Thursday, December 10, 2015

পুরাণের কাহিনীতে পার্থিব জীবনের অসারতা ও মুক্তির একমাত্র উপায়

পুরাণের কাহিনীতে পার্থিব জীবনের অসারতা ও মুক্তির একমাত্র উপায়


মোহাম্মদ আসাদ আলী:
———————
আমরা ছোটবেলায় সংখ্যা গণনা শেখার সময় অনেকেই পড়তাম একে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ, তিনে নেত্র . . . আটে অষ্টবসু ইত্যাদি। হ্যাঁ, ঘটনাটি এই অষ্টবসুকে নিয়ে। যে সময়টির কথা বলছি তখন অষ্টবসু অর্থাৎ আটজন বসু ছিলেন স্বর্গের বাসিন্দা। দেব-দেবীদের সাথে থাকতেন, ঘুরতেন, আনন্দ-খুশি করতেন। তাদেরকে যেমন অন্য কারও দুঃখ-দুর্দশা দেখতে হতো না, তেমন নিজেদেরও দুঃখ-দুর্দশার লেশমাত্র ছিল না। একদিন কী হেতু তাদের ইচ্ছা হলো পৃথিবীতে ঘুরতে আসার। অতঃপর ইচ্ছাপূরণের অভিপ্রায় নিয়ে সত্যি সত্যিই তারা পৃথিবীতে আসলেন। আসার সময় নিজ নিজ স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে আসলেন। তারা পৃথিবীর এমন একটি বনে পৌঁছলেন যেখানে বশিষ্ঠ নামের একজন অতি শক্তিধর ঋষির আশ্রম ছিল। ঋষি বশিষ্ঠ ছিলেন ঋষিদের সেরা, শক্তিমান রাজাধিরাজেরও রাজা।
তার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার কথা কোনো মহাশক্তিধর রাজা-মহারাজাও চিন্তা করতে পারতেন না। যাই হোক, মূল ঘটনা শুরু হবে এখন। ঋষি বশিষ্ঠের সুরভী নাুী একটি গাভী ছিল। সেটি অন্যান্য সাধারণ গাভীদের মতো ছিল না। সুরভী একাই দশ হাজার মানুষের প্রয়োজনীয় দুগ্ধ প্রদান করতে পারতো। গাভীটি ঋষির অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ভ্রমণের এক পর্যায়ে অষ্টবসু যখন ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে আসলেন তখন বশিষ্ঠ সেখানে ছিলেন না, এমনকি তার কোনো শিষ্যও ছিল না। আশ্রমে কেবল গাভীটি অবস্থান করছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে ওই আকর্ষণীয় গাভীটি দেখে বসু দ্যু-এর স্ত্রী মুগ্ধ হয়ে গাভীটিকে নিয়ে যাবার জন্য স্বামীর নিকট অনুরোধ জানালেন। বসুগণও আগ-পাছ না ভেবে গাভীটি সঙ্গে নিতে মনস্থির করলেন। তারা ভাবলেন- কী আর হবে, একজন ঋষির গাভী নিলে তিনি কী আর করতে পারবেন? বস্তুত তারা ঋষি বশিষ্ঠের অসম্ভব ক্ষমতা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। তাই অজ্ঞতাবশত তারা গরুটিকে নিয়ে স্বর্গে চলে গেলেন। আর এতেই ঘটল বিপত্তি!
ঋষি বশিষ্ঠ আশ্রমে ফিরে গাভীকে দেখতে না পেয়ে বেশ বিচলিত হয়ে উঠলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন গাভীর অবস্থান জানা গেল না তখন যোগের মাধ্যমে ঋষি সব ঘটনা জানতে পারলেন। অতঃপর তিনি শুধু গাভীটি ফিরিয়ে এনেই ক্ষান্ত হলেন না, উপরন্তু বসুগণকে অভিশাপ করলেন যে, তোমাদের সবাইকে মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হবে এবং পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হবে, যেমন অন্যরা করে থাকে। এ অভিশাপ শ্রবণ করে বসুগণ ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
পৃথিবী কত কষ্টের জায়গা। কত অন্যায়, অবিচার, অশান্তি হয় সেখানে। অশান্তিময় ওই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হবে? বসবাস করতে হবে? এত বৃহৎ শাস্তি কীভাবে ভোগ করব? বসুগণ ঘোর সঙ্কটে নিপতিত হলেন।
অনুশোচনাবশত বসুগণ হৃদয়বিদারী ক্রন্দন করতে লাগলেন। আকাশ-বাতাস, পশু-পক্ষী, গাছ-পালাও সে কান্নায় কষ্ট অনুভব করল। বিভিন্নভাবে অনুনয়-বিনয় সহকারে বসুগণ ঋষি বশিষ্ঠের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে ঋষি বশিষ্ঠের দয়া হলো। তিনি একটি উপায় বাতলে দিলেন যে, যদি কোনো স্বর্গের দেবী তোমাদেরকে পৃথিবীতে জন্ম দিতে রাজী হন তাহলে কেবল দ্যু ছাড়া অন্য সাতজনের পৃথিবীতে জন্ম নিলেই হবে, বসবাস করতে হবে না। তবে দ্যু-এর পাপ বেশি হওয়ায় তাকে পৃথিবীতে পূর্ণজীবন অতিবাহিত করতেই হবে এবং জীবন শেষে পুনরায় স্বর্গে প্রবেশ করবে।
উপায় খুঁজে পেয়ে বসুগণ স্বর্গের দেবী গঙ্গার শরণাগত হয়ে ঘটনা খুলে বললে দেবী তাদেরকে পৃথিবীতে জন্ম দিতে রাজী হলেন। কিন্তু কার ঔরষে অষ্টবসু পৃথিবীতে জন্ম নেবে? যার তার ঔরষে তো আর জন্ম নেয়া যায় না। এরা যে স্বর্গবাসী। অনেক খুঁজে নির্ধারণ করা হলো যে, কুরুবংশের প্রজাহিতৈষী রাজা শান্তনুর ঔরষে অষ্টবসু পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবে। রাজা শান্তনু কুরুবংশের উজ্জ্বল প্রদীপ। তার প্রজাবান্ধব শাসনে কুরুরাজ্যে তখন সুখ-শান্তির জোয়ার বইছে। একদিন রাজা শান্তনু নদী তীরবর্তী এলাকায় শিকারে বের হলেন। সেখানেই নদীর কিনারে সাক্ষাৎ ঘটল দেবী গঙ্গার সঙ্গে। দেবী গঙ্গার রূপ মাধুর্য দেখে অভিভূত হয়ে রাজা সেখানেই বিয়ের প্রস্তাব দিলে দেবী গঙ্গা কয়েকটি শর্তের কথা জানালেন এবং সেইসব শর্তসাপেক্ষে বিয়ে করতে রাজী হলেন। শর্তগুলো হচ্ছে:
এক- রাজা তার (গঙ্গা দেবীর) কোনো বংশপরিচয় জানতে চাইবেন না,
দুই- তার কোনো কাজের ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন না,
তিন- তার কোনো কাজে রাজা বাধা প্রদান করতে পারবেন না। এই তিন শর্তের মধ্যে যদি একটি শর্তেরও লঙ্ঘন করা হয় তাহলে তিনি রাজমহল ছেড়ে চলে যাবেন।
আপাতদৃষ্টে শর্তগুলো অমান্যযোগ্য হলেও দেবী গঙ্গার রূপে রাজা এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি একটু সময় নিয়ে চিন্তাও করলেন না, অমনি রাজী হয়ে গেলেন। ফলে রাজা শান্তনুর ঘরে দেবী গঙ্গা স্ত্রী হিসেবে প্রবেশ করলেন। এর পরবর্তী ঘটনা সংক্ষেপে এই যে, বছর ঘুরতেই গঙ্গার গর্ভে রাজার একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে রানী সাথে সাথে শিশুটিকে নদীতে ফেলে দিলেন। রাজা অবাক হলেন, মনকষ্টে ভুগলেন কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না, কারণ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না। এভাবে যে সন্তানই জন্ম নেয় রানী সাথে সাথে সন্তানকে পানিতে ফেলে দেন। রাজা কিছুই বলতে পারেন না। তিনি ক্রমেই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। সব সন্তানকে পানিতে ফেলে মেরে ফেললে বংশের ধারা রক্ষা হবে কী করে? সব থেকে বড় কথা হলো এমন কাজ কোনো মা করতে পারে? রাজা ভয়াবহ সঙ্কটে পতিত হয়ে অসহায় বোধ করতে লাগলেন। তিনি না রানীকে হারাতে