Monday, April 11, 2016

যদি আমরা আত্মত্যাগী হই???

যদি আমরা আত্মত্যাগী হই???


অন্যায় আর অসৎ কাজ না করলেই ব্যক্তিগত কিছু মানুষ পরহেজগার বা মোত্তাকি হইলো। এর ফলাফল কিছু মানুষ পেতে থাকবে। আর আমরা যদি সত্যের জন্য আত্মত্যাগ করি নিজেকে মানবতার কল্যাণে নিজের সাধ্যমতো বিচরণ করি তাহলেই তো সে দুর্বার সৈনিকের কাতারে পড়লাম। এর জন্য কাজ কাম ফেলে রেখে সৈনিক হওয়ার দরকার পড়েনা যে যার অবস্থানে থেকে সত্যের জন্য গর্জে উঠতে পারি। নিজেদের কাজ শেষে যে যতটুকু সময় পাই তা অঅযথা না কাটিয়ে মানবতার কল্যাণে ব্যয় করি। আপনার আমার এই সত্যনিষ্ঠ গর্জন যদি আরো মানুষ বুঝতে পারে তাইলে দুনিয়াময় ন্যায় সত্যে আবার পরিণত হবে।যুগে যুগে নবী রাসুল গণে এই ন্যায় সত্য আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়েছেন। আজ যদি আমরা স্রষ্টার দেওয়া ন্যায় সত্য নিজেদের আত্মায় ধারণ কোরে আত্মত্যাগী হই তাহলে মানুষ প্রকৃত শান্তি পাবে। আমরা সেই লক্ষ্যে মানুষকে আহবান করছি আসুন আমরা যার যার অবস্থানে থেকে সত্য ও ন্যায় কে কায়েম করি আর বয়কট করি অসত্য মিথ্যা সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ নামক কালো অধ্যায় যা আমাদের সমাজ ও দেশ তথা গোটা পৃথিবীর জন্য অভিশাপ স্বরূপ।
সত্য ও ন্যায় এর পক্ষে কাজ করছি আমরা আপনিও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করতে পারেন। ধন্যবাদ –
শুভেচ্ছা নিবেন। সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সকল ন্যায়ের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান নিয়ে কাজ করছে এ পেইজটি। লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

Wednesday, April 6, 2016

চিন্তার স্থবিরতা

চিন্তার স্থবিরতা

মিজানুর রহমান, আমীর, রাজশাহী জেলা, হেযবুত তওহীদ

পাশ্চাত্যের ধর্মহীন বস্তুবাদী চিন্তা চেতনার শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার তেমন কোনো শিক্ষা নেই। সেখানে সচেতনভাবে ধর্ম সম্পর্কে অবজ্ঞা, সন্দেহ ও নিরাসক্ততা সৃষ্টি করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত বিদ্বেষ ও শত্রুতামূলক মনোভাব তৈরি হয়ে যায়। তারা মাদ্রাসাশিক্ষিত মানুষকে অনেক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন এবং বোধবুদ্ধিহীন মনে করেন। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞান, আধুনিক দুনিয়া সম্পর্কে তেমন কিছুই শিক্ষা দেওয়া হয় না। তারা সেখানে কেবল আরবি ভাষা ও মাসলা মাসায়েলের জ্ঞান লাভ করেন যা ধর্মীয় অঙ্গনের বাইরে কোনো কাজে আসে না। এখন এই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো ছেলে যদি ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে, যদি সে মুসলিম জাতির দুর্দশা দেখে ব্যথিত হয়ে তা দূর করার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে চায় তখন এই মাদ্রাসা শিক্ষিত লোকগুলো তার উপর সর্বপ্রথম দাড়ি-টুপি আর লেবাসের শর্ত আরোপ করেন। তাকে বোঝান যে, ইসলামের কাজ করতে হলে, ইসলামের কথা বলতে হলে সর্বপ্রথম তোমাকে দাড়ি রাখতেই হবে। অথচ ছেলেটির এতদিনের গড়ে ওঠা রুচিবোধের সঙ্গে এই দাড়ি-টুপি সামঞ্জস্যশীল নয়। এখানেই হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের চিন্তার স্থবিরতা। তারা কোনো কিছুর গুরুত্ব বিচার করার ক্ষেত্রে তার বাস্তবমূল্য ও কার্যকারণ বিবেচনার বোধ হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের জ্ঞান ফতোয়ার কেতাবে বন্দী হয়ে গেছে, দাড়ি-টুপি সুন্নত (অনেকে বলেন ওয়াজিব) তাই রাখতেই হবে। যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্বই প্রতিষ্ঠা না করা যায় তাঁর বিধানও প্রতিষ্ঠা হবে না। সেক্ষেত্রে ইসলামের যে মূল লক্ষ্য সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সেটাও বাস্তবায়িত হবে না। তখন নামাজ, রোজা, হজ্ব, দাড়ি, টুপি, লেবাস কিছুরই কোনো মূল্য থাকবে না এটা বোঝার জন্য যে চিন্তাশক্তি লাগবে, তারা সেই চিন্তার ঘরে তালা মেরে দিয়েছেন। পৃথিবীর সব মানুষও যদি দাড়ি রেখে দেয় তাতেই কি সমাজে শান্তি নিরাপত্তা কায়েম হয়ে যাবে? যাবে না। এটাই চিন্তার স্থবিরতা। ইসলামকে তারা বাস্তবতার নিরিখে উপস্থাপন না করে ১৪০০ বছর আগে আরবের মানুষের যে চুল-দাড়ির কাটিং, পোশাকের রীতি বা ফ্যাশন ছিল সেটাকেই ইসলামের প্রথম দায়িত্ব বলে নিরূপণ করে নিয়েছেন। চিন্তার এই জড়ত্বকে তারা বিস্তার করে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। একারণেই চিন্তাশীল মানুষ ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামবিদ্বেষী হয়ে যাচ্ছেন।

Tuesday, April 5, 2016

ওবাদাহ বিন সামিত (রা.)

ওবাদাহ বিন সামিত (রা.)


