Monday, October 19, 2015

প্রকৃত ইসলামে নারীর ক্ষমতায়ন

প্রকৃত ইসলামে নারীর ক্ষমতায়ন

 0


রাকীব আল হাসান

আজকের পৃথিবীতে বিভিন্নভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, খুটিয়ে খুটিয়ে ইসলামের ত্র“টি বের কোরে এর বদনাম করা হয়। কিন্তু আজকে যে ইসলামটা দুনিয়াময় চালু আছে, এটা আল্লাহ ও রসুলের (দ:) প্রকৃত ইসলাম নয়। বিগত ১৩০০ বছরের কাল পরিক্রমায় বিকৃত হতে হতে ইসলাম আজ চূড়ান্তভাবে বিকৃত। আর এই চূড়ান্ত বিকৃতির সূত্রপাত ঘটায় ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা ঔপনিবেশিক আমলে। তারা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা কোরে খ্রিস্টান প্রিন্সিপালদের তত্ত্বাবধানে তাদের নিজেদের তৈরি করা একটা বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দেয় এবং জাতির মধ্যে একটি ধর্মব্যবসায়ী আলেম-মোল্লা শ্রেণির উদ্ভব ঘটায়। এই ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা শ্রেণিটি সেই বিকৃত ইসলামটাই মাদ্রাসা থেকে শিখে এসে মসজিদে, মাদ্রাসায়, খানকায়, ওয়াজ নসীহতে সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেয়। এভাবে গত কয়েক শতাব্দী ধরে ব্রিটিশদের তৈরি করা বিকৃত ইসলামটিই এই জাতির মধ্যে চর্চিত হচ্ছে। আজকে যে বিভিন্ন মহল থেকে ইসলামের বদনাম করা হচ্ছে, ইসলামকে পশ্চাদপদ, বর্বর ধর্ম বলে গালি দেওয়া হচ্ছে সেটা এই বিকৃত ইসলামের রূপটিকে দেখেই করা হচ্ছে। যারা গালি দিচ্ছেন তারা প্রকৃত ইসলাম দেখেন নি, তারা তাদের সামনে ইসলাম হিসাবে যেটাকে দেখছেন সেটাকেই গালাগালি করছেন।
সত্যিকার অর্থেই বিকৃত ইসলামের এই ধারক বাহক তথা আলেম মোল্লা শ্রেণির মনোভাব সাংঘাতিক পশ্চাদপদ, বিকৃত। নারীদের ব্যাপারে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি আমরা দেখতে পাই তা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, এটা তাদের নিজস্ব বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার কারণে পশ্চিমা প্রভাবাধীন গণমাধ্যমগুলি বিকৃত ইসলামের কূপমণ্ডূকতার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে যে ইসলাম নারীদের অবরুদ্ধ কোরে রাখে, মানুষের বাক-স্বাধীনতায়, চিন্তার স্বাধীনতায়, চলাফেরার স্বাধীনতায় বিঘœ ঘটায়, তাই যে কোনভাবেই হোক ইসলামের উত্থানকে রোধ করতে হবে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, শাশ্বত ও প্রাকৃতিক দীন। সুতরাং ইসলামের প্রতিটি বিধি-বিধান প্রাকৃতিক, যৌক্তিক ও চিরন্তন। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের সাথে বর্তমানের কূপমণ্ডূক ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে কুক্ষীগত বিকৃত ও বিপরীতমুখী ইসলামের তুলনা করা নিতান্তই বোকামী হবে। ১৩০০বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আল্লাহ রসুলের সেই প্রকৃত ইসলামে নারীদের ক্ষমতায়ন ও বর্তমানে বিকৃত ইসলামের ধ্বজাধারীরা নারীদেরকে কিভাবে গৃহবন্দী কোরে রেখেছে তা তুলে ধরাই আমার আজকের আলোচ্য বিষয়।
বিকৃত ইসলামে নারীদের গৃহবন্দী অবস্থা:
আজকের বিকৃত ইসলামের কূপমণ্ডূক ধর্মজীবী আলেম-মোল্লারা নারীদের ব্যাপারে ইসলামের যে ধারণা প্রচার কোরে থাকে তা প্রকৃত ইসলামের একেবারে বিপরীত। তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের অধীন কোরে রাখার পক্ষে ফতোয়া দিয়ে থাকেন। তারা এটা বুঝতে সক্ষম নয় যে, যার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা বেশি সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে। অযোগ্য পুরুষকে নারীর কর্তা করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত ইসলাম সমর্থন করে না। যেমন একটি প্রতিষ্ঠানে এক হাজার জন কর্মকর্তা, কর্মচারী আছে। সেখানে যদি জ্ঞান, যোগ্যতা, দক্ষতায় কোন নারী অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকে সেখানে সেই নারীকে প্রধান অর্থাৎ নেতৃত্বদানকারী হিসাবে মেনে নিতে বাধা কোথায়? সেই হিসাবে একজন নারী কোন এলাকার রাজনৈতিক প্রশাসকও (এড়াবৎহড়ৎ) হতে পারেন। আজকের বিকৃত ইসলামের ধ্বজাধারীরা ইসলামে পুরুষ ও নারীর অবস্থানকে এমনভাবে ভারসাম্যহীন কোরে ফেলেছে যে তারা নতমস্তক নারীদের গায়ে বোরকা চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের গৃহবন্দী করেছে, অপরদিকে পুরুষকে দিয়েছে স্বৈরশাসকের অধিকার। তারা একবারও ভাবে না যে উম্মতে মোহাম্মদীর নারীরা রসুলের পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করলেন, এই রকম তাবুসদৃশ বোরখা গায়ে চাপিয়ে কি যুদ্ধ করা যায়, ঘোড়ায় চড়া যায়? বর্তমানে নারীর দিকে দৃষ্টিপাত করাকেও মারাত্মক গোনাহের কাজ বলে প্রচার করা হয়। এই সব মনগড়া, বুদ্ধিহীন, জাতিধ্বংসকারী ধারণাকে তারা ইসলামের উপরে চাপিয়ে দিয়েছে এবং এগুলির অনুকূলে হাজার হাজার বই লিখেছে, হাজার হাজার ফতোয়া ও মাসলা মাসায়েল বের করেছে। এই অন্ধত্ব আজ সমগ্র জাতির উপর জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসেছে। তথাকথিত প্রগতিশীলরাও মোল্লা শ্রেণির এইসব মুর্খতাকে অসার প্রমাণ করতে গিয়ে আল্লাহ-রসুলকেই দোষারোপ করছেন। প্রচলিত ইসলামের বোরখা পরিহিতা কিম্ভূতকিমাকার নারীমূর্তি দেখেই তারা ধরে নিয়েছেন যে ইসলাম নারীকে বুঝি এভাবেই অথর্ব, জড়বুদ্ধি, অচল, বিড়ম্বিত করেই রাখতে চায়। তারা নিজেরাও পাশ্চাত্য জড়বাদী ‘সভ্যতা’র প্রভাবে অন্ধ হয়ে আছেন। তাই ইসলামের বিরোধিতা করা তাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান তাদের লুপ্ত হয়ে গেছে। নইলে তারা বুঝতে পারতেন যে – এই ধর্মজীবী, ফতোয়াবাজ মাদ্রাসা শিক্ষিত আলেম মোল্লাদের সঙ্গে আল্লাহ রসুলের ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই, কেবল সম্পর্ক নেই নয়, এই মোল্লারাই ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্র“। তারা যে ইসলামটি বিক্রি কোরে খাচ্ছেন তার প্রতিটি দিক আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলামের বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছে। সত্য ইসলামের নারী কেমন ছিল সেটা তাদের ধারণারও বাইরে।
আজ ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র গলায় সুর মিলিয়ে নারীবাদীরা হিংস্র মুখভঙ্গি প্রদর্শন কোরে বলেন, নারীকে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার দিতে হবে। তারা জানেন না যে প্রকৃতপক্ষে ইসলাম নারীর অধিকার তো দিয়েছেই, তাদেরকে এমন সম্মানিত করেছে যে কোন জীবনব্যবস্থাতে এর ভগ্নাংশও দেওয়া হয় নি, অপরদিকে পশ্চিমা সভ্যতা বিজ্ঞাপনী প্রচারণা ও অশ্লীল সংস্কৃতির দ্বারা নারীদেহকে কর্পোরেট পণ্যে পরিণত করেছে।
প্রকৃত ইসলামে নারীর ক্ষমতায়ন:
যেহেতু উপার্জন করা পুরুষের কাজ, তাই বলা যায় জীবিকার যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েরা দ্বিতীয় সারির সৈনিক। কখনও কখনও যদি অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে গিয়ে জীবিকার লড়াইতে অবতীর্ণ হতে হয় সেটার সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। রসুলাল্লাহর অনেক নারী আসহাব পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় বা পুরুষ সদস্যরা জিহাদে অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ কোরে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন।
এবার আসা যাক সত্যিকার যুদ্ধ-ক্ষেত্রে। রসুলাল্লাহর সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। আনাস (রা:) ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “সেদিন আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা:) এবং উম্মে সুলাইমকে (রা:) দেখেছি, তাঁরা উভয়েই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের গোছা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পিঠে বহন করে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার চলে যেতেন এবং মশক ভরে পানি এনে লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন (বোখারী শরীফ, হাদিস নং ৩৭৬৭)। এখানে কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের সবচাইতে বিপদসঙ্কুল পরিবেশের কথা বলা হয়েছে, বাড়িঘরের স্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা বলা হয় নি। তাছাড়া মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী রুফায়দাহ (রা:)। কোন যোদ্ধাকে যদি রসদ ও এই সেবাগুলি দিয়ে সাহায্য না করা হয় তবে সে কখনও প্রথম লাইনে থেকে যুদ্ধ করতে পারবে না। যে কোন সামরিক বাহিনীর কাছে জিজ্ঞাস করে দেখতে পারেন এই কাজের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু এটুকুই না, যুদ্ধে এমন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন মেয়েদেরকেও অস্ত্র হাতে নিতে হয়, সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে হয় [সংসার সমরাঙ্গণেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নারীকেও প্রথম সারিতে অর্থাৎ উপার্জন ও পরিবার ভরণপোষণের কাজে নামতে হবে]। যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে যেন মেয়েরা এগিয়ে আসতে পারে এবং পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমানভাবে যুদ্ধ কোরে যেতে পারে সে সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। তার প্রমাণ ইতিহাস। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, বহু সাহাবী শহীদ হয়ে যান, স্বয়ং রসুলাল্লাহ মারাত্মকভাবে আহত হন, কাফেররা প্রচার কোরে দেয় যে, রসুলাল্লাহও শহীদ হয়ে গেছেন এমনই বিপজ্জনক মুহূর্তে মেয়েরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবী উম্মে আম্মারার (রা:) ভূমিকা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। এ সম্পর্কে রসুলাল্লাহর (সাঃ) উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাহকেই লড়াই করতে দেখেছি।’ তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন তা নজিরবিহীন। এক শত্র“ সৈন্যের তরবারির কোপ পড়ল তার মাথায়। তিনি ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করলেন। তিনি আঘাত করলেন তার ঘোড়ার পায়ের উপর। অশ্ব ও অশ্বারোহী দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। মহানবী এই দৃশ্য দেখে তার পুত্র আব্দুল্লাহকে (রাঃ) সাহায্যের নির্দেশ দিলেন। তিনি পতিত সৈন্যকে শেষ করলেন। এলো অন্য এক শত্র“। সে আঘাত হানলো আব্দুল্লাহর (রাঃ) বাম বাহুতে। মা পুত্রের ক্ষতস্থান বেঁধে দিলেন। আর ছেলেকে আমৃত্যু লড়াই করার জন্য উদ্দীপ্ত করলেন। এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘হে উম্মে আম্মারাহ! তোমার মধ্যে যে শক্তি আছে, তা আর কার মধ্যে থাকবে?’
নবী করিম (সা:) নিজ হাতে সেদিন এই বীরাঙ্গণার ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁর কাঁধ থেকে গল গল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। বেশ কয়েকজন বীর সৈনিকের নাম উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘আল্লাহর কসম! আজ তাদের সবার চেয়ে উম্মে আম্মারাহ বেশি বীরত্ব দেখিয়েছেন। এর অনেক পরে ইয়ারমুকের যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালীদের অন্যতম এক বাহু দেরার বিন আজওয়ার যখন শত্র“র হাতে আটকা পড়েন তখন তারই আপন ভগ্নী খাওলা ঘোড়ায় চড়ে এমন লড়াই শুরু করেন যে স্বয়ং সেনাপ্রধান খালিদ (রাঃ) বার বার জিজ্ঞেস করেন, “কে এই বীর?” খাওলা শত্র“ শিবিরে আক্রমণ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তার ভাইকে উদ্ধার করেই ছাড়েন। পাঠক, এমন অসংখ্য উদাহরণের মধ্য থেকে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করলাম, আশা করি সত্যপ্রিয় পাঠকের বোঝার জন্য এ ক’টিই যথেষ্ট হবে যে, রসুলাল্লাহর সময়ে নারীরা প্রথম সারির ভূমিকাও কিভাবে পালন করেছেন। মাসলা মাসায়েলের জটিল জাল বিস্তার কোরে কোনকাজেই তাদের অংশগ্রহণের বাধা সৃষ্টি করা হয় নি।
একটি জাতির প্রায় অর্ধাংশই নারী। জাতির অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অচল কোরে রাখা আর এক পায়ে হাঁটার চেষ্টা করা একই কথা। সেই জাতির কোনদিনই উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের একটি সুন্দর সমন্বয় সাধন করেছে। নারীর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতাকে ইসলাম মোটেও অস্বীকার করে না। যদি অবস্থার প্রেক্ষাপটে কোন নারীকে দ্বিতীয় সারি থেকে প্রথম সারিতে আসতে হয় এবং সেখানে তিনি যদি তার জ্ঞান, প্রতিভা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সামর্থ্যবলে নেতৃত্বদানের উপযুক্ত বলে সাব্যস্ত হন, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তিনি বহু পুরুষের উপরও নেত্রী হিসাবে নিয়োজিত হতে পারবেন। প্রকৃত ইসলামের দৃষ্টিতে নারী হওয়া নেতৃত্বলাভের ক্ষেত্রে কোন অযোগ্যতা নয়। ইসলামের ইতিহাসের একটি দুঃখজনক অধ্যায় উটের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:)। বহু সাহাবী তাঁর অধীনে থেকে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ঐতিহাসিকরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম” বলে তখন তাঁর পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধরত কোন সাহাবী ফতোয়া দিয়েছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এই কথাটি আবিষ্কার করেছেন বিকৃত আকিদার মোল্লারা যারা উম্মাহর মূল কাজ, তাকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অন্ধ।
মূল কথা হচ্ছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিপদসঙ্কুল এবং সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পুরুষ সাহাবীদের পাশাপাশি নারী সাহাবীরা অংশ নিয়েছেন, সেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য কাজে যে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা কখনই পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। তারা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ যে কোন ভূমিকা রাখতে পারতেন। কেবল একটি মাত্র পদ নারীকে দেওয়া বৈধ নয়, সেটি হলো- উম্মতে মোহাম্মদী নামের যে মহাজাতিটি সৃষ্টি হবে সেই জাতির এমামের পদ। আল্লাহ নারী ও পুরুষের দেহ ও আত্মার স্রষ্টা, সচেতন মন ও অবচেতন মনের স্রষ্টা। এদের উভয়ের দুর্বলতা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন মহান আল্লাহ। তিনি জানেন যে নারীর শারীরিক গঠন যেমন পুরুষের তুলনায় কোমল, তার হৃদয়ও পুরুষের তুলনায় কোমল, আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল। সহজেই তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে, তার স্থৈর্য, দূরদর্শীতা পুরুষের চেয়ে কম, তাকে প্রভাবিত করা সহজতর। ইবলিস নারীকেই প্রথম আল্লাহর হুকুম থেকে বিচলিত করেছিল। এ কারণেই আল্লাহর অগণ্য নবী-রসুলের মধ্যে একজনও নারী নেই। সুতরাং পৃথিবীময় উম্মতে মোহাম্মদী নামক যে মহাজাতি হবে সেই মহাজাতির এমাম কেবল নারী হতে পারবেন না, স্বীয় যোগ্যতাবলে অন্যান্য যে কোন পর্যায়ের আমীর বা নেতা সে হতে পারবে। শুধু নারী হওয়ার কারণে কেউ নেতৃত্ব দিতে পারবে না এটা ইসলামের দৃষ্টিতে যোগ্যতা অযোগ্যতার মাপকাঠি নয়।
[পাঠক মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ: ০১৯৩৩৭৬৭৭২৫]

