Wednesday, March 2, 2016

নামাজ নয়-‘সালাহ’

নামাজ নয়-‘সালাহ’

কাজী মাহফুজ
আল্লাহর দেয়া মানুষের জন্য জীবন বিধানে সালাতের গুরুত্ব ও মূল্য অত্যন্ত অধিক। তাঁর কোর’আনে আল্লাহ আশি বারেরও বেশি সালাহ্-কে উল্লেখ করেছেন, সালাহ্ কায়েম করতে বলেছেন। আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ, লক্ষ লক্ষ বিরাট বিরাট সুদৃশ্য মসজিদে দিনে পাঁচবার একত্রিত হয় সালাহ্ কায়েম করতে, আল্লাহর আদেশ পালন করতে। কিন্তু আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে মুমিনদের সালাহ্ কায়েম করতে আদেশ করেছেন সে উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না। একশ’ পঞ্চাশ কোটির এই জাতিটি, যে জাতিটি নিজেদের মুমিন, মুসলিম ও উম্মতে মোহাম্মদী বলে বিশ্বাস করে, এই জাতিটি আজ পৃথিবীর অন্য সব জাতি দ্বারা পরাজিত লাঞ্ছিত, অপমানিত, নিগৃহিত। আল্লাহর রসুল পৃথিবী থেকে চলে যাবার সময় তাঁর গড়া এ জাতিটি সংখ্যায় ছিল পাঁচ লাখের মত। এটা ইতিহাস যে আল্লাহর রসুল চলে যাবার পর ৬০/৭০ বছরের মধ্যে ঐ ছোট্ট জাতিটি, একটি একটি করে নয়, এক সঙ্গে তদানীন্তন পৃথিবীর দু’টি বিশ্বশক্তি রোম ও পারস্যকে আক্রমণ করে তাদের সামরিকভাবে পরাজিত করে অর্ধেক পৃথিবীতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই পাঁচলাখের জাতিটাও সালাহ্ কায়েম করতো, আজ একশ’ পঞ্চাশ কোটির এই জাতিটাও সালাহ্ কায়েম করে, অন্তত করে বলে বিশ্বাস করে। তাহলে সেই একই কাজ করে, আল্লাহর একই আদেশ পালন করে সেই পাঁচ লাখের প্রায় নিরক্ষর, চরম দরিদ্র জাতি বিশ্বজয় করল আর বর্তমানের একশ’ পঞ্চাশ কোটির জাতি, তাদের মধ্যে বহু উচ্চ শিক্ষিত, আলেম, পীর মোরশেদ থাকা সত্ত্বেও, বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের একটা বিরাট অংশের মালিক হওয়া সত্ত্বেও আজ বিশ্বের সমস্ত জাতি দ্বারা পরাজিত, নিগৃহিত। একই কাজ করে, আল্লাহর একই আদেশ পালন করে পরিণতি, ফল শুধু আকাশ পাতাল নয়, একেবারে উল্টো কেন?
এই ‘কেন’র জবাব অনেক ব্যাপক। আজকে নামাজ শব্দটা ব্যবহার না করে সালাহ্ শব্দ কেন ব্যবহার করছি তা বলছি। এ উপমহাদেশে সালাতের বদলে নামাজ শব্দটা ব্যবহারে আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে সালাহ্ বললে অনেকে বুঝিই না সালাহ্ কি। কোর’আনে কোথাও নামাজ শব্দটা নেই কারণ কোর’আন আরবি ভাষায় আর নামাজ পার্শি অর্থাৎ ইরানি ভাষা। শুধু ঐ নামাজ নয় আরও অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার কোরি যা কোর’আনে নেই। যেমন খোদা, রোজা, বেহেশত, দোযখ, ফেরেশতা, জায়নামাজ, মুসলমান, পয়গম্বর ইত্যাদি। এই ব্যবহার মুসলিম দুনিয়ায় শুধু ইরানে এবং আমাদের এই উপমহাদেশে ছাড়া আর কোথাও নেই। এর কারণ আছে। কারণটা হলো- ইরান দেশটি সমস্তটাই অগ্নি-উপাসক ছিল। আল্লাহর নবীর সুন্নাহ পালনের জন্য উম্মতে মোহাম্মদী যখন ইরানকে তিন শর্তের একটি মেনে নেয়ার আমন্ত্রণ দিলো তখন ইরান পৃথিবীর দুই বিশ্বশক্তির একটি; অন্যটি খ্রিস্টান রোমান। ঐ তিন শর্ত হলো-
১) আল্লাহর রসুল সত্য দীন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন- এই দীন মেনে নিয়ে মুসলিম হয়ে যাও, তাহলে তোমরা আমাদের ভাই হয়ে যাবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল এই দীনকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার যে দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পণ করেছেন, সে দায়িত্ব তোমাদের ওপরও বর্তাবে। ২) যদি তা গ্রহণ না করো তবে আমাদের বশ্যতা স্বীকার করো, আমরা আল্লাহর দেয়া দীন, কোর’আনের আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করবো; তোমরা যার যার ধর্মে থাকবে, আমরা বাধাতো দেবই না বরং সর্বপ্রকারে তোমাদের এবং তোমাদের ধর্মকে নিরাপত্তা দেব; বিনিময়ে তোমাদের যুদ্ধক্ষম লোকেরা বার্ষিক সামান্য একটা কর দেবে, যার নাম জিজিয়া। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, স্ত্রীলোক, রোগগ্রস্ত মানুষ এবং বালক-বালিকা, শিশুগণকে এ কর দিতে হবে না। এর পরও তোমাদের রক্ষার জন্য যুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে যেসব যুদ্ধক্ষম লোক আমাদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করবে তাদের ঐ জিজিয়া দিতে হবে না। ৩) যদি এই দুই শর্তের কোনোটাই না মেনে নাও তবে যুদ্ধ ছাড়া আর পথ নেই। আমরা তোমাদের আক্রমণ করে পরাজিত করে আল্লাহর দীন, জীবন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব।
এটা ইতিহাস যে প্রচণ্ড শক্তিশালী, অন্যতম বিশ্বশক্তি ইরান অবজ্ঞাভরে ঐ প্রথম দুই শর্ত উপেক্ষা করে তৃতীয় শর্ত যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল ও অল্প সময়ের মধ্যে ঐ ছোট্ট উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে গিয়েছিল। পরাজিত হবার পর প্রায় সমস্ত ইরানি জাতিটি অল্প সময়ের মধ্যে পাইকারি ভাবে দীন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। এই ঢালাও ভাবে মুসলিম হয়ে যাবার ফলে তারা ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি তা পূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হলো না অর্থাৎ তাদের আকিদা সঠিক হলো না। তারা ইসলামে প্রবেশ করল কিন্তু তাদের অগ্নি-উপাসনার অর্থাৎ আগুন পূজার সময়ের বেশ কিছু বিষয় সঙ্গে নিয়ে ইসলামে প্রবেশ করল। আগুন উপাসনাকে তারা নামাজ পড়া বোলত, সালাহ্-কে তারা নামাজ বলতে শুরু করল, তাদের অগ্নি-উপাসনার ধর্মে উপবাস ছিল, তারা সাওমকে রোজা অর্থাৎ উপবাস বলতে লাগলো, মুসলিমকে তারা পার্শি ভাষায় মুসলমান, নবী-রসুলদের পয়গম্বর, জান্নাহ-কে বেহেশত, জাহান্নামকে দোযখ, মালায়েকদের ফেরেশতা এমন কি মহান আল্লাহর নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে খোদা ইত্যাদিতে ভাষান্তর করে ফেললো। শুধু যে সব ব্যাপার আগুন পূজার ধর্মে ছিল না, সেগুলি স্বভাবতই আরবি শব্দেই রয়ে গেল; যেমন যাকাহ, হজ্ব ইত্যাদি। তারপর মুসলিম জাতি যখন ভারতে প্রবেশ করে এখানে রাজত্ব করতে শুরু করল তখন যেহেতু তাদের ভাষা পার্শি ছিল সেহেতু এই উপমহাদেশে ঐ পার্শি শব্দগুলির প্রচলন হয়ে গেলো। এক কথায় বলা যায় যে, আরবের ইসলাম পারস্য দেশের ভেতর দিয়ে ভারতে, এই উপমহাদেশে আসার পথে পার্শি ধর্ম, কৃষ্টি ও ভাষার রং-এ রং বদলিয়ে রঙ্গীন হয়ে এলো।
ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম:- অগ্নি-উপাসক ইরান না হয়ে যদি মুর্তিপূজক হিন্দু ভারত উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হয়ে ইসলাম ভালো করে না বুঝেই ব্যাপকভাবে, ঢালাওভাবে এই দীনে প্রবেশ কোরত তবে তারা সালাহ্-কে পূজা বা উপাসনা, সাওমকে উপবাস, নবী-রসুলকে অবতার, জান্নাহ-কে স্বর্গ, জাহান্নামকে নরক, মালায়েকদের দেবদূত, দেবতা, আল্লাহকে ভগবান বা ঈশ্বর ইত্যাদি চালু করে ফেলতো এবং আমরা যেমন এখন নামাজ, রোজা, বেহেশত, দোযখ, পয়গম্বর, ফেরেশতা, খোদা শব্দগুলি ব্যবহার কোরি তেমন করে ঐ ভারতীয় শব্দগুলি ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে যেতাম।
আমাদের উচিৎ এই পার্শি শব্দগুলির ব্যবহার ত্যাগ করে আল্লাহ কোর’আনে যে শব্দগুলি ব্যবহার করেছেন সেই শব্দগুলি আবার চালু করার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে সতর্ক করে বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহর আছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা তাঁকে সে নামেই ডাক, যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে (সুরা আরাফ- ১৮০) তাই খোদা শব্দের বদলে আল্লাহ, নামাজের বদলে সালাহ্ এবং রোজার বদলে সওম শব্দ, পয়গম্বরের বদলে নবী ব্যবহার করাই শুদ্ধ।