কাজী মাহফুজ

খলিফা ওমরের (রা.) শাসনামলে মিশর বিজয়ী সেনানায়ক আমর ইবনুল আস (রা.) রসুলাল্লাহর প্রিয় সাহাবী আবু ওবাদাহ বিন সামেতকে (রা.) মকোকাসের নিকট মুসলিম বাহিনীর দূত হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। তখন মিশর ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ, সেখানে কপটিক খ্রিষ্টান যাজক আর্চ বিশপ মকোকাস শাসন করতেন।
আবু ওবাদাহ (রা.) ছিলেন এমন এক যোদ্ধা যাকে যুদ্ধক্ষেত্রে এক হাজার কাফেরের সমতুল্য বলে মনে করা হতো। তিনি ছিলেন মদিনার খাজরাজ বংশীয় এবং আকাবার বায়াতে অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম। রসুলের একদল সর্বত্যাগী সাহাবী যাদেরকে আসহাবে সুফফা বলা হতো, তারা বাড়ি-ঘরে যেতেন না, মসজিদে নববীতে থাকতেন আর অপেক্ষা করতেন রসুল কখন কী হুকুম দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সে হুকুম বাস্তবায়ন করতেন। আবু ওবাদাহ (রা.) সেই আসহাবে সুফফার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রসুলের সঙ্গে থেকে তিনি প্রায় সকল যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এই দুর্ধর্ষ চরিত্রের সর্বত্যাগী সাহাবীকেই সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.) রাজদরবারে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজার সামনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব প্রদান করা। আমর (রা.) বলে দেন ওবাদাহ (রা.) যেন তিন শর্তের বাইরে অন্য কিছুই মিশরীয়দের থেকে গ্রহণ না করেন। ঐ তিন শর্ত হলো-
১) আল্লাহর রসুল সত্য দীন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন- এই দীন মেনে নিয়ে মুসলিম হয়ে যাও, তাহলে তোমরা আমাদের ভাই হয়ে যাবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল এই দীনকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার যে দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পণ করেছেন, সে দায়িত্ব তোমাদের ওপরও বর্তাবে।
২) যদি তা গ্রহণ না করো তবে আমাদের বশ্যতা স্বীকার করো, আমরা আল্লাহর দেয়া দীন, কোর’আনের আইন-কানুন, দ-বিধি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করব; তোমরা যার যার ধর্মে থাকবে, আমরা বাধা তো দেবই না বরং সর্বপ্রকারে তোমাদের এবং তোমাদের ধর্মকে নিরাপত্তা দেব; বিনিময়ে তোমাদের যুদ্ধক্ষম লোকেরা বার্ষিক সামান্য একটা কর দেবে, যার নাম জিজিয়া। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, স্ত্রীলোক, রোগগ্রস্ত মানুষ এবং বালক-বালিকা, শিশুগণকে এ কর দিতে হবে না। এর পরও তোমাদের রক্ষার জন্য যুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে যেসব যুদ্ধক্ষম লোক আমাদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করবে তাদের ঐ জিজিয়া দিতে হবে না।
৩) যদি এই দুই শর্তের কোনোটাই না মেনে নাও তবে যুদ্ধ ছাড়া আর পথ নেই। আমরা তোমাদের আক্রমণ করে পরাজিত করে আল্লাহর দীন, জীবন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব।
মুসলিম বাহিনীর প্রতিনিধিগণ আবু ওবাদাহর (রা.) নেতৃত্বে মকোকাসের রাজদরবারে প্রবেশ করলেন। আবু ওবাদাহকে (রা.) দেখেই মকোকাসের যে প্রতিক্রিয়া হলো তা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর। তিনি আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন: “এই কালোটাকে আমার চোখের সামনে থেকে দূর করে দাও, তোমাদের মধ্য থেকে অন্য কেউ আমার সাথে কথা বলো।” তখন শেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের মানুষই জ্ঞান করত না। যদিও আবু ওবাদাহ (রা.) কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন না, কিন্তু তার গায়ের রং সাধারণের চেয়ে কালো ছিল।
প্রতিনিধি দলের একজন বললেন Ñ ‘এই কালো মানুষটিই প্রজ্ঞায় ও জ্ঞানে আমাদের মধ্যে অগ্রণী। তিনিই আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, আর তিনিই আমাদের আমীর (আদেশকারী)। তার প্রতিটি কথা ও আদেশই আমরা মান্য করি। আমাদের সেনাপতি তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদেরকে হুকুম করেছেন যেন আমরা তার কোনো সিদ্ধান্ত, এমনকি সাধারণ কোনো কথার ব্যাপারেও কোনোরূপ আপত্তি না তুলি।’
মুসলিম প্রতিনিধির এই কথা মকোকাসকে কৌতূহলী করে তুললো। তিনি বললেন: ‘কিন্তু তোমরা কি করে একজন কালো মানুষকে তোমাদের আমীর হিসাবে মেনে নিলে? সে কি হিসাবে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত হলো?’
মুসলিম প্রতিনিধি জবাব দিলেন, ‘না। আপনার চোখে তিনি কালো হতে পারেন কিন্তু তিনি পদমর্যাদায়, ঈমানে, বিচারবুদ্ধিতে এবং প্রজ্ঞায় আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আমাদের মধ্যে শামিল হতে তার গায়ের রং কোনো বিচার্য বিষয়ই নয়।’
অগত্যা মকোকাস একরাশ ঘৃণা মিশ্রিত চোখে আবু ওবাদাহর (রা.) দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বেশ, তাই হোক। কিন্তু খবরদার কালো মানুষ, আমার সাথে তুমি সংযত হয়ে ভদ্রভাবে কথা বলো। কারণ তোমার গায়ের রঙ আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে। তোমার কথাও যদি এমন রুক্ষ হয় তাহলে তা আমার ক্রোধ উদ্রেক করতে পারে।’
ওবাদাহ (রা.) তখন ধীর পদক্ষেপে অন্যদের থেকে এগিয়ে মকোকাসের সামনে গিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “তোমার কথা তো শুনলাম, এবার আমার কথা শোন। আমার সঙ্গীদের মধ্যে আরও এক হাজার কালো মানুষ আছে, যারা প্রত্যেকে দেখতে আমার চেয়েও কালো এবং কুৎসিত। তাদেরকে দেখলে তুমি আমাকে দেখে যতটা না আতঙ্কিত হয়েছ তার চেয়ে বেশি আতঙ্কিত হতে। আমি আমার যৌবন পার করে এসেছি, তারপরেও আল্লাহর রহমে এখনও আমি একাই এক হাজার কাফেরের অন্তরাত্মায় ত্রাস সৃষ্টি করতে পারি; এমনকি তারা যদি আমাকে একযোগেও আক্রমণ করে তবু। এই একই কথা আমার সঙ্গীদের প্রত্যেকের বেলায়ও সমানভাবে খাটে।
“আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমাদের হৃদয়ের আকুলতা আর আল্লাহর রাস্তায় অবিরাম সংগ্রাম করে যাওয়ার নেশা ও তাতে দৃঢ় প্রত্যয়ী থাকার প্রশিক্ষণ (সবর) আমাদের চরিত্রকে এমনভাবে তৈরি করেছে। আমাদের জেহাদ শুধু তাদের বিরুদ্ধে যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে আমাদের সামনে অবতীর্ণ হয়। সেই জেহাদ আমরা পার্থিব কিছুর আশায় করি না, সম্পদ লাভের জন্যেও করি না। যেটুকু গনিমত আল্লাহ আমাদের জন্য বৈধ করেছেন শুধু তা-ই আমরা গ্রহণ করি। এ থেকে কেউ প্রচুর সোনার মালিক হতে পারে আবার কেউ এক দেরহামের বেশি কিছু নাও পেতে পারে, এটা আমাদের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কারণ আমরা বেঁচেই আছি শুধু আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার জন্য। আমাদের শুধু পেটের ক্ষুধা নিবারণ আর পরার কাপড়ের চেয়ে বেশি কিছু চাই না। এই দুনিয়ার জীবনের কোনো মূল্য আমাদের কাছে নেই- এর পরের জীবনই আমাদের কাছে সব। এই হচ্ছে আমাদের প্রতি আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ও আমাদের নবীর হুকুম।”

