Sunday, December 6, 2015

ধেয়ে আসছে বিশ্বমহামন্দা : পরিত্রাণের উপায়- ধর্মবিশ্বাস

ধেয়ে আসছে বিশ্বমহামন্দা : পরিত্রাণের উপায়- ধর্মবিশ্বাস

রাকীব আল হাসান : 
ঋণ সঙ্কটে চরমভাবে বিপর্যস্ত ইউরোপের প্রতিটি দেশের অর্থনীতি। ইউরোপের দেশগুলো এত বেশি ঋণ করেছে যে সেটা আর শোধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। শুধু তাই নয় ঋণ করে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করতে শেখানো হয়েছে জনগণকে। তাদের অভ্যস্ত করা হয়েছে ধার করে ঘি খেতে। এখন সেই ঋণের পরিমাণ এত বেশি জমা হয়েছে যে সেটা আর শোধ করার ক্ষমতা নেই তাদের। যার ফলে অনেক দেশই এখন দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইতোমধ্যেই দেউলিয়া হয়ে গেছে আয়ারল্যান্ড। দেউলিয়ার পথে গ্রিস। ইতালি ও পতুর্গালের অর্থনীতিরও টালমাটাল অবস্থা। আসলে ইউরোপের প্রতিটি দেশই ঋণ সঙ্কটে আক্রান্ত। কিন্তু অন্যান্য দেশগুলো যাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো তারা কোনো রকমে এই সঙ্কট মোকাবেলা করছে বা এক রকম সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু আর্থিকভাবে কিছুটা দুর্বল যেমন গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, পর্তুগাল তারা রয়েছে মহাবিপদে। আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলা করতে না পারার অভিযোগে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বার্লোসকুনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এর সঙ্গে তার সরকারেরও পতন ঘটেছিল। আর্থিক সঙ্কটের কারণে এটাই সম্ভাবত প্রথম কোনো সরকার পতনের ঘটনা। এখন সরকার পতনের আন্দোলন চলছে গ্রিসে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে গ্রিস। গত ১ জুলাই শেষ হওয়া সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় গ্রিস এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ-খেলাপি। উন্নত বিশ্বের কোনও দেশের এমন ঋণখেলাপী হবার ঘটনা এই প্রথম। এসব দিয়ে এই সঙ্কটের তীব্রতা বোঝা যায়। এ ছাড়াও সমগ্র ইউরোপে দেউলিয়া হয়ে গেছে শত শত ব্যাংক, বীমা ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান। কারণ তারা যে ঋণ বিতরণ করেছে সেটা আর ফিরে আসেনি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই সঙ্কট শুরু হলেও এখন এটা রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঋণ সঙ্কট ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অস্তিত্ব। চেষ্টা তদবির কম হচ্ছে না কিন্তু কোনোভাবেই সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। পুঁজিবাদী অর্থনীতি ইতিহাসে এত বড় সঙ্কটে আর পড়েনি।
সার্বিক পরিস্থিতি বিচারে আশঙ্কা করা হচ্ছে ১৯৩০ সালের মতো বিশ্বব্যাপী আর একটা মহামন্দা আসন্ন। এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর ড. রঘুরাম রাজন। যাকে কিনা ভারতের আর্থিক ক্ষেত্রের “জেমস বন্ড” ডাকা হয়। ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দার ভবিষ্যৎ বাণীটিও কিন্তু তিনিই করেছিলেন ২০০৫ সালে লেখা তার একটা গবেষণাপত্রে। তখন তিনি কর্মরত ছিলেন আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে। তার সেদিনের ভবিষ্যৎ বাণীকে তখন কেউই পাত্তা দেয়নি কিন্তু পরবর্তীতে ড. রাজনের ধারনাই অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় এবং আমেরিকা তথা বিশ্ব অর্থনীতি এক এক করে ধসে যেতে থাকে।
সব মিলিয়ে এটা প্রায় নিশ্চিত যে একটা মহামন্দা পৃথিবীবাসীর জন্য অপেক্ষা করে আছে। আর এটাও নিশ্চিত যে আমরা যেহেতু পৃথিবী নামক এই গ্রহেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ, বিশাল জনসংখ্যার কিন্তু ক্ষুদ্র অর্থনীতির একটি উন্নয়নশীল দেশ, কাজেই এই মন্দার রেখা আমাদেরকেও আঁচড় দেবে। এখন প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে এই আসন্ন মহামন্দাসহ যেকোনো অর্থনীতিক সঙ্কটকে মোকাবেলা করতে পারি?
এর জন্য আমাদেরকে আগে বুঝতে হবে সাধারণত অর্থনীতিক সঙ্কট কেন দেখা দেয়, এটা খুঁজে বের করতে পারলে এ থেকে পরিত্রাণের উপায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে যে সঙ্কট চলছে তার কেন্দ্রে যে বিষয়টি আছে তাহলো লোভ। অতি মুনাফা, অর্থ, বিত্ত, আর ভোগবিলাসের লোভ। অতি মুনাফার জন্য ব্যাংক, বীমা আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মনীতি না মেনে সর্বোচ্চ ঋণ বিতরণ করেছে। আর যারা ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য হারিয়েছে তারা অতি মাত্রায় ভোগ-বিলাসিতা ও বেহিসাবী অপচয়ের কারণে তা হারিয়েছে। এছাড়া অর্থনীতিক সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি। এই ভোগবাদী, বস্তুবাদী, আত্মাহীন দাজ্জালীয় ব্যবস্থার কারণে আজ অর্থনীতিক বৈষম্য এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, একদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী চরম দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করছে আর অন্যদিকে গুটিকয় মানুষ সম্পদের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চরম ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পিশাচের হাসি হাসছে। ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকারীরা এটাকে বলছে ‘We are 99% & you are 1%’ এই ১% এর হাতে বিশ্বের প্রায় সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত। পৃথিবীর সম্পদ সীমিত, কাজেই এই সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন না হলে মানুষ অর্থনীতিক অবিচারের শিকার হবে। নির্দিষ্ট কিছু দেশে, নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে এই সীমিত সম্পদ যত বেশি কুক্ষিগত হতে থাকবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তত বেশি বঞ্চিত হবে ও চরম দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত হতে থাকবে। আবার এই সম্পদের অপচয়ও মানুষকে চরম অভাবে পতিত করে। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কাজে, অস্ত্র তৈরিতে সম্পদের যে অপচয় হয়েছিল তা পরবর্তীতে অর্থনীতিক মন্দা ডেকে আনে। বর্তমানে পরাশক্তিধর দেশগুলি আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে, অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা করে যে ট্রিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ অপচয় করে যাচ্ছে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনার অন্যতম কারণ।
এ ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হলো সকল প্রকার অর্থনীতিক মন্দা থেকে রক্ষা করতে পারে আমাদের ধর্মবিশ্বাস। ধর্মবিশ্বাস আমাদের বিরাট একটি শক্তি। আমাদের সমাজ বস্তুবাদী সমাজ নয়, আমাদের সমাজ বিশ্বাসভিত্তিক সমাজ। ধর্ম থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা অর্থনীতিক এই মন্দাসহ সকল প্রকার সমস্যার সমাধান করতে পারি।