Tuesday, March 1, 2016

জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় ধর্মবিশ্বাস

জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় ধর্মবিশ্বাস


শফিকুল আলম উখবাহ
জঙ্গিবাদ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট। বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ হানা দিয়েছে। জঙ্গিবাদের ইস্যুতে বিশ্বের বহু দেশে এই মুহূর্তে যুদ্ধ চলছে। আমাদের দেশেরও ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং সমগ্র বিশ্বে মুসলিমদেরকেই সন্ত্রাসী হিসাবে পরিচিত করে তুলতে ব্যাপক প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে যার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।
জঙ্গিবাদের মোকাবেলায় যত বেশি শক্তিপ্রয়োগ করা হচ্ছে ততই জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা অনুমাননির্ভর কথা নয়, এটা পরিসংখ্যান।
শক্তিপ্রয়োগ অপরাধ দমনের অন্যতম উপায়, তবে প্রধান উপায় হচ্ছে শিক্ষা। এ কারণে শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। সুশিক্ষা একটি জাতিকে নৈতিক বলে বলীয়ান করে তোলে যা চরিত্রের মধ্যে প্রোথিত হয়ে তাকে অপরাধ থেকে ফিরিয়ে রাখে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা মানবসভ্যতা অনাদিকাল থেকে পাপ, গোনাহ, অপরাধ ও আইনভঙ্গ থেকে ফিরিয়ে রেখে মানবতা, দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। জঙ্গিবাদ কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি একটি আদর্শিক সন্ত্রাসবাদ যার প্রতিবিধানের জন্য রাষ্ট্রগুলোর হাতে শক্তিপ্রয়োগ ব্যতীত অন্য কোনো পন্থা নেই; উপরন্তু যে ধর্ম মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখার কথা সেই ধর্মের অপব্যাখ্যা দ্বারাই মানুষ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের পন্থা যে ফলপ্রসূ হচ্ছে না, এর জন্য অন্য উপায় লাগবে এ কথাটি এখন অনেকেই অনুভব করছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন যে, জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, জঙ্গিবাদের বিপরীতে তাদেরকে অনুপ্রাণিত ও প্রণোদিত (গড়ঃরাধঃব) করতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে কী বললে জঙ্গিরা তাদের পথ পরিত্যাগ করবে এবং নতুন করে কেউ আর জঙ্গি হবে না? এবং কীভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে?
যে কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য তার উৎপত্তি সম্পর্কে আগে জানতে হয়। এটা যদি একটা অসুখের মতো হয় এবং এর জন্য ডাক্তার দেখানো হয়, সেক্ষেত্রে ডাক্তারের প্রথম কাজ কী হবে? তিনি প্রথমে রোগীর লক্ষণগুলো দেখবেন যে এ রোগের ফলে রোগী কী ধরনের আচরণ করছে এবং এ আচরণের ফলে তার এবং তার আশেপাশের মানুষের কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। তারপরই তিনি ভাববেন এটার উৎপত্তির কারণ কী? উৎপত্তির কারণ না জেনে চিকিৎসা করলে ওষুধপত্র দিয়ে সাময়িকভাবে রোগের লক্ষণ (যেমন জ্বর) দূর করা গেলেও রোগ নির্মূল করা যাবে না, সেটা বার বার হবে। একইভাবে জঙ্গিদেরকে যদি জঙ্গিবাদ থেকে ফেরাতেই হয় তাহলে তা করতে হবে জঙ্গিবাদের উৎপত্তিস্থল থেকে। জঙ্গিবাদের উৎপত্তি কোথা থেকে হয়েছে? ধর্মের বিকৃত শিক্ষা থেকে। অতএব, যারা জঙ্গিদেরকে ধর্ম থেকেই যুক্তি তুলে ধরে বোঝাতে হবে যে, এটা সঠিক পথ নয়। রোগের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিষেধক জরুরি। জঙ্গিবাদের প্রতিকার করার ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে কিন্তু প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আদর্শের কোনো বিকল্প নেই।
এখন এই বিষয়টি জনগণকে বোঝাতে হলে যেসব বিষয়বস্তু, তথ্য প্রমাণ, ধর্মীয় যুক্তি দরকার যা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করবে তা বর্তমান ধর্মীয় শিক্ষায় নেই, সাধারণ শিক্ষায়ও নেই। কিন্তু সেই আদর্শ আমাদের কাছে আছে। আমাদের এমামুয্যামান তাঁর অভিমত ২০০৯ সনে একটি পত্রের মারফত বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জঙ্গিবাদ ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যার ফল। শক্তিপ্রয়োগের পাশাপাশি সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হলে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব। তিনি এই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব করেছিলেন।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ইদানীং আল্লাহ-রসুলের সম্পর্কে কটূক্তিকারীদেরকে গোপনে ও প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে। যারা রসুলাল্লাহকে নিজেদের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসেন, তাদের অনুভূতিকে অবজ্ঞা করার কোনো উপায় নাই, ঠিক একইভাবে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির অভিলাসী বাম আদর্শকেও আমরা অবজ্ঞা করতে পারি না। যে কোনো নিঃস্বার্থ আদর্শকে অস্বীকার করাই অনৈতিক, যদিও সব আদর্শ পরিণামে মানুষকে শান্তি দিতে সফল হয় না। যাহোক যারা এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে তাদেরকে আমরা বলতে পারি, তুমি যে রসুলকে গালাগালি করার কারণে তাকে মেরে ফেললে এটা কি রসুলাল্লাহর রেখে যাওয়া আদর্শ, পন্থা (সুন্নাহ) মোতাবেক সঠিক হলো? যদি না হয়ে থাকে তাহলে তোমার এই কাজে আল্লাহও সন্তুষ্ট হবেন না, রসুলাল্লাহও সন্তুষ্ট হবেন না। আগে তোমাকে বুঝতে হবে এই কাজের ক্ষেত্রে রসুলাল্লাহর নীতি কি? রসুলাল্লাহর ১৩ বছরের মক্কী জীবনে তাঁকে কী নির্যাতন, অপমান, অপদস্থই না করা হয়েছে, তিনি কি পারতেন না তাঁর অনুগত আসহাবদেরকে দিয়ে বিরোধী নেতৃবৃন্দকে গুপ্তহত্যা করাতে, জ্বালাও পোড়াও, ভাঙচুর করাতে? তিনি তা করেন নি। আমাদের দেশের একটি ধর্মান্ধ শ্রেণি প্রায়ই ইসলামবিদ্বেষীদের কর্মকাণ্ডে মূর্খের ন্যায় উত্তেজিত হয়ে