কলেমার ভুল অর্থ করার ফল

কলেমার ভুল অর্থ করার ফল


এম. আমিনুল ইসলাম

বর্তমানে মুসলিম বলে পরিচিত জাতিটি কলেমা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এই কলেমা ইসলামের আত্মা, ভিত্তি, মূলমন্ত্র। এই কলেমা ছাড়া কোনো ইসলাম নেই। এই কলেমা সঠিক অর্থে অন্তরে বিশ্বাস না করে, মুখে প্রচার না করে এবং এর উপর আমল না করে অর্থাৎ একে মানবজীবনে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্ট, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, সংগ্রাম না করে কেউ মুমিন বা মুসলিম হতে পারে না। পৃথিবীময় কলেমার আজ ভুল অর্থ করা হয়। আজ সর্বত্র শেখানো হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য অর্থাৎ মা’বুদ নাই। কলেমা হচ্ছে – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ইলাহ অর্থ মা’বুদ নয়। ইলাহ হচ্ছেন তিনি সেই সত্তা যার আদেশ শুনতে হবে, মানতে হবে, পালন করতে হবে অর্থাৎ সার্বভৌম। আর উপাস্য, মা’বুদ হচ্ছেন তিনি সেই সত্তা যাকে উপাসনা করা হয়। দু’টো ভিন্ন অর্থ। ইসলামের কলেমার সঠিক অর্থ হচ্ছে শুধু আল্লাহকে ইলাহ হিসাবে, একমাত্র আদেশদাতা হিসাবে বিশ্বাস করা, মেনে নেওয়া অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম ছাড়া অন্য সকল হুকুম বিধান প্রত্যাখ্যান করা।
কলেমার এই ভুল অর্থের পরিণাম হয়েছে এই যে, পৃথিবীর মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যা অর্থাৎ আমরা আল্লাহকে হুকুমদাতা, আইনদাতা হিসাবে ভুলে গিয়ে তাঁকে শুধু উপাস্য, মা’বুদ বিশ্বাস করে আপ্রাণ তাঁর উপাসনা করে, নামায, যাকাত, হজ্ব, রোযা করে আসমান যমীন ভর্তি করে ফেলছি, কিন্তু আমাদের সমষ্টিগত জীবনে কেউ তাঁর আদেশ, হুকুম শুনি না, পালন করি না। আল্লাহর দেওয়া জীবন-ব্যবস্থা (দীন) কে বাদ দিয়ে আমরা সমষ্টিগত জীবনে ইহুদি খ্রিষ্টানদের তৈরি জীবন-ব্যবস্থা গ্রহণ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ থেকে অর্থাৎ কলেমা থেকে বের হয়ে কার্যতঃ মুশরিক ও কাফের হয়ে গেছি। আজ জাতীয় জীবনে, সমষ্টিগত জীবনে, রাষ্ট্র্রীয় জীবনে পৃথিবীর কোথাও আল্লাহর আদেশ পালন করা হচ্ছে না, মুসলিম বলে পরিচিত দেশগুলোতেও না। সর্বত্র মানুষের নিজেদের তৈরি এবং পাশ্চাত্য প্রভুদের তৈরি জীবন-ব্যবস্থাকে মেনে নেয়া হয়েছে আল্লাহর দেওয়া জীবন-ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে। এই কাজ করে আমরা কলেমা থেকে, ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছি। আজ পৃথিবীর ‘অতি মুসলিমরা’ নামাযে, রোযায়, হজ্বে, তাহাজ্জুদে, তারাবীতে, দাড়ি, টুপি-পাগড়ীতে, পাজামায়, কোর্তায় নিখুঁত। শুধু একটিমাত্র ব্যাপারে তারা নেই, সেটা হলো তওহীদ, কলেমা–একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে সামগ্রিক জীবনের বিধানদাতা, আদেশদাতা হিসাবে মানি না। যে আংশিক অর্থাৎ ব্যক্তিগত ঈমান (যা প্রকৃতপক্ষে শেরক) তাদের মধ্যে আছে তা আল্লাহ আজও যেমন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে রেখেছেন, হাশরের দিনেও তেমনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবেন।
একেবারে কলেমা থেকে বিচ্যুতি ছাড়াও আল্লাহ তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে যে ইসলাম পৃথিবীর মানুষের জন্য পাঠিয়েছিলেন তা নানা কারণে ক্রমে ক্রমে বিকৃত হয়ে বর্তমানে যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছে তাতে এই ইসলাম আর সেই ইসলামই নেই। আল্লাহর সেই প্রকৃত ইসলাম যেটা আল্লাহ নবীর মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন যারা সেটা গ্রহণ করল তাদের উপর তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন যে তারা কঠিন চেষ্টা, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, সংগ্রামের মাধ্যমে সেটাকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করবে। এই জাতি ৬০/৭০ বছর আল্লাহর আদেশ মোতাবেক সংগ্রাম চালিয়ে অর্ধেক পৃথিবীতে এই সত্যদীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর দুর্ভাগ্যক্রমে আকিদার বিকৃতির কারণে আল্লাহর সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরিত্যাগ করে অন্যান্য রাজা বাদশাহদের মতো রাজত্ব বাদশাহী উপভোগ করতে আরম্ভ করল। আল্লাহর সাবধানবাণী কখনও মিথ্যা হতে পারে? পারে না। তাই তিনি ইউরোপের খ্রিষ্টান জাতিগুলি দিয়ে মুসলিম জাতিটিকে সামরিকভাবে পরাজিত করে তাদের গোলাম বানিয়ে দিলেন। সেই গোলামি আজও চলছে।

