Monday, April 4, 2016

মুমিন না হলে সকল আমল অর্থহীন

মুমিন না হলে সকল আমল অর্থহীন


হেযবুত তওহীদ

‘‘যে কোন আমলের পূর্বশর্ত হচ্ছে ঈমান। অর্থাৎ সকল আমলই মুমিনদের জন্য। একজন কাফের, মোশরেক ঈমান আনয়নের পূর্বে যতই আমল করুক এতে তার কোনো পুণ্য হয় না। যেমন- আবু জেহেল, আবু লাহাবরাও অনেক ভালো কাজ করেছে কিন্তু তাদের কোনো আমলই কি কাজে আসবে?
এখন এই মুমিন কারা? যারা সত্যকে ধারণ করে এবং সেই সত্যকে মানবজীবনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যক্তিস্বার্থকে কোরবান করে দেয় তারাই হলো মুমিন, আর যারা সত্য অস্বীকার করে, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, মিথ্যাকে ধারণ করে, সমাজে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করে রাখে তারাই মূলত কাফের। অর্থাৎ যারা সত্যের পক্ষে তারাই হলো মুমিন আর যারা মিথ্যার পক্ষে তারাই হলো কাফের।
সত্যের উৎস হচ্ছেন আল্লাহ। আল্লাহর আদেশ, নিষেধ, তাঁর দেওয়া মানদ- ও রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শই হলো সত্যের চূড়ান্ত রূপ। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক এক কথায় জীবনের সর্ব অঙ্গনে সত্যকে স্বীকার করতে হবে। আর স্বীকৃতির পরবর্তী কাজ হলো জীবন ও সম্পদ দিয়ে এই সত্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম। এটিই হলো সর্বপ্রথম এবং প্রধান আমল। এটি ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না। (সুরা হুজরাত-১৫)। যখন জাতীয়, আন্তর্জাতিক জীবনে আল্লাহর হুকুম তথা চূড়ান্ত সত্য প্রত্যাখ্যান করে পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের দেওয়া হুকুম বিধান প্রতিষ্ঠিত এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ অন্যায়, অবিচারে পরিপূর্ণ তখন সার্বিক জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায় অবিচার দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাদ দিয়ে যত আমলই করা হোক তা নিরর্থক হবে। কিন্তু আজ এই নিরর্থক আমলই করা হচ্ছে সর্বত্র। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আজ পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের হুকুম বিধান প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমরা একটা দৃশ্য সর্বত্র দেখতে পাই, শহর-গ্রাম, পাড়া-মহল্লাসহ সব জায়গাতেই মানুষ টুপি-পাঞ্জাবী পরে টাখনুর উপর পাজামা তুলে মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছে, কোরবানি করছে, হজ্ব করে আসছে, ওয়াজ-মাহফিল শুনছে, কোর’আন তেলাওয়াত করছে, যিকির-আসগর করছে। অর্থাৎ আমরা বুঝাতে চাইছি আমরা পাক্কা মুসলমান। কিন্তু কিভাবে? এই যে নামাজ পড়ছি, কোর’আন পড়ছি, টুপি পাঞ্জাবী পরছি, কেউ কেউ হজ্ব করে আসছি। আমাদেরকে কে বলে দেবে এই জাতি আল্লাহর হুকুম, বিধান বাদ দেওয়ার কারণে এরা মুমিনই না মুসলিমই না? এই সরল প্রশ্নের উত্তর কে দেবে যে, তাদেরকে আল্লাহ মুমিন, মুসলিম এর খাতা থেকে বাদ দিয়েছেন বহু আগে। বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে সত্য প্রত্যাখ্যান করে এই জাতি কার্যত কাফের, জালেম, ফাসেক হয়ে গিয়েছে। (সুরা মায়েদা- ৪৪,৪৫,৪৭)
কাজেই এখন আগে চূড়ান্ত সত্য আল্লাহর তওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে মুমিন হওয়া জরুরি। তারপরে যত পারা যায় ঐসব আমল। আমরা মুখে দাবি করি মুসলমান, আইন-বিধান, হুকুম মানি এবং অনুসরণ করি পাশ্চাত্য সভ্যতা দাজ্জালের। এজন্য আল্লাহ এই জাতির উপর লানৎ দিয়েছেন। এখন এই লানৎ, শাস্তি থেকে পরিত্রাণের একটাই পথ আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। সেই প্রকৃত, অনাবিল, শান্তিদায়ক, নিখুঁত, ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা কোথায় পাওয়া যাবে?
সেটা আল্লাহ হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। আজ সারা পৃথিবীতে যে ইসলামটি চর্চা করা হচ্ছে, মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তবে, খানকায় যে ইসলামটা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে সেটা আল্লাহর দেওয়া প্রকৃত ইসলাম নয়। এই ইসলাম ১৬০ কোটির এই জনসংখ্যাকে শান্তি দিতে পারে নি, অন্য জাতির গোলামি থেকে রক্ষাও করতে পারে নি। আমরা এমন এক ইসলামের কথা বলছি, যে ইসলাম সমস্ত মানবজাতিকে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারবে, সমস্ত মানবজাতিকে একটি পরিবারে পরিণত করবে, ইনশা’ল্লাহ।

অন্ধত্ব কী?

অন্ধত্ব কী?