যেমন প্রতিটি ধর্মে পাশবিক ভোগ-বিলাস ও সম্পদের অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। ধর্মের এই দিকটি মানুষের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে সম্পদের অপচয় কমানো যাবে। ইসলাম ধর্মে এ বিষয়ে অনেক উপদেশ, নির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম অপচয় ও ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকতে শিক্ষা দিয়েছে। ছোটখাটো অপচয়ের বিরুদ্ধেও রসুলাল্লাহ সতর্ক থাকতে বলেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।” (বনি ইসরাঈল-২৭)। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলাল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সোনা অথবা রুপার পাত্রে বা সোনা-রুপা মিশ্রিত পাত্রে পান করে, সে নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ঢালে (দারু কুতনি থেকে মিশকাত)। ভোগবাদী মানসিকতার প্রদর্শনী থেকে মানবসমাজকে পবিত্র রাখাই এ হাদিসের উদ্দেশ্য।
ভোগ-বিলাসিতার ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন, “আর যারা কাফের, তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুস্পদ জন্তুর মতো আহার করে। তাদের বাসস্থান জাহান্নাম।” (মুহাম্মদ- ১২)। তিনি আরও বলেন, “আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার ভোগবিলাস অতীব নগণ্য” (তওবা- ৩৮)। সকল ধর্মেই অপচয় ও ভোগ-বিলাসিতার বিরুদ্ধে নির্দেশনা রয়েছে। ঈসা (আ.) বলেন, “তোমাদের শরীরটা বানাও ঘোড়ার মতো আর এতেই তোমাদের নিরাপত্তা। কারণ ঘোড়ার আহার খুব পরিমিত কিন্তু শ্রম অপরিমিত।” তিনি আরও বলেন, “সঞ্চয় যত বাড়ে আগ্রহ ততই বেড়ে যায়। অতএব একটি পোশাকই বিধেয় গণ্য করো, টাকার ব্যাগটি দূরে নিক্ষেপ করো, থলিয়াটা বাদ দাও, পায়ে চপ্পল নেই বলে ভাবতে বসো না- হায় আমাদের কী হবে? বরং লেগে যাও আল্লাহর ইচ্ছা পূরণের কাজে।” (বার্নাবাসের বাইবেল, অধ্যায়- ২৫)।
সনাতন ধর্মে একটি শাস্ত্রই আছে আয়ুর্বেদ। সেখানে পরিমিত খাবার গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ ও খাদ্য অপচয়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যোগ ব্যায়াম ও ব্রহ্মচার্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘অপরিগ্রহ’। দেহরক্ষার প্রয়োজন ব্যতীত অতিরিক্ত কোন বস্তুর আরাধনায় (ভোগবিলাসিতায়) নিরত না থাকার নাম ‘অপরিগ্রহ’। শ্রীরামকৃষ্ণ পাঁকাল মাছের উদাহরন দিয়ে বলেছেন “সংসারে বাস করবে পাঁকাল মাছের মতো, গায়ে কাদা লাগবে না। সংসারের ভোগ বিলাস যেন আচ্ছন্ন না করে।”
এই বিষয়গুলি যখন মানুষ মেনে চলবে তখন খদ্য ঘাটতি অনেকাংশেই কমে যাবে। মানুষ নিজে অল্প আহার করে অন্যকে অন্ন দানের চেষ্টা করবে।
সম্পদ যত বেশি সঞ্চালিত হয় সামষ্টিক অর্থনীতি তত চাঙ্গা হয় আর সম্পদ যত বেশি পুঞ্জীভূত হবে সামষ্টিক অর্থনীতি ততই ভেঙ্গে পড়বে, বৃহত্তর জনসাধারণ বঞ্চিত হবে। বর্তমানে সম্পদকে সঞ্চালিত করার পন্থা হিসাবে সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থাকে গ্রহণ করা হলেও এর ফলে মূলত সম্পদ পুঞ্জীভূতই হয়। সম্পদ দ্রুত থেকে দ্রুততর সঞ্চালনের সর্বোত্তম পন্থা হলো দান। প্রতিটা ধর্মে এই দানের ব্যাপারে অত্যধিক জোর দেওয়া হয়েছে। সম্পদ পুঞ্জীভূত করকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ পাক মো’মেনের সংজ্ঞার মধ্যেই বলেছেন, “মো’মেন শুধুমাত্র তারা যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে, পরে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না, সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে অর্থাৎ মানুষের কল্যাণে সম্পদ ও জীবন ব্যয় করে সেই সত্যনিষ্ঠ।” (সুরা হুজরাত- ১৫)। দান করার জন্য আল্লাহ সরাসরি হুকুম দিয়েছেন (সুরা নাহল- ৯০), যার মাধ্যমে দান করা মো’মেনের জন্য ফরদ হয়ে যায়। রসুলাল্লাহ দানের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দ্ব্যার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, “আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি দান কর, আমি তোমাকে দান করব [আবু হুরায়রাহ (রা:) থেকে বোখারী ও মুসলিম]।” হাদীসে আরও উল্লেখিত যে, হাশরের মাঠে দান মো’মেনের জন্য ছায়াস্বরূপ হবে। অন্যান্য ধর্মেও দানের ব্যাপারে অনেক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মহাভারতে বলা হয়েছে, “দানই শুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়। দান করলে আত্মা বিশুদ্ধ হয়ে যায়।” দানের বিষয়ে ঈসা (আ.) বলেছেন, “অর্থলিপ্সাকে দান-খয়রাতের প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করা বাঞ্ছনীয়, যা অন্যায়ভাবে জমা করা হয়েছে তা ন্যায়্যভাবে বিলিয়ে দেওয়া দরকার। আর তার লক্ষ রাখা উচিত যে তার দক্ষিণ হস্ত যা দান করছে তার বাম হস্ত যেন তা টের না পায়। কারণ কপট লোকেরা চায়, দুনিয়া দেখুক ও প্রশংসা করুক যে তারা দান-খয়রাত করছে।” (বার্নাবাসের বাইবেল, অধ্যায়-১২৫)।
মানুষকে যদি ধর্ম দ্বারা উদ্বুদ্ধ করা যায় তখন অর্থ-বিত্তশালী লোকজন নিজেদের অর্থের একটা বিরাট অংশ দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেবে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি এমনভাবে উপচে পড়বে যে মানুষের আর অভাব থাকবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলাল্লাহ (সা.) কে এ কথা বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তৃপ্তিসহকারে পেট পুরে ভক্ষণ করে, আর তারই পার্শ্বে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে, সে ঈমানদার নয়। (বাইহাকী)। এছাড়াও প্রতিটা মানুষের মধ্যে যদি ধর্মের এই চেতনাটি জাগ্রত করা যায় যে নিজের উদরপূর্তি করলেই হবে না, অন্যের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ই মানুষের জীবনের স্বার্থকতা তবে কোনো অর্থনীতিক মন্দাই আমাদের কিছু করতে পারবে না। একটি উদাহরণ দেওয়া যায়- ধরি একশ’ জন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১ কেজি চাউলের ভাত খায়, এখন সঙ্কট জেনে তারা প্রত্যেকে অন্যের জন্য ২০০ গ্রাম চাউল উঠিয়ে রাখলো, এতে কিন্তু শারীরিকভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবার কথা নয়। এর ফলে প্রতি একশ’ জন মানুষের নিকট থেকে ২০ কেজি চাউল উদ্বৃত্ত হয়। এই ২০ কেজি আবার বিশ জনকে ভাগ করে দিলে তারাও ২০০ গ্রাম করে রেখে দিলে পুনরায় ৪ কেজি চাউল উদ্বৃত্ত থাকবে। এভাবে যে কোনো মন্দাই ধর্মবিশ্বাস দ্বারা মোকাবেলা করা সম্ভব। তাই আসুন ধর্মবিশ্বাসকে আর ভুল খাতে ব্যবহৃত হতে না দিয়ে দেশ জাতির উন্নয়নে ব্যবহার করি, যে কোনো সমস্যাকে রুখে দিই, ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনের কল্যাণ সাধন করি। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ বস্তুবাদী সভ্যতার প্রভাবে মানুষগুলি নিতান্তই আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর পশুতে পরিণত হয়েছে। এখন মানুষকে যদি তার ধর্মবিশ্বাস দ্বারা উদ্বুদ্ধ করা যায় তবে এই জাতীয় সঙ্কট থেকে আমরা অন্তত রেহাই পাব, ফলে অন্যরাও আমাদের দেখা-দেখি এ থেকে পত্রিাণের পথ পাবে।

