Monday, March 21, 2016

ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে হবে

ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে হবে


মোহাম্মদ মাসুদ রানা
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই ধর্মভীরু, তবে তারা ধর্মীয় বিষয়গুলির ব্যাপারে ধর্মব্যবসায়ী আলেম মোল্লা ও পুরোহিত শ্রেণির উপর নির্ভর করে। তারা জানেই না যে, এই শ্রেণিটি প্রকৃতপক্ষে ধর্মের ধারক-বাহক নয়, তারা ধর্মব্যবসায়ী, আগুনখোর, স্রষ্টা এদেরকে জাহান্নাম বা নরকের ভয়াবহ শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা-পুরোহিতদের প্রচারে সাধারণ মানুষ সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত হয়, অতীতে যা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ধর্মের নামে উন্মাদনা যুগে যুগে অশান্তির একটি মূল কারণ। সাম্প্রতিককালে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মিশর, সিরিয়া ইত্যাদি দেশগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর পিছনে মূল কারণ ছিল এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি। একই চিত্র দেখা যায় মিয়ানমারেও। বৌদ্ধ ধর্মব্যবসায়ীরা মানবতার মূর্ত প্রতীক গৌতম বুদ্ধের (আ:) অহিংস বাণীর কবর রচনা করে সেখানে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নির্মম নৃশংসতা চালিয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে যত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়েছে তার সবগুলোর পেছনেই এভাবে ইন্ধন যুগিয়েছে উভয় ধর্মের ধর্মযাজক, পুরোহিত শ্রেণির অপপ্রচার, উস্কানি। আবার মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কয়েক শতাব্দব্যাপী যে ক্রুসেড চলেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তার প্রধান কারণ রাজনৈতিক হলেও, তৎকালীন রাজারা তার বাস্তব রূপ দিতে পেরেছিল একমাত্র ধর্মযাজকদের সাহায্যেই। কারণ ধর্ম ভিন্ন অন্য কোনো উপায়ে ইউরোপকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। এ কথা বুঝেই ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো খ্রিস্টান জগৎকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল খ্রিস্টান পোপ বা ধর্মযাজকরা।
এটা সন্দেহাতীত বিষয় যে, স্রষ্টা প্রেরিত সকল ধর্মই এসেছে মানবতার কল্যাণে, মানুষকে শান্তি দেওয়ার জন্য, মুক্তি দেওয়ার জন্য, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য নয়, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য নয়। ব্যবসায়ীরা যেমন অধিক মুনাফা লাভের জন্য নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে, সুযোগ বুঝে স্বার্থোদ্ধার করে, তেমনি ধর্মব্যবসায়ীরাও নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট বা জোট সৃষ্টি করে স্বার্থ হাসিলের জন্য “ধর্ম গেল – ধর্ম গেল” জিকির তুলে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে।
কাজেই এখন যদি সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া যায় যে, এই মোল্লা-পুরুতরা যে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করছে, যে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছে, সন্ত্রাস করছে সেটা স্রষ্টা প্রদত্ত প্রকৃত ধর্ম নয়, যুগে যুগে স্রষ্টা মানবজাতির হিতসাধনের নিমিত্তে যে ধর্ম পাঠিয়েছেন এগুলো তার বিপরীতমুখী ধর্ম, তাহলে সাধারণ মানুষ আর তাদের কোনো অপপ্রচারে কান দেবে না, তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করবে। ধর্মব্যবসায়ীদের প্রকৃত রূপ এবং তাদের প্রচারিত ধর্ম কিভাবে বিকৃত তা যদি আরও ব্যাপকভাবে মানুষের মাঝে প্রচার করা যায়, তবে আমাদের দেশ থেকে ধর্মীয় অন্ধত্ব, গোঁড়ামী, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় সন্ত্রাস, ধর্মব্যবসা এক কথায় ধর্মের নামে যা কিছু মিথ্যা সমাজে প্রতিষ্ঠিত আছে তা একেবারে নির্মূল হয়ে যাবে। ধর্মজীবী মোল্লা-পুরোহিতরা ধর্মের নামে কোনো হুজুগ বা উন্মাদনা সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন কোরতে পারবে না। প্রকৃত ধর্মের রূপ কেমন ছিল, নবী-রসুল-অবতারদের মূল শিক্ষা কী ছিল, তাঁরা সারা জীবন কিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, মানবজাতির প্রকৃত এবাদত কী, আকিদাবিহীন ঈমানের কোনো মূল্য নেই কেন- এসব বিষয় মানুষের সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরতে হবে। তবেই মানুষ সজাগ ও সচেতন হবে। তারা আর ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতারণার শিকার হবে না।

Sunday, March 20, 2016

ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে কারা???

ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে কারা???


মনিরুজ্জামান
ধর্ম কোনো পণ্য নয়, ধর্মীয় কাজ কোনো পেশা নয়। ধর্মীয় কাজ মানুষ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য, এর বিনিময়ও গ্রহণ করবে আল্লাহর কাছ থেকে। আল্লাহর সকল নবী-রসুল, অবতার, মহামানবগণও এই কথা ঘোষণা দিয়েছেন যে, আমি তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চাই না, আমার বিনিময় আল্লাহর কাছে। সুতরাং তাঁদের উম্মতের জন্যও একই বিধান। কিন্তু তা না করে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বড় জনগোষ্ঠী কিছু ধর্মীয় জ্ঞান আয়ত্ব করে সেটাকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পার্থিব স্বার্থ হাসিল করে থাকে। এই পার্থিব স্বার্থের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতাও আসে, মিলাদ পড়িয়ে, নামাজ পড়িয়ে টাকা নেওয়াও আসে, ভক্ত মুরিদকে আল্লাহর সান্নিধ্য এনে দেওয়ার নাম করে উপঢৌকন নেওয়াও আসে। যখনই এসব পার্থিব স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে ধর্মকে ব্যবহার করা হয় তখনই ধর্মে প্রবেশ করে বিকৃতি। অনেক কিছুই তারা বাণিজ্যিক স্বার্থে অতিরঞ্জন করেন, নিজেদের স্বার্থ বিরোধী যা কিছু থাকে তা গোপন করেন। যেহেতু তাদের ধর্মীয় কিছু জ্ঞান থাকে তারা যা বলেন মানুষ সেটাকে আল্লাহ-রসুলের কথা বলে গ্রহণ করে নেয়। তারা যখন কাউকে কাফের ফতোয়া দেয়, মানুষ ঐ ব্যক্তিকে (যাকে কাফের বলা হলো) ঘৃণা করে। এই ধর্মব্যবসায়ীরা আল্লাহর শত্র“, কারণ এরা আল্লাহর প্রেরিত সত্যকে বিকৃত করে, পার্থিব স্বার্থে ব্যবহার করে। পবিত্র কোর’আনে এবং হাদিসে ধর্মব্যবসার সবগুলি ধরন সম্পর্কেই নিষেধাজ্ঞা ঘোষিত হয়েছে, ধর্মকে বিক্রি করে পার্থিব সুযোগ সুবিধা, সম্পদ হাসিলের কোনো সুযোগ আল্লাহ রাখেন নি। তিনি একে কেবল হারামই করেন নি, তিনি বলেছেন, তারা পথভ্রষ্ট, তারা আগুন ছাড়া কিছুই খায় না। তিনি আখেরাতে তাদেরকে পবিত্র করবেন না, তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। যাদের গন্তব্য জাহান্নাম, তাদের অনুসারীরাও জাহান্নামেই যাবে এটাই স্বাভাবিক। তবুও আল্লাহ সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, তোমরা তাদের অনুরসণ করো যারা বিনিময় গ্রহণ করে না এবং সঠিক পথে আছে (সুরা ইয়াসীন ২১)। এই যে ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি, তারা কিন্তু এই সত্য বিষয়গুলি কখনো মানুষের সামনে প্রকাশ করে না। তারা সুদ, ঘুষের বিরুদ্ধে বয়ান করেন কিন্তু ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। এ প্রসঙ্গটি তারা গোপন রাখতে চান। তাদের একটি শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করতে মানুষের ধর্মীয় চেতনাকে কাজে লাগায়। তারা নিজেদেরকে ইসলামের ধারক হিসাবে প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধপক্ষকে ইসলামবিদ্বেষী হিসাবে ফতোয়া দেন। জনগণও তাদের কথায় প্রভাবিত হয়। কিন্তু এই শ্রেণিটি যে স্বার্থের হাতিয়ার হিসাবে ধর্মকে ব্যবহার করছে এবং তারা নিজেরাই যে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধ সেটা যখন প্রকাশ করে দেওয়া হবে তখন জনগণ তাদেরকে ধিক্কার দেবে। জনগণ যখন বুঝতে পারবে আল্লাহ তাদেরকে অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে অনুসরণ করলে জাহান্নামে যেতে হবে তখন জনগণও আর তাদের ডাকে সাড়া দেবে না। এভাবেই আমাদের দেশ থেকে, পৃথিবী থেকে ধর্মের নামে দাঙ্গা, ধর্মের নামে অপরাজনীতি, প্রতিহিংসা, সহিংসতা, ক্ষমতার জন্য, ব্যক্তিগত দলীয় স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হবে। মানুষের জীবন যেমন নিরাপদ হবে তেমনি তারা সুপথও পাবে। ইসলামে ধর্মব্যবসায়ীদের কোনো স্থান নেই, যে সমাজে তাদেরকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় সেই সমাজেও তারা অশান্তি বিস্তার করে।
[পাঠক মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ: ০১৭৮২১৮৮২৩৭, ০১৭১১০০৫০২৫] 