নামাজ পড়বো কার পেছনে?

নামাজ পড়বো কার পেছনে?

 0
17711_1015000891858074_2291631612132971591_nমোহাম্মদ আসাদ আলী:
সালাহ (নামাজ) হোল উম্মতে মোহাম্মদীর চরিত্র গঠনের ছাঁচ। যে মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে উম্মতে মোহাম্মদী নিজেদেরকে কঠিন সংগ্রামে আত্মনিয়োগ কোরবে সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কোরতে হোলে যথাযথ চরিত্রেরও প্রয়োজন আছে। সেই চরিত্র অর্জনের প্রশিক্ষণই হোল সালাহ (নামাজ)। সালাহই জাতিকে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের অনুপম শিক্ষা দেয়। তবে সালাহর উপকারিতা বর্ণনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার আজকের আলোচ্য বিষয় হোল- মো’মেনরা সালাহ (নামাজ) কায়েম কোরবে কার পেছনে তা নিরূপন করা। এটা বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
একজন এমাম (নেতা) ছাড়া সালাহ (নামাজ) হয় না। সালাতে একজন এমামের পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে রুকু, সাজদা, এতেদাল কোরতে হয় অর্থাৎ এমামের অনুসরণ কোরতে হয়। এমাম রুকুতে গেলে মুসল্লিকেও বাধ্যতামূলকভাবে রুকুতে যেতে হয়, এমাম সেজদা কোরলে মুসল্লিদেরও সেজদা কোরতে হয়। কেউ এমামের অনুসরণ না কোরলে তার সালাহ পণ্ড হোয়ে যায়। অর্থাৎ স¤পূর্ণ সালাহ চলাকালীন সময়ে মুসল্লি এমামের অনুসরণ করেন। এখান থেকে মুসল্লিরা আনুগত্যের শিক্ষা গ্রহণ করেন। বাস্তব জীবনেও যাতে এমাম বা নেতা (যার অধীনে সালাহ কায়েম করা হোল) যে আদেশ দেন তার অবাধ্যতা না কোরে এমামের প্রতিটি হুকুমের আনুগত্য কোরতে পারেন তার শিক্ষা গ্রহণ করেন। এখন প্রশ্ন হোল- যে এমামের নেতৃত্বে সালাহ কায়েম করা হোল তিনি কি আসলেই অনুসৃত হবার যোগ্যতা রাখেন? প্রশ্নটি আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার। সালাহতে আমরা যার আনুগত্য কোরব, বাস্তব জীবনে যে মানুষটির নির্দেশ মেনে চোলতে চেষ্টা কোরব সেই মানুষটির চরিত্র কেমন হওয়া দরকার? অবশ্যই তাকে হোতে হবে শান্তির দূত। তিনি চাইবেন সমাজে যাতে কোন হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, মারামারি এক কথায় অনৈক্য না থাকে। ধর্ম-বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে মানুষ একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস কোরতে পারে। তিনি কোনো বিভক্তিকে প্রশ্রয় দেবেন না। তিনি কোনো পার্থিব স্বার্থের বশবর্তী হোয়ে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত কোরবেন না। সবচেয়ে বড় কথা হোল, তিনি তার কাজের কোন বিনিময় নেবেন না। তিনি সালাহর (নামাজের) এমামতি কোরবেন জাতি গঠনের মহান ব্রত নিয়ে, এর বিনিময় তিনি একমাত্র স্রষ্টার কাছেই পাওয়ার আশা কোরবেন। মহান রব্বুল আলামিনও মোমেনদেরকে কেমন নেতার (এমামের) অনুসরণ কোরতে হবে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বোলেছেন- অনুসরণ কর তাদের (এমাম) যারা বিনিময় চায় না এবং সঠিক পথপ্রাপ্ত (কোর’আন-সুরা আল ইয়াসীন-২১)।
এবারে আসা যাক উপরোক্ত আয়াতের আলোকে আমাদের বর্তমান সমাজে। যারা দীনের বিনিময় গ্রহণ করে তাদের অনুসরণ কোরতে আল্লাহ নিষেধ কোরেছেন। সে ক্ষেত্রে যারা নামাজ পড়িয়ে, মিলাদ পড়িয়ে, ওয়াজ কোরে ইত্যাদিভাবে অর্থ উপার্জন কোরছে তাদের অনুসরণ করা এবং তাদের এমামতিতে সালাহ কায়েম করা কতটুকু যৌক্তিক? শুধু যে যৌক্তিক নয় তাই নয়, সেটা হবে সরাসরি আল্লাহর হুকুমের বরখেলাপ। অথচ এখন সেটাই করা হোচ্ছে। প্রকৃত এসলামের যুগে রসুলাল্লাহর সময় এবং তৎপরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদুনের সময় কেউ নামাজ পড়িয়ে বা অন্যান্য দীনের কাজ কোরে বিনিময় নিয়েছেন এমন নজির কেউ দেখাতে পারবেন না। এর কোন পার্থিব বিনিময় হয় না। এর বিনিময় (পুরস্কার) আছে স্রষ্টার কাছে। তবে তার জন্য পৃথিবীতে এই কাজ হোতে হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। যারা পার্থিব স্বার্থ আদায় কোরবে তাদের অনুসরণ কোরতে আল্লাহই নিষেধ কোরেছেন। কিন্তু আল্লাহর স্পষ্ট নিষেধবাণী সত্ত্বেও আজকে মোসলেম নামধারী জাতিটি ধর্মের বিনিময় গ্রহণকারীর অনুসরণ কোরছে। তাদের পেছনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাহ কায়েম কোরছে, জুমা পড়ছে, তারাবীহ পড়ছে। এটা সরাসরি আল্লাহর হুকুম অমান্য করা।
আবার আল্লাহ যে সঠিক পথপ্রাপ্তদের (হেদায়াহপ্রাপ্ত) অনুসরণ কোরতে নির্দেশ দিয়েছেন তারও বরখেলাপ হোচ্ছে। ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা-মাওলানারা মোটেও সঠিকপথের পথিক নয়। শুধু তাই নয়, তারাই মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত কোরে রেখেছে তাদের ব্যক্তিস্বার্থের খাতিরে। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ তাদেরকে শ্রদ্ধা করে, তাদেরকে নবীর উত্তরসূরি হিসেবে জ্ঞান করে। আর এই সুযোগে তারা এই মানুষগুলোকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করছে। সাধারণ মানুষকে ওয়াজ কোরে, বক্তৃতা দিয়ে উত্তেজিত কোরে তাদেরকে হানাহানি, রক্তপাত ও নৈরাজ্যের পথে ধাবিত কোরছে।
তাদের এই ভুলগুলোই ধরিয়ে দিয়ে যামানার এমাম, এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী তাদেরকে সত্য পথের দিকে আহ্বান করেন। কিন্তু এতে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে। তারা ধর্মব্যবসা বিলুপ্ত হবার আশঙ্কা থেকে এমামুয্যামান ও তাঁর অনুসারীদের বিরোধিতা শুরু করে। তাঁকে খ্রিস্টান, কাফের, নাস্তিক আখ্যা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ সানুষকে উত্তেজিত কোরে তোলে। অর্থাৎ, এই ধর্মব্যবাসায়ী শ্রেণিটির ধর্মব্যবসা পরিত্যাগ করার কোন মানসিকতাই নেই। সুতরাং এদের অনুসরণ করা এবং এদের পেছনে নামাজ পড়া কোন যুক্তিতেই টিকে না।
আর তাই এমামুয্যামানের অনুসারী হেযবুত তওহীদের মো’মেন মোজাহেদ-মোজাহেদারা প্রচলিত মসজিদে গিয়ে অন্যান্যদের মতো ধর্মব্যবসায়ী মোল্লাদের পেছনে সালাহ কায়েম করেন না। তারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাহ, জুমার সালাহ, তারাবীহর সালাহ ও ঈদের সালাহ পড়েন নিজেরা নিজেরা জামায়াতবদ্ধ হোয়ে। জুমার সালাতে পুরুষদের পেছনে নারীরাও অংশগ্রহণ করেন। যিনি এমামতি করেন তিনি কোন পার্থিব স্বার্থের জন্য করেন না, বরং তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও আনুগত্যশীল জাতি গঠনের লক্ষ্যেই এমামতি করেন, খুতবা দেন। যামানার এমামের অনুসারীদের জুমা ধর্মব্যবসায়ীদের মতো প্রাণহীন নয়, প্রাণোচ্ছল জুমা। সে জুমায় সকল স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ কোরতে পারেন। ১৩০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদীর সেই জুমা, সেই সালাহ আবার শুরু হোয়েছে। আসুন, আমরা ধর্মব্যবসায়ীদের প্রত্যাখ্যান কোরি এবং তাদের আনুগত্য না কোরি কারণ, যারা বিনিময় নেয় তাদের আনুগত্য করা আল্লাহর সরাসরি নিষেধ (সুরা আল ইয়াসীন-২১)।