গল্প নয়, সত্যি সত্যের জয় ও মিথ্যার বিনাশ


তাহের মারুফ :
তায়েফ থেকে ফিরে আসা, তাদের রুঢ় ও অমানবিক আচরণ এবং আবু তালিব ও আম্মা খাদিজার মৃত্যুর পর কুরাইশের অত্যাচার বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। এতে রসুল (সা.) এর অন্তরে একাধিক চিন্তা একত্রিত হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে শোকাহত ও দুঃখে কাতর নবীর সান্ত্বনা আসে। নবুওয়াতের ১০ম সালে রজবের ২৭ তারিখের রাতে তিনি যখন নিদ্রারত ছিলেন, জিবরাঈল (আ.) বুরাক নামক বাহন নিয়ে আসেন। বোরাক ঘোড়া সদৃশ এক জন্তু যার দুটি দ্রুতমান পাখা আছে বিদ্যুতের ন্যায়। রসুলকে (সা.) তাতে আরোহণ করানো হয় এবং জিবরাঈল তাঁকে ফিলিস্তীনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথমে নিয়ে যান। অতঃপর সেখান থেকে আসামান পর্যন্ত নিয়ে যান। এ ভ্রমণে তিনি পালনকর্তার বড় বড় নিদর্শন পরিদর্শন করেন। আসমানেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়। তিনি একই রাত্রে তুষ্ট মন ও সুদৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে মক্কায় প্রত্যাগমন করেন। ভোর বেলায় কাবা শরিফে গিয়ে তিনি লোকদেরকে একথা শুনালে কাফেরদের মিথ্যার অভিযোগ ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ আরোপ বেড়ে যায়। উপস্থিত কয়েকজন লোক তাঁকে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিবরণ দিতে বলে। মূলত উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে অপারগ ও অক্ষম প্রমাণিত করা। তিনি তন্ন তন্ন করে সব কিছু বলতে লাগলেন। কাফেররা এতে ক্ষান্ত না হয়ে বলে, আমরা আর একটি প্রমাণ চাই। রসুল (সা.) বললেন, আমি পথে মক্কাগামী একটি কাফেলার সাক্ষাৎ পাই এবং তিনি কাফেলার বিস্তারিত বিবরণসহ উটের সংখ্যা ও আগমনের সময়ও বলে দিলেন। রসুল (সা.) সত্যই বলেছেন কিন্তু কাফেররা হটকারিতা, কুফর ও সত্যকে অস্বীকার করার দরুণ ভ্রান্ত রয়ে গেল। সকাল বেলায় জিবরাঈল (আ.) এসে রসুলকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পদ্ধতি ও সময়সূচি শিখিয়ে দিলেন। ইতঃপূর্বে নামাজ শুধু সকাল বেলায় দু’রাকাত ও বিকেল বেলায় দু’রাকাত ছিলো। কুরাইশরা সত্য অস্বীকার করতে থাকায় এ দিনগুলোতে তিনি মক্কায় আগমণকারী ব্যক্তিদের মাঝে দাওয়াতী তৎপরতা চালাতে লাগলেন। তিনি তাদের অবস্থান স্থলে মিলিত হয়ে দাওয়াত পেশ করতেন এবং তার সুন্দর ব্যাখ্যা দিতেন। আবু লাহাব তাঁর পিছনে তো লেগেই থাকতো। সে লোকদেরকে তাঁর থেকে ও তাঁর দাওয়াত থেকে সতর্ক থাকতে বলতো। এক বার ইয়াসরিব থেকে আগত এক দলকে ইসলামের আহ্বান জানালে তাঁরা মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং তাঁর অনুসরণ ও তাঁর প্রতি ঈমান আনতে ঐক্যবদ্ধ হয়। ইয়াসরিববাসী ইহুদিদের কাছে শুনতো যে অদূর ভবিষ্যতে এক নবী প্রেরিত হবেন। তাঁর আবির্ভাবের যুগ নিকটে এসে গেছে। তাদেরকে যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত দেন, তাঁরা বুঝতে পারলো যে তিনি সেই নবী যার কথা ইহুদিরা বলেছে। তাঁরা সত্ত্বর ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে এবং বলে ইহুদিরা যেন আমাদের অগ্রগামী না হয়। তাঁরা ছিল ৬ জন, পরবর্তী বছর ১২ জন আসে। তাদেরকে রসুল (সা.) মৌলিক শিক্ষা দেন। প্রত্যাবর্তনের সময় তাদের সাথে তিনি মুসআব বিন উমাইরকে (রা.) কোর’আন ও দীনের বিধানাবলী শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠান। মুসআব (রা.) মদিনায় বিরাট প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এক বছর পর তিনি যখন মদিনায় আসেন, তখন তাঁর সাথে ৭২ জন পুরুষ ও দু’জন মহিলা ছিল। রসুল (সা.) তাদের সাথে মিলিত হন এবং তাঁরা দ্বীনের সহযোগিতা ও এর প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। অতঃপর তাঁরা মদিনায় ফিরে যান। এরই ধারাবাহিকতায় কিছুকাল পরে রসুলাল্লাহ ও তাঁর আসহাবগণ মদীনায় হেযরত করেন এবং ইসলামের নবযুগের সূচনা করেন।
শিক্ষা: দৃষ্টিহীন, যুক্তিহীনভাবে যারা সত্যের বিরোধিতা করতে থাকে তাদের সামনে যতবড় প্রমাণই উপস্থিত করা হোক না কেন তারা কখনো সত্য গ্রহণ করবে না। কিন্তু এতে সত্যের পক্ষাবলম্বনকারীদের দুশ্চিন্তা করার কোনোই কারণ নেই, কারণ শেষ বিজয় সত্যেরই হয়। সত্য যখন উপস্থিত হয় তখন মিথ্যাকে বিতাড়িত হতেই হয়।

