Friday, October 9, 2015

হেদায়াহ সম্পর্কে সঠিক ধারনা।

হেদায়াহ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, কোনো দুষ্ট প্রকৃতির গোনাহগার লোককে যদি উপদেশ দিয়ে মদ খাওয়া ছাড়ানো যায়, চুরি-ডাকাতি ছাড়ানো যায়, তাকে নামাজী বানানো যায়, রোজা রাখানো যায় তবে আমরা বলি- লোকটা হেদায়াত হয়েছে।
.
এই ধারণা ভুল, কারণ মানুষ নামাজ পড়তেই মসজিদে যায় অথচ রসুলাল্লাহ বলেছেন, “এমন সময় আসবে যখন মসজিদসমূহ জাঁকজমকপূর্ণ ও লোকে লোকারণ্য হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না।” তাহলে রসুলাল্লাহর কথা মোতাবেকই বোঝা গেল হেদায়াহ একেবারেই অন্য জিনিস। কারণ বর্তমানে যে কাজগুলিকে ইবাদত মনে করা হয় যেমন নামাজ, রোজা ইত্যাদি, সেগুলি করলেই হেদায়াতে থাকা হলো এ ধারণা ভুল।
.
হেদায়াহ অর্থ হচ্ছে সঠিক দিক নির্দেশনা (Right direction, guidance, orientation) অর্থাৎ আল্লাহ রসুল মানবজাতিকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন, যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই পথে, সেই দিকে চলাই হচ্ছে হেদায়াহ। আল্লাহ যে পথে চলতে আদেশ দিচ্ছেন সেটা হলো সেরাতুল মোস্তাকীম- সহজ, সরল পথ, জীবনের সর্বস্তরে, সর্ব অঙ্গনে, সর্ব বিভাগে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো আইন-কানুন, নীতি নির্দেশ অস্বীকার করা এবং তাঁকে ছাড়া আর কারো খেলাফত না করা এক কথায় তওহীদ; এই সহজ সোজা কথা। আর আজ সারা দুনিয়ার কোথাও আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ, হুকুমদাতা, সার্বভৌমত্বের মালিক হিসাবে মানা হচ্ছে না, এমন কি ঐ জাঁকজমকপূর্ণ সোনার গম্বুজওয়ালা মসজিদগুলিতেও এই হেদায়াহ নেই, সেখানেও চলছে তাগুতের গোলামী।
.
অথচ আল্লাহর রসুল এবং প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী খেজুর পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির মসজিদ থেকে অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছেন, তাঁদের মসজিদসমূহ কোনোই জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তবু যে ভূখণ্ডে এই জাতি শাসন করেছেন সেখান থেকে সমস্ত অন্যায় অবিচার, যুদ্ধ রক্তপাত, ক্ষুধা দারিদ্র্য, শোষণ এক কথায় সর্ব প্রকার অন্যায় অশান্তি লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
.
অর্ধেক পৃথিবীর কোথাও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনী না থাকা সত্ত্বেও সমাজে বলতে গেলে কোনো অপরাধই ছিল না। সুন্দরী যুবতী নারী অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ একা পাড়ি দিত, তার মনে কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও জাগ্রত হতো না। মানুষ রাতে ঘুমানোর সময় ঘরের দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত না, রাস্তায় ধন-স¤পদ ফেলে রাখলেও তা খোঁজ করে যথাস্থানে পাওয়া যেত, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানি প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, আদালতে বছরের পর বছর কোনো অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসতো না। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল হয়ে গিয়েছিল। এই স্বচ্ছলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মানুষ যাকাত ও সদকা দেওয়ার জন্য টাকা পয়সা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, কিন্তু সেই টাকা গ্রহণ করার মতো লোক পাওয়া যেত না। এই পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, কারণ ঐ জাতি হেদায়াতে ছিল, তওহীদে ছিল। তাদের ইলাহ, বিধাতা, হুকুমদাতা ছিলেন আল্লাহ।
.
আর আজ যারা সোনার গম্বুজওয়ালা মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছেন তাদের কারও ইলাহ গণতন্ত্র, কারও রাজতন্ত্র, কারও সমাজতন্ত্র, কেউ সরকারি দলের, কেউ বিরোধীদলের অনুসারী, অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কোথাও নেই। সবাই ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র সার্বভৌমত্ব মাথায় নিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে দৌঁড়ে পাক্কা মুসল্লী হচ্ছে। এ জন্যই আল্লাহর রসুল বলেছেন, মসজিদ সমূহ ভর্তি হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না। পাঠক, ভেবে দেখেছেন কি, মুসলিম জাতি যদি হেদায়াতেই না থাকে তবে কোথায় রয়েছে? নিশ্চয়ই হেদায়াতের বিপরীত অর্থাৎ পথভ্রষ্টতায়, যদি সেরাতুল মোস্তাকীমেই না থাকে তবে নিশ্চয়ই রয়েছে ইবলিসের বক্রপথে। এই পথ তাদেরকে কোন গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে- জান্নাতে, না জাহান্নামে?

তওহীদহীন জাতিকে আগে তওহীদের জ্ঞান প্রদান করতে হবে

তওহীদহীন জাতিকে আগে তওহীদের জ্ঞান প্রদান করতে হবে

জঙ্গি মনোভাবসম্পন্ন মানুষদেরকে তওহীদের প্রকৃত অর্থ বোঝাতে হবে। দীনের ভিত্তি বা প্রাণ হলো তওহীদ। জীবনের সকল অঙ্গনে যেখানে আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের কোনো কথা আছে, সেখানে অন্য কারোটা না মানাই তওহীদের একমাত্র দাবী। সেই তওহীদ কি আজকের মুসলিম নামধারী জাতির মধ্যে আছে? নেই। আজ এই জাতি জাতীয় জীবন থেকে আল্লাহ প্রদত্ত সিস্টেম, বিধি-বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সিস্টেম গ্রহণ করেছে। ইসলাম বলতেই এরা বোঝে নামাজ, রোজা, এবাদত-উপাসনা এবং জিকির-আজগার, তসবীহ-তাহলীল, ওযু, গোসল, মেসওয়াক বা লেবাসের মতো তুচ্ছ ব্যক্তিগত জিনিস। অথচ আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, দীনের ব্যক্তিগত ভাগ মেনে ও জাতীয় ভাগ প্রত্যাখ্যান করে এরা যে তওহীদ থেকেই বিচ্যুত হয়ে গেছে, আল্লাহর চোখে এরা আর যে মোমেন নেই, মুসলিম নেই, বরং মোশরেকে পরিণত হয়েছে সে জ্ঞান তাদের নেই। কাজেই যারা পুনরায় ইসলামের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে চায় তাদেরকে একদিকে যেমন নিজেদের অবস্থান বুঝতে হবে, সেই সাথে বুঝতে হবে জাতি বর্তমানে কোন অবস্থানে আছে। যে জাতিতে তওহীদই নেই, যারা জাতীয় জীবনে আল্লাহর প্রদত্ত সিস্টেমকে অস্বীকার করেছে তাদেরকে তওহীদের আহ্বান না জানিয়ে, তওহীদের মর্মার্থ না বুঝিয়ে অর্থাৎ মানসিকভাবে জাতিকে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করার উপযোগী না করে আগেই জেহাদের জিগির তোলা সুবিবেচনার কাজ হতে পারে না। জাতিকে আগে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝাতে হবে। ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজ থেকে অশান্তি দূর করার জন্য সংগ্রাম করাই যে একজন মু’মিনের প্রধান কর্তব্য, এবাদত সেটা সকলকে বোঝাতে হবে। তাদেরকে আরও বোঝাতে হবে যে, ধর্মের কোনো বিনিময় চলে না, ব্যবসা চলে না। ধর্মের কাজ হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। এভাবে জাতিকে আগে ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য, তওহীদ, শিরক, কুফর ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে। যুগ যুগ ধরে এদের বিশ্বাসে, আচারে, প্রথায় যে অজ্ঞতা বাসা বেধেছে তা দূরীভূত করতে হবে। তা না করে যাদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম, সেই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরা চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় প্রদান করে। এভাবে যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ শান্তি আনয়ন সম্ভব নয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ গত দুই-এক দশকের ভেতরেই পাওয়া যাবে। 