ওবাইদুল হক:

পড়ব না, জানব না, দেখব না, চিন্তা করব না-
এটার নামই অন্ধত্ব বা কূপম-ূকতা
ইউরোপিয়ানরা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় বিচরণ শুরু করল, তখনই তাদের ঝুলি নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সমৃদ্ধ হতে লাগল। আধুনিক বিজ্ঞানের প্রায় সকল উদ্ভাবনের কৃতিত্ব তাই তাদের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু এসব আবিষ্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন স্বর্ণযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীরা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় শীর্ষে আরোহণকারী মুসলিমরা পরবর্তীতে যখন ধর্মবেত্তাদের অতি-বিশ্লেষণের ফাঁদে পড়ে এলেমকে কেবলমাত্র ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলল, তখনই এ জাতি সর্ববিষয়ে পিছিয়ে পড়তে লাগল। এক সময় তারা পাশ্চাত্য জাতিগুলির গোলামে পরিণত হলো। পরাধীন হওয়ায় জাতির মানসিক বিকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রত্যেক ধর্মেই একটি ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি আছে যারা তাদের সংকীর্ণতা দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে অব্যাহতভাবে জগৎ সংসারের অকল্যাণ করে চলেছে। এরাই সৃষ্টি করছে ধর্মীয় বিভেদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, অশ্রদ্ধা, পরিণামে হচ্ছে দাঙ্গা, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ। ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণের জন্য, মুক্তির জন্য। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে বিকৃত করে তারা ধর্মকে বানিয়ে নিয়েছে বাণিজ্যের মূলধন, স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। সাধারণ মানুষ ধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য, ধর্মীয় নানা কার্য সম্পাদনের জন্য এই পুরোহিত শ্রেণিটির শরণাপন্ন হয় আর এরা স্বার্থ-রক্ষার্থে নিজেদের মনগড়া কথা ধর্মের নামে চালিয়ে দেয়। নিজেদের প্রভাব ও রোজগার টিকিয়ে রাখার জন্য এরা চায় মানুষের অন্ধত্ব যেন টিকে থাকে, যেন মানুষ কোর’আন, হাদিস না খুঁজে একমাত্র তাদের উপরই নির্ভরশীল থাকে। তারা বলে, ‘আপনারা কেতাব পড়লে বুঝবেন না। এর মধ্যে অনেক কিছু আছে। ইসলাম বুঝতে আমাদের কাছে আসতে হবে।’
তাদের এই ধ্বংসাত্মক বুলি জাতিকে অন্ধত্বের এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, আমরা যামানার এমামের অনুসারীরা যখন তাদের সামনে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরার চেষ্টা করছি, সাধারণ মানুষ সেটা যাচাই বাছাই করার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেরা সেই ধর্মব্যবসায়ীদের কাছেই ছুটে যাচ্ছেন। আর তারা নিজেদের গদি বজায় রাখার জন্য হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা দ্বারা সাধারণ মানুষের কান ভারি করে তুলছে। ঈসা (আ.) ইহুদি আলেমদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘হে মোনাফেক ফরিশি ও আলেমরা! কী ঘৃণ্য আপনারা। আপনারা জান্নাতে নিজেরাও ঢোকেন না, অন্যদেরকেও ঢুকতে দেন না।’
আমরা যখন বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ধর্মে স্রষ্টা প্রেরিত নবী-রসুল, অবতার, মহামানবদের নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা আমাদের পত্রিকায় তুলে ধরছি তখন এই শ্রেণিটি অপপ্রচার করছে এটা খ্রিষ্টানদের পত্রিকা, এটা বিধর্মীদের পত্রিকা, এই পত্রিকা যেন কেউ স্পর্শ না করে, স্পর্শ করলে তার ঈমান চলে যাবে। অথচ আল্লাহ বলেছেন- ‘যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ করে, তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই বোধশক্তি সম্পন্ন (সুরা যুমার ১৮)।’ আল্লাহ মনোযোগ-সহকারে সব বিষয় শুনতে বলেছেন, অতঃপর যাচাই করে যেটা উত্তম সেটা গ্রহণ করতে বলেছেন। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও এটা অত্যন্ত যৌক্তিক যে, কোনো নাগরিক স্বাধীনভাবে, আইনসঙ্গতভাবে তার বক্তব্য, মতামত ইত্যাদি প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে। এই বক্তব্য, মতামত কেউ গ্রহণও করতে পারে আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। এটা শ্রোতা বা পাঠকের স্বাধীনতা। তাই সকল মানুষের প্রতি আমাদের কথা হচ্ছে, আমরা কিছু মহাসত্য মানুষের সামনে তুলে ধরেছি। কারণ সংবাদ পৌঁছে দেয়া পর্যন্তই আমাদের কাজ। নবী-রসুলদেরও এর চেয়ে বেশি দায়িত্ব ছিল না। আমরা কাউকে আমাদের বক্তব্য মেনে নেওয়ার জন্য জোর করছি না। আল্লাহ ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করার জ্ঞান প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন। আমাদের কথাগুলি যদি বর্তমানের জন্য প্রযোজ্য, উত্তম এবং যৌক্তিক মনে হয় তাহলে আপনারা সেটা গ্রহণ করুন। গ্রহণ বা বর্জন করা একান্তই আপনাদের সিদ্ধান্ত। তবে সিদ্ধান্তের আগে আমাদের বক্তব্য সঠিক না ভুল যাচাই করুন, কারণ এটা একদিকে যেমন স্রষ্টার নির্দেশ, অন্যদিকে যুক্তির মানদ-েও করণীয়।’
আর ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের কথা হচ্ছে, ‘আমাদের কোনো বক্তব্য সম্পর্কে যদি আপনার আপত্তি থাকে তবে সেটা আমাদেরকে অবহিত করুন। আমরা চেষ্টা করব আপনাকে সদুত্তর দিতে। আমাদের কোন কাজের অসঙ্গতি যদি আপনাদের দৃষ্টিগোচর হয় সেটা আমাদেরকে জানান, ভুল সংশোধনের মানসিকতা আমাদের আছে। কিন্তু আপনারা সত্যবিমুখ হবেন না, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন না। কারণ আপনার কারণে যে পথভ্রষ্ট হবে তার দায়িত্ব আখেরাতে আপনাকেই নিতে হবে। আর মানুষকে সত্য থেকে ফিরিয়ে রাখার কারণে সমাজ থেকে অন্যায় অশান্তি দূর হবে না, সেটার দায়ও আপনার উপরই বর্তাবে।’
তাছাড়া কাউকে কোনো কিছু পড়তে না দেওয়া, জানতে না দেওয়া, গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা করতে না দেওয়া চরম মূর্খতা, অন্ধত্ব। এটা ধর্মীয় বিধানে যেমন অনৈতিক ও অবৈধ তেমনি রাষ্ট্রীয় আইনেও অবৈধ ও তথ্য জানার অধিকার পরিপন্থী।