সালাহ দীনের স্তম্ভ

সালাহ দীনের স্তম্ভ



আল্লাহর রসুল বিভিন্ন সময়ে তাঁর আসহাবদেরকে ইসলামের প্রকৃত আকিদা বোঝাতে বিভিন্ন ধরনের উপমা বা উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। যেমন একটি ঘরের সাথে ইসলামের তুলনা করে তিনি জেহাদ ও সালাতের সম্পর্ক আসহাবদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন- ইসলাম একটি ঘর, সালাহ তার খুঁটি এবং জেহাদ হলো ছাদ [হাদিস- মুয়ায (রা:) থেকে আহমদ, তিরমিযি, এবনে মাজাহ, মেশকাত]। এই উপমাতে রসুলাল্লাহ সালাহ ও জেহাদের সম্পর্ক, এদের উভয়ের প্রয়োজনীয়তা, এমনকি কোনটির প্রাধান্য বেশি (Priority) তা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। ছাদবিহীন একটি ঘরের কোনই মূল্য নেই, এমন কি সেই ঘর যদি দামি আসবাবপত্র ও গৃহস্থালী সামগ্রী দিয়ে সুসজ্জিত থাকে তবুও তা মূল্যহীন। এর খুঁটিগুলো যদি হীরা দিয়ে তৈরি থাকে তবুও ঘরের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না; এ ঘরে কেউ বাস করতে পারবে না। বর্তমানে মুসলিম নামক এই জাতিটি ইসলামের ভিত্তি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের (তওহীদ) বদলে দাজ্জালের সার্বভৌমত্বকে সার্বিক জীবনে স্বীকার করে নিয়েছে আর ছাদ অর্থাৎ জেহাদ (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম) তাদের কাছে কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়-অসহ্য। এখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবাদত হচ্ছে সালাহ বা নামাজ। জান্নাতের প্রকৃত চাবি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে (হাদিস- মু’আজ এবনে জাবাল থেকে আহমদ) ত্যাগ করে এই জাতি নামাজকে জান্নাতের চাবি বানিয়ে নিয়ে সারা দুনিয়ায় লক্ষ লক্ষ সুদৃশ্য মসজিদে কেবল শূন্যের উপরই খুঁটি গেঁড়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এ খুঁটিগুলির উদ্দেশ্য কী তাও তারা জানেন না। ছাদ নির্মাণ না করে কেবল খুঁটি গাঁড়া যে কতটা নির্বুদ্ধিতার কাজ তা বোঝার জ্ঞানটুকুও আল্লাহর লা’নতের ফলে এ জাতির মধ্যে অবশিষ্ট নেই। ফলে এই সালাহ মুসলিম জাতির কোনো কাজেই আসছে না; এ সালাহ তাদেরকে সকল জাতির লাথি ও ঘৃণা থেকে রক্ষা করতে পারছে না। ভিত্তি ও ছাদহীন খুঁটি সর্বস্ব এ ঘর (যদিও এমন ঘর অসম্ভব) তাদেরকে কোনই নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