এসলামের প্রকৃত সালাহ্ (নামাজ)

এসলামের প্রকৃত সালাহ্ (নামাজ)

 0

Untitled-1-229x300এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী

আল্লাহর দেয়া মানুষের জন্য জীবন বিধানে সালাতের গুরুত্ব ও মূল্য অত্যন্ত অধিক৷ তাঁর কোরানে আল্লাহ আশি বারেরও বেশী সালাহ্-কে উল্লেখ কোরেছেন, সালাহ্ কায়েম কোরতে বোলেছেন৷ আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ, লক্ষ লক্ষ বিরাট বিরাট সুদৃশ্য মসজিদে দিনে পাঁচবার একত্রিত হয় সালাহ্ কায়েম কোরতে, আল্লাহর আদেশ পালন কোরতে৷ কিন্তু আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে মো’মেনদের সালাহ্ কায়েম কোরতে আদেশ কোরেছেন সে উদ্দেশ্য সাধিত হোচ্ছে না৷ একশ’ পঞ্চাশ কোটির এই জাতিটি, যে জাতিটি নিজেদের মো’মেন, মোসলেম ও উম্মতে মোহাম্মদী বোলে বিশ্বাস করে, এই জাতিটি আজ পৃথিবীর অন্য সব জাতি দ্বারা পরাজিত লান্ছিত, অপমানিত, নিগৃহিত৷ আল্লাহর রসুল পৃথিবী থেকে চলে যাবার সময় তাঁর গড়া এ জাতিটি সংখ্যায় ছিলো পাঁচ লাখের মত৷ এটা ইতিহাস যে আল্লাহর রসুল চলে যাবার পর ৬০/৭০ বছরের মধ্যে ঐ ছোট্ট জাতিটি, একটি একটি কোরে নয়, এক সঙ্গে তদানিন্তন পৃথিবীর দু’টি বিশ্বশক্তিকে আক্রমণ কোরে তাদের সামরিকভাবে পরাজিত কোরে অর্দ্ধেক পৃথিবীতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা কোরেছিলো৷ সেই পাঁচলাখের জাতিটাও সালাহ্ কায়েম করতো, আজ একশ’ পঞ্চাশ কোটির এই জাতিটাও সালাহ্ কায়েম করে, অন্তত করে বোলে বিশ্বাস করে৷ তাহোলে সেই একই কাজ কোরে, আল্লাহর একই আদেশ পালন কোরে সেই পাঁচ লাখের প্রায় নিরক্ষর, চরম দরিদ্র জাতি বিশ্বজয় করলো আর বর্ত্তমানের একশ’ পঞ্চাশ কোটির জাতি, তাদের মধ্যে বহু উচ্চ শিক্ষিত, আলেম, পীর মোরশেদ থাকা সত্ত্বেও, বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের একটা বিরাট অংশের মালিক হওয়া সত্ত্বেও আজ বিশ্বের সমস্ত জাতি দ্বারা পরাজিত, নিগৃহিত৷ একই কাজ কোরে আল্লাহর একই আদেশ পালন কোরে পরিণতি, ফল শুধু আকাশ পাতাল নয়, একেবারে উল্টো কেন?
এই ‘কেন’র জবাব দেবার আমি চেষ্টা কোরছি-
তার আগে নামায শব্দটা ব্যবহার না কোরে সালাহ্ শব্দ কেন ব্যবহার কোরছি তা বোলে নেয়া দরকার৷ এ উপমহাদেশে সালাতের বদলে নামায শব্দটা ব্যবহারে আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে সালাহ্ বোললে অনেকে বুঝিই না সালাহ্ কি৷ কোরানে কোথাও নামায শব্দটা নেই কারণ কোরান আরবী ভাষায় আর নামায পার্শি অর্থাত্‍ ইরানী ভাষা৷ শুধু ঐ নামায নয় আরও অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার কোরি যা কোরানে নেই৷ যেমন খোদা, রোযা, বেহেশত, দোযখ, ফেরেশতা, জায়নামায, মুসলমান, পয়গম্বর ইত্যাদি৷ এই ব্যবহার মোসলেম দুনিয়ায় শুধু ইরানে এবং আমাদের এই উপমহাদেশে ছাড়া আর কোথাও নেই৷ এর কারণ আছে৷ কারণটা হোল- ইরান দেশটি সমস্তটাই অগি্ন-উপাসক ছিলো৷ আল্লাহর নবীর সুন্নাহ পালনের জন্য উম্মতে মোহাম্মদী যখন ইরানকে তিন শর্ত্তের একটি মেনে নেয়ার আমন্ত্রণ দিলো তখন ইরান পৃথিবীর দুই বিশ্বশক্তির একটি; অন্যটি খ্রীস্টান রোমান৷ ঐ তিন শর্ত্ত হোল-
১) আল্লাহর রসুল সত্য দীন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন- এই দীন মেনে নিয়ে মোসলেম হোয়ে যাও, তাহোলে তোমরা আমাদের ভাই হোয়ে যাবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল এই দীনকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার যে দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পণ কোরেছেন, সে দায়িত্ব তোমাদের ওপরও বর্ত্তাবে৷ ২) যদি তা গ্রহণ না করো তবে আমাদের বশ্যতা স্বীকার করো, আমরা আল্লাহর দেয়া দীন, কোরআনের আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু কোরবো; তোমরা যার যার ধর্মে থাকবে, আমরা বাধাতো দেবই না বরং সর্বপ্রকারে তোমাদের এবং তোমাদের ধর্মকে নিরাপত্তা দেব; বিনিময়ে তোমাদের যুদ্ধক্ষম লোকেরা বার্ষিক সামান্য একটা কর দেবে, যার নাম জিজিয়া৷ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, স্ত্রীলোক, রোগগ্রস্ত মানুষ এবং বালক-বালিকা, শিশুগণকে এ কর দিতে হবে না৷ এর পরও তোমাদের রক্ষার জন্য যুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে যেসব যুদ্ধক্ষম লোক আমাদের পক্ষ হোয়ে যুদ্ধ কোরবে তাদের ঐ জিজিয়া দিতে হবে না৷ ৩) যদি এই দুই শর্ত্তের কোনটাই না মেনে নাও তবে যুদ্ধ ছাড়া আর পথ নেই৷ আমরা তোমাদের আক্রমণ কোরে পরাজিত কোরে আল্লাহর দীন, জীবন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কোরবো৷
এটা ইতিহাস যে প্রচণ্ড শক্তিশালী, অন্যতম বিশ্বশক্তি ইরান অবজ্ঞাভরে ঐ প্রথম দুই শর্ত্ত উপেক্ষা কোরে তৃতীয় শর্ত্ত যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিলো ও অল্প সময়ের মধ্যে ঐ ছোট্ট উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হোয়ে গিয়েছিলো৷ পরাজিত হবার পর প্রায় সমস্ত ইরানী জাতিটি অল্প সময়ের মধ্যে পাইকারী ভাবে দীন এসলাম গ্রহণ কোরে মোসলেম হোয়ে গিয়েছিলো৷ এই ঢালাও ভাবে মোসলেম হোয়ে যাবার ফলে তারা এসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি তা পূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হোল না অর্থাত্‍ তাদের আকীদা সঠিক হোল না৷ তারা এসলামে প্রবেশ করলো কিন্তু তাদের অগি্ন-উপাসনার অর্থাত্‍ আগুন পূজার সময়ের বেশ কিছু বিষয় সঙ্গে নিয়ে এসলামে প্রবেশ কোরলো৷ আগুন উপাসনাকে তারা নামায পড়া বলতো, সালাহ্-কে তারা নামায বোলতে শুরু কোরলো, তাদের অগি্ন-উপাসনার ধর্মে উপবাস ছিলো, তারা সাওমকে রোযা অর্থাত্‍ উপবাস বোলতে লাগলো, মোসলেমকে তারা পার্শি ভাষায় মুসলমান, নবী-রসুলদের পয়গম্বর, জান্নাহ-কে বেহেশত, জাহান্নামকে দোযখ, মালায়েকদের ফেরেশতা এমন কি মহান আল্লাহর নাম পর্যন্ত পরিবর্ত্তন করে খোদা ইত্যাদিতে ভাষান্তর কোরে ফেললো৷ শুধু যে সব ব্যাপার আগুন পূজার ধর্মে ছিলো না, সেগুলি স্বভাবতই আরবী শব্দেই রোয়ে গেল; যেমন যাকাহ, হজ্ব ইত্যাদি৷ তারপর মোসলেম জাতি যখন ভারতে প্রবেশ কোরে এখানে রাজত্ব কোরতে শুরু কোরলো তখন যেহেতু তাদের ভাষা পার্শি ছিলো সেহেতু এই উপমহাদেশে ঐ পার্শি শব্দগুলির প্রচলন হোয়ে গেলো৷ এক কথায় বলা যায় যে, আরবের এসলাম পারস্য দেশের ভেতর দিয়ে ভারতে, এই উপমহাদেশে আসার পথে পার্শি ধর্ম, কৃষ্টি ও ভাষার রং-এ রং বদলিয়ে রঙ্গীন হোয়ে এলো৷
ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম:- অগি্ন-উপাসক ইরান না হোয়ে যদি মুর্ত্তিপূজক হিন্দু ভারত উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হোয়ে এসলাম ভালো কোরে না বুঝেই ব্যাপকভাবে, ঢালাওভাবে এই দীনে প্রবেশ কোরতো তবে তারা সালাহ্-কে পূজা বা উপাসনা, সাওমকে উপবাস, নবী-রসুলকে অবতার, জান্নাহ-কে স্বর্গ, জাহান্নামকে নরক, মালায়েকদের দেবদূত, দেবতা, আল্লাহকে ভগবান বা ঈশ্বর ইত্যাদি চালু কোরে ফেলতো এবং আমরা যেমন এখন নামায, রোযা, বেহেশত, দোযখ, পয়গম্বর, ফেরেশতা, খোদা শব্দগুলি ব্যবহার কোরি তেমন কোরে ঐ ভারতীয় শব্দগুলি ব্যবহার কোরতে অভ্যস্ত হোয়ে যেতাম৷
আমরা হেয্বুত তওহীদ এই পার্শি শব্দগুলির ব্যবহার ত্যাগ কোরে আল্লাহ কোরানে যে শব্দগুলি ব্যবহার কোরেছেন সেই শব্দগুলি আবার চালু করার চেষ্টা কোরছি৷ মহান আল্লাহ পবিত্র কোর্আনে সতর্ক করে বোলে দিয়েছেন যে, আল্লাহর আছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা তাঁকে সে নামেই ডাক, যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন কোরবে (সুরা আরাফ- ১৮০) তাই খোদা শব্দের বদলে আল্লাহ, নামাযের বদলে সালাহ্ এবং রোযার বদলে সাওম শব্দের আমাদের এই ব্যবহার৷
মহান আল্লাহ এই মহাসৃষ্টির বিশাল থেকে ক্ষুুদ্রতম যা কিছু সৃষ্টি কোরেছেন তাঁর প্রত্যেকটারই কোন না কোন উদ্দেশ্য আছে; উদ্দেশ্যহীন একটি অণু বা পরমাণুও তিনি সৃষ্টি করেন নাই৷ তেমনি, তিনি মানব জাতিকে যা কিছু আদেশ-নিষেধ কোরেছেন তারও প্রত্যেকটিরই কোন না কোন উদ্দেশ্য আছে, উদ্দেশ্যহীন একটি ক্ষুদ্রতম আদেশও দেন নাই, কারণ তিনি সোবহান; নিখুঁত, ত্রুটিহীন৷ যিনি ক্ষুদ্রতম আদেশও উদ্দেশ্যহীন ভাবে দেবেন না তিনি যে সালাতের আদেশ আশীবারেরও বেশী দিয়েছেন তা কি উদ্দেশ্যহীন হোতে পারে? অবশ্যই নয়৷ এবং শুধু যে উদ্দেশ্যহীন নয় তাই নয়; যেহেতু তিনি এ আদেশ এতবার দিয়েছেন সেহেতু এ আদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷
তাহোলে সালাতের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব কী?
এসলামে সালাতের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব এত বড় যে তা বোঝাবার জন্য আমাকে আল্লাহর খলিফা অর্থাত্‍ মানুষ সৃষ্টির অধ্যায় থেকে শুরু কোরতে হবে- যদিও খুব সংক্ষেপে৷
এই মহাবিশ্ব, অগণিত ছায়াপথ, নীহারিকা, সূর্য, চন্দ্র, তারা ও এগুলো সুশৃংখলভাবে পরিচালনা করার জন্য অসংখ্য মালায়েক সৃষ্টি করার পর আল্লাহর ইচ্ছা হোল এমন একটি সৃষ্টি করার যার মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি থাকবে৷ তাই তিনি নিজ হাতে সৃষ্টি কোরলেন আদম (আঃ) আর হাওয়াকে৷ আদমের (আঃ) মধ্যে আল্লাহ তাঁর নিজ রূহ্ থেকে ফুঁকে দিলেন (কোরান- সুরা হেজর ২৯) তাঁর নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসহ সব গুণাবলি৷ নাম দিলেন আল্লাহর প্রতিনিধি- খলিফাতুল্লাহ৷ তারপর আদম ও হাওয়ার (আঃ) দেহের ভেতরে প্রবেশ কোরে তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনায় প্রভাব ফেলার শক্তি দিলেন এবলিসকে আদম-হাওয়াকে পরীক্ষার জন্য (কোরান- সুরা নেসা ১১৯)৷ আদমের (আঃ) কারণে আল্লাহর সানি্নধ্য থেকে বিতাড়িত হোয়ে এবলিস আল্লাহকে বোলল যে তোমার এই খলিফাকে দিয়ে আমি তোমাকে অস্বীকার করাবো৷ জবাবে আল্লাহ বোললেন- আমি যুগে যুগে নবী-রসুল পাঠিয়ে বনী আদমকে হেদায়াহ সঠিক দিক নির্দেশনা অর্থাত্‍ সেরাতুল মুস্তাকীম দান কোরব৷ যারা এই সেরাতুল মুস্তাকীমের ওপর দৃঢ় থাকবে তুমি তাদের বিপথে চালনা কোরতে পারবে না, তারা হেদায়াতে থাকবে, তাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা কোরে আমি তাদের জান্নাতে দেব৷ জবাবে এবলিস বোলল- তুমি তোমার খলিফাকে যে সেরাতুল মুস্তাকীম দেবে তার সম্মুখে, পেছনে, ডানে, বামে আমি ওঁত্‍ পেতে বোসে থাকবো (আর তাদের সে পথ থেকে ছিনিয়ে নেবো); আর দেখবে যে তাদের অধিকাংশ অকৃতজ্ঞ (অর্থাত্‍ অধিকাংশই আমি ছিনিয়ে নেব)৷ এর উত্তরে আল্লাহ বোললেন তোমাকে এবং যাদের তুমি সেরাতুল মুস্তাকীম থেকে ছিনিয়ে নেবে তাদের দিয়ে আমি জাহান্নাম ভর্ত্তি কোরবো (সুরা আ’রাফ- ১৭,১৮)৷ এখানে বলা প্রয়োজন এই সেরাতুল মুস্তাকীম কী? দেখা যাচ্ছে আল্লাহর সাথে এবলিসের চ্যালেঞ্জটা সালাহ্ (নামাজ), সওম (রোযা), হজ্ব, যাকাত বা চুরি ডাকাতি, ব্যাভিচার, খুন নিয়ে নয়, চ্যালেঞ্জটা এই সেরাতুল মুস্তাকীমটাকেই নিয়ে৷
এই সেরাতুল মুস্তাকিম হোচ্ছে তওহীদ- লা এলাহা এল্লা আল্লাহ৷ (কোরান- সুরা ইয়াসিন- ৬১ ও কোরানের বিভিন্ন স্থানে)৷ কিন্তু আল্লাহ যে লা-এলাহা ইল্লাল্লাহর কথা বোলেছেন তা বর্ত্তমানে পৃথিবীতে প্রচলিত লা-এলাহা এল্লা আল্লাহ নয়৷ বর্ত্তমানে মোসলেম জগতের সকলেই লা এলাহা এল্লা আল্লাহ-এ বিশ্বাস করে, কিন্তু তারা সেরাতুল মুসতাকীমে, সহজ-সরল পথে নেই৷ কারণ প্রকৃত তওহীদ অর্থাত্‍ লা-এলাহা এল্লা আল্লাহ হোচ্ছে আল্লাহকে ছাড়া আর সমস্ত রকম ক্ষমতাকে অস্বীকার করা; এবং এই অস্বীকার জীবনের সর্বক্ষেত্রে, সর্ব অঙ্গনে৷ এক কথায় যে কোন বিষয়ে, যে কোন প্রশ্নে, যেখানে আল্লাহ বা তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য আছে সেখানে আর কারো কথা, আদেশ, নিষেধ, নির্দেশ অগ্রাহ্য করা (সুরা আহযাব- ৩৬); হোক সেটা ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সমাজ-ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য৷ এখানে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের সঙ্গে রসুলকেও অঙ্গীভূত কোরছি এই কারণে যে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ হাতে-কলমে কার্যকরী কোরে দেখানোর দায়িত্ব তাঁর রসুলের এবং তিনি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ, নির্দেশের বাইরে কিছুই করেন না, কিছুই বলেন না (কোরান সুরা নজম-৩-৪)৷ এই হোল এসলামের _ সেরাতুল মুস্তাকীম৷ বর্ত্তমানে অন্য জাতিগুলির তো কথাই নেই- মোসলেম হবার দাবীদার এই একশ’ পঞ্চাশ কোটির জাতির মধ্যেও কোথাও নেই এবং তাদের মধ্যে এ বোধ ও উপলব্ধিও নেই যে তওহীদ না থাকার অর্থই হোচ্ছে শেরক ও কুফর এবং তওহীদহীন কোন এবাদত আল্লাহ কবুল করেন না৷ যে বিষয়ে আল্লাহ বা তাঁর রসুলের কোন নির্দেশ আছে সেটা যত ছোট, যত সামান্যই হোক সে বিষয়ে অন্য কারো নির্দেশ, ব্যবস্থা গ্রহণ মানেই শেরক, অংশীবাদ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও স্বীকার করা৷
শুরু হোল বিশাল খেলা, বিরাট পরীক্ষা৷ আল্লাহ তাঁর কথামত যুগে যুগে প্রতি জনপদে পাঠাতে লাগলেন তাঁর নবী-রসুলদের সেরাতুল মুস্তাকীম দিয়ে, অর্থাত্‍ তওহীদ দিয়ে৷
আল্লাহ নবী-রসুলদের মাধ্যমে বনি-আদম, মানুষকে আরও জানিয়ে দিলেন যে, যে বা যারা ঐ সেরাতুল মুস্তাকীমে অর্থাত্‍ তওহীদের ওপর অটল থাকবে জীবনের কোন অঙ্গনে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে মানবে না, স্বীকার কোরবেনা তাদের তিনি সমস্ত অপরাধ, পাপ, গোনাহ মাফ কোরে জান্নাতে স্থান দেবেন চিরকালের জন্য (কোরান- সুরা যুমার- ৫৩)৷ আর যে বা যারা জীবনের যে কোন অঙ্গনে, যে কোন বিষয়ে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অস্বীকার কোরে অন্য কোন শক্তি বা নিজেদের তৈরী আদেশ-নিষেধকে মেনে নেবে তারা জীবনে যত পুণ্য, যত সওয়াবই করুক, যত ভালো কাজই করুক আল্লাহ তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ কোরবেন চিরকালের জন্য (সুরা মায়েদা- ৭২, সুরা নেসা- ৪৮, বোখারী, মোসলেম, তিরমিযি)৷