চান, আবার না সন্তান হারিয়ে নির্বংশ হতে চান। এক পর্যায়ে সাত সন্তানের মৃত্যুর পর অষ্টম সন্তানটি যখন ভূমিষ্ঠ হলো এবং রানী বেশধারী দেবী গঙ্গা তাকে নদীতে ফেলার উদ্দেশ্যে নদীর কিনারে পৌঁছলেন তখন আর রাজা শান্তনু চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি রানীকে বাধা প্রদান করে এমন অহেতুক ও অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের কারণ জিজ্ঞাসা করে বসলেন। দেবী গঙ্গা জানতেন এমনটাই ঘটবে। কারণ এই অষ্টম সন্তানকে পৃথিবীর পূর্ণজীবন অতিবাহিত করতে হবে। এরপর দেবী রাজাকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে চলে গেলেন। পুরাণের এই দু’কেই আমরা মহাভারতের কাহিনীতে জানি দেবব্রত ও ভীস্ম হিসেবে। তিনি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শাস্তিসরূপ, যে শাস্তি তাকে পেতে হয়েছিল দীর্ঘ জীবনে একটু একটু করে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে করতে। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে যিনি কখনও সত্যের পক্ষ নিয়ে কৃতার্থ হয়েছেন আবার কখনও অজ্ঞতাবশত মিথ্যার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তবে সবশেষে তিনি সত্যকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন যার দরুণ শেষাবধি তার এই মানবজনম স্বার্থক হয়েছিল।
এবারে আসি কাহিনীটির শিক্ষণীয় দিকটিতে। আমরাও মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি, বসবাস করছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, বংশ বিস্তার করছি, হাসি-তামাশা করছি, ব্যবসা-বাণিজ্য করছি, অবসর যাপন করছি। কিন্তু একটিবার কি ভেবে দেখেছি যে, আমার মানবজনম স্বার্থক হলো কিনা? বসুগণ পৃথিবীতে স্বেচ্ছায় আসেন নি, এসেছিলেন বাধ্য হয়ে। হয়তো আমরাও স্বেচ্ছায় আসি নি। অশান্তিময় এই পৃথিবীতে ক্ষণকালের জন্য কে-ই বা স্বেচ্ছায় আসতে চায়? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- যে পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে ভেবে বসুগণ আকাশ-পাতাল বিদীর্ণ করে ক্রন্দনে ফেটে পড়েছিলেন সেই পৃথিবীতে আজ আমাদের অবস্থা এই যে, আমরা অনেকেই ভাবি- পৃথিবীই আমার পরম পাওয়া, জীবনমাত্রই উপভোগ্য; মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি বলে অজ্ঞতা ও মোহবশত আমরা নিজেদের ধন্য মনে করি। আমরা একথা ভুলে যাই যে, এককালে আমি পৃথিবীতে ছিলাম না, আবার এককালে থাকবও না। কাজেই এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী আমার পরম গন্তব্য হতে পারে না। পৃথিবীর শষ্যক্ষেত্রসম, ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমি এই শস্যক্ষেত্রে যে বীজ বপন করব তারই ফল প্রাপ্ত হবে পারলৌকিক জীবনে। বস্তুবাদী জীবনদর্শনের আগ্রাসনে এই বোধ আমাদের অবশিষ্ট আছে কি?
পৃথিবী বড়ই কঠিন। এখানে শুধুই পরীক্ষা আর পরীক্ষা। এটা আরাম-আয়েশে বেঁচে থাকার জায়গা নয়। এটা সংগ্রামের জায়গা, দুঃখ-কষ্টের জায়গা। যারা পৃথিবীকেই সবকিছুর আধার ধরে নিয়ে পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে তারা বিপথগামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তো যুগে যুগে আমরা কত ঋষি-মুণি, দরবেশ, পীর-ফকির, সন্ন্যাসী, ভিক্ষুর কথা জানতে পাই যারা এই জগৎ সংসারের মায়া ত্যাগ করে, পার্থিব কাজ-কর্ম ত্যাগ করে কেবল স্রষ্টাকেই খুঁজে ফিরেছেন, আত্মিক উন্নতি করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, সমাজ-সংসার থেকে বের হয়ে বনে-জঙ্গলে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওটাও কোনো স্বাভাবিক জীবন নয়, মুক্তির পথ নয়।
প্রকৃত মুক্তির পথ আমরা পাই বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে। যেমন গীতায় আছে কর্মযোগ। মানুষ প্রকৃতপক্ষে কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয় না, কর্মফলের কামনা-বাসনা দ্বারা আবদ্ধ হয়। কর্মফলের কামনা-বাসনাই কর্মের বন্ধন। কর্মযোগ অর্থাৎ সকল কর্মের পশ্চাতে আশা-আকাক্সক্ষা ত্যাগ করার মাধ্যমে কর্মের এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। পার্থিব জগতে বাস করেও, অন্য আর দশজন মানুষের সাথে জীবনযাপন করেও, সংসারধর্ম নির্বাহ করেও সন্ন্যাসী হওয়া সম্ভব। তার জন্য বনে-জঙ্গলে যাবার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে কাজ করা। এ সন্ন্যাস থেকে শুধু ব্যক্তিই লাভবান হয় না, সমস্ত মানবজাতিই লাভবান হয়। কারণ নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে কাজ করলে যেমন স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়া যায় তেমন পৃথিবীকেও সুন্দর করা যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন অর্জুনের দৃঢ়তার খুঁটি নড়বড় করছিল তখন মুক্তির বার্তা নিয়ে আসা শ্রীকৃষ্ণ তাকে এই মুক্তির পথই দেখিয়েছিলেন।
ইসলাম ধর্মও একই কথা বলে। আল্লাহর রসুল নিঃস্বার্থভাবে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঘর-বাড়ি ত্যাগ করাকে অর্থাৎ জেহাদকে ইসলামের বৈরাগ্য বলে অভিহিত করেছেন। ঘরে বসে থেকে বা বনে জঙ্গলে ঘুরে আত্মার ঘষামাজা করে স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাবার প্রচেষ্টাকে ইসলাম অনুমোদন দেয় নি। মহামতি বুদ্ধকেও আমরা দেখি এককালে সংসারের মায়া ত্যাগ করে তিনি সমাজ-সংসার ছেড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু পরবর্তীতে সত্য পাওয়ার পর সমাজ-সংসারেই ফিরে এসেছেন ভিন্নভাবে, ভিন্ন উদ্দেশ্যে।
আবারো বলছি পৃথিবী মোটেও ভালো জায়গা নয়, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয়। এটা নিছক পরীক্ষাকেন্দ্র। তাই পৃথিবীতে বিষয়াসক্ত হয়ে পড়া চূড়ান্ত অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আবার পৃথিবীতে আসক্ত হবো না এই উদ্দেশ্যে জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াও সমীচীন নয়। মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে একে অপরের কল্যাণে সংগ্রাম করা, যেটা সকল নবী-রসুল-অবতার করেছেন। তাতে পৃথিবীও সুন্দর হবে, পরকালও সুন্দর হবে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি ধ্বংস হবে মানবজাতি!



