Tuesday, February 23, 2016

মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায় ঢিলেঢালাভাবে

মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায় ঢিলেঢালাভাবে

মাহবুব আলী:
এই দীনের নেতারা, ওলামা, আল্লামা, ফুকাহা, মোহাদ্দেসিন, মুফাস্সেরিন সবাই একমত যে আকিদা সহীহ অর্থাৎ সঠিক না হলে ঈমানেরও কোন দাম নেই এবং স্বভাবতই ঈমান ভিত্তিক সব আমল অর্থাৎ সালাহ্ (নামাজ), যাকাহ, হজ্ব, সওম (রোজা) এবং অন্যান্য কোন ইবাদতেরই আর দাম নেই, সব অর্থহীন। তাদের এই অভিমতের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু বর্তমানের এই বিকৃত ইসলামে আকিদার অর্থ করা হয় ঈমান। এটা ভুল। আকিদার প্রকৃত অর্থ হলো কোন বিষয় সম্বন্ধে সঠিক ধারণা। কোন জিনিস দিয়ে কী হয়, ওটার উদ্দেশ্য কী, ওটাকে কেন তৈরি করা হয়েছে তা সঠিক ভাবে বোঝা। সালাহ্ সম্বন্ধে সঠিক আকিদা কী? অত্যন্ত সংক্ষেপে সঠিক আকিদা হলো: আল্লাহ তাঁর শেষ রসুলকে পাঠালেন এই দায়িত্ব দিয়ে যে, তিনি যেন আল্লাহর দেয়া হেদায়াহ ও সত্যদীন পৃথিবীর অন্য সব দীনের ওপর প্রতিষ্ঠা করেন, এবং নিজে এই কথার সাক্ষী রইলেন (কোরান- সুরা ফাতাহ ২৮)। এই হেদায়াতই হলো তওহীদ, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, সিরাতুল মুস্তাকীম; এবং সত্যদীন হলো ঐ তওহীদের ওপর ভিত্তি করা জীবন-ব্যবস্থা, শরিয়াহ, দীনুল ইসলাম, দীনুল কাইয়্যেমাহ। এই কাজের অর্থাৎ এই সত্যদীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার তরিকা, প্রক্রিয়া অর্থাৎ কোন্ নীতিতে এই কাজ করা হবে তাও আল্লাহ নির্ধারিত কোরে দিলেন এবং সেটা হলো কেতাল, সশস্ত্র সংগ্রাম, যুদ্ধ। প্রশিক্ষণ ছাড়া, চরিত্র গঠন ছাড়া যুদ্ধ কোরে জয়লাভ সম্ভব নয়, থাম-খুঁটি, পিলার ছাড়া ছাদ রাখা সম্ভব নয়, কাজেই সেই চরিত্র গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত কোরে দিলেন সালাহ্ এবং এই সালাহ্-কেও ফরদে আইন অবশ্য কর্তব্য, (Must) কোরে দিলেন (সুরা বনি এসরাঈল ৭৮)।
আজ মুসলিম দুনিয়ায় সালাতের সম্বন্ধে আকিদা কী? সালাহ্ চরিত্র গঠনের মুখ্যত দুর্ধর্ষ, অপরাজেয় যোদ্ধার চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া; এই আকিদা বদলে একে অন্যান্য ধর্মের মতো ইবাদতের, উপাসনার শুধু আত্মিক উন্নতির প্রক্রিয়া বলে মনে করার ফলে আজ সেই যোদ্ধার চরিত্র গঠন তো হয়ই না এমন কি সালাতের বাহ্যিক চেহারা পর্যন্ত বদলে গেছে। আল্লাহর রসুলের বহুবারের দেওয়া তাগীদ- সাবধান বাণী- তোমাদের সালাতের লাইন ধনুকের ছিলার মতো সোজা কর, নাহলে আল্লাহ তোমাদের মুখ পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেবেন, তাঁর আদেশ- তোমাদের মেরুদণ্ড, ঘাড় সোজা কোরে সালাতে দাঁড়াও এ সমস্ত কিছুই আজ ভুলে যাওয়া হয়েছে। এসব হুকুম না মুসুল্লীদের মনে আছে, না ইমামদের মনে আছে। কাজেই ঐ সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের সালাহ্ আজ নুব্জ, বাঁকা লাইনের; বাঁকা পিঠের মুসুল্লী ও ইমামদের মরা সালাহ্। আল্লাহ কোর’আনে সুরা নিসার ১৪১-১৪২ নং আয়াতে মুনাফিকদের সালাতের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন- মুনাফিকরা শৈথিল্যের সাথে সালাতে দাঁড়ায়। আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘কুসালা’ যার অর্থ সাহস হারিয়ে ফেলা, অলসতা, ঢিলা-ঢালা ভাবে। বর্তমান বিশ্বের মুসলিম নামের এ জাতির সালাতের দিকে তাকালে কুসালা শব্দের অর্থ বুঝতে কারও কষ্ট হবে না। খুশু, খুজুর নামে এ জাতি ‘কুসালা’ শব্দের যথাযথ প্রয়োগ করছে। সমস্ত বিশ্বে বর্তমানে এই সাহসহীন সালাহ্-ই চলছে। এই মরা প্রাণহীন সালাতের পক্ষে বলা হয়- খুশু-খুজুর সাথে নামাজ পড়া উচিত। এই খুশু-খুজু কী? বর্তমানে বলা হয় সমস্ত কিছু থেকে মন সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন কোরে আল্লাহর প্রতি মন নিবিষ্ট করা হচ্ছে খুশু-খুজু; অর্থাৎ এক কথায় ধ্যান করা।
প্রশ্ন হচ্ছে, সালাতে আল্লাহকে ধ্যান করাই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে আল্লাহ সালাতের প্রক্রিয়া, নিয়ম-কানুন এমন কোরে দিলেন কেন যাতে ধ্যান করা অসম্ভব। খুশু-খুজুু অর্থাৎ ধ্যান করাই আল্লাহর উদ্দেশ্য হলে সালাতের নিয়ম হতো পাহাড়-পর্বতের গুহায়, কিম্বা খানকা বা হুজরায় অথবা অন্ততপক্ষে কোন নির্জন স্থানে ধীর-স্থিরভাবে একাকী বোসে চোখ বন্ধ কোরে মন নিবিষ্ট কোরে আল্লাহর ধ্যান করা। সালাহ্ কি তাই? অবশ্যই নয়, সালাহ্ এর ঠিক উলটো। বহু জনসমাবেশের মধ্যে যেয়ে সেখানে ধনুকের ছিলার মতো সোজা লাইন কোরে দাঁড়িয়ে সৈনিকের, যোদ্ধার মতো ঘাড়, মেরুদণ্ড লোহার রডের মতো সোজা কোরে, ইমামের তকবিরের (আদেশের) অপেক্ষায় সতর্ক, তটস্থ, থাকা তারপর তকবিরের সঙ্গে সঙ্গে সকলে একত্রে রুকু, সাজদায় যাওয়া, ওঠা, সালাম দেয়া অর্থাৎ ইমামের (নেতার) আদেশ পালন করা। সালাতের প্রায় ১১৪ টি নিয়ম-পদ্ধতির প্রতি লক্ষ্য রেখে, সেগুলি যথাযথভাবে পালন কোরে ঐ খুশু-খুজুর সাথে অর্থাৎ ধ্যানের সাথে সালাহ্ সম্পাদন করা যে অসম্ভব তা সাধারণ জ্ঞানেই (Common sense) বোঝা যায়। অথচ ঐ নিয়ম-পদ্ধতি সঠিক ভাবে, যথাযথ ভাবে পালন না কোরে যেমন-তেমন ভাবে সালাহ্ পড়লে তা আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। আল্লাহর রসুল বলেছেন- তোমরা পূর্ণভাবে সালাহ্ কায়েম করো, কেননা আল্লাহ পূর্ণ ব্যতীত সালাহ্ কবুল করেন না [আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে]। তিনি আরও বলেছেন- তোমাদের কাহারও সালাহ্ পূর্ণ (সঠিক) হবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ যেভাবে আদেশ করেছেন ঠিক সেইভাবে কায়েম করবে (আবু দাউদ)। আল্লাহ-রসুলের আদেশ মোতাবেক সমস্ত নিয়ম-কানুন যথাযথ পালন কোরে অর্থাৎ পূর্ণ সঠিকভাবে সালাহ্ কায়েম করলে বর্তমানে মুসুল্লীরা খুশু-খুজু বলতে যা বুঝেন তা অসম্ভব। খুশু-খুজুর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে- মুমিন যখন সালাতে দাঁড়াবে তখন তার মন পৃথিবীর সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাগ্র হবে সালাতে; সে সমস্ত ক্ষণ সচেতন থাকবে যে সে মহামহীম আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আল্লাহর বিরাটত্ব ও তার নিজের ক্ষুদ্রতা সম্বন্ধে সে থাকবে সর্বদা সচেতন, আর সেই সঙ্গে একাগ্র হয়ে থাকবে ইমামের (নেতার) তকবিরের (আদেশের) প্রতি, সালাহ্ সঠিকভাবে, নিখুঁতভাবে সম্পাদন করতে। এই হলো খুশু-খুজু।