মানবতার মুক্তির জন্য পৃথিবীর বুকে আবার এসেছে- তওহীদের বালাগ

মানবতার মুক্তির জন্য পৃথিবীর বুকে আবার এসেছে- তওহীদের বালাগ

 0
Tawheeder-balag1
আল্লাহ আদম (আ:) থেকে শুরু করে শেষ নবী মোহাম্মদ (দ:) পর্যন্ত যত নবী ও রসুল পৃথিবীর বিভিন্ন মানব সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করেছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি একটি অভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা হোল বালাগ। নবী ও রসুলগণ প্রত্যেকে তাঁদের স্ব স্ব সম্প্রদায়কে বলেছেন, “আমাদের দায়িত্ব তো কেবলমাত্র সুস্পষ্টভাবে সংবাদ পৌঁছে দেয়া” (সূরা ইয়াসীন ১৭)। এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন “বালাগুল মুবীন” যার অর্থ সুস্পষ্টভাবে পৌঁছানো। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন কিছুর সংবাদ পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দেওয়াই ছিল নবী-রসুলদের একমাত্র কাজ, কে সেটা গ্রহণ করবে আর কে প্রত্যাখ্যান করবে সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়, সেটা আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।
এসলামের বালাগ কাদের প্রতি:
মক্কার ১৩ বছরের জীবনে রসুলাল্লাহ ও তাঁর সঙ্গীরা কাফের মোশরেকদেরকে সালাহ, সওম ইত্যাদি কোন আমলের দিকে আহ্বান করেন নি, তাঁরা আহ্বান করেছেন কেবলমাত্র কলেমার দিকে, তওহীদের দিকে। অনেকে মনে করেন মক্কার সেই কাফেরদের আল্লাহর প্রতি এবং আল্লাহর একত্বের প্রতি ঈমান ছিল না। এ ধারণাটি সঠিক নয়। সেই মোশরেকরাও আল্লাহর একত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস কোরত, কিন্তু তারা আল্লাহর হুকুম, বিধান মানত না অর্থাৎ তারা আল্লাহর আনুগত্য কোরত না। তখনকার আরবরা বিশ্বাস কোরত যে তারা আল্লাহর নবী এব্রাহীমের (আঃ) উম্মাহ। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বলে, পালনকারী বলে বিশ্বাস কোরত, নামাজ পড়ত, কাবা শরীফকে আল্লাহর ঘর বলে বিশ্বাস কোরত, ঐ কাবাকে কেন্দ্র করে বাৎসরিক হজ্ব কোরত, কোরবানি কোরত, রোজা রাখত, আল্লাহর নামে কসম কোরত, এমনকি খাত্নাও কোরত। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় দলিল, বিয়ে শাদীর কাবিন ইত্যাদি সমস্ত কিছু লেখার আগে আমরা যেমন ‘বিসমিল্লাহ’ লেখি তেমনি তারাও আল্লাহর নাম লিখত। আরবের মোশরেকরা যে আমাদের মতোই আল্লাহয় বিশ্বাসী ছিলো এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। কোর’আনে তিনি তাঁর রসুলকে বলছেন- তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করো, আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা অবশ্যই জবাব দেবে- সেই সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী (আল্লাহ) (সুরা যুখরুফ- ৯)। অন্যত্র বলেছেন- তুমি যদি তাদের প্রশ্ন করো আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন এবং কে সূর্য ও চন্দ্রকে তাদের (কর্তব্য কাজে) নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণ করছেন, তবে তারা নিশ্চয়ই জবাব দেবে- আল্লাহ (সুরা আনকাবুত- ৬১)।
এমন আরও অনেকগুলি আয়াত এবং ইতিহাস থেকে দেখা যায় সেই মোশরেকদের আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের ওপর ঈমান ছিলো। তারা মূর্তিপূজা কোরত ঠিকই কিন্তু ওগুলোকে তারা স্রষ্টা বলে মানত না। তারা বিশ্বাস কোরত যে ঐ দেব-দেবীকে মানবে, ওগুলোর পূজা করবে তাদের জন্য ঐ দেব-দেবীরা আল্লাহর কাছেই সুপারিশ করবে (সুরা ইউনুস- ১৮, সুরা যুমার ৩)। এত ঈমান সত্ত্বেও তারা কাফের ছিল কারণ তারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন নিজেদের মনগড়া নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালনা কোরত। যেহেতু তারা আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম মানত না, তাই তাদের ঐ ঈমান ছিল অর্থহীন, নিষ্ফল এবং স্বভাবতই আল্লাহর হুকুম না মানার পরিণতিতে তাদের সমাজ অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা, সংঘর্ষ ও রক্তপাতে পরিপূর্ণ ছিল। ঠিক আজকেও আল্লাহর প্রতি আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস থাকলেও আল্লাহর হুকুম, আইন, বিধান অমান্য করার ফলে আমাদের সমসাময়িক পৃথিবীও চরম অন্যায় ও অশান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
একইভাবে বর্তমানে ‘মোসলেম’ বোলে পরিচিত জনসংখ্যাটি তদানীন্তন আরবের মানুষের মতোই আল্লাহকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, তাকে স্রষ্টা বোলে, জীবন-মরণের প্রভু বোলে মানে, কিন্তু আরবের ঐ মোশরেকদের মতোই তাঁর দেয়া দীন, জীবন-বিধান মোতাবেক সমষ্টিগত, জাতীয় জীবন পরিচালনা করে না। আরবের মোশরেকরা দেব-দেবীর পুরোহিতদের দেয়া বিধান অনুযায়ী তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা কোরতো, বর্তমানের মোসলেম দুনিয়া নতুন দেব-দেবী গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্রের পুরোহিত ইহুদি-খ্রিস্টানদের তৈরি করা জীবন-বিধান অনুযায়ী তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা কোরছে। তফাৎ শুধু এইটুকু যে আরবদের হাবল, লা’ত, মানাতের মূর্তিগুলি ছিল কাঠ এবং পাথর দিয়ে তৈরি, বর্তমানের মূর্তিগুলি কাঠ পাথরের নয়, তন্ত্রের মূর্তি। বরং এই তন্ত্রের মূর্তিগুলোর পুজা ঐ কাঠ পাথরের মূর্তিপূজার চেয়েও বড় র্শেক ও কুফর। তাহোলে বিশ্বনবী যাদের মধ্যে আবির্ভুত হোয়েছিলেন আরবের সেই আল্লাহয় বিশ্বাসী অথচ মোশরেক কাফেরদের সঙ্গে বর্তমানের আল্লাহয় বিশ্বাসী কিন্তু কার্যত মোশরেক ‘মোসলেম’ জনসংখ্যার তফাৎ কোথায়? এজন্যই আল্লাহর রসুল মক্কার ঐ আল্লাহ-বিশ্বাসী কাফের মোশরেকদেরকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ তওহীদের বালাগ দিয়েছিলেন, আর একই কারণে মাননীয় এমামুয্যামান মানবজাতিকে তওহীদ মেনে নেওয়ার আহ্বান কোরেছেন।
তওহীদের বালাগ চিরন্তন:
আল্লাহ শেষ রসুলকে (দ:) বলছেন, ‘আপনার পূর্বে আমি যে রসুলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন এলাহ (সার্বভৌমত্বের মালিক বা হুকুমদাতা) নেই (সুরা আম্বিয়া ২৫)। অর্থাৎ সকল নবী ও রসুলগণের বালাগ ছিল ‘লা- এলাহা এল্লাল্লাহ’র প্রতি অর্থাৎ তওহীদের প্রতি। আল্লাহ ছাড়া জগতের সকল বিধানদাতা, হুকুমদাতা, সার্বভৌম অস্তিত্বকে অস্বীকার করাই হচ্ছে তওহীদ, এটাই এই দীনের ভিত্তি। সংক্ষেপে এর মর্মার্থ হচ্ছে আমি জীবনের প্রতিটি বিষয়ে যেখানেই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য আছে সেটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি যে বিভাগেই হোক না কেন, সেই ব্যাপারে আমি আর কারও নির্দেশ মানি না। যে বিষয়ে আল্লাহ অথবা তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য নেই সে বিষয়ে আমরা স্বাধীনভাবে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। বর্তমান দুনিয়ার কোথাও এই তওহীদ নেই, সর্বত্র আল্লাহকে কেবল উপাস্য বা মা’বুদ হিসাবে মানা হচ্ছে, কিন্তু এলাহ বা সার্বভৌমত্বের আসনে আল্লাহ নেই। মানুষ নিজেই এখন নিজের জীবনব্যবস্থা তৈরি করে সেই মোতাবেক জীবন চালাচ্ছে, মানুষ নিজেই এখন এলাহ অর্থাৎ বিধাতার আসনে আসীন। আজ মানুষের তৈরি জীবন-ব্যবস্থাগুলিকেই (দীন) মানবজীবনের সকল সমস্যার যুগোপযোগী সমাধান হিসাবে মনে করা হচ্ছে যদিও সেগুলির সবই মানুষকে শান্তি দিতে চরমভাবে ব্যর্থ। বর্তমান দুনিয়ার সীমাহীন মারামারি, কাটাকাটি, রক্তপাত, অনাচারই এই ব্যবস্থাগুলির ব্যর্থতার যথেষ্ট প্রমাণ।
বালাগের বিনিময় নেওয়া চলবে না:
মানুষকে আল্লাহর তওহীদের দিকে আহ্বান করার জন্য কোনরূপ বিনিময় গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষেধ। আল্লাহ তাঁর রসুলকে নির্দেশ দেন, তুমি তাদের নিকট কোন মজুরি দাবি করো না (সুরা ইউসুফ-১০৪)। মানুষকে তওহীদের দিকে আহ্বান কোরে প্রত্যেক নবীই বলতেন, আমি তোমাদের কাছে কোন মজুরি চাই না, আমার বিনিময় তো আল্লাহর কাছে (সুরা শুয়ারা-১৮০)। আল্লাহর নবী রসুলগণ যখনই তাঁদের গোত্রের লোকদেরকে হেদায়াতের দিকে আহ্বান কোরেছেন, তখন তাদের প্রত্যেকেই সেই সমাজের ধর্মীয় পুরোহিত, ধর্মব্যবসায়ী আলেম শ্রেণির প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হোয়েছেন। এর কারণ ধর্মই ছিল তাদের রুটি-রুজির একমাত্র বাহন। নবী রসুলরা তাদের এই ধর্মব্যবসাকে নিষিদ্ধ বোলে ঘোষণা কোরেছেন, যার ফলে তারা রুজি রোজগার বন্ধের আশঙ্কায় শঙ্কিত হোয়ে নবীরসুলদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এবং সাধারণ মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত কোরেছেন।
ধর্মকে রুজি রোজগারের মাধ্যম বানানোর ফলে সেটার মধ্যে বিকৃতি প্রবেশ করে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেমন সিন্ডিকেট তৈরি হয় তেমনি ধর্মব্যবসায়ীদের মধ্যেও এক প্রকার সিন্ডিকেট তৈরি হয়। তারা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সত্য গোপন করে। ফলে ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য না হোয়ে নিপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে মানুষ ধর্মকে ঘৃণা কোরতে শুরু করে এবং এর নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। মানব ইতিহাসে এই ঘটনা সর্বদেশে সর্বযুগে বার বার ঘোটেছে। মধ্যযুগে ইউরোপের রেনেসাঁর পেছনে কারণ ছিল মূলতঃ এটাই।
হেযবুত তওহীদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘোটেছে। আল্লাহ যখন এমামুয্যামানকে বুঝিয়ে দিলেন যে, বর্তমানের প্রচলিত এসলামটি একটি তওহীদহীন বিকৃত বিপরীতমুখী এসলাম এবং ব্রিটিশরা তাদের শাসনামলে এই বিকৃত এসলামটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ১৪৬ বছর ধোরে শিক্ষা দিয়ে এদেশের মানুষের মনে মগজে গেঁড়ে দিয়ে গেছে, তিনি এই কথা বই লিখে ও আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ কোরতে শুরু কোরলেন। এই মহাসত্য প্রকাশ কোরে দেওয়ায় বিকৃত এসলামের ধ্বজাধারী আলেম মোল্লারা এমামুয্যামান ও হেযবুত তওহীদের বিরোধিতা আরম্ভ করে। তারা এমামুয্যামানের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা কোরে মসজিদে মসজিদে, ওয়াজ মাহফিলে, খোতবায় অপপ্রচার চালিয়ে মানুষকে সত্য থেকে দূরে সোরিয়ে রাখে। ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এ দেশের গণমাধ্যমগুলিও হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে নানারূপ অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। এই উভয়পক্ষের নিরবচ্ছিন্ন অপপ্রচারের ফলে সাধারণ মানুষ হেযবুত তওহীদের বক্তব্য সঠিকরূপে জানতে পারে না। এজন্য অধিকাংশ মানুষই এতদিন হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে একটি ভুলের মধ্যে ছিল। এই ভুল বোঝানোর কারণে হেযবুত তওহীদের মোজাহেদ-মোজাহেদাদের বালাগের সময় তাদের উপর কঠিন সামাজিক ও প্রশাসনিক নির্যাতন নিপীড়ন নেমে আসে। এভাবে ১৭ বছর হেযবুত তওহীদ অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য কোরেও তাদের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয় নি, তারা বিভিন্নভাবে তাদের তওহীদের এই বালাগ চালিয়ে গেছে। সূর্য যখন উদিত হয় কোনকিছু দিয়েই তার আলোকে আড়াল কোরে রাখা যায় না, তেমনি আল্লাহর প্রকৃত এসলাম, সত্যদীন যখন আবার আল্লাহ এমামুয্যামানের মাধ্যমে পৃথিবীতে দান কোরেছেন, তাকেও ঢেকে রাখা যাবে না, এর আলো উদ্ভাসিত হবেই হবে। সত্যসন্ধানী মানুষেরা এখন আল্লাহর দয়ায় একটু একটু কোরে বুঝতে পারছেন যে হেযবুত তওহীদের এই বালাগ আল্লাহর রসুলের সেই সত্যদীনের বালাগ যা মানবজাতিকে অন্যায় অশান্তি থেকে মুক্ত কোরে শান্তির জীবন উপহার দেবে।
আসুন কলেমার বাণীকে কেবল যিকিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আল্লাহকে একমাত্র এলাহ হিসাবে মেনে নিই এবং মানবজাতির মধ্য থেকে সর্বপ্রকার অন্যায় অশান্তি অবিচার লুপ্ত করে পৃথিবীকে একটি শান্তিময় জান্নাতের বাগানে পরিণত করি।

Sunday, October 18, 2015

পৃথিবী আজ অন্যায় অবিচারে পরিপূর্ণ কেন?


পৃথিবী আজ অন্যায় অবিচারে পরিপূর্ণ কেন?