নিজ দেশের সম্পদ, রাস্তাঘাট ভাঙচুর করেন, নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করেন। কিন্তু আল্লাহর রসুল তা করেন নি। তিনি অটল, অনড়, সংশপ্তক হয়ে সত্যের প্রচার ও প্রকাশ ঘটিয়ে গেছেন। একটা সময় তাঁর জীবনে এসেছে যখন ঐ বিরোধীরা নবীর প্রচারিত সত্যকে গ্রহণ করে তাঁরই অনুসারী হয়ে গেছেন। আর যারা বিরোধিতায় অটল ছিল তারা কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। তাই গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাস সৃষ্টির মতো নিষ্ফল প্রয়াস না করে কার্যকর পদক্ষেপ হলো জাতিকে ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা, জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে প্রাকৃতিক নিয়মেই বিজয় তাদেরকে অনুসরণ করবে। গত তেরশ বছর ধরে মুসলিম জাতিটির মধ্যে শিয়া-সুন্নী দাঙ্গা করে লক্ষ-কোটি মুসলিম দাবিদার মারা যাচ্ছে। আজও সিরিয়া, ইরাক, ইয়ামেন, আরব, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশে শিয়া-সুন্নী দাঙ্গা অব্যাহত আছে। গত ৫ বছরে সিরিয়াতে আড়াই লক্ষ মানুষ এই অন্তর্কোন্দলে নিহত হয়েছে। মসজিদে হামলা চালিয়ে এক মুসুল্লি আরেক মুসুল্লিকে হত্যা করছে। জাতির এই যখন অভ্যন্তরীণ অবস্থা তখন ইসলাম-বিদ্বেষী শ্রেণি ইসলামের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাতেই পারে। এই সুযোগ থাকবে না যদি এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা যায়। তাই রসুলের সুন্নাহ হচ্ছে সেটা করা। জঙ্গিদেরকে বোঝাতে হবে যে, তোমরা যে কাজ করছ তা দ্বারা তোমরা একূল ওকূল দু’টিই হারাচ্ছো। এতে তোমার সওয়াব হবে না বরং গুনাহ হবে। আর ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর যে এজেন্ডা পশ্চিমা বিশ্ব নিয়েছে সেটা তাতে আরো বৃদ্ধি পাবে। তাদের কাছে আছে বিরাট বিশাল সামরিক শক্তি, এবং আছে প্রভূত পার্থিব সম্পদ। পক্ষান্তরে এই ক্ষুদ্রসংখ্যক জঙ্গিদের কাছে ওসব কিছুই নেই, তাদের পার্থিব সম্পদ, তেল গ্যাস ইত্যাদিও তাদের হাতে নেই, সেগুলো তাদের সরকারগুলোর হাতে, যারা ইতোমধ্যেই পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর পায়ে সাজদায় প্রণত হয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে কার্যত অস্বীকার করে পশ্চিমা শক্তি ও জীবনদর্শনকেই প্রভু ও বিধাতা বলে স্বীকার করে নিয়েছে। সুতরাং মরিয়া হয়ে তারা ভুল কাজ করছেন। তারা এখানে ওখানে বোমা ফাটাচ্ছেন, পর্যটন কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করছেন। তাতে পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কোন ক্ষতি না হওয়ায় তারা শরীরে বোমা বেঁধে আত্মঘাতি হচ্ছেন। এতে প্রতিপক্ষের কী ক্ষতি হয়েছে? ধরতে গেলে কিছুই না। টুইন টাওয়ার গেছে তাতে কী হয়েছে? এখন ঐ স্থানেই সেই টুইন টাওয়ারের চেয়েও বড় টাওয়ার তৈরি করেছে। বরং এতে প্রতিপক্ষের লাভই হচ্ছে। পৃথিবীর মানুষকে সে বলছে যে দেখ! এরা কী রকম সন্ত্রাসী। এরা নিরীহ নিরপরাধ মানুষ, স্ত্রীলোক, শিশু হত্যা করছে। এদের ধর, মার, জেলে দাও, ফাঁসি দাও। পৃথিবী তার এ কথা মেনে নিয়েছে এবং তার নির্দেশ মোতাবেক তা-ই করছে, কারণ ইংরাজি প্রবাদ বাক্য গরমযঃ রং ৎরমযঃ অর্থাৎ মহাশক্তিধরের কথাই ঠিক।
এই কথাগুলো জঙ্গিবাদীদেরকে বোঝাতে হবে যে, তোমাদের এই কাজের দ্বারাই তোমাদের প্রতিপক্ষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে। সেই ঐক্যের সামনে তোমরা দাঁড়াতেই পারবে না। যেমনটা হয়েছে শার্লি হেবদোর ঘটনায়। যে পত্রিকা কেউ চিনত না, সেটার নাম এখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মুখে মুখে। সুতরাং এই ভুল পন্থা ছাড়ো। এই ব্যাপারটি বোঝানোর পরের কাজ দুইটি।
প্রথমত, যারা ইতোমধ্যেই জঙ্গি হয়ে গেছে তারা নৈতিক বল হারিয়ে ফেলবে, তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আর একাজে যাবে না। তারা সবাই হুট করেই পূর্ণভাবে নিবৃত হয়ে যাবে এটা আমরা বলছি না। কিন্তু তারা অধিকাংশই নিজেদের কাজ সম্পর্কে দ্বিধান্বিত হয়ে যাবে। তারা একটা মধ্যবর্তী অবস্থায় উপনীত হবে। এই দ্বিধাই তাদেরকে বেপরোয়া হতে বাধা দেবে।
দ্বিতীয়ত, আরেকটা ভাগ রয়ে যাবে যারা তারপরও ওই ধরনের কর্মকাণ্ড করতেই থাকবে। কিন্তু তখন তাদের সংখ্যা হবে কম। তখন তাদেরকে নিবৃত্ত করতে রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রয়োজন পড়বে। জনগণ প্রকৃত শিক্ষা পেলে স্বভাবতই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে, তারা সরকারকে জঙ্গিদমনে সহযোগিতা করবে, জঙ্গিদের রিক্রুটমেন্টও বন্ধ হবে। জঙ্গিদের সংখ্যা কম থাকলে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগে তা নির্মূল করা সম্ভব হবে। এই শিক্ষা দিতে হবে সর্বতোভাবে, উভয়প্রকার শিক্ষাব্যবস্থায় এবং গণমাধ্যমের দ্বারা। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটি শিক্ষাকে আমরা উদাহরণ হিসাবে দিলাম, এমন বহু বিষয় আছে যা জঙ্গিবাদ ও এর উৎপত্তির প্রতিটি পথ বন্ধ করে দিতে সক্ষম হবে এটা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি।
কিন্তু এখন যদি রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করে উগ্রপন্থী ইসলামিস্টদের দমন করতে চায় তাহলে জনসাধারণের ধর্মানুভূতি, ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। কারণ তাদের আছে ধর্মনেতার ভাবমূর্তি। তারা সাধারণ জনগণকে বলবে দেখ আমরা রসুলের জন্য এতোকিছু করছি অথচ সরকার আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। অতএব সরকার ইসলামবিরোধী, নাস্তিক, তার বিরুদ্ধে জেহাদ করার ফতোয়াও তারা দিয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে অতীতে এটা বহুবার হয়েছে। প্রতিবারই জনগণ তাদের কথায় প্রভাবিত হয়েছে।
কাজেই এখন বল শুধুমাত্র বল প্রয়োগের যে পন্থা নেওয়া হয়েছে তা থেকে সরে এসে এদর্শিক এই লাড়াই চালাতে হবে।

