Saturday, October 10, 2015

কোর’আনের আলোকে: দীনের বিনিময় নেবার কোনো সুযোগ নেই

কোর’আনের আলোকে: দীনের বিনিময় নেবার কোনো সুযোগ নেই




মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে:

প্রতিটা দীন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যুগেযুগে এসেছে মানবতার কল্যাণের জন্য। যখন কোনো সমাজ ধর্মকে বিকৃত কোরেছে তখনই অন্যায় অবিচারে ছেয়ে গেছে মানুষের জীবন; ফলশ্রুতিতে আল্লাহ পাক নবী-রসুলদের মাধ্যমে নতুন দীন বা জীবনব্যবস্থা পাঠিয়েছেন। নবী-রসুলগণ আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত নতুন দীনটির মর্মবাণী পূর্ববর্তী বিকৃত ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে প্রচার কোরতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানাভাবে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত হোয়েছেন। নবী-রসুলগণ শতনির্যাতন ও বাধা সত্ত্বেও তাঁদের সেই সংগ্রাম অর্থাৎ তওহীদের প্রতি মানুষকে আহ্বান করা চালিয়ে গিয়েছেন। অবশেষে যখন আল্লাহর সাহায্যে ঐ দীন বা জীবনব্যবস্থা উক্ত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোয়েছে তখন সমাজ থেকে সকল অন্যায় অবিচার দূর হোয়ে অনাবিল শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হোয়েছে। এই দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা দীনি কাজ কোরতে গিয়ে কখনো নবী-রসুলগণ বিনিময় গ্রহণ তো করেনই নি বরং তাদের সকল সহায়-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে গেছেন, দীন প্রতিষ্ঠার পরও তাঁরা অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন কোরেছেন। তাঁরা তাঁদের অনুসারীদের সাবধান কোরে গেছেন বিনিময় না নেয়ার জন্য। যতদিন ঐ ধর্মটি অবিকৃত থেকেছে ততদিন নবী-রসুলদের কোনো অনুসারীও দীনের বিনিময় গ্রহণ করেন নি। কোনো যুক্তিতেই আল্লাহ পাক ও তাঁর নবী-রসুলগণ দীনের বিনিময় নেবার কোনো সুযোগ দেন নি। সত্যের আহ্বানে বিনিময় না নিয়ে বরং ত্যাগ হোল সত্যতার একটি নিদর্শন।
দীন বা ধর্মের বিনিময় নেবার বিরুদ্ধে নবী-রসুলদের কঠিন ভূমিকার কিছু বিবরণ পবিত্র কোর’আনে বর্ণিত হোয়েছে। যেমন:
১। নূহের (আ:) এর ঘোষণা: হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট ধন সম্পদ চাই না। আমার পারিশ্রমিক আল্লাহর নিকট। [সুরা হুদ-২৯, সুরা শুআরা – ১০৯, সুরা ইউনুস – ৭২]
২। হুদের (আ:) ঘোষণা: হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর পরিবর্তে তোমাদের নিকট কোনো মজুরি চাই না। আমার পারিশ্রমিক তাঁরই নিকট যিনি আমাকে সৃষ্টি কোরেছেন। তোমরা কি তবুও বুঝতে চেষ্টা কোরবে না? [হুদ-৫১, সুরা শুআরা – ১২৭]
৩। সালেহ (আ:) এর ঘোষণা: আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রোয়েছে। [শুয়ারা-১৪৫]
৪। লুতের (আ:) ঘোষণা: এর জন্য আমি কোনো মজুরি চাইনা। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে। [শুয়ারা-১৬৪]
৫। শোয়েবের (আ:) ঘোষণা: আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোনো মূল্য চাই না। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে। [শুয়ারা-১৮০]
৬। মোহাম্মদ (দ:) এর প্রতি আল্লাহর হুকুম:
ক. এবং তুমি তাদের নিকট কোনো মজুরি দাবি কোর না। এই বাণী তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ মাত্র। [ইউসুফ – ১০৪]
খ. বল! আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এবং যারা মিথ্যা দাবি করে আমি তাদের দলভুক্ত নই। [সাদ – ৮৬]
গ. তাদেরকেই (নবীদেরকেই) আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত কোরেছেন। সুতরাং তুমি তাদের পথ অনুসরণ কর; বল! এর জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। [আনআম – ৯০]
ঘ. বল! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে প্রেম-ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার ব্যতীত অন্য কোনো মজুরি চাই না। [শুরা – ২৩]
ঙ. আমি তাদেরকে দিয়েছি উপদেশ, কিন্তু তারা উপদেশে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অথবা তুমি কি তাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাও? তোমার প্রতিপালকের প্রতিদানই তো শ্রেষ্ঠ এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ রেযেকদাতা। [২৩: সুরা মো’মেনুন: ৭১-৭২]
চ. তবে কি তুমি উহাদের নিকট পারিশ্রমিক চাচ্ছো যা ওরা একটি দুর্বহ বোঝা মনে করে? [৫২: সুরা তুর: ৪০]
সুতরাং কোর’আনের ভাষ্যমতে দীনের, ধর্মের কোনো কাজ কোরে নবী ও রসুলরা যেমন পারিশ্রমিক গ্রহণ কোরতেন না, তেমনি তাঁদের উম্মাহর জন্যও পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়।
ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে রসুলাল্লাহ (দ:) এর একটি বাণী উল্লেখ কোরছি-
আল্লাহর রসুলও তাঁর জাতির মধ্যে যেন ধর্মব্যবসায়ী পুরোহিত শ্রেণি গজিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য তিনি তাঁর আসহাবদেরকে বার বার সতর্ক কোরে গেছেন। উবায়দা বিন সামেত (রা:) ছিলেন আসহাবে সুফফার অন্তর্ভুক্ত এক সাহাবী। তাঁকে রসুলাল্লাহ কোনো এক গোত্রের লোকদেরকে কোর’আন শিক্ষা দিতে প্রেরণ কোরেছিলেন। সেই গোত্রের একজন ব্যক্তি উবায়দাকে (রা:) আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার উদ্দেশ্যে একটি ধনুক ও তীর উপহার দিয়েছিলেন। উবায়দা (রা:) রসুলাল্লাহর দরবারে ফিরে এসে যখন সেই তীর ও ধনুক তাঁকে দেখালেন তখন রসুলাল্লাহ বোললেন, “যদি তুমি আগুনের তীর গলায় জড়িত হওয়া পছন্দ করো তাহোলে তুমি এটা গ্রহণ করো” (আবু দাউদ)।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সন্দেহ নেই। উবায়দাহ (রা:)-কে কোর’আন শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে যে উপহারটি দেওয়া হোয়েছিল সেটা কোনো অর্থকড়ি নয়, ব্যক্তি ব্যবহার্য কোনো বস্তুও নয়। সেটা হোচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে ব্যবহারের জন্য একটি অস্ত্র। অথচ সেই অস্ত্রটি গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ হোয়ে গেল, কেবল নিষিদ্ধই না, সেটা আখেরাতে আগুনের তীর হোয়ে গ্রহণকারীর বুকে বিঁধবে এই কারণে যে, তিনি সেটা গ্রহণ কোরেছিলেন কোর’আন শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে। এমন ঘটনা আরও আছে। রসুলাল্লাহর এই কথার পর দীনের জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে অর্থ উপার্জনের কোনো পথ খোলা রোইল কি? তা সত্ত্বেও বর্তমানের বিকৃত এসলামে পয়সা ছাড়া কিছুই হয় না, মুর্দা দাফনেও পয়সা দিতে হয়। মোল্লাদের শিষ্য অর্থাৎ তালবে-এলেম থেকে শুরু করে পীরে কামেল, গাউস কুতুব, মুফতি, শায়খ, নামধারী আল্লামাগণ পয়সা ব্যতীত কেউই ধর্ম-কর্ম করেন না। শুধু তাই নয়, তারা যে মানুষকে এসলাম থেকে সরিয়ে রাখতে চায় এবং ধর্মকে পুঁজি কোরে সম্পদের মালিক হোতে চায় সেটাও আল্লাহও জানিয়ে দিয়েছেন সুস্পষ্টভাষায়। তিনি বোলেছেন, “হে মো’মেনগণ! আলেম ও সুফিদের (আহবার ও রোহবান) মধ্যে বহুসংখ্যক তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরে চোলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে মানবজাতিকে ফিরিয়ে রাখছে (সুরা তওবা ৩৪)।