কাজী আবদাল্লাহ আল মাহফুজ : তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ! কথাটা শুনে অনেকেই চমকে উঠেন। আবার অনেকে এর সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে চান। যারা চমকে উঠেন তাদের যুক্তি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধলে মানবজাতির কোন অস্তিত্ব থাকবে না। আর যারা উড়িয়ে দিতে চান তাদের যুক্তি মানবজাতি এখন অনেক সভ্য, তারা এমন আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে না। অর্থাৎ উভয়ের যুক্তিতেই রয়েছে মানবজাতির ধ্বংস। উভয়েই শংকিত মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে। কিন্তু যুদ্ধবাজদের কাছে মানবজাতি কোন বিষয় নয়, বিষয় শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ। আজ এসকল যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে যে পরিমাণ রাসায়নিক, পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমার মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে কয়েক মিনিটেই পৃথিবী ধ্বংস করে দেয়া যায়। তাই শত্র“কে মারলে আমিও মরব এই ভয়ই এখন পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে তাদের বিরত রয়েছে। এখানে মানবতা নয়, দয়া নয়, ন্যায়ের প্রতি সম্মান নয়, অন্যায়ের প্রতি বিরূপতা নয়, কত কোটি মানুষ, শিশু, পশু নিহত হবে, এসব অনুভূতির কোন স্থান নেই। তার প্রমাণ নাগাসাকি ও হিরোশিমা। তথাপিও অনেকে বলবেন না, না, মানুষ এমন আত্মহত্যার কাজ করবে না। কিন্তু যে দিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তার আগের দিন যদি সমস্ত পৃথিবীতে একটা গণভোট নেয়া হতো যে, যুদ্ধ চাও কি চাওনা? তবে যুদ্ধের পক্ষে মানুষ কোন ভোট দিত না, দিলেও তা শূন্যের কোঠায় থাকত। এমন কি যারা পরের দিন মহাযুদ্ধ আরম্ভ করেছিল তারাও না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কি বাঁধেনি? সেই যুদ্ধে চার কোটি মানুষ হতাহত হয় নি? তারপর সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মাত্র একুশ বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের দিন যদি আবার যুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট নেয়া হতো তারও ফল ঐ আগের গণভোটের মতই হত। কিন্তু তাতে কি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বন্ধ হয়েছে? হয় নি- এবং সে যুদ্ধে সাত কোটি মানুষ হতাহত হয়েছে, বিভৎসভাবে পঙ্গু হোয়েছে, কোটি কোটি স্ত্রীলোক বিধবা হোয়েছে, কোটি কোটি শিশু বাপ-মা হারিয়েছে, কোটি কোটি স্ত্রীলোক ধর্ষিতা হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ কেমন কোরে যুদ্ধ আরম্ভ হলো তা লিখতে যেয়ে লেখেছেন-“ডব ধষষ ংষরঃযবৎবফ রহঃড় রঃ” অর্থাৎ আমরা কেমন যেন পিছলিয়ে ওর মধ্যে পড়ে গেলাম। আর এবারও যে একইভাবে পা পিছলে পড়বে না তা তার কি গ্যারান্টি আছে? কোন গ্যারান্টি নেই বরং সাম্রাজ্যবাদীরা তার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে।
ঠাণ্ডাযুদ্ধ চলাকালে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে মানুষ কিছুদিন চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। আর সেটি স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে ইতি টানায় বিশ্ববাসী ধরে নিয়েছিল বর্তমান সভ্যতার ভোগবাদী মানুষেরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়ে হয়তো তাদের ধ্বংস করতে চাইবে না। কিন্তু যুদ্ধ যাদের জীবিকা, যুদ্ধ যাদের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার তাদের পক্ষে বেশিদিন নীরব থাকা সম্ভব নয়। আবার যুদ্ধে যারা পরাজিত হয়, তাদের পক্ষেও মার খাওয়ার গ্লানি মুছে ফেলা সহজ নয়। তার প্রমাণ মিলল অল্পদিনেই। বিশেষ করে ঠাণ্ডা যুদ্ধে কমিউনিজমের পতনের পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সামনে স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মুসলিমরা। এক ঢিলে দুই পাখি। ভবিষ্যৎ মুসলিম আধিপত্যকে রোধ করা এবং একইসাথে তেল ও খনিজ সম্পদ লুটে নেয়ার জন্য এক বছরের মধ্যে শুরু হলো উপসাগরীয় যুদ্ধ। যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক এ যুদ্ধের মাধ্যমে তারা মুসলিমদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে রচিত হলো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। আফগানিস্তানে জংগিবাদের উত্থান এবং তা দমন। তারপর একের পর এক মুসলিম দেশে আক্রমণ ও ভিন্নভাবে সরকার পতনের মাধ্যমে চলল সেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। ধ্বংস হয়ে গেল ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া। উত্থান হলো আইএস’র। এবার আইএস নিয়ে শুরু হলো ইঁদুর বিড়াল খেলা। উঠে এলো সেই পুরনো মারখাওয়া শত্র“ রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যে এই চরম অস্থিতিশীল অবস্থা পশ্চিমাবিশ্ব ও রাশিয়ার মধ্যে আবার শুরু করে দিল আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। কারণ খুব সহজ, আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্রব্যবসা, খনিজ ও তেলসম্পদ। এ আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এখন তরান্বিত করছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের। এটা কনো অমূলক বিষয় নয়। এ নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের তেমন মাথাব্যাথা না থাকলেও বিশ্বব্যাপি চলছে জল্পনা-কল্পনা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং গা শিউরে ওঠার মত সংবাদ পাঠকদের উদ্দেশে সংবাদটি তুলে ধরা হলো-
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধাবে রাশিয়া?
সিরিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। এ যুদ্ধে হাইড্রোজেন বোমা ও কিয়ামতের বিমান ব্যবহার হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন কেয়ামতের বিমান দ্রুত অভিযান-উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরমাণু ও হাইড্রোজেন বোমার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে স্থলে থাকা নিয়ন্ত্রণ কক্ষও যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে রাশিয়ার কেয়ামতের বিমান উড়ন্ত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে কাজ করবে। আর এই বিমানগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যে এদের পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব। এ ধরনের ইলিউশিন টু-৮০ মডেলের বিমানগুলোকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যবহার উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন। বিশ্বে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছেই রয়েছে এ ধরনের বিমান। যুক্তরাষ্ট্র এগুলোকে কেয়ামতের বিমান বলে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে এরই মধ্যে বিমানগুলোর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও স¤পন্ন হয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, উচ্চক্ষমতাস¤পন্ন এই যুদ্ধবিমানগুলো ২০১৫ সালের শেষের দিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। কিন্তু পুতিন দুই সপ্তাহের মধ্যে এগুলোকে প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাইড্রোজেন বোমার প্রতিকৃতি প্রদর্শন করা হয় মস্কোতে।
হাইড্রোজেন বোমা কী? : পারমাণবিক বোমা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা। নক্ষত্রে যে প্রক্রিয়ায় আলোক তৈরি করে। হাইড্রোজেন বোমা ঠিক সেই প্রক্রিয়ায় কাজ করে। হাইড্রোজেন বোমার ভেতরে একটি মিনি সাইজের এটমবোমাও থাকে। বিস্ফোরণের পূর্ব মুহূর্তে বোমার ভেতরে একীভবনের ক্রিয়াটি শুরু করার জন্যই একে ধরে রাখা হয়। মূল বোমাটি বিস্ফোরণের আগেই এটি বিস্ফোরিত হয়। এএন৬০২ হাইড্রোজেন বোমাকে সংক্ষিপ্তাকারে জার বোমা বা এইচ বোমা নামে ডাকা হয়। ১৯৫৩ সালে এটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাশিয়ায় আবিষ্কৃত হয়। সোভিয়েত পরমাণুবিজ্ঞানী আন্দ্রে শাখারভ হাইড্রোজেন বোমা আবিষ্কার করেন। এই বোমাকে সব বোমার জনক বলে ঘোষণা করা হয়। এ বোমার প্রতি ইঙ্গিত করে ১৯৬০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রকে একহাত দেখিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ১৯৬১ সালের ৩০ অক্টোবর মেরুবৃত্তের ভেতরের দ্বীপ নোভায়া জেমলিয়ায় ৫৮ মেগাটনের এই হাইড্রোজেন বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে এই হাউড্রোজেন বোমাটি তিন হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল।
প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট এটমিক আর্কাইভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরমাণু বোমা যেখানে জীবাশ্ম প্রতিক্রিয়ায় কাজ করে, হাইড্রোজেন বোমা সেখানে ধ্বংসাÍক গলন মিশ্রণ প্রতিক্রিয়া করে। পরমাণু বোমার চেয়ে যা কয়েক গুণ ক্ষতিসাধন করতে পারে। হাইড্রোজেন বোমা বিশ্বের পাঁচটি দেশের (রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন) কাছে রয়েছে।
কেয়ামত বিমান কী? রাশিয়ার ইলিউশিন টু-৮০ বিমানকে যুক্তরাষ্ট্র ডুমস ডে প্লেন বা কেয়ামত বিমান বলে অভিহিত করে। রুশ বিমান গবেষণা ও প্রস্তুত প্রকল্পের মহাপরিচালক আলেকসান্দ্র কমিয়াকভ বলেন, এই বিমানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এটি অজেয়, একে পরাজিত করা যায় না। ভূমিতে কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হলে তা শনাক্ত এবং ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু বিমানকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে আকাশ থেকে নির্দেশ দিলে তা শনাক্ত করা খুবই কঠিন।
নিজেদের মূল কাজ স¤পর্কে কমিয়াকভ বলেন, অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও যোগাযোগটা বজায় রাখাই হচ্ছে এর প্রধান কাজ। মাটিতে থাকা অবকাঠামো যদি ধ্বংসও হয়ে যায়, তবু যেন যুদ্ধ ও পরিকল্পনা ঠিক থাকে, সেটা এখান থেকে লক্ষ্য রাখা হবে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কারা জিতবে? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মানবজাতির অস্তিত্ব থাকবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউকে ডেইলি স্টারের একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ মনে করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে আগের দুটোর মতো যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন জয়লাভ করবে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করে, রাশিয়া এখন ভাল্লুক। তাকে খেপিয়ে তুললে কেউ টিকবে না। ওই জরিপে আইএসকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে- বিশ্ব ধ্বংস হলেও তেলাপোকা টিকবে। তবে ৫৪ শতাংশ মানুষ মনে করে, এ যুদ্ধে কেউই জয়ী হবে না, মানবজাতি ধ্বংস হবে।