ধর্ম ও উপাসনা

ধর্ম ও উপাসনা


মো. মনিরুজ্জামান
ধর্ম ও ধারণ একই শব্দ থেকে এসেছে। যে গুণ বা বৈশিষ্ট ধারণ করে কোনো বস্তু তার স্বকীয়তা, নিজস্বতা পায় তাকেই ঐ বস্তুর ধর্ম বলে। যেমন একটি লৌহদণ্ড আকর্ষণ করার গুণ ধারণ করে চুম্বকে পরিণত হয়। এই আকর্ষণ করার গুণটিই হলো ঐ চুম্বকের ধর্ম। যদি কোনো কারণে চুম্বক তার ধর্ম তথা আকর্ষণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তবে সেটি পুনরায় লৌহে পরিণত হয়, সেটি আর চুম্বক থাকে না। একটি লৌহকে চুম্বকে পরিণত করতে হলে নিরন্তর তাকে চুম্বক দিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘর্ষণ করতে হয়, এটি চুম্বকের ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। আবার পরিপূর্ণ চুম্বকও যদি আগুনে পোড়ানো যায় তবে সে তার ধর্ম হারিয়ে সাধারণ পদার্থে পরিণত হয়।
পানির ধর্ম হলো সে নিজে পবিত্র এবং সমস্ত কিছুকে ধৌত করে পবিত্র করে দেয়, তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা দূর করে নতুন জীবন দান করে। কিন্তু পানি যদি অপবিত্র, বিষাক্ত হয়ে যায় তবে সে অন্যকে না পবিত্র করতে পারে, না কারো তৃষ্ণা দূর করতে পারে। পানিকে পবিত্র করার জন্য, বিষমুক্ত করার জন্য আগুনে ফুটাতে হয়। এটিই পানির প্রকৃত ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। ধর্মহীন তথা বিষাক্ত, অপবিত্র পানি মানুষের জীবনের কারণ না হয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
মানুষও একটি সাধারণ প্রাণী হিসাবে জন্মগ্রহণ করে আস্তে আস্তে মনুষ্য ধর্ম প্রাপ্ত হয়ে মানুষের স্তরে ওঠে। এই মনুষ্য ধর্ম হলো মানবতা। এক পিতার মধ্যে সন্তানের প্রতি যে ভালোবাসা থাকে তা পিতৃধর্ম, ছেলে-মেয়ের প্রতি মায়ের মমতা হলো মাতৃধর্ম, ভায়ের প্রতি ভায়ের যে প্রেম তা ভ্রাতৃধর্ম। আর মানুষের প্রতি মানুষের যে প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, মমতা সেটি হলো মনুষ্যধর্ম। যার মধ্যে অন্য মানুষের প্রতি যত বেশি ভালোবাসা সে তত বড় ধার্মিক। সন্তান কষ্টে থাকলে মা-বাবার মনেও সুখ থাকে না, সন্তানের কষ্ট দূর করার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে। বাবা-মা হিসাবে এটা তাদের কর্তব্য। মানুষ কষ্টে থাকলে অপর মানুষও কষ্টে থাকবে, অপরের কষ্ট দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে- এটা মানুষ হিসাবে তার কর্তব্য, এটাই তার এবাদত। এই এবাদতের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের প্রতি ভালোবাসাই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা। সন্তানকে কষ্ট দিয়ে কি কখনো তার বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়া যায়? ঠিক একইভাবে আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে কষ্টে রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হলো- নামাজ, রোজা, পূজা, প্রার্থনা ইত্যাদি যে ধর্মীয় উপাসনাগুলি ধর্ম মনে করে, এবাদত মনে করে করা হয় সেগুলির উদ্দেশ্য কী? একটি লৌহকে যেমন চুম্বকের ধর্ম প্রাপ্ত করার জন্য নিরন্তর চুম্বক দিয়ে ঘর্ষণ করতে হয়, পানিকে যেমন বিশুদ্ধ করার জন্য ফুটাতে হয় ঠিক তেমনই মানুষের আত্মায় সর্বদা মনুষ্য ধর্ম তথা অন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত রাখার জন্য নানা উপাসনা করতে হয়। মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্টই এমন যে, সে অসচেতনভাবেই নিজ স্বার্থচিন্তায় মগ্ন হয়ে অপরের কল্যাণের চিন্তা ভুলেই যায়। নামাজ, রোজা, পূজা, প্রার্থনার মাধ্যমে সে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করবে, স্রষ্টাকে স্মরণ করবে, তার কর্তব্য তথা এবাদতের কথা স্মরণ করবে, সে নিজ স্বার্থ ভুলে জগৎসংসারের কল্যাণ চিন্তা করবে। অর্থাৎ উপাসনাগুলি হলো ধর্ম প্রাপ্ত করার প্রক্রিয়া। যতবেশি উপাসনা করবে তত বেশি ধর্ম প্রাপ্ত হবে। এই উপাসনাগুলি সকল খারাপ কাজ থেকে, অকল্যাণকর কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় নামাজ সকল প্রকার ফাহেশা তথা অকল্যাণকর কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত- ৪৫)। দিনরাত উপাসনায় মগ্ন থেকেও যদি কারো মধ্যে মনুষ্য ধর্ম জাগ্রহ না হয়, অকল্যাণকর কাজ থেকে সে বিরত না হয়, মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য নিজের জীবন-সম্পদ ব্যয় করার মনোবৃত্তি সৃষ্টি না হয় তবে সকল উপসনালয় ব্যর্থ।