Saturday, March 19, 2016

ঈসা (আ.) দেখালেন- ‘মানবতা আগে’

ঈসা (আ.) দেখালেন- ‘মানবতা আগে’


শেখ মনিরুল ইসলাম
পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার, বৈষম্য, হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধ, রক্তপাত ইত্যাদি নির্মূল হতে পারে একমাত্র ঐক্যের সূত্র ধরে। এখন প্রয়োজন শুধু নিজ নিজ ধর্মের শাশ্বত শিক্ষায় সকল ধর্মাবলম্বীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। প্রশ্ন হচ্ছে- ধর্মের ঐ শাশ্বত শিক্ষা কী? এই শাশ্বত শিক্ষা হচ্ছে মানবতা। সকল ধর্মই মানবতার কথা বলে, মানবতার কল্যাণ সাধনে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিটি ধর্মের ধর্মগ্রন্থে যে মানবতাবোধ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তা যদি আজকের মানবজাতি অনুধাবন করতে পারত, সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হতো তাহলে সম্পূর্ণ পৃথিবীর চেহারাই পাল্টে যেত। আজ যেমন মানুষ অন্যায়-অবিচারের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে তার ঠিক বিপরীত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো, অর্থাৎ মানুষ শান্তির চির আকাক্সিক্ষত বাস্তবিক রূপ দেখতে পেত। মানবতা হলো ধর্মের আত্মা। দেহ থেকে আত্মা পৃথক করা আর ধর্ম থেকে মানবতা পৃথক করা একই কাজ। পরিণতিও অভিন্ন, অর্থাৎ মৃত্যু। যে দেহে আত্মা নেই সে দেহের কোনো মূল্য থাকে না, অচিরেই তা পচে-গলে নষ্ট হয়ে যায়, এক সময় তার আর অস্তিত্ব থাকে না। একইভাবে আজকের পৃথীবিতে প্রচলিত ধর্মগুলো মানবতা থেকে বহু দূরে সরে যাওয়ায় ধর্মগুলো মানুষের কোনো উপকারে আসছে না, বরং ধর্মই মানুষের অকল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা ধর্মের ব্যর্থতা নয়, ধর্মকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে মানুষের ব্যর্থতা।
বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জাতি হলো খ্রিস্টান। পৃথিবীতে প্রায় দু’শ কোটির অধিক খ্রিস্টধর্মের অনুসারী রয়েছেন। তারা যদি সত্যিকার অর্থেই যিশু খ্রিস্টের প্রদত্ত শিক্ষাকে অনুধাবন করে কার্যক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন তাহলে পৃথিবীর অশান্তির কিছুটা হলেও প্রশমিত হতো। যিশু খ্রিস্ট কী শিক্ষা দিয়েছেন? আসুন বাইবেলে বর্ণিত একটি ঘটনা থেকে তা জানার চেষ্টা করি।
পথ দিয়ে যাবার সময় ঈসা (আ.) একজন অন্ধ লোককে দেখতে পেলেন। অন্ধ ব্যক্তিটি জন্ম থেকেই অন্ধ ছিলেন। তাকে দেখে ঈসা (আ.) মাটিতে থুথু ফেলে কাদা করলেন। তারপর সেই কাদা তিনি অন্ধ লোকটির চোখে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও শীলোহের পুকুরে গিয়ে ধুয়ে ফেল। অন্ধ লোকটি তখন পুকুরে গিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলল। সে অভিভূত হয়ে গেল কারণ, সে চোখে দেখতে পাচ্ছিল। তার দৃষ্টিশক্তি তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে গেল। কেউ কেউ বলল, এ কি সেই লোক, যে কিছুক্ষণ পূর্বে ভিক্ষা করছিল? দৃষ্টি ফিরে পাওয়া ব্যক্তিটি বললেন, হ্যাঁ, আমি সেই লোক। ঈসা (আ.) আমার দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন।
বস্তুত দিনটি ছিল ইহুদিদের বিশ্রামবার। ইহুদি ধর্মের অন্যতম প্রধান বিধান হলো সপ্তাহে একদিন, শনিবার, জাগতিক কোনো কাজকর্ম না করে শুধু ধর্ম-কর্ম করা এবং সিনাগগে যেয়ে উপাসনা করা। এর নাম স্যাবাথ। ঈসা (আ.) দৃষ্টিহীনকে দৃষ্টিশক্তি দান করে সেই স্যাবাথের নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন। এতে ইহুদি ধর্মীয় নেতা ফরীসীরা প্রচণ্ড রেগে যায় এবং দৃষ্টি ফিরে পাওয়া ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বের করে দেয়। (হবি ঃবংঃধসবহঃ. লড়যহ ৯: ০১-৩৪)
স্যাবাথের আদেশ বাইবেলে (নিউ টেস্টামেন্টে) আছে এবং এটা যে রাব্বাই, ফারিসী অর্থাৎ পুরোহিতদের মনগড়া মতবাদ ছিল না তার প্রমাণ- এ কথা পবিত্র কোর’আনেও আছে (সুরা আন নহল- ১২৪)। এখন বাইবেলে (ঘবি ঞবংঃধসবহঃ) পাচ্ছি যে, ঈসা (আ.) বছরের পর বছর ভিক্ষা করছে এমন একজন জন্মান্ধের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলেন এবং দিলেন ঐ স্যাবাথের দিনে, শনিবারে। ঐ জন্মান্ধটি তো সারা জীবনই ঐ স্থানে বসে ভিক্ষা করছিলেন। জন্মান্ধকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়াই বা অলৌকিক শক্তি (মো’জেজা) দেখানোই যদি তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হতো তবে ঈসা (আ.) শনিবার ছাড়া অন্য যে কোনোদিন কি তা করতে পারতেন না? পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে বেছে ঐ স্যাবাথের দিনটাতেই ঐ কাজ করলেন। এটা দ্বারা তিনি তাঁর জাতির জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
ঈসা (আ.) কর্তৃক সেদিনের বিধান ভঙ্গের অন্যতম কারণ ছিল এটা বোঝানো যে, ‘মানবিক কাজ বা মানবতার কল্যাণ সাধিত হয় এমন কাজ ঐ স্যাবাথের অর্থাৎ আইনের দোহাই দিয়ে বাদ দেয়ার অর্থ হলো ধর্মের আত্মাকে ধর্ম থেকে পৃথক করে রাখা। বস্তুত মানবতার জন্যই ধর্ম, কাজেই ধর্মের আইন-অনুশাসন কোনোভাবেই মানবতার কল্যাণের পথে বাধা হতে পারে না। যে ধর্ম মানবতার বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেটা ধর্ম নয়, অধর্ম। সেটা পালন করে স্বর্গে আরোহনণ করা যায় না। এটাই ঈসা (আ.) এর শিক্ষা। মআজ ধর্ম থেকে মানবতা বিদায় নিয়েছে, ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মজীবীদের ব্যবসার পুঁজি। তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র উপাসনালয়গুলিতে তারা উড়িয়ে দিয়েছে স্বার্থের ঝাণ্ডা। টাকা ছাড়া ধর্মের চাকা নড়ে না।

