যের নির্দেশ দিলেন। তিনি পতিত সৈন্যকে শেষ করলেন। এলো অন্য এক শত্র“। সে আঘাত হানলো আব্দুল্লাহর (রাঃ) বাম বাহুতে। মা পুত্রের ক্ষতস্থান বেঁধে দিলেন। আর ছেলেকে আমৃত্যু লড়াই করার জন্য উদ্দীপ্ত করলেন। এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘হে উম্মে আম্মারাহ! তোমার মধ্যে যে শক্তি আছে, তা আর কার মধ্যে থাকবে?’
নবী করিম (সা:) নিজ হাতে সেদিন এই বীরাঙ্গণার ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁর কাঁধ থেকে গল গল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। বেশ কয়েকজন বীর সৈনিকের নাম উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘আল্লাহর কসম! আজ তাদের সবার চেয়ে উম্মে আম্মারাহ বেশি বীরত্ব দেখিয়েছেন। এর অনেক পরে ইয়ারমুকের যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালীদের অন্যতম এক বাহু দেরার বিন আজওয়ার যখন শত্র“র হাতে আটকা পড়েন তখন তারই আপন ভগ্নী খাওলা ঘোড়ায় চড়ে এমন লড়াই শুরু করেন যে স্বয়ং সেনাপ্রধান খালিদ (রাঃ) বার বার জিজ্ঞেস করেন, “কে এই বীর?” খাওলা শত্র“ শিবিরে আক্রমণ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তার ভাইকে উদ্ধার করেই ছাড়েন। পাঠক, এমন অসংখ্য উদাহরণের মধ্য থেকে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করলাম, আশা করি সত্যপ্রিয় পাঠকের বোঝার জন্য এ ক’টিই যথেষ্ট হবে যে, রসুলাল্লাহর সময়ে নারীরা প্রথম সারির ভূমিকাও কিভাবে পালন করেছেন। মাসলা মাসায়েলের জটিল জাল বিস্তার কোরে কোনকাজেই তাদের অংশগ্রহণের বাধা সৃষ্টি করা হয় নি।
একটি জাতির প্রায় অর্ধাংশই নারী। জাতির অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অচল কোরে রাখা আর এক পায়ে হাঁটার চেষ্টা করা একই কথা। সেই জাতির কোনদিনই উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের একটি সুন্দর সমন্বয় সাধন করেছে। নারীর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতাকে ইসলাম মোটেও অস্বীকার করে না। যদি অবস্থার প্রেক্ষাপটে কোন নারীকে দ্বিতীয় সারি থেকে প্রথম সারিতে আসতে হয় এবং সেখানে তিনি যদি তার জ্ঞান, প্রতিভা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সামর্থ্যবলে নেতৃত্বদানের উপযুক্ত বলে সাব্যস্ত হন, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তিনি বহু পুরুষের উপরও নেত্রী হিসাবে নিয়োজিত হতে পারবেন। প্রকৃত ইসলামের দৃষ্টিতে নারী হওয়া নেতৃত্বলাভের ক্ষেত্রে কোন অযোগ্যতা নয়। ইসলামের ইতিহাসের একটি দুঃখজনক অধ্যায় উটের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:)। বহু সাহাবী তাঁর অধীনে থেকে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ঐতিহাসিকরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম” বলে তখন তাঁর পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধরত কোন সাহাবী ফতোয়া দিয়েছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এই কথাটি আবিষ্কার করেছেন বিকৃত আকিদার মোল্লারা যারা উম্মাহর মূল কাজ, তাকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অন্ধ।