Monday, February 29, 2016

রাজধানীর আদাবর এলাকায় হেযবুত তওহীদের জনসভা

রাজধানীর আদাবর এলাকায় হেযবুত তওহীদের জনসভা


জঙ্গিবাদকে না বলুন, ধর্মব্যবসাকে না বলুন, সাম্প্রদায়িকতাকে না বলুন। যারা মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক করে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে অমানবিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করায় তাদেরকে বয়কট করুন।
.
পৃথিবীতে যা কিছু কল্যাণকর তাই ধর্ম, যা অকল্যাণকর তা অধর্ম। আসুন- নিজেদের ইহকালকে সাফল্যমণ্ডিত করতে ও পরকালকে সাফল্যমণ্ডিত করতে নিজেকে মানবতার কল্যাণে সমর্পণ করি।
.
পৃথিবী যখন অশান্তির আগুনে পুড়ছে, তখন কারও কোনো ব্যক্তিগত আমল-এবাদত-পূজা-প্রার্থনা কবুল হবে না। আগে মানুষের মুক্তি, আগে সমাজের শান্তি, তারপর আমল।
.
এই মুহূর্তে মানুষের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করে পৃথিবী থেকে মিথ্যা ও অন্যায়ের রাজত্বকে সমূলে উৎপাটন করা। মানবজীবনে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
.
যে জীবন মানবকল্যাণে কাজে লাগল না, যে জীবন সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে লাগল না, সে জীবন বৃথা গেল। যে ব্যক্তি সমাজ নিয়ে ভাবল না, দেশ নিয়ে ভাবল না, বিশ্ব নিয়ে ভাবল না, অতঃপর মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নিজেকে বিসর্জন করল না সে তো মানুষই নয়, পশুর সাথে স্বার্থপর-আত্মকেন্দ্রিক ওই ব্যক্তির কোনোই পার্থক্য নেই।
.
যে ব্যক্তি নিজের জন্য বাচে সে ধার্মিক নয়, ধার্মিক সেই জন যার প্রতিটি নিঃশ্বাস থেকে এই জগৎ সংসার উপকৃত হয়।
.
সুতরাং যারা ধর্মকে বিশ্বাস করেন, ধর্মকে ধারণ করতে চান তারা আসুন- নিজেদের আত্মার বলে বলীয়ান হয়ে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অপরাজনীতি, ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই।
.
আর যারা ধর্মই বিশ্বাস করেন না তারাও আসুন, সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা ভেবে হলেও। এই সমাজে আপনি জন্ম নিয়েছেন, এই সমাজে লালিত-পালিত হয়েছেন, এই সমাজে বেচে আছেন, সুতরাং এই সমাজের প্রতি আপনি ঋণী। এই ঋণের বোঝা হালকা করার সময় এসেছে। সমাজের দুর্দশাকে অনুধাবন করুন। সমাজ নামক দেহটির প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আজ ভয়ানক ব্যাধিতে আক্রান্ত, তাকে বাচান। তার চিকিৎসা করুন। ওষুধ আছে আমাদের কাছে। আমরা সে ওষুধ নিয়ে আপনাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি, আসুন, বসুন, শুনুন আমাদের কথা। উপলব্ধি করুন। সমাজ বেচে যাবে, আপনিও বাচবেন।
.
হেযবুত তওহীদের সংগ্রাম চলছে। চলবে। সত্য প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে সবাইকে আমন্ত্রণ।

অধ্যক্ষের বক্তব্য: আলীয়া মাদ্রাসা ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের ফসল

অধ্যক্ষের বক্তব্য: আলীয়া মাদ্রাসা ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের ফসল