Thursday, October 8, 2015

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি কিছু কথা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি কিছু কথা

 0

হেযবুত তওহীদ:
উইকিপিডিয়ার হিসাবমতে বিশ্বের মোট সনাতন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় ১১০ কোটি ১৫ লক্ষ। তাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে আমরা যা বোলতে চাই তা হোচ্ছে:
ব সমগ্র মানবজাতি একই স্রষ্টার সৃষ্টি, একই বাবা-মা আদম হাওয়ার সন্তান। সেই হিসাবে সকল মানুষ ভাই ভাই। এ বিষয়ে সকল ধর্মগ্রন্থই একমত। মানবসৃষ্টির পর থেকে যুগে যুগে লক্ষাধিক নবী-রসুল পৃথিবীতে এসেছেন, তারা সবাই একটি ধর্মই নিয়ে এসেছেন যার নাম সনাতন ধর্ম বা দীনুল কাইয়্যেমাহ। সনাতন শব্দের অর্থ হোল চিরন্তন, শাশ্বত, অপরিবর্তনীয়। এভাবে ভারতবর্ষেও বহু নবী রসুল এসেছেন, যাদের শিক্ষা থেকেই সৃষ্টি হোয়েছে প্রচলিত হিন্দু ধর্মের। আমরা সনাতন ধর্মের সেই অবতারদের নবী-রসুল বোলে বিশ্বাস কোরি এবং তাদের আনীত শিক্ষাকে অহি এবং গ্রন্থাবলীকে আল্লাহর কেতাব বোলে বিশ্বাস কোরি। সকল নবী-রসুলের প্রতি, সকল আসমানী কেতাবের প্রতি বিশ্বাস রাখা একজন মোসলেমের ঈমানের অংশ। নবী রসুল অবতারদের ধারাবাহিকতায় সবশেষে এসেছেন মোহাম্মদ (দ:)। আমরা তাঁর উপর যেমন ঈমান রাখি তেমনি এব্রাহীম (আ:), মুসা (আ:), ঈসা (আ:), রামচন্দ্র (আ:), শ্রীকৃষ্ণ (আ:), বুদ্ধ (আ:), কনফুসিয়াস (আ:) এঁদের সকলের প্রতিও সমভাবে ঈমান রাখি এবং আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তাদের প্রতি সালাম পাঠাই (ওয়া সালামুন আলাল মুরসালীন- কোর’আন, সুরা সাফফাত ১৮১)। আমরা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য কোরি না (লা নুফাররিকু বাইনা আহাদিম মীর রসুল- সুরা বাকারা ২৮৫)। আমরা মনে কোরি, যারা আল্লাহর প্রেরিত অবতারদের একজনকে পূজা ও শ্রদ্ধা করে আর অপর একজনকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করে তারা কখনোই সত্যধর্মের অনুসারী নয়। তারা কখনোই স্রষ্টার সন্তুষ্টি পাবে না, স্বর্গ বা জান্নাতলাভ তাদের সুদূর পরাহত।
ব প্রতিটি ধর্মের ধ্বজাধারী শ্রেণি আল্লাহর প্রেরিত ধর্মকে অতি বিশ্লেষণ কোরে সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে নিয়ে গেছে এবং সেই বিকৃত ধর্মকে পুঁজি কোরে ব্যবসা কোরে যাচ্ছে। তারাই ভিন্নধর্মের প্রতি ঘৃণা বিস্তার কোরে মানবজাতির মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ-বিদ্বেষ সৃষ্টি কোরে রেখেছে, যা কখনো কখনো দাঙ্গায় রূপ নেয়। এই সাম্প্রদায়িকতাকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে অসাধু রাজনৈতিক বেনিয়া। ভারতবর্ষে এই নোংরা খেলার সূচনা করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা। তাদের ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে ভাই ভাইয়ের, এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীর চরম শত্র“তে পরিণত হোয়েছে। তাদের বাধিয়ে দেওয়া রায়টে লক্ষ কোটি হিন্দু-মুসলমান জীবন হারিয়েছে, বাসভূমি হারিয়ে উদ্বাস্তু হোয়েছে। সেই রক্তক্ষরণ আজও বন্ধ হয় নি। আমরা হেযবুত তওহীদ, এ যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর অনুসারীরা এই রক্তক্ষরণ বন্ধ কোরে সমস্ত মানবজাতিকে একই ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ করার পথের সন্ধান পেয়েছি এবং সেই লক্ষ্যে কাজ কোরে যাচ্ছি।
ব আমরা মানবজাতির সামনে একটি ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধোরেছি। সেটা হোল: মানুষের হাজার হাজার (হয়তো লক্ষ লক্ষ) বছরের ইতিহাসে মানুষ শান্তি পেয়েছে কেবলমাত্র স্রষ্টার বিধানে। আমরা রামরাজ্যকে এবং এসলামের স্বর্ণযুগকে উদাহরণ হিসাবে নিতে পারি। আর যখনই মানুষ নিজেই নিজের জীবনব্যবস্থা রচনার ভার নিয়েছে তখনই অশান্তিতে পতিত হোয়েছে। বর্তমানে আমরা মেনে চোলছি পাশ্চাত্যের চাপিয়ে দেওয়া পুঁজিবাদী গণতন্ত্র যার পরিণামে আমরা চরম অন্যায় অশান্তিতে ডুবে আছি। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদেরকে স্রষ্টার বিধানে ফিরে যেতে হবে। স্রষ্টার বিধান বোলতে আমরা আদিগ্রন্থ বেদ, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক, জিন্দাবেস্তা, তওরাত, যবুর, কোর’আন সবগুলিকেই বোঝাচ্ছি। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণনা কোরে কাউকে সেই ধর্মগ্রহণে অনুপ্রাণিত করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের কথা হোচ্ছে, যার যার ধর্মে যে সত্য বর্ণিত আছে তারা সেই কথার উপরে প্রতিষ্ঠিত হোলেই শান্তি আসবে। তবে সবাইকে পাশ্চাত্য সভ্যতার চাপিয়ে দেওয়া মতবাদগুলিকে প্রত্যাখ্যান কোরতে হবে।

কারা স্বদেশি কারা বিদেশি?

কারা স্বদেশি কারা বিদেশি?