মূল কথা হচ্ছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিপদসঙ্কুল এবং সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পুরুষ সাহাবীদের পাশাপাশি নারী সাহাবীরা অংশ নিয়েছেন, সেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য কাজে যে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা কখনই পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। তারা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ যে কোন ভূমিকা রাখতে পারতেন। কেবল একটি মাত্র পদ নারীকে দেওয়া বৈধ নয়, সেটি হলো- উম্মতে মোহাম্মদী নামের যে মহাজাতিটি সৃষ্টি হবে সেই জাতির এমামের পদ। আল্লাহ নারী ও পুরুষের দেহ ও আত্মার স্রষ্টা, সচেতন মন ও অবচেতন মনের স্রষ্টা। এদের উভয়ের দুর্বলতা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন মহান আল্লাহ। তিনি জানেন যে নারীর শারীরিক গঠন যেমন পুরুষের তুলনায় কোমল, তার হৃদয়ও পুরুষের তুলনায় কোমল, আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল। সহজেই তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে, তার স্থৈর্য, দূরদর্শীতা পুরুষের চেয়ে কম, তাকে প্রভাবিত করা সহজতর। ইবলিস নারীকেই প্রথম আল্লাহর হুকুম থেকে বিচলিত করেছিল। এ কারণেই আল্লাহর অগণ্য নবী-রসুলের মধ্যে একজনও নারী নেই। সুতরাং পৃথিবীময় উম্মতে মোহাম্মদী নামক যে মহাজাতি হবে সেই মহাজাতির এমাম কেবল নারী হতে পারবেন না, স্বীয় যোগ্যতাবলে অন্যান্য যে কোন পর্যায়ের আমীর বা নেতা সে হতে পারবে। শুধু নারী হওয়ার কারণে কেউ নেতৃত্ব দিতে পারবে না এটা ইসলামের দৃষ্টিতে যোগ্যতা অযোগ্যতার মাপকাঠি নয়।

[পাঠক মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ: ০১৯৩৩৭৬৭৭২৫]

প্রকৃত এসলামের বিয়ে এবং বর্তমানের বিকৃতিসমূহ

প্রকৃত এসলামের বিয়ে এবং বর্তমানের বিকৃতিসমূহ

আফরোজা শবনম:
এসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিয়ে হোচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা। বিয়ে পুরুষ ও নারীর মাঝে সামাজিক পরিবেশে ও সমর্থনে শরীয়ত মোতাবেক অনুষ্ঠিত এমন এক সম্পর্ক, যার ফলে দু’জনে একত্রে বসবাস ও পরস্পরে দাম্পত্য সম্পর্ক ও সন্তান উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বৈধ হয়ে যায় এবং পরস্পরের উপর অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে দাঁড়ায়।
রাসুলাল্লাহ বলেন আল্লাহ “দাম্পত্য সম্পর্ককে নৈকট্য ও আত্মীয়তার মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ কোরেছেন এবং এটাকে অবশ্যকীয় বিষয় কোরেছেন যার কারণে আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত হয়। সমগ্র মানব মানবীর মধ্যে এই বিষয়ে আকর্ষণ ও অনুরাগকে সহজাত কোরেছেন এবং বংশের দ্বারা সম্মানিত কোরেছেন”। এ প্রসঙ্গে সুমহান আল্লাহ বলেন: “তিনি সেই সত্তা যিনি অপবিত্র পানি হতে মানুষ সৃষ্টি কোরেছেন এবং বৈবাহিক সম্পর্ককে বংশও আত্মীয়তার অন্যতম মানদণ্ড নির্ধারণ কোরেছেন। আর আপনার প্রতিপালক প্রবল পরাক্রমশালী (সুরা ফোরকান ৫৪)।