রাকীব আল হাসান
আবদুস সাত্তার রচিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘আলীয়া মাদ্রাসার ইতিহাস’ নামক বিরল তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জনাব মোহাম্মদ ইয়াকুব শরীফ (তাং- শবে বরাত ১৪০০ হিজরী)। আমরা তার সেই মহামূল্যবান লেখা থেকে কিছু অংশ পাঠক-পাঠিকার জন্য তুলে ধরছি।
“এটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বিশেষের ইতিহাস নয়, এটা মূলত তদানীন্তন সুবায়ে বাংলার আরবী শিক্ষা তথা গোটা মুসলমান জাতির শিক্ষা, মর্যাদা এবং আপন বৈশিষ্ট্য রক্ষার সংগ্রাম বিধৃত একটি করুণ আলেখ্য।
আজ এই লেখাটি লিখতে স্বভাবতই মন কতগুলো বিশেষ কারণে আবেগ-আপ্লুত হয়ে ওঠে। আর তা হলো অতীতে প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনৈক্য। মুসলমানরা ছিল বীরের জাতি, ইংরেজ বেনিয়ারা ছলে-বলে-কৌশলে তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের প্রচলিত ধর্ম, শিক্ষা, ও মর্যাদা হরণ করার জন্য পদে পদে যেসব ষড়যন্ত্র আরোপ করেছিল, আলিয়া মাদ্রাসা তারই একটি ফসল। বাহ্যত এই প্রতিষ্ঠানের পত্তন করা হয়েছিল আলাদা জাতি হিসাবে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্ত, যাতে মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি ও আদর্শ রক্ষা পায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়াই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য।
ইংরেজরা যুদ্ধ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় নি। হয়তো সে সময় তাদের পক্ষে তা করা সম্ভবও ছিল না। মুসলিমদের মধ্যে পরস্পরলোভী নেতৃত্বের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছিল। সুবায়ে বাংলার শাসনভার ইংরেজদের হাতে হস্তান্তরিত হওয়ার পর থেকে আরম্ভ হয় মুসলমানদের তাহজীব-তমদ্দুন ও শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর কূটনৈতিক আক্রমণ। এই শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন ব্যতীত এটা সম্ভব নয়, তাই ইংরেজরা সন্তর্পণে শিক্ষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
দিওয়ানী বিভাগে স্বয়ং ইংরেজরা এবং তাদের পদলেহনকারী হিন্দুরা নিয়োজিত ছিল। এদিকে মুসলমানদের কীভাবে উৎখাত করা যায় প্রশাসন বিভাগে সেই ষড়যন্ত্র চলল। কারণ তখনও রাষ্ট্র ভাষা ফারসি পরিবর্তন করা সম্ভব হয় নি। রাষ্ট্রভাষা ফারসিকে পরিবর্তন করে সে স্থলে ইংরেজি প্রতিষ্ঠা করাও সহজসাধ্য ছিল না। এবং সেকালে ফারসি জানা হিন্দু-মুসলমানদের সংখ্যাও কম ছিল না। ১৭৮০ সালে কলিকাতাতে আলিয়া মাদ্রাসার বুনিয়াদ রাখা হয়। নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে অবশেষে ওয়েলেসলী স্কোয়ারে মাদ্রাসার ইমারত প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এখানকার উলামারা ভারত বর্ষকে দারুল হরব বলে বিশ্বাসী ছিলেন। সুতরাং ছাত্রগণও ঐভাবে শিক্ষিত হতে থাকে।
অতঃপর মুসলিম জাতির হাত থেকে প্রশাসন বিভাগ হস্তান্তরিত করবার পালা আসে। পূর্বে মাদ্রাসার শিক্ষিত ছাত্ররাই কাজী, এসেসর ও জজ ইত্যাদি পদে নিযুক্ত হতো। পরে তাও না হওয়ার ব্যবস্থা গৃহীত হয়। ধীরে ধীরে মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্বল করার ব্যাপারে সকল প্রচেষ্টা চালানো হয়। জীবিকার ক্ষেত্রে মাদ্রাসার ছাত্ররা যাতে একটা পথ খুঁজে পেতে পারে এজন্য আলিয়া মাদ্রাসাতে ইলমে ত্বিব (হেকিমি চিকিৎসাবিদ্যা) সিলেবাসভুক্ত করারও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু ইংরেজ সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেন। শেষাবধি শুধু ধর্ম শিক্ষার জন্যই এই মাদ্রাসা কোনো রকমে টিকে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আলিয়া মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাই ছিল মুসলমানদের আসল শিক্ষার মাধ্যম। কিন্তু কালক্রমে ইংরেজরা এর পাশাপাশি একটি বিকল্প শিক্ষা হিসেবে ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ গড়ে তোলে।
মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার এক শতাব্দী পর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এবং সামগ্রিকভাবে ইংরেজি এই দেশের রাষ্ট্রভাতা রূপে গৃহীত হয়। এভাবে মুসলমানরা ধীরে ধীরে রাজ্যহারা, ধনহারা, মান-সম্মানহারা হয়ে এমন দরিদ্র জাতিতে পরিণত হয়, যা কোনোদিন তারা কল্পনা করতে পারে নি।
এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভাষা হিসাবে ফারসি, আরবি ইত্যাদি ছিল এবং ভালোভাবে এর শিক্ষাসূচিতে নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। মূলত তা ছিল ধর্মভিত্তিক, এমনকি হিন্দুদের শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল ধর্মভিত্তিক। তাই বিদেশি ভাষার মাধ্যমে নৈতিকতাহীন শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণে মুসলমান কিছুতেই রাজী হয় নি। কিন্তু তরপরও কিছু কিছু মুসলমান ইংরেজি পড়তে বাধ্য হয়েছে এবং ইংরেজি শিখে তাদের গোলাম হয়েছে। এ ব্যাপারে আকবর ইলাহাবাদী তাঁর ভাষায় বলেন-
আহবাব কেয়া নুমাযা কর গ্যায়ে
বি.এ. কিয়া, নওকর হুয়ে, পেনশন মিলি আরও মর গ্যায়ে।
অর্থাৎ, বন্ধুগণ কী কীর্তিই না করলেন। বি.এ. পাস করার পর ইংরেজের চাকর হলেন, চাকরির অবসানে পেনশন পেয়ে মৃত্যুবরণ করলেন।
মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন-বর্জিত এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিণতি এ ছাড়া আর কী হতে পারে? এই ধর্মহীন, নৈতিকতাহীন ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্রহীনতা ও ধ্বংস এদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। এ সত্যের নতুন ব্যাখ্যার প্রয়োজন মোটেই নেই। যে জাতি ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়, তাকে কে রক্ষা করতে পারে? একটা জাতির মধ্যে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ বিদ্যমান এবং রাষ্ট্রও এগুলোকে নিয়ে গঠিত। একটি জাতির উত্থান প্রকৃতপক্ষে তার ত্যাগ ও কুরবানির ভিত্তিতে সম্ভব হয়। লোভ-লালসা, ইন্দ্রীয়পরায়ণতা, ঈর্ষা-হিংসার ফলে জাতি পরাধীন ও দাসত্বে পদানত হয়ে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পরও এই দেশে শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিকতাভিত্তিক সুগঠিত ও সুবিন্যস্ত হতে পারে নি। পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের ফলে জাতির মাঝে নৈতিক দিক শূন্য থেকে শূন্যতর হয়ে আসছে। এই মানসিকতা জাতির সম্মান, স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের প্রতি দৈনন্দিন এক হুমকিসরূপ বিরাজ করছে।
আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস জাতির পতনের ইতিহাস। অনুভূতিহীন জাতির সম্মুখে এ আলোচনা কি ভালো বোধ হবে? তবে নিরাশ হওয়া চলবে না। মানুষ যেখানে পতিত হয় সেখান থেকে উত্থানের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। অনুভূতি জাগ্রত হলে উন্নতির পথ সুপ্রশস্ত হয়।

তাহলে ধর্মজীবী মোল্লারা খাবেন কী করে?