ওদের জীবনে কবে আসবে বসন্ত???

ওদের জীবনে কবে আসবে বসন্ত???



রাকীব আল হাসান
দিনপঞ্জীর শুকনো পাতা দেখে হিসেব মিলালাম বসন্তের আগমন ঘটেছে। ঋতুরাজের সাক্ষাৎ লাভের আশায় বেরিয়েছিলাম রাস্তায়। গ্রামে ফেলে আসা বসন্তের অতীত স্মৃতি মনে মনে ভাবছিলাম- প্রকৃতি দক্ষিণা দুয়ার খুলে দিয়েছে। দুয়ারে বইছে ফাগুনের হাওয়া। বসন্তের আগমনে কোকিল গাইছে গান। ভ্রমরও করছে খেলা। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এত বর্ণিল সাজ।
মনে মনে আবৃত্তি করছিলাম রবিঠাকুরের সেই কবিতার লাইনগুলো-
ফালগুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল,
ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল।
চঞ্চল মৌমাছি গুঞ্জরি গায়,
বেণুবনে মর্মরে দক্ষিণবায়।
এতো কেবলই স্মৃতিগাঁথা। বাস্তবতা যা দেখলাম তা তো সম্পূর্ণ উল্টো। কোথাও পেলাম না বসন্তের ছোঁয়া। ফুলের সুবাস নেই, আছে নর্দমার দুর্গন্ধ। কোকিলের কুহু কলতান শুনতে পাইনি, কেবলই কর্কশ কাকা ধ্বনি আসছিলো কানে। পলাশ-শিমুলের গাছ কোথায়, বিল্ডিং এর পর বিল্ডিং, সামান্য অক্সিজেন প্রদান করবার মতো সাধারণ বৃক্ষও খুঁজে পাওয়া যায় না। খাচায় বন্দী পাখির মতো কিছু ফুলগাছ দেখেছি বড় বড় বিল্ডিঙের বারান্দায়, ছাদে। খাচায় বন্দী পাখিকে কিছু দিয়ে কি আনন্দিত করা যায়? প্রকৃতি ক্রন্দন করছে মানুষের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য। প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া কোথায়?
দেখলাম বস্তির ছেলেগুলোকে ডাস্টবিনের নোংরা খাবার খেতে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে গার্মেন্টস কর্মীদের ছোটাছুটি, দরিদ্র মানুষগুলোর করুণ দৃষ্টি, রিক্সাওয়ালাদের ঘামা শরীর আর খিটখিটে মেজাজ, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক, খাদ্যের সন্ধানে ছুটেছে ক্ষুধার্ত কুকুরগুলো, সাথে মানুষও। বসন্ত শব্দটি তাদের কাছে হয়ত অপরিচিত। ফুল আর কোকিলের ডাক তাদের হৃদয় কাড়বে না, তাদের চাই একটুখানি ভাত, এক টুকরো রুটি। গাছে গাছে যদি রুটি ধরত আর কোকিল যদি ভাত ছিটিয়ে বেড়াত তবে হয়ত তারা বসন্তের নামটা জানত ভালোমতোই।
মার্সিডিস গাড়িতে ছুটে চলা মানুষকেও দেখলাম, সাথে কুকুরও। মসজিদ পানে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া নির্বিকার মুসল্লিদের দেখলাম, বসন্তকে বরণ করতে বাসন্তীরং শাড়ি পরা রমণীদেরও দেখলাম, কপোত-কপোতীদের নির্লজ্জতা দেখলাম— ফুল ফুটুক বা নাই ফুটুক বসন্ত এদের জীবনে সবসময় লেগে থাকে কিন্তু সবার জীবনে বসন্ত কবে আসবে জানি না। আমি বসন্ত খুঁজে পাইনি, আমি যে ক্ষুধার্ত, হাড্ডিসার মানুষগুলো দলে। মার্সিডিস গাড়িতে বসে থাকা সাহেববাবু, মসজিদে ছুটে চলা মুসল্লি, বাসন্তী রং এর পোশাক পরাদের দলে এখনো ভিড়তে পারিনি।