এসলামে বিয়ের শর্ত মূলত তিনটি। প্রথমতঃ ছেলে এবং মেয়ে দু’জন দু’জনকে অবশ্যই পছন্দ হতে হবে। সাক্ষী থাকবে দু’জন এবং মেয়েকে দেনমোহর দিতে হবে। ছেলের সামর্থ অনুযায়ী যে দেনমোহর দিতে সক্ষম তা মেয়ে যদি মেনে নেয় তাহোলেই হবে এসলামের বিয়ে। কিন্তু আমরা যদি সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, এসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের সমাজে একজন পাত্রের অবিভাবক কোরবানির হাটের গরুর মত পাত্রের দাম হাকেন। যে যত দাম বেশি দিবে বিয়েটা শেষ পর্যন্ত সেখানেই হয়। এখানে অবিভাবকরা পাত্র পাত্রীর পছন্দ অপছন্দের মূল্যায়ন করে না। আর মেয়ের অভিভাবকরা একটা মেয়েকে পার করার জন্য পাত্র পক্ষের চাহিদা পূরণ করার জন্য সাধ্যের বাইরে চেষ্টা করেন, অনেক সময় দেখা যায় পাত্র পক্ষের এই চাহিদা পূরণ করার জন্য জায়গা-জমি, সহায়-সম্পত্তিও বিক্রি কোরতে হয়। তারপরও যদি শ্বশুর বাড়ির নির্যাতন থেকে নিস্তার পাওয়া যেত! নববধূর হাতের মেহেদীর রং মুছতে না মুছতেই শুরু হয় নতুন উৎপীড়ন। প্রতিদিন যৌতুকের বলী হোচ্ছেন হাজার হাজার নারী, কাউকে আত্মহত্যা কোরতে বাধ্য করা হোচ্ছে। কতগুলো ঘটনা আমরা জানি আর কতগুলো ঘটনা আমাদের অজানাই থেকে যায়।
আমরা যদি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহোলে আমাদের উপমহাদেশের বিপরীত চিত্র দেখতে পাবো। সেখানে পাত্রীর অভিভাবকরা মোটা অংকের দেনমোহর হাঁকেন, যা একজন পাত্রের সাধ্যের বাইরে। তাই সেখানে একজন ছেলে বিয়ে করার আগেই প্রৌঢ়ত্বে পদার্পণ করেন, অনেকে বিবাহে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, অনেকে তাদের চাহিদা পূরণ কোরতে হয় আরব উপমহদেশের বাইরে গিয়ে অবৈধ উপায়ে।
পাশ্চাত্য সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সেখানে নারী পুরুষরা বিয়েকে একটা বোঝা হিসাবে মনে করে। ওদের দর্শন হল, অর্থ উপার্জন করো এবং যত পারো ভোগ করো। যতদিন যৌবন থাকে এই দর্শনে তারা বিশ্বাসী থাকে, পরে যখন জীবন বার্দ্ধক্যের দিকে ঝুঁকতে থাকে এই দর্শনের প্রতি আস্থাও কমতে থাকে, লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ পড়ে অনিশ্চয়তায়। কোন পরিবার নেই, মনের ভাব আদান-প্রদান করার কেউ নেই। প্রচণ্ড হতাশায় দিন কাটাতে হয়। এই হতাশা কাটাতে নির্ভর কোরতে হয় মাদকের উপরে, জীবনের উপার্জিত সম্পদ ব্যয় হতে থাকে মাদক আর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। একসময় অনেকগুলি জারজ সন্তান দুনিয়াতে রেখে হাসপাতালে বা বৃদ্ধাশ্রমে প্রাণত্যাগ করে। ইদানিং তো এই বিয়ে ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি অন্যদিকে গড়িয়েছে। সেটা হোচ্ছে সমকামীতা যা কিনা পশুও পশুর সঙ্গে করে না। কী জঘন্য, কী ভয়াবহ, কী নিকৃষ্ট! অথচ এই সমকামীতা অনেকগুলি উন্নত (!) দেশে আইনসিদ্ধ।
হিন্দু শাস্ত্রে বিয়েটা এমনই জটিল যে আধুনিক ভারতীয় হিন্দুরাও পুরাতন ধ্যান ধারণা ছুঁড়ে ফেলে পাশ্চাত্যের ‘অবাধ বা ফ্রি-সেক্স’ জীবনদর্শনে প্রভাবিত হয়ে পড়ছে এবং বিয়েকে ‘তথাকথিত’ ‘প্রথাগত’ ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত কোরছে।
পুরুষের বহু বিবাহের প্রয়োজনীয়তা