গুরুত্বের নিরিখে দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও হজ্ব

গুরুত্বের নিরিখে দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও হজ্ব

 0

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
আল্লাহর মানুষ সৃষ্টি এবং এবলিসকে জান্নাত থেকে বহিস্কৃত ও বিতাড়িত করার পর এবলিস আল্লাহকে যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল (সুরা বাকারা-৩০) তাহলো সে মানবজাতিকে সেরাতুল মোস্তাকিম থেকে বিচ্যুত কোরবে। ফলে মানবজাতি অনিবার্যভাবে অন্যায়- অশান্তি, যুদ্ধ, রক্তপাতে পতিত হবে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে যুগে যুগে হেদায়াহ পাঠানোর অঙ্গীকার কোরলেন যার ধারাবাহিকতায় তিনি সর্বশেষ পাঠিয়েছেন আমাদের প্রিয় রসুল, সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল মোহম্মদকে (দ:)। তাঁর উপর দ্বায়িত্ব দিলেন সমস্ত পৃথিবীব্যাপী এই হেদায়াহ এবং হেদায়াহ ভিত্তিক দ্বীন প্রতিষ্ঠা কোরে সমস্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার (সুরা তওবা-৩৩, সুরা ফাতাহ-২৮, সুরা আস সফ-৯)। এই কাজের নীতি হিসেবে আল্লাহ নির্দিষ্ট কোরে দিলেন সর্বাত্মক সংগ্রামকে। আল্লাহ সরাসরি আদেশ দিচ্ছেন, “সর্বাত্মক সংগ্রাম কর যতক্ষণ না অন্যায়, অশান্তি (পৃথিবী থেকে) নির্মূল হোয়ে সেখানে আল্লাহর দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠিত হয়”(কোর’আন সুরা আনফাল-৩৯)। এই আদেশেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় রসুলাল্লাহর হাদীসেও। তিনি বলেন,“আমি আদিষ্ট হোয়েছি (আল্লাহর কাছে থেকে) পৃথিবীর মানুষের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নেই এবং আমি মোহাম্মদ (দ:) আল্লাহর রসুল এবং সালাহ প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত দেয়।” [হাদীস-আবদুল্লাহ এবনে ওমর (রা:) থেকে বোখারী]। এরকম আরো শত শত কোরানের আয়াত এবং রসুলুল্লাহর হাদীস রোয়েছে যেগুলোকে বিশ্লেষণ কোরলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে উম্মতে মোহাম্মদীর উপর আল্লাহর অর্পিত দায়িত্ব হোল এসলামের এই শেষ সংস্করণকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করা। আর তা হতে হবে অবশ্যই দলগতভাবে জেহাদ ও রাষ্ট্রগতভাবে কেতাল দ্বারা। আর তাই এই দীনে সবচেয়ে বড় পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হোয়েছে এই জেহাদে যারা শহীদ হবে তাদের। যেহেতু এসলাম একটি ভারসাম্যযুক্ত এবং নিখুঁত জীবনব্যবস্থা, কাজেই এটাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া জেহাদের জন্য যে চরিত্র দরকার তা অর্জনের ব্যবস্থা থাকাও বাধ্যতামূলক। এই চরিত্র অর্জনের প্রশিক্ষণগুলোই হোচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি। শারীরিক এবং আত্মীকভাবে যে প্রশিক্ষণগুলো নিলে মানুষ জেহাদে অপরাজেয়, মৃত্যু ভয়হীন, এবং মৃত্যুর জন্য আকুলভাবে পিপাসার্ত-দুর্ধর্ষ চরিত্র অর্জন কোরতে সক্ষম হবে সেই প্রশিক্ষণ হোল এই নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদি। এগুলো উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে চরিত্র দরকার তার প্রশিক্ষণ দেয় এগুলো। উদ্দেশ্য হোল জেহাদ যার ফলে পৃথিবীতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত হবে। জেহাদই যদি না থাকে তাহলে নামাজ, রোজা, হজ্বের কোন মূল্য নেই। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ছাড়া শুধু হজ্ব নয়, কোনো এবাদতই কবুল হবে না।
বর্তমানে হজ্বের মৌসুম। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ কোরে মোসলেম নামধারী এই জাতি হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা মদিনায় যাচ্ছেন। তাদের কাউকে যদি বলা হয়, আপনি হজ্বে কেন যাচ্ছেন? তিনি নিঃসন্দেহে উত্তর দিবেন আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তাই যাচ্ছি। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন ঠিকই তবে তিনি তো বিনা কারণে কোন নির্দেশ দেন না। তিনি কেন এই নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি কি তাদের হজ্বের মুখাপেক্ষী? বরং আল্লাহ আমাদের নিজেদের স্বার্থেই নির্দেশ দিয়েছেন। হজ্ব সম্পর্কে আজকের এই জাতির আকীদা, আল্লাহ রসুলের হাতে গড়া জাতির আকীদার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদীর যুগের একটি ঘটনা উল্লেখ কোরছি যেখানে এই জাতির আকীদার সাথে উম্মতে মোহাম্মদীর আকীদার আকাশ-পাতাল ফারাক প্রতীয়মান হয়।
পারসিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধের সময় আল্লাহর তলোয়ার খালেদ (রা:) মোসলেম বাহিনীকে ফিরাদ থেকে হিরায় স্থানান্তরিত করার সময় হজ্বের সময় এসে গেলো। হজ্ব করার লোভ সামলাতে না পেরে খালেদ (রা:) অন্য একজন সেনাপতির হাতে কর্তৃত্ব দিয়ে বাহিনী রওয়ানা কোরে দিয়ে চুপে চুপে হজ্বে চলে গেলেন। হজ্বও তিনি কোরলেন এমন গুপ্তভাবে- যেন কেউ তাকে চিনতে না পারে। হজ্ব কোরেই খালেদ (রা:) এমন দ্রুত ফিরে এসে তার বাহিনীতে যোগ দিলেন, যে সেনাপতির উপর তিনি ভার দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি ছাড়া আর কেউ টেরই পেলো না যে খালেদ (রা:) কয়েকদিনের জন্য তাদের সঙ্গেই ছিলেন না এবং মোসলেম বাহিনী তার গন্তব্যস্থান হিরায় পৌঁছবার আগেই খালেদ (রা:) তার বাহিনীর সাথে যোগ দিলেন। হিরায় পৌঁছবার কয়েক দিনের মধ্যেই খলিফা আবু বকরের (রা:) কাছ থেকে সেনাপতি খালেদ বিন ওলিদের (রা:) কাছে চিঠি এসে পৌঁছলো। তাতে খলিফা তার প্রিয় সেনাপতিকে জানালেন যে তিনি যে গোপনে হজ্ব কোরতে মক্কায় গিয়েছিলেন তা তিনি জানতে পেরেছেন এবং অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হোয়েছেন এবং তাকে সাবধান কোরে দিচ্ছেন যে খালেদ (রা:) যেন ভবিষ্যতে এমন কাজ আর না করেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির প্রতি লক্ষ্য কোরুন। এতে দু’টি বিষয় ফুটে উঠেছে। প্রথমটি হোচ্ছে বেসামরিক, গোয়েন্দা বিভাগের (ঈরারষ ওহঃবষষরমবহপব) কর্ম-কুশলতা। সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের (গরষরঃধৎু ওহঃবষষরমবহপব) তো কথাই নেই। সেটা অপূর্ব দক্ষ না হোলে তো মোসলেম বাহিনীর অতুলনীয় বিজয়ই সম্ভব হোতনা, এই ঘটনায় বেসামরিক দিকটার কথা বোলছি। কেউ যেন না জানতে পারে যে খালেদ (রা:) ইরাক থেকে মক্কা গেছেন এ জন্য খালেদের এত সতর্কতা, যে সতর্কতার জন্য নিজের সৈন্যরা পর্য্যন্ত জানতে পারলো না যে খালেদ (রা:) তাদের মধ্যে নেই, তা সত্ত্বেও আবু বকরের (রা:) বেসামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সতর্ক চক্ষুকে তিনি ফাঁকি দিতে পারলেন না এবং মক্কায় হজ্বে খালেদের উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মদীনায় খলিফা আবু বকরের (রা:) কাছে রিপোর্ট হোয়ে গেলো। দ্বিতীয় বিষয়টি এই যে, যখন আল্লাহর তলোয়ার খালেদ (রা:) এই গোপন হজ্বটি কোরেছিলেন তখন কোন যুদ্ধ চোলছিলো না, তিনি শুধু তার বাহিনীকে ফিরাদ থেকে হিরায় স্থানান্তর (গড়াব) কোরছিলেন। এর আগেই উপর্যুপরি কয়েকটি তীব্র যুদ্ধে (হুসেইদ, মুযাইয়াহ, সানীহ, যুমেইল ইত্যাদি) মোসলেম বাহিনী পারসিক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছিলো। ঠিক তখন তাদের দিক থেকে নতুন কোন আক্রমনের সম্ভাবনা ছিলো না। আর মোসলেম বাহিনীকে রওয়ানা কোরে দিয়ে তাদের গন্তব্যস্থানে হিরায় পৌঁছবার আগেই খালেদ (রা:) হজ্ব শেষ কোরে আবার বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হোয়েছিলেন। কিন্তু এত সব কারণ থাকা সত্ত্বেও আবু বকর (রা:) খালেদকে (রা:) ছেড়ে দেন নি। তাকে ভর্ৎসনা (ঈড়হংড়ৎ) কোরলেন এবং ভবিষ্যতে যেন কখনও এরকম কাজ না করেন সেজন্য তাকে সাবধান কোরে দিলেন। খলিফার এই কাজের একটি মাত্র অর্থ হয় আর সেটা হলো- সংগ্রাম, জেহাদ, শুধু জেহাদ নয় জেহাদের কোন কিছুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, জড়িত থাকাও হজ্বের চেয়ে বড় কর্তব্য। নিজের অসুস্থতার সময় উম্মতে মোহাম্মদীর নামাজের এমামতি, নেতৃত্ব দেবার জন্য রসুলাল্লাহ (দ:) যাকে মনোনীত কোরেছিলেন সেই আবু বকর (রা:) এসলাম কী, তার উদ্দেশ্য কি, তার প্রক্রিয়া কি তা কি শেখেন নি? হজ্ব ও সংগ্রামের মধ্যে কোনটার প্রাধান্য, গুরুত্ব (চৎরড়ৎরঃু) তা শেখেন নি? আজ এই জাতির অতি ধার্মিকদের মধ্যে শুধু নামাজ, রোজা, হজ্ব নয়, বহু নফল, ছোট-খাট অপ্রয়োজনীয় ধর্মকর্ম আছে- নেই শুধু জেহাদ, সংগ্রাম যেটা এই জাতির মূল লক্ষ্য, মূল আদর্শ। তা থেকে এই জাতি লক্ষ মাইল দূরে।
আবু বকরের (রা:) এসলাম, সাহাবাদের এসলাম আর বর্তমানের অতি মোসলেমদের এসলাম দুইটি বিপরীতমুখী এসলাম, দু’টি বিপরীতমুখী আকীদা। একটি মূল উদ্দেশ্যমুখী, অন্যটি মূল উদ্দেশ্যের বিপরীতমুখী, আর তাই একটি সহায় সম্বলহীন পাঁচ লাখের জাতি অর্ধেক পৃথিবীতে আল্লাহর দীন কায়েম কোরেছিলো, অন্যটি প্রায় একশ’ষাট কোটি হোয়েও, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের একটা বিরাট অংশের মালিক হোয়েও আল্লাহদ্রোহীদের দয়ার উপর, কৃপার উপর বেঁচে আছে, অজ্ঞানতার, কুশিক্ষার অন্ধকারে ঘৃণিত জীবন যাপন কোরছে। আকীদা এতখানি বিকৃত হোয়েছে যে আসল লক্ষ্যকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিয়ে, লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়াকেই লক্ষ্য মনে কোরে, তাই নিয়ে মহা ব্যস্ত হোয়ে থেকে এই জাতি পরকালে আল্লাহর কাছে থেকে পুরস্কারের আশা কোরছে।