 0

আতাহার হোসাইন:
বহির্দেশ থেকে ইংরেজসহ যে সকল জাতি ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছেন, এদেশের মানুষকে শাসন করেছেন তাদের সবাইকে এক বাক্যে পরসম্পদলোভী বিদেশি লুটেরা, ডাকাত বলে প্রচার করা হয়। কি গানে, কি কবিতায়, কি সাহিত্যে, কি ইতিহাস বইয়ে কোথাও এর ব্যত্যয় নেই। আর জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারায় যারা এক ধাপ এগিয়ে তারা ‘বিদেশি’দের চলে যাওয়ার পরও সেই একইরকম মনোভাব পোষণ কোরে ঐ ‘বিদেশি’দের বর্তমান প্রজন্মকে এদেশ থেকে উৎখাত করতে অতিশয় তৎপর। এই ভূ-খণ্ডে যতগুলো সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঘটেছে তার পেছনে এই শ্রেণিটার এমন মনোভাব অনেকটাই দায়ী। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন আঙ্গিকে দেশি-বিদেশির স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক গোলাম আহমাদ মোর্তজা। তিনি তার ‘চেপে রাখা ইতিহাস’ বইটিতে বলেন, ‘আর্য এবং মুসলমান জাতি যারা নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষায় ভারতে এসে এখানে বাস করছেন, উন্নতি ও অবনতির শেষ ফল অর্র্থাৎ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ-সম্পত্তি ভারতেই রেখে শ্মশান কিংবা কবরের মাটিতে নিজেদের মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন তাঁরাই স্বদেশি। আর ইংরেজ, যারা এসেছিল ভাগ্য পরীক্ষা করতে। তারা বণিকের বেশে তুলাদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত কোরে ভারত দখল কোরে ভারতের সম্পদ, শস্য, অর্থ যতটা সম্ভব নিংড়ে নিয়ে চলে গেছেন নিজেদের দেশে। তারা ব্রিটেনকে করেছেন অধিকতর সমৃদ্ধশালী। অতএব তারা বিদেশি হলেও কোনক্রমেই মুসলমান ও আর্যজাতি বিদেশি নয়।’
কারা দেশি আর কারা বিদেশি এই প্রশ্নের জবাবে জনাব গোলাম মোর্তজার এই মতটি একটি চরম সত্যকেই প্রতিভাত করে। আমি তার সঙ্গে একমত। প্রাচীন যুগের আর্য, উম্মতে মোহাম্মদীর অন্তর্ভুক্ত মোহাম্মদ বিন কাসেম, দীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আসা শাহজালাল (র:), শাহপরান (র:) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গ ও তাঁদের অনুসারীগণ, মুঘল, তাতার, তুর্কি ও পাঠান বংশীয় শাসকবর্গ বিদেশি নন, কারণ তারা এদেশে এসে আর ফিরে যান নি। নিজেদের মেধা, শ্রম সবকিছুকে উজাড় কোরে দিয়ে তারা এদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, এদেশের ইতিহাসকে স্বর্ণোজ্জ্বল করেছেন। সেই সাথে তারা এদেশের বুকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ কোরে এ দেশের মাটির সাথেই মিশে রয়েছেন। অন্যদিকে প্রবল জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের উপরোক্ত ‘বিদেশি লুটেরা’ তত্ত্বকে আমরা এই জন্য বর্জন কোরব যে তারা নিজেরা অতি দেশপ্রেমিক সেজে বাইরে থেকে আগত সকলকেই এক কাতারে ফেলে পরসম্পদলোভী বিদেশি শক্তি আখ্যা দিয়ে থাকেন। এর দ্বারা তারা প্রকারান্তরে নিজেদের জাতীয় উন্নতিতে সকলের অবদানকে অস্বীকার কোরে বসেন।
ইংরেজরা ছিল প্রকৃতই বিদেশি স্বার্থান্বেষী, দস্যুতাপরায়ণ বেনিয়া জাতি। তাদের মূল সরকার ছিল ব্রিটেনেই। সেখান থেকেই নিয়োগ দেওয়া হত বড় লাট, ছোট লাট, বিভিন্ন সরকারি বিভাগের কর্মকর্তা (আমলা) ইত্যাদি হিসেবে। তারা এদেশে এসে বাণিজ্য, শাসন-শোষণ, লুটপাট কোরে সম্পদ হাতিয়ে নিজেদের দেশকে উন্নত করেছে। আবার প্রায় সবাই দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়ে নিজ দেশে গিয়েই মৃত্যুবরণ করেছে। তাই নিঃসন্দেহে যারা এই তালিকায় পড়ে তারাই বিদেশি। কিন্তু যারা এখানে এসে আর কখনোই নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যান নি তারা এদেশীয়দের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন। কেননা তারা এদেশ থেকে পাচার কোরে নিজ দেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন নি।
ইউরোপীয় বিদেশিদের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ যখন বিদ্রোহ করেছিল তাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন মুসলিমরা যাদের আজ বিদেশি বলে অপবাদ দেওয়া হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। এই সিপাহী বিদ্রোহের নেপথ্যে হাত ছিল পারস্য থেকে আগত মুঘলদের শেষ উত্তসূরি বাহাদুর শাহ জাফরের। কিন্তু কথিত স্বদেশিদের অনেকেই সেদিন ব্রিটিশরাজের বিপক্ষে অস্ত্রধারণ করতে ভয় পেয়ে তাদের আনুগত্য মেনে নিয়েছিল। পরবর্তীতে বিদ্রোহে সম্পৃক্ততা থাকার কারণে বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেখানে তার কবরে স্বরচিত যে এপিটাফ লেখা হয় তাতে নিজ ভূমি ভারতের প্রতি যে ভালবাসা ও প্রবল আকুলতা ফুটে উঠে তা ভেবে যে কোন কঠোর হৃদয়ের মানুষও বেদনায় আপ্লুত হতে বাধ্য।
হায় জাফর! এতোই হতভাগ্য তুমি।
দাফনের জন্য হিন্দুস্থানে দু’গজ জায়গা পেলে না তুমি!
যেখানে ঘুমিয়ে আছে আমার শত প্রিয়জন,
যেখানে কেটেছে আমার সুখ জীবন যৌবন।
এই করুণ আর্তি কি কোন ‘বিদেশি’ লোকের হতে পারে?
এতো গেল অতীত। এখন দেখা যাক স্বদেশি-বিদেশির এই সংজ্ঞায় বর্তমানে কারা কোন পর্যায়ে পড়েন। যারা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির রাজনৈতিক হর্তাকর্তা, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই বৈধ কিংবা অবৈধ উপায়ে অর্থ-কড়ি উপার্জন কোরে একটু জাতে উঠতে পারলেই দেশের সম্পদ পাচার কোরে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি ক্রয় করেন। রাজনীতিকদের মধ্যে অনেকেই ক্ষমতার মেয়াদ পার হওয়ার আগে আগে নতুন সরকারের হাতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। অনেক সেনা অফিসারও এমন কাজ করেছেন অতীতে। এই শ্রেণির মানুষগুলি নিজেরা রাজনীতির মঞ্চে, টিভি টকশোতে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে দেশপ্রেমের বুলি আউড়ালেও, স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে রাজনীতি, দলাদলি, মারা-মারি, ছুরি চালানো, বোমা ফাটানোর মতো কাজকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বৈধতা দান করলেও তাদের নিজেদের ছেলে-মেয়েদেরকে ঐসব দেশিয় স্কুল-কলেজগুলোতে পড়া-লেখা করান না, ছাত্র-রাজনীতিতেও জড়িত হতে দেন না। তারাসহ এদেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য কোরে অর্থ কামান কিন্তু নিজেদের ছেলে-মেয়েদেরকে বেশি টাকা-পয়সা ব্যয় কোরে পড়া-লেখা করান বিদেশের স্কুল-কলেজগুলোতে। একাধিক বাড়ি-গাড়ি আগেই তারা বিদেশে কোরে রেখেছেন। ইংরেজরা যেমন তাদের শাসনকালে নিজেদের দেশ থেকে বেড়িয়ে আসতেন তেমনি সরকারি কর্মকর্তারা কিছুদিন পর পর সম্ভব হলে সরকারের কোষাগার খালি কোরে বিদেশভ্রমণ কোরে আসেন। ব্রিটিশরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজেদের দেশের আদলে এদেশীয় অবকাঠামো গড়ার প্রয়াস পেতেন। অনুরূপ কথিত ‘স্বদেশিগণ’ বিদেশের আদলে এদেশের হোটেল, বাড়ি-গাড়ি, অবকাঠামো গড়ে তুলতে চান। এদেশীয় শিল্পকলা, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র থেকে সে সব দেশের ভাষা, শিল্পকলা, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে বেশি ভালবাসেন। আড্ডায়, কথা-বার্তায়, উদাহরণে বিদেশিদের মতবাদ, বিদেশিদের চালচলনের প্রশংসা করেন এবং এরা ওসবের হুবহু কপি কোরে সেগুলোরই প্রয়োগ করতে চান। এগুলিই তাদের প্রগতিবাদিতা আর দেশপ্রেমের পরিচয়!
আজকে আমাদের সমাজের যারা উচ্চপর্যায়ের বাসিন্দা, তারা আমলাই হোন আর রাজনীতিকই হোন, তাদের মধ্যে আর লুটেরা বর্গি, ঠগি, ইংরেজ, ফিরিঙ্গিদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ওরা যেমন ছিল এরাও ঠিক একই রকম। সুতরাং গায়ের রঙে এদেশীয় হলেও তারা চরিত্রগত দিক থেকে প্রকৃত অর্থেই বিদেশি। তারা কেবল বিদেশিই নয়, তারা এদেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত। সুতরাং তাদের ব্যাপারে প্রকৃত স্বদেশিদের সাবধান হওয়া একান্ত জরুরি।