আকিদা সঠিক না হলে ঈমান অর্থহীন -মো. আলী হোসেন

আকিদা সঠিক না হলে ঈমান অর্থহীন -মো. আলী হোসেন


এ বিষয়ে সমস্ত আলেম ও ফকিহগণ একমত যে, আকিদা সঠিক না হলে ঈমানের কোনো দাম নেই। যে জিনিসটি সঠিক না হলে ঈমানের কোনো দাম নেই- সেই জিনিসটি অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতসহ সকল ইবাদতের মূল হচ্ছে ঈমান। কিসের ওপর ঈমান? আল্লাহর, তাঁর রসুলদের, মালায়েকদের, হাশরের দিনের বিচারের, জান্নাত, জাহান্নাম, তকদীর ইত্যাদির ওপর ঈমান। এই ঈমান অর্থহীন হয়ে গেলে স্বভাবতঃই এই নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত এবং অন্যান্য সমস্ত রকমের ইবাদতও অর্থহীন। যে জিনিস সঠিক না হলে ঈমান এবং ঈমান ভিত্তিক সমস্ত ইবাদত অর্থহীন সেই মহাগুরুত্বপূর্ণ আকিদা কী?
আকিদা হচ্ছে কোনো জিনিস বা ব্যাপার সম্বন্ধে সঠিক ও সম্যক ধারণা অর্থাৎ ঈড়সঢ়ৎবযবহংরাব পড়হপবঢ়ঃ। কোনো জিনিস বা ব্যাপার, তা সে যে কোনো জিনিস হোক না কেন, সেটা দিয়ে কি হয়, সেটার উদ্দেশ্য কী সে সম্বন্ধে সম্যক ধারণা বা ঈড়সঢ়ৎবযবহংরাব পড়হপবঢ়ঃ হচ্ছে আকিদা। যে কোনো জিনিস বা ব্যাপার সম্বন্ধে এই ধারণা পূর্ণ ও সঠিক না হলে সেই জিনিসটি অর্থহীন। আল্লাহ তাঁর রসুলদের (আ.) মাধ্যমে মানবজাতিকে দীন অর্থাৎ জীবন-ব্যবস্থা দিয়েছেন। তিনি কি কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই এই দীন দিয়েছেন? অবশ্যই নয়। নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য আছে। যদি আমরা সেই উদ্দেশ্য না বুঝি বা যদি সেই উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভুল ধারণা করি, তবে ঐ দীন অর্থহীন হয়ে যাবে। এ জন্যই ফকিহরা, ইমামরা সকলেই একমত যে আকিদা অর্থাৎ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ধারণা সঠিক না হলে ঈমান ও সমস্ত ইবাদত নিষ্ফল।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি। কেউ আপনাকে একটি মটর গাড়ি উপহার দিলেন। মনে করুন এই মটর গাড়িটি ইসলাম- আল্লাহ মানব জাতিকে যা উপহার দিয়েছেন। যিনি গাড়িটি উপহার দিলেন তিনি ঐ সঙ্গে গাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ কেমন করে করতে হবে সেই নিয়মাবলীর একটি বইও দিলেন, যাকে বলা হয় গধরহঃবহধহপব ইড়ড়শ। মনে করুন এই বই কোর’আন ও সহীহ হাদিস। গাড়ির উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য হচ্ছে ওটাতে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া। এটাই হচ্ছে গাড়িটির আসল উদ্দেশ্য। ওটাকে তৈরিই করা হয়েছে ঐ উদ্দেশ্যে। কিন্তু ঐ সঙ্গে আরামে বসার জন্য তার ভিতরে গদীর আসন তৈরি করা হয়েছে, খবর, সঙ্গীত শোনার জন্য রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার লাগনো হয়েছে, গাড়িটিকে সুন্দর দেখাবার জন্য চকচকে রং করা হয়েছে। গাড়িটির সঙ্গে যে গধরহঃবহধহপব বই আপনাকে দেয়া হয়েছে তাতে বলা আছে গাড়িটিতে কোন্ ধরনের পেট্রোল দিতে হবে, কত নম্বর মবিল দিতে হবে। কোথায় কোথায় চর্বি (এৎবধংব) দিতে হবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয় দেখতেও যেন গাড়িটি সুন্দর হয় সেজন্য কোথাও রং খারাপ হয়ে গেলে কেমন রং কেমন ভাবে লাগালে গাড়ি সুন্দর দেখাবে তাও সব কিছু আছে। ঐ গধরহঃবহধহপব বইয়ে এত সব কিছু লেখা থাকলেও মূল সত্য হচ্ছে এই যে ঐ গাড়ি তৈরির উদ্দেশ্য যে ওটা আপনাকে আপনার প্রয়োজনীয় গন্তব্যস্থানে নিয়ে যাবে। বাকি সব ঐ উদ্দেশ্যের পরিপূরক। এখন আপনি যদি না জানেন ঐ গাড়িটি দিয়ে কী হয়, ওটাকে কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে তবে আপনাকে ঐ গাড়িটি উপহার দেয়া নিষ্ফল, অর্থহীন। ঐ গাড়িটির উদ্দেশ্য আপনাকে প্রয়োজন মোতাবেক ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর নিয়ে যাওয়া। আপনি যদি সেটাই না বোঝেন তবে আপনি কী করবেন? আরামের গদি দেখে ভাববেন এই গাড়িটিকে তৈরি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই গদিতে বসে আরাম করা। কিম্বা ভাববেন এটা তৈরির উদ্দেশ্য হচ্ছে রেডিও শোনা, ক্যাসেটে সঙ্গীত শোনা। আর তাই মনে করে আপনি গাড়িটির আরামের সিটে বসে রেডিও, ক্যাসেট বাজাবেন।
এই হলে আপনার আকিদার ভুল হলো। আপনাকে গাড়িটি উপহার দেয়া অর্থহীন হলো কারণ ওটার আসল উদ্দেশ্যই আপনি বুঝলেন না। আপনি যদি গাড়ির গধরহঃবহধহপব বই দেখে দেখে অতি সতর্কতার সাথে যথাস্থানে চর্বি লাগান, মবিল দেন, চাকায় পাম্প দেন, গাড়ির ট্যাংকে তেল দেন, গাড়ির রং পালিশ করেন, তবুও সবই অর্থহীন যদি আপনি না জানেন যে গাড়িটির আসল উদ্দেশ্য কী। অর্থহীনতা ছাড়াও আরও একটি ব্যাপার হবে। সেটা হলো আপনার অগ্রাধিকারের (চৎরড়ৎরঃু) ধারণাও ভুল হয়ে যাবে। তখন আপনার কাছে গাড়ির ইঞ্জিনের চেয়েও প্রয়োজনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে গাড়ির রেডিও, ক্যাসেট, গাড়ির রং ইত্যাদি। অর্থাৎ অগ্রাধিকার ওলট-পালট হয়ে গিয়ে অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপার হয়ে যাবে অতি সামান্য বা একেবারে বাদ যাবে আর অপ্রয়োজনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে মহা প্রয়োজনীয়। এ জন্যই সমস্ত আলেম, ফকিহ, ইমামরা একমত হয়েই বলেছেন যে আকিদা অর্থাৎ কোনো ব্যাপার বা জিনিস সম্বন্ধে পূর্ণ ধারণা না হলে বা ওটার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভুল ধারণা হলে সম্পূর্ণ জিনিসটাই অর্থহীন- ঈমান এবং ঈমান ভিত্তিক অন্যান্য আমলও অর্থহীন।