হেযবুত তওহীদের সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য

হেযবুত তওহীদের সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য

 0

মসীহ উর রহমান, আমীর, হেযবুত তওহীদ:
মানবজাতির বর্তমান সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ স্রষ্টার বিধান। মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটিসহ সমস্ত মানবজাতি আজ তার সমষ্টিগত জীবন মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা দিয়ে পরিচালনা করছে। ফলে সমস্ত পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই, মানুষের জীবন সংঘর্ষ, রক্তপাত, অন্যায়, অবিচারে পূর্ণ হয়ে আছে। মানুষের তৈরি এই বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র এ সমস্যাগুলোর সমাধান করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। হেযবুত তওহীদের বক্তব্য এই যে, শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ বর্তমান জীবনব্যবস্থা (System) বাদ দিয়ে স্রষ্টার, আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং তা সমষ্টিগত জীবনে কার্যকরী করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
স বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম নামে যে ধর্মটি চালু আছে সেটা আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম নয়। গত ১৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিকৃত ও বিপরীতমুখী হয়ে গেছে। আল্লাহ অতি দয়া করে তাঁর প্রকৃত ইসলাম যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীকে বুঝিয়েছেন। হেযবুত তওহীদ সেই প্রকৃত ইসলামের ধারক।
সধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। ধর্মের কোন বিনিময় চলে না। বিনিময় নিয়ে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। কাজেই ধর্মের কাজ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে করতে হবে এবং বিনিময় নিতে হবে কেবল আল্লাহর কাছ থেকে।
সহজ সরল সেরাতুল মোস্তাকীম দীনুল হক, ইসলামকে পণ্ডিত, আলেম, ফকীহ, মোফাস্সেরগণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বহু মতের সৃষ্টি করেছে। ফলে একদা অখণ্ড উম্মতে মোহাম্মদী হাজার ফেরকা, মাজহাব, দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে আছে। ভারসাম্যহীন সুফিরা জাতির সংগ্রামী চরিত্রকে উল্টিয়ে ঘরমুখী, অন্তর্মুখী করে নিস্তেজ, নিপ্রাণ করে দিয়েছে। ফলে একদা অর্ধ্ব-বিশ্বজয়ী দুর্বার গতিশীল যোদ্ধা জাতিটি আজ হাজার হাজার আধ্যাত্মিক তরিকায় বিভক্ত, স্থবির উপাসনাকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই উভয় শ্রেণির কাজের ফলে ইসলামের উদ্দেশ্যই পাল্টে গেছে। সংগ্রাম করে সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে ধর্মের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মার উন্নয়ন এবং জীবনের ব্যক্তিগত অঙ্গনের ছোট খাটো বিষয়ের মাসলা মাসায়েল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা।
ব্রিটিশরা এই জাতিকে পদানত করার পর এরা যেন কোনদিন আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে এজন্য একটি শয়তানি ফন্দি আঁটে। তারা এ জাতির মানুষের মন ও মগজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য দু’টি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করে, যথা: মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা। তাদের অধিকৃত সকল উপনিবেশেই তারা মুসলমানদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার নাম করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে তারা নিজেদের মনগড়া একটি বিকৃত-বিপরীতমুখী ইসলাম শিক্ষা দেয়। মাদ্রাসাগুলির অধ্যক্ষপদ তারা নিজেদের হাতে রেখে দীর্ঘ ১৪৬ বছর এই উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে তাদের তৈরি ‘ইসলাম’ শিক্ষা দিয়েছে। এখানে অংক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির কোন কিছুই রাখা হলো না, যেন মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসে আলেমদের রুজি-রোজগার করে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই দীন, ধর্ম বিক্রি করে রোজগার করা ছাড়া আর কোন পথ না থাকে। খ্রিষ্টানরা এটা এই উদ্দেশ্যে করল যে তাদের মাদ্রাসায় শিক্ষিত এই মানুষগুলো যাতে বাধ্য হয় দীন বিক্রী করে উপার্জন করতে এবং তাদের ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে বিকৃত ইসলামটা এই জনগোষ্ঠীর মন-মগজে স্থায়িভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়; এ উপমহাদেশসহ খ্রিষ্টানরা তাদের অধিকৃত সমস্ত মুসলিম দেশগুলিতে এই একই নীতি কার্যকরী করেছে এবং সর্বত্র তারা একশ’ ভাগ সফল হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাটি তারা চালু করল স্কুল কলেজের মাধ্যমে। এ ভাগটা তারা করল এই জন্য যে, এ বিরাট এলাকা শাসন করতে যে জনশক্তি প্রয়োজন তা এদেশের মানুষ ছাড়া সম্ভব ছিল না; সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কেরাণীর কাজে অংশ নিতে যে শিক্ষা প্রয়োজন তা দেওয়ার জন্য তারা এতে ইংরেজি ভাষা, সুদভিত্তিক অংক, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক, ইতিহাস (প্রধানতঃ ইংল্যান্ড ও ইউরোপের রাজা-রাণীদের ইতিহাস), ভূগোল, প্রযুক্তিবিদ্যা অর্থাৎ পার্থিব জীবনে যা যা প্রয়োজন হয় তা শেখানোর বন্দোবস্ত রাখলো; সেখানে আল্লাহ, রসুল, আখেরাত ও দীন সম্বন্ধে প্রায় কিছুই রাখা হলো না, সেই সঙ্গে নৈতিকতা, মানবতা, আদর্শ, দেশপ্রেম ইত্যাদি শিক্ষাও সম্পূর্ণ বাদ রাখা হলো। তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হলো যাতে তাদের মন শাসকদের প্রতি হীনম্মন্যতায় আপ্লুত থাকে এবং পাশাপাশি তাদের মন-মগজে, আল্লাহ, রসুল, দীন সম্বন্ধে অপরিসীম অজ্ঞতাপ্রসূত বিদ্বেষ (A hostile attitude) সৃষ্টি হয়। বিশ্ব-রাজনৈতিক কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের খ্রিষ্টান শক্তিগুলি তাদের উপনিবেশগুলিকে বাহ্যিক স্বাধীনতা দিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় তারা ক্ষমতা দিয়ে যায় এই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিটির উপর যারা চরিত্রে ও আত্মায় ব্রিটিশদের দাস। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সেই শিক্ষাব্যবস্থা আজও চালু আছে। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী নামে খ্রিষ্টান হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে ঈসা (আ.) এর অনুসারী ছিল না। ঈসা (আ.) এর শিক্ষাকে বহু পূর্বেই তারা বাদ দিয়ে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
আল্লাহর শেষ রসুল আখেরি যামানায় যে এক চক্ষুবিশিষ্ট দানব দাজ্জালের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যাকে ঈসা (আ.) Anti-christ বলে আখ্যায়িত করেছেন, মাননীয় এমামুয্যামান সেই দাজ্জালকে হাদিস, বাইবেল, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী সভ্যতাই হচ্ছে সেই দাজ্জাল। বর্তমানে সমগ্র মানবজাতি সেই দাজ্জালের তৈরি জীবনবিধান মেনে নিয়ে তার পায়ে সেজদায় পড়ে আছে। পরিণামে তারা একদিকে যান্ত্রিক প্রগতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও মানুষ হিসাবে তারা পশুর পর্যায়ে নেমে গেছে। সমগ্র মানবজাতি ঘোর অশান্তি, অন্যায়, অবিচারের মধ্যে ডুবে আছে। দাজ্জালের হাত থেকে পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। আল্লাহর রসুল বলেছেন যে, যারা দাজ্জালকে প্রতিরোধ করবে তারা বদর ও ওহুদ দুই যুদ্ধের শহীদের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে (আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী মুসলিম)। হেযবুত তওহীদের যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে তাদেরকেও আল্লাহ দুই শহীদ হিসাবে কবুল করে নিয়েছেন। যার প্রমাণস্বরূপ তিনি একটি বিরাট মো’জেজা হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। তা হলো: এই দাজ্জাল প্রতিরোধকারীরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের দেহ শক্ত (রাইগরমর্টিস) ও শীতল হয়ে যায় না। জীবিত মানুষের ন্যায় নরম ও স্বাভাবিক থাকে।