অষ্টবসু এর কাহিনীতে পার্থিব জীবনের অসারতা ও মুক্তির একমাত্র উপায়

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
আমরা ছোটবেলায় সংখ্যা গণনা শেখার সময় অনেকেই পড়তাম একে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ, তিনে নেত্র . . . আটে অষ্টবসু ইত্যাদি। হ্যাঁ, ঘটনাটি এই অষ্টবসুকে নিয়ে। যে সময়টির কথা বলছি তখন অষ্টবসু অর্থাৎ আটজন বসু ছিলেন স্বর্গের বাসিন্দা। দেব-দেবীদের সাথে থাকতেন, ঘুরতেন, আনন্দ-খুশি করতেন। তাদেরকে যেমন অন্য কারও দুঃখ-দুর্দশা দেখতে হতো না, তেমন নিজেদেরও দুঃখ-দুর্দশার লেশমাত্র ছিল না। একদিন কী হেতু তাদের ইচ্ছা হলো পৃথিবীতে ঘুরতে আসার। অতঃপর ইচ্ছাপূরণের অভিপ্রায় নিয়ে সত্যি সত্যিই তারা পৃথিবীতে আসলেন। আসার সময় নিজ নিজ স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে আসলেন। তারা পৃথিবীর এমন একটি বনে পৌঁছলেন যেখানে বশিষ্ঠ নামের একজন অতি শক্তিধর ঋষির আশ্রম ছিল। ঋষি বশিষ্ঠ ছিলেন ঋষিদের সেরা, শক্তিমান রাজাধিরাজেরও রাজা। তার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার কথা কোনো মহাশক্তিধর রাজা-মহারাজাও চিন্তা করতে পারতেন না। যাই হোক, মূল ঘটনা শুরু হবে এখন। ঋষি বশিষ্ঠের সুরভী নাুী একটি গাভী ছিল। সেটি অন্যান্য সাধারণ গাভীদের মতো ছিল না। সুরভী একাই দশ হাজার মানুষের প্রয়োজনীয় দুগ্ধ প্রদান করতে পারতো। গাভীটি ঋষির অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ভ্রমণের এক পর্যায়ে অষ্টবসু যখন ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে আসলেন তখন বশিষ্ঠ সেখানে ছিলেন না, এমনকি তার কোনো শিষ্যও ছিল না। আশ্রমে কেবল গাভীটি অবস্থান করছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে ওই আকর্ষণীয় গাভীটি দেখে বসু দ্যু-এর স্ত্রী মুগ্ধ হয়ে গাভীটিকে নিয়ে যাবার জন্য স্বামীর নিকট অনুরোধ জানালেন। বসুগণও আগ-পাছ না ভেবে গাভীটি সঙ্গে নিতে মনস্থির করলেন। তারা ভাবলেন- কী আর হবে, একজন ঋষির গাভী নিলে তিনি কী আর করতে পারবেন? বস্তুত তারা ঋষি বশিষ্ঠের অসম্ভব ক্ষমতা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। তাই অজ্ঞতাবশত তারা গরুটিকে নিয়ে স্বর্গে চলে গেলেন। আর এতেই ঘটল বিপত্তি!
ঋষি বশিষ্ঠ আশ্রমে ফিরে গাভীকে দেখতে না পেয়ে বেশ বিচলিত হয়ে উঠলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন গাভীর অবস্থান জানা গেল না তখন যোগের মাধ্যমে ঋষি সব ঘটনা জানতে পারলেন। অতঃপর তিনি শুধু গাভীটি ফিরিয়ে এনেই ক্ষান্ত হলেন না, উপরন্তু বসুগণকে অভিশাপ করলেন যে, তোমাদের সবাইকে মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হবে এবং পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হবে, যেমন অন্যরা করে থাকে। এ অভিশাপ শ্রবণ করে বসুগণ ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
পৃথিবী কত কষ্টের জায়গা। কত অন্যায়, অবিচার, অশান্তি হয় সেখানে। অশান্তিময় ওই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হবে? বসবাস করতে হবে? এত বৃহৎ শাস্তি কীভাবে ভোগ করব? বসুগণ ঘোর সঙ্কটে নিপতিত হলেন।
অনুশোচনাবশত বসুগণ হৃদয়বিদারী ক্রন্দন করতে লাগলেন। আকাশ-বাতাস, পশু-পক্ষী, গাছ-পালাও সে কান্নায় কষ্ট অনুভব করল। বিভিন্নভাবে অনুনয়-বিনয় সহকারে বসুগণ ঋষি বশিষ্ঠের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে ঋষি বশিষ্ঠের দয়া হলো। তিনি একটি উপায় বাতলে দিলেন যে, যদি কোনো স্বর্গের দেবী তোমাদেরকে পৃথিবীতে জন্ম দিতে রাজী হন তাহলে কেবল দ্যু ছাড়া অন্য সাতজনের পৃথিবীতে জন্ম নিলেই হবে, বসবাস করতে হবে না। তবে দ্যু-এর পাপ বেশি হওয়ায় তাকে পৃথিবীতে পূর্ণজীবন অতিবাহিত করতেই হবে এবং জীবন শেষে পুনরায় স্বর্গে প্রবেশ করবে।
উপায় খুঁজে পেয়ে বসুগণ স্বর্গের দেবী গঙ্গার শরণাগত হয়ে ঘটনা খুলে বললে দেবী তাদেরকে পৃথিবীতে জন্ম দিতে রাজী হলেন। কিন্তু কার ঔরষে অষ্টবসু পৃথিবীতে জন্ম নেবে? যার তার ঔরষে তো আর জন্ম নেয়া যায় না। এরা যে স্বর্গবাসী। অনেক খুঁজে নির্ধারণ করা হলো যে, কুরুবংশের প্রজাহিতৈষী রাজা শান্তনুর ঔরষে অষ্টবসু পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবে। রাজা শান্তনু কুরুবংশের উজ্জ্বল প্রদীপ। তার প্রজাবান্ধব শাসনে কুরুরাজ্যে তখন সুখ-শান্তির জোয়ার বইছে। একদিন রাজা শান্তনু নদী তীরবর্তী এলাকায় শিকারে বের হলেন। সেখানেই নদীর কিনারে সাক্ষাৎ ঘটল দেবী গঙ্গার সঙ্গে। দেবী গঙ্গার রূপ মাধুর্য দেখে অভিভূত হয়ে রাজা সেখানেই বিয়ের প্রস্তাব দিলে দেবী গঙ্গা কয়েকটি শর্তের কথা জানালেন এবং সেইসব শর্তসাপেক্ষে বিয়ে করতে রাজী হলেন। শর্তগুলো হচ্ছে:
এক- রাজা তার (গঙ্গা দেবীর) কোনো বংশপরিচয় জানতে চাইবেন না,
দুই- তার কোনো কাজের ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন না,
তিন- তার কোনো কাজে রাজা বাধা প্রদান করতে পারবেন না। এই তিন শর্তের মধ্যে যদি একটি শর্তেরও লঙ্ঘন করা হয় তাহলে তিনি রাজমহল ছেড়ে চলে যাবেন।
আপাতদৃষ্টে শর্তগুলো অমান্যযোগ্য হলেও দেবী গঙ্গার রূপে রাজা এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি একটু সময় নিয়ে চিন্তাও করলেন না, অমনি রাজী হয়ে গেলেন। ফলে রাজা শান্তনুর ঘরে দেবী গঙ্গা স্ত্রী হিসেবে প্রবেশ করলেন। এর পরবর্তী ঘটনা সংক্ষেপে এই যে, বছর ঘুরতেই গঙ্গার গর্ভে রাজার একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে রানী সাথে সাথে শিশুটিকে নদীতে ফেলে দিলেন। রাজা অবাক হলেন, মনকষ্টে ভুগলেন কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না, কারণ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না। এভাবে যে সন্তানই জন্ম নেয় রানী সাথে সাথে সন্তানকে পানিতে ফেলে দেন। রাজা কিছুই বলতে পারেন না। তিনি ক্রমেই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। সব সন্তানকে পানিতে ফেলে মেরে ফেললে বংশের ধারা রক্ষা হবে কী করে? সব থেকে বড় কথা হলো এমন কাজ কোনো মা করতে পারে? রাজা ভয়াবহ সঙ্কটে পতিত হয়ে অসহায় বোধ করতে লাগলেন। তিনি না রানীকে হারাতে চান, আবার না সন্তান হারিয়ে নির্বংশ হতে চান। এক পর্যায়ে সাত সন্তানের মৃত্যুর পর অষ্টম সন্তানটি যখন ভূমিষ্ঠ হলো এবং রানী বেশধারী দেবী গঙ্গা তাকে নদীতে ফেলার উদ্দেশ্যে নদীর কিনারে পৌঁছলেন তখন আর রাজা শান্তনু চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি রানীকে বাধা প্রদান করে এমন অহেতুক ও অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের কারণ জিজ্ঞাসা করে বসলেন। দেবী গঙ্গা জানতেন এমনটাই ঘটবে। কারণ এই অষ্টম সন্তানকে পৃথিবীর পূর্ণজীবন অতিবাহিত করতে হবে। এরপর দেবী রাজাকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে চলে গেলেন। পুরাণের এই দু’কেই আমরা মহাভারতের কাহিনীতে জানি দেবব্রত ও ভীস্ম হিসেবে। তিনি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শাস্তিসরূপ, যে শাস্তি তাকে পেতে হয়েছিল দীর্ঘ জীবনে একটু একটু করে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে করতে। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে যিনি কখনও সত্যের পক্ষ নিয়ে কৃতার্থ হয়েছেন আবার কখনও অজ্ঞতাবশত মিথ্যার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তবে সবশেষে তিনি সত্যকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন যার দরুণ শেষাবধি তার এই মানবজনম স্বার্থক হয়েছিল।
এবারে আসি কাহিনীটির শিক্ষণীয় দিকটিতে। আমরাও মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি, বসবাস করছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, বংশ বিস্তার করছি, হাসি-তামাশা করছি, ব্যবসা-বাণিজ্য করছি, অবসর যাপন করছি। কিন্তু একটিবার কি ভেবে দেখেছি যে, আমার মানবজনম স্বার্থক হলো কিনা? বসুগণ পৃথিবীতে স্বেচ্ছায় আসেন নি, এসেছিলেন বাধ্য হয়ে। হয়তো আমরাও স্বেচ্ছায় আসি নি। অশান্তিময় এই পৃথিবীতে ক্ষণকালের জন্য কে-ই বা স্বেচ্ছায় আসতে চায়? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- যে পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে ভেবে বসুগণ আকাশ-পাতাল বিদীর্ণ করে ক্রন্দনে ফেটে পড়েছিলেন সেই পৃথিবীতে আজ আমাদের অবস্থা এই যে, আমরা অনেকেই ভাবি- পৃথিবীই আমার পরম পাওয়া, জীবনমাত্রই উপভোগ্য; মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি বলে অজ্ঞতা ও মোহবশত আমরা নিজেদের ধন্য মনে করি। আমরা একথা ভুলে যাই যে, এককালে আমি পৃথিবীতে ছিলাম না, আবার এককালে থাকবও না। কাজেই এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী আমার পরম গন্তব্য হতে পারে না। পৃথিবীর শষ্যক্ষেত্রসম, ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমি এই শস্যক্ষেত্রে যে বীজ বপন করব তারই ফল প্রাপ্ত হবে পারলৌকিক জীবনে। বস্তুবাদী জীবনদর্শনের আগ্রাসনে এই বোধ আমাদের অবশিষ্ট আছে কি?
পৃথিবী বড়ই কঠিন। এখানে শুধুই পরীক্ষা আর পরীক্ষা। এটা আরাম-আয়েশে বেঁচে থাকার জায়গা নয়। এটা সংগ্রামের জায়গা, দুঃখ-কষ্টের জায়গা। যারা পৃথিবীকেই সবকিছুর আধার ধরে নিয়ে পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে তারা বিপথগামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তো যুগে যুগে আমরা কত ঋষি-মুণি, দরবেশ, পীর-ফকির, সন্ন্যাসী, ভিক্ষুর কথা জানতে পাই যারা এই জগৎ সংসারের মায়া ত্যাগ করে, পার্থিব কাজ-কর্ম ত্যাগ করে কেবল স্রষ্টাকেই খুঁজে ফিরেছেন, আত্মিক উন্নতি করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, সমাজ-সংসার থেকে বের হয়ে বনে-জঙ্গলে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওটাও কোনো স্বাভাবিক জীবন নয়, মুক্তির পথ নয়।
প্রকৃত মুক্তির পথ আমরা পাই বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে। যেমন গীতায় আছে কর্মযোগ। মানুষ প্রকৃতপক্ষে কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয় না, কর্মফলের কামনা-বাসনা দ্বারা আবদ্ধ হয়। কর্মফলের কামনা-বাসনাই কর্মের বন্ধন। কর্মযোগ অর্থাৎ সকল কর্মের পশ্চাতে আশা-আকাক্সক্ষা ত্যাগ করার মাধ্যমে কর্মের এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। পার্থিব জগতে বাস করেও, অন্য আর দশজন মানুষের সাথে জীবনযাপন করেও, সংসারধর্ম নির্বাহ করেও সন্ন্যাসী হওয়া সম্ভব। তার জন্য বনে-জঙ্গলে যাবার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে কাজ করা। এ সন্ন্যাস থেকে শুধু ব্যক্তিই লাভবান হয় না, সমস্ত মানবজাতিই লাভবান হয়। কারণ নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে কাজ করলে যেমন স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়া যায় তেমন পৃথিবীকেও সুন্দর করা যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন অর্জুনের দৃঢ়তার খুঁটি নড়বড় করছিল তখন মুক্তির বার্তা নিয়ে আসা শ্রীকৃষ্ণ তাকে এই মুক্তির পথই দেখিয়েছিলেন।
ইসলাম ধর্মও একই কথা বলে। আল্লাহর রসুল নিঃস্বার্থভাবে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঘর-বাড়ি ত্যাগ করাকে অর্থাৎ জেহাদকে ইসলামের বৈরাগ্য বলে অভিহিত করেছেন। ঘরে বসে থেকে বা বনে জঙ্গলে ঘুরে আত্মার ঘষামাজা করে স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাবার প্রচেষ্টাকে ইসলাম অনুমোদন দেয় নি। মহামতি বুদ্ধকেও আমরা দেখি এককালে সংসারের মায়া ত্যাগ করে তিনি সমাজ-সংসার ছেড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু পরবর্তীতে সত্য পাওয়ার পর সমাজ-সংসারেই ফিরে এসেছেন ভিন্নভাবে, ভিন্ন উদ্দেশ্যে।
আবারো বলছি পৃথিবী মোটেও ভালো জায়গা নয়, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয়। এটা নিছক পরীক্ষাকেন্দ্র। তাই পৃথিবীতে বিষয়াসক্ত হয়ে পড়া চূড়ান্ত অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আবার পৃথিবীতে আসক্ত হবো না এই উদ্দেশ্যে জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াও সমীচীন নয়। মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে একে অপরের কল্যাণে সংগ্রাম করা, যেটা সকল নবী-রসুল-অবতার করেছেন। তাতে পৃথিবীও সুন্দর হবে, পরকালও সুন্দর হবে।