 0


মো: সাইদুর রহমান:
মানুষ আজ এতটাই আত্মাহীন ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, যে যাকে যেভাবে পারছে প্রতারণা করে, পদপিষ্ঠ করে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করছে। মানুষের চারপাশে এমন একটি জিনিসও অবশিষ্ট নেই যাতে মিথ্যা মিশ্রিত নেই। বাতাস, পানি পর্যন্ত বিষাক্ত হয়ে গেছে। ন্যূনতম মনুষ্যত্ব না থাকায় তারা খাদ্যে বিষ মেশাচ্ছে, ঔষধে পর্যন্ত ভেজাল দিচ্ছে। তারা এমন এক দানবে পরিণত হয়েছে যে চার বছরের শিশুও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারে, দরিদ্রের ওপর ধনীর বঞ্চনায়, শোষণে, শাসিতের ওপর শাসকের অবিচারে, সরলের ওপর ধূর্তের প্রতারণায় পৃথিবী আজ মানুষের বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। শান্তি রক্ষার জন্য বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করে, বিভিন্ন নামে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। একটার পর একটা আইন করে, জীবন-ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হচ্ছে কিন্তু কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না হত্যা, ধর্ষণ, বেকারত্ব, রাজনৈতিক হানাহানি, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস ও যুদ্ধের তাণ্ডব। একটি সমস্যারও সমাধান হচ্ছে না, বরং দিন দিন নতুন নতুন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থার কারণ কী?
এর মূল কারণ হচ্ছে স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে পশ্চিমা সভ্যতা দাজ্জালের চাপিয়ে দেওয়া নীতি-নৈতিকতাহীন বস্তুবাদী সিস্টেম মানুষ তাদের জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়াও ব্রিটিশদের তৈরি ষড়যন্ত্রমূলক শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছে নানা রকম অনৈক্য আর বিভেদ, ঘোটে চলেছে নানামুখী দাঙ্গা-সংঘাত।
এখন এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
আমাদের সকলের স্রষ্টা এক, একই পিতা-মাতার রক্ত আমাদের সবার দেহে। সকল নবী-রসুল-অবতারগণও এসেছেন সেই এক স্রষ্টার পক্ষ থেকে। তাই শান্তি পেতে হলে আমাদেরকে স্রষ্টার হুকুমের উপর ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহর হুকুমই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। স্রষ্টার হুকুমের বাস্তবায়ন ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমাদেরকে পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’র চাপিয়ে দেওয়া তন্ত্রমন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, সর্বপ্রকার ধর্মব্যবসা ও ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে সকল প্রকার সন্ত্রাস, হানাহানির বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষে।