কম্যুনিস্টদের উদ্দেশ্যে দু’টি কথা : ধর্মব্যবসায়ীদের কূপমণ্ডূকতায় ব্যর্থ হল কমরেড লেনিনের পরিকল্পনা


কম্যুনিস্টদের উদ্দেশ্যে দু’টি কথা : ধর্মব্যবসায়ীদের কূপমণ্ডূকতায় ব্যর্থ হল কমরেড লেনিনের পরিকল্পনা

সারা দুনিয়ায় কিছুদিন আগে বাম আদর্শের জয়জয়কার ছিলো, এখনও বিশ্বের অনেক স্থানে বামপন্থীদের নাম সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। পুরো রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা, ভারত উপমহাদেশের বুদ্ধিজীবী মহল, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ বাম ঘরানার। কারও অজানা নয় যে, গণতন্ত্রের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রেণিহীন মানুষদেরকে চরম দুর্গতি থেকে মুক্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি হয়েছিল। তদানীন্তন গণতন্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রেণিহীন মানুষের দুর্গতির কথা পড়লে চোখের পানি ধোরে রাখতে কষ্ট হয়। এই অবস্থার কারণে ইউরোপের জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবীরা উদ্বিগ্ন হোয়ে পড়লেন যে, কী কোরে এই মানুষগুলোকে মুক্তি দেয়া যায়? সেই জ্ঞানী-গুণী, মুক্তচিন্তার মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলেন কার্ল মার্কস, লেনিন এরা। তারা চেষ্টা কোরলেন মানুষকে অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি দেবার জন্য। কার্ল মার্কস আবিষ্কার করলেন সমাজতন্ত্র। কিন্তু সমাজতন্ত্র হলো মানবজীবনের মাত্র একটি দিক অর্থাৎ অর্থনৈতিক অঙ্গনের সমাধান। কিন্তু মানুষের জীবন কি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যাতেই পূর্ণ? নিশ্চয় নয়, অনেক কিছু নিয়েই মানুষ। মার্কসের সমাধান হলো মানুষের জীবনের শুধু একটি অঙ্গনের ভারসাম্যহীন সমাধান, যা আজ কার্যত অচল। এটা প্রয়োগের ফলে আবারও প্রমাণিত হোয়েছে যে, মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত বিধান কখনও মানুষকে শান্তি দিতে পারে না, তাই সমাজতন্ত্রও মানুষকে শান্তি দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হোল। ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পাশবিক নিপীড়নের পর বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মানবজাতির সামনে আশার বাতি নিয়ে হাজির হয়েছিল যে সমাজতন্ত্র কালের বিবর্তনে এখন তার অসারতা সূর্যের আলোর মতো দীপ্তমান। সমাজতন্ত্র যে স্বপ্ন দেখিয়েছে সেটা বাস্তবতার ঠিক উল্টো। কম্যুনিস্টদের এই নিদারুণ ব্যর্থতার কারণ মানুষের আত্মার চাহিদা পূরণে অকৃতকার্য হওয়া। এ বিষয়টি উপলব্ধি কোরেছিলেন কার্ল মার্কসের তত্ত্বের বাস্তব রূপকার ভ.ই.লেনিন; কিন্তু এর কোন সমাধান কোরে যেতে পারেন নি দু’টি কারণে। প্রথমত ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র, এবং দ্বিতীয়ত বিকৃত এসলামের ধারক-বাহক কূপমণ্ডূক মোল্লাদের এসলাম-পরিপন্থী ফতোয়াবাজি।
সমাজতন্ত্রীরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার ধ্বজাধারী মনে করেন এবং পক্ষান্তরে এসলামসহ সকল ধর্মমতকে একচেটিয়াভাবে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করেন, সকল ধর্মকে স্থবির, কল্পকাহিনী, জড়তা, কূপমণ্ডূকতা বোলে গালিগালাজ করেন, বিশেষ কোরে মোসলেমদেরকে পশ্চাদপদ, গোঁড়া, মধ্যযুগীয়, অন্ধ বলেন। এটা বলেন কেন? এটা বলার কারণ, আপনারা মসজিদে, মাদ্রাসা, খানকার চার দেয়ালের ভেতরে দাড়িওয়ালা-টুপিওয়ালা, লম্বা পাগড়ীওয়ালা লেবাসধারী মওলানা ও পীর সাহেবদেরকে দেখে মনে করেন এটাই বুঝি এসলাম। কিন্তু না, এটা প্রকৃত এসলাম নয়। গত ১৩০০ বছরে বিকৃত হতে হতে বর্তমানে প্রচলিত এসলাম প্রকৃত এসলামের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রূপ ধারণ করেছে। ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা ষড়যন্ত্র কোরে তাদের সকল উপনিবেশগুলিতে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা কোরে একেবারে চূড়ান্ত একটা বিকৃত এসলাম শিক্ষা দিয়ে মোসলেম জাতিকে একেবারে বিপরীত দিকে পরিচালিত কোরেছে। এই এসলাম যে কতটা বিকৃত তার একটি প্রমাণ লেনিনের জীবন থেকে দেওয়া যায়। ঘটনাটি আমরা উদ্ধৃত কোরছি মাওলানা শামস নাবীদ উসমানী রচিত Now of Never গ্রন্থ থেকে যা অনুবাদ কোরেছেন স.স.আলম শাহ। অনুবাদ পুস্তক ‘বেদ-কুর’আন ও স্বজাতির বিভেদ’। আরও দেখুন উর্দু পত্রিকা ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ এর ২৮তম সংখ্যা, ১৯৮২, সূত্রঃ জগদগুরু মুহাম্মদ (সাঃ), রেনেসাঁ পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা-২০৯-২১০। ঘটনাটি হোল:
রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড লেলিন বিশ্বধর্মের পর্যালোচনা করার পর এসলামে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি রুশীয় জনগণের এসলাম গ্রহণের আশা পোষণ কোরতেন। কথিত আছে যে, জনৈক বাকরা খাঁন নামক বুযুর্গের সংস্পর্শে আসার পর তিনি এসলামের প্রতি অনুরক্ত হন। তার দ্বারা লেলিন যথেষ্ট প্রভাবিত হন। যাই হোক, লেনিন সচেষ্ট হোয়েছিলেন, কিন্তু মিশরীয় উলামাদের অজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের ষড়যন্ত্রের ফলে এই সুযোগ হাতছাড়া হয়।
রাশিয়ার জার-তন্ত্রের পতনের পর লেনিন হন সর্বময়কর্তা। তিনি কমিউনিস্ট প্রশাসন স্থাপন করেন। একদিন তিনি নিকটতম বন্ধুবর্গের বৈঠক ডাকেন। তাতে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার গঠনে সফল হোয়েছি কিন্তু একে সুদৃঢ়, সুবিন্যাস্ত, শাশ্বত ও সার্বজনীন কোরে তোলার জন্য আমাদেরকে এমন এক জীবন ব্যবস্থা দিতে হবে যা হবে মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের শুধুমাত্র অন্নবস্ত্র-ই যথেষ্ট নয়। আত্মার খোরাকও প্রয়োজন। ক্ষুধার্ত মানুষকে রুটি দিয়ে শান্ত রাখা যায় একটা পর্যায় পর্যন্ত। এ পর্যায় অতিক্রান্ত হোলে মানবাত্মা তৃষ্ণার্ত হোয়ে উঠে। এ তৃষ্ণা নিবারণের কোন উপকরণ-ই আমাদের কাছে নেই। আছে ধর্মাচারের মধ্যে। আমি পৃথিবীর সব ধর্ম-ই গভীরভাবে অধ্যয়ন কোরেছি , সবখানে পেয়েছি আফিমের আবেশ। শুধুমাত্র একটি ধর্মকেই পেয়েছি প্রাণবন্ত জীবন ব্যবস্থা হিসেবে। এক অনিরুদ্ধ গতিময়তা এর মধ্যে বিদ্যমান। এটাই আমাদের প্রগতিশীল জীবন ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সহায়ক বোলে আমার কাছে প্রতীয়মাণ হোয়েছে। এখন সে ধর্মের নাম আমি শুধু বলব। এ ব্যাপারে মত প্রতিষ্ঠায় আপনারা তাড়াহুড়ো কোরবেন না। কেননা প্রশ্নটি কমিউনিজমের জীবন মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত (Don’t hasten to form your  own conclusions because this question pertains to the life and death of Communism.) আপনারা সময় নিয়ে ভাবনা চিন্তা কোরুন। হতে পারে আমার ধারণা ভুল, কিন্তু আমাদের আত্মপ্রশান্তির জন্য ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কোরতে হবে। আমি মনে করি যে, এসলামই একমাত্র ধর্ম যার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজতন্ত্রের নিকটতম
(Islam is the only religion closer to the economic programmes of Communism.)”
এ কথা শুনে সমবেত লোকদের মধ্যে হইচই শুরু হোয়ে যায়। তখন লেনিন তাদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কোরতে নির্দেশ দিয়ে বলেন- আজ থেকে পুরো এক বছর পরে পুনরায় আমরা একত্রিত হব। আর তখনই আমরা ঠিক কোরব কমিউনিস্টদের ধর্মাশ্রয়ী হওয়া উচিৎ হবে কি না, যদি গ্রহণ কোরতেই হয় তাহলে সে ধর্ম কোনটি?”
ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর এ সংবাদ অবহিত হোয়ে এটাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের অশনিসংকেত মনে কোরল। তারা ভাবলো, যদি উদীয়মান শক্তি কমিউনিস্ট রাশিয়া এবং বিপন্ন বিপর্যস্ত আধমরা লড়াকু মোসলেম জনগোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হোয়ে যায় , তাহলে ওপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠবে। সুতরাং ব্রিটিশ কূটনৈতিকরা তৎপর হোয়ে উঠল বিশ্বব্যাপী। মোসলেম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া হল এমন এক সংবেদনশীল প্রশ্ন যে কমিউনিজম হলো আল্লাহবিরোধী মতবাদ। এসলামের জন্য আল্লাহদ্রোহী এই মার্কসীয় মতবাদ কি গ্রহণীয় হোতে পারে? ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে মোসলেম বিশ্বের আলেম ওলামার নিকট থেকে ফতোয়া নেয়া হল। একইভাবে এ প্রশ্নে তৎকালিন মোসলেম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল। আলেমগণ এ সংক্রান্ত প্রশ্নের পটভূমি ও এর অর্ন্তনিহিত উদ্দেশ্য অবগত ছিলেন না। ফলে আল-আযহারের ওলামাগণ এরূপ নেতিবাচক বিধান প্রকাশ কোরলেন যা ব্রিটিশ প্রশাসন একান্তভাবে চাইছিল। অতঃপর যা হবার তাই হলো। ব্রিটিশ সরকার এ ফতোয়া ছাপিয়ে সারা বিশ্বে বিলি কোরল। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার মোসলেম অধ্যুষিত অনেক এলাকায় মোসলেমদের অনেকের কাছে এ ফতোয়ার কপি রয়েছে। এ সংবাদ লেনিনও অবগত হলেন। এতে বিস্ময় প্রকাশ কোরে তিনি বলেন- ‘আমার ধারণা ছিল মোসলেমরা কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রমাণ কোরল, অন্য আর সব ধর্মাবলম্বীদের মত মোসলেমরাও গোঁড়া, তত্ত্বসর্বস্ব ও সংকীর্ণ।’ ফলশ্র“তিতে পরিকল্পনা অপূর্ণ থেকে গেল আর লেনিন বিরোধীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
সেদিন লেলিনের এই প্রস্তাব আলেমরা নিতে পারেন নি। কারণ, তখন মদীনা, কায়রো, লাহোর, দিল্লী, কোলকাতা ইত্যাদি জায়গায় যে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ব্রিটিশ পণ্ডিতদের তৈরি করা সিলেবাস মোতাবেক যে এসলাম শিক্ষা দেওয়া হোচ্ছিল (এবং এখনও হোচ্ছে) সেটি আদৌ আল্লাহ-রসুলের এসলাম নয়। সেই ফতোয়া দানকারী ধর্মব্যবসায়ীরা ছিল কূপমণ্ডূক মোল্লা যারা প্রকৃত এসলামের সাথে সম্পর্কহীন। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব প্রত্যাখ্যান কোরে তারা ব্রিটিশ বেনিয়াদের তৈরি মতবাদ ও সার্বভৌমত্ব তারা মেনে নিয়েছে। আজও পৃথিবীময় ধর্মব্যবসায়ীদের পণ্যরূপী সেই অন্তঃসারশূন্য, স্থবির এসলামকেই আপনারা দেখছেন এবং অনর্থক আল্লাহ-রসুলের প্রতি বিদ্বেষ লালন ও বিস্তার কোরে যাচ্ছেন।
সেদিন মুক্ত চিন্তার ধারক কমরেড লেনিনের পুরো রাশিয়ার জনগোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে এসলামকে সহায়ক ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণকে যে ধর্মব্যবসায়ীরা নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান কোরেছিলেন তাদের মনোভাব ছিলো অনেকটা এমন- ঐ ব্যাটা তো নাস্তিক, কাফের। ওকে এসলাম ধর্মের বিধান ব্যবহার কোরতে দিলে তো এসলামের জাত যাবে। আজও একই ধারণা ধর্মজীবীরা পোষণ করেন। তাদের জানা দরকার আল্লাহর রসুলের সময় রসুল যখন প্রকৃত এসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান কোরেছিলেন তখন তাঁর আহ্বানে ইহুদি, খ্রিস্টান, নাস্তিক, মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক সব জাতির মানুষ এসলামের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হোয়েছিল। এমন কি রসুলাল্লাহ খ্রিস্টান শাসক নাজ্জাশির মৃত্যুর পর সাহাবীদেরকে বোলেছিলেন যে, তোমাদের একজন ভাই মৃত্যুবরণ কোরেছেন। রসুলাল্লাহ নিজে তার জানাজার সালাহ কায়েম কোরিয়েছিলেন। কারণ নাজ্জাশি রসুলাল্লাহর আসহাবদেরকে অকপটে সহযোগিতা কোরেছিলেন। আমরা বিশ্বাস কোরি, যদি মাননীয় এমামুয্যামানের সঙ্গে কমরেড লেনিনের সাক্ষাৎ হোত, আমাদের বিশ্বাস রাশিয়াতে কম্যুনিজমের যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হওয়ার যে দুর্বিসহ অবস্থা সৃষ্টি হোয়েছিল, সেটা হওয়া সম্ভব হোত না। রাশিয়ার ইতিহাস হোত অন্য।
১৯৯০-তে সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা সুস্পষ্ট হোয়ে যাওয়ায় মার্কসবাদীদের তীর্থভূমি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়, তারপরই সারা দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র নিক্ষিপ্ত হয় আস্তাকুঁড়ে। সে সময়ের গোঁড়া সমাজতান্ত্রিকরা আজও দুর্বল কণ্ঠে সমাজতন্ত্রের জয়গান করেন কিন্তু বাস্তবে তারা সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা মার্কস লেলিনের আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছেন এবং বর্তমানে তারা চরম পূঁজিবাদী গণতন্ত্রের অনুসারী। আপনারা পুঁজিপতিদের অধীনে মন্ত্রিত্ব কোরছেন, রাজনীতি কোরছেন, শ্রেণিহীন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা বাদ দিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা কোরছেন আর সকল ধর্মের পুরোহিতরা যেমন ধর্মকে বিক্রী কোরে জীবিকা নির্বাহ করেন আপনারাও মার্কস, লেনিন, এঙ্গেলসকে বিক্রী কোরছেন। আপনারা খামোখা মানুষদেরকে সাম্যবাদের কথা বোলে প্রতারণা কোরে যাচ্ছেন। আপনারা জানেন যে, আপনাদের সিস্টেম ব্যর্থ ও অচল। এখন গণতন্ত্রের দিন এসেছে, তাই সেদিকেই এখন ছাতা ধোরে আছেন। এই কথিত পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের অধীনে থাকলে আপনাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত জীবন ঋষ্টপুষ্ট হোচ্ছে।
আপনারা যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন আপনাদের প্রতি আমাদের শেষ কথা হোল, যদি আপনারা সত্যিই মানুষের কল্যাণ চান, তবে আপনাদের উচিত প্রকৃত এসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা যেটা প্রচণ্ড, দুর্দান্ত গতিশীল এক জীবনব্যবস্থা। সেটা মোল্লাদের কাছে নেই, সেটা আছে আমাদের কাছে। সেটা প্রতিষ্ঠিত হোলে পৃথিবীতে থাকবে না কোন ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ, থাকবে না ধর্ম-বর্ণের কোন ভেদাভেদ, শ্রেণীবৈষম্য, পুরো মানবজাতি হবে এক জাতি। মানব সমাজে এমন অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে যে, প্রত্যেকের নিজের মেধা ও পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থের উপর যেমন পূর্ণ অধিকার থাকবে, অপরপক্ষে সমাজের প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল হোয়ে যাবে, মানুষ তো দূরের কথা একটি কুকুরও বুভুক্ষ থাকবে না। ধনীর সম্পদে দরিদ্রের ন্যায্য অংশীদারত্ব থাকবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার হাতে মজুরি অর্পিত হবে। মালিক ও শ্রমিক এক টেবিলে বসে খাওয়ার পারিপার্শ্বিকতা সৃষ্টি হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য লাইসেন্স লাগবে না, মিথ্যা না বোলে যত খুশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা যাবে। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের আঞ্চলিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকবে, সঙ্গীত, নাট্য, চিত্রকলায় কোনরূপ বাধা আরোপ করা হবে না, কেবল মাত্র যা কিছু মানুষের ক্ষতির কারণ হয় সেগুলি বর্জনীয় বোলে বিবেচিত হবে। আমরা বোলি না যে, আপনারা আল্লাহ বিশ্বাসী হোয়ে যান, মো’মেন হোয়ে যান, পরকালে বিশ্বাসী হোয়ে যান। আল্লাহর প্রতি কে ঈমান আনবে কে আনবে না সেটা তারা আল্লাহর সঙ্গে বুঝবে। সুতরাং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করানো আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ আল্লাহর শেষ রসুলের আনীত আকাশের মত উদার, সমুদ্রের মত বিশাল, দুর্দান্ত গতিশীল এসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা কোরে মানবজাতিকে শান্তিময়, নিরাপদ, ন্যায় ও সুবিচারে পূর্ণ একটি জীবন উপহার দেওয়া। দল, মত, পথ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, আস্তিক, নাস্তিক নির্বিশেষে সকল মনুষ্য সন্তানের প্রতি আমাদের একটিই প্রশ্ন, আপনি মানবজাতির সার্বিক জীবনে সুখ, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি ও ন্যায় চান কি না। যদি চান, তাহোলে একটিই পথ- সেই অপার শান্তিময় জীবনব্যবস্থার রূপরেখা আল্লাহ যামানার এমামকে দান কোরেছেন। আমরা তাঁর পক্ষ থেকে সেটা আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা কোরছি। তাই অন্য কারও কথায় প্রভাবিত না হোয়ে জানুন আমরা কী বোলি।