আল্লাহ আমাদের ইসলাম বলে যে দীন, জীবন-বিধান দিয়েছেন সেটার উদ্দেশ্য কী, সেই আকিদা আমাদের বহু পূর্বেই বিকৃত হয়ে ঐ গাড়ির মালিকের মতো হয়ে গেছে- যে গাড়ির উদ্দেশ্যই জানে না। ঐ মালিকের মতো আমরা গধরহঃবহধহপব বই, অর্থাৎ কোর’আন-হাদিস দেখে দেখে অতি সতর্কতার সাথে গাড়ির পরিচর্যা করছি- কিন্তু ওটাতে চড়ি না, ওটা চালিয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় গন্তব্যস্থানে যাই না, গ্যারেজে রেখে দিয়েছি- কারণ ওটার আসল উদ্দেশ্যই আমরা জানি না বা যেটা মনে করি তা ভুল বা বিকৃত। কাজেই আমাদের অগ্রাধিকারও (চৎরড়ৎরঃু) ওলট-পালট হয়ে গেছে। প্রকৃত উদ্দেশ্যই অর্থাৎ তওহীদ ও তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমরা ত্যাগ করেছি, কিন্তু গাড়ির রং, পালিশ, অর্থাৎ দাড়ি, টুপি, পাগড়ী, আলখাল্লা সম্বন্ধে আমরা অতি সতর্ক। আকিদার বিকৃতি ও তার ফলে অগ্রাধিকারের ওলট-পালটের পরিণাম এই হয়েছে যে আল্লাহ আমাদের ত্যাগ করেছেন, আমরা তাঁর গযবের ও লানতের পাত্রে পরিণত হয়েছি। আমরা আজ পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জাতিতে পরিণত হয়েছি। অন্য সমস্ত জাতি, পৃথিবীর সর্বত্র আমাদের গণহত্যা করছে, আমাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, আমাদের পর্দানশিন মা-বোনদের ধর্ষণ করছে, হাজারে হাজারে আমাদের মসজিদ ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক হানাহানি, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, অনৈক্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদির মধ্যে ডুবে আছি অর্থাৎ অশান্তির মধ্যে আছি। অশান্তির মধ্যে আছি মানেই ইসলামে (ইসলাম শব্দের আক্ষরিক অর্থই শান্তি) নেই

ঋগবেদে সুরা আর রাহমানের প্রতিধ্বনি

ঋগবেদে সুরা আর রাহমানের প্রতিধ্বনি



রাকীব আল হাসান:
——————
ঋগবেদের কিছু কিছু শ্লোকের বর্ণনা নিুরূপঃ তিনি কোন পরম ঈশ্বর যার উদ্দেশ্যে আমি পূজা আর্চনা করব? তিনি মহান ঈশ্বর যিনি আমাকে দিয়েছেন জীবন। যিনি দিয়েছেন শক্তি সামর্থ। ঈশ্বরের নির্দেশ সকল উজ্জ্বল দেবতাবৃন্দ অবনত মস্তকে পালন করেন। ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি হলো অমরত্ব। তার ছায়া হলো মৃত্যু।
একচ্ছত্র প্রভু
তিনি কোন ঈশ্বর, যারা পূজা-আর্চনা আমি করব? তিনি ঐ ঈশ্বর যিনি নিজ শক্তি বলে সকল নিঃশ্বাস বিশিষ্ট প্রাণী ও আলোকিত বিশ্বের একচ্ছত্র মালিক বা প্রভু। তিনি বিশ্বের মানব এবং পশু তথা সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।
তিনি কোন মহান ঈশ্বর যারা পূজা-আর্চনা আমি করব? তিনি সেই পরম ঈশ্বর যার শক্তিতে সৃষ্টি হয়েছে তুষার ধবল পর্বতাবলী, সমুদ্র, মহাসমুদ্র, সুদীর্ঘ (রস) নদী। সকল দিক দিগন্ত সে মহা প্রভুর দুটি বাহুর মতো।
ভূমণ্ডল
তিনি কোন ঈশ্বর, যার পূজা আর্চনা আমি করব? তিনি সে ঈশ্বর যারা ইচ্ছায় এক মুহূর্তে সৃষ্টি হয়েছে মহাকাশ মণ্ডল, ধরণীপুঞ্জ এবং তার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল। তিনি নভোমণ্ডলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন পরিমিত বায়মণ্ডল।
নভোমণ্ডল
তিনি কোন ঈশ্বর যার উদ্দেশ্যে আমরা পূজা আর্চনা করব? তিনি সে ঈশ্বর যার ইচ্ছায় নভোমণ্ডল ও পৃথিবী দৃঢ়ভাবে আছে। ঊর্ধ্ব দিকে তাকিয়ে আছে ভীত প্রকম্পিত হৃদয়ে। যে নভোমণ্ডলে সূর্য অধিকতর কিরণ বিতরণ করে।
হিরণ্যগর্ভ
তিনি কোন ঈশ্বর যার উদ্দেশ্যে আমরা পূজা-আর্চনা করব? তিনি সে মহান ঈশ্বর যার ইচ্ছায় মহানদীসমূহ বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়। হিরণ্যগর্ভ দৃঢ়ভাবে স্থাপিত-যা থেকে বিকশিত হয় আলোকমালা এবং তা থেকে হিঃসৃত হয় দেবদেবীদের শ্বাস-প্রশ্বাস।
প্রাকৃতিক শক্তি দেবতা
তিনি কোন পরম ঈশ্বর যার উদ্দেশ্যে আমরা পূজা আর্চনা করব? তিনি সে পরম ঈশ্বর যিনি স্বীয় শক্তি বলে সলীল সমুদ্র থেকে দৃষ্টিপাত করেন এবং সে সলীল মালায় আছে জীবানু শক্তি এবং যা থেকে সৃষ্টি হয় আলো। তিনি সে পরম ঈশ্বর যিনি সকল দেবদেবীর উপরে একমাত্র পরম ঈশ্বর।
সুবিচারক
তিনি কোন পরম ঈশ্বর যার উদ্দেশ্যে আমরা পূজা আর্চনা করব? তিনি সেই ঈশ্বার যার থেকে আমাদের কোনো দুঃখ এবং ক্ষতি আসবে না। যিনি সৃজন করেছেন বিশ্ব চরাচর। তিনি সুবিচারক, যিনি সৃষ্টি করেছেন স্বর্গ মর্ত। যিনি সৃজন করেছে উজ্জ্বল আকাশ এবং প্রবল জল প্রবাহ।
ঋগবেদের উপরোক্ত শ্লোক সমূহে (১০ম অধ্যায়, শ্লোক ১২১ থেকে) আল-কুরআনুল কারিমের সুরা আর-রহমানের একটি বাক্যের যে বর্ণনাভঙ্গি “ফাবে আইয়ে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” (তোমাদের প্রভুর কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?” আয়াতের বর্ণনা ভঙ্গির অনুরণ এবং প্রতিফলন রয়েছে। এভাবে সম্পূর্ণ বেদের মধ্যে বহু শ্লোক রয়েছে যা কোর’আনের অনেক আয়াতের সাথে মিলে যায়। এভাবে মূল মূল ধর্মগ্রন্থগুলো যারাই গবেষণা করেছেন তারা এটা স্বীকার করেছেন যে এই ধর্মগ্রন্থগুলো একই স্রষ্টা থেকে আগত। কেবল স্থান, কাল ও পরিস্থিতির কারণে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। মৌলিক বিষয়গুলো একই। ঋগবেদের মধ্যে বলা হয়েছে, “ঈশ্বর একম ইভা দ্বিতীয়ম।” অর্থাৎ “ঈশ্বর এক, তার কোনো দ্বিতীয় নেই।” এভাবে সকল ধর্মেই আল্লাহর একত্ববাদের কথা, ওয়াহদানিয়াতের কথা বলা হয়েছে। এ নিদর্শনগুলিই প্রমাণ করে যে উল্লেখযোগ্য সকল ধর্মই এক আল্লাহর নিকট থেকে আগত, ধর্মগ্রন্থের বাণী সমূহ মহান আল্লাহরই বাণী। কাজেই সত্য যেখানেই থাক তা আমাদের মান্য করা উচিত। আমরা কেবল অজ্ঞতার কারণে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষবাষ্প ছড়াই, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করি। অথচ আমরা যদি বুঝতাম যে আমারেদ মাঝে আসলে কোনো বিরোধ নেই, বরং আমাদের সকলের গন্তব্য একই দিকে, সমাজে শান্তি ও আখেরাতে তথা পরজনমে মুক্তি তবে আমরা একই সাথে পথ চলতে পারতাম। আল্লাহ আমাদের সেই তওফিক দিন। আমিন।