Saturday, October 17, 2015

যে কারণে আমরা স্বজাতি

যে কারণে আমরা স্বজাতি

 0
011রিয়াদুল হাসান:
আজকের পৃথিবীতে প্রধান প্রধান ধর্মীয় জাতিগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে যতগুলো অমিল লক্ষ্য করা যায়, তার চেয়ে বহু বেশি মিল পরিদৃষ্ট হয়। অথচ রাজনৈতিক কারণসহ বিভিন্ন কারণে কেবলমাত্র জাতিগুলোর অমিল বা মতদ্বৈততা আছে এমন বিষয়গুলোকেই বারংবার সামনে আনা হয়, আর মিলগুলোকে সুচতুরভাবে দূরে সোরিয়ে রাখা হয়। ধর্মব্যবসায়ী ও স্বার্থবাদী রাজনীতিকদের এই কপটতার বলী হয় সকল ধর্মের সাধারণ মানুষেরা। তাই ধর্মব্যবসায়ীরা যাতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত কোরে কোনোরূপ অনর্থ ঘটাতে না পারে তার জন্য সকল ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় অতি প্রয়োজনীয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং মোসলেমরা কিভাবে স্বজাতি?
আমাদের এই উপমহাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রায় ১১০ কোটি সনাতন ধর্মের অনুসারী রোয়েছেন। ধর্মীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মগ্রন্থের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ এই জাতিটি বরাবরই ধর্মানুরাগী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। পৃথিবীতে সম্ভবত তাদের মতো প্রাচীন গ্রন্থের অধিকারী দ্বিতীয় কোনো নৃ-গোষ্ঠী নেই। বহু নবী-রসুল অবতারের আগমন ঘটেছে এই ভারতবর্ষে যারা সকলেই ছিলেন সনাতন ধর্মের ধারক। সনাতন শব্দের অর্থ যা নিত্য, চিরসত্য, স্বতঃসিদ্ধ, শাশ্বত। আল কোর’আনে এসলামকে বলা হোয়েছে ‘দীনুল কাইয়্যেমা’। এই কাইয়্যেমাহ শব্দের অর্থও ঐ একই- যা সনাতন, নিত্য, শাশ্বত। সে হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আর মোসলেমরা শুধু যে স্বজাতি তা-ই নয়, তাদের উভয়ের ধর্মের নাম পর্যন্ত অভিন্ন। কিন্তু অতি সুচতুরভাবে সনাতন ধর্ম থেকে এসলাম ধর্মকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য ‘হিন্দু’ শব্দটিকে সনাতন ধর্মের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হোল। এই এলাকার মানুষের ধর্মকে হিন্দু ধর্ম কখনোই বলা হোত না। হিন্দু ধর্ম বা Hinduism এই শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা যা ছিলো তাদের সুচতুর ষড়যন্ত্রের একটি পদক্ষেপমাত্র। আমার এ কথায় কারো সন্দেহ থাকলে দয়া কোরে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ২০ খণ্ডের ৫১৯ পৃষ্ঠায় Hinduism অধ্যায়টি দেখে নিতে পারেন। সেখানে বলা হোয়েছে,  “The term Hinduism … [ was] introduced in about 1830 by British writers.” এর ফল হোল এটাই যে, হিন্দু ও মোসলেম দুটো দুই জাতি হোয়ে গেল। একে অপরের থেকে দূরে সরে গেলো। সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানো সহজ হোয়ে গেলো। হিন্দু কাকে বলে? ইতিহাস থেকে জানা যায়, সিন্ধু নদের অববাহিকা অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বোলে আখ্যায়িত কোরত পারস্যে মোসলেমরা। অর্থাৎ এটি ছিলো একটি ভৌগোলিক পরিচয়ের বিষয়, ধর্মীয় পরিচয় নয়। এখন কথা হোচ্ছে, হিন্দুস্তানের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে যদি কোন জনগোষ্ঠীকে হিন্দু বোলে আখ্যা দেওয়া হয়, তাহোলে সিন্ধুর অববাহিকায় আরও যতো নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে এবং কোরবে তাদেরকেও হিন্দু বলা অযৌক্তিক হবে না।
সকল মানুষ একই পিতা-মাতা আদম হাওয়ার সন্তান, সকলেই ভাই-বোন। সনাতন ধর্মের গ্রন্থে এই আদি পিতা-মাতাকে আদম ও হব্যবতী বোলে উল্লেখ করা হোয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রাথমিকভাবে মহর্ষী মনুর (আ:) অনুসারী। মহর্ষী মনুই (আ:) হোচ্ছেন কোর’আনে বর্ণিত নূহ (আ:)। সুতরাং মোসলেম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আদিতে একই নবীর অনুসারী। নূহ (আ:) এর মাধ্যমেই মানবজাতির বংশ রক্ষিত হয়, তাই পৃথিবীতে বিরাজমান সকল মানুষের পূর্বপুরুষগণ একসময় নূহের (আ:) অনুসারী এতে কোন সন্দেহ নেই। পরবর্তীতে ভারতবাসীকে পথ দেখাতে এবং ধর্মকে প্রতিষ্ঠা কোরতে আবির্ভূত হোয়েছেন আরও বহু নবী-রসুলগণ যাঁদেরকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় অবতার। শ্রীকৃষ্ণ (আ:), যুধিষ্ঠির (আ:), বুদ্ধ (আ:), মহাবীর (আ:) এঁরা সকলেই ছিলেন আল্লাহর সত্য নবী। সত্য কখনো পৃথক হয় না, সত্যের একরূপ। তাই সকল সত্যনবীর অনুসারীদেরও এক জাতি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
খ্রিস্টানদের সাথে মোসলেমদের শত্র“তার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থবাদীদের চক্রান্তই প্রধান হোলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের তারতম্যও যথেষ্ট বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু আদতে খ্রিস্টান ও মোসলেম ভিন্ন জাতি নয়। মোসলেমরা যেমন আল্লাহ তথা ঈশ্বরের প্রেরিত নবী মোহাম্মদের (দ:) অনুসারী, তেমনি খ্রিস্টানরাও ঐ ঈশ্বরেরই প্রেরিত অপর এক নবী যিশুর (আ:) অনুসারী দাবিদার। খ্রিস্টান ও মোসলেম উভয়েই একই স্রষ্টার সৃষ্টি, একই মাতা-পিতার সন্তান। এসলাম ধর্মে তাদেরকে বলা হোয়েছে আদম-হাওয়া, আর বাইবেলে বলা হোয়েছে অ্যাডাম-ইভ। খ্রিস্টানরা যাকে বলেন জেসাস-ক্রাইস্ট, মোসলেমরা তাঁকেই বলেন ঈসা (আ:)। যিশু খ্রিস্টকে (আ:) সম্মান করা, তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু একজন মোসলেমের কর্তব্যই নয়, ঈমানী দায়িত্ব। কোন মোসলেম যদি তাঁকে অস্বীকার করে তবে সে কাফের হবে, কারণ তাঁকে অস্বীকার কোরলে প্রকারান্তরে স্রষ্টাকেই অস্বীকার করা হয় (সুরা নেসা- ১৫১)। ঈসা (আ:) আল্লাহর তওহীদ তথা একত্ববাদ শিক্ষা দিয়েছেন। বাইবেলে আমরা পাই, একদিন একজন লোক তাঁর কাছে জানতে চাইলো, সকল অনুশাসনের মধ্যে সর্বপ্রথম অনুশাসন কি? ঈসা (আ:) উত্তরে বোললেন, “শোন হে বনী ইসরাইল। সর্বপ্রথম অনুশাসন হোচ্ছে আমাদের প্রভু আল্লাহ হোচ্ছেন একমাত্র প্রভু [“The first of all the commandments is, Hear, O Israel; The Lord our God is one Lord.” (The 12th chapter of Mark) মোসলেমদের বিশ্বাসও তাই। যারা খ্রিস্টান নামধারী কিন্তু না মানে ইঞ্জিলের বিধান, না মানে ঈসা (আ:) এর উপদেশ এক কথায় যারা স্রষ্টার বিধান মানে না তারা আসলে ঈসা (আ:) এর অনুসারী নয়, যতোই তারা দাবী কোরুক। তেমনিভাবে যারা না মানে কোর’আনের বিধান, না অনুসরণ করে শেষ নবীর আদর্শ, তারা মোসলেম বংশোদ্ভূত হোলেও মোসলেম নয়, উম্মতে মোহাম্মদী নয় যতোই দাবি কোরুক না কেন। বাইবেল বলছে যিশু খ্রিস্ট আবার আসবেন, হাদিসেও বলা আছে তিনি আবার আসবেন এবং এসে দাজ্জাল ধ্বংস কোরবেন। খ্রিস্টানরা অপেক্ষা কোরছেন- যিশু খ্রিস্ট এসে এন্টি ক্রাইস্ট ধ্বংস কোরবেন, ‘কিংডম অব হ্যাভেন’ প্রতিষ্ঠা কোরবেন; মোসলেমরাও অপেক্ষা কোরছেন- ঈসা (আ:) পৃথিবীতে এসে দাজ্জালকে ধ্বংস কোরে এমন শান্তি প্রতিষ্ঠা কোরবেন যে, নেকড়ে আর ভেড়া এক সাথে থাকবে। তাহলে মোসলেম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে পার্থক্য রোইল কোথায়? উভয় জাতির মধ্যে শত্র“তার কোনো ভিত্তি রোইল কি?
পবিত্র কোর’আনে সুরা নেসার ১৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, “আহলে কিতাবদের প্রত্যেকে তাদের মুত্যুর পূর্বে তাঁহার [ঈসা (আ:) এর] উপর ঈমান আনবেই।” আবার সুরা আল এমরানের ৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, “ তামার [ঈসা (আ:) এর] অনুসারীদেরকে কেয়ামত পর্যন্ত কাফেরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি।” ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাংলায় অনুদিত কোর’আনের ফুটনোটে ঈসার (আ:) অনুসারী বলতে মোসলেমদেরকেই বোঝানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে মোহাম্মদ (সা:) এর আবির্ভাবের পর থেকে ঈসা (আ:) এর প্রকৃত অনুসারী তো তারা যারা মোসলেম অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর সকল রসুলগণের উপরই বিশ্বাস রাখে। মোসলেম শব্দের অর্থ বিনা দ্বিধায় আত্মসমর্পণকারী। সুতরাং যারাই আল্লাহর হুকুমের প্রতি বিনা দ্বিধায় আত্মসমর্পণ কোরবে তারাই মোসলেম, তার বংশপরিচয় এখানে বিবেচ্য নয়। তাই উপরোক্ত আয়াতগুলিতে মহান আল্লাহ পাকের কথা ও তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যার আলোকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, কেয়ামতের পূর্বে সমগ্র মানবজাতি স্রষ্টার সিদ্ধান্তের প্রতি আত্মসমর্পণ কোরবে এবং মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ কোরে একজাতিতে পরিণত করার জন্যই ঈসা (আ:) এর পুনরাগমন হবে। সুতরাং এটাই যদি তাঁর কাজ হয় তবে কেন আমরা মিছেমিছি সেই ঐক্যকে বিলম্বিত কোরছি, আজই কেন আমরা এক জাতিতে পরিণত হোতে পারছি না? যেহেতু ঈসা (আ:) এসে বাইবেলে বর্ণিত Anti-Christ, The Beast, হাদীসে বর্ণিত দাজ্জালকে ধ্বংস কোরে সমস্ত মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ কোরবেন যার ফলস্বরূপ পৃথিবী হবে Kingdom of Heaven, সেহেতু আমরা সেই ঐক্যপ্রক্রিয়া এখনই কেন শুরু কোরি না?
এটা প্রসিদ্ধ ইতিহাস যে, রসুলাল্লাহ মক্কা বিজয়ের পর যখন কাবা ঘরে স্থাপিত বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি ভেঙে ফেলছিলেন তখন কাবার অভ্যন্তরভাগের দেওয়ালে যিশু খ্রিস্ট ও মাতা মেরির ছবিও ছিল। আল্লাহর রসুল সকল মূর্তি ভাঙলেও, সকল ছবি ধুয়ে ফেললেও ঐ ছবিটা নষ্ট কোরলেন না। কয়েক শতাব্দী ঐ ছবি সেখানেই ছিলো। পরে কাবাঘর পুনসংস্কার করার সময় সেই ছবিগুলি নষ্ট হোয়ে যায় (সূত্র: সিরাত ইবনে ইসহাক)। যে ছবি আল্লাহর ঘর ক্বাবায় ছিলো সে ছবি কারও ঘরে কেউ যদি রাখতে চায় তবে অন্যের আপত্তি থাকবে কেন? তিনি তো কেবল খ্রিস্টানদেরই নবী নন, মোসলেমদেরও নবী। নবী-রসুলগণ কোনো নির্দিষ্ট জাতির একার সম্পদ হোতে পারেন না। তাঁরা সমগ্র পৃথিবীর সম্পদ, সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। তাঁরা যে বিধান এনেছেন স্থান-কাল-পাত্রভেদে সেগুলোতে শরিয়াহর কিছু রদ-বদল থাকলেও মূল শিক্ষায় কোনো পার্থক্য ছিলো না। কারণ, পৃথিবীর সত্য, শাশ্বত, সনাতন নিয়ম-নীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। এই শাশ্বত শিক্ষা যেমন আল কোর’আনে আছে, তেমন বাইবেলেও আছে। কাজেই মোসলেমরা কোর’আনের পাশাপাশি বাইবেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ কোরবেন, ইঞ্জিলের বহু কথা আল্লাহ কোর’আনেও উল্লেখ কোরেছেন। খ্রিস্টানরা বাইবেলের পাশাপাশি কোর’আন থেকে শিক্ষাগ্রহণ কোরবেন এমনটাই হওয়া উচিৎ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মোসলেম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কার্যত হিংসা, বিদ্বেষ, যুদ্ধ, হানাহানি তথা শত্র“তার যুক্তিসঙ্গত ধর্মীয় কোন কারণ নেই।
তাছাড়াও এব্রাহীম (আ:) তথা আব্রাহাম কে মোসলেমরা যেমন জাতির পিতা বোলে মান্য করেন। আল্লাহ উম্মতে মোহাম্মদীর উদ্দেশে পবিত্র কোর’আনে বোলছেন, “এটাই (এসলাম) তোমাদের পিতা এব্রাহীমের দীন। আল্লাহ্ তোমাদের নাম রেখেছেন “মুসলিম”। পূর্বের গ্রন্থাবলীতেও আবার এই গ্রন্থেও (কোর’আন) ঐ নামই দেয়া হোয়েছে। (সুরা আল-হাজ্জ ৭৮)।
তেমনি খ্রিস্টানরাও তাঁকে জাতির পিতা বোলেই মান্য করেন। বাইবেলে বলা হোচ্ছে: Abraham is “the father of all those who believe”, both of the circumcised and the uncircumcised (Rom 4:9-12). অর্থাৎ আব্রাহাম খাৎনাকারী এবং খাৎনা বিহীন নির্বিশেষ সকল বিশ্বাসী মানুষের পিতা। ঈসা (আ:) তাঁর অনুসারীদের বোলছেন, “If you were Abraham’s children, then you would do what Abraham did. (John 8:39) অর্থাৎ যদি তোমরা এব্রাহীমের সন্তান হোয়ে থাকো তবে সেই কাজই তোমাদের কর্তব্য যা এব্রাহীম কোরেছেন। সুতরাং এদিক দিয়েও মোসলেম খ্রিস্টান একই পিতার দুই পূত্র।
এই যদি হয় মোসলেমদের সাথে খ্রিস্টানদের সম্পর্ক তাহলে এ দুই জাতির মধ্যে এত বিভেদ কেন? আমরা কি আজও এক সাথে বসতে পারি না? শত শত বছর ধরে বহু সংঘাত হোয়েছে, শত্র“তা হোয়েছে, ক্রুসেড সংঘটিত হোয়েছে, কিন্তু কী লাভ হোয়েছে? শান্তি এসেছে কি? শান্তি তো আসেই নি, মাঝখান থেকে ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানবতাটাই হারিয়ে গেছে। তাই আসুন আমরা একসাথে বসি, আমরা ভাই ভাই হোয়ে যাই। যে নবী-রসুলগণ একজন আরেকজনকে ভাই বোলে সম্বোধন কোরেছেন, সেই নবীদের অনুসারী হোয়ে আমরা কেন একে অপরের সাথে শত্র“তা কোরবো?