Friday, March 18, 2016

কার আমল আল্লাহ কবুল করেন ???

কার আমল আল্লাহ কবুল করেন ???





মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে সম্পাদিত
কেবলমাত্র মো’মেনদের আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য, কাফের ও মোশরেকদের সকল আমল পণ্ডশ্রম। তবু কাফেররা আমল করে যায়, কারণ তারা জানে না যে তারা কাফের। আল্লাহ তাদের প্রসঙ্গে বলেন, “তারা ঐ সব লোক যাদের পার্থিব জীবনের যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, অথচ তারা ধারণা করে যে, নিশ্চয়ই তারা উত্তম আমল করছে (সুরা কাহফ ১০৪)।” মুসলিম জনসংখ্যার বর্তমান অবস্থা এটাই। তারা নিজেদেরকে মো’মেন ও মুসলিম বলে বিশ্বাস করে নামাজ, রোজা, হজ, কোরবানিসহ বহু আমল করে যাচ্ছে কিন্তু তাদের সবই পণ্ডশ্রম, কারণ তারা আল্লাহর সংজ্ঞা মোতাবেক মো’মেনই নয়, তারা কাফের ও মোশরেক। আল্লাহ বলছেন- মো’মেন শুধু তারা যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে বিশ্বাস করে (অর্থাৎ জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর বিধান ছাড়া আর কাউকে মানে না) তারপর তা থেকে বিচ্যুত হয় না এবং নিজেদের প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে (তা প্রতিষ্ঠার জন্য) আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম, জেহাদ করে (সুরা হুজরাত ১৫)। অর্থাৎ মো’মেন হবার জন্য আল্লাহ দু’টি শর্ত দিচ্ছেন। একটা জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার অর্থাৎ তওহীদ এবং দ্বিতীয়টি সেই তওহীদকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই দু’টোর যে কোন একটা বাদ গেলেই সে বা তারা আর মো’মেন নয়। সারারাত তাহাজ্জুদ পড়লেও নয়, সারা বছর রোজা রাখলেও নয়। অথচ এই জাতি বহু শতাব্দী আগেই তওহীদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছেড়ে দিয়েছে, যার ফলে আল্লাহ এই জাতিকে খ্রিষ্টান জাতিগুলির দাসে পরিণত করে দিয়েছেন। এর পর থেকে তারা আল্লাহর দীন পরিত্যাগ করে ইহুদি খ্রিষ্টানদের তৈরি দীন তথা নানা তন্ত্র-মন্ত্র বরণ করে নিয়েছে। এভাবে তারা পূর্ণাঙ্গরূপে মো’মেনের সংজ্ঞা থেকে বের হয়ে গেছে। ইসলামের কোনো হুকুম তাদের জন্য নয়, সুতরাং তারা যতই নামাজ, রোজা, কোরবানি করুক আল্লাহ সেগুলির দিকে দৃষ্টিপাতও করবেন না, করছেন না। কাফের মোশরেক হওয়া ছাড়াও আরেকটি কারণ আছে এবাদত কবুল না হওয়ার। সেটা হলো এই আমলগুলির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের ভুল ধারণা। যে কোন আমল তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল। নিয়ত বা লক্ষ্য যদি ভুল হয়, যত আমলই করা হোক সেগুলি কোনো সওয়াব লেখাবে না। যেখানে এই জাতিকে সৃষ্টিই করা হয়েছে এই জন্য যে, তারা গলিত সীসার তৈরি প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর দীন ধারণ করবে এবং মানবজাতিকে শেষ দীনের আওতায় আনবে। সেখানে তারা নিজেরাই আল্লাহর সত্যদীন প্রত্যাখ্যান করে দাজ্জালের তৈরি বিধান গ্রহণ করে নিয়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক দলে বিভক্ত, দীনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যখ্যা বিশ্লেষণপ্রসূত মাসলা মাসায়েল নিয়ে হাজার হাজার