Friday, October 9, 2015

আইএস থাকলে যা হবে, আইএস না থাকলে যা হবে

আইএস থাকলে যা হবে, আইএস না থাকলে যা হবে

লিখেছেনঃ মোহাম্মদ আসাদ আলী।
এ দেশে আইএস সত্যিই আছে কি নেই তা ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা ও গবেষণার বিষয়। এ প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন জনের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন। আইএস থাকার স্বপক্ষে যেমন অনেক যুক্তি-প্রমাণ আছে, বিপক্ষের যুক্তিও কম নেই। অনেকে আবার বিতর্কে মাঝামাঝি অবস্থান নিয়ে বলছেন, বাংলাদেশে আইএস নেই তবে জঙ্গি আছে। যাই হোক, আমার আজকের লেখার বিষয়বস্তু আইএসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি প্রমাণ করা নয়। এখানে আমরা অতীত অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা ও কিছু সরল যুক্তিবোধের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করব আইএস থাকা বা না থাকার সাপেক্ষে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, অর্থাৎ আইএস থাকলে কী হবে আর না থাকলে কী হবে?
আইএস থাকলে-
১. আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি মোতাবেক যদি ধরে নিই আমাদের দেশে আইএস আছে, তাহলে এটাও ধরে নিতে হয় ‘বিদেশী হত্যাকাণ্ড’গুলো তারাই ঘটাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বড় ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়ায় আইএসের সক্রিয়তা সম্পর্কে কোনোরূপ পূর্বধারণা না থাকা। আবার আইএস থাকার পরও এখন পর্যন্ত সরকার যেহেতু আইএস এর অস্তিত্ব সহজ ভাষায় স্বীকার করছে না, কাজেই বিষয়টি ভবিষ্যতে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস এর উত্থান কীভাবে হয়েছিল তা বিবেচনার বিষয়। ইরাক ও সিরিয়ার ভূখণ্ড দখল করে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার পূর্বপরিকল্পনা তাদের অনেক আগে থেকেই ছিল বলে জানা গেছে কিন্তু তা প্রকাশ করা হয় নি। সংগঠনটি আগে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করে, তারপর হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করে ঝড়ের বেগে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত হিসাব-নিকাশকে এলোমেলো করে ফেলে। একটি বিরাট ভূখণ্ড অধিকারের আগ পর্যন্ত সংগঠনটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আনকোরা একটি বিচ্ছিন্ন সংগঠন হিসেবেই পরিচিত ছিল। অর্থাৎ সুঁচ হয়ে প্রবেশ করে কীভাবে ফাল হয়ে বেরোতে হয় সে অভিজ্ঞতা তাদের আছে। আইএস এর এসব অতীত ইতিহাস যদি বিশ্লেষণ করা হয় এবং বাংলাদেশেও সংগঠনটি শাখা বিস্তার করেছে এ খবর সত্য ধরা হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আকস্মিকভাবে বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়লে অবাক হওয়া চলবে না।
২. বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা গেলেও, এ দেশে জঙ্গি আছে, নামে-বেনামে, ছদ্মনামে অনেক উগ্রপন্থী জঙ্গিবাদী সক্রিয় রয়েছে এ কথায় আশা করি কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার কারণে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারলেও এই জঙ্গিবাদীরা একেবারে নির্মূল হয়ে যায় নি। তাদের অন্তরে লালিত জেহাদী চেতনা জেল-জরিমানার ভয়ে নিঃশেষিত হয়ে যায় নি, বরং সময়ের সাথে সাথে সেই চেতনা আরও শাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে আইএস এর উত্থান ও বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিতে এইসব জেহাদী গোষ্ঠীগুলো নতুনভাবে অনুপ্রাণিত (রহংঢ়রৎবফ) হচ্ছে। বস্তুত আইএস তাদের আদর্শিক ‘হিরো’য় পরিণত হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশে আইএস তাদের শাখা স্থাপন করলে এটা খুব স্বাভাবিক যে, এ দেশের জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলোও একাট্টা হয়ে তার অধীনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে। সকল জঙ্গি সংগঠন একত্রে মিলিত হবার মতো একটি প্লাটফর্ম পেয়ে যাবে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মোটেও সহজ হবে না।
৩. বলা বাহুল্য, আইএসের কথিত খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বাহ্যত জেহাদী মনোভাব দেখে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেরও কিছু মানুষ ইতোমধ্যেই আইএসকে সমর্থন করা শুরু করেছে। যেহেতু বিষয়টা মানুষের ইমানের সাথে সম্পর্কিত, অর্থাৎ আল্লাহ-রসুল, কোর’আন-হাদীস তথা ইসলামের নাম ব্যবহার করে আইএস সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে, সুতরাং সাধারণ মানুষ তো বটেই, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ ব্যক্তিও যদি ভেতরে ভেতরে আইএসবাদী হয়ে থাকেন তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। সাধারণ মানুষের এই সরল বিশ্বাসকে মোকাবেলা করা পৃথিবীর পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষেও প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে যে হারে সাধারণ মুসলিম পরিবারগুলো আইএসে যোগ দিচ্ছে তাতে এ আশঙ্কাই আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশি বংশদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকদেরও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবার ঘটনা অহরহ ঘটছে। আইএসে যোগ দেবার বাসনায় দেশ ছাড়তে গিয়ে বিমানবন্দরে পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন যুবক আটক হয়েছে আমাদের দেশেই- যা প্রায় সকল গণমাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। ইদানীং আইএসের পক্ষে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টার লাগানোর ঘটনাও ঘটছে। সুতরাং আইএস বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করলে তাদেরকে সহযোগিতা ও সমর্থন প্রদানকারী সাধারণ মানুষের অভাব হবে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক ইসলাম (চড়ষরঃরপধষ ওংষধস) করতে গিয়ে নানাবিধ কারণে যারা বাধা-বিঘেœর শিকার হয়ে কার্যত নিশ্চিহ্ন হবার পথে, স্বভাবজাতভাবেই আইএস নামক ‘মওকা’ লুফে নিতে কসুর করবে না তারাও। কাজেই আইএসের উপস্থিতিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। একবার এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে কোনো প্রতিশেধকেই কাজ হবে না।
৪. জঙ্গিবাদের রোষানলে পড়ে পৃথিবীব্যাপী যে ভয়ানক বিপর্যয় চলছে, ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আইএসসহ জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো তার কেবল একটি দিক রচনা করে এসেছে, সেটা হলো বর্বরতা ও নৃশংসতার দিক, অন্য দিকটি অর্থাৎ ধ্বংসলীলা, শোষণ ও অস্ত্রবাণিজ্যের দিক বরাবরই রচিত হয়েছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে। সাম্রাজ্যবাদের জঙ্গি জঙ্গি খেলা বর্তমানে অপ্রকাশ্য নয়। এ খেলায় বহু দেশ ধ্বংস হয়েছে, জনাকীর্ণ জনপদ বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, উদ্বাস্তু হয়েছে। বাংলাদেশে যে কোনোভাবে আইএস সক্রিয় হলে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়বে তখন আমাদের উপর। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইরাকের মতো ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে বাংলাদেশকেও। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ আশঙ্কা অমূলক নয়।
আইএস না থাকলে-
১. অন্যদিকে বাস্তবতা যদি হয় এমন যে, সরকারের ভাষ্য মোতাবেক এ দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্বই নেই, বিদেশী হত্যাকাণ্ডগুলো আইএস ঘটাচ্ছে না, বরং অন্য কোনো পক্ষ বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অভিসন্ধী নিয়ে এ অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে তাহলেও নিশ্চিন্ত হবার কারণ নেই। বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই- এ কথা যদি সত্য হয় তাহলে এও সত্য যে, এ দেশে আইএসের মিথ্যা উপস্থিতি প্রমাণের পক্ষে একটি মহল অপতৎপরতা চালাচ্ছে এবং সফলও হচ্ছে। বাংলাদেশের সামনে হুমকি হিসেবে সেটাইবা কম কীসে?
২. আইএস থাকুক আর না থাকুক, পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে যে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল তা যে অমূলক ছিল না তা তো প্রমাণ হয়ে গেছে। দুইজন বিদেশী নাগরিক খুন হয়েছেন। একই কায়দায়, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে। দুইটি খুনেরই দায় স্বীকার করেছে আইএস, আর তা গণমাধ্যমে প্রচার করেছে যে ওয়েবসাইটটি তার পরিচালক একজন ‘ইজরাইলী গুপ্তচর’ বলে দাবী করছেন অনেকে। যদিও আইএসের নিজস্ব কোনো সূত্র থেকে দায় স্বীকার করা হয় নি, কাজেই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিঃসন্দেহে আইএসকে দায়ী করার সুযোগ নেই, কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে যেভাবে ব্যাপক উৎসাহের সাথে বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছে তাতে আইএস থাকা আর না থাকা এখন সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএস থাকলে সরকারকে যতখানি চাপে পড়তে হতো, এখন মোটেও তার চেয়ে কম চাপ পোহাতে হচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিমের পর এবার দক্ষিণ আফ্রিকার নারী ক্রিকেট দলও বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দেশে আসতে ভয় পাচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো বারবার সরকারকে চাপ প্রয়োগ করছে, হত্যাকাণ্ডের কূল-কিনারা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কূটনীতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক হুলস্থুল। গণমাধ্যমের প্রচারণা তো রয়েছেই। এক কথায় সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদ প্রশ্নে বাংলাদেশের যে স্বচ্ছ একটি ইমেজ ছিল তা এখন অনেকাংশেই ম্লান। তবে বিশ্লেষকরা বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তিত বেশি।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ সরকার যদি কোনোভাবে বিদেশী হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিতে পারে যে, এর সাথে আইএসের কোনো যোগসূত্র নেই তবেই রক্ষা। তা করতে ব্যর্থ হলে এবং এভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকলে আইএসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সাপেক্ষে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আলাদা হবে না। উভয়ক্ষেত্রেই দেশটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পরিণতি বরণ করতে বাধ্য হবে।
৩. তৃতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদীদের বহুল ব্যবহৃত একটি সূত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হচ্ছে কিনা তাও অনেকে ভেবে দেখছেন। প্রথমে একটি দেশে কৌশলে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানো, এরপর আন্তর্জাতিকভাবে দেশটিকে জঙ্গিবাদে আক্রান্ত দেশ হিসেবে প্রচারণা চালানো এবং সবশেষে জঙ্গি দমনের নাম করে দেশটিকে ধ্বংস্তুপে পরিণত করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করার ইতিহাস পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বহুবার রচনা করেছে। সাম্রাজ্যবাদের এই পাতানো ফাঁদে পদার্পণ করার খেসারত আজও দিতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। বাংলাদেশে হঠাৎ আইএসের উপস্থিতি নিয়ে প্রচার-প্রচারণা, দুই দুইটি পরিকল্পিত অথচ রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড, বিতর্কিত একটি ওয়েবসাইট থেকে আইএসের দায় স্বীকারের খবর প্রচার এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করা- সব মিলিয়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকেও যদি কেউ সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করতে চায় তাহলে কি খুব অন্যায্য কাজ হবে?