Wednesday, October 7, 2015

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী ও শান্তির দূত বিশ্বনবী (সা.)

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী ও শান্তির দূত বিশ্বনবী (সা.)

 0

এম. এ. সামাদ:
আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বার্তাবাহক মহানবী (সা.) সত্যদীনের অধীনে আরবের অজ্ঞাত, অখ্যাত, রিক্ত-নিঃস্ব, নিরক্ষর মরুবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করে তিলে তিলে গড়ে তুললেন মানব ইতিহাসের বিস্ময়কর এক জাতি, অপরাজেয় অপ্রতিরোধ্য মৃত্যু-ভয়হীন এক বিপ্লবী জাতি। এই জাতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া, তাদের নিরলস সংগ্রাম সম্পৃক্ততার ইতিহাস বিচার করলে জাতিটিকে পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী জাতি, যাদের বিপ্লবের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত অন্যায়, অবিচার ও অশান্তি দূর করে পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর রসুল নিজে উপস্থিত থেকে আবার পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়ে এই জাতিটি নিয়ে ৭৮টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেন, যার ফলে তাঁর জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপে সত্যদীন তথা শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। এর পরের ইতিহাস এই জাতিটির নিরবচ্ছিন্ন জয়ের ইতিহাস। মহানবীর (সা.) পবিত্র হাতে গড়া জাতিটি তৎকালীন দু’টি পরাশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে যারা ছিল সংখ্যা, অস্ত্র-শস্ত্র ও অর্থবলে মুসলিম বাহিনীর চেয়ে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী, তাদের উভয়কে এক এক করে নয়, একইসাথে সামরিকভাবে পরাজিত করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে নিয়ে আসলো। উম্মতে মোহাম্মদীই হয়ে গেলো পৃথিবীর একক পরাশক্তি। তাদের মোকাবেলা করা তো দূরের কথা, তাদের নাম শুনলেও শত্র“র অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো। ধনবলে, শিক্ষায়-দীক্ষায়, সামরিক শক্তিতে, উন্নতি-প্রগতিতে এই জাতিটি তখন ছিল পৃথিবীতে অদ্বিতীয়।
মুসলিম বাহিনীর এই বিস্ময়কর সাফল্যের নেপথ্যে ছিল মহান রাব্বুল আলামীনের সাহায্য। এই সাহায্যের ধারা অব্যাহত ছিল ততোদিন, যতোদিন পর্যন্ত জাতিটি বিশ্বনবীর (সা.) আদর্শকে আঁকড়ে ধরে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। অতঃপর এই আদর্শ যখন মুসলিম জাতি ত্যাগ করেছে, তখনই আল্লাহ তাদেরকে ত্যাগ করেছেন। ধীরে ধীরে তাদের উপরে নেমে এসেছে আল্লাহর শাস্তি। বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত জাতিটির ভাগ্যে জুটেছে পরাজয়, অপমান-লাঞ্ছনা। এ সম্পর্কে আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা – “যদি তোমরা অভিযানে বের না হও, তাহলে তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিয়ে তোমাদের উপরে অন্য জাতি চাপিয়ে দেব তোমরা (আল্লাহর) কোন ক্ষতি করতে পারবে না (কোর’আন সুরা আত-তওবাহ- ৩৯)। স্রষ্টার এই সাবধানবাণী অমান্য করার পরিণতিতে আজকের ১৬০ কোটির এই জনসংখ্যা সকল জাতির গোলামে পরিণত হয়েছে। তারা পৃথিবীতে ভয়াবহতম শাস্তি আর লাঞ্ছনার সম্মুখীন। এখন এই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটাতে আমাদেরকে রসুলাল্লাহর সেই লুপ্ত আদর্শকে ধারণ করতে হবে, প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হতে হবে। আসুন সংক্ষিপ্ত পরিসরে সেই বিপ্লবী আদর্শটি অবলোকন করি-
এক নজরে বিশ্বনবীর বিপ্লবের ২৩ বছর
মক্কা জীবন ৪৭৪৫ দিন
১। ৬১০ খৃঃ ২৭ শে রমজান হেরা পর্বতের গুহায় বিশ্ব-মানবতার মুক্তির জন্য বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) তওহীদের সুমহান বাণীপ্রাপ্ত হন।
২। রসুলের ডাকে সর্বপ্রথম তওহীদের দীক্ষায় দীক্ষিত হন স্ত্রী খাদিজা (রা:)। অতঃপর রসুলাল্লাহর স্বজনদের মাঝে তওহীদের আহবান জানান এবং তা ব্যাপকভাবে গোপনে প্রচার করতে থাকেন।
৩। একদিন রসুলাল্লাহ কোরায়েশ ও অন্যান্য গোত্রের লোকজনকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে জমায়েত করলেন। অতঃপর তাদেরকে প্রকাশ্যে তওহীদের পথে আহ্বান করলেন। কিন্তু কোরায়েশরা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল। আবু লাহাব রসুলাল্লাহকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করল।