রাজনীতি ও ধর্মীয় অঙ্গনে মিথ্যার চিত্র

রাজনীতি ও ধর্মীয় অঙ্গনে মিথ্যার চিত্র


মাহবুব আলম
সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্বই হচ্ছে মানবজাতির প্রকৃত ইতিহাস। আজও এই সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্ব চলছে, পার্থক্য এই যে- অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান দুনিয়ার অবস্থার দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সর্বাঙ্গনেই দেখতে পাই- সত্য এবং মিথ্যা এমনভাবে মিশে গেছে যে- আজকে যেন সত্য কী জিনিস- মানুষ তা চিনতেই পারে না। মিথ্যাটাই আজ সত্যরূপে পরিগণিত হচ্ছে। আমাদের সমাজেও বাকি পৃথিবীর মতই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ক্ষেত্রে মিথ্যা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। রাজনৈতিক মিথ্যা কীভাবে? দুর্নীতি, অন্যায়, জুলুম, স্বৈরাচারী আচরণ, ওয়াদাভঙ্গ করা, জনগণের সম্পদ লুটপাট করা, সন্ত্রাস, সহিংসতা, হত্যা ইত্যাদি- এই হলো রাজনৈতিক মিথ্যা।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই মিথ্যাগুলো কীভাবে আসলো?
এই মিথ্যাগুলো রাজনীতিতে একদিনে আসে নি। কারণ মানুষের আত্মিক শূন্যতা যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে- সেখানে অন্যায় না করার প্রবণতা, দুর্নীতি না করার মতো যে আত্মার শক্তির প্রয়োজন তা কোথাও নেই। সেটা থাকা না থাকার কারণ হলো কোথাও আজ স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব নেই। অর্থাৎ স্রষ্টার দেওয়া দিকনির্দেশনাকে সমষ্টিগত জীবনে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। এটার একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেটা হলো মানুষ হাজার হাজার বছর হতে, মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই স্রষ্টার দেওয়া বিধান দিয়েই তাদের জীবন, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করে আসছিল। কিন্তু ইউরোপে যখন খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করে নেওয়া হলো- তখন এক বিরাট সংকট দেখা দিল। কারণ খ্রিষ্টানধর্মে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কোনো বিধি-বিধান ছিল না। ঈসা (আ.) এসেছিলেন ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য। কিন্তু ঘটনাক্রমে তা যখন ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের আবাসস্থলের বাইরে অর্থাৎ ইউরোপের রাজারা গ্রহণ করে নিল- তখন তারা স্বভাবতই একে তাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োগ করতে চাইলেন। কিন্তু তা-তো আর এই ধর্মে ছিল না। তখন তারা বাধ্য হয়ে নিজেরা রাষ্ট্রের জন্য তাদের নিজ হাতে বিধান তৈরি করে নিলেন। ফলে শুরু হলো চার্চের সাথে, গীর্জার সাথে- রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব এমন একটা চরম আকার ধারণ করল যে- তার প্রভাব জনগণের মধ্যে পড়তে লাগল। পরিণতি সংঘাত, যুদ্ধ এবং রক্তপাত। ফলে ধর্মের ব্যাপারে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠল।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, সমাজচিন্তাবিদগণ বসে সিদ্ধান্ত নিলেন যে- যেহেতু ধর্ম রাষ্ট্রের দিক-নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ- তাই ধর্মকে ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে রেখে দেওয়া হোক। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন তৈরি করা হোক। রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের কোনো ভূমিকা থাকতে পারবে না। এর ফলে ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ রাজা অষ্টম হেনরির রাজত্বজকালে মানুষ সিদ্ধান্ত নিল যে এখন থেকে সামষ্টিক জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মের অর্থাৎ স্রষ্টার কোনো ভূমিকা থাকবে না। তারা নিজেরা নিজেদের বিধান তৈরি করে নেবে। এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে নতুন একটা সভ্যতা গড়ে উঠল। যে সভ্যতা আজ পাশ্চাত্য বস্তুবাদী, আত্মাহীন, যান্ত্রিক সভ্যতা । এই সভ্যতা দেহ-সর্বস্ব, ভোগ-সর্বস্ব, বস্তু-সর্বস্ব, যেখানে আত্মার কোনো স্থান নেই, আধ্যাত্মিকতার কোনো স্থান নেই।
স্রষ্টা একজন আছেন, এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এটা মানুষ অস্বীকার করতে পারে না। তিনি আমাদের একটা জীবনবিধান দিয়েছেন- সেটাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সুতরাং সামষ্টিক জীবনে দিক নির্দেশনা প্রদান করতে খ্রিষ্ট ধর্মের ব্যর্থতার ফলে ইউরোপের সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হতে শুরু হলো মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত বিধান দিয়ে। দীর্ঘদিন থেকে এটা চলল। আর এই সভ্যতা ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে লাগল সারা পৃথিবীময়। আমাদের এই উপমহাদেশেও তাদের সেই ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে আসল। শাসক প্রভুদের প্রভাবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে আমরাও আমাদের মৌলিক যে বিধান ছিল- অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া আইন, কানুন, অর্থনীতি, দণ্ডবিধি আমরা সেটা পরিত্যাগ করলাম। তাদের কাছে পরাজিত হলাম। আমাদের ঐক্যহীনতা, পারস্পরিক হানাহানি, মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া-ইত্যাদি নানাবিধ কারণে আমরা তাদের দাসে পরিণত হলাম। তখন তারা আমাদের উপর তাদের তৈরি সেই আত্মাহীন ‘সভ্যতা’কে চাপিয়ে দিল।
তাদের তৈরি জীবন ব্যবস্থা দিয়েই আজ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে- যেখানে স্রষ্টার কোনো স্থান নেই। ফলে সমস্ত ন্যায়ের উৎস, সমস্ত জবাবদিহিতার উৎস, সমস্ত সুন্দরের উৎস যিনি- সেই স্রষ্টা- তাঁর শিক্ষা না থাকলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। অন্যায়- অবিচার- দুর্নীতি- জুলুম- সম্পদ লুট করা। কেউ না খেয়ে মরছে রাস্তায়, তাতে কারো আত্মার সামান্য অনুভুতিও নেই। আবার কেউ কোটি কোটি ডলারের পাহাড় জমাচ্ছেন। এই আত্মাহীন জীবনব্যবস্থা প্রয়োগের ফলে সৃষ্টি হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। সুতরাং এই অসত্য আজ সর্বত্র গ্রাস করে আছে।
পাশাপাশি ধর্মীয় অসত্যও আমাদের গ্রাস করেছে। সেই পাশ্চাত্য সভ্যতাই আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছে তাদের অধিকৃত ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে- তারা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে আমাদের এমন একটা ধর্ম শিক্ষা দিয়েছে যার ফলে ধর্মের সত্য দিকটা আর জন্মলাভ করতে পারে নি। ধর্ম যে মানবতার কল্যাণে, ধর্মের যারা বার্তাবাহক, তারা যে সম্পূর্ণ স্বার্থহীনভাবে, মানবতার কল্যাণে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ ও উৎসর্গ করেছেন, মানবজীবনে শান্তি এনেছেন- এই সত্যদিকটা হারিয়ে গেছে। তাহলে ধর্মের অসত্য দিক আসলো প্রধানত তিনটা।
প্রথমত: ধর্মের নামে ব্যবসা, ধর্মের নামে ব্যবসা কখনো কোন কালেই কোন ধর্মের দ্বারাই স্বীকৃত ছিল না। নবী করিম (সা.) ও তাঁর আসহাবগণ, এমনকি কোন নবী রসুলই কখনো ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেন নি, জীবিকার উৎস করেন নি। এটা ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে। এবং পারলৌকিক কল্যাণে। এটা যখন ব্যবসায়ের মাধ্যমে পরিণত হবে তখন এর প্রকৃতরূপ, মৌলিকত্ব আর থাকবে না। সেটা মিথ্যায় পরিণত হবে। ধর্মব্যবসায়ীদের মাধ্যমে একটা সিন্ডিকেট তৈরি হবে। তারা সুবিধা আদায়ের জন্য ধর্মকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতে শুরু করবে।
দ্বিতীয়ত হলো ধর্মের নামে সন্ত্রাস। আজকে যে বোমাবাজী, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, হানাহানি চলছে-এগুলো কোনকালেই ধর্ম দ্বারা সিদ্ধ ছিল না। নবী করিম (সা.) নবুয়্যতের শুরু থেকেই মানুষকে শুধু তওহীদের দিকে আহ্বান করে গেছেন, কলেমার ডাক দিয়ে গেছেন। তিনি ন্যায়ের দিকে, সত্যের দিকে আহ্বান করে গেছেন। তিনি বলেছেন মানুষ যদি এই সত্যকে মেনে নেয় তাহলে তারা পাবে শান্তি, ন্যায় বিচার। দুনিয়াতে তারা হবে সফল এবং পরকালে তারা পাবে মুক্তি। যারা প্রত্যাখ্যান করেছে-তাদেরকে তিনি কিছু বলেন নি। বরং তিনি তাদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারপরও তিনি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আঘাত করেন নি। সুতরাং ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ এটাও ধর্মের অসত্যের দিক, অন্ধকার দিক।
তৃতীয়ত: ধর্মের নামে রাজনীতি। আজকে যে ধর্মীয় রাজনীতির নামে মিছিল, মিটিং, জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদি করা হচ্ছে এসব কিন্তু এসলামে নেই। নবী করিম (সা.) ও তাঁর আসহাবরা তা করেন নি। তিনি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের নিকট সত্য উপস্থাপন করেছেন। যারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন তাদেরকে নিয়ে আলাদা একটি সুখময় ও সমৃদ্ধ সমাজ কায়েম করেছেন। ইতিহাসে আমরা তা জানতে পারি। কিন্তু পরে এই অন্ধকার বিষয়গুলো পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ধর্মে প্রবেশ করেছে। এগুলিও আমদানি হয়েছে ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রমূলক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে। তাই ধর্মের প্রকৃত রূপ, সত্যরূপ আজ হারিয়ে গেছে।
সুতরাং আমাদেরকে আজ ধর্মের সেই সত্য দিকটাকে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি অসত্য কী, মিথ্যা কী- তাও পরিষ্কার করতে হবে। অসত্য হচ্ছে এই যে স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা না থাকার কারণে, সেখানে আত্মিক শূন্যতা সাংঘাতিক আকার ধারণ করেছে। যে জন্য কোন ন্যায় নীতির বালাই নেই। মানবতার কোন বালাই নেই। আইনেরও কোন বালাই নেই। একটু আইনের মারপ্যাঁচের বাইরে যেতে পারলেই তারা ভোগবিলাস এবং অন্যায়ে নিমজ্জিত হয়ে জঘন্য পশুতে পরিণত হয়ে পড়ে। আজ দুর্ভাগ্যবশত আমরা চরম এক মিথ্যার গহ্বরে পতিত হয়ে গেছি। আসুন আমরা মহান স্রষ্টার দেওয়া সুন্দর এবং সত্যকে উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করি।