Friday, December 4, 2015

কে হবে সেই আলোর দিশারী?

কে হবে সেই আলোর দিশারী?


মানব সমাজ যখন অন্যায়, অশান্তি, অবিচারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে, সমাজে যখন ধনী-গরীবের ব্যবধান ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়, তখন কিছু মহানব্যক্তি সমাজের মানুষকে এই অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-ত্রাসন থেকে মুক্তি দিয়ে একটি সুখময়, শান্তিময় জীবন উপহার দিতে আবির্ভূত হন। এই মহান ব্যক্তিত্বরা ইতিহাসে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। আর তাদের সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের নাম হয়েছে ‘বিপ্লব’। ‘বিপ্লব’ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি স্বপ্ন সমষ্টি। বিপ্লবীরা যুগে যুগে এসেছেন সময়ের দাবি মেটাতে। সমাজের স্বার্থরক্ষায় তারা জীবন-সম্পদ সব কিছু ত্যাগ করেছেন। এই চূড়ান্ত ত্যাগের বিনিময়ে তারা পার্থিব জীবনে হয়তো কিছুই লাভ কোরতে পারেন নি, কিন্তু মানুষের মনিকোঠায় থেকেছেন চির অমর হয়ে। সমাজের সকল শ্রেণি থেকেই উঠে এসেছেন অন্যায়ের সাথে আপোষহীন এই বিপ্লবীরা। তারা মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন কল্যাণের পথ।
আজ দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সর্বত্রই যখন হানাহানি-মারামারি, অন্যায়-অত্যাচার, ধনী-গরিবের বৈষম্য বিদ্যমান তখন ঐ বিপ্লবীদের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু কে হবে সেই বিপ্লবের অগ্রপথিক, অন্ধকারের পথ প্রদর্শক? আজ সমাজে শিক্ষিত বোলতে যে শ্রেণিটি আছে তারা চরম সুবিধাভোগী। এদের কাছে কোরবানি বা ত্যাগ একটি অবোধ্য বিষয়। এরা সমাজের জন্য যা করেন বলে মুখে প্রচার করে থাকেন তার বেশিরভাগ মূলত আত্মস্বার্থেই করেন। সমাজের মানুষের জন্য এরা যতটুকু করেন সেটুকু ব্যবসায়ে পুঁজি খাটানোর মতো। পরবর্তীতে সুদসহ আসল তুলে নেয়াই এদের প্রধান লক্ষ্য। লাভের গুঁড়ের পিঁপড়ার ভাগও এরা ছাড়েন না। এই সমাজের শিক্ষকের কাছে ছাত্র নিরাপদ নয়, ছাত্রের কাছে শিক্ষক নিরাপদ নয়। ছাত্র নিজের স্বার্থ আদায়ে শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে আবার শিক্ষক নিজের স্বার্থ আদায়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেয়। রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি অধিকাংশ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষকদের সংস্কৃতিতে পরিণত হোয়েছে, শিক্ষাদান-শিক্ষাগ্রহণ সবই এখানে গৌণ। আর যারা এগুলোর বাইরে আছেন তাদের জগতও শুধুমাত্র নিজেদের নিয়ে। সমাজের স্বার্থে, মানবতার স্বার্থে বিপ্লব করা এদের কাছে অকল্পনীয় ব্যাপার। কোনভাবে খেয়ে পরে জীবনটা পার করে দিতে পারলেই এরা তৃপ্ত। সমাজের অধিকাংশ চিকিৎসকদের কাছে রোগীর জীবনের চেয়ে নিজেদের অর্থোপার্জনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে মাসে একবার হাজিরা দিয়েই এরা সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এদের বিবেক সমুদ্রের মতো বিশাল তাই ছোট-খাট আত্ম-গ্লানি এদের কাবু করতে পারেনা! এছাড়াও বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদসহ সুশীল সমাজের সকল গর্বিত প্রতিনিধিরা সমাজের মানুষকে তাদের দাবার গুটি হিসেবেই বেশি ব্যবহার করেন। তার পেছনে মতলব থাকে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার, কিন্তু উপরের মোড়কটা থাকে জনস্বার্থ, জনকল্যাণ ইত্যাদি। সাধারণ মানুষ মুক্তির আশায় তাদের দ্বারস্থ হয় কিন্তু বার বার তারা শুধু পরাজিতই হয়, প্রতারিতই হয়। কিন্তু পরাজিত হলেও এরা হাল ছাড়ে না, কারণ তারা নিরুপায়। উপায় খুঁজতে গিয়ে মানুষ বার বার জুয়া খেলে। ঘোর অন্ধকারে পাগলের মতো হাঁতড়ে বেড়ায় আলোর দিশা। কিন্তু কে হবে সেই আলোর দিশারী যে নিজের স্বার্থ পায়ে ঠেলে জাতিকে আলোর পথ দেখাবেন? এতো সময় কি কারো আছে? কিন্তু তিনি আসবেনই, তাঁকে আসতেই হবে। কারণ এটাই এখন যুগের দাবী, এই সময়ের দাবী। তিনি ঠিকই হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালার মতো বিপ্লবের সুর নিয়ে আবির্ভূত হবেন। কিন্তু আমরা কি তৈরি আছি তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য?