শুধু ব্যক্তি জীবনে আল্লাহর হুকুম মানলেই মো’মেন থাকা যায় না

শুধু ব্যক্তি জীবনে আল্লাহর হুকুম মানলেই মো’মেন থাকা যায় না


রাকীব আল হাসান

কোন সন্দেহ নেই যে মুসলিম দাবিদার এই জাতিটা ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের দাসে পরিণত হবার পরও বহু লোক আল্লাহ ও তাঁর রসুলে (সা.) পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ছিল, কিন্তু সে বিশ্বাস ছিল ব্যক্তিগতভাবে, জাতিগতভাবে নয়। কারণ জাতিগতভাবে তাদের রাজনৈতিক আর্থ সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থা তো তখন ইউরোপীয়ান খ্রিষ্টানদের হাতে এবং তারা ইসলামী ব্যবস্থা বদলে নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা এই জাতির জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতীয় জীবন থেকে আল্লাহর দেয়া রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা কেটে ফেলে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে তা বজায় রাখলে আল্লাহর চোখে মুসলিম বা মো’মেন থাকা যায় কিনা এ প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর হচ্ছে- না, থাকা যায় না। কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন- তোমরা কি কোর’আনের কিছু অংশ বিশ্বাস কর, আর কিছু অংশ বিশ্বাস কর না? যারা তা করে (অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ সমূহের এক অংশ বিশ্বাস করে না বা তার উপর আমল করে না) তাদের প্রতিফল হচ্ছে এই পৃথিবীতে অপমান, লাঞ্ছনা এবং কেয়ামতের দিনে কঠিন শাস্তি। তোমরা কী করছ সে সম্বন্ধে আল্লাহ বেখেয়াল নন (সুরা আল বাকারা ৮৫)। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় কী বলেছেন। তাঁর আদেশ নিষেধগুলির কতকগুলি মেনে নেয়া আর কতকগুলিকে না মানার অর্থ আল্লাহকে আংশিকভাবে মানা অর্থাৎ শেরক। তারপর বলছেন এর প্রতিফল শুধু পরকালেই হবে না এই দুনিয়াতেও হবে আর তা হবে অপমান ও হীনতা। আল্লাহ মো’মেনদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উভয় দুনিয়াতে অন্য সবার উপর স্থান ও সম্মান। এ প্রতিশ্রুতি তার কোর’আনের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এখন যদি এই লোকগুলিকে তিনি বলেন, তোমাদের জন্য এই দুনিয়াতে অপমান ও কেয়ামতে কঠিন শাস্তি, শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘শাদীদ’ ভয়ংকর তবে আল্লাহ তাদের নিশ্চয়ই মো’মেন বলে স্বীকার করছেন না। যদিও তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর আইন-কানুন (শরীয়াহ) তারা পুংখানুপুংখভাবে মেনে চলেন।
আল্লাহ কোর’আনে আরো বলেছেন- হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সম্পূর্ণভাবে ইসলামে প্রবিষ্ট হও (কোর’আন, সুরা বাকারা- ২০৮)। আকিদা বিকৃতি হয়ে যাওয়ার ফলে আজ আল্লাহর এই আদেশের অর্থ করা হয় এই যে, ইসলামের খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলি পালন কর। আসলে এই আয়াতে আল্লাহ মো’মেনদের অর্থাৎ যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে তাদের বললেন যে, ইসলামকে অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানকে সম্পূর্ণ ও পূর্ণভাবে গ্রহণ কর এর কোন একটা অংশকে নয়। ব্যক্তিগত অংশকে বাদ দিয়ে শুধু জাতীয়, রাষ্ট্রীয় অংশটুকু নয়; কিম্বা জাতীয় অংশকে বাদ দিয়ে শুধু ব্যক্তিগত অংশটুকুও নয়। ঐ কথার পরই তিনি বলছেন- এবং শয়তানের কথামত চলো না। অর্থাৎ ঐ আংশিকভাবে ইসলামে প্রবেশ করলে তা শয়তানের অনুসরণ করা হবে, শয়তানের কথামত চলা হবে। শয়তান তা-ই চায়, কারণ আংশিকভাবে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে আল্লাহর আইন, বিধান প্রতিষ্ঠা না করে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে তা মেনে চললে সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে না এবং অন্যায়, অশান্তি ও রক্তপাত চলতেই থাকবে। যেমন আজ শুধু পৃথিবীতে নয়, মুসলিম নামের এই জাতিতেও নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও অন্যান্য খুঁটিনাটি পূর্ণভাবে পালন করা সত্ত্বেও পৃথিবীতে অশান্তির জয়জয়কার, বইছে রক্তের বন্যা। সুতরাং এই জাতি (উম্মাহ) যখন ইউরোপীয়ানদের কাছে যুদ্ধে হেরে যেয়ে তাদের দাসে পরিণত হলো এবং তাদের রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা যখন তাদের বিদেশী প্রভুরা পরিবর্তন করে তাদের নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা প্রবর্তন করলো, তখন আর এই জাতি মুসলিমও রইলো না, হয়ে গেল মোশরেক এবং কাফের।
ইউরোপীয়ান খ্রিষ্টানদের দাসে পরিণত হবার পরও এ জাতির চোখ খুললো না। মনে এ চিন্তাও এলো না যে, একি? আমার তো অন্য জাতির গোলাম হবার কথা নয়। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি তো এর উল্টো, আমাকেই তো পৃথিবীর সমস্ত জাতির উপর প্রাধান্য দেবার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়ে ছিলেন (সুরা নুর ৫৫)। আমরা যখন মুষ্টিমেয় ছিলাম তখন তো আমাদের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে নি। ঐ মুষ্টিমেয় যোদ্ধার কারণে আমরা পৃথিবীর একটা বিরাট অংশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলাম। কিন্তু কোথায় কি হলো? সেই মুষ্টিমেয়র কাছে পরাজিত শত্রু আজ আমাদের জীবন বিধাতা। এসব চিন্তা এ জাতির মনে এলো না কারণ কয়েক শতাব্দী আগেই তাদের আকিদা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। কোর’আন হাদীসে পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করে প-িতরা এ জাতির এক অংশের আকিদা এই করে দিয়েছিলেন যে, ব্যক্তিগতভাবে খুঁটিনাটি শরীয়াহ পালন করে চললেই “ধর্ম পালন” করা হয় এবং পরকালে জান্নাত লাভ হবে। অন্যদিকে ভারাসাম্যহীন বিকৃত তাসাওয়াফ অনুশীলনকারীরা জাতির অন্য অংশের আকিদা এই করে দিয়েছিলেন যে, দুনিয়াবিমুখ হয়ে নির্জনতা অবলম্বন করে ব্যক্তিগতভাবে আত্মার ঘষামাজা করে পবিত্র হলেই “ধর্ম পালন” করা হয় ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। জাতীয় জীবন কোন্ আইনে চলছে, কার তৈরি দণ্ডবিধিতে (Penal code) আদালতে শাস্তি হচ্ছে তা দেখবার দরকার নেই। এই আকিদা (Attitude, Concept) দৃষ্টিভঙ্গি যে বিশ্বনবীর (সা.) শিক্ষার বিপরীত তা উপলব্ধি করার শক্তি তখন আর এ জাতির ছিল না। কারণ ফতোয়াবাজীর জ্ঞানই যে একমাত্র জ্ঞান, পৃথিবীর অন্যান্য কোন জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, প-িতদের এই শিক্ষার ও ফতোয়ার ফলে এই জাতি একটি মূর্খ জাতিতে পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিল, দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্থানে স্থানে কিছু সংখ্যক লোক বাদে সমস্ত জাতিটাই এই অজ্ঞানতার ঘোর অন্ধকারের মধ্যে বসে ভারবাহী পশুর মতো ইউরোপীয়ান প্রভুদের পদসেবা করলো কয়েক শতাব্দী ধরে। এই কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের সময়ে এই জাতির একটি বড় অংশ অকৃত্রিম হৃদয়ে তার খ্রিষ্টান প্রভুদের সেবা করেছে। প্রভুরা যখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করেছে তখন এরা যার যার প্রভুর পক্ষ নিয়ে লড়েছে ও প্রাণ দিয়েছে। যে মহামূল্যবান প্রাণ শুধুমাত্র পৃথিবীতে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে উৎসর্গ করার কথা সে প্রাণ এরা দিয়েছে ইউরোপীয়ান খ্রিষ্টান প্রভুদের সাম্রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধে, প্রভুদের নিজেদের মধ্যে মারামারিতে। আল্লাহর শাস্তি কী ভয়ংকর!