আধুনিক নারীরা পুরুষের বহু বিবাহের ব্যাপারটি মানতে রাজি না, তারা মনে করে এসলাম এই অপমানজনক পুরুষতান্ত্রিক প্রথাটিকে নারীর উপরে চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর জনসংখ্যা জরিপে দেখা যায় যে পুরুষের চেয়ে নারীদের সংখ্যা অনেক দেশেই বেশি। এখন একজন পুরুষ যদি একটি বিয়েই করে তাহোলে বাদবাকী নারীদের কি হবে? হয় তাদের বিয়ে ছাড়া জীবন কাটিয়ে দিতে হবে, না হয় অবৈধ পথ বেছে নিতে হবে। অন্যভাবে বলা যায়, সংসারের আশ্রয় না পাওয়ায় সমাজই তাকে বাধ্য করবে ‘অসতী’ হতে। তার চেয়ে কি ভাল নয় যৌথ পরিবারে ঐক্যবদ্ধভাবে অন্য নারীর সঙ্গে স্ত্রীর অধিকার ও সম্মান নিয়ে সহমর্মী হয়ে বসবাস করা? এতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেলো, একাকীত্ব দূর হোল, জীবনের অবলম্বনও হোল, অবিচার অনাচারের পথও রুদ্ধ হোল।
তাছাড়া একজন পুরুষের স্ত্রী যদি সন্তান ধারণে অক্ষম হয়, তখনও তার স্বামী কি আরেকজন স্ত্রী গ্রহণ কোরতে পারবে না? অথবা প্রথমা স্ত্রী অসুস্থ হোলে তখন সেই পুরুষ কি দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করে পরিবারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে না? মহান আল্লাহর দেওয়া কোন বিধানই একপেশে বা অন্যায় হতে পারে না, আল্লাহর সকল বিধান হোচ্ছে চূড়ান্ত ন্যায় ও ভারসাম্যে পূর্ণ এবং প্রাকৃতিক। অনেকেই আমরা মনে করি, পুরুষের বহু বিবাহ কেবলমাত্র পুরুষেরই প্রয়োজনে, কিন্তু আসলেই কি তাই? একাধিক নারী একটি সংসারে যদি সহোদরার ন্যায় অবস্থান কোরতে পারেন, সন্তানদেরকে মানুষ করার ক্ষেত্রে, পারস্পরিক সেবাযতেœ এবং সংসারকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার ক্ষেত্রে তারা কেমন অবদান রাখতে পারেন, তা কি ভেবে দেখেছেন?
বর্তমানে আমাদের সমাজে একটা বিয়ে মানেই পাত্র এবং পাত্রী উভয় পক্ষের অর্থের অপচয়। অথচ রসুলাল্লাহর আদরের মেয়ে জান্নাতের রানী ফাতেমাকে (রা:) বিয়ে দিলেন তাঁর চাচাতো ভাই আলীর (রা:) সঙ্গে। বিয়ে ঠিক হবার পর রসুলাল্লাহ আলীকে (রা:) জিজ্ঞাস করলেন তার কাছে কি আছে? আলী (রা:) জবাব দিলেন টাকা পয়সা কিছুই নেই। থাকার মধ্যে আছে একটি ঘোড়া, একটি তলোয়ার আর একটি লোহার বর্ম। মহানবী তাকে বোললেন, ‘আর যখন কিছুই নেই তখন বর্মটি বন্ধক দিয়ে টাকা নিয়ে এসো।’ তাই করা হোল এবং ঐ টাকা দিয়ে বিয়ের খরচ চালানো হোল। এবং দেনমোহর হোল চারশত মিসকাল রূপা। আরেকটি উদাহরণ দিই। একজন সাহাবীর বিয়ের প্রশ্ন উঠলে রসুলাল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস কোরলেন, ‘দেন মোহর দেওয়ার মত তোমার কি আছে?’ সাহাবী বোললেন, ‘আমার কোন কিছুই তো নেই।’ রসুলাল্লাহ জিজ্ঞেস কোরলেন, ‘তুমি কি কোর’আনের কোন আয়াত জানো?’ সাহাবী বোললেন, ‘হ্যাঁ। আমি কোর’আনের এতগুলি আয়াত জানি।’ রসুলাল্লাহ বোললেন, ‘তোমার দেনমোহর হচ্ছে তুমি এই আয়াতগুলি তোমার স্ত্রীকে শিক্ষা দিবে।’ তখন এভাবেই বিয়ে হোল।
পাঠকগণ একটু চিন্তা করে দেখুন এসলামের বিয়ে কত সাধারণ ও সহজ! আল্লাহর রসুল কি পারতেন না তাঁর আদরের কন্যার বিয়ে অতি জাঁকজমকপূর্ণভাবে দিতে। কিন্তু প্রকৃত এসলাম বর্তমান সমাজের এই অপচয় মোটেও সমর্থন করে না। আরেকটি প্রতারণামূলক ও দুঃখজনক ব্যাপার হোচ্ছে আমাদের সমাজে মোটা অংকের টাকা দেনমোহর হিসাবে ধার্য করা হয় কিন্তু সেই দেনমোহরের টাকা স্ত্রীকে জীবনেও আর পরিশোধ করে না অথচ দেনমোহরের টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত— স্ত্রী