তরিকা, ফেরকা, মাজহাব, দল, উপদলে বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামায় লিপ্ত রয়েছে। অথচ মুসলিম জাতির মধ্যে যে কোনো প্রকার বিভক্তিই আল্লাহ ও রসুলের ভাষায় কুফর। এভাবে কুফরের মধ্যে নিমজ্জিত থেকে কোনো এবাদত কবুল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এখন এই জাতির মুখ্য কর্তব্য হলো, অতি দ্রুত আল্লাহর তওহীদের ভিত্তিতে সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশের পরে আসবে আমলের প্রশ্ন।

Thursday, March 17, 2016

মো’মেনের সংজ্ঞা কি???

মো’মেনের সংজ্ঞা কি???



মো’মেন শব্দটি এসেছে ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাস থেকে। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ মো’মেনের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে,
“তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে এবং আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না এবং জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ। (সুরা হুজরাত ১৫)।
আল্লাহর দেয়া প্রকৃত মো’মেনের এই সংজ্ঞাটা ঠিক ভাবে বুঝতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে “যারা আল্লাহর ওপর ঈমানে”র অর্থ শুধু আল্লাহর অস্তিত্বে ও একত্বের ওপর ঈমান নয়, তাঁর উলুহিয়াতের ওপর, সার্বভৌমত্বের ওপর (Sovereignty) ঈমান, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন আদেশদাতা, হুকুমদাতা নেই এই বিশ্বাস করা অর্থাৎ তওহীদ।
আল্লাহর দেয়া মো’মেনের এই সংজ্ঞার দ্বিতীয় ভাগ হলো প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে জেহাদ করা। কি জন্য জেহাদ করা? আল্লাহর তওহীদের, সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত দীনটি যদি মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা, কার্যকর না হয় তবে ওটা অর্থহীন। কাজেই আল্লাহর তওহীদ ভিত্তিক ঐ দীনুল হক, সত্য জীবন-ব্যবস্থাটা মানব জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, জেহাদ। এই দু’টি একত্রে প্রকৃত মো’মেনের সংজ্ঞা। এই দু’টি যার মধ্যে আছে, আল্লাহর দেয়া সংজ্ঞা মোতাবেক সে প্রকৃত মো’মেন। এই সংজ্ঞায় আল্লাহ বলেন নি, যে সালাহ পড়বে সে মো’মেন, বা যে রোযা রাখবে সে মো’মেন, বা যে হজ্ব করবে, বা অন্য যে কোন পূণ্য, সওয়াবের কাজ করবে সে মো’মেন।
এ সংজ্ঞায় শুধু আল্লাহ ছাড়া আর সমস্ত রকম প্রভূত্ব, সার্বভৌমত্ব অস্বীকার ও আল্লাহর পথে জেহাদ। এর ঠিক বিপরীতে তিনি এ সতর্কবাণীও বলেছেন যে এ তওহীদে যে বা যারা থাকবে না, যারা তাদের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত জীবনের যে কোন একটি ভাগে, অঙ্গনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বা নিজেদের তৈরি আইন-কানুন, রীতি-নীতি গ্রহণ বা প্রয়োগ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ইলাহ বা সার্বভৌম হুকুমদাতা হিসাবে মানবে তারা শেরক করবে। আর শেরক ক্ষমা না করার জন্য আল্লাহ অঙ্গীকারাবদ্ধ (কোর’আন- সুরা নেসা ৪৮)।
মহান আল্লাহ মো’মেনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন আজ সারা পৃথিবীতে সেই সংজ্ঞা মোতাবেক মো’মেন আছে? নেই। আর মো’মেন নয় মানেই কাফের মোশরেক।