তাহলে ধর্মজীবী মোল্লারা খাবেন কী করে?


আরিফ মোহাম্মদ আলী আহসান
আমরা যখন প্রকৃত ইসলাম কী এবং কিভাবে প্রকৃত ইসলাম মানবজীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এই বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলি ধরি, তখন সঙ্গতভাবেই ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের প্রসঙ্গ এসে যায়। কারণ তারাই প্রচলিত ইসলামের অভিভাবক ও ধ্বজাধারী সেজে আছে। অথচ প্রকৃত ইসলামে ধর্মব্যবসার কোন সুযোগ নেই, রসুলাল্লাহর সময় এই ধর্মজীবিদের কোন অস্তিত্বও ছিল না। দীনের বিকৃতি ঘটায় ও খ্রিস্টানদের ঔপনিবেশিক শাসনামলে চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে এই পুরোহিত শ্রেণি একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। এ কারণে প্রকৃত ইসলামের কথা বললে ধর্মজীবীদের অবৈধ বাণিজ্যের বিষয়টি এড়ানোর কোন সুযোগ থাকে না। তাই আমাদেরকে অনেকে প্রশ্ন করেন- তাহলে তারা কী করে খাবেন? তারা কী করে খাবেন তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এখন তারা কী খাচ্ছেন? আল্লাহ বলছেন, আল্লাহ যা নাজেল করেছেন যারা তা গোপন করে এবং এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছু প্রবেশ করায় না। (সুরা বাকারা ১৭৪)। সুতরাং ধর্মজীবী আলেমরা জাহান্নামের আগুন দিয়ে উদর পূর্তি করছেন। প্রশ্ন হলো, জাহান্নামের আগুন না খেলে তারা খাবেন কী? এর জবাব হলো:
১। ধর্মব্যবসা আমারা নিষেধ করি নি, স্বয়ং আল্লাহ নিষেধ করছেন। শুধু নিষেধই করেন নি, ধর্মের কথা বলে বিনিময় নিলে তাকে তিনি জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। ক্ষুধার তাড়নায়, কোন উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত পশু, শুকরের গোশত খেলেও আল্লাহ ক্ষমা করবেন কিন্তু কোন অবস্থাতেই দীনের কাজের বিনিময় নেয়া যাবে না একথা আল্লাহ কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন (সুরা বাকারা ১৭৩-১৭৫)। সুতরাং প্রশ্নটি আমাদের করে কী লাভ? বরং আল্লাহকেই প্রশ্নটি করা দরকার যেহেতু নিষেধটি স্বয়ং আল্লাহই করেছেন।
২। নামাজ পড়ানোর জন্য তারা যে সময় ব্যয় করেন- মুসুল্লীও সেই একই সময় ব্যয় করেন, ওয়াজ করে তিনি যে সময় ব্যয় করেন- যে ওয়াজ শোনেন সেও একই সময় ব্যয় করেন। মুসল্লীগণ ও ওয়াজ শুনতে আসা লোকজন কী করে জীবন ধারণ করেন? নিশ্চয় তারা সামাজে অন্য সকলের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কারখানা, ক্ষেতখামার বা চাকুরী-বাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করেন? তাহলে ধর্ম নিয়ে কেন ব্যবসা করতে হবে? সকলের মতো তাদের জন্যও জীবিকা আহরণের পথ খোলা রয়েছে।
৩। সুরা জুম’আতে আল্লাহ বলেছেন নামাজ শেষে তোমরা কর্মে বেরিয়ে পড়? সুতরাং সকলের জন্যই জীবিকার নির্বাহ আবশ্যকীয়, অলসতার কোন সুযোগ নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় রসুলাল্লাহও জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে একজন ইহুদির কূপ থেকে পানি তুলে দিতেন। প্রকৃত ইসলামের খলিফাগণও কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন; বৃদ্ধ আবু বকর (র:) কাপড়ের গাট্টি মাথায় করে বাজারের দিকে ছুটেছেন, আলী (রা:) যবের আটা পিষে বিক্রি করেছেন এবং কুলির কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁরা চাইলে খুব সহজেই ধর্মের বিনিময় নিতে পারতেন। খানকা, হুজরা, মসজিদ, মাদ্রাসা তৈরি করে সেখানে বসে এখনকার মোল্লাদের চেয়ে বেশি আয়-রোজগার করতে পারতেন, ওয়াজ করে কাড়ি কাড়ি টাকা কামাতে পারতেন (নাউযুবিল্লাহ)। কিন্তু তাঁরা তা করেন নি, বরং কঠোরভাবে আল্লাহর হুকুম মান্য করেছেন। তাহলে ধর্মজীবীদের অন্য সকলের মতো কাজ করে উপার্জনে বাধা কোথায়?
রসুলাল্লাহ বলেন হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি, জীবিকা নির্বাহের জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করো এবং তোমাদের প্রচেষ্টার পরিপূর্ণতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, কোন মুমিনের সত্তাকে দুনিয়ায় বেকার এবং অনর্থক সৃষ্টি করা হয় নি। বরং তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কর্ম ও কর্তব্যের সঙ্গে সংযুক্ত। কর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অল্পে সন্তুষ্টি এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার অর্থ এ নয় যে, হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা এবং নিজের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া। নিশ্চয়ই আল্লাহর উপর ভরসা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। কিন্তু রেযেক হাসিল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা নিতান্তই জরুরী বিষয় (মহানবীর স. ভাষণ-ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)।
নায়েবে রসুলের দাবীদার ধর্মব্যবসায়ীরা ছাড়া রসুলের এ কথার বাইরে তো কাউকে দেখা যায় না। আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নিষেধ অমান্য করে যারা ধর্মব্যবসা করছেন সেই সকল ধর্ম ব্যবসায়ীরা কী করে খাবেন এ প্রশ্ন করা শুধু অনুচিত নয় আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধাচারণও বটে। তবে এ কথাও ঠিক যে, তাদেরকে প্রচলিত সিস্টেমের মাধ্যমেই হারাম উপার্জনের দিকে এক প্রকার ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা যখন পরিকল্পিতভাবে তাদের উপনিবেশগুলিতে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে সেখানে তারা কেবল ধর্মীয় বিকৃত জ্ঞানই শিক্ষা দেয়। তাদের সিলেবাসে অংক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার কোন কিছুই রাখা হয় না। ফলে মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এই সমস্ত আলেমরা রুজি-রোজগার করে বেঁচে থাকার জন্য ধর্ম বিক্রী করে রোজগার করা ছাড়া আর কোন পথ থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা দীন বিক্রি করে উপার্জন করে এবং ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে ঐ বিকৃত ইসলামটা এই জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা দেয়। এ উপমহাদেশসহ খ্রিস্টানরা তাদের অধিকৃত সমস্ত মুসলিম দেশগুলিতে এই একই নীতি কার্যকরি করেছে এবং সর্বত্র তারা একশ’ ভাগ সফল হয়েছে। এই নিশ্চিত এবং সহজ জীবিকা, দাওয়াত, খানা-পিনা ও মান-ইজ্জত হারানোর ভয়ে এখন আলেম সাহেবরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ধর্মব্যবসাকে জায়েজ করার জন্য বহু ফতোয়া আবিষ্কার করেছেন। এজন্যই আল্লাহ তাদের বিষয়ে বলেছেন, “আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্য্যশীল (সুরা বাকারা ১৭৪)।”
মনে রাখতে হবে, অন্যের করুণার দানের উপর যারা নির্ভর করে তাদের নৈতিক বল থাকে না। যারা তাকে ভিক্ষা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে তারা কোন অন্যায় করলে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে না। এজন্যই কোন ধর্মব্যবসায়ী সমাজের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন না। অথচ উম্মতে মোহাম্মদীর দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা প্রদান করা, এজন্য সবার আগে দরকার নৈতিক বল। তাই আলেম দাবি করেও যারা এখনও ধর্মব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন তাদের উচিৎ এই হারাম উপার্জন বন্ধ করা, যেহেতু তারাই সব সময় ওয়াজ করেন যে কোন ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে হালাল রুজি আর যে শরীর পুষ্ট হয় হারাম উপার্জনের দ্বারা সে শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