কোন পুরুষের জন্য বৈধ হয় না। তাই আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বোলেছেন “স্ত্রীদের মোহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান কর। অবশ্য তারা নিজেরা যদি খুশিমনে মোহরের কিছু অংশ মাফ করে দেয়, তবে তা তোমরা সানন্দে গ্রহণ কোরতে পার (সুরা নিসা-৪)। পাঠকগণ, আয়াতটি লক্ষ্য করুন। মোহরানার টাকা অবশ্যই আদায় কোরতে হবে। তারপর স্ত্রী যদি সন্তুষ্টচিত্তে কিছু অংশ ক্ষমা করে দেয় তাহলে গ্রহণ কোরতে পারবে। অথচ আমাদের পুরুষ সমাজ বিশাল অংকের টাকা মোহরানা প্রদানের শর্তে বিয়ে করে কিন্তু পরিশোধ করেন না, বিবাহিত জীবনের শুরুতেই “মোহরানার টাকা মাফ করে দাও” বলে আজীবন স্ত্রীর কাছে ছোট হয়ে থাকে। কারণ যদি কোন কারণে বিয়ে ভেঙ্গে যায় ঐ মোহরানার টাকা তাকে তখন বাধ্য হয়ে পরিশোধ কোরতে হবে, যার সামর্থ্য অনেক সময়ই স্বামীর থাকে না।
বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই রেওয়াজ প্রচলিত আছে যে, পাত্রীকে অবশ্যই পাত্রের চেয়ে বয়সে ছোট হতে হবে। এই ধারণা এসলাম সমর্থন করে না। রসুলাল্লাহর প্রথমা স্ত্রী আম্মা খাদিজা রসুলাল্লাহর চেয়ে বয়সে ১৫ বছরের বড় ছিলেন। আমাদের সমাজে কোন ছেলে যদি বয়সে বড় কাউকে বিয়ে করে তাকে কেউ সহজে মেনে নিতে পারে না। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বোলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ‘আইয়্যিম’ তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দাও (সুরা নূর ৩২)।’ আইয়্যিম বোলতে যে প্রাপ্তবয়ষ্কা নারীর স্বামী নেই বা যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের স্ত্রী নেই, সে কুমারী, অবিবাহিত, তালাকপ্রাপ্ত, বিধবা বা বিপতœীক যাই হোক না কেন। এখানে আল্লাহ কোন বয়সের সীমারেখা দেন নি।
আমাদের সমাজে বিধবা অথবা তালাক প্রাপ্ত মহিলাকেও কেউ বিয়ে কোরতে চায় না, এবং বিধবা তালাকপ্রাপ্ত মহিলা আজীবন কষ্টে দিন পার করেন কিন্তু বিয়ে করেন না, কিন্তু এসলামে এই ধারণা সমর্থন করে না। আমাদের সমাজে কোন বিধবা তালাকপ্রাপ্ত মহিলাকে কেউ বিয়ে কোরলে তার পরিবারের সদস্যরা কিছুতেই মেনে নেয় না। অথচ এসলামে বিধবাদেরকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেওয়া হোয়েছে, বিয়ের জন্য অনেক সময় আপন সন্তানদের মাধ্যমেও প্রস্তাব পাঠানো হোয়েছে। এসলাম কোন পুরুষ বা নারীর নিঃসঙ্গ থাকা সমর্থন করে না। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ অবিবাহিতভাবে থাকলে সমাজে অপরাধ বিস্তারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, পাশাপাশি তারা সমাজের একটি বোঝাতেও পরিণত হয়। বর্তমান সমাজেই এর ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়। এখন সময় এসেছে আমাদের সমাজের প্রচলিত এই ভুল ধারণাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার।
আল্লাহর দেওয়া ন্যায়-নীতিতে পূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ, শান্তিময় জীবনবব্যস্থাকে নির্বাসন দিয়ে দাজ্জাল আজ এমন এক সভ্যতা কায়েম কোরেছে যা পুরো মানবজাতিকেই ভারসাম্যহীন করে ফেলেছে। মানুষ শুধুমাত্র জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবেই চরম অশান্তিতে নেই বরং ব্যক্তি-জীবনেও ভয়াবহ দুর্বিসহ জীবন অতিবাহিত কোরছে।