আমাদের সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য:

আমাদের সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য:



মসীহ উর রহমান, আমীর, হেযবুত তওহীদ

মানবজাতির বর্তমান সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ স্রষ্টার বিধান। মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটিসহ সমস্ত মানবজাতি আজ তার সমষ্টিগত জীবন মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা দিয়ে পরিচালনা করছে। ফলে সমস্ত পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই, মানুষের জীবন সংঘর্ষ, রক্তপাত, অন্যায়, অবিচারে পূর্ণ হয়ে আছে। মানুষের তৈরি এই বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র এ সমস্যাগুলোর সমাধান করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। হেযবুত তওহীদের বক্তব্য এই যে, শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ বর্তমান জীবনব্যবস্থা (System) বাদ দিয়ে স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং তা সমষ্টিগত জীবনে কার্যকরী করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম নামে যে ধর্মটি চালু আছে সেটা প্রকৃত ইসলাম নয়। গত ১৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম কিছু স্বার্থান্বেষী শ্রেণির দ্বারা বিকৃত ও বিপরীতমুখী হয়ে গেছে। এই বিকৃত ইসলাম অনুসরণ করে এই জাতি না পারছে দুনিয়াতে শান্তি কায়েম করতে, না পাবে আখেরাতে জান্নাত। এই বিকৃত ইসলামের ধারক-বাহক ধর্মব্যবসায়ী একটা শ্রেণি সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক করে মানবতার কল্যাণের পরিবর্তে জাতি ধ্বংসের কাজে, জাতীয় সম্পত্তি বিনষ্টের কাজে লাগাচ্ছে। এখন যদি মানুষকে প্রকৃত ইসলাম শিক্ষা দেওয়া যায় তবে ঐ ধর্মবিশ্বাসই জাতির উন্নতি, প্রগতির পথে সহায়ক ও প্রধান নিয়ামক হবে।
ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। ধর্মের কোন বিনিময় চলে না। বিনিময় নিলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। কাজেই ধর্মের কাজ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে করতে হবে এবং বিনিময় নিতে হবে কেবল আল্লাহর কাছ থেকে।
 সহজ সরল সেরাতুল মোস্তাকীম দীনুল হক, ইসলামকে পণ্ডিত, আলেম, ফকীহ, মোফাস্সেরগণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বহু মতের সৃষ্টি করেছে। ফলে একদা অখ- উম্মতে মোহাম্মদী হাজারো ফেরকা, মাজহাব, দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন সুফিরা জাতির সংগ্রামী চরিত্রকে উল্টিয়ে ঘরমুখী, অন্তর্মুখী করে নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ করে দিয়েছে। ফলে একদা অর্ধ্ব-বিশ্বজয়ী দুর্বার গতিশীল যোদ্ধা জাতিটি আজ হাজার হাজার আধ্যাত্মিক তরিকায় বিভক্ত, স্থবির উপাসনাকেন্দ্রিক, স্বার্থপর জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই উভয় শ্রেণির কাজের ফলে ইসলামের উদ্দেশ্যই পাল্টে গেছে। নিস্বার্থভাবে সংগ্রাম করে সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে ধর্মের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মার উন্নয়ন এবং জীবনের ব্যক্তিগত অঙ্গনের ছোট খাটো বিষয়ের মাসলা মাসায়েল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা।
 ব্রিটিশরা এই জাতিকে পদানত করার পর এরা যেন কোনদিন আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে এজন্য একটি শয়তানি ফন্দি আঁটে। তারা এ জাতির মানুষের মন ও মগজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য দু’টি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করে, যথা: মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা। তাদের অধিকৃত সকল উপনিবেশেই তারা মুসলমানদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার নাম করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে তারা নিজেদের মনগড়া একটি বিকৃত-বিপরীতমুখী ইসলাম শিক্ষা দেয়। মাদ্রাসাগুলির অধ্যক্ষপদ তারা নিজেদের হাতে রেখে দীর্ঘ ১৪৬ বছর এই উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে তাদের তৈরি ‘ইসলাম’ শিক্ষা দিয়েছে। এখানে