‘অল্পে তুষ্টি’ অর্থ স্বেচ্ছায় দরিদ্রতা বরণ নয়

‘অল্পে তুষ্টি’ অর্থ স্বেচ্ছায় দরিদ্রতা বরণ নয়


হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

অল্পে তুষ্ট থাকা মো’মেনের অনন্য বৈশিষ্ট্য- এটা ঠিক, কিন্তু আজকাল এই ‘অল্পে তুষ্টি’কে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তা ঠিক নয়। বর্তমানে রসুলের হাদীস থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়, যেখানে রসুলাল্লাহ বলেছেন, অঢেল সম্পদ থাকলেই ঐশ্বর্যশালী হওয়া যায় না, বরং মনের ঐশ্বর্যই প্রকৃত ঈশ্বর্য (বোখারী, মুসলিম)। এছাড়াও রসুলাল্লাহ ও তাঁর আসহাবগণের জীবনী থেকে বিভিন্ন ঘটনার অবতারণা ঘটিয়ে অনেকে দেখাতে চান যে, তাঁরা খুব অনাড়ম্বর, সাদাসিধে, প্রকারান্তরে দরিদ্র জীবনযাপন করেছেন, ছেঁড়া পোশাক পরেছেন, অনেক সময় প্রায় অভুক্ত থেকেছেন। কাজেই আমাদেরও অল্পে তুষ্ট থেকে ঐরূপ জীবনযাপন করা উচিত। এই চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে অনেক ধর্মভীরু মানুষ বেশি অর্থোপার্জন করাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। তারা শুধু জীবনধারনের জন্য ন্যূনতম যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু রোজগার করাকেই যথোচিত জ্ঞান করে তার বেশি পরিশ্রম করা বা আর্থিকভাবে আরও স্বচ্ছল হওয়ার প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকেন, অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বেচ্ছায় দরিদ্রতা বরণ করে নেন। বেশি ধন-সম্পদের মালিক হলে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে, আল্লাহর কাছে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে, হাশরের ময়দানে তীল পরিমাণ সম্পদের সঠিক হিসাব প্রদান না করে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না- আলেম মাওলানাদের এমন সাবধানবাণী স্মরণ করে তারা দরিদ্র জীবনকেই কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন আর ভাবেন, পৃথিবীর জীবন যেহেতু পরকালের তুলনায় কিছুই না, কাজেই অল্পে তুষ্ট থেকে কোনো রকমে আলুসিদ্ধ ডাল খেয়ে জীবনটা পার করে যেতে পারলেই হলো।
এখানে আমার ভিন্নমত রয়েছে। অল্পে তুষ্টি অর্থ স্বেচ্ছায় দরিদ্রতা বরণ করা নয়। ইচ্ছা করে দরিদ্রতা অবলম্বন করাই বরং গুনাহ্র কাজ। কারণ, তার এই কাজে না সে নিজে লাভবান হয়, না মানবজাতি লাভবান হয়। অল্পে তুষ্টির অর্থ ভিন্ন। একটি উদাহরণ। ধরুন আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অনেক আয় রোজগার করলেন, যা আপনার প্রাথমিক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। এই রোজগার থেকে আপনি একশ’টি শার্ট কিনলেন। তার মধ্যে নিজের জন্য বিশটি শার্ট রেখে বাকি আশিটি শার্ট আপনি সমাজের গরীব-দুঃখী, ছিন্নমূল মানুষকে দান করে দিলেন। আপনি ইচ্ছা করলে কিন্তু সবগুলো শার্টই নিজের ও পরিবারের জন্য রাখতে পারতেন, বিষয়টি আপনার ইচ্ছাসাপেক্ষ, বৈধভাবে উপার্জিত টাকায় আপনি একশ’ কেন হাজারটা শার্টও ক্রয় করতে ও ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু আপনি শুধু নিজের কথা চিন্তা না করে সমাজের কথাও ভাবলেন এবং আপনার উপার্জিত সম্পদ থেকে আপনার পাশাপাশি সমাজের আশিটি দুস্থ পরিবার উপকৃত হলো। কিন্তু শুধু ন্যূনতম খাওয়া-পরার চিন্তা করে সামান্য কিছু উপার্জন করেই ক্ষান্ত থাকলে, নিজের ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ বিশটি শার্ট হয়তো আপনি ক্রয় করতে পারতেন কিন্তু তার দ্বারা সমাজ কখনই উপকৃত হতো না।
একইভাবে ধরুন আপনার দশ লক্ষ টাকা আছে। ইচ্ছা করলেই আপনি একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন ভিন্ন। ভাবলেন- পৃথিবীতে একটি ছোট ঘর হলেই হবে, এখানে এর বেশি কিছু দরকার নাই, যা নেবার আমি পরকালে আল্লাহর কাছে নেবো। এই ভেবে আপনি যদি এক লক্ষ টাকার ছোট একটি ঘর তৈরি করে বাকি নয় লক্ষ টাকা আর্তপীড়িত গৃহহীন মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে ব্যয় করেন তাহলে আপনি অল্পে তুষ্ট থাকলেন। এটাকে বলে অল্পে তুষ্টি। কিন্তু আপনি চেষ্টা করলেন না, পরিশ্রম করলেন না, আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্যকে কাজে লাগালেন না, উপায়-উপার্জন করলেন না, ইচ্ছা করে কুঁড়ে ঘরে থাকলেন, ছেঁড়া ছ্যান্ডেল পরলেন, পান্তা ভাত খেলেন, আর বললেন আমি অল্পে তুষ্ট সেটা মানা যায় না। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অল্পে তুষ্টির অজুহাতে সে সামর্থ্যকে ব্যবহার না করাটাই বড় অন্যায়। স্বেচ্ছায় দরিদ্রতা বরণ না করা, পরিশ্রম করে অর্থোপার্জন করা এবং প্রতিবেশিকে সেই অর্থ থেকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে রসুলাল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেন- “আমি তোমাদেরকে অবহিত করছি যে, দুনিয়ায় যত নবী-রসুল এসেছেন তাদের সবাই রেযেক হাসিলের জন্য চেষ্টা- সাধনা করতেন এবং নিজেদের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতেন না। অতএব তোমরাও রুযী হাসিলের জন্য কোশেশ করো। মেহনত-মজদুরী করা এবং লাকড়ির বোঝা নিজের মাথায় উঠানো অন্যের কাছে সওয়াল করার চেয়ে উত্তম। যার জীবিকা উপার্জনের সামর্থ্য রয়েছে অন্যের কাছে চাওয়া তার জন্য খুবই অসম্মানজনক। সে দুনিয়াতেও লান্ছিত এবং শেষ বিচারের দিনও তাকে এমন অবস্থায় হাযির করা হবে যে তার চেহারায় গোশত থাকবেনা। আমি পরিষ্কারভাবে তোমাদের বলছি, যার কাছে একদিনের খাদ্যও মওজুদ রয়েছে তার জন্য সওয়াল করা অবশ্যই হারাম। আমি জানি, কোনো কোনো সংসারত্যাগী ভিক্ষাবৃত্তিকে জায়েয বলে, কিন্তু ইসলাম হাত-পা গুটিয়ে বসা এবং ভিক্ষাবৃত্তি এখতিয়ার করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম আমাদের হুকুম করেছে যে, দুনিয়ায় ছড়িয়ে যাও এবং আল্লাহর করুণা তালাশ করো। যে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বাঁচবে, নিজের পরিবার-পরিজনের পর-ওয়ারিশ করা ও প্রতিবেশীর সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য হালাল উপায়ে জীবিকা হাসিল করবে সে কেয়ামতের দিন পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জল চেহারা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাযির হবে। দুনিয়াতেও তার জন্য সম্মান ও প্রতিপত্তি রয়েছে। [মহানবীর ভাষণ, সিরাত বিশ্বকোষ, ইফাবা]
সুতরাং আমি অল্পে তুষ্ট এ কথা তখনই বলা যাবে যখন আমি সর্বোতভাবে প্রচেষ্টা চালাবো এবং আমার সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে উপার্জন করার পর নিজের জন্য নিতান্তই প্রয়োজনীয় ব্যয় করব আর বাকি সবটুকু অন্য মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেব। এটাই হলো মো’মেনের অল্পে তুষ্টি। কিন্তু কোনো প্রচেষ্টা না করে ইচ্ছা করে দরিদ্র হলাম, যা দ্বারা আমি ও আমার সমাজ কেউই উপকৃত হলো না, এটা অল্পে তুষ্টি নয়।

ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার উত্তরাধিকার

ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার উত্তরাধিকার



রিয়াদুল হাসান
মানবজাতির ইতিহাসে ধর্মের অধ্যায়টি বিরাট। এ বিরাট অধ্যায়ের দিকে তাকানোর জন্য আমাদের সামনে এখন দুটো চশমা রয়েছে। একটি ধর্মহীন চশমা, আরেকটি ধর্মের চশমা। এ দুটো চশমায় আমাদের অতীত দুটি ভিন্ন প্রকৃতি নিয়ে ধরা পড়ে।
ধর্মহীন চশমা বলছে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এমনিতেই সৃষ্টি হয়েছে, এর কোনো স্রষ্টা নেই। সকল জীব ও জড়ও এমনি এমনিই সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণীকুলের মধ্যে কেউ উন্নত, কেউ অনুন্নত যা নির্ণিত হয়েছে তাদের অভিযোজনের ক্ষমতার তারতম্য দ্বারা। মানুষ (খুব সম্ভবত) একটি বানরজাতীয় বিবর্তিত প্রাণী, যার আদিপিতা-পিতৃব্যরা গাছে থাকত, তাদের লেজ ছিল। খুলির আকৃতির পার্থক্য অনুযায়ী তারা নিগ্রয়েড, ককেশয়েড, মঙ্গলয়েড, অস্ট্রালয়েড ইত্যাদি শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত।
আর ধর্মের চশমা বলছে, এই বিশ্বজগৎ নিজে থেকে সৃষ্টি হয় নি, এর একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি নিরন্তর এটি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিপালন করছেন। তিনি বিশ্বজগতে এমন কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম, ব্যবস্থা বা চক্র আরোপ করেছেন যার দ্বারা সকল বস্তু ও প্রাণির সৃষ্টি, পালন, বাস্তুসংস্থান, ধ্বংস ইত্যাদি সাধিত হয়। মানুষ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ ও ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি যার উদ্ভব জান্নাতে, যার আদিপিতা আদম (আ.), আদিমাতা হাওয়া (আ.)। তাদের থেকেই আজকের সকল হিন্দু, সকল বৌদ্ধ, সকল মুসলিম, সকল খ্রিষ্টান, আর সকলেই।
একটি চশমা দিয়ে তাকালে দেখি নূহ (আ.), ইব্রাহীম (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.) ইত্যাদি বহু উজ্জ্বল নাম। অন্য চশমায় তাদেরকে দেখা যায় না, সেখানে আছে বস্তুবাদী দার্শনিক আর বিভিন্ন রাজবংশের নাম। একটি চশমা বলছে, মানব ইতিহাস নবী-রসুলদের মাধ্যমে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রামের ইতিহাস, ধর্মের দ্বারা মানবজাতির শান্তি পাওয়ার ইতিহাস। অন্য চশমাটি বলছে মানুষের অতীত অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল ধর্ম নামক কুসংস্কার ও বর্বরতা দ্বারা। বর্তমানে ধর্ম বিদায় নিয়েছে, মানুষ অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
বর্তমানে আমরা জাতি হিসাবে দ্বিধাগ্রস্ত, ধর্ম ও আধুনিকতা একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দণ্ডায়মান, দু নৌকায় পা দিয়ে আছি আমরা। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি উজ্জ্বল আকর্ষণ নিয়ে হাতছানি দিচ্ছে, ধর্ম ক্রমেই বিবর্ণ ও আকর্ষণহীন বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্তের কণিকায় মিশে আছে যা বাদ দেওয়া সহজ নয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টির যে প্রচেষ্টা বিগত শতাব্দীগুলোতে চালানো হয়েছে তা খুবই সফল হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এই দ্বিধা ও সন্দেহ সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। উপরে যে দুটো চশমার কথা বললাম, বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা, বিশেষ করে মুসলিম নামধারীরা এ দুটো চশমা দিয়েই নিজেদের ইতিহাসকে দেখতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তি থেকে জাতীয় জীবনের সর্বত্র।
এ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মকে রাখা হয়েছে নামে মাত্র। এস.এস.সি পর্যন্ত ধর্মের যেটুকু রাখা হয়েছে সেটুকুর উদ্দেশ্য নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান। কারণ এটা অস্বীকার করার মত অবস্থা এখনও সৃষ্টি হয় নি যে, সকল ভদ্রতা, শিষ্টাচার, সত্যনিষ্ঠা ধর্মেরই অবদান। ধর্ম বইতে বলা হচ্ছে সমস্ত কিছুর মালিক স্রষ্টা, অথচ অন্য সকল বইয়ে ‘আল্লাহ’ শব্দটিও খুঁজে পাওয়া মুশকিল, এমনভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বতে অস্বীকার করা হয়েছে। আর ধর্মকে সবচেয়ে গুরুত্বহীন বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। যে ধর্ম সেখানে শেখানো হচ্ছে সেটাও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই আলোচনা করে, সামষ্টিক জীবন কীভাবে চলবে তা শেখানোর জন্য আছে অন্যান্য বিষয়সমূহ। এটা হচ্ছে মানবজাতিকে ধর্মবিমুখ করে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া। কিন্তু পাশ্চাত্যে নানা কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা সফল হলেও প্রাচ্যে এটি কয়েক শতাব্দী পরও খাপ খাচ্ছে না। বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে একটু গভীরে যেতে হবে।
‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ দর্শনটি উনিশ শতকে যুক্তরাজ্য থেকে প্রথমত উদ্ভূত হয়েছে। ১৮৪৬ সালে জর্জ জ্যাকব হোলিওক (George Jacob Holyoake) নামক এক ব্যক্তি সেকুলারিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। Oxford Dictionary-তে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism)-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, Belief that religion should not be involved in the organization of society, education, etc. অর্থাৎ সমাজ কাঠামোতে ধর্মকে সম্পৃক্ত করা যাবে না এমন বিশ্বাস পোষণ করাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এ মতবাদের অনুসারী (Secular) স¤পর্কে বলা হয়েছে, Not connected with spiritual or religious matter যিনি আধ্যাত্মিক বিষয় বা ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নন।
মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে যুক্তি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার নামে Enlightenment Movement-এর ফসল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এর উদ্ভব হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের মাধ্যমে এর অনুসারীরা মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মানবসভ্যতার ইতিহাসে স¤পূর্ণ নতুন দর্শন আমদানি করলেন যে, রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে ধর্মের কোনো স¤পর্ক নেই; ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অন্তরের ব্যাপার; অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা প্রভৃতি থেকে ধর্মকে দূরে রাখতে হবে। তাদের মূল বক্তব্য ছিল, যুক্তি (logic)-ই জীবন পরিচালনার ভিত্তি হবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহপ্রদত্ত নির্দেশনার (divine guidance) কোনো প্রয়োজন নেই। ইউরোপে এই আন্দোলনের সফলতার ফলে ধর্মহীন যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠল, তাতে মানুষ নিতান্তই স্বার্থপর হয়ে গেল, ভোগবাদী হয়ে পড়ল, পূর্বপুরুষ ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গেল। সর্বোপরি নীতিবোধের লোপ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ই এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে প্রকাশ পেল।
মূলত নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ ব্যতীত একটি কল্যাণকর মানবসমাজ কল্পনা করা যায় না। আর নৈতিক শিক্ষার মূল বিষয়টি ধর্মীয় শিক্ষা থেকে উৎসারিত। মানবসমাজে বিরাজিত সকল নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলো, অতিপ্রাকৃতিক শক্তি তথা সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস। এ বিশ্বাসই ব্যক্তিমানুষকে তাঁর আদেশ ও নিয়ম অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করে, পৃথিবীতে ও পরলোকে কু-কর্মের শাস্তি স¤পর্কে অবহিত করে এবং ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হতে উৎসাহ দেয়। স্রষ্টায় বিশ্বাসের কারণেই ব্যক্তি সবচেয়ে গোপন ও নিরাপদ জায়গাতেও শত প্রলোভন সত্ত্বেও অনৈতিক কোনো কাজে জড়িত হতে পারে না। কিন্তু এ বিশ্বাসের বীজ যার হৃদয়ে বপিত হয় নি তার কাছে নৈতিকতা অর্থহীন মনে হয়। ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত নৈতিক শিক্ষা ভঙ্গুর ও বিক্ষিপ্ত। এমন কি এগুলোর আদি উৎসও বিভিন্ন ধর্ম। ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে যে নৈতিক শিক্ষার কথা বলা হয় তাতে ব্যক্তি নিজের বিবেকের কাছে তার দায়বদ্ধতার কারণে নীতি মেনে চলে। ফলে ব্যক্তি যেকোনো দুর্বল মুহূর্তে প্রলোভনে পড়ে কিংবা মানবিক দুর্বলতার কারণে তার নৈতিক গণ্ডির বাইরে চলে যেতে পারে। সে তো পরকালীন শাস্তির ভয়ে নীতি মানছে না, তাই একবার ভাঙলে আবার তা গড়ে তোলার শক্তিশালী অনুপ্রেরণা পায় না। সে ভাবে যে, নশ্বর এই পৃথিবীতে ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে জীবন কেটে গেলেই হলো।
সুতরাং ধর্মকে কাজে লাগিয়েই সামষ্টিক মানুষের চারিত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করা সম্ভব, অন্যভাবে নয়। তাই শিশুকাল থেকেই এ চরিত্রগঠনের প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি যে, ব্যক্তির মানসিক গঠনের উপযুক্ত সময় তার শৈশব ও কৈশোর। এ সময় শিশুকে যেভাবে শিক্ষা দেয়া হবে তার গন্তব্যও সেদিকেই হবে। আমরা সবাই চাই, আমাদের শিশুরা জ্ঞানে-গুণে, যোগ্যতা-দক্ষতায় অনন্য হোক এবং তাদের সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কল্যাণকর কাজে ব্যবহৃত হোক। অথচ তাদেরকে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সকল নৈতিকতার উৎস ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার শিক্ষাই দিয়ে থাকি। আমরা কি দেখছি না যে, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই আজ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, চরিত্র বিকিয়ে টাকার মালিক হওয়ার প্রতিযোগিতা, মিথ্যা আর জালিয়াতির ছড়াছড়ি। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্য যেমন মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি সেই মানুষগুলোকে মনুষ্যত্বসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা। বিকৃত ধর্ম সমাজকে আরো দূষিত করবে। প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা যেমন পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে দিতে হবে তেমনি দিতে হবে রাষ্ট্রের উদ্যোগের মাধ্যমে। রাষ্ট্রই শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন করে। আর সকল পরিবারের পক্ষে সমভাবে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নির্দিষ্ট চারিত্রিক কাঠামোয় তৈরি করা সম্ভব নয়। পরিবারের অজ্ঞতা বা অসচেতনতার কারণে যেন শিশু সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য সমগ্র জাতিকে এ ভার নিতে হবে। নীতিহীন, চরিত্রহীন মানুষ একটি দানব ছাড়া আর কিছু নয়, বিশেষ করে যখন সে কোনো ধ্বংসাত্মক শক্তির অধিকারী হয়ে যায়। এটা উপলব্ধি করে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পর The Philosophy of the Modern Education গ্রন্থে অধ্যাপক বার্বাস বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, “বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অনুশীলন না করলে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কারণ, মানুষ ধ্বংসের উপকরণ অনেক বেশি জোগাড় করে ফেলেছে।”