প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন

প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন


ওবায়দুল হক বাদল:
ব্রিটেনের বিচার মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পরিসংখ্যান বিভাগ কিছুদিন আগে এক ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর ইংল্যান্ডে ৮৫ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া আরও ৪ লাখ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, ২০১২/১৩ সালে ৩৫ ভাগ যৌন অপরাধ ঘটেছে শিশুদের বিরুদ্ধে, যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের ৯০ ভাগ নারীই পরিচিত লোকদের লালসার শিকার। শুধু খোদ ব্রিটেন নয় পশ্চিমা সভ্যতার ধারক-বাহক প্রায় দেশেই একই অবস্থা। আমেরিকার জাতীয় আইন বিভাগের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতি বছর ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৮৬৮ জন নারী ধর্ষিত হয়। উপরোক্ত পরিসংখ্যান যে কোন সুস্থ ও চিন্তাশীল মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আর মানবজাতির জন্য এ এক বিরাট লজ্জা। এই অবস্থার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্মার্ট ফোন ও ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। ৫৪ ভাগ কিশোর পর্নোগ্রাফিতে মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক প্রযুক্তি একদিকে যেমন জীবনকে সহজলভ্য করছে অন্যদিকে এর অপব্যবহার মানুষকে পশুবৎ আচরণ করতে বাধ্য করছে। কোন জিনিস ভালো কি মন্দ তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই জিনিসের ব্যবহারের ওপর। একটা অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি বা খুন করা যায়, সেই অস্ত্রই খুনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে অসহায়কে রক্ষা করা যায়। অস্ত্র নিজে দায়ী নয়, যে সেটাকে ব্যবহার করবে সে দায়ী। পাশ্চাত্য সভ্যতা বর্তমানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে অন্যায়ভাবে। রেডিও-টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মানুষকে ভালো অনেক কিছুই শিক্ষা দিতে পারত কিন্তু এগুলি বর্তমানে মানুষকে হত্যা, সহিংসতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপরাধ, নগ্ন যৌনতা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে তাকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে দিচ্ছে। এই যৌনতা, নগ্নতা, বেহায়পনা, শিশু নির্যাতন-এক কথায় সমস্ত রকম অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধের জন্য অনেক সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র‌্যালি, সমাবেশ, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টকশো প্রভৃতি করা হচ্ছে, বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, প্রচলিত আইন কঠোর থেকে কঠোরতর করা হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে দিন দিন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলোচকগণের সামনে ভয়ঙ্কর রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তারা প্রচলিত মূল্যবোধের বাইরে কোন কথা বলেন না। প্রচলিত মূল্যবোধে কখনও বর্তমানের এ সমস্ত অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধ হবে না। তার প্রমাণ পরিসংখ্যান। অথচ আমরা যদি একটু পিছন দিকে তাকাই, যে সময় স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ পৃথিবীতে কার্যকর ছিল তখন যুবতী নারী গায়ে স্বর্ণের অলঙ্কার আচ্ছাদিত করে শত শত মাইল নির্ভয়ে অতিক্রম করত। বর্তমানে যা কল্পনাও করা যায় না। কল্পনা করা যাক বা না যাক, স্বীকার করা হোক বা নো হোক- এর পরিণতি থেকে আমরা রেহাই পাচ্ছি না। বাইরে আমরা খুবই চাকচিক্য চেহারা আর সুখী সুখী ভাব দেখালেও অন্তরের দিক থেকে চূড়ান্ত দৈন্যতায় ভুগছি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর আত্মহত্যার তালিকার দিকে তাকালেই আমরা এই বাস্তবতা টের পাই। মানুষ সাধারণত পরিসংখ্যান দেখে চোখ ছানাবড়া করে ফেলে, কিন্তু পরিবেশের সাথে মিশে থাকায় উপলব্ধি করে কম। যার কারণে মানুষের ঐ শক্তিটুকু ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যায়। কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে এই সভ্যতার ভেতরটা এতই ফাঁপা হয়ে গেছে যে সামান্য বাতাসেই এটি যে কোন সময় ধূলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে নৈতিকতাহীনতার এই নারকীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে, সভ্যতাকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রচলিত মূল্যবোধ ত্যাগ করে মানুষের সামনে স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই।

আনন্দময়ীর আগমনে

-কাজী নজরুল ইসলাম

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,-আসবি কখন সর্বনাশী?
দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তরে,
রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে’?
বিষ্ণু নিজে বন্দী আজি ছয়-বছরী ফন্দী-কারায়,
চক্র তাহার চরকা বুঝি ভণ্ড-হাতে শক্তি হারায়!
মহেশ্বর আজ সিন্ধুতীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে,
অরবিন্দ চিত্ত তাহার ফুটবে কখন কে সে জানে!
সদ্য অসুর-গ্রাসচ্যুত ব্রহ্মা-চিত্তরঞ্জনে, হায়!
কমগুলুর শান্তি-বারি সিঞ্চি যেন চাঁদ নদীয়ায়।
শান্তি শুনে তিক্ত এ-মন কাঁদছে আরো ক্ষিপ্ত রবে,
মরার দেশের মড়া-শান্তি, সে ত আছেই, কাজ কি তবে?
শান্তি কোথায়? শান্তি কোথায় কেউ জানি না।
মা গো তোর ঐ দনুজ-দলন সংহারিণী মূর্তি বিনা!
দে তারা আজ জ্যোতিহারা, ধ্র“ব তাঁদের যায় না জানা,
কেউ বা দৈব-অন্ধ মা গো, কেউ বা ভয়ে দিনে কানা।
সুরেন্দ্র আজ মন্ত্রণা দেন দানব-রাজার অত্যাচারে,
দম্ভ তাঁহার দম্ভোলি ভীম বিকিয়ে দিয়ে পাঁচ হাজারে।
রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে,
সে কর শুধু পশলো না মা অন্ধ কারার বন্ধ ঘরে।
গগন-পথে রবি-রথের সাত সারথি হাঁকায় ঘোড়া,
মর্ত্যে দানব মানব-পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোঁড়া।
বারি-ইন্দ্র বরুণ আজি করুণ সুরে বংশী বাজায়,
বুড়িগঙ্গার পুলিন বুকে বাঁধছে ঘাটি দস্যু-রাজায়।
পুরুষগুলোর ঝুঁটি ধরে বুরুশ করায় দানব-জুতো,
মুখে ভজে আল্লা হরি, পূজে কিন্তু ডাণ্ডা-গুঁতো।
দাড়ি নাড়ে, ফতোয়া ঝাড়ে, মসজিদে যায় নামাজ পড়ে,
নাই ক’ খেয়াল গোলামগুলোর হারাম এ-সব বন্দী-গড়ে।
‘লানত’ গলায় গোলাম ওরা সালাম করে জুলূমবাজে,
ধর্ম-ধক্ষজা উড়ায় দাড়ি, ‘গলিজ’ মুখে কোরান ভাঁজে।
তাজ-হারা যার নাঙ্গা শিরে গরমাগরম পড়ছে জুতি,
ধর্ম-কথা বলছে তারাই, পড়ছে তারাই কেতাব-পুঁথি।
উৎপীড়কে প্রণাম করে শেষে ভগবানে নমি,
হিজ্রে ভীরুর ধর্ম-কথার ভণ্ডামিতে আসছে বমি।
টিকটিকির ঐ লেজুড় সম দিগি¦দিকে উড়ছে টিকি,
দেব্তার আগে পূজে দানব, তাদের কাছে সত্য শিখি!
পুরুষ ছেলে দেশের নামে চুগ্লি খেয়ে ভরায় উদর,
টিকটিকি হয়, বিষ্ঠা কি নাই-ছি ছি এদের খাদ্য ক্ষুধোর!
আজ দানবের রংমহলে তেত্রিশ কোটি খোজা গোলাম
লাথি খায় আর চ্যাঁচায় শুধু, ‘দোহাই হুজুর, মলাম মলাম!’
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা-বোল নাকি-নাকি,
খাঁড়ায় কেটে র্ক মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি!
হান্ তরবার, আন্ মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় র্ক মা পুরুষ, রক্ত দে মা, রক্ত দেখা!
লক্ষ্মী-সরস্বতীকে তোর আয় না রেখে কমল-বনে,
বুদ্ধি বুড়ো সিদ্ধিদাতা গণেশ-টনেশ চাই না রণে।
ঘোমটা-পরা কলা বৌ-এর গলা ধরে দাও ক’রে দূর,
ঐ বুঝি দেব-সেনাপতি, ময়ূর-চড়া জামাই ঠাকুর?
দূর ক’রে দে, দূর ক’রে দে, এ সব বালাই সর্নাশী,
চাই না ক’ ঐ ভাং-খাওয়া শিব, নেক দিয়া তাঁয় গঙ্গামাসী!
তূই একা আয় পাগ্লী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য ক’রে,
রক্ত-তৃষায় ‘ময় ভখা হুঁর কাঁদন-কেতন কণ্ঠে ধরে’।
‘ময় ভুখা হুঁ’র ক্ষেপী ছিন্নমস্তা আয় মা কালী,
গুরুর বাগে শিব সেনা তোর হুঙ্কারে ঐ ‘জয় আকালী!’