আল্লাহর দেওয়া বিয়ের ব্যবস্থা ও পারিবারিক জীবনযাপন পদ্ধতি পরিহার করে কোথাও যৌতুকের বিয়ে, কোথাও Live together, কোথাও সমকামীতা, কোথাও বহুবিবাহের নামে যথেচ্ছাচার করা হোচ্ছে। পরিণতিতে সারা দুনিয়াতেই মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন সাংঘাতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হোয়েছে। কিছুদিন আগেও দাদা-দাদী, নানা-নানীরা বার্ধ্যক্যে এসে নাতি, পুতি, সন্তান, প্রতিবেশীদের মধ্যে আনন্দে, গল্পে জীবন অতিবাহিত কোরত, বয়স্ক হিসাবে সকলে তাদের শ্রদ্ধা কোরত, যে কোন খানাপিনা, পোশাক আশাক আগে বয়স্কদের দেওয়া হোত, যে কোন কাজ শুরুর আগে তাদের থেকে দোয়া আশীর্বাদ নেওয়া হোত, ফলে ঐ তারা নিজেদেরকে সম্মানিত বোধ কোরতেন। তারা মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে কান্নার রোল উঠতো, শোকের পরিবেশ বিরাজিত থাকতো অনেকদিন। তার আত্মার মাগফেরাতের জন্য মিলাদ, দরিদ্র মানুষকে আহার করানো ইত্যাদি অনুষ্ঠান হোত।
কিন্তু আজ সর্বত্র বিপরীত চিত্র। সন্তানরা অল্প বয়স থেকে বাবা-মাকে উপেক্ষা কোরতে আরম্ভ করে। পাঠবইয়ের সিলেবাসে কোথাও আদব কায়দা না শেখানোয় নতুন প্রজন্ম হয়ে উঠছে বে-পরোয়া। বৃদ্ধরা এ সমাজে Old fool. যারা আরও আধুনিক তারা বাবা-মাকে নির্বাসন দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম নামের কারাগারে। বৃদ্ধাশ্রম তো পরিবার নয়, সেখানকার কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব থাকতে পারে ভালোবাসা নেই। সরকার এই বৃদ্ধদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে বার্দ্ধক্য ভাতা হিসাবে ২০০/৩০০ টাকা কখনও সখনও দিতে পারে, কিন্তু সেই টাকায় কোন মমতা বা শ্রদ্ধার স্পর্শ থাকে না, তাকে শুধুই অবহেলা।
দরিদ্র বাবা-মাকে ফেলে বহু শিক্ষিত, উপার্যনক্ষম সন্তান যার যার পথ বেছে নিচ্ছে। এমন দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি যে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে ঘর্মাক্তে কলেবরে রিক্সা চালাচ্ছেন একজন সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ আর তার রিক্সায় বসে শীস দিয়ে গান গাইছে নতুন প্রজন্মের ‘শিক্ষিত’ যুবক। জিজ্ঞেস কোরলে জানতে পারবেন ঐ বৃদ্ধেরও আছে জোয়ান ছেলে মেয়ে। এই বৃদ্ধ একদিন সেই ছেলেমেয়েদের অজ্ঞাতেই হয়তো দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন। তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোলবে, বুড়ো মরে বাঁচলো।
আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রত্যাখ্যানের জন্য কী কঠিন মূল্যই না দিয়ে যাচ্ছে মানবজাতি, কিন্তু বুঝতে পারছে না কোথায় তাদের গলদ। এখন সেই গলদ শোধরানোর একটি সুযোগ এসেছে। যামানার এমাম, হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীকে আল্লাহ দয়া করে সেই হারিয়ে যাওয়া এসলামের আকিদা বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মো’জেজা ঘটিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে অচিরেই সেই তওহীদ ভিত্তিক সত্যদীন প্রতষ্ঠিত হোয়ে দুনিয়াকে একটি জান্নাতের বাগানে পরিণত কোরবে।