অংক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির কিছুই রাখা হলো না, ফলে মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসে আলেমদের রুজি-রোজগার করে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই দীন, ধর্ম বিক্রি করে রোজগার করা ছাড়া আর কোনো পথ রইল না। খ্রিষ্টানরা এটা এই উদ্দেশ্যে করল যে তাদের মাদ্রাসায় শিক্ষিত এই মানুষগুলো যাতে বাধ্য হয়ে ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে বিকৃত ইসলামটা এই জনগোষ্ঠীর মন-মগজে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে; এ উপমহাদেশসহ খ্রিষ্টানরা তাদের অধিকৃত সমস্ত মুসলিম দেশগুলিতে এই একই নীতি কার্যকরী করেছে এবং সর্বত্র তারা একশ’ ভাগ সফল হয়েছে।
 ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাটি তারা চালু করল স্কুল কলেজের মাধ্যমে। এ ভাগটা তারা করল এই জন্য যে, এ বিরাট এলাকা শাসন করতে যে জনশক্তি প্রয়োজন তা এদেশের মানুষ ছাড়া সম্ভব ছিল না; সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কেরাণীর কাজে অংশ নিতে যতটুকু শিক্ষা প্রয়োজন তা দেওয়ার জন্য তারা এতে ইংরেজি ভাষা, সুদভিত্তিক অংক, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক, ইতিহাস (প্রধানতঃ ইংল্যান্ড ও ইউরোপের রাজা-রাণীদের ইতিহাস), ভূগোল, প্রযুক্তিবিদ্যা অর্থাৎ পার্থিব জীবনে যা যা প্রয়োজন হয় তা শেখানোর বন্দোবস্ত রাখলো; সেখানে আল্লাহ, রাসুল, আখেরাত ও দীন সম্বন্ধে প্রায় কিছুই রাখা হলো না, সেই সঙ্গে নৈতিকতা, ত্যাগ মানবতা, আদর্শ, দেশপ্রেম ইত্যাদি শিক্ষাও সম্পূর্ণ বাদ রাখা হলো। তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হলো যাতে তাদের মন শাসকদের প্রতি হীনমন্যতায় আপ্লুত থাকে এবং পাশাপাশি তাদের মন-মগজে, আল্লাহ, রসুল, দীন সম্বন্ধে অপরিসীম অজ্ঞতাপ্রসূত হীনম্মন্যতা, বিদ্বেষ (A hostile attitude) সৃষ্টি হয়। বিশ্ব-রাজনৈতিক কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের খ্রিষ্টান শক্তিগুলি তাদের উপনিবেশগুলিকে বাহ্যিক স্বাধীনতা দিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় তারা ক্ষমতা দিয়ে যায় এই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিটির উপর যারা চরিত্রে ও আত্মায় ব্রিটিশদের দাস। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সেই শিক্ষাব্যবস্থা আজও চালু আছে। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী নামে খ্রিষ্টান হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে ঈসা (আ.) এর অনুসারী ছিলো না। ঈসা (আ.) এর শিক্ষাকে বহু পূর্বেই তারা বাদ দিয়ে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
আল্লাহর শেষ রসুল আখেরি যামানায় যে এক চক্ষুবিশিষ্ট দানব দাজ্জালের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যাকে ঈসা (আ.) Anti-Christ বলে আখ্যায়িত করেছেন, মাননীয় এমামুয্যামান সেই দাজ্জালকে হাদিস, বাইবেল, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী সভ্যতাই হচ্ছে সেই দাজ্জাল। বর্তমানে সমগ্র মানবজাতি সেই দাজ্জালের তৈরি জীবনবিধান মেনে নিয়ে তার পায়ে সেজদায় পড়ে আছে। পরিণামে তারা একদিকে যান্ত্রিক প্রগতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও মানুষ হিসাবে তারা পশুর পর্যায়ে নেমে গেছে। সমগ্র মানবজাতি ঘোর অশান্তি, অন্যায়, অবিচারের মধ্যে ডুবে আছে। দাজ্জালের হাত থেকে পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। আল্লাহর রসুল বলেছেন যে, যারা দাজ্জালকে প্রতিরোধ করবে তারা বদর ও ওহুদ দুই যুদ্ধের শহীদের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে (আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী মুসলিম)। হেযবুত তওহীদের যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে তাদেরকেও আল্লাহ দুই শহীদ হিসাবে কবুল করে নিয়েছেন। যার প্রমাণস্বরূপ তিনি একটি বিরাট মো’জেজা হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। তা হলো: এই দাজ্জাল প্রতিরোধকারীরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের দেহ শক্ত (রাইগরমর্টিস) ও শীতল হয়ে যায় না। জীবিত মানুষের ন্যায় নরম ও স্বাভাবিক থাকে।