ঈসা (আ:) সম্পর্কে আল্লাহর শেষ রসুল (দ:) বোলেছেন, “মানবজাতির মধ্যে সবার চেয়ে ঈসা ইবনে মারিয়ামের (আ:) ভাই হবার ক্ষেত্রে আমি সর্বাধিক দাবিদার, তাঁর ও আমার মধ্যে আর কোন নবী নেই” (কানজুল উম্মাল, ১৭ খণ্ড, হাদিস ১০৩৩)। অন্যত্র বোলেছেন, “দুনিয়ায় এবং আখেরাতে আমি ঈসা ইবনে মারিয়ামের (আ:) সবচেয়ে নিকটতম। সকল নবীরাই ভাই ভাই, কেবল তাদের মা আলাদা। তবে তাদের সবাই একই ধর্মের অনুসারী। (হাদীস- আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী)। আবার ঈসা (আ:) শেষ নবীকে কতখানি সম্মান কোরেছেন তা বাইবেলে বর্ণিত আছে। ঈসা (আ:) তাঁর আসহাবদেরকে বোলেছেন, “বিশ্বাস করো আমি তাঁকে দেখেছি এবং তাঁকে সম্মান জানিয়েছি। এভাবে সকল নবী তাঁকে দেখেছেন। তাঁর রূহকে দর্শনের মাধ্যমে নবীগণ নব্যুয়তপ্রাপ্ত হোয়েছেন। আমি যখন তাঁকে দেখলাম আত্মা প্রশান্ত হোয়ে গেল। আমি বোললাম, O Muhammad;, God be with you, and may he make me worthy to untie your shoelatchet; for obtaining this I shall be a great prophet and holy one of God. হে মোহাম্মদ! আল্লাহ আপনার সহায় হোন। আমাকে তিনি আপনার জুতার ফিতা বাঁধার যোগ্যতা দান কোরুন। কারণ আমি যদি এই মর্যাদা লাভ কোরি তাহলে আমি একজন বড় নবী হবো এবং আল্লাহর একজন পবিত্র মানুষ হোয়ে যাবো। (The Gospel of Barnabas, Chapter 44)”. এই ছিল একজন নবীর নিকটে অপর একজন নবীর সম্মান, মর্যাদা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, নবী-রসুল-অবতারগণ একে অপরকে কতখানি সম্মান কোরতেন, ভালোবাসতেন। অথচ তাদেরই অনুসারী দাবি করে আমরা জেহাদ-ক্রুসেডের নামে একে অপরের সাথে বংশ পরম্পরায় শত্র“তা কোরে যাচ্ছি, উপাসনালয় ভাঙছি, মূর্তি ভাঙছি, দাঙ্গা কোরছি, রক্তপাত কোরছি। কী নিষ্ঠুর পরিহাস।
খ্রিস্টানদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হোয়ে থাকে কোর’আনে বহু আয়াত আছে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে। এটা একটা বিভ্রান্তি। বস্তুত কোর’আনে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে কোনো আয়াত নেই। কোর’আনে বলা আছে- তুমি অবশ্যই মুমিনদের জন্য মানুষের মধ্যে শত্র“তায় অধিক কঠোর পাবে ইহুদি ও মুশরিকদেরকে। আর মুমিনদের জন্য বন্ধুত্বে তাদেরকে নিকটে পাবে যারা বলে, ‘আমরা নাসারা (খ্রিস্টান)’ (মায়েদা, ৮২)।
নাজ্জাশী ছিলেন খ্রিস্টান শাসক। তিনি রসুলাল্লাহকে সত্য প্রচারে সহযোগিতা কোরেছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত এসলাম গ্রহণ কোরেছেন বোলে কোনো সহিহ হাদিস বা ইতিহাস পাওয়া যায় না। কিন্তু এসলাম গ্রহণ না কোরলেও রসুলাল্লাহ তাঁকে একজন মোসলেমের সম্মানে সম্মানিত কোরেছেন। তাঁকে মোসলেমদের ভাই হিসেবে উল্লেখ কোরেছেন।
নাজ্জাশী ইন্তেকাল কোরেছিলেন তাবুক যুদ্ধের পর নবম হিজরীতে। আল্লাহর রসুল নাজ্জাশীর এন্তেকালের তারিখেই তার মৃত্যু সংবাদ সাহাবাদের জানান এবং জামায়াতবদ্ধ হোয়ে গায়েবানা জানাযার ব্যবস্থা করেন। তিনি সাহাবাদেরকে বলেন- ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা পড় যিনি তোমাদের দেশ ব্যতীত অন্য দেশে মৃত্যুবরণ কোরেছেন।’ নাজ্জাশী যে মোসলেম ছিলেন না তার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল পাওয়া যায় এখানেই। রসুলাল্লাহ যখন জানাযায় দাঁড়ালেন তখন কয়েকজন মোনাফেক মন্তব্য করে যে, রসুলাল্লাহ একজন কাফেরের জানাযা পড়াচ্ছেন। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ সুরা আল ইমরানের ১৯৯ নং আয়াত নাজেল কোরলেন, যেখানে বলা হোয়েছে- ‘আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রোয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হোয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে স্বল্পমূল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রোয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন।’ নাজ্জাশী যে মোসলেম ছিলেন না, আহলে কিতাব অর্থাৎ খ্রিস্টান ছিলেন এবং আহলে কিতাবরাও দীন প্রতিষ্ঠার কাজে সাহায্য করে মোসলেমদের সমান মর্যাদার অধিকারী হোতে পারে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই আয়াতটিই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোচ্ছে নাজ্জাশী ধর্মব্যবসায়ী ছিলেন না, ধর্মকে তিনি স্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে পরিণত করেন নি। প্রায় সকল মোফাসসের ও হাদিস বিশারদগণ স্বীকার কোরেছেন যে, এই আয়াতটি নাজ্জাশীর মৃত্যু ও মোনাফেকের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত নাজেল হোয়েছিল।
এই ঘটনার দ্বারা আল্লাহর শেষ রসুল তাঁর জাতির জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন যে, তোমরা একে অপরের শত্র“ নও, আলাদা নও, তোমরা যাঁদের অনুসারী তাঁরা একই স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত, সুতরাং অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তির প্রাচীর তুলে রাখার কোন বৈধতা নেই, যুক্তিও নেই। এই ছিলো মোসলেমদের সাথে খ্রিস্টানদের সম্পর্ক। প্রশ্ন হোতে পারে, তাই যদি হবে তাহলে পরবর্তীতে তিনি খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোরলেন কেন?
পরবর্তীতে খ্রিস্টানদের সাথে মোসলেমদের যে যুদ্ধের ইতিহাস পাওয়া যায় তার পেছনে বহু কারণ নিহিত রোয়েছে। প্রধান কারণ ছিলো রাজনৈতিক। রসুলাল্লাহ যখন মদীনার রাষ্ট্রপ্রধান, তখন মক্কাবাসী মোশরেকরা পৃথিবী থেকে সত্যদীনকে মুছে ফেলার অভিপ্রায় নিয়ে অনেকবার তাঁকে আক্রমণ কোরেছে। সে আক্রমণে যারা যারা সাহায্য কোরেছে তাদের বিরুদ্ধে তিনি পরবর্তীতে অভিযান পরিচালনা কোরেছেন। সেটা ছিলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেটা কোনো আন্তঃধর্মীয় যুদ্ধ ছিলো না। পবিত্র জেরুসালেম শহর মোসলেম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর খলিফা ওমর বিন খাত্তাব (রা:) ঘুরে ঘুরে শহরের দর্শনীয় বস্তুগুলি দেখার সময় যখন খ্রিস্টানদের একটি অতি প্রসিদ্ধ গির্জা দেখছিলেন তখন সালাতের সময় হওয়ায় তিনি গির্জার বাইরে যেতে চাইলেন। জেরুজালেম তখন সবেমাত্র মোসলেমদের অধিকারে এসেছে, তখনও কোন মসজিদ তৈরিই হয় নি, কাজেই সালাহ খোলা ময়দানেই কায়েম করা হতো। জেরুজালেমের প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ বিশপ সোফ্রোনিয়াস ওমরকে (রা:) অনুরোধ কোরলেন ঐ গির্জার মধ্যেই তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নামাজ পড়তে। ভদ্রভাবে ঐ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান কোরে ওমর (রা:) গির্জার বাইরে যেয়ে সালাহ কায়েম করলেন। কারণ কি বোললেন তা লক্ষ্য কোরুন। বললেন- আমি যদি ঐ গির্জার মধ্যে নামাজ পড়তাম তবে ভবিষ্যতে মোসলেমরা সম্ভবতঃ একে মসজিদে পরিণত কোরে ফেলতো। একদিকে এসলামকে পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠিত কোরতে সর্বস্ব পণ কোরে দেশ থেকে বেরিয়ে সুদূর জেরুজালেমে যেয়ে সেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসলাম প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে খ্রিস্টানদের গির্জা যেন কোন অজুহাতে মোসলেমরা মসজিদে পরিণত না করে সে জন্য অমন সাবধানতা। উম্মতে মোহাম্মদী যতো যুদ্ধ কোরেছিলো সেগুলির উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর বিধান জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা (আজ যেমন জাতীয়ভাবে ব্রিটিশের আইন-বিধান মেনে নেওয়া হোয়েছে)। কিন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে একটি মানুষকেও তার ধর্ম ত্যাগ কোরে এই দীন গ্রহণে বাধ্য করেন নি। শুধু তাই নয়, যেখানেই তারা আল্লাহর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কোরেছেন সেখানেই অন্য ধর্মের চার্চ, সিনাগগ, মন্দির ও প্যাগোডা রক্ষার দায়িত্ব তো নিয়েছেনই তার উপর ঐ সব ধর্মের লোকজনের যার যার ধর্ম পালনে কেউ যেন কোন অসুবিধা পর্যন্ত না কোরতে পারে সে দায়িত্বও তারা নিয়েছেন। একটি উদাহরণ দিই। আমর ইবনুল আস (রা:) এর মিসর বিজয়ের পর আলেকজান্দ্রিয়ায় কে একজন একদিন রাত্রে যিশু খ্রিস্টের প্রস্তর নির্মিত প্রতিমূর্তির নাক ভেঙ্গে ফেলেছে। খ্রিস্টানরা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। তারা ধরে নিলো যে, এটা একজন মোসলেমেরই কাজ। আমর (রা:) সব শুনে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তিনি প্রতিমূর্তিটি স¤পূর্ণ নতুন কোরে তৈরি কোরে দিতে চাইলেন। কিন্তু খ্রিস্টান নেতাদের প্রতিশোধ নেবার বাসনা ছিলো অন্যরূপ। তারা বললো, “আমরা চাই আপনাদের নবী মোহাম্মদের (দ:) প্রতিমূর্তি তৈরি করে ঠিক অমনিভাবে তাঁর নাক ভেঙে দেব।”
এ কথা শুনে বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন আমর (রা:)। প্রাণপ্রিয় নবীজির প্রতি এত বড় ধৃষ্টতা ও বেয়াদবি দেখে তাঁর ডান হাত তলোয়ার বাটের উপর মুষ্টিবদ্ধ হয়। ভীষণ ক্রোধে তাঁর মুখমণ্ডল উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজেকে সংবরণ কোরে নিয়ে বোললেন, “আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যে কোন প্রস্তাব করুন আমি তাতে রাজি আছি।” পরদিন খ্রিস্টানরা ও মোসলেমরা বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হোল। আমর (রা:) সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বোললেন, “এদেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের ধর্মের হোয়েছে, তাতে আমার শাসন দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে। তাই তরবারি গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাক কেটে দিন।” এই কথা বলেই তিনি বিশপকে একখানি তীক্ষèধার তরবারি হাতে দিলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রিস্টানরা স্তম্ভিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সহসা সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মোসলেম সৈন্য এলো। চিৎকার করে বললো, “থামুন! আমি ঐ মূর্তির নাক ভেঙ্গেছি। অতএব আমার নাক কাটুন।” বিজিতদের উপরে বিজয়ীদের এই উদারতায় ও ন্যায়বিচারে মুগ্ধ হোয়ে সেদিন শত শত খ্রিস্টান এসলাম কবুল কোরেছিলেন।
সুতরাং উম্মতে মোহাম্মদীর যুদ্ধগুলি ছিলো রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কোন সম্প্রদায় বিশেষের বিরুদ্ধে নয়। খ্রিস্টান শাসকরা যুদ্ধগুলোর মধ্যে ধর্মীয় চেতনাকে ব্যবহার কোরেছেন। মুসা (আ:) যুদ্ধ কোরেছেন ফেরাউনের বিরুদ্ধে, কৃষ্ণ (আ:) যুদ্ধ কোরেছেন আপন মামা কংসের বিরুদ্ধে, যুধিষ্ঠির (আ:) যুদ্ধ কোরেছেন আপন চাচার বিরুদ্ধে, আখেরী নবীও যুদ্ধ কোরেছেন আপন চাচার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ বহু নবীকেই যুদ্ধ কোরতে হোয়েছে। কারণ একটাই- অসত্যের বিরুদ্ধে প্রথমে ঘৃণা, তারপর প্রতিবাদ, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ কোরতে হোয়েছে। এটাই সনাতন রীতি। রসুলাল্লাহ ও তাঁর প্রকৃত অনুসারীরা মাত্র ৬০/৭০ বছরের মধ্যে অর্ধপৃথিবী অধিকার কোরেছিলেন। বস্তুত অন্যায়-অবিচার, অশান্তি নির্মূল কোরে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ছিলো এর উদ্দেশ্য, কোনো জাতি বা ধর্মকে আঘাত করা নয়।
বর্তমানে প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন স্রষ্টা কেবল আমাদের সাথেই আছেন। আমরা স্রষ্টার প্রিয় জাতি, অন্যরা অবাধ্য, তারা নরকে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি তাতে স্রষ্টা আমাদের কারও প্রতিই খুশি নন। মানুষে মানুষে বিভেদের অভেদ্য প্রাচীর তৈরি কোরে এবং মানবতাকে উপেক্ষা কোরে নিত্য অশান্তির সৃষ্টি কোরে আমরা নিজেদের হাতেই আল্লাহর অভিশাপ ক্রয় কোরে নিয়েছি। এখন প্রতিনিয়ত তার ফল ভোগ কোরছি। কিন্তু স্রষ্টার অপার মহিমা যে, তিনি এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর মাধ্যমে এ অভিশাপ থেকে বাঁচার রাস্তা দেখিয়েছেন। তাই আসুন আমরা ভাই ভাই হোয়ে যাই। সকল প্রকার অনৈক্যকে পেছনে ফেলে নবী-রসুল-অবতারদের প্রকৃত শিক্ষা মোতাবেক ঐক্যবদ্ধ হোই। নিজ নিজ ধর্মের সত্য ও শাশ্বত বিধানের আশ্রয় গ্রহণ কোরে স্রষ্টাহীন, বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের সৃষ্ট অশান্তির অনল থেকে নিজেদের মুক্ত কোরি।