আর ধর্ম নিয়ে ব্যবসা নয়, আসুন ধর্মবিশ্বাসকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করি

যে কোনো জিনিসেরই দু রকম ব্যবহার হতে পারে – কল্যাণকর অথবা অকল্যাণকর। ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণার্থে। অথচ এই ধর্মকেও মানুষের অকল্যাণে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা করছে বিভিন্ন শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ীরা। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই ধর্মবিশ্বাসী। মানব ইতিহাসের বড় বড় সহিংস কর্মকাণ্ডের পেছনে ধর্মকে ইস্যু করা হয়েছে। ধর্মীয় দাঙ্গায় কোটি কোটি মানুষ প্রাণ দিয়েছে, উদ্বাস্তু, সর্বহারা হয়েছে। আজ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে সহিংস রাজনীতিক কর্মসূচি ও জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, মানুষের ঈমানকে ভুল পথে পরিচালিত করে রাজনীতি ও ব্যবসার পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। নামায পড়ানো, ওয়াজ করা থেকে শুরু করে ধর্মের কোনো কাজ এমনকি মুর্দা দাফনও এখন টাকা ছাড়া হয় না। পরকালের ওসিলা সেজে বহু মানুষ অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। এ সবই হচ্ছে ধর্মের অপব্যবহার; তাহলে ধর্মের সঠিক ব্যবহার কোনটি? যে কোনো বস্তুকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে আগে সেটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকতে হয়। ধর্মের সঠিক ধারণা থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রাখার কারণেই আজ ধর্মের কল্যাণ থেকে মানবজাতি বঞ্চিত হচ্ছে। যেমন ধর্মব্যবসা যে হারাম, ধর্মীয় কাজের বিনিময়ে পার্থিব মূল্য গ্রহণ করাকে আল্লাহ আগুন খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন (সুরা বাকারা ১৭৪), এই সত্যটি গোপন করা হয়। ফলে ধার্মিকগণ মাদকব্যবসায়ীকে ঘৃণা করলেও ধর্মব্যবসায়ীকে তাজিম করেন। এই সুযোগে ধর্মব্যবসায়ীরা মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত দুটোকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ধর্মকে ভারসাম্যহীন করে সম্পূর্ণ আখেরাতকেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে, যেন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানে ধর্মের কোনো ভূমিকাই নেই। অথচ যে ধর্ম মানুষকে ইহজগতে শান্তি দিতে সক্ষম নয়, সে ধর্ম তাকে পরকালেও জান্নাত দিতে পারবে না। ধর্ম কী, কোন এবাদতের জন্য আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, কোন কাজের বিনিময়ে তিনি জান্নাত দেবেন, আল্লাহর নবী-রসুলগণ কী কাজে জীবন ব্যয় করে গেছেন – এ প্রশ্নগুলো করা হলে আজ হাজার হাজার রকমের উত্তর পাওয়া যাবে। আমরা যদি ধর্মকে আমাদের পার্থিব ও পারলৌকিক মুক্তির পাথেয় করতে চাই তবে এ মৌলিক প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর আমাদের সবাইকে জানতে হবে। ধর্ম কী? ধার্মিক কারা? ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। কোনো বস্তু, প্রাণি বা শক্তি যে বৈশিষ্ট্য বা গুণ ধারণ করে সেটাই হচ্ছে তার ধর্ম। আগুনের ধর্ম পোড়ানো। পোড়ানোর ক্ষমতা হারালে সে তার ধর্ম হারালো। মানুষের ধর্ম কী? মানুষের ধর্ম হচ্ছে মানবতা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্যের দুঃখ-কষ্ট হৃদয়ে অনুভব করে এবং সেটা দূর করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায় সে-ই ধার্মিক। অথচ প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট লেবাস ধারণ করে সুরা কালাম, শাস্ত্র মুখস্থ বলতে পারে, নামায-রোযা, প্রার্থনা করে সে-ই ধার্মিক। এটা সঠিক ধারণা নয়। এবাদত কী? এবাদত হচ্ছে যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেই কাজটি করা। গাড়ি তৈরি হয়েছে পরিবহনের কাজে ব্যবহারের জন্য, এটা করাই গাড়ির এবাদত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে (সুরা বাকারা-৩০)। অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহ যেভাবে সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ রেখেছেন ঠিক সেভাবে এ পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখাই মানুষের এবাদত। ধরুন আপনি গভীর রাত্রে প্রার্থনায় মগ্ন। হঠাৎ পাশের বাড়িতে আগুন লাগলো। আপনি কী করবেন? দৌড়ে যাবেন সাহায্য করতে, নাকি চোখ-কান বন্ধ করে প্রার্থনা চালিয়ে যাবেন। যদি আগুন নেভাতে যান সেটাই হবে আপনার এবাদত। আর যদি ভাবেন- বিপন্ন ব্যক্তি অন্য ধর্মের লোক, তাহলে আপনি ধর্মহীন, আপনার সমস্ত আমলই পণ্ডশ্রম। আজ ধর্মব্যবসায়ীরা মানুষকে কেবল সেগুলোই করতে বলেন যেগুলোতে তাদের স্বার্থ জড়িত। তারা মসজিদে-মাদ্রাসায় দান করতে ওয়াজ করেন, কিন্তু ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, বাসগৃহ ইত্যাদি নির্মাণ অর্থাৎ মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন না। এই আত্মাহীন ধর্মশিক্ষার কারণে নির্যাতিতের হাহাকার, ক্ষুধার্তের ক্রন্দন এ জাতির মহা ধার্মিকদের কানেও প্রবেশ করে না। সেগুলোকে দুনিয়াবি কাজ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পাশবিক মনোবৃত্তি তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। দেশ-জাতি রসাতলে গেলেও তারা নিরাপদে যিকির, তসবিহ, তাহলিল করে যেতে পারলেই খুশি। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি নামায, রোযা, হজ্ব করতে হবে না? হ্যাঁ, অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু উদ্দেশ্য বুঝে। মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মিক শক্তি সৃষ্টির প্রশিক্ষণই হচ্ছে নামায, রোযা, হজ্ব ইত্যাদি। যে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ঘোঁচাতে সংগ্রাম ও ব্যয় করবে না, তার তাহাজ্জুদ হবে ঘুম নষ্ট করা, রোযা হবে না খেয়ে থাকা। আল্লাহর রসুল ও তাঁর সাহাবীরা আজীবন মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাঁদের কাজের ফলে আরবের হানাহানি, রক্তপাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত, অশিক্ষা, কুসংস্কারে নিমজ্জিত একটি জাতি অল্প কিছুদিনের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক ও আর্থিক শক্তিতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল। এমন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে একজন যুবতী অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ অতিক্রম করত, তার মনে কোনো ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা জাগ্রত হতো না। মাসের পর মাস আদালতে কোনো অভিযোগ আসতো না। এই শান্তির নামই এসলাম আর এই শান্তির জন্য কাজ করাই হচ্ছে আল্লাহর এবাদত বা আমল। একটি জাতির ধর্মবিশ্বাস তথা ঈমান তাদেরকে সঠিক পথে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং মানুষের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা যোগাতে পারে। কেননা সব ধর্মেই আছে ঐক্য প্রতিষ্ঠার নির্দেশ এবং জাতির স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার শিক্ষা। বর্তমানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর ভোট দিয়েই জনগণ মনে করে যে তাদের দায়িত্ব শেষ। এ রাষ্ট্রব্যবস্থায় যারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন তারা চোখের সামনে অপরাধ হতে দেখলেও বাধা দেন না, ভাবেন, ‘এগুলো দেখার দায়িত্ব তো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আমি কেন খামাখা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাবো।’ আজকে আমাদের যে জাতীয় সংকট, তা এই আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার ফল, কারণ এই ধর্মহীন ব্যবস্থাকে আমরাই টিকিয়ে রেখেছি। ধর্মবিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় কল্যাণে সম্পৃক্ত না করে এই সংকট থেকে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা এ যামানা এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হেযবুত তওহীদ বলছি, সকল ধর্মের শিক্ষা হচ্ছে, মানুষের কল্যাণের জন্য যারা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে পারে শুধু তারাই পাবে আল্লাহর সান্নিধ্য ও জান্নাত। তাই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর জন্য কাজ করাও ধর্মেরই কাজ। মসজিদ নির্মাণ যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি মানুষের উপকারের জন্য ব্রিজ, কালভার্ট, হাসপাতাল, শিক্ষালয়, বাসগৃহ নির্মাণ করাও এবাদত। পক্ষান্তরে রাস্তাঘাট অবরোধ করা, অন্যায়ভাবে বৃক্ষ কর্তন করা, জাতীয় সম্পদ, মানুষের সম্পদ ধ্বংস করা ধর্মবিরোধী কাজ। যে কোনো যুগে, যে কোনো দেশে জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তাকে যারাই বিনষ্ট করবে তারাই আল্লাহর শত্র“, ইসলামের শত্র“, সকল ধর্মের শত্র“। এদেরকে প্রতিরোধ করা এবাদত। আমরা যদি এই এবাদত থেকে বিরত থাকি, তাহলে পার্থিব জীবনে আরো মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হবো এই নিষ্ক্রীয়তার কারণে পরকালে জান্নাতও হারাবো। এখন বাঁচার একটাই পথ, ধর্মবিশ্বাসী মানুষদেরকে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যদি আমরা সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, নিজেরাই নিজেদের পরিবেশকে নিরাপদ রাখার জন্য অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হই তাহলে আমাদের দেশ থেকে এই অভিশাপ দূর হতে বাধ্য হবে। সহিংসতা, মানুষ হত্যা এখন আমাদের রাজনীতিক সংস্কৃতি। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো দল নয়, দায়ী প্রচলিত সিস্টেম। প্রত্যেক দলের কর্মকাণ্ডই এ জাতি বার বার দেখেছে, ঘুরে ফিরে একই দৃশ্য। এটা সবারই জানা যে, বর্তমানে মানবতার কল্যাণে রাজনীতি করা হয় না, রাজনীতি এখন একটি লাভজনক ব্যবসা বা পেশা। ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্ম বিক্রি করে সংসার চালান, আর এক শ্রেণির রাজনীতিকরা দেশপ্রেম, চেতনা, গণতন্ত্র ইত্যাদি ভাবাদর্শ বিক্রি করে পুঁজিপতিতে পরিণত হন। আজকে যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তার সুযোগ নিতে বহিঃশত্র“ও বসে আছে। ভুললে চলবে না, সরকার ও সরকার বিরোধীদের দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে গিয়ে সিরিয়ায় বিগত দু বছরে নিহত হয়েছে দু লক্ষ মানুষ যাদের অধিকাংশই বেসামরিক জনগণ, নারী ও শিশু। আহত, বাস্তুহারার তো কোনো ইয়ত্তা নেই। সুতরাং জাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব কেবল সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর অর্পণ করে বসে থাকা অযৌক্তিক। কারণ প্রথমত তারা সর্বত্র থাকেন না, দ্বিতীয়ত তারা এই সংকট মোকাবেলার জন্য যে শক্তিপ্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছেন, আমরা মনে করি, তাতে স্থায়ী সমাধান আসবে না। পৃথিবীর কোথাও কেবল জোর করে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব হয় নি, হবেও না। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে জনগণের ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মাত্র গুটি কতক লোকের কারণে ষোল কোটি মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছে, এই ষোল কোটি মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে তাহলে কি ঐ গুটি কয়েক মানুষ তাদের জীবনকে এভাবে বিপন্ন করে তুলতে পারত? কখনোই পারত না। কিন্তু ষোল কোটি মানুষের অনৈক্যের সুযোগেই তারা এই অন্যায় ঘটাতে পারছে। জনগণ নি®কৃয় দর্শকের ভূমিকা নিলে সমাজ থেকে অন্যায়, অপরাধ, স্বার্থবাজদের রাজনীতিক হানাহানি দূর করা কোনোকালেই সম্ভব হবে না। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমরা যদি নাশকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, আমরা যদি জাতীয় সম্পদকে নিজের সম্পদের মত পাহারা দেই, আমরা যদি যে কোনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দুর্জয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রত্যয়ী হই তাহলে আমাদের জীবনকে নিয়ে কেউ আর ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। এবং এই ঐক্য আমাদের দুনিয়ার জীবনকে করবে নিরাপদ ও শান্তিময়, তেমনি এই শান্তি-প্রচেষ্টার বিনিময়ে আমরা আল্লাহর সান্ন্যিধ্য ও পুরস্কার লাভ করব।