Saturday, April 2, 2016

মানুষের পরিবর্তন





সমস্ত পৃথিবীতে চলমান অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, এক কথায় অশান্তি থেকে পরিত্রাণের আশায় মানুষ একের পর এক জীবনব্যবস্থা পরিবর্তন করে চলেছে। কিন্তু কোনো মানবসৃষ্ট জীবনব্যবস্থাই মানুষকে শান্তির সন্ধান দিতে না পারায় মানবজাতির সামনে এখন একটাই পথ দাঁড়িয়েছে- আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা দ্বীনুল হক্ব, কার্যকরী করা, যেটা আল্লাহ পাঠিয়েছেন শেষ নবীর উপর।
.
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই দ্বীনুল হক্ব প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বা কর্মসূচি কী হবে? একেকজন একেকভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতিতে, কেউ জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, এছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রচেষ্টা চলছে। আমাদের কথা হলো- দ্বীন যেহেতু দিয়েছেন আল্লাহ, কাজেই কীভাবে সেই দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেটাও আল্লাহ বলে দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। আমরা কি দ্বীন প্রতিষ্ঠার আল্লাহপ্রদত্ত কর্মসূচির সন্ধান করেছি কখনও? করলে জানতাম- আল্লাহ কীভাবে পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া দ্বীনুল হক্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে তার পাঁচ দফা কর্মসূচি রসুলাল্লাহকে দান করেছিলেন এবং রসুল তা এই জাতিকে দান করে গেছেন।
.
হজরত হারিস আল আশয়ারী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ দিচ্ছি, যে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তা হলো (১) ঐক্যবদ্ধ হবে (২) নেতার কথা শুনবে (৩) আনুগত্য করবে (৪) হিজরত করবে ও (৫) জিহাদ (দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা) করবে।
যে ব্যক্তি (কর্মসূচির) এই ঐক্যবন্ধনী থেকে এক বিঘত পরিমাণও দূরে সরে গেল, সে যেন নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলল। অবশ্য যদি ফিরে আসে তা হলে ভিন্ন কথা। আর যে ব্যক্তি জাহিলিয়াতের (মানব রচিত মতবাদ, অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার) দিকে আহ্বান জানাবে সে জাহান্নামের জ্বালানি পাথরে পরিণত হবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) সালাত ও সিয়াম আদায় করলেও কি সে জাহান্নামী ? রাসূল (সা.) বললেন-হ্যাঁ, যদি সে সালাত ও সিয়াম পালন করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে, তবুও সে জাহান্নামী’ (তিরমিযী ও আহমদ-হাকেম)।
এটাই শেষ নবীর উম্মতদের জন্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার আল্লাহ প্রদত্ত কর্মসূচি।
.
এই কর্মসূচি মোতাবেক এখন একটাই করণীয়- জাতিকে আল্লাহর তওহীদ তথা সার্বভৌমত্বের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা। সেই কাজটিই করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। এর বাইরে অন্য কোনো মনগড়া কর্মসূচি দিয়ে সফলতা আসবে না এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে।

Friday, April 1, 2016

ধর্মের আত্মা কোথায়???

ধর্মের আত্মা কোথায়???