ওঁরা ভালো নেই’, আমরা ভালো আছি তো?

মোখলেছুর রহমান সুমন:
আমরা বর্তমানে যে পথে হাটছি তা আমাদের সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনৈক্য, হানাহানি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, উগ্রপন্থা, ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের সুযোগে আজ দেশের সার্বভৌমত্বই প্রশ্নের মুখোমুখি।
গত সোমবার ৭ ডিসেম্বর দেশের বহুল প্রচলিত জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে চোখ পড়লো। ‘জঙ্গিবাদের হুমকিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, প্রিয়জন ছেড়ে প্রবাসে একাকী জীবন, তবু অন্তরজুড়ে স্বদেশ/ ওঁরা ভালো নেই’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের অব্যাহত হুমকিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এমন কয়েকজন ব্লগার, লেখকদের বর্তমান মানসিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক। নিজের দেশ, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, চিরচেনা শহর, সেই শহরের মানুষগুলোকে ফেলে রেখে বহুদূরের কোনো দেশের অচেনা কোনো শহরে পড়ে থাকা কতটা কষ্টের তা কেবল ভুক্তভোগীরাই উপলব্ধি করে থাকবেন। আর তাও যদি হতো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে, পরিবারের দুঃখ মোচনের অভিপ্রায়ে, উন্নত জীবনের খোঁজে তবে কষ্টদায়ক হলেও বাস্তবতার খাতিরে তেমন জীবন মেনে নেওয়া সহজ হয়। কিন্তু প্রতিবেদনটি এমন কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে যারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে দেশ ছেড়েছেন। ব্লগারদের হিটলিস্ট প্রকাশ করে একের পর খুন, হত্যার হুমকি দিয়ে অব্যাহত ম্যাসেজ, উড়োচিঠি, অজ্ঞাত সন্দেহভাজদের অনুসরণ, সবচেয়ে বড় কথা খুনী বা হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ, যে দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা রয়েছে, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাসী দল ক্ষমতায় রয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী-গোয়েন্দা সংস্থা সবই রয়েছে, সেই দেশের কিছু নাগরিককে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়েছে কেবল উগ্রপন্থীদের চাপাতির কোপের আশঙ্কায়, মৃত্যুভয়ে, তাদের হৃদয়ের অবস্থাটা আসলেই শোচনীয়। তবে তাদেরকে এমন একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখে ফেলে দেওয়ার দায় কেবল সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়াটা সম্ভবত সমীচিন হবে না। খোলা মন নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এর পশ্চাতে আরো অনেকেই দায়ী। এমনকি এর জন্য ভুক্তভোগীরা নিজেরাও দায় এড়াতে পারবেন না। যা হোক সেটা পরে আলোচিত হবে। প্রথমে যে বিষয়টি ওঠে আসে সেটা হলো, দেশে বিরাজিত নিয়ন্ত্রণহীন অসহিষ্ণুতা। ধর্মীয় অহিষ্ণুতাই এখানে সব নয়, একটা দিক মাত্র। আমাদের পুরো জীবনযাত্রা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র যেখানে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে, সেখানে কেবল ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উপর দোষ দিয়ে লাভ নেই। তাতে বরং আমরা প্রকৃত বাস্তবতা থেকে সরে যাব এবং সমস্যার সমাধানেও ব্যর্থ হব। আমাদের রাজনীতির দিকে তাকান। সেখানে ভিন্ন দল-মতের উপর দমন, পীড়ন, জেল-জুলুম চলছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষের উপর যে অন্যায় করেছিল, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত যারাই ক্ষমতায় গিয়েছেন তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ঠিক একই অন্যায় করেছেন। আর সেটা এখন লাগাম ছাড়িয়েছে। বিপরীতে যারা ক্ষমতার বাইরে ছিলেন বা আছেন তারাও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য হরতাল, অবরোধ, হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি করে এসেছেন, এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা মারাত্মক আকার ধারন করেছে। একটি দেশের রাজনীতিতে যখন অসহিষ্ণুতা চরম আকার ধারণ করে এবং রাষ্ট্র তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তখন তা খুব স্বাভাবিকভাবেই সমাজের প্রতি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে তাই হয়েছে। আমাদের পরিবার, সমাজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাঙ্গন প্রতিটি জায়গায় এটা বিস্তার লাভ করেছে। এখন আমরা কেউ কারো সাথে কোনো ব্যাপারেই একমত হতে পারি না এবং অপরের মত ও বিশ্বাসের প্রতি এতটুকু শ্রদ্ধা-সমীহও দেখাতে পারি না। সামান্য ফুটবল খেলা, তাও সেই সুদূর ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে যে খেলায় আমাদের দেশ কোনো দিন অংশগ্রহণ করতে পারেনি আর পারবে কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে, তা নিয়ে যেখানে আমরা মাথা ফাটাফাটি এমনকি খুনোখুনি করে ফেলি, সেখানে ধর্ম বিশ্বাসের ন্যায় একটি বৃহৎ জায়গায় যখন আঘাত লাগে তা মানুষকে কতটুকু উত্তেজিত করে তোলে তা খুব সহজেই অনুমেয়।
এই ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতাকে কেবল নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি তা নয়, একে রীতিমতো নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে, এর পেছনে অনেক শ্রম, মেধা ও অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের সমাজবিজ্ঞানী, গবেষকরা একমত হবেন কি না জানি না, কারণ বর্তমানে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির যেমন অভাব, সত্যকে সত্য বলে স্বীকার করার লোকেরও খুব অভাব। আমাদের রাজনীতিবিদদের বক্তব্য শুনুন। স্থানীয় পর্যায়ে ছোট পরিসরে হোক আর জাতীয় পর্যায়ে বৃহৎ পরিসরে হোক, সেখানে শুনবেন প্রতিপক্ষের প্রতি বক্তাদের কি অপরিমেয় ঘৃণা আর ক্রোধ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা নেতার বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য শুনে উল্লাসে মেতে ওঠে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণেরা। এই বিদ্বেষ কি জনসভার সেই মাঠেই হারিয়ে যায়, নাকি সেটা রাজপথ পর্যন্ত গড়ায় সেটা কি আমাদের নেতৃবৃন্দ খেয়াল করেন না? অবশ্যই করেন। কিন্তু তাদের কাছে এটা ইতিবাচক, বলা চলে একটা অতিপ্রয়োজনীয় অস্ত্র। আপনার দলের কর্মী-সমর্থকদের মনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যত ঘৃণার জন্ম দিতে পারবেন, তাদেরকে আপনি তত বেশি মারমুখী করে তুলতে পারবেন। আর আপনার চিন্তা যেহেতু রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা সুতরাং এই ঘৃণার বাণী ভেতরে ভেতরে জাতির কত বড় সর্বনাশ করে চলেছে সেটা আপনার কাছে মুখ্য নয়।
আমাদের সংস্কৃতির দিকে তাকান। আবহমান বাংলার যে গান, শিল্প-সাহিত্য মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার কথা বলতো, দেশপ্রেম জাগ্রত করতো, মানুষ মানুষ হিসেবে ভালোবাসার প্রেরণা দিত সেগুলো হারিয়ে গেছে। তার স্থান করে নিয়েছে বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণে তৈরি নাটক, সিনেমা, গল্পের বইগুলো যেগুলোতে নগ্নতা, যৌনতা থেকে শুরু করে দাঙ্গা, মারামারি, সন্ত্রাস, উগ্রপন্থাকে উপস্থাপন করা হয় অত্যন্ত যতœ সহকারে। নির্মাতারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই নেতিবাচক বিষয়গুলোকে এতটা আকর্ষণীয় করে তোলেন যে তা আমাদের আড়াই-তিন ঘণ্টা রীতিমতো সম্মোহিত করে রাখে। এই গল্প ও দৃশ্যগুলো কি সিনেমার হলেই সীমাবদ্ধ থাকে নাকি সমাজে এর প্রভাব রয়েছে সেটা কি বিবেচনার বিষয় নয়? নাকি ব্যবসাটাই সবচেয়ে বড়?