[যোগাযোগ: হেযবুত তওহীদ, ০১৭৩০০১৪৩৬১, ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৯৩৩৭৬৭৭২৫, ০১৮৫৩৯৯৩২২২, ০১১৯১৩৬৭১১০, ০১৭৮২১৮৮২৩৭, ০১৫৫৯৩৫৮৬৪৭]

জঙ্গিবাদ নির্মূলের একমাত্র উপায় ধর্মবিশ্বাসের সঠিক প্রয়োগ

জাতীয় প্রেসক্লাবে হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান



জঙ্গিবাদ বা টেরোরিজম বর্তমান বিশ্বের এক করুণ বাস্তবতা। সারা পৃথিবী আজ জঙ্গিবাদ নামক ভয়াবহ অভিশাপের অনলে জ্বলছে। এ মানবসৃষ্ট মহামারি দিনদিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে, ক্রমশই ভয়াবহ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্তে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সম্মিলতভাবে কাজ করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউন্সে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম লিখিত “ধর্মব্যবসায়ী ও পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের যোগফল: জঙ্গিবাদ-উত্তরণের একমাত্র পথ” বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এম.পি।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বইয়ের লেখক ও হেযবুত তওহীদের এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম- এর একটি ভিডিও বক্তব্য চালানো হয়। তিনি বলেন- সমস্ত পৃথিবীতে যখন জঙ্গিবাদ মহামারি আকার ধারণ করেছে, মানবজীবন ক্রমশই দুর্বিসহ হয়ে উঠছে তখন হেযবুত তওহীদ হাজির হয়েছে মুক্তির পথ নিয়ে। আমরা কেন বইটি লিখলাম তা আপনাদের সামনে বলতে চাই। তিনি বলেন- এ দেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তারা আল্লাহ, আল্লাহর রসুল তথা ইসলামকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু তাদের সেই ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে স্বার্থবাদী ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি ভুল পথে পরিচালিত করছে। তারা মানবতার কল্যাণে আসা ধর্মকে মানবতার অকল্যাণের পথে কাজে লাগাচ্ছে। ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপারে সতর্ক করে তিনি বলেন- তিনটি শ্রেণির কথা আমি বিশেষভাবে বলতে চাই যারা মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে ভুল পথে পরিচালিত করে সমাজে হানাহানি, রক্তপাত, অশান্তি সৃষ্টি করছে। প্রথমত জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী। এরা ইসলামের নাম করে মানুষকে সহিংসতার পথে পরিচালিত করছে, সমাজে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয়ত ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুকে ধর্মীয় রূপ দান করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর তৃতীয় শ্রেণিটি হলো ওইসব স্বার্থবাদীরা যারা মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে। এসব কারণে মানবতার কল্যাণে আসা ধর্ম এখন মানবতার জন্য হুমকি হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে। তাই এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক পথে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। মানুষ যদি তাদের প্রকৃত এবাদত কী, জেহাদ কী ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায় তাহলে তারা আর স্বার্থবাদীদের দ্বারা ব্যবহৃত হবে না। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে অবজ্ঞা করার অসারতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন- পশ্চিমা বিশ্ব যুগ যুগ ধরে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে মুছে ফেলতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের ধর্মবিশ্বাস মুছে ফেলার বিষয় নয়। মাথা ব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয় তেমনি ধর্মের অপব্যবহার রোধ করতে ধর্মবিশ্বাস মুছে ফেলাও উপযুক্ত সমাধান হতে পারে না। সমাধান একটাই- মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক পথে প্রবাহিত করা। মানুষকে এ কথা বোঝাতে হবে যে, মানুষের পরম ধর্ম হলো মানবতা। মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হচ্ছে মানুষের আসল এবাদত। সমাজে অশান্তি, অন্যায়, অবিচার, সহিংসতা, হানাহানি ইত্যাদি চলতে দিয়ে যতই নামাজ-রোজা, উপাসনা-প্রার্থনা করা হোক সেগুলো আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। সন্ত্রাস-সহিংসতা করা জেহাদ নয়, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই হচ্ছে আসল জেহাদ। হেযবুত তওহীদের এমাম আরও বলেন- আমরা অবাক হচ্ছি এই কারণে যে, এখনও আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ হয় নি। একটি শ্রেণি এখনও আমাদের বিরুদ্ধে বিবিধ অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আগে অপপ্রচার চালাত ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি। এখন আর তাদের অপপ্রচার মানুষ বিশ্বাস করে না। ইনশা’আল্লাহ কোনো অপপ্রচারই মানবতার কল্যাণে ধর্মব্যবসা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামকে রুদ্ধ করতে পারবে না।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এম.পি আয়োজিত অনুষ্ঠানটিকে মহতী উদ্যোগ আখ্যা দিয়ে তার প্রশংসা করে বলেন- হেযবুত তওহীদ একটি পবিত্র কাজ করছে, মহৎ কাজ করছে। যারা শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন শুধু তাদের জন্য নয় অন্য সকলের জন্যও। হেযবুত তওহীদের মধ্যে আমি সত্য খুঁজে পেয়েছি। হেযবুত তওহীদের সদস্যদের আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাদের নেতৃবৃন্দের সাথে দফায় দফায় কথা হয়েছে, রুফায়দাহ পন্নীর সাথেও কথা হয়েছে। তারা এই প্রতিকূল সময়ে যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বইটিতে যে দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করা হয়েছে তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে তিনি আরও বলেন- ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে জঙ্গিবাদ উস্কে দেওয়া সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জঙ্গিবাদের মূল লক্ষ্য হলো রাজনীতি, এর সাথে ধর্মের কোন সংস্পর্শ আছে বলে আমি মনে করি না। পেট্রোল বোমার আঘাতে অগ্নিদগ্ধ দুই বছরের বাচ্চামেয়ের কথা উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে পরিচিত হওয়ার আগেই পেট্রোল বোমার আঘাতে শিশুটির কচি দেহ কালো হয়ে গেল। মাত্র ২ বছর বয়সে সে এই জঙ্গিবাদের সঙ্গে পরিচিত হল। এটা অমানবিক। একটি আদর্শের বিরুদ্ধে পাল্টা আদর্শ না থাকলে সফলতা আসবে না। সঠিক আদর্শ দিয়েই এই বিকৃত আদর্শকে প্রতিহত করতে হবে। তবে মানুষের নিরাপত্তার জন্য যতটুকু শক্তি প্রয়োগ দরকার তা করার প্রয়োজন রয়েছে।
‘জঙ্গিবাদ: উত্তরণের একমাত্র পথ’ বইটির লেখক হেযবুত তওহীদের এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন- এই বইয়ের লেখক খুব স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন। আফগানিস্তানের জেহাদে মুসলিমদের কোনো লাভ হয় নি, ওটা প্রকৃতপক্ষে জেহাদ ছিল না, ওটা ছিল পরাশক্তি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ উদ্ধারের কৌশলমাত্র। মোসলেম জনগোষ্ঠীকে জেহাদের কথা বলে তাদের ঈমানকে ভুল পথে প্রবাহিত করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল। কথিত ওই জেহাদ থেকে মুসলিমরা সামান্য পরিমাণ লাভবান তো হয়ই নি, উপরন্তু জঙ্গিবাদ নামক অভিশাপ উপহার পেয়েছিল।
তিনি বলেন- আজ তালেবানরা গভীর সংকটে পড়েছে। তাদেরকে একের পর এক ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে। যারা তাদের তৈরি করেছে তাদের হাতেই মরতে হচ্ছে। পাকিস্তানিরাও তাদের একের পর এক ফাঁসি দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান কি এসেছে? আসেনি, বরং দিনদিন পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। পশ্চিমারা ড্রয়িং রুমে বসে চলচ্চিত্র দেখার মতো করে সবকিছু উপভোগ করছে, আর ওদিকে সাধারণ নিরীহ মানুষগুলো যুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে পতিত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে, বাস্তুভিটা হারিয়ে উ™£ান্তের মতো ঘুরছে। এই স্বার্থবাদীদের সম্পর্কে সজাগ হতে হবে, সতর্ক হতে হবে। তাদেরকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করতে পারি না। সবশেষে তিনি মানবতার কল্যাণে হেযবুত তওহীদের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন- আমি যতটুকু জেনেছি, শুনেছি ততটুকু কথার সঙ্গে আমি একমত। ইনশা’আল্লাহ আমরা এখন থেকে এক সঙ্গে কাজ করব। এরপর দৈনিক বজ্রশক্তির সাহিত্য সম্পাদক রিয়াদুল হাসান বলেন- যে কোনো আদর্শ থেকে সম্পাদিত সন্ত্রাসই জঙ্গিবাদ, তা ধর্ম দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়েই করা হোক, আর কথিত গণতন্ত্রের জন্যই করা হোক। আমরা পাঁচ বছর পর পর ভোট দিয়ে একটি সরকার নির্বাচন করেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাই যে, সরকার আমাদেরকে রক্ষা করবে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে, কিন্তু এত বড় দায়িত্ব কি শুধুই সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পালন করতে সক্ষম? এটা তো আমাদের সকলের দায়িত্ব। নিজেরা স্বার্থবাদী হলে কোনোভাবেই এ সমস্যার সমাধান আসবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা প্রতি ইঞ্চি ভূমি পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, যৌক্তিকও নয়। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, এই দায়িত্ব আমাদের সকলের। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন- আপনি অসুস্থ হলে স্বাভাবিকভাবেই আপনার পরিবার-আত্মীয় স্বজন আপনাকে সুস্থ করে তুলতে নিবেদিত হয়, সর্বাত্মকভাবে প্রচেষ্টা চালায়। আজ আমাদের সম্পূর্ণ জাতি অসুস্থ, হানাহানি-সহিংসতা নামক মহামারিতে জর্জরিত। তাহলে জাতিকে বাঁচাবে কে? অবশ্যই আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই দেশ আমাদের মা, আর আমার মা আজ অসুস্থ, তাকে সুস্থ করে তোলা তাই প্রতিটি সন্তানের কর্তব্য, সামাজিক ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই এ দায়িত্ব অবশ্য পালনীয়। জঙ্গিদের প্রসঙ্গে জনাব রিয়াদুল হাসান আরও বলেন- জঙ্গিরা ইসলাম ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত, তাই তাদেরকে বোঝাতে হলে ইসলাম ধর্ম দিয়েই বোঝাতে হবে, কোর’আন-হাদীস, যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে তাদের ভ্রান্ততা পরিষ্কার করে তুলে ধরতে হবে। ইনশাআল্লাহ সেটা করার সামর্থ্য একমাত্র হেযবুত তওহীদের কাছেই আছে। এরপর অনুষ্ঠানের সভাপতি রূফায়দাহ পন্নী তার সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বলেন- জঙ্গিবাদ শুধু আমাদের দেশের নয়, সারাবিশ্বের অন্যতম আলোচিত ইস্যু। পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়কদের মাথাব্যথার কারণ। কোনো সমাধানের পথ না পেয়ে তাই রাষ্ট্রনায়করা শক্তি প্রয়োগের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। ফলে মরছে জঙ্গি, কিন্তু বেঁচে থাকছে জঙ্গিবাদ। এই বইটি পড়লে ইনশাআল্লাহ সকলের দৃষ্টি খুলে যাবে, সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং জঙ্গিবাদ নামক বৃহৎ সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া যাবে। এছাড়া তিনি নারীদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন- আজকে নারীদেরকে ধর্মের অজুহাত দিয়ে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। কিন্তু ইসলামের কোথায় আছে নারীরা বাইরে যেতে পারবে না, অর্থ উপার্জনে পুরুষদের সাথে শরীক হতে পারবে না? নারীরা জাতির প্রায় অর্ধেক। কাজেই নারীদেরকে ঘরে বন্দী করে রেখে জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। নারীদেরকে জানতে হবে ইসলাম তাদেরকে কতটা স্বাধীনতা দিয়েছে, কত সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। নারীরা রসুলের সামনাসামনি বসে আলোচনা শুনেছেন, মসজিদে গিয়ে সালাহ কায়েম করেছেন। এ সময় নারী ও পুরুষদের মধ্যে কোনো পর্দা টাঙানো ছিল বলে জানা যায় না। রসুলাল্লাহর সময় নারীরা পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছেন। মসজিদে নববীর পাশে যুদ্ধাহত সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যার প্রধান ছিলেন একজন নারী। তাহলে ইসলাম কোথায় নারীদেরকে অধিকার থেকে বঞ্ছিত করল? আসলে সলাম নারীদেরকে অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা কেড়ে নিয়েছে ধর্মব্যবসায়ীরা। নারীদেরকে তাই আরও সচেতন হতে হবে। তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে হেযবুত তওহীদের নারীদের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন- হেযবুত তওহীদের নারীরা পুরুষদের সঙ্গে থেকে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে অংশ নিচ্ছেন। আমি নিজেও দৈনিক দেশেরপত্রের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক থাকাকালীন এবং এখন দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় গিয়েছি, সেমিনার করেছি, কিন্তু আমাকে তো কেউ বাধা দেয় নি। আমাকে তো কেউ ধর্মের কথা বলে গৃহের অভ্যন্তরে থাকার কথা বলে নি। কারণ, আমরা যামানার এমামের কাছ থেকে যে ইসলাম শিখেছি সেটা ধর্মব্যবসায়ী কূপমন্ডূকদের বিকৃত ইসলাম নয়, আমরা প্রকৃত সেই ইসলাম শিখেছি যেটা আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল। জঙ্গিবাদের প্রসঙ্গে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমারাই জঙ্গিবাদ জিইয়ে রাখতে চায়। কারণ এর দ্বারা পশ্চিমারাই সর্বাধিক উপকৃত হয়। আমাদের দেশের অর্থনীতি যেমন কৃষিভিত্তিক তেমন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে যুদ্ধভিত্তিক। কাজেই তাদের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখার জন্যই তারা জঙ্গিবাদকে অজুহাত করে পৃথিবীর বুকে একের পর এক যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে চলছে। এছাড়াও অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন বইটির প্রকাশক এস.এম. সামসুল হুদা, মুক্তিযুদ্ধ জনতা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জনাব মো. শের আলী, বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুবপরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক চন্দন কুমার শীল, বাংলাদেশ কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কবি ও সাংবাদিক আলহাজ্ব মো. মোশাররফ হোসেন আলমগীর প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দের আলোচনা ছাড়াও ‘একজাতি একদেশ ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’, ‘এক নজরে মাননীয় এমামুয্যামান ও হেযবুত তওহীদ’ ও ‘ধর্মব্যবসায়ী ও পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের যোগফল জঙ্গিবাদ- উত্তরণের একমাত্র পথ’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তানজীদ এমাম তিতুমীর এবং সভাপতিত্ব করেন দৈনিক দেশেরপত্রের সাবেক সম্পাদক ও দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা রুফায়দাহ পন্নী।