রিয়াদুল হাসান
ন্যায় ও সত্যকে আংশিক পরিত্যাগ করা যায় না, ধর্মের পরিত্যাগ মানেই স¤পূর্ণ ধর্মত্যাগ। এক মণ দুধকে অপেয় করতে এক ফোটা গোমুত্রই যথেষ্ট। অর্ধসত্য যা মিথ্যাও তা। ইসলামে শেরক হচ্ছে তেমনই একটি বিষয় যা ধর্মবিশ্বাস ও যাবতীয় সৎকর্মকে বিনষ্ট করে দেয়। কিন্তু সেটা কীভাবে দেয়?
সুরা বাকারা ৮৫ নম্বর আয়াতটি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও চমকপ্রদ ধারণা প্রদান করে। বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও আয়াতটি প্রাসঙ্গিক। আল্লাহ বলেন, “তোমরাই পরস্পর খুনাখুনি করছ এবং তোমাদেরই একদলকে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করছ। তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে আক্রমণ করছ। আর যদি তারা কারও বন্দী হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তবে বিনিময় নিয়ে তাদের মুক্ত করছ। অথচ তাদের বহিষ্কার করাই ছিল তোমাদের জন্য অবৈধ।” বোঝা যাচ্ছে মানুষকে আটক করে বা বহিষ্কার করে বাণিজ্য করা বর্তমান সময় যেমন হচ্ছে ২০০০ বছর আগের ইহুদিদের মধ্যেও ছিল।
এর পরের অংশটি শেরকের সংজ্ঞা। আল্লাহর বিধানের (সত্যের) আংশিক মানা আর আংশিক অস্বীকার করাই হচ্ছে শেরক। কেননা সেই সত্যের শূন্যস্থান অনিবার্যভাবে মিথ্যা দ্বারাই পুরণ করতে হয়। আল্লাহ বলছেন, “তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম স¤পর্কে বে-খবর নন।”
আমাদের পার্থিব দুর্গতি তো দৃশ্যমান বাস্তবতা, বাকি অংশ সময়ের অপেক্ষা। ধর্মের কোন অংশ না মানার কারণে আল্লাহ এই আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন সেটা আমাদের বোঝা প্রয়োজন আছে।
লক্ষ্য করুন, ইহুদি জাতি কেতাবে (ধর্মের) কোন অংশকে অমান্য করেছিল, যে অংশটি পুনরায় জাতির মধ্যে প্রতিস্থাপন করতে আল্লাহ ঈসাকে (আ.) পাঠিয়েছিলেন। সেটা হচ্ছে ধর্মের আধ্যাত্মিক ভাগ, মানবতা, মায়া, দয়া, করুণার ভাগ। নির্জীব উপাসনাভিত্তিক ধর্মচর্চা থেকে প্রাণময় ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মের দিকে বনি ইসরাইলকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই করুণার অবতার ঈসার (আ.) আবির্ভাব হয়।
পূর্ববর্তী আয়াতে তা সুস্পষ্ট। আল্লাহ বলেন, “যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও প্রতিনিধিত্ব করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, সালাহ প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।” (বাকারা ৮৩) ধর্মের নির্দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে তওহীদের উপর বিশ্বাস যার মর্মার্থ হচ্ছে সর্বাবস্থায়, জীবনের সর্ব অঙ্গনে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার অঙ্গীকার। এর পরে আসে আমল বা কাজ। সেই আমলগুলোর সবই হচ্ছে সামাজিক শান্তির লক্ষ্যে যেমন পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার, মানুষকে সদুপদেশ দান, অর্থ দান কেবল একটি কাজ অর্থাৎ সালাহ প্রতিষ্ঠাকে আনুষ্ঠানিক উপাসনা হিসাবে মনে করা হয়। কিন্তু আসলে সালাহ হচ্ছে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে পারার জন্য যে চরিত্র লাগে, আত্মীক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য লাগে তা অর্জনের প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ আমলের প্রশিক্ষণ।
ইহুদিরা যেটা করেছিল তা হচ্ছে, তারা কেবল সাবাথের দিনে এবাদতগাহে সালাহ করত, আর অন্যান্য আনুষ্ঠানিক উপাসনাগুলোর মধ্যেই ধর্মকে সীমিত করে ফেলেছিল। ধর্মের যে মূল কাজ তথা সমাজে শান্তি, করুণার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সেই অংশটুকুই তারা পরিহার করেছিল। আর সেটা পূরণ করাই ছিল ঈসা (আ.) একমাত্র সংগ্রাম। তিনি সাবাথের দিনে অন্ধকে দৃষ্টিদান করে, অবশরোগীর হাত ভালো করে ইহুদি রাব্বাইদের দৃষ্টিতে ধর্মদ্রোহ (ব্লাসফেমি) করেছিলেন। কারণ ঐ দিনের কাজ শুধুই উপাসনা আর উপাসনা। আর ঈসা (আ.) প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, মানুষের কল্যাণ করাই স্রষ্টার উপাসনা।
আজকে যে ইসলামটি আমরা দেখছি সেটাও প্রাচীন ইহুদি ধর্মের মতোই আচারসর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মসজিদের পাশেই বর্ষায় শীতে কষ্ট করে বস্তিবাসী মানুষ, কিন্তু মসজিদগুলো প্রাসাদোপম। সেখানে আগত মুসল্লিদের লক্ষ্য হচ্ছে নামাজ পড়া আর নামাজ পড়া, আর আলেম ওলামাদের লক্ষ্য হলো মসজিদকে ব্যবহার করে অর্থোপার্জন করা। তারা রমজান মাসের কতই না ফজিলত বর্ণনা করেন, কিন্তু সবকিছুর উদ্দেশ্য সেই স্বার্থ। যারা নিত্য উপবাসী তাদের প্রতি করুণাপ্রদর্শন কেবল ওয়াজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যাকাত হয়ে দাঁড়িয়েছে ধনীর খ্যাতিবৃদ্ধির মাধ্যম। যাকাতের সস্তা কাপড় নিতে এসে পদপিষ্ট হয়ে অমানবিক মৃত্যুবরণ করে বহু গরীব মানুষ। প্রকৃত ইসলামের যুগে কি এমন দৃশ্য কল্পনা করা যেত? ধনীরা স¤পদ, খাদ্য বোঝাই উট নিয়ে শহরের পথে, মরুর পথে ঘুরত একজন গ্রহণকারীর সন্ধানে। আর আজ বিরাট ধনী, বিরাট পরহেজগার কিন্তু চরম স্বার্থপর, ঘোর বস্তুবাদী।
এভাবে ধর্মের আত্মাকে পরিহার করে কেবল আচারসর্বস্ব লেবাসি ধর্মকেই ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে- এটাই হচ্ছে কেতাবের কিছু মানা আর কিছু না মানা। উপরস্তু ব্যক্তিগত জীবনের সংকীর্ণ পরিসরে আল্লাহকে মান্য করে রাষ্ট্রীয় জাতীয় জীবনে পুরোপুরি তাঁর বিধানকে অস্বীকার করা হয়েছে। স্রষ্টার পরিবর্তে ইলাহ তথা হুকুমদাতার আসনে বসানো হয়েছে পশ্চিমা সভ্যতাকে। এই সামষ্টিক শেরক আমাদের জীবনকে চরম অশান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করে রেখেছে, আখেরাতকেও ধ্বংস করছে।
এই অংশটুকু আমাদের ইসলামী চিন্তাবিদগণ অনেকেই অনুধাবন করেন আর যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান তারাও ঐ শরিয়তের অংশটুকুরই গুরুত্ব দেন। এ কারণে দেখা যায় জঙ্গিবাদীরা যেখানে তাদের শাসন কায়েম করতে পেরেছে, সেখানে শরিয়াহ কায়েম হলেও মানুষ শান্তি পায় নি, কারণ আত্মাহীন মানুষ যেমন মৃত, তেমনি মানবতাহীন ধর্মও মৃত।