৪। হযরত আলী (রা:), আবু বকর (রা:), ওসমান (রা:), ওমর ফারুক (রা:), যায়েদ (রা:), হামজা (রা:), সাদসহ (রা:) বেশ কিছুসংখ্যক সৌভাগ্যবান তওহীদ গ্রহণ করলেন। অতঃপর রসুলাল্লাহ তাদেরকে সাথে নিয়ে প্রকাশ্যে বালাগ কার্যক্রম (তওহীদের দাওয়াত) শুরু করলেন।
৫। তওহীদের বিরুদ্ধে মোশরেকদের কবিতাযুদ্ধ ও ঘৃণ্য মিথ্যা প্রচারণা শুরু হলো। তারা রসুলাল্লাহ ও তাঁর সঙ্গীদের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক বিরোধিতা শুরু করল।
৬। রসুলাল্লাহকে কাবাচত্বরে গলায় চাদর পেচিয়ে হত্যার প্রয়াস করা হয়, সালাহরত অবস্থায় তাঁর মাথায় উটের নাড়িভুড়ি চাপানো হয়। তাছাড়াও বিভিন্নভাবে তাঁকে হত্যার অপচেষ্টা করা হয়।
৭। তওহীদের দলভুক্ত হবার অপরাধে সুমাইয়া (রা:) ও তার স্বামী ইয়াসীরকে (রা:) মরুপ্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমতাবস্থায় বেশ কিছু মো’মেন আবু তালহার নেতৃত্বে আবিসিনিয়ায় হেজরত করেন।
৮। শিয়াবে আবু তালিবে সমাজচ্যুত ও নির্বাসিত মো’মেন মা ও শিশুদের আর্তচিৎকার; গাছের ছাল, লতা-পাতা, জুতার চামড়া ইত্যাদি খেয়ে কোন রকমে জীবন-ধারণ।
৯। তওহীদের দলের উপর থেকে অবরোধের অবসান।
১০। মেরাজ। পাঁচ ওয়াক্ত সালাহ প্রবর্তন। তওহীদের মহান আহ্বান তায়েফে প্রচারকালে তায়েফবাসীর নির্মম অত্যাচারে নবীজীর পবিত্র দেহমোবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্তে রঞ্জিত হয়।
১১। হজ্বের মৌসুমে প্রথম আকাবার বায়াত সম্পন্ন হয় ১২ জন মদিনাবাসীর সমন্বয়ে। তওহীদের প্রচার কার্যক্রমে মাস’আব এবনে উমায়েরকে (রা:) আল্লাহর রসুল কর্তৃক মদিনা প্রেরণ।
১২। ২য় আকবার বায়াতে ৭২ জন মদিনাবাসীর অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর রসুলকে মদিনায় হেজরতের আহবান।
১৩। পৃথিবীর বুক থেকে তওহীদের অগ্নিশিখা চিরতরে নির্বাপিত করার চেষ্টায় মক্কার মোশরেক কর্তৃক রসুলাল্লাহকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অতঃপর তাদের ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে রসুলাল্লাহর মদিনায় হেজরত।
মাদানী জীবন ঃ ৩৬৫০ দিন
হেজরী ১: রসুলাল্লাহ মদিনায় সর্বপ্রথম মসজিদে জুম’আ পড়েন। মসজিদে নববী নির্মাণ ও মসজিদকেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ১৯ দফা কার্যক্রম শুরু হয়। মদিনা সনদ কায়েম হয়।
হেজরী ২: সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি। আযানের হুকুম নাজিল হয়। বদরের যুদ্ধসহ ছোটখাটো প্রায় ৮ টি সংঘর্ষ ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ঈদের সালাহ ও মাসব্যাপী সওম প্রবর্তন।
হেজরী ৩: উহুদের যুদ্ধে রসুলাল্লাহ গুরুতর আহত। হামযা (রা:) শহীদ। ছোটখাটোসহ প্রায় আটটি যুদ্ধ সংঘটিত।
হেজরী ৪: যাতুরিকা অভিযান, দ্বিতীয় বদর অভিযান ও যীকারাদ অভিযান। বীরে মাওনা।
হেজরী ৬: হুদায়বিয়ার সন্ধি। বনু লিহইয়ান অভিযান। ফিদাক সামরিক অভিযান। মোট চৌদ্দটি যুদ্ধ সংঘটিত।
হেজরী ৭: খায়বর বিজয়। ওয়াদিল অভিযান। মোট আটটি যুদ্ধ।
হেজরী ৮: মক্কা বিজয়। মুতার সামরিক অভিযান। তায়েফ অভিযান। মোট চৌদ্দটি যুদ্ধ।
হেজরী ৯: তাবুক অভিযান। সারিয়ায়ে খালেদ। সারিয়ায়ে আলী। মোট সাতটি যুদ্ধ।
হেজরী ১০: রসুলের জীবদ্দশায় সর্বমোট ৭৮টি জেহাদ সংঘটিত। তন্মধ্যে ২৮টি জেহাদে তিনি নিজে সোনাপতিত্ব করেন।
বিদায় হজ্বের ভাষণ
রসুলাল্লাহ কর্তৃক সকল মুসলিম ভ্রাতৃবন্ধনীতে আবদ্ধ থাকার নির্দেশনা। এছাড়াও তিনি যে সকল বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন তাহলে- পর সম্পদ ও রক্ত নিষিদ্ধ ও হারাম করা। সুদ নিষিদ্ধ ও হারাম করা। স্বামী স্ত্রী অধিকার নিশ্চিতকরণ।
জাতীয় জীবনব্যবস্থা হিসেবে কোর’আন এবং সুন্নাহকে ঘোষণা দেওয়া। একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কোর’আন সংবিধান ও সুন্নাহ অনুসারী শাসকের আনুগত্য বাধ্যতামূলক-করণ। দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির ব্যাপারে কঠোর সাবধানবাণী।
প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.) এর
ওফাতের পর প্রাপ্ত সম্পদ
১) ১টি চাটাই,
২) ১ টি বালিশ (খেজুরের ছাল দিয়ে ভর্তি) ও
৩) কয়েকটি মশক
১) ৯টি তরবারি,
২) ৫টি বর্শা,
৩) ১টি তীরকোষ,
৪) ৬টি ধনুক,
৫) ৭টি লৌহবর্ম,
৬) ৩টি জোব্বা (যুদ্ধের),
৭) ১টি কোমরবন্ধ,
৮) ১টি ঢাল এবং
৯) ৩টি পতাকা। (তথ্যসূত্র:- সিরাতুন্নবী- মওলানা শিবলী নোমানী)

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ: পশ্চিমাদের স্বার্থ আদায়ের তন্ত্র – গণতন্ত্র!

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ: পশ্চিমাদের স্বার্থ আদায়ের তন্ত্র – গণতন্ত্র!
মোহাম্মদ আসাদ আলী:

পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’ কর্তৃক রূপায়িত নতুন যে বিশ্বব্যবস্থা কার্যকর কোরতে পশ্চিমারা এতদিন বদ্ধপরিকর ছিলো ইতোমধ্যেই সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে তারা পৌঁছে গেছে। সেটা হচ্ছে পৃথিবীব্যাপী একমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কোরে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখা। তাদের পূর্বকল্পিত বিশ্বব্যবস্থাই পৃথিবী গ্রহণ কোরেছে এবং নেতা হিসেবে গ্রহণ কোরেছে ঐ আধিপত্যবাদীদের। তারা যে উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে যেভাবে কর্মসম্পাদন কোরেছে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যেই ফলাফল আশা কোরেছে ঠিক তা-ই হোয়েছে এবং হোচ্ছে, এর কোথাও কোন বিচ্যুতি হয় নি। আর তাদের এই কর্মসম্পাদনা থেকে বার বার যেটা প্রমাণিত হোয়েছে যে- মানবাধিকার, স্বাধীনতা, মানবতা ইত্যাদি তাদের মুখের বুলি হোলেও কার্যক্ষেত্রে সেগুলোকে তারা ‘ছেলে ভুলানো গান’ মনে করে, তাদের কাছে এগুলো বিশ্ববাসীর চোখে ধূলি দিয়ে স্বার্থোদ্ধারের একটি পন্থা বৈ কিছু নয়। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার মোড়ল, অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার আশীর্বাদপুষ্ট দোসর রাষ্ট্রগুলিকে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বরাবরই গণতন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার কোরতে দেখা গেছে। বলা যায় এই গণতন্ত্রই তাদেরকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির পর ইউরোপ ও আমেরিকায় বর্তমানে গণতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠিত সরকার পদ্ধতি। গণতন্ত্র আজ তাদের মূলধনে পরিণত হোয়েছে এবং তাদের সংস্কৃতি-সভ্যতার অনুকূলে গড়ে ওঠা সেই শাসনব্যবস্থাকেই তারা সমস্ত পৃথিবীর জাতিগোষ্ঠিগুলোর ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এভাবেই পৃথিবীজুড়ে যে গতিতে এই শাসনব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো হোয়েছে তার সমান্তরালে পাশ্চাত্যের ভারসাম্যহীন সংস্কৃতি ও সভ্যতারও বিস্তার ঘটেছে, বিশ্ব হোয়ে উঠেছে আপাদমস্তক পশ্চিমানির্ভর। এতে কোরে খুব সহজেই নিজেদের স্বার্থকে আদায় করে নিতে পারছে মোড়ল রাষ্ট্রগুলি।
পশ্চিমাদের এই সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের ফলে পৃথিবীতে এখন গণতন্ত্রের জয়-জয়কার। পশ্চিমা ভাবাদর্শে পরিচালিত দেশীয় মিডিয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থার ফলে মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরছে যে গণতন্ত্রই একমাত্র গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা। এর বিকল্প হিসেবে অন্য কোন শাসনব্যবস্থার কথা পৃথিবীবাসী কল্পনাও কোরতে পারছে না, আর কল্পনা কোরলেও কোন লাভ হবে না। কারণ গণতন্ত্রের মধ্যেই পশ্চিমাদের স্বার্থ, গণতন্ত্রই তাদের শাসন-শোষণের হাতিয়ার। এটা ছাড়া অন্য কোন শাসনব্যবস্থাকে পশ্চিম মেনে নিতে দিবে না। যুক্তি আসতে পারে – অনেক দেশেই তো এখনো গণতন্ত্র চালু নেই, সে দেশের মানুষ অন্য শাসনব্যবস্থাকে এখনো ধরে নিয়ে আছে। তাহোলে সে সব দেশে কেন পশ্চিমারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কোরতে চেষ্টা কোরছে না? এর উত্তরে প্রথমেই বোলতে চাই – সে সব দেশে যে পশ্চিমা সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটে নি তা কিন্তু নয়। এটা বুঝতে হবে যে- আপাত দৃষ্টিতে পশ্চিমাদেরকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বোলতে দেখা গেলেও বাস্তবে তাদের কাছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা বা মানবাধিকারের কোন মূল্য নেই, এগুলো মূলত তাদের স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার। কাজেই যেখানে তাদের স্বার্থ পরিপন্থী কোন কাজ হয় না এবং হবার কোন সম্ভাবনাও নেই, বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না থাকলেও সে দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে তাদের হাতেই রোয়েছে সেখানে তারা কেন ঐ গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা কোরবে?
মধ্যপ্রাচ্যের যে আরব দেশগুলোতে এখনও রাজতন্ত্র চালু আছে সেখানকার অধিবাসীরা যে গণতন্ত্র চায় না তা কিন্তু নয়। বহির্বিশ্বের মত তাদেরকেও দেখা গেছে গণতন্ত্রের পক্ষে শ্লোগান তুলতে, রাজপথে নামতে। কিন্তু সে চেষ্টা কোন কাজে আসেনি, পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের কাছ থেকে কোন সাহায্য-সহায়তা আসেনি। কারণ ঐ দেশগুলোতে গণতন্ত্র চালু করার সাথে পশ্চিমা স্বার্থের কোন সম্পর্ক নেই। যদি থাকতো তবে বছরখানেকও বোধহয় লাগতো না তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়ার মত সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ইত্যাদি দেশগুলোতে গণতন্ত্র কায়েম হোতে। এখানেই বোঝা যায় – পশ্চিমাদের কাছে গণতন্ত্র আসলে কোন বিষয় নয়, আসল বিষয় হলো তাদের স্বার্থ। এই স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য তারা বহু পূর্ব থেকে চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। পৃথিবীব্যাপী অন্যায়-অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত নির্মূলের অভিপ্রায়ে ১৯৪৫ সালে যে জাতিসঙ্ঘকে জন্ম দেয়া হয় সেটাও ছিলো তাদের ঐ পরিকল্পনারই অংশবিশেষ।
পাশ্চাত্যের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাদের নিরাপত্তার ছাতা হিসেবে জাতিসঙ্ঘের ব্যবহার নতুন বিশ্বব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ কোরছে। জাতিসঙ্ঘ ১৯৩টি দেশের সঙ্ঘ হোলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়ার মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশ তা নিয়ন্ত্রণ করে। জাতিসঙ্ঘের সকল সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মূলত এই সব দেশের বিশেষ কোরে আজকের একক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে যা কোনভাবেই তাদের মুখের সর্বাধিক উচ্চারিত বুলি গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যাপারে জাতিসংঘের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সমর্থকদের যে আহ্বান ছিােলা বর্তমান অবস্থায় তা থেকে জাতিসঙ্ঘ অনেক দূরে অবস্থান কোরছে। এর কার্যক্রম এখন ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলোর জাতীয় পররাষ্ট্রনীতির নকশা অনুসরণ কোরে চলে। জাতিসঙ্ঘ ব্যবস্থার মোট খরচের সিংহভাগও তারাই বহন করে। কারণ গণতন্ত্রের মতো এটাও তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি বড় হাতিয়ার। যেখানে নিরাপত্তা পরিষদের সকল দেশ কোন একটি সিদ্ধান্তে একমত হবার পরে শুধুমাত্র একটি দেশ ভেটো দিলেই সেই সিদ্ধান্ত নাকচ হোয়ে যায় সেখানে “সংখ্যাগরিষ্ঠের মতোই চূড়ান্ত” – এই তত্ত্বের গণতন্ত্র কোথায় থাকে? আবার দেখা যায় কোন দেশ আক্রমণ কোরতে চাইলে অন্য সব দেশ বিরোধিতা কোরলেও যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের মতো কতিপয় দেশ কাউকে পাত্তা না দিয়ে আক্রমণ কোরে বসে, সেখানেও গণতন্ত্র কোন কাজে আসে না, গণতন্ত্রের ভাষ্য আর কৃতকর্মের মধ্যে কোন মিল পাওয়া যায় না। এর উত্তর একটিই – গণতন্ত্র পশ্চিমা আগ্রাসীদের কাছে কোন বিষয় নয়, আসল বিষয় হোল তাদের স্বার্থ। তারা গণতন্ত্র মানবে ততোক্ষণ, যতক্ষণ সেটা তাদের স্বার্থের অনুকূলে থাকবে।
কাজেই এটা স্পষ্ট যে- আজ পৃথিবীবাসী পশ্চিমের তাবেদারি কোরেই হোক আর তাদের গালভরা বুলিতে বিশ্বাস কোরেই হোক গণতন্ত্র নামক যে সিস্টেমটিকে তাদের চলার পাথেয় হিসেবে গণ্য কোরছে এবং সেটাকে বিকল্পহীন হিসেবে বিবেচনা কোরছে সেটা পশ্চিমাদের নিছক একটি পৃথিবীব্যাপী নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার ছাড়া কিছুই নয়। এই গণতন্ত্র আজ পর্যন্ত ঐ গুটিকতক আধিপত্যবাদীদের ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ছাড়া আর কোন জাতিকে শান্তি-সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে নি, পারার কোন সম্ভাবনাও নেই।