রাষ্ট্র ও সমাজের দ্বন্দ্ব: গলদ কোথায়???

রাষ্ট্র ও সমাজের দ্বন্দ্ব: গলদ কোথায়???



আরিফ মো. আলী আহসান

সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকা চলে না। বিশেষ করে চিন্তাধারা, বিশ্বাস ও উপলব্ধিতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অভিন্ন হতেই হবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যদি একটি সিড়ির আলাদা আলাদা ধাপ হয়, তাহলে সমাজের পরের ধাপটাই হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সাথে তাই ব্যক্তির দূরত্ব থাকতে পারে, কিন্তু সমাজের দূরত্ব মানা যায় না। চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধে রাষ্ট্র সমাজ থেকে যত দূরে সরে যাবে একটি জাতির উন্নতি ও প্রগতির সিড়ি ততটাই অকার্যকর হয়ে পড়বে। জাতি গতি হারিয়ে ফেলবে।
রাষ্ট্র হচ্ছে সমাজের বৃহত্তর পরিসর। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে উদ্ভূত সমস্যা, রীতি-নীতি, প্রথা-পরম্পরা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অনুষ্ঠান ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ। আর তা করতে গিয়ে কোনো প্রশ্নে সিদ্ধান্তের দরকার হলে সমাজ তার সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে যখন সমাধান দিতে পারে না, তখনই কেবল দরকার পড়ে রাষ্ট্রের। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাথে সমাজের তফাৎ যদি থাকে সেটা ক্ষমতায়; বিশ্বাসে নয়। বিশ্বাসের পার্থক্য রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে, যার পরিণতি বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি।
দুর্ভাগ্যক্রমে বর্তমানে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র সেই বিশৃঙ্খলা ও অশান্তির মধ্যেই নিপতিত হয়েছে। এর কারণ ধর্মবিশ্বাস। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের সমাজ বিশ্বাসকেন্দ্রিক। ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে পরিবার ও সমাজের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও আচরণের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ধর্মবিশ্বাস। অন্যদিকে রাষ্ট্রকে করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ, কার্যত ধর্মহীন। ফলে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি ইত্যাদি প্রধান প্রধান সেক্টরগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যার সাথে সমাজের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার কোনো সুসম্পর্ক নেই, বরং তা সামাজিক বিশ্বাসের পরিপন্থীও বলা চলে। সমাজ যদি বলে কালো, রাষ্ট্র বলছে সাদা, সমাজ যদি বলে সাদা রাষ্ট্র বলে কালো। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্র যেহেতু সমাজের উপর কর্তৃত্বশীল, সুতরাং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে সমাজকে বাধ্য করছে। যেমন সুদ। ধর্ম সুদকে নিষিদ্ধ করেছে, সুদের সাথে সম্পর্কিত যে কোনো কর্মকাণ্ড ধর্মে অবৈধ। ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী আমাদের সমাজ সুদ আদান-প্রদানকে অতি গর্হিত কাজ বলেই জেনে এসেছে। যদি কেউ সুদের লেনদেন করে সমাজ তাকে ঘৃণা করে। মানুষ মনে মনে হলেও সুদখোরকে ধিক্কার দেয়। অথচ সেই সুদ আজ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূলভিত্তি এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে সুদকে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে রাষ্ট্র।
সমাজে ধর্মের শতভাগ প্রভাব বজায় রেখে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণভাবে ধর্মমুক্ত করার এই সাংঘর্ষিক ও অপ্রাকৃতিক সিদ্ধান্তের পরিণতি দাঁড়াচ্ছে এই যে, সমাজে দানা বাধছে ক্ষোভ। দূরত্ব তৈরি হচ্ছে রাষ্ট্রের সাথে সমাজের। সূত্রপাত হচ্ছে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার।
রাষ্ট্রের হাতে আছে সামরিক শক্তি, প্রশাসনিক শক্তি। রাষ্ট্রের হাতেই অর্থনীতি। সুতরাং সমাজ যতই রাষ্ট্রের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়–ক, রাষ্ট্রের আনুগত্য থেকে হাত গুটাতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। এদিকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম অবিশ্রান্ত প্রচারণা চালাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে। সেখানে ধর্ম অবহেলিত ও অবজ্ঞাত, মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রতীক। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাস এসব প্রচারমাধ্যমের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। তারা বরং ব্যস্ত থাকে রাষ্ট্রকে ধর্মের যে কোনো সংস্পর্শ থেকে মুক্ত রাখতে।
শিক্ষাব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে ধর্মকে সচেতনভাবে এড়িয়ে। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মের বিশেষ জায়গা নেই। এই শিক্ষায় শিক্ষিতরা কিছু নাস্তিক ও সংশয়বাদী হয়, আর অধিকাংশই ধর্ম সম্পর্কে সীমাহীন অজ্ঞতা ও হীনম্মন্যতা নিয়ে দিনাতিপাত করে। অন্যদিকে মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে যেগুলো সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেগুলোতে সচেতনভাবে ধর্মের রাষ্ট্রসম্পর্কিত দিকটিকে ছেটে ফেলে ব্যক্তিগত আচার-আচরণ, এবাদত-উপাসনাকে অতি গুরুত্ব দিয়ে উপরে উঠানোর প্রচেষ্টা চলে। আর যেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সেখানে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, মূল্যবোধ ও চিন্তাধারার বিপরীত চর্চা চলে। ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সরকার যতটা আতঙ্কিত, সমাজ কিন্তু ততটাই আন্তরিক। এখানে এসে সমাজ ও রাষ্ট্র পুনরায় মুখোমুখি।
ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি মোতাবেক ধর্মমতে অবৈধ জ্ঞান করা হয় এমন কোনো কাজ করলেও রাষ্ট্র কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়, সুতরাং কোনো ধর্মবিশ্বাসী গোষ্ঠী ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যদি কোনো কারণে রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়, রাষ্ট্র তাদের প্রতি শত্র“ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। সেই শত্র“ভাবকে কাজে লাগিয়ে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে উস্কানি দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার ঘটনাও অহরহ ঘটে। ফলে পরিস্থিতি যে রক্তাক্ত পরিণতির দিকে গড়ায়, তাকে না ধর্মবিশ্বাস দ্বারা বৈধতা দেওয়া যায়, না ধর্মনিরপেক্ষতা দ্বারা।
ধর্মনিরপেক্ষতার তীর্থভূমি ইউরোপে কিন্তু এ ধরনের ঘটনা কল্পনাও করা যায় না, যদিও সেখানকার সমাজ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। ইউরোপের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের মূল উৎসভূমি যে ধর্ম তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মবিশ্বাসী সমাজের দ্বন্দ্ব এত প্রবল নয় যতটা প্রবল আমাদের মতো প্রাচ্যের দেশগুলোতে। তাই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক- যে ব্যবস্থা ইউরোপের রাষ্ট্র ও সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে পারছে, সেই একই ব্যবস্থা আমাদের রাষ্ট্রকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে কেন? এর কারণ- আমাদের সমাজ এমন একটি ধর্মবিশ্বাসের ধারক যা নিছক উপাসনা বা আচার-অনুষ্ঠাননির্ভর নয়। এতে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল অঙ্গনের নীতিমালা সুনির্দিষ্ট রয়েছে। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি সব বিষয়ে এতটা স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং তা লঙ্ঘন করার ক্ষেত্রে জোরালো নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যে, ধর্মের সেই সমষ্টিগত ভাগটাকে বাদ দিলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অন্যদিকে ইউরোপ যে ধর্মবিশ্বাস থেকে পরিচালিত তাতে সমষ্টিগত জীবনের দিক-নির্দেশনা নেই, আছে ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনের নৈতিক বা আত্মিক শিক্ষা। তাই ইউরোপের জন্য রাষ্ট্রকে ধর্মমুক্ত বা ধর্মহীন করে ফেলা যতটা সহজ, আমাদের জন্য ততটাই কঠিন।
বাংলাদেশকেই উদাহরণ হিসেবে নেয়া যাক। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইসলামের প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল কোর’আন, যেখানে মহান আল্লাহ মুসলিমদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় জীবনের নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একজন মুসলিম যখন ইসলামের ইতিহাস পড়ে, সে জানতে পারে এক সময় ইসলামই ছিল মুসলিমদের সমষ্টিগত জীবনের নিয়ন্ত্রক, প্রাণশক্তি। ইসলামের শাসনে অতীতে এমন শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, সমাজে কোনো অপরাধ ছিল, শোষণ ছিল না, দারিদ্র্যও ছিল না। রাতের অন্ধকারে একা অলংকার পরিহিত যুবতি নারী মাইলের পর মাইল পথ চলতো, তার মনে কোনো ভয় জাগ্রত হতো না। কোথাও চুরি ছিল না, ডাকাতি ছিল না। সে বোঝে বর্তমানে সমাজের এত অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা, অশান্তির কারণ হলো জাতীয় জীবন থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করা হয়েছে। সে তার জন্য দায়ী মনে করে রাষ্ট্রকে। একইভাবে কেউ যখন কোর’আন খোলে সে তার জাতীয় জীবনের করণীয় দিকগুলোকে চাক্ষুষ দেখতে পায় এবং এও জানতে পারে যে, আল্লাহ চান মানুষ তার দেওয়া বিধি-ব্যবস্থা অনুযায়ী নিজেদের পরিচালিত করুক। অথচ বাস্তবে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো। এর জন্য একদিকে সে যেমন রাষ্ট্রকে দোষারোপ করে, অন্যদিকে নিজেকেও অপরাধী ভাবতে থাকে, অনুতপ্ত হয়। সেই অপরাধী মনোভাব থেকে সঞ্চারিত হয় ক্ষোভ। ক্ষোভ থেকে সৃষ্টি হয় হিংসা ও হিংস্রতা, যার সমাপ্তি ঘটে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মাধ্যমে।
এভাবে আমাদের সমাজে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে, বিশ্বাসকে মূল্য দিতে গেলে রাষ্ট্র প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, রাষ্ট্রকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে গেলে বিশ্বাসের বন্ধনে চিড় ধরছে। ধর্মহীন রাষ্ট্র ও ধর্মাবৃত সমাজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার বদলে পথ চলছে ব্যাপক অনাস্থা ও অসহযোগিতা নিয়ে। বলা বাহুল্য, ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপকে কিন্তু এই দ্বান্দ্বিক অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় নি।
লেখক: গোপালগঞ্জ জেলা আমীর, হেযবুত তওহীদ।