সকল ধর্ম একই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা


সকল ধর্ম একই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা

 0

Listশামসুয্যামান মিলন
এমন আরও বহু উদাহরণ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু খোলা মন নিয়ে যারা উপরোক্ত সাতাশটি মিল লক্ষ্য কোরবেন তারা আশা কোরি বুঝতে পারবেন যে সব ধর্মের উৎসই এক। তাই কোন ধর্মের অবতারদের বিষয়ে অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা, কোন ধর্মকে কটাক্ষ ও অবমাননা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ২০১৩ এর জানুয়ারি থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেবল ভারতেই ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হোয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১০৭ জন মানুষ। এই সংঘাতের শেষ কোথায় এবং কিভাবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিদ্বৎসমাজ। আমার মতে হিন্দু-মোসলেম উভয়ই স্রষ্টা প্রদত্ত একই সনাতন ধর্মের (দীনুল কাইয়্যেমা) অনুসারী। পবিত্র কোর’আনে বহু আয়াতে এসলামকে দীনুল কাইয়্যেমাহ বা সনাতন, শ্বাশ্বত জীবনব্যবস্থা হিসাবে আখ্যায়িত করা হোয়েছে। হিন্দু বোলে আদতে কোন ধর্ম নেই, বেদ-পুরাণে হিন্দু শব্দের কোন উল্লেখও নেই। তারা আসলে সনাতন ধর্মের একটি প্রাচীন ও আঞ্চলিক সংস্করণের অনুসারী। সেই দীনের চূড়ান্ত বিকশিত ও সবশেষ সংস্করণ আল্লাহ পাঠিয়েছেন শেষ নবীর মাধ্যমে। বহুবিধ কারণে এই মহাসত্য বুঝতে ব্যর্থ হওয়ায় একই ধর্ম আজ বহু ধর্মে বিভক্ত হোয়ে আছে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। তারা প্রত্যেকেই যদি এটা অনুধাবন করে যে, আমাদের স্রষ্টা এক, আমরা এক আদম-হাওয়া থেকে এসেছি, সেই সূত্রে আমরা ভাই-বোন, বিভিন্ন সময় যে সকল নবী-রসুল, অবতারগণ এসেছেন তারা সকলেই আমাদের মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত হোয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে নবী রসুল বোলে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের ঈমানের অঙ্গ এবং ফরদ। মানবজাতি এখন যে মহা সঙ্কটকাল অতিক্রম কোরছে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ, আমাদের উচিত স্রষ্টার বিধানের দিকে ফিরে যাওয়া, অবতার প্রেরণের ধারাবাহিকতায় শেষ অবতার, নবী, রসুল মোহাম্মদের প্রকৃত শিক্ষাকে গ্রহণ করা, বর্তমানের বিকৃতটি নয়। জীবনব্যবস্থা ছাড়া মানুষ চোলতে পারে না। সঠিক কোন জীবনব্যবস্থা খুঁজে না পাওয়ায় তারা স্রষ্টাহীন, আল্লাহহীন, ইহুদি-খ্রিস্টান বস্তুবাদী সভ্যতা দাজ্জালের প্রদত্ত জীবনব্যবস্থাগুলির অনুসরণ কোরছে, কিন্তু শান্তি পাচ্ছে না, নিরাপত্তা পাচ্ছে না। বরং দিন দিন মানুষ পশু পর্যায়ে উপনীত হোচ্ছে। দাজ্জালের অনুসারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার কোরছে, এজন্য তারা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ধর্মীয় দাঙ্গা বাঁধিয়ে রাখতে চায়। প্রকৃতপক্ষে দাজ্জালের অনুসারীরা কোন ধর্মই বিশ্বাস করে না। ওদের ধর্ম ক্ষমতা। কাজেই আপনারা যারা ধর্মের সত্যিকারের অনুসারী অন্তত আপনারা এক হোন, আপনারা যার যার ধর্মগ্রন্থে কি বলা আছে সেটা অনুসরণ কোরুন। দেখবেন সকল ধরণের দাঙ্গা, ফাসাদ, সন্ত্রাস নির্মূল হোয়ে যাবে, হোতে বাধ্য।
[লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও যামানার এমামের অনুসারী, ]