জঙ্গিবাদের টেকসই সমাধান

জঙ্গিবাদের টেকসই সমাধান 



রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র, গণতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্র- কোনো তন্ত্রমন্ত্রই যখন পৃথিবীকে ক্ষুধা-দারিদ্র-ক্রন্দন ও যুদ্ধ-সংঘাত-শোষণ ছাড়া কিছুই দিতে পারল না তখন মুসলিম নামধারী ১৬০ কোটির জাতির মধ্য থেকে কিছু লোক স্বপ্ন দেখছে প্রচলিত ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করার। তাদের এই চেতনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয় এই কারণে যে, একদা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ছায়াতলে পৃথিবীর এক বিশাল ভূ-খণ্ড শান্তি ও সমৃদ্ধির চূড়ান্ত শিখরে আরোহন করেছিল। সে ইতিহাসকে আবারও ফিরিয়ে আনার আশা পোষণ করে প্রায় সকল মুসলিম। তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে একমাত্র ইসলামই পারবে অশান্তিময় বিশ্বকে শান্তিতে প্রতিস্থাপন করতে। ইসলামের পুনর্জাগরণবিষয়ক রসুলাল্লাহর অনেক ভবিষ্যদ্বাণীও রয়েছে যেগুলো তাদের বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করছে। যাই হোক, তারা চাইছে ইসলাম পুনরায় স্বমহীমায় উদ্ভাসিত হোক এবং ইসলামের আদর্শে আলোকিত হয়ে বিশ্ব শান্তিময় হয়ে উঠুক। এই চেতনা থেকেই জন্ম জঙ্গিবাদের।
আজ পৃথিবীর বিশাল ভূ-খণ্ড জঙ্গিবাদ নামক ভয়াবহ মহামারীতে আক্রান্ত। এ মহামারী যেন থামবার নয়। পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রপ্রধানদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে জঙ্গিবাদ। মুসলিম নামধারী জাতিটির প্রত্যেকটি রাষ্ট্রনায়ক চিন্তিত ও শঙ্কিত। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে, নতুন নুতন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, জঙ্গিদেরকে জেলে দেয়া হচ্ছে, সাজা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে; অর্থবল, অস্ত্রবল ও মিডিয়া- তিন শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আপাতদৃষ্টে এক অসম লড়াই চলছে পৃথিবীব্যাপী, কিন্তু ফলাফল? শুন্য। একজন জঙ্গি মরলে দশজন তৈরি হচ্ছে। ১৮ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে বিবিসিতে প্রকাশিত ‘বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচক- ২০১৪’ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ২০১২ ও ২০১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের হার শতকরা ৬১ ভাগ বেড়ে গেছে। সেখানে আরও বলা হয়, বিশ্বে কেবল সন্ত্রাসের (জঙ্গিবাদের) তীব্রতাই বাড়ে নি, এর প্রসারও বেড়েছে। এদিকে চলতি বছরে জঙ্গিবাদের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- আগের বছরের তুলনায় ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এক তৃতীয়াংশ বেড়েছে। আর চলতি বছরের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহ থেকে এখনই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বৈশ্বিক জঙ্গিবাদের ঊর্ধ্বমুখী সূচকে এ বছরটিও নতুন মাত্রা লাভ করবে। এ পরিস্থিতিই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থাগ্রহণ করা হচ্ছে তার অসারতা প্রমাণ করে। পৃথিবী কাঁপানো এই দানবের প্রাণপাখি কোন গহ্বরে লুকিয়ে আছে কেউ জানে না। সকলেরই এক প্রশ্ন- জঙ্গিবাদের শেষ কোথায়, কোন পথে?
এমনই হতাশাঘেরা পরিস্থিতিতে আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছে হেযবুত তওহীদ। আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, পৃথিবীব্যাপী সংক্রমিত হওয়া জঙ্গিবাদকে নির্মূল করার একমাত্র পথ হলো আদর্শিক লড়াই। আদর্শকে অস্ত্র দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না। যেহেতু আদর্শটি বিকৃত, কাজেই একমাত্র সঠিক আদর্শই তাকে প্রতিহত করতে পারে। আর সেই আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাবার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা আছে একমাত্র হেযবুত তওহীদের কাছেই। এটা যে নিছক আশ্বাসবাণী নয়, প্রকৃতপক্ষেই জঙ্গিদেরকে ভুল প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট যুক্তি, প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্য আমাদের কাছে আছে, সেটাই অতি স্বল্প পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়।

সাম্রাজ্যবাদের পাতানো ফাঁদ: জঙ্গিবাদ
পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোই এক ঢিলে দুই পাখি মারার উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদ ইস্যুটির জন্ম দিয়েছে। তারপর তা বিশ্বময় রপ্তানি করে নিজেরাই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। এ যুদ্ধের স্বল্পমেয়াদী উদ্দেশ্য হলো পররাজ্য দখল করা, পরসম্পদ লুট করা। আর দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য হলো কম্যুনিজমের পতনের পর তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ইসলাম’-কে ধ্বংস করে দেওয়া। এটা এখন পশ্চিমা আগ্রাসনকারীদের আত্মস্বীকৃত বিষয়। অনেকেই স্বীকার করেছেন, অনেকে এ নিয়ে দম্ভোক্তিও করেছেন। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন। তিনি বলেন, “আজকে আমরা যে আল কায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি কুড়ি বছর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমরাই তাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাদেরকে অর্থ যুগিয়েছি।’ [১ জুন ২০১৪, ফক্স নিউজ, সি.এন.এন]। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মোশারফকে বলতে শোনা গেছে- তালেবান আমেরিকার সৃষ্টি, (ডন, ০৫.১২.১৪)। আর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া আইএস- এর জন্মের প্রেক্ষাপট যারা জানেন তাদেরকে বলে দিতে হবে না যে, কীভাবে পশ্চিমা জোট আসাদ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুৎ করার প্রচেষ্টায় আইএসকেই একদা সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করে শক্তিশালী করেছে। এমনকি ইরাকের বিস্তির্ণ অঞ্চল দখল করার পরও কুর্দীদের অস্ত্র দেবার নাম করে আকাশ থেকে আইএসকে অস্ত্র প্রদান করেছে যুক্তরাষ্ট্রই। অবশ্য জঙ্গিরাও অকৃতজ্ঞ নয়; তালেবান, আল কায়েদা বা আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে পৃথিবীব্যাপী শোষণ অব্যাহত রাখতে যতখানি সুযোগ করে দিয়েছে তা অতীতে কেউ পেরেছে বলে মনে হয় না।
আমরা সবাই জানি, আশির দশকে সংঘটিত রুশ-আফগান যুদ্ধটিই হচ্ছে জঙ্গিবাদের সূতিকাগার। এ সময়টিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ এবং পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আই.এস.আই. আফগানদেরকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ এই সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানে একটি সশস্ত্র বাহিনী তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। বিভিন্ন মোসলেম দেশ থেকে লাখ লাখ যুবক আফগানিস্তানে ছুটে গিয়েছিল আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার জন্য। তারা কি বুঝেছিলেন যে, এটা জেহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নয়, এটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাথের্র যুদ্ধ, এ যুদ্ধে আল্লাহ-রসুলের কিছু আসে যায় না? বুঝতে পারেন নি, কারণ এই যুবকদেরকে প্রাণদানে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পশ্চিমারা মোসলেম দেশগুলোতে হাজার হাজার ধর্মব্যবসায়ীকে ভাড়া করছিল যারা তাদের যার যার দেশের যুবকদেরকে যুদ্ধে যোগদানের জন্য উত্তেজিত ও সংঘটিত করেছিল। তারা বলত যে এটা যুদ্ধ নয়, জেহাদ ও কেতাল ফি-সাবিলিল্লাহ। এখানে মরলে শহীদ বাঁচলে গাজি। শুধু তাই নয়, পরবর্তী প্রজন্মকে জঙ্গি হিসাবে গড়ে তোলার জন্য পশ্চিমারা ওই প্রকল্পের আওতায় আফগানিস্তানের বাচ্চাদের পাঠ্যপুস্তকে সন্ত্রাস ও মারণাস্ত্র সম্পর্কিত অনেক প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোন কোন অস্ত্র ব্যবহার করলে ভালো হবে এমন তথ্য সেগুলোতে অনায়াসে দেওয়া হয়েছিল। তখন ইংরেজি বর্ণমালা পরিচয়ে ‘জে’-তে জেহাদ শেখানো হতো। এমনকি গণনা শেখানোর সময় ৫ বন্দুক + ৫ বন্দুক = ১০ বন্দুক শেখানো হতো। এভাবে হাতে কলমে জঙ্গিবাদের শিক্ষা প্রচার করেছে যারা সেই পশ্চিমারাই আজ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে চেচিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন।
এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ যে আসলে পশ্চিমাদের রাজনীতির খেলা, অর্থাৎ Political game, সেটাও প্রমাণিত। এতে তাদের লাভ হচ্ছে তারা খনিজ ও তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো দখল করতে পারছে, পাশাপাশি অস্ত্রব্যবসা করে নিজেদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। আমাদের দেশের অর্থনীতিকে যেমন বলা হয় কৃষি অর্থনীতি, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বলা হচ্ছে যুদ্ধ অর্থনীতি (War Economy)। যুদ্ধ না থাকলে তাদের অর্থনীতিতে মন্দা হবে। তাদের প্রয়োজন বিশ্বজোড়া অস্ত্রের বাজার। কিন্তু তারা নিজেরা আর স্বশরীরে যুদ্ধ করতে আগ্রহী নয়। তাদের সৈন্যরা যুদ্ধবিমুখ ও ভোগবাদী। তাই দরকার পড়েছে মোসলেমদের একটি দলকে আরেকটি দলের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া। সুতরাং জঙ্গিরা পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে অতি প্রয়োজনীয় শত্র“ (Useful enemy)। তারা যেমন জঙ্গিদেরকে জিইয়ে রাখতে চায় চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত তেমনি, অনেক দেশের সরকারও জঙ্গিবাদ নির্মূল হোক এটা চায় না। জঙ্গিরা থাকলে তাদের বহুমুখী স্বার্থোদ্ধারের পথ খোলা থাকে। 