Wednesday, March 30, 2016

ইসলামি অর্থনীতিতে দান

ইসলামি অর্থনীতিতে দান


এম আমিনুল ইসলাম
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম তথা আমাদেরকে সৃষ্টি করে তাঁর নিজের রূহ থেকে ফুঁকে দিলেন। যে কারণে আল্লাহর সমস্ত মহৎ গুণাবলী আমাদের ভিতরে চলে এসেছে যদিও খুবই সামান্য পরিমাণে। আল্লাহর অন্যতম একটি সিফতী নাম ওহাব অর্থাৎ মহা-দাতা। এই মহাসৃষ্টির প্রত্যেকটি অণু পরমাণু আল্লাহর দানেরই ফসল। যে কারণে স্বভাবগতভাবে মানুষ দানশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়াও দানের উদ্দেশ্য আকিদা ও গুরুত্বের বর্ণনার পাশাপাশি দান করার জন্য আল্লাহ সরাসরি হুকুম দিয়েছেন (সুরা নাহল- ৯০), যার মাধ্যমে দান করা মুমিনের জন্য ফরদ হয়ে যায়। রসুলাল্লাহ দানের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছেন যে, “আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি দান কর, আমি তোমাকে দান করব [আবু হুরায়রাহ (রা:) থেকে বোখারী ও মুসলিম]।” হাদীসে আরও উল্লিখিত যে, হাশরের মাঠে দান মুমিনের জন্য ছায়াস্বরূপ হবে। এ ছাড়া দান আল্লাহর দেওয়া জীবন ব্যবস্থার অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দানের সংজ্ঞা: দান মানেই মানুষের কল্যাণার্থে কোনো কিছু বিনাশর্তে প্রদান করা, যা কখনোই ফেরত যোগ্য নয়। যদিও আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে বান্দার এই দানকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। শুধু নগদ অর্থ নয়, নিজের অধিকারভ্ক্তূ যেকোন কিছুই দানের বিষয়-বস্তু হতে পারে। রসুলাল্লাহর হাদিস মোতাবেক নিজের পোষ্যদের জন্য ব্যয় করা, আত্মীয়তা রক্ষার জন্য ব্যয় করা, মানুষকে বিপদে আশ্রয় দেওয়া, কারো জন্য দোয়া করা, কোনো ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাদ্য দেওয়া, পথ-সন্ধানীকে পথ দেখিয়ে দেওয়া, পতিত জমিতে আবাদ করা, কোনো মুমিন ভাইয়ের প্রতি হাস্যমুখ করা, কাউকে সৎ কাজের উপদেশ দেওয়া, অসৎ কাজ হতে নিষেধ করাও দান, পথের থেকে কাঁটা সরিয়ে দেওয়াও একটি দান। এককথায় বলতে গেলে, প্রত্যেক পুণ্য কাজই মুমিনের জন্য এক একটি দান যদি সেই কাজে আল্লাহর কোনো সৃষ্টি উপকৃত হয়।
দানের প্রতিদান: মানব জাতি তথা আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণ সাধনে প্রত্যেকটি কাজেরই আল্লাহ প্রতিদান দিয়ে থাকেন, এটা দুনিয়াতেও আখেরাতেও। দান যেহেতু আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং জারি রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে সেহেতু দানের প্রতিদান আল্লাহ দিবেন এটা সহজ কথা। আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে দানকে আল্লাহ করযে হাসানা হিসাবে উল্লেখ করেছেন এবং দানকারীকে দানের চেয়ে বহুগুণ বেশি পরিমাণে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা দিয়েছেন (সুরা বাকারা- ২৪৫, হাদীদ- ১১)। তাছাড়া দানকারী পুরুষ ও নারীদেরকে বহুগণ বেশি ছাড়াও সম্মানজনক পুরস্কার প্রদান ও ক্ষমার আশ্বাস দিয়েছেন (সুরা হাদীদ ১৮, তাগাবুন- ১৭)। পক্ষান্তরে দানের বিপরীতে যারা নিজে কৃপণতা করে এবং অন্যকে কৃপণতার নির্দেশ দেয় তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত (সুরা হাদীদ- ২৪), আল্লাহ তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন (সুরা নেসা- ৩৭), আর লোক দেখানো দানকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন না এবং শয়তানের সঙ্গী হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন (সুরা নেসা- ৩৮)। পাশাপাশি এটাও জানিয়েছেন যে, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, দানের কথা বলে বেড়ায় না এবং দান গ্রহণকারীকে খোটাও দেয় না তাদের পুরস্কারতো আছেই, তাদের কোনো ভয় নাই এবং তারা দুঃখিতও হবে না (সুরা বাকারা- ২৬২, ২৭৪)। যারা দানের কথা বলে বেড়ায় এবং দানগ্রহণকারীকে কষ্ট দেয় তাদের দানকে আল্লাহ নিষ্ফল করে দেন এবং লোক দেখানো দান বলে অখ্যায়িত করেছেন এমনকি আল্লাহ তাদেরকে মুমিন হিসাবেও স্বীকৃতি দেন নি। আর তাদের উপমা দিয়েছেন একটি মসৃণ পাথরের সাথে যার উপর কিছু মাটি থাকে; অতপর প্রবল বৃষ্টিপাতে উক্ত পাথরকে পরিষ্কার করে ফেলে, ফলে দানের কারণে তারা যা কিছু অর্জন করেছিল তা নিষ্ফল হয়ে যায় (সুরা বাকারা- ২৬৪)।
দানের উপকারিতা: দানের কারণে দৃশ্যমানভাবে সমাজের অস্বচ্ছল দরিদ্রশ্রেণি যেমন উপকৃত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে তেমনি অদৃশ্য অনেক উপকারিতাও আছে যা মুমিন মাত্রই বুঝতে সক্ষম। যেমন দানের কারণে আল্লাহ পাপ মোচন করেন (সুরা বাকারা- ২৭১), আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়, দানকারীর আত্মা বলিষ্ঠ হয় (সুরা বাকারা- ২৬৫)। দানকারীদেরকে আল্লাহ মোত্তাকী এবং তাদের এই কাজকে সৎকর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন (সুরা এমরান- ১৩৩, ১৩৪)। দানকে আল্লাহর সান্নিধ্য ও রসুলের দোয়া লাভের উপায় হিসাবেও সাব্যস্ত করেছেন (সুরা তওবা- ৯৯)। আত্মশুদ্ধির জন্য দানকারীদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে রাখার ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ঘোষণা দিয়েছেন (সুরা লাইল- ১৭-২১)। দানের উপকারিতা প্রসঙ্গে হুজুর (সা.) বলছেন, “দাতা ব্যক্তি আল্লাহর কাছে, জান্নাতের কাছে, মানুষেরও কাছে অথচ জাহান্নাম হতে দূরে এবং কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহ হতে দূরে, জান্নাত হতেও দূরে, মানুষ হতেও দূরে অথচ জাহান্নামের অতি কাছে। নিশ্চয় মূর্খ দাতা কৃপণ সাধক অপেক্ষা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় (আবু হুরায়রাহ থেকে তিরমিযি)। দান আল্লাহ পাকের রোষ প্রশমিত করে এবং মন্দ মৃত্যু রোধ করে (আনাস রা. থেকে তিরমিযী)।”