Sunday, February 7, 2016

স্রষ্টার অস্তিত্বের স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির উপর অনেক কিছু নির্ভর করে

স্রষ্টার অস্তিত্বের স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির উপর অনেক কিছু নির্ভর করে


মোহাম্মদ আসাদ আলী
সুস্থ মস্তিস্কের সচেতন মানুষমাত্রই জানেন- আত্মাহীন যান্ত্রিক উন্নতিতে ভর করে সমগ্র মানবজাতি দিন দিন নিশ্চিত ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলছে। মানুষ জানে এ পথ ধ্বংসের, এ পথ বিপদের, কিন্তু থেমে যেতে পারছে না। পারছে না কারণ প্রচলিত বস্তুবাদী সভ্যতা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
আত্মাহীন জীবনব্যবস্থাগুলো মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক সর্বগ্রাসী মহাদানবে পরিণত করেছে, পৃথিবীর কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত হয়ে বিশেষ একটি শ্রেণির হাতে জমা হচ্ছে যাদের কাছে একটি প্রাণের চেয়ে একটি বুলেটের মূল্য অনেক বেশি। অতি ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য সমগ্র মানবজাতিকে বিপদে ফেলতেও তারা পিছপা হচ্ছে না। এই কর্তৃত্ববাদী শক্তির শাসন ও শোষণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ একের পর এক জীবনব্যবস্থা পরিবর্তন করছে। রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র, গণতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে প্রবেশ করেছে, কিন্তু জীবনব্যবস্থার এই উত্থান পতন ধ্বংসের পথে মানুষের অগ্রযাত্রাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি। বরং এই জীবনব্যবস্থাগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বিশ্বযুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটে গেছে।
যে পথে চললে, যে জীবনব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা করলে মানুষ জাতি অপ্রতিরোধ্যভাবে তার আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাবে না, তার বুদ্ধি ও মনের, দেহের ও আত্মার এমন একটা সুষ্ঠু, ভারসাম্য মিশ্রণ দেবে যা তাকে দু’দিকেই উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবে- এমন পথ খুঁজতে গেলে সর্বপ্রথম মানুষকে একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে সিদ্ধান্তের উপর তার সাফল্য ও বিফলতা স¤পূর্ণভাবে নির্ভর করবে। সেটা হচ্ছে ধীরস্থির, নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত করা যে, এই পৃথিবী ও মহাবিশ্বের কোন স্রষ্টা আছেন, কি নেই।
সাধারণ বুদ্ধিতেই এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, মানুষ পৃথিবীতে কোন পথে কিভাবে চললে নিরাপত্তা ও শান্তির মধ্যে থাকতে পারবে তা স্রষ্টা থাকলে বা না থাকলে এই উভয় অবস্থাতেই একই হওয়া স¤পূর্ণ অসম্ভব। আরও সহজ করতে গেলে- আপনাকে যদি কোনও বিশেষ একটি দেশে যেতে হয়, তবে সর্ব অবস্থাতেই আপনার সিদ্ধান্ত কি একই হবে? যদি সেই দেশটাতে দৃঢ় আইন-কানুন, বিচারালয়, কর্তব্যনিষ্ঠ, দক্ষ পুলিশ থাকে, অথবা সেই দেশটাতে কোন সরকার, আইন-কানুন, পুলিশ এমনকি কোর্ট-কাচারী কিছুই না থাকে- এই উভয় অবস্থাতেই কি আপনি একইভাবে সেই দেশে প্রবেশ করবেন এবং একইভাবে বিচরণ করবেন? কোন দ্বিধা না করে বলা যায় যে- অবশ্যই নয়। প্রথম অবস্থায় আপনি একা এবং নিরস্ত্র সে দেশে প্রবেশ করবেন এবং নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াবেন এবং দ্বিতীয় অবস্থায় আপনি একা সে দেশে অবশ্যই প্রবেশ করবেন না। যদি যেতেই হয় তবে আপনি দল গঠন করবেন, অস্ত্র সজ্জিত হবেন এবং চলাফেরার সময় অত্যন্ত সতর্ক এবং সাবধান হবেন। যেহেতু দেশে আইন নেই তাই আপনার অস্ত্রই হবে আইন। অর্থাৎ ঐ দেশে একটা শক্তিশালী সরকার থাকা বা না থাকার উপর আপনার মত, পথ, কাজ সর্ব কিছু শুধু বদলাচ্ছে না একেবারে উল্টো হয়ে যাচ্ছে।
একইভাবে স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকা বা না থাকার উপর মানুষের চলার পথ, মত ও শান্তি-অশান্তি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। নাস্তিকদের দাবি মোতাবেক যদি তিনি না থাকেন তবে তো না-ই, সে ক্ষেত্রে মানুষের চলার পথ মানুষকেই ঠিক করে নিতে হবে যে চেষ্টা চলছে বিগত কয়েক শতাব্দীব্যাপী এবং যার পরিণাম হিসেবে মানবজাতি এখন ধ্বংসের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের চলার পথ নিজেরা ঠিক করে নিতে মানুষ অপারগ- এটা প্রমাণিত সত্য। অন্যদিকে যদি তিনি থেকে থাকেন তাহলে এটা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে, যেহেতু তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, মানুষের শরীর ও আত্মা, মানুষের দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তার চেয়ে ভালো আর কেউই জানে না, সুতরাং একমাত্র তিনিই পারেন এমন একটি জীবনব্যবস্থা মানুষকে দান করতে যা মেনে চললে মানুষ অনিবার্যভাবে রক্তপাতহীন ও অন্যায়-অবিচারহীন শান্তিময় জীবনযাপন করতে পারবে।
কাজেই স্রষ্টা আছেন কি নেই এই সিদ্ধান্তের উপর স¤পূর্ণ নির্ভর করছে মানুষের সত্যিকারের শান্তিময়, সুখী প্রগতির পথ কিম্বা বিপথ। মানব জাতি হিসাবে, মানুষ আজও এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নি, তাই তার মত ও পথের এত বিভিন্নতা, এত সংঘর্ষ। মানব জাতিকে সামগ্রিকভাবে আজ স্থির সিদ্ধান্ত নিতেই হবে যে স্রষ্টা আছেন কি নেই, কারণ আজ শুধু মানুষে মানুষে যুদ্ধ, রক্তারক্তি, হানাহানি, অশান্তি আর অশ্র“ নয়, এগুলো দিয়ে তার অতীত ও বর্তমান পূর্ণ হয়ে আছে- আজ বাজী তার একেবারে অস্তিত্বের।