সুতরাং জঙ্গি ও জঙ্গি মনোভাবাপন্ন মুসলিমদেরকে যদি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের এই খেলা সম্পর্কে সচেতন করা যায় এবং তারা যদি বুঝতে পারে যে, জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড থেকে ইসলামের কোনো উপকার তো হয়-ই না, বরং ইসলামের শত্র“রাই লাভবান হয় তাহলে ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো আর পশ্চিমা ক্রীড়নকে পরিণত হবে না।

বিকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: ভস্মে ঘৃতাহুতি দেয়া
জঙ্গিরা যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে, জেলে যাচ্ছে, ফাঁসিতে ঝুলছে, শত্র“র গোলা-বারুদে ঝাঁঝরা হচ্ছে সেই ইসলাম আর আল্লাহর রসুলের ইসলাম এক নয়। বর্তমানে ইসলামের নাম করে যে দ্বীনটি প্রচলিত আছে তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে প্রকৃত ইসলামের মতো মনে হলেও, আত্মায় ও চরিত্রে আল্লাহর রসুলের ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। যেটাকে আইএস, বোকো হারাম, আল কায়েদা, তালেবানরা ইসলাম মনে করছে এবং ভাবছে সেটাকে প্রতিষ্ঠা করে স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনবে সেটা বিগত ১৩০০ বছরের ধারাবাহিক বিকৃতির ফল, প্রকৃত ইসলামের ছিটে ফোটাও এর মধ্যে নেই। দীন নিয়ে অতি বিশ্লেষণকারী আলেম, মুফতি, মোফাস্সের, মোহাদ্দেস, সুফি, দরবেশ ও পীর-মাশায়েখদের অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক, বাহাস, মতভেদ ও চূলচেরা বিশ্লেষণের পরিণামে দীনের ভারসাম্য হারিয়ে গেছে অনেক আগেই, সেই ভারসাম্যহীন দীনের ভিন্ন ভিন্ন ভাগকে আঁকড়ে ধরে ছিল ভিন্ন ভিন্ন ফেরকা-মাজহাব, দল-উপদল। অতঃপর ব্রিটিশরা এসে জাতির কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকল। আগের শিক্ষাব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে নিজেরা মাদ্রাসা তৈরি করে সেই মাদ্রাসায় ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের তৈরি সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুযায়ী তাদের সুবিধামতো একটি বিকৃত ইসলাম এই জাতিকে শিক্ষা দিল। ফলাফল- মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ করে রসুলাল্লাহর রেখে যাওয়া ঐক্যবদ্ধ জাতি এখন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, তেহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়ে একে অপরের রক্তে হোলি খেলছে। ব্রিটিশদের শেখানো এই বিকৃত ইসলাম পৃথিবীর এক ইঞ্চি মাটিতেও শান্তি আনয়ন করতে ব্যর্থ। সুতরাং একে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যারা জীবন দেবে, সম্পদ দেবে তারা যে ভস্মে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন তাতে সন্দেহ নেই।

ইসলামের প্রকৃত আকীদা বুঝতে হবে
প্রকৃত আকীদার অনুপস্থিতির কারণে জঙ্গিবাদের পথ আরও প্রশস্ত হচ্ছে। ইসলামে আকীদার গুরুত্ব অতুলনীয়। এই দীনের আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাপারে মতভেদ থাকলেও এ ব্যাপারে তারা সকলেই একমত যে, আকীদা সঠিক না হলে ঈমানের মূল্য থাকে না। জঙ্গিদের ঈমান আছে, শুধু আছে বললে ভুল বলা হয়, তাদের ঈমান অন্য আর দশজন সাধারণ মুসলিমের চেয়ে অনেক বেশি। দৃঢ় ঈমান না থাকলে কেউ জান দিতে যায় না। কিন্তু এত প্রবল ঈমানের কী দাম থাকে যদি আকীদা ঠিক না হয়? আকীদা হচ্ছে comprehensive concept, সম্যক ধারণা, অর্থাৎ একটি কাজ কেন করা হবে, কীভাবে করা হবে, কখন করা হবে, কোন কাজ আগে কোনটা পরে, কোনটা এখন কোনটা তখন, কোনটা খুব প্রয়োজনীয় কোনটা কম প্রয়োজনীয়, কোনটা না হলেই নয় কোনটা না হলেও চলবে, কোনটার পূর্বশর্ত (precondition) কোনটা, কোন কাজ দ্বারা মানবতার কী উপকার হবে বা কী ক্ষতি হবে ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা। অথচ এই দীনের নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতসহ যে জেহাদের কথা বলে জঙ্গিবাদ ছড়ানো হচ্ছে সেই জেহাদ সম্পর্কেও জঙ্গিদের আকীদা সঠিক নয়। উপরন্তু আকীদাকে অনেকে ঈমানের সাথেই গুলিয়ে ফেলছেন, অথচ আকীদা ও ঈমান যে পৃথক বিষয় তা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। ইসলামের জেহাদ কী জন্য, রসুল কখন কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে জেহাদ করেছেন, কখন কিতাল করেছেন সে সম্পর্কে সঠিক আকীদা না থাকায় জঙ্গিরা সন্ত্রাসকেই জেহাদ বলে মনে করছে। কাজেই ইসলামের প্রকৃত আকীদা জানতে পারলে অনেক বিপথগামী জঙ্গিই সন্ত্রাস ত্যাগ করবে তাতে সন্দেহ নেই।