সমাজে এখনো অনেক ভাল কাজ হয়। মানুষকে উত্তম কাজে উৎসাহিত করবে এমন অনেক কিছু এখনো আমাদের চারপাশে ঘটে। কিন্তু আমাদের খবরের কাগজগুলোর দিকে তাকান। সেখানে কোনো ভাল সংবাদ পাওয়া যায় না। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অধিকাংশ পাতাতেই খুন, ধর্ষণ, রাজনৈতিক কোন্দল, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্নীতি, মামলা, হামলা ইত্যাদির ছড়াছড়ি। সেই ফাঁকে কাটতি বাড়ানোর জন্য প্রথম পাতার উপরের দিকে ডানে অথবা বামে আর ভেতরের যে কোনো একটা পুরো পৃষ্ঠায় অশ্লীল কিছু ছবি সংবলিত সংবাদ। এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম যে, সুন্দর, ভালো কাজের প্রচার ভালো কাজকে উৎসাহিত ও প্রসারিত করে। বিপরীতে খারাপ কাজের প্রচার খারাপকে প্রসারিত করে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সচেতনভাবে হোক আর অবচেতনভাবে হোক আমাদের পত্রিকাওয়ালারা একে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে, ‘যা কিছু মন্দ তাই সংবাদ হওয়ার যোগ্য’। তাদের এই নীতি সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ‘ফিল্মি স্টাইলে’ খুন বা অপহরণ বা ধর্ষণের সবিস্তারিত বর্ণনাগুলো সমাজে এমন অপরাধকে উৎসাহিত করছে এটা কি কেউ মনে করেন না? কয়েক মাস আগে পত্রিকান্তরে জানা গেল, নাটোরে মাদ্রাসা পড়–য়া তিন শিক্ষার্থী তাদের এক বন্ধুকে গুম করে মুক্তিপণ দাবি করে না পেয়ে তাকে হত্যা করে। তারপর লাশ খুব কায়দা করে সেপ্টিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেয়। অপরাধীদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ বা তার নিচে। কথা হচ্ছে এত অল্প বয়সে তারা এত বড় দুঃসাহসী পরিকল্পনা কিভাবে করলো। নিঃসন্দেহে আমাদের নাটক-সিনেমার গল্প কিংবা পত্রিকায় অপরাধের ‘ফিল্মি স্টাইল’ এর প্রতিবেদনগুলো তাদের প্রভাবিত করেছে।
শুরুতে ব্লগারদের ব্যাপারে আমরা কথা বলছিলাম। ব্লগাররা, বিশেষ করে উগ্রপন্থীদের হাতে যারা সম্প্রতি খুন হয়েছেন এবং যারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তাদের মুটামুটি সবাই ধর্মের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন যেটাকে ধর্মবিদ্বেষ বলা হয়ে থাকে। আজকের যুগে এটা খুব স্বাভাবিক। কারণ ধর্মের নামে সমাজে এমন অসংখ্য অধর্ম প্রচলিত আছে, এমন অনেক কূপমণ্ডূকসুলভ বিষয় চলছে যা ধর্মের প্রতি মানুষকে বিদ্বেষী করে তোলার জন্য যথেষ্ট। মানবতার কল্যাণে আগত ধর্মগুলো তাদের প্রকৃত রূপ হারিয়ে ফেলার কারণে এমনটা হয়েছে। এখন নাস্তিক বা ধর্মবিদ্বেষী যে নামেই সম্বোধন করি না কেন, ভিন্ন মতাবলম্বীদের একটা বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল যে, এদেশের ১৬ কোটি মানুষের মোটামুটি সবাই ধর্মে বিশ্বাসী। কেবল বিশ্বাসী নয়, ধর্ম তাদের নিকট অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার একটি বিষয়। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিকট তাদের নিজ নিজ ধর্মের মহামানবদের স্থান খুবই স্পর্শকাতর একটি জায়গায়। আপনি যখন এমন একজন মহামানবের ব্যাপারে সমালোচনা করবেন, আপনার সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে আপনি তা করতে পারেন। কিন্তু আপনার সমালোচনা হতে হবে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত, অকাট্য দলিলসমৃদ্ধ, ভাষাগতভাবে মার্জিত। এক কথায় আপনার সমালোচনার ভাষা যেন বিশ্বাসী ব্যক্তিদের আহত না করে, তাদের সংক্ষুব্ধ না করে, তাদের মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়ার ক্ষমতা স্বয়ং সংবিধান দ্বারা রহিত করা হয়েছে। আপনি যদি এই বাস্তবতাকে স্বীকার না করেন তবে সেটা হবে আপনার ব্যর্থতা। সেক্ষেত্রে আপনি মানুষের হৃদয়কে বুঝতে অক্ষম। আপনি স্বয়ং মানুষের চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল। সুতরাং অপরের নিকট হতে আপনি শ্রদ্ধাপ্রাপ্তির প্রত্যাশা করতে পারেন না। ব্লগারদের ব্যর্থতা এখানেই যে তারা বিশ্বাসী মানুষদের হৃদয়ের এই স্পর্শকাতর জায়গাটিকে স্বীকার করেন না বা করতে চান না। সেটা সচেতনভাবে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাকি নিজের অজ্ঞতাবশত তা কেবল তারাই বলতে পারবেন। কথা হচ্ছে, তারা দেশকে ভালোবাসেন, দেশের মাটিতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চান, দেশের মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, দেশের মানুষের মধ্যে ঘৃণার জন্ম নেয়, মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে সরকার তা সামাল দিতে হিমশিম খায়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এমন পরিস্থিতির দিকে দেশকে ঠেলে দিয়ে তাদের স্বার্থ কি? তারা নিজেদের মুক্তমনা বলে বিশ্বাস করেন এবং সগর্বে তা প্রচার করেন। একজন মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কেন এই সাধারণ সত্যটুকু বুঝতে পারে না, একটি দেশ যে দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ ধর্মবিশ্বাসী সেখানে ধর্মের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে অন্তত আর যাই হোক সেই ধর্মের মহামানবদের গালিগালাজ করাটা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। যারা জীবনে দুয়েকবার হলেও ব্লগে লেখালেখি পড়েছেন, তারাও জানেন কি বিশ্রী ভাষায় সেখানে ধর্মকে উপস্থাপন করা হয়। এটা কোনোভাবে মুক্তবুদ্ধির পরিচয় হতে পারে না। বিশেষ করে সমাজের সর্বত্র যখন অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা, উগ্রতা, ারড়ষবহপব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে তখন মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ন্যায় স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত মৃদু প্রতিক্রিয়া আশা করা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। কিংবা নির্বুদ্ধিতা না বলে একেও এক ধরনের উগ্রপন্থা বলা যায়।
এই লেখাটি পড়ে কেউ যদি মনে করেন আমি উগ্রপন্থীদের সাফাই গাইতে কলম ধরেছি সেটা অবিচার হবে। আমি কেবল সমাজে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার ব্যাপারে আমার আতঙ্কের কথাটা তুলে ধরেছি এবং বলতে চেয়েছি এই পরিস্থিতিতে মানুষের ধর্মপ্রসূত উগ্রপন্থাকে নির্মূল করতে হলে আগে মূলে নজর দিতে হবে। সমাজের বর্তমান অস্থিতিশীল, অসহিষ্ণু পরিস্থিতিতে কারো কাছ থেকে সহিষ্ণু আচরণ প্রত্যাশা করার আগে নিজের আচরণকে সংযত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজকে গড়ে তুলতে হবে ন্যায়, সততা, সুবিচার, সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের উপর। ঘৃণার বাণী ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। আমাদের প্রেমের কথা, মানবের কল্যাণের কথা বলতে হবে, ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার কথা মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। তখন দেখা যাবে অনেক বড় বড় সমস্যা আলাদাভাবে সমাধান করতে হচ্ছে না, আপনাতেই সেগুলো ঠিক হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদিতে বিদ্বেষের চর্চা করে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনকে প্রেমময় করে তুলতে পারব না। আমাদের এ কথা মনে রাখতে হবে, ঘৃণা ঘৃণারই বিস্তার ঘটায়, ক্রোধঘটিত কোনো কর্ম নতুন ক্রোধের জন্ম দেয়। বিপরীতে প্রীতির কথা, সমানুভূতির কথা সমাজকে সুন্দর করে তোলে। আমরা বর্তমানে যে পথে হাটছি তা আমাদের সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনৈক্য, হানাহানি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, উগ্রপন্থা, ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের সুযোগে আজ দেশের সার্বভৌমত্বই প্রশ্নের মুখোমুখি। এই ভূ-খণ্ডকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের আলামত পাচ্ছি আমরা। আজ তেমন কোনো বৃহৎ ঘটনা যদি ঘটে আমাদের কি পরিণতি হবে আমরা কি ভেবে দেখব না? যে ব্লগাররা দেশে নিজেদের নিরাপদ বোধ করেননি তারা পৃথিবীর বিভিন্ন সমৃদ্ধ দেশে আশ্রয় পেয়েছেন। আমাদের কে আশ্রয় দেবে? বেচারা ব্লগাররা আর যাই হোক আশ্রয়টুকু তো পেয়েছেন। সেখানে খেয়ে পড়ে একটা ছাদের নিজে ঘুমাতে তো অন্তত পারছেন। কিন্তু আমাদের সবার গায়ে তো ‘মুক্তমনা’ ট্যাগ নেই। দেশের বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্র যদি বাস্তবায়িত হয় তবে আমাদের অবস্থা নিশ্চয়ই আজকের সিরীয়দের চেয়ে অধিক সুখকর হবে না।