Sunday, February 28, 2016

হেদায়াতের সঠিক অর্থ

হেদায়াতের সঠিক অর্থ


মোহাম্মদ আক্কাস আলী
হেদায়াহ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, কোনো দুষ্ট প্রকৃতির গোনাহগার লোককে যদি উপদেশ দিয়ে মদ খাওয়া ছাড়ানো যায়, চুরি-ডাকাতি ছাড়ানো যায়, তাকে নামাজী বানানো যায়, রোজা রাখানো যায় তবে আমরা বলি- লোকটা হেদায়াত হয়েছে। এই ধারণা ভুল, কারণ মানুষ নামাজ পড়তেই মসজিদে যায় অথচ রসুলাল্লাহ বলেছেন, “এমন সময় আসবে যখন মসজিদসমূহ জাঁকজমকপূর্ণ ও লোকে লোকারণ্য হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না।” তাহলে রসুলাল্লাহর কথা মোতাবেকই বোঝা গেল হেদায়াহ একেবারেই অন্য জিনিস। কারণ বর্তমানে যে কাজগুলিকে ইবাদত মনে করা হয় যেমন নামাজ, রোজা ইত্যাদি, সেগুলি করলেই হেদায়াতে থাকা হলো এ ধারণা ভুল। হেদায়াহ অর্থ হচ্ছে সঠিক দিক নির্দেশনা (Right direction, guidance, orientation) অর্থাৎ আল্লাহ রসুল মানবজাতিকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন, যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই পথে, সেই দিকে চলাই হচ্ছে হেদায়াহ। আল্লাহ যে পথে চলতে আদেশ দিচ্ছেন সেটা হলো সেরাতুল মোস্তাকীম- সহজ, সরল পথ, জীবনের সর্বস্তরে, সর্ব অঙ্গনে, সর্ব বিভাগে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো আইন-কানুন, নীতি নির্দেশ অস্বীকার করা এবং তাঁকে ছাড়া আর কারো খেলাফত না করা এক কথায় তওহীদ; এই সহজ সোজা কথা। আর আজ সারা দুনিয়ার কোথাও আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ, হুকুমদাতা, সার্বভৌমত্বের মালিক হিসাবে মানা হচ্ছে না, এমন কি ঐ জাঁকজমকপূর্ণ সোনার গম্বুজওয়ালা মসজিদগুলিতেও এই হেদায়াহ নেই, সেখানেও চলছে তাগুতের গোলামী।
অথচ আল্লাহর রসুল এবং প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী খেজুর পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির মসজিদ থেকে অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছেন, তাঁদের মসজিদসমূহ কোনোই জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তবু যে ভূখণ্ডে এই জাতি শাসন করেছেন সেখান থেকে সমস্ত অন্যায় অবিচার, যুদ্ধ রক্তপাত, ক্ষুধা দারিদ্র্য, শোষণ এক কথায় সর্ব প্রকার অন্যায় অশান্তি লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। অর্ধেক পৃথিবীর কোথাও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনী না থাকা সত্ত্বেও সমাজে বলতে গেলে কোনো অপরাধই ছিল না। সুন্দরী যুবতী নারী অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ একা পাড়ি দিত, তার মনে কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও জাগ্রত হতো না। মানুষ রাতে ঘুমানোর সময় ঘরের দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত না, রাস্তায় ধন-স¤পদ ফেলে রাখলেও তা খোঁজ করে যথাস্থানে পাওয়া যেত, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানি প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, আদালতে বছরের পর বছর কোনো অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসতো না। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল হয়ে গিয়েছিল। এই স্বচ্ছলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মানুষ যাকাত ও সদকা দেওয়ার জন্য টাকা পয়সা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, কিন্তু সেই টাকা গ্রহণ করার মতো লোক পাওয়া যেত না। এই পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, কারণ ঐ জাতি হেদায়াতে ছিল, তওহীদে ছিল। তাদের ইলাহ, বিধাতা, হুকুমদাতা ছিলেন আল্লাহ।
আর আজ যারা সোনার গম্বুজওয়ালা মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছেন তাদের কারও ইলাহ গণতন্ত্র, কারও রাজতন্ত্র, কারও সমাজতন্ত্র, কেউ সরকারি দলের, কেউ বিরোধীদলের অনুসারী, অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কোথাও নেই। সবাই ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’র সার্বভৌমত্ব মাথায় নিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে দৌঁড়ে পাক্কা মুসল্লী হচ্ছে। এ জন্যই আল্লাহর রসুল বলেছেন, মসজিদ সমূহ ভর্তি হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না। পাঠক, ভেবে দেখেছেন কি, মুসলিম জাতি যদি হেদায়াতেই না থাকে তবে কোথায় রয়েছে? নিশ্চয়ই হেদায়াতের বিপরীত অর্থাৎ পথভ্রষ্টতায়, যদি সেরাতুল মোস্তাকীমেই না থাকে তবে নিশ্চয়ই রয়েছে ইবলিসের বক্রপথে। এই পথ তাদেরকে কোন গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে- জান্নাতে, না জাহান্নামে?