তওহীদের প্রকৃত অর্থ

তওহীদের প্রকৃত অর্থ


‘আপনার পূর্বে আমি যে রসুলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ (হুকুমদাতা) নেই । (সুরা আম্বিয়া ২৫)
আদম থেকে শুরু করে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবী ও রসুলগণের আহ্বান ছিল ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতি অর্থাৎ তওহীদের প্রতি। তওহীদ হচ্ছে এমন এক ঘোষণা যা শুরু হয় ‘লা’ শব্দ দিয়ে যার অর্থ হচ্ছে অস্বীকার। আল্লাহ ছাড়া জগতের সকল বিধানদাতা, হুকুমদাতা, সার্বভৌম অস্তিত্বকে অস্বীকার করাই হচ্ছে তওহীদ, এটাই এই দীনের ভিত্তি। এর মর্মার্থ হচ্ছে: জীবনের প্রতিটি বিষয়ে যেখানেই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য আছে সেটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি যে বিভাগেই হোক না কেন, সেই ব্যাপারে আর কারও কোন বক্তব্য, নির্দেশ মানা যাবে না। তবে যে বিষয়ে আল্লাহ অথবা তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য নেই সে বিষয়ে আমরা স্বাধীনভাবে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। বর্তমান দুনিয়ার কোথাও এই তওহীদ নেই, সর্বত্র আল্লাহকে কেবল উপাস্য বা মা’বুদ হিসাবে মানা হচ্ছে, কিন্তু ইলাহ বা সার্বভৌমত্বের আসনে আল্লাহ নেই। মানুষ নিজেই এখন নিজের ইলাহ। সমগ্র মানবজাতি এখন মানুষের তৈরি করা দীন যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি দ্বারা তাদের জীবন পরিচালিত করছে। অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ না মানার অঙ্গীকারই হচ্ছে তওহীদ। মুসলিম জনসংখ্যাটিসহ সমস্ত মানবজাতি সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এখন শেরক ও কুফরে ডুবে আছে। আর বর্তমানে আমরা যে ইসলামটি পালন করে যাচ্ছি সেটা আল্লাহর রসুলের রেখে যাওয়া ইসলামেরই বিকৃত রূপ, প্রকৃত ইসলাম নয়।