Monday, April 4, 2016

রসুলাল্লাহর আবির্ভাবের আগে ও পরে

রসুলাল্লাহর আবির্ভাবের আগে ও পরে


রসুলাল্লাহর আগমনের পটভূমি:

রসুলাল্লাহর আবির্ভাবকালীন বিশ্বে পারস্য, রোম, চীন ও ভারতীয় সভ্যতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তন্মধ্যে পারস্য ও রোম সভ্যতা ছিল সর্বাপেক্ষা বিস্তৃত এবং পরাক্রমশালী (সুপার পাওয়ার)। সে সময়ের প্রতিটি সভ্যতার অধীনেই সীমাহীন অন্যায়, অশান্তি, রক্তপাত বিস্তার লাভ করেছিল। যেমন: ধর্মীয়ভাবে পারস্যের অধিবাসীরা ছিল অগ্নি উপাসক। কিন্তু সে ধর্ম সমাজে কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। ফলে পারাস্য সমাজে অনাচার, অবিচার, যুদ্ধ, বিগ্রহ লেগেই ছিল। নৈতিক অবক্ষয় তাদের মধ্যে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পিতা কন্যাকে, ভাই বোনকে পর্যন্ত বিয়ে করত। আর রোমানদের অবস্থাও পারস্যের চেয়ে খুব একটা ভাল ছিল না, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী হলেও তাদের মধ্যে ধর্ম সংক্রান্ত মতানৈক্য, দলাদলির দাবানল চরম আকার ধারণ করেছিল। রসুলাল্লাহর জন্মের মাত্র ছাপ্পান্ন বছর আগে ৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে একত্ববাদ থেকে ত্রিত্ববাদের সূচনাকে কেন্দ্র করে রোমীয় খ্রিষ্টানদের মধ্যে এক মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এ যুদ্ধের ফলে প্রায় পঁয়ষট্টি হাজার খ্রিষ্টান রোম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এদিকে ভারত উপমহাদেশ সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নানা রকম কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। বর্ণবাদের বৈষম্যের বেড়াজালে আটকে পুরো জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। বর্ণবাদের নিষ্পেষণে ভারত উপমহাদেশ চরমভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। অপর দিকে চীনের অধিবাসীরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম তখনো চীনকে শান্তি দিতে পারেনি বরং সামাজিক অবক্ষয়ে জাতিটা থিতিয়ে পড়েছিল। তৎকালীন বিশ্বের বড় বড় সভ্যতার যখন এই দূরাবস্থা তখন ছোট ছোট জাতিগুলির অবস্থা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এমন একটি ছোট্ট জাতি ছিল আরব জাতি। সে সময় আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল ভয়াবহ রকমের নৈরাজ্যকর। ব্যক্তিগতভাবে হিংসা-বিদ্বেষ; দলগতভাবে হানাহানি, যুদ্ধ; সামাজিকভাবে হত্যা, লুণ্ঠন, জুয়া, মদ ও ব্যভিচার সমগ্র আরবকে যেন গ্রাস করে ফেলেছিল। তারা আল্লাহকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে বিশ্বাস করলেও মানাত, লাত, ওযযা, হাবলসহ শতশত দেবতার উপাসনায় ছিল নিমগ্ন। কাঠ-পাথরের বিভিন্ন মূর্তি দিয়ে তারা কাবাকে কলঙ্কিত করেছিল। শুধু তাই নয়, হজ্ব উপলক্ষ্যে তারা কাবাকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছিল। সে সময় সবচেয়ে বর্বর, অসভ্য, হতদরিদ্র জাতি হিসাবে আরবরা সর্বত্র পরিচিত ছিল।
এক কথায় বলা যায় রসুলাল্লাহর আবির্ভাবের সময় সমস্ত বিশ্বে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজাধিরাজ পর্যন্ত সকলেই আকণ্ঠ ডুবে ছিল অন্ধকারের সাগরে।
পৃথিবীর এমন ক্রান্তিকালে মহান আল্লাহ সমস্ত মানব জাতির উপর সদয় হলেন। নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল বিষয়ে অধঃপতিত আরব জাতির মধ্যে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামনব, নবীকূলশিরমনি মোহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাব ঘটালেন।

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সাথে বর্তমানের মিল:

বর্তমানে সমস্ত পৃথিবীর একক কর্তৃত্বকারী ‘সভ্যতা’ হলো ইহুদি খ্রিষ্টান বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ যার প্রভাবাধীন সমস্ত পৃথিবী আজ চরম অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনায় পরিপূর্ণ। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় হত্যা, রাহাজানি, ধর্ষণ, ছিনতাই, যুদ্ধ, আত্মঘাতী বোমাহামলা ইত্যাদি নানা জঘন্য ঘটনায় পরিপূর্ণ আমাদের এই পৃথিবী। আজও পত্রিকার পাতায় তৎকালীন আরব সমাজের মতো দেখতে পাই “বাবার কাছে যৌন নিপীড়নের শিকার হলো নিজ কণ্যা”, “ভারতে বাবা ও ভাইয়ের পৈশাচিক যৌন নিপীড়নের শিকার হতভাগ্য এক নারী” ইত্যাদি আরও জঘন্য সব লোমহর্ষক সংবাদ। পাশ্চাত্য সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে গেছে যে, পৃথিবীর ইতিহাসের সমস্ত রকম যৌনতার রেকর্ড ভেঙ্গে সমলিঙ্গে যৌনতা আইনসিদ্ধ করে নিচ্ছে, ইতর প্রাণীর সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করছে এবং বিকৃত যৌনাচারের ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে সমগ্র পৃথিবীতে। আর আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র জাতিগুলি তাদের পদে পদে অনুসরণ করছে। অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক স্খলনসহ সকল ক্ষেত্রে বর্তমান সমাজ তৎকালীন আরবসমাজের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে।

নবুয়্যত পূর্ববর্তী জীবন:

অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোকিত করতে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ১২ই রবিউল আউয়াল অর্থাৎ আজকের এই দিনে আরব মরুর বুকে ঝর্ণাধারার মত আবির্ভূত হলেন মানবতার মুক্তির দূত, মানবজাতির আদর্শ মোহাম্মদুর রসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম। রসুলাল্লাহ এই অন্ধকার যুগে জন্মগ্রহণ করলেও আল্লাহ তাঁকে সবধরণের দোষত্রুটি, নোংরামী থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্কলুষ রেখেছিলেন। ফলশ্রুতিতে যৌবনে তিনি হলেন আরবের সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, সবচেয়ে সত্যবাদী, সর্বাধিক বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। সকল গুণের সমাহারে মহান আল্লাহ তাঁকে এমন সুমহান চরিত্রের অধিকারী করলেন যে আরবদের কাছে তিনি ‘আল আমিন’ বলে পরিচিত হয়ে গেলেন।
মানুষের বিপদাপদ, সামাজিক সংস্কার নবুয়ত প্রাপ্তির আগেও রসুলাল্লাহর স্বাভাবজাত ছিল। ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি সমাজ কল্যাণে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রত হয়েছিলেন। যদিও হেদায়াহ্হীন ‘হিলফুল ফুজুল’ এর কার্যক্রম বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আর স্থায়ী হলেও রসুল্লাহর জন্য এর কোন প্রয়োজন ছিল না। কারণ আল্লাহ তাকে সমাজ সংস্কারের মত ছোখাট কোন দায়িত্ব দিয়ে পাঠাননি। তাঁকে আল্লাহ দায়িত্ব দিলেন সব রকমের কুসংস্কার, অতীতের বিকৃত ধর্ম ও মানুষের মনগড়া বিধান সম্বলিত জীবনব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ‘সত্যদীন’ প্রতিষ্ঠার কাজ।

নবুয়্যতের দায়িত্ব পালন:

রসুলাল্লাহ তৎকালীন সমাজের অন্যায়, অবিচার, জুলুম, যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখে সর্বদা চিন্তা করতেন কিভাবে এই অশান্তি থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। চল্লিশ বছর বয়সের মোহাম্মদ (সা.) এই চিন্তাগুলি নিয়ে যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন তখন পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক আল্লাহপাক তাঁকে বিশাল এক দায়িত্ব দিয়ে মনোনীত করলেন শেষ নবী ও রসুল হিসেবে। রসুলাল্লাহকে আল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন কেন আজ সমাজ এত অশান্তিতে পূর্ণ এবং কিভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। রসুলাল্লাহ বুঝলেন সমাজে সমস্তরকম অশান্তির মূল কারণ আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে না মানা। লাত, মানাত, ওয্যা, হাবল ইত্যাদি দেবদেবীর নামে নিজেদের মস্তিষ্কপ্রসূত আইন-কানুন দিয়ে সমাজ পরিচালনার জন্যই সমাজে চরম অশান্তি বিরাজ করছিল যেমন বর্তমান সমাজেও আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইন-বিধান দিয়ে সমাজ পরিচালিত হয় বলে সমাজে এত অশান্তি বিরাজ করছে। তাই রসুলাল্লাহ প্রথমেই আরবজাতিকে বোললেন, “তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নাই, তাহোলে আল্লাহ তোমাদের জান্নাতে দাখিল করবেন।” তিনি দীর্ঘ ১৩বছর অর্থাৎ মক্কার জীবনের সম্পূর্ণ সময় শুধু এই কলেমার দাওয়াত বা আল্লাহর তওহীদের দাওয়াত দিয়ে গেলেন। এই সময়ে তিনি নানা রকম নির্যাতনের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ে সবর করেছেন এবং তওহীদের বালাগ চালিয়ে গেছেন, একটি বারের জন্যও নির্যাতন কারীদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন নি। মক্কার জীবনে তিনি কোন কেতাল অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম করেন নি।
রসুলাল্লাহর দায়িত্বকে পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই বলে হেদায়াহ (সঠিক দিক নির্দেশনা) ও সত্যদিনসহ আপন রসুলকে প্রেরণ করেছি এজন্য যে তিনি যেন অন্য সমস্ত দিনের ওপর একে বিজয়ী করেন। (আল কোর’আন- সুরা ফাতাহ-২৮, তওবা-৩৩, সফ-৯)। রসুলাল্লাহ তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব এবং এর ফলাফল সম্পর্কে ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন। মক্কায় যখন রসুলাল্লাহ ও তাঁর সাহাবীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চলছিল, সে সময় একদিন তিনি কাবার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। হঠাৎ কাফেরদের নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের শিকার খাব্বাব (রা.) এসে বোললেন, ‘হে আল্লাহর রসুল! এই অত্যাচার নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আমাদের বিরোধীরা সব যেন ধ্বংস হয়ে যায়।’ তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং খাব্বাব (রা.)-কে বোললেন, ‘তুমি কী বোললে? সাহাবা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। শুনে আল্লাহর রসুল তাকে বোললেন, ‘শোন, শীঘ্রই সময় আসছে যখন কোন যুবতী মেয়ে গায়ে গহনা পরে একা সা’না থেকে হাদরামাউদ যাবে। তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য জন্তু ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ না এটা খাব্বাব (রা.) কে দেয়া রসুলের কোন অভয় ছিল না, বরং তিনি সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই কথাটি বোলেছেন।
মক্কাবাসীর সকল বিরোধিতা উপেক্ষা করে রসুল তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি বোলতে থাকলেন ‘লা এলাহ এল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা-বিধানদাতা নাই। কালেমার এই বাক্য অর্থাৎ জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের হুকুমের স্থলে অন্য কারো হুকুম মানব না। মাত্র কয়েকশজন ব্যতীত সমস্ত মক্কাবাসী রসুলকে প্রত্যাখান কোরল একই সাথে দমন, নিপীড়ন চালাতে আরম্ভ কোরল। তাদের অত্যচার চরম সীমায় পৌঁছুলে রসুলাল্লাহ তাঁর আসহাবদের সঙ্গে নিয়ে মদীনায় হেজরত করলেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, মক্কার তের বছর অবস্থান করলেও রসুলাল্লাহ সে সমাজের কোন অন্যায়কে সংস্কার করতে এগিয়ে জাননি, কারণ বিষবৃক্ষের ফল একটি একটি করে না ছিঁড়ে তিনি বিষবৃক্ষটি সমূলে উপড়ে ফেলার কাজে হাত দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন আল্লাহর দেয়া সত্যদীনের বিধান প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সমাজকে পুরাতন বিল্ডিংএর মত পরতে পরতে সংস্কার করার প্রয়োজন থাকবে না।
যা হোক, আল্লাহ তাঁর অসীম রহমতে মদিনাকে রসুলাল্লাহর হাতে তুলে দিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই দীনুল হকের সত্যের আলোকচ্ছটা মদিনাকে আলোকিত করে ফেলল। যে সমাজে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, হত্যা, লুন্ঠন, জুয়া, জেনা, সুদ ইত্যাদি ছিল নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়, যেখানে মেয়েদের কোন নিরাপত্তা ছিল না, দীনুল হক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন ঠিক তার বিপরীত হয়ে গেল, নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা হলো। সে সমাজের পুরাতন কোন সমস্যা আলাদাভাবে রসুলকে সংস্কার করতে হলো না। কিন্তু শুধুমাত্র মদীনায় দীনুল হক প্রতিষ্ঠা রসুলের দায়িত্ব ছিল না ছিল দুনিয়াব্যাপী। তথাপি চতুর্থ হেজরী পর্যন্ত বদর, ওহদ, খন্দক যুদ্ধ এবং ইহুদিদের সন্ধি ভঙ্গের দরুন তাদের দমনে রসুলাল্লাহর সময় ব্যয় হয়ে গেল। পঞ্চম হেজরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মদীনায় স্থিরতা আসলে রসুল মোটেই কালক্ষেপণ করলেন না। তিনি ঝড়ের বেগে সাহাবীদের নিয়ে বহির্গত হলেন। আল্লাহর সাহায্যে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে আরব উপদ্বীপেবর বাকি সবটুকু দীনুল হকের ছায়াতলে চলে এলো। আরববাসী এবার প্রত্যক্ষ করল দীনুল হকের নির্যাস ‘ইসলাম’ শান্তি। মক্কায় অবস্থানকালে খাব্বাব (রা.) কে বলা সে কথা বাস্তবে পরিণত হলো। রসুল এমন এক শান্তির সমাজ গড়লেন যে সত্যই একজন যুবতী স্বর্ণ অলঙ্কার পরে নির্ভয়ে দু-তিনশত মাইল এককি পথ চলল। কেউ ভুল করে চুরি করে ফেললে, বা রিপুর তাড়নায় ব্যভিচার করে ফেললে সে এসে বলল আমি ব্যভিচার করেছি, আমাকে শাস্তি দিন। এমনকি সমাজে সকলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত কিন্তু পাহারা দেওয়ার জন্য কোন পুলিস রাখা হলোনা এবং সমাজে কোন অন্যায়ও সংঘটিত হলো না। এমনও হলো যে, আদালতে বিচারক বসে অপেক্ষা করতেন কিন্তু তার কাছে কোন অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসতো না। এর চেয়ে শান্তি, আর কি হতে পারে?
শুধু আরব উপদ্বীপে দীনুল হক প্রতিষ্ঠার পর রসুলাল্লাহ প্রত্যক্ষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। বিদায়ের আগে তিনি বাকি দুনিয়ায় আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্ব দিয়ে গেলেন নিজ হাতে গড়া জাতিটির উপর, যার নাম উম্মতে মোহাম্মদী।

আসহাবদের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীদের উদাসীনতা:

রসুলের এন্তেকালের পর এ জাতিটি মোটেই কালক্ষেপণ কোরল না, তাঁরা খরোস্রোতা নদীর মত প্রচ- গতিতে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়লো। ফলশ্রুততি মাত্র ষাট সত্তর বছরের মধ্যে তৎকালীন পরাশক্তি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য সে খরস্রোতে বিলীন হয়ে গেল। অর্ধেকেরও বেশি দুনিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা হলো। তারপর হঠাৎ এ খরোস্রোতা নদীর স্রোত গতিহীন হতে থাকলো। এ জাতি ভুলে যেতে থাকলো যে কেন তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা বাকি দুনিয়াতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ কোরল। শুরু কোরল বাদশাহী, ভোগ বিলাস আর দীন নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও মাসলা ফতোয়া নিয়ে গবেষণা। তখন থেকে বর্তমানের ইতিহাস সবারই জানা।