Friday, February 5, 2016

গল্প নয়, সত্যি: মহত্ত্বে উথলি উঠে মহত্ত্ব জোয়ার

গল্প নয়, সত্যি: মহত্ত্বে উথলি উঠে মহত্ত্ব জোয়ার



মিসরের রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়া সিরিয়ার পরাজিত খ্রিষ্টান সৈন্যগণ মুসলিম বিজয়তরঙ্গ প্রতিরোধ করিতে এখানে তাঁহাদের সমস্ত ক্ষাত্রশক্তি কেন্দ্রীভূত করিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন; কিন্তু আমর ইবনুল আ’সের দুর্জয় শক্তির সম্মুখে আলেকজান্দ্রিয়াকেও মস্তক নত করিতে হইয়াছে। বিজয়ী সেনাপতি মিসরের শাসনভার গ্রহণ করতঃ তথাকার খ্রিষ্টান অধিবাসীগণকে সর্বপ্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতার অভয় বাণীতে আশ্বস্ত করিয়াছেন।
একদিন প্রভাতে খ্রিষ্টান মহল্লায় বিপুল চাঞ্চল্যের সঞ্চার হইল; বিক্ষুদ্ধ অধিবাসিগণ দলে দলে শহরের চকবাজারে সমবেত হইল, উত্তেজনাময়ী বক্তৃতা করিল এবং একটি প্রতিনিধি দল গঠন করতঃ প্রধান বিশপের অধিনায়কত্বে ‘আমরের গৃহে উপস্থিত হইল। ‘আমর সসম্মানে তাহাদিগকে অভ্যর্থনা করিলেন।
বিশপ ‘আমরের নিকট খ্রিষ্টান অধিবাসীদের বিক্ষোভের কারণ বিবৃত করিলেন। উপরোক্ত বাজারে যীশু খ্রিষ্টের একটি প্রস্তর মূর্তি ছিল। খ্রিষ্টানগণ পরম ভক্তির সহিত ঐ মূর্তির পূজা করিত। পূর্ব দিবাগত রাত্রিতে কে সেই মূর্তির নাসিকাভঙ্গ করিয়া লইয়া গিয়াছে। খ্রিষ্টানগণ সিদ্ধান্ত করিয়াছে যে, কোন মুসলমান ভিন্ন এ কাজ অন্য কেহ করে নাই।
‘আমর ইবনুল ‘আসও ঐরূপ সিদ্ধান্ত করিলেন এবং বিশপকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “আমি পরম মর্মাহত ও লজ্জিত হলাম। ইসলাম প্রতিমা নির্মাণ বা প্রতিমাপূজা সমর্থন করে না সত্য, কিন্তু অন্যের উপাস্য দেবদেবীর অবমাননাও সমর্থন করে না। আপনারা প্রতিমাটি মেরামত করে নিন, আমি সমস্ত খরচ দিয়ে দিচ্ছি।” বিশপ বলিলেন, “কিন্তু মেরামত করা অসম্ভব। কারণ মূর্তিটিতে নূতন নাসিকা বসান সাধ্যায়ত্ত নয়।” ‘আমর পুনরায় বলিলেন, “বেশ, তবে আপনারা সমগ্র মূর্তিটির ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করুন; আপনারা যে ক্ষতি নির্দেশ করবেন আমি তাই দিব।” বিশপ ইহাতে সম্মত না হইয়া বলিলেন, “দেখুন, আমরা যীশুকে আল্লাহর পুত্র বলে বিশ্বাস করি, সুতরাং তাঁর মূর্তির অপমানের ক্ষতিপূরণ তুচ্ছ টাকা-পয়সায় হতে পারে না। এর একটা মাত্র ক্ষতিপূরণ সম্ভব; আমরা আপনাদের পয়গম্বরের প্রতিমূর্ত্তি গঠন করে নিয়ে তার নাসিকা ভেঙ্গে ফেলব।”
আকস্মিক অগ্নিসংযোগে বারুদ স্তূপ যেমন জ্বলিয়া উঠে, ‘আমরের মুখ-মণ্ডল সহসা তেমনই জ্বলিয়া উঠিল। তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে যেন রক্ত ফুটিয়া বাহির হইতে লাগিল, শরীর কাঁপিতে লাগিল, হাত অজ্ঞাতসারে বার বার তলোয়ারের মুঠা চাপিয়া ধরিতে লাগিল, পরক্ষণেই আবার তিনি জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইতে লাগিলেন। ‘আমর আসন ত্যাগ করিয়া কিছুক্ষণ দ্রুত পায়চারি করিলেন, তৎপর ঠাণ্ডা পানি আনাইয়া চোখ-মুখ ধুইয়া ফেলিলেন। তিনি তখন শান্ত বিষণ্ণ স্বরে বিশপকে বলিলেন, “যে মহাপুরুষ আমরণ মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এক আল্লাহর উপাসনা প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাঁরই মূর্তি তাঁরই ভক্ত অনুচরদের সম্মুখে নির্মিত হবে, আর অপমানের সঙ্গে দ্বিখণ্ডিত হবে, তার আগে আমাদের ধন-মান সন্তান-সন্ততি এমনকি আমাদের প্রাণ বিনাশ হয়ে যাওয়া শ্রেয়। বিশপ, আপনি অন্য যে-কোন প্রস্তাব করুন, আমি গ্রহণ করতে রাজী, এমন কি প্রতিমার নাসিকার পরিবর্তে যদি আমাদের কারো নাসিকা কেটে দিতে হয়, তাতেও আমি অসম্মত নই।”
বিশপ শেষোক্ত প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করিলেন।
পরদিন পূর্বাহ্নে দলে দলে খ্রিষ্টান ও মুসলমান ময়দানে যাইয়া সমবেত হইতে লাগিল, অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে।
‘আমর উপস্থিত জনমণ্ডলীকে সম্বোধন করিয়া সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিলেন তৎপর তিনি বিশপকে সম্মুখে ডাকিয়া বলিলেন, “আপনি খ্রিষ্টানগণের প্রতিনিধি, আমিও মুসলিমগণের প্রতিনিধি। এদেশের শাসনভার আমার উপর, সে শাসনের ত্র“টিতে যদি আপনাদের ধর্মের অবমাননা হইয়া থাকে, তবে তার শাস্তি আমাকেই গ্রহণ করিতে হইবে। এই তলোয়ার নিন। আপনি অসঙ্কোচে আমার নাসিকা ছেদন করুন।” বলিতে বলিতে ‘আমর বিশপের হাতে তলোয়ার তুলিয়া দিলেন।
বিশপ তলোয়ার হাতে লইয়া উহার ধার পরীক্ষা করিতে লাগিলেন বিপুল জনসংখ্যা নিঃশ্বাস রোধ করিয়া নির্বাক বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। সহসা নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া পশ্চাদ্দিক হইতে দৌঁড়িয়া জনৈক মুসলিম সৈনিক চিৎকার করিতে করিতে অগ্রসর হইল“থামুন, থামুন, বিশপ, এই আপনার মূর্তির নাক; আর এই আসল অপরাধী; এই মূর্তি আমিই ভেঙ্গেছি; এ শাস্তি আমাকেই গ্রহণ করতে হবে, সেনাপতি সম্পূর্ণ নির্দোষ” বলিতে বলিতে সে বিশপের সম্মুখে আসিয়া নাসিকা বাড়াইয়া ধরিল।
আবার সে বিশাল জনমণ্ডলী নীরব বিস্ময়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চাহিয়া রহিল।
কম্পিত কণ্ঠে বিশপ বলিতে লাগিলেন, “ধন্য সেনাপতি, ধন্য সৈন্য, ধন্য এ জাতি, আর ধন্য সেই নবী যাঁর আদর্শে এমন মানুষ গড়ে উঠে। প্রতিমা ভাঙ্গা অন্যায় হয়েছে, কিন্তু এমন মানুুষের উপর এর প্রতিশোধ মহাপাপ হবে। আমাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করছি, আশীর্বাদ করছি, এদেশে আপনাদের রাজা চিরস্থায়ী হউক।”

তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো?

তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো?


রাকীব আল হাসান
ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ- একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে হুকুমদাতা হিসাবে না মানা। তওহীদের বিপরীত হচ্ছে শিরক বা অংশীবাদ। আল্লাহ ছাড়া কাউকে হুকুমদাতা হিসাবে গ্রহণ করাই অংশীবাদ। এটা এমন একটি অপরাধ যার ফলে একজন মুসলিম মুশরিক হয়ে যায়। যতক্ষণ না সে শিরক থেকে মুক্ত হলো, তার সকল ইবাদত, আমল ব্যর্থ হবে। কোনো কিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তাই শিরককে কেবল একটি গোনাহ বলা ঠিক হয় না, শিরক হচ্ছে ইসলাম থেকে বহির্গত হওয়ার প্রথম পথ। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তিনি শিরক ক্ষমা করবেন না। এ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন (সুরা নিসা ৪৮, ১১৬)। তাহলে আল্লাহর ঘোষণা মোতাবেক বুঝা গেল শিরক ক্ষমার অযোগ্য, এবং এর একমাত্র প্রতিফল স্থায়ী জাহান্নাম। সুতরাং মানুষের একান্ত উচিত অন্তত শিরক থেকে মুক্ত হওয়া, শিরক থেকে মুক্ত থাকলেই জান্নাত নিশ্চিত- সেটা ছোট জান্নাত হোক আর বড় জান্নাতই হোক। এখন বোঝা দরকার এই শিরক কী?
বর্তমানের বিকৃত ইসলামে- মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকায়, ওয়াজ মাহফিলে আলোচনায় সর্বত্র অন্যান্য কবীরা ও সগীরা গোনাহ যেমন মিথ্যা বলা, চুরি করা, ব্যভিচার করা, ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি না করার জন্য ওয়াজ নসিহত করা হয়ে থাকে। কিন্তু যে গোনাহটি কোনভাবেই ক্ষমা করা হবে না অর্থাৎ শিরক এই বিষয়টি তেমন কোনই গুরুত্ব পায় না। এর একমাত্র কারণ আকিদার বিকৃতি। বর্তমান ইসলামের ধর্ম ব্যবসায়ী আলেমরা কেবল আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সামনে সেজদা করাকেই শিরক বলে মনে করেন, যেমন মূর্তি পূজা, মাজার পূজা, পীরকে সেজদা করা ইত্যাদি। তারা আরও প্রচার করে যে, যেহেতু মুসলিম দাবিদার কেউ মূর্তিপূজা করে না তাই তারা শিরকও করে না। মাজার ও পীরপূজার সঙ্গেও অধিকাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত নয়। তাই তাদেরকে শিরক সম্পর্কে ওয়াজ করার প্রয়োজনও পড়ে না। তাদের প্রায়ন্ধ দৃষ্টিতে ঐ ১৪০০ বছর আগেকার কাঠ পাথরের মূর্তির সামনে মাথা নোয়ানো ছাড়া আর কোনো কাজকেই শিরক হিসাবে দেখতে পান না। মূর্তিপূজা, মাজার পূজা শিরক বটে, কিন্তু প্রকৃত শিরক হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও হুকুম মানা অর্থাৎ অন্যকে ইলাহ হিসাবে মানা, যে শিরকে এই জাতি আকণ্ঠ ডুবে আছে। আল্লাহ বলেন, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো? সুতরাং তোমাদের যারা এরূপ করে তাহাদের প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা, অপমান এবং কেয়ামতের দিন কঠিনতম শাস্তি (সুরা বাকারা ৮৫)” এখানে আল্লাহ পার্থিব জীবনেই যে শাস্তির কথা বলছেন, আজ মুসলিম বলে পরিচিত এই জাতির অবস্থা কি ঠিক তাই নয়? আল্লাহর দেওয়া বিধান হলো আল কোর’আন। এই কোর’আনের কিছু মানা, কিছু না মানাই হলো শিরক। এ ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না; এটা ছাড়া সব কিছু তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন (সুরা নিসা ৪৮, ১১৬)। আল্লাহর দেওয়া বিধান কোর’আন থেকে নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত এই কয়েকটি বিধান এ জাতি ব্যক্তিগতভাবে পালন করে, তাও বিকৃতরূপে কিন্তু জাতীয় ও সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহর দেওয়া বিধান যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, দণ্ডবিধি, শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি বাদ দিয়ে মানুষের এবং ইহুদি-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের তৈরি বিধান মেনে চলছে। এই শিরকই হচ্ছে বড় জুলুম (সুরা লোকমান ১৩)। কাজেই এখন এ জাতির জন্য বিভিন্ন গোনাহ সংক্রান্ত ওয়াজ নসিহতের চাইতে জরুরি হচ্ছে শিরক মুক্ত হওয়া আর শিরক মুক্ত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো আল্লাহর তওহীদে আসা, এছাড়া আর কোনো পথ নেই।