তওহীদহীন জাতিকে আগে তওহীদের জ্ঞান প্রদান করতে হবে
জঙ্গি মনোভাবসম্পন্ন মানুষদেরকে তওহীদের প্রকৃত অর্থ বোঝাতে হবে। দীনের ভিত্তি বা প্রাণ হলো তওহীদ। জীবনের সকল অঙ্গনে যেখানে আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের কোনো কথা আছে, সেখানে অন্য কারোটা না মানাই তওহীদের একমাত্র দাবী। সেই তওহীদ কি আজকের মুসলিম নামধারী জাতির মধ্যে আছে? নেই। আজ এই জাতি জাতীয় জীবন থেকে আল্লাহ প্রদত্ত সিস্টেম, বিধি-বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সিস্টেম গ্রহণ করেছে। ইসলাম বলতেই এরা বোঝে নামাজ, রোজা, এবাদত-উপাসনা এবং জিকির-আজগার, তসবীহ-তাহলীল, ওযু, গোসল, মেসওয়াক বা লেবাসের মতো তুচ্ছ ব্যক্তিগত জিনিস। অথচ আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, দীনের ব্যক্তিগত ভাগ মেনে ও জাতীয় ভাগ প্রত্যাখ্যান করে এরা যে তওহীদ থেকেই বিচ্যুত হয়ে গেছে, আল্লাহর চোখে এরা আর যে মোমেন নেই, মুসলিম নেই, বরং মোশরেকে পরিণত হয়েছে সে জ্ঞান তাদের নেই। কাজেই যারা পুনরায় ইসলামের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে চায় তাদেরকে একদিকে যেমন নিজেদের অবস্থান বুঝতে হবে, সেই সাথে বুঝতে হবে জাতি বর্তমানে কোন অবস্থানে আছে। যে জাতিতে তওহীদই নেই, যারা জাতীয় জীবনে আল্লাহর প্রদত্ত সিস্টেমকে অস্বীকার করেছে তাদেরকে তওহীদের আহ্বান না জানিয়ে, তওহীদের মর্মার্থ না বুঝিয়ে অর্থাৎ মানসিকভাবে জাতিকে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করার উপযোগী না করে আগেই জেহাদের জিগির তোলা সুবিবেচনার কাজ হতে পারে না। জাতিকে আগে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝাতে হবে। ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজ থেকে অশান্তি দূর করার জন্য সংগ্রাম করাই যে একজন মু’মিনের প্রধান কর্তব্য, এবাদত সেটা সকলকে বোঝাতে হবে। তাদেরকে আরও বোঝাতে হবে যে, ধর্মের কোনো বিনিময় চলে না, ব্যবসা চলে না। ধর্মের কাজ হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। এভাবে জাতিকে আগে ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য, তওহীদ, শিরক, কুফর ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে। যুগ যুগ ধরে এদের বিশ্বাসে, আচারে, প্রথায় যে অজ্ঞতা বাসা বেধেছে তা দূরীভূত করতে হবে। তা না করে যাদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম, সেই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরা চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় প্রদান করে। এভাবে যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ শান্তি আনয়ন সম্ভব নয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ গত দুই-এক দশকের ভেতরেই পাওয়া যাবে।

ইতিহাসের শিক্ষা
ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইরত তথাকথিত জেহাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য রসুলাল্লাহর জীবনী থেকে বিভিন্ন ঘটনার অবতারণা করে থাকে। আপাতদৃষ্টে তাদের প্রত্যেকটি যুক্তিই গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে কারণ রসুলাল্লাহ তাঁর নবী জীবনের অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রসুলের পদাঙ্ক অনুসরণ করাই প্রতিটি মু’মিনের কর্তব্য। কিন্তু আরেকটু গভীরে গেলেই শুভংকরের ফাঁকিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জঙ্গিরা প্রধান যে ভুলটি করে তাহলো- আল্লাহর রসুলের জীবনের দুইটি ভাগ, অর্থাৎ মক্কা জীবন ও মদীনা জীবনের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়; অথচ মক্কা ও মদীনায় রসুলাল্লাহর কর্মপদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মক্কায় তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে তওহীদের বালাগ দিয়ে গেছেন। শত অন্যায়, অবিচার সহ্য করেছেন। মুশরিকদের নির্দয় আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন। সঙ্গি-সাথীরা ঘর-বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছে। অবরুদ্ধ ও একঘরে জীবনযাপন করেছে। কয়েকজনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। রসুলের সামনে দিয়ে সাহাবীদের টেনে-হিঁচরে নির্যাতন করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, রসুলাল্লাহ বাধা পর্যন্ত দিতে পারেন নি। এত নির্যাতনের মাঝেও মক্কা জীবনে যুদ্ধের অনুমতি ছিল না। সেখানে একটাই কাজ- সমস্ত নির্যাতন, নিপীড়ন, ঠাট্টা, বিদ্রƒপ উপেক্ষা করে যথাসম্ভব তওহীদের বালাগ চালিয়ে যাওয়া, ঘুমন্ত মানুষগুলোর অন্তরাত্মাকে জাগ্রত করে তোলা। অতঃপর যখন মদীনায় একটি বিশাল জনসংখ্যা রসুলাল্লাহর আহ্বান গ্রহণ করল, রসুল হেযরত করলেন এবং মদীনার মুসলিম-অমুসলিম সকলকে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছার ভিত্তিতে সাধারণ চুক্তির মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী ও অস্ত্র-শস্ত্র দরকার পড়েছিল। সেখান থেকেই রাজনীতিক কারণে রসুলাল্লাহ ও তাঁর সাহাবাদের যোদ্ধা জীবন শুরু। সেই যুদ্ধ প্রচলিত রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধনীতি ও ধর্মীয় বিধান কোনো দৃষ্টিতেই অবৈধ ছিল না।

অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, ব্যক্তি বা দলগতভাবে কেউ অস্ত্র হাতে নিলে সেটা ইসলাম হবে না, কারণ রসুল তা নেন নি। অস্ত্রের ব্যবহার, সেনাবাহিনীর ব্যবহার করতে পারে একমাত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই মুলনীতিকে অগ্রাহ্য করার অর্থ রসুলাল্লাহর কর্মপদ্ধতিকে ভুল মনে করা।
যারা জঙ্গি হচ্ছে এবং যারা আগামীতে সেই পথে পা বাড়াবে তাদের মূল প্রেরণা হচ্ছে কোর’আন-হাদীস, রসুলের ইতিহাস ইত্যাদি। তাদের ইসলামের অপব্যাখ্যা দ্বারা উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এই অপব্যাখ্যা বজায় রেখে, শুধু শক্তি প্রয়োগ করে সফলতার আশা করা যায় না। কারণ, পূর্বেই বলেছি- যারা জঙ্গি হয় তারা জেনে বুঝেই হয়, মৃত্যুকে ভয় পাওয়া তো পরের কথা, মৃত্যুই তাদের আকুল কামনা। এমতাবস্থায় ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও শিক্ষা প্রদান করে মানুষকে সচেতন করে তোলা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। এতে সকলেরই কল্যাণ। ব্যক্তি যেমন উপকৃত হবে, সমাজ ও জাতিও উপকৃত হবে। ইহকাল এবং পরকাল উভয়ই সার্থক হবে। হেযবুত তওহীদ যথাসাধ্য সে প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে।

বিকল্প সিস্টেমের কথা কেন ভাববেন?

বিকল্প সিস্টেমের কথা কেন ভাববেন???



‘সর্বনাশা পদ্মা নদী, তোর কাছে শুধাই, বল আমারে তোর কি রে আর কূল কিনারা নাই।’ উত্তাল পদ্মার যেন কোনো কুল-কিনারা নেই, সে ভেঙেচুরে ভাসিয়ে নিতে চায় সবকিছু। তার বিশালতার মাঝেও হিংস্রতা স্পষ্ট। আজ দুনিয়াময় গণতন্ত্রের নামে যে সিস্টেমটি চলছে তা যেন ওই উন্মত্ত পদ্মারই স্বভাব ধারণ করেছে। সে একদিকে নিজেকে উদার ভাবে, পরমতসহিষ্ণুতার দীক্ষা প্রদান করে, অধিকারের কথা বলে, অন্যদিকে সবার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সে সমস্ত পৃথিবীকে পদানত করে রাখতে চায়, মানুষের সাথে, মানবতার সাথে তার প্রতারণা সুস্পষ্ট।

দুনিয়াময় আজ গণতন্ত্রের নামে যা চলছে সেখানে কেবল অনৈক্যের সুর, ভাঙ্গনের সুর। পরিবার ভাঙছে, সমাজ ভাঙছে, দল ভাঙছে, রাষ্ট্র ভাঙছে। অনৈক্য, শত্র“তা, বিদ্বেষ, হানাহানি, যুদ্ধ, রক্তপাত ও ধ্বংস- গণতন্ত্রের এই অশুভচক্রে আটকা পড়েছে রাষ্ট্রসমূহ। পৃথিবীব্যাপী গণতন্ত্র রপ্তানি করতে গিয়ে পরাশক্তিধর শোষক রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্যে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ জনপদকে বিরানভূমিতে পরিণত করছে। প্রয়োজনে চালানো হচ্ছে গণহত্যা। এদিকে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো না পারছে এহেন গণতন্ত্রকে হজম করতে, না পারছে উগরে দিতে। জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা, ভাঙচুর, অবরোধ-হরতাল এসব দেশের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশ্চাত্যের পানে বাড়ানো ভিক্ষার হাত দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। পদানত রাষ্ট্র আরও পদানত হচ্ছে। চূড়ান্তবিচারে লাভবান হচ্ছে একমাত্র পাশ্চাত্য শোষক রাষ্ট্রগুলোই, যেখান থেকে এ শোষণযন্ত্রের সূচনা হয়েছিল।

স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র বরাবরই এক বৃহৎ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গণতন্ত্রের আশায় বুক বেঁধেছে লাখো মানুষ। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে গণতন্ত্রের দাবিতে। রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে। ভাঙচুর হয়েছে। উত্তপ্ত স্লোগানে স্লোগানে গরম হয়ে উঠেছে রাজপথ। বুলেটে ঝাঝরা হয়েছে কত বুক। তারপর একসময় শোনা গেল গণতন্ত্র নাকি মুক্তি পেয়েছে। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বিজয়ের আস্ফালন করল। নব্বই এর দশকে যাত্রা শুরু করল কথিত গনতন্ত্র। কিন্তু যে শান্তির জন্য এতকিছু, তার এতটুকু চিহ্নও কি দেশের গণতান্ত্রিক শাসনামলের কয়েক দশকের ইতিহাসে আমরা পেয়েছি? গণতন্ত্র চলছে, পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হচ্ছে, ক্ষমতা পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু দেশবাসীর ভাগ্যের কাক্সিক্ষত কোনো পরিবর্তন নেই।

এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পরিচিত। তারা কথিত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনে যোগ দেয়, গণতান্ত্রিকভাবে জয়লাভ করে ক্ষমতায় বসে। সবার মুখেই গণতন্ত্রের বুলি, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- কোনটা গণতন্ত্র আর কোনটা স্বৈরতন্ত্র সে বিষয়ে আজ পর্যন্ত এরা ঐক্যমতে পৌঁছতে পারল না। যে দল ক্ষমতায় বসে তার কাছে গণতন্ত্রের মানে একরকম, যে দল পরাজিত হয় তার কাছে অন্যরকম। ইদানিং শুরু হয়েছে- ‘গণতন্ত্রের আসল রূপটা কী’ এই নিয়ে বিতর্ক। সরকার যেখানে দেশে গণতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই দেখছে না, সেখানে বিরোধী পক্ষগুলোর অভিযোগ হলো দেশে গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও নেই। সরকার বলছে, এই দেখো, দেশ চলছে একশভাগ সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন হচ্ছে সংবিধান মেনে, বিচারবিভাগ কাজ করছে স্বাধীনভাবে, যে কেউ সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং করতে পারছে, দাবি আদায়ের আন্দোলনও করছে অনেকে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়নের জোয়ার বইছে। মানুষ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো আছে। এটাই গণতন্ত্র। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষটি বলছে, না, দেশের কোথাও গণতন্ত্র নেই। দেশ চলছে স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বিজয়লাভ করলেই কেবল সে সরকার বৈধ হয়। এ সরকার সেই শর্ত পূরণ করে নি। এ বিতর্ক আজকের হলেও, খেয়াল করলে বোঝা যাবে, একই ধরনের বিতর্ক আমাদের দেশে দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। সম্প্রতি এ ধরনের বিতর্কে নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়েছে। গণতন্ত্র জরুরি নাকি উন্নয়ন জরুরি- কোনটা আগে? যদি গণতন্ত্র জরুরি হয় তাহলে কোন গণতন্ত্র? সীমিত গণতন্ত্র (Controlled democracy) নাকি বিস্তৃত পরিধির গণতন্ত্র (wide space democracy)? এসব নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সব কিছুতেই যারা গণতন্ত্রের সার্থকতা খুঁজেন, তাদের নিজেদের মধ্যেই গণতন্ত্র নেই, তা কি হয়? ইদানীং তাই দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চার জোর চেষ্টা চলছে। রাজনীতিক দলের বা অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি গঠন করা হচ্ছে গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটাভুটির মাধ্যমে। কিন্তু যে গণতন্ত্র রাষ্ট্রে ব্যর্থ, তা দলে সফল হবে এমন আশা তো করা যায় না। পরিণাম- কাদা ছোঁড়াছুড়ি, চেয়ার ছোঁড়াছুড়ি, শক্তিশালী সিন্ডিকেট, আর এক কমিটিকে আরেক কমিটির অস্বীকার। কোনো কোনো জেলায় দশকের পর দশক চলে যায়, কমিটি গঠন করতে পারে না। আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দল চলে। কাজের কাজ এই হয় যে, গণতন্ত্রের ব্যর্থতার ফুটো আরও বড় হয়।

এই সর্বনাশা বহুরূপী পুঁজিবাদী গণতন্ত্র জাতিটাকে শেষ করে দিল। একদিকে ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতায় টিকে থাকার নগ্ন প্রতিযোগিতা, হামলা-মামলা, খুন-খারাবি, হয়রানি, দমন-পীড়ন; অন্যদিকে গণতন্ত্রের নামে হরতাল, অবরোধ, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ভাঙচুর, মানুষ পোড়ানোসহ যার যা খুশি বলা, যার যা খুশি লেখা ও যার যা খুশি করার লাইসেন্স এ জাতিকে একটি মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেয় নি। স্রোতস্বিনী নদী যেমন তার স্রোতের টানে একটু একটু করে তীরের গাছপালা, গ্রাম-গঞ্জ, বাজার ও জনপদ ধ্বংস করে নিজেকে বিস্তৃত করে, তেমনি চলমান সর্বনাশা গণতন্ত্র এ জাতির ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধিকে ধ্বংস করে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে চলেছে। অথচ এ জাতি নির্বোধের মতো তাকেই নমঃ নমঃ করছে।

গণতন্ত্রের উৎপত্তি ইউরোপে। মধ্যযুগের বর্বরতা কাটিয়ে উঠার জন্য এমন একটি সিস্টেম ইউরোপের প্রয়োজন হয়েছিল। ধর্মের নামে চালানো চার্চের অধর্মের অপশাসন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা ও সভ্যতার সাথে সামঞ্জস্যশীল জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইউরোপীয়ানরা তাই গণতন্ত্র আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে শিল্পবিপ্লবের ফলে গণতন্ত্র পরিণত হয় পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে। তার কুফল থেকে মানুষকে বাঁচাতে আবার একদল সমাজচিন্তক আবিষ্কার করেন সমাজতন্ত্র। সেই সমাজতন্ত্রও যখন ব্যর্থ হয়ে গেল, সমস্ত পৃথিবীকে পুনরায় গ্রাস করে নিল পুঁজিবাদী গণতন্ত্র। ঔপনিবেশিক আমল শেষ হয়ে গেলে, নব্য নাম্রাজ্যবাদীরা সাম্রাজ্যবাদের আধুনিকতম পদ্ধতি হিসেবে গরীব দেশগুলোতে গণতন্ত্র রপ্তানি করতে শুরু করল। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে গণতন্ত্রের দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল সেই ব্রিটিশ, যাদের অপশাসন, দমন-পীড়ন ও শোষণের দাগ তখনও ভারতের বুকে দগদগ করছে। যাদের দুই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক আমলে একবারের জন্যও গণতন্ত্রের প্রয়োগ লক্ষ করা যায় নি। যুগে যুগে এ উপমাদেশের মানুষের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতির যোগসূত্র রচিত হয়েছে ধর্মের দ্বারা। সেই ধর্মকেই অবাঞ্ছিত করে রেখে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের নামে এমন একটি সিস্টেম তারা চাপিয়ে দিল যার সাথে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস, রুচি-অভিরুচি, কৃষ্টি-কালচার ও ধ্যান-ধারণার বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য নেই। আমাদের দেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কটাবস্থা ও বিভিন্ন জটিলতার প্রধান কারণ এটাই। এছাড়াও রয়েছে প্রাচ্যের এই দেশগুলোর দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে চালানো পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীদের বহুমুখী শোষণ। গণতন্ত্রের প্রধান কুফল- জাতির ঐক্য বিনষ্টকরণ। যে জাতিতে যত বেশি অনৈক্য, সেই জাতিকে শোষণ করা তত সহজ। গণতন্ত্র এ কাজটি খুব সহজ করে দিয়েছে। আর সে কারণেই গণতন্ত্রের জন্য পাশ্চাত্যের এত মায়াকান্না।

আজ সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। পশ্চিমাদের গণতন্ত্রের তত্ত্বকথা অনেক শোনা হয়েছে। সেগুলো যে ‘শাখের করাত’ ছাড়া কিছুই নয় তা প্রমাণ হতে বাকি নেই। সুন্দর সুন্দর শব্দজাল বিছিয়ে জাতিকে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থানে আটকে রাখা হয়েছে। তাই আর সংজ্ঞা দেখে নয়, ফলাফল দেখে বিচার করতে হবে। আর নির্লিপ্ত থাকা চলে না। সবাইকে বসতে হবে। রাজনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী সকলে মিলে আসুন আমরা একটি ঐক্যমতে পৌঁছাই। আমাদের বিশ্বাস, কৃষ্টি-কালচার, রুচি-অভিরুচি অর্থাৎ আমাদের চিন্তা-ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং প্রাকৃতিক সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত এমন একটি সিস্টেম দাঁড় করাই যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের মতো ভাগ্যবরণ করা থেকে রক্ষা করবে, সেটা যে তন্ত্রই হোক না কেন।

আল্লাহর শেষ রসুল আখেরি যামানায় যে এক চক্ষুবিশিষ্ট দানব দাজ্জালের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যাকে ঈসা (আ.) Anti-christ বলে আখ্যায়িত করেছেন, মাননীয় এমামুয্যামান সেই দাজ্জালকে হাদিস, বাইবেল, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করেছেন। 
তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী সভ্যতাই হচ্ছে সেই দাজ্জাল। বর্তমানে সমগ্র মানবজাতি সেই দাজ্জালের তৈরি জীবনবিধান মেনে নিয়ে তার পায়ে সেজদায় পড়ে আছে। পরিণামে তারা একদিকে যান্ত্রিক প্রগতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও মানুষ হিসাবে তারা পশুর পর্যায়ে নেমে গেছে। সমগ্র মানবজাতি ঘোর অশান্তি, অন্যায়, অবিচারের মধ্যে ডুবে আছে। দাজ্জালের হাত থেকে পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ।
আল্লাহর রসুল বলেছেন যে, যারা দাজ্জালকে প্রতিরোধ করবে তারা বদর ও ওহুদ দুই যুদ্ধের শহীদের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে (আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী মুসলিম)।
হেযবুত তওহীদের যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে তাদেরকেও আল্লাহ দুই শহীদ হিসাবে কবুল করে নিয়েছেন। যার প্রমাণস্বরূপ তিনি একটি বিরাট মো’জেজা হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। তা হলো: এই দাজ্জাল প্রতিরোধকারীরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের দেহ শক্ত (রাইগরমর্টিস) ও শীতল হয়ে যায় না। জীবিত মানুষের ন্যায় নরম ও স্বাভাবিক থাকে।