উৎকৃষ্ট বস্তু দান করা: মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে মানুষকে অকৃতজ্ঞ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, মানুষের প্রতি আল্লাহ যে অফুরন্ত রহমত, বরকত, দয়া, করুণা বর্ষিত হয় সে মোতাবেক সে অল্পই আল্লাহকে স্মরণ করে। মানুষের অধিকারে থাকা প্রত্যেকটি সম্পদই আল্লাহর দান কিন্তু যখনই আল্লাহর পথে ব্যয় করার ডাক আসে তখন মানুষ তার সম্পদের নিকৃষ্টতম বস্তুটিই দান করতে এগিয়ে আসে। সে জন্য আল্লাহ উৎকৃষ্ট বস্তুই দান করতে এবং নিকৃষ্ট বস্তু দান করার সংকল্প করা থেকেও দূরে থাকতে (সুরা বাকারা- ২৬৭) এবং নিজেদের প্রিয় জিনিস দান করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা আলে এমরান- ৯২)। যে জিনিস নিজে গ্রহণ করবে না, বা ইতস্তত করবে সেটা দান করা থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়। রসুলাল্লাহও এক মুমিনের প্রতি আরেক মুমিনের অধিকার বর্ণনা করতে যেয়ে নিজের জন্য যা পছন্দ করবে অপরের জন্যও তা-ই পছন্দ করার তাগিদ দিয়েছেন।
দান করার নীতি: মহান আল্লাহ আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ জাতি হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্টির প্রত্যেকটি বিষয়বস্তুই ভারসাম্যপূর্ণ, প্রাকৃতিক। এই ভারসাম্য একদিকে নষ্ট হলে অপরদিকেও আঘাত করবে এবং আল্লাহর সৃষ্টিতে বিঘ্ন ঘটাবে। এ কারণে আল্লাহ দান করার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করতে বলেছেন, “তুমি তোমার হস্ত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না। তাহলে তুমি তিরষ্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে (সুরা বনী ইসরাইল- ২৯)।” আবার একেবারে কড়ায় গণ্ডায় হিসেব করেও দান করতে রসুল নিষেধ করছেন, “দান করতে থাকবে এবং হিসাব করবে না যাতে আল্লাহ তোমাকে দান করতে হিসাব না করেন। ধরে রাখবে না যাতে আল্লাহ তোমার ব্যাপারে ধরে না রাখেন। তোমার সামর্থ্য অনুসারে সামান্য হলেও দান করবে (আসমা বিনতে আবু বকর থেকে বোখারী ও মুসলিম)।” আবার নগণ্য উসিলায় যেন দান করা থেকে বিরত না থাকে সেজন্য রসুলাল্লাহ বলছেন, “হে নারী সমাজ! তোমরা দান কর যদি তোমাদের গহনা হতেও হয় (যয়নব রা. থেকে বোখারী ও মুসলিম)।”
সম্পদ জমা করার প্রতিফল: ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। অর্থনীতি হলো জীবনব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। ইসলামী অর্থনীতির মূল কথা হলো সম্পদ জমা করা নয়, খরচ করা, ব্যয় করা। কারণ, একটা সম্পদ যত বেশি লোকের হাতে যাবে ঐ সম্পদ দিয়ে ততবেশি লোক উপকৃত হবে। একারণে, ব্যয় না করে যারা জমা করে তাদের জন্য আল্লাহর কঠোর সতর্কবাণী যে, “আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাহাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে, সেদিন বলা হবে, এটাই হচ্ছে তা যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জিভূত করতে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা এবার আস্বাদন কর (সুরা তাওবা- ৩৪, ৩৫)। দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও তা বার বার গণনা করে, সে ধারণা করে যে, তাহার অর্থ তাহাকে অমর করে রাখিবে, কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায় (সুরা হুমাযা- ১-৪)।”
যারা কৃপণতা করে তাদের পরিণাম: আল্লাহ মানুষকে তাঁর রঙে রঙিন হতে বলেছেন তার মানে তাকে দয়া, মায়া, মমত্ববোধ, উদারতা, মহানুভবতা, দানশীলতা ইত্যাদি আল্লাহর গুণাবলীতে নিজেকে গুণান্বিত করতে হবে। তেমনি কৃপণতা, দারিদ্র্যের ভয়, হতাশা এগুলো হলো এবলিসের গুণ। যে কারণেই হোক, যারা কৃপণতা করবে তারা এবলিসের অনুসারী, তারা আল্লাহর লানতের পাত্র হবে। তাদের প্রতি আল্লাহ হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, “তোমরাই তো তারা যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হয়েছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা কোরছ। যারা কার্পণ্য করে তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরাই অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন, তারা তোমাদের মতো হবে না (সুরা মুহাম্মদ- ৩৮)।” কৃপণতাকে ধিক্কার দিয়ে রসুলাল্লাহ বলেছেন, “তোমরা কৃপণতা হতে বেঁচে থাকবে, কেননা, কৃপণতা ধ্বংস করেছে তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে। কৃপণতা তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে রক্তপাতের প্রতি এবং হারামকে হালাল করার প্রতি, তারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয়লোকে ধ্বংস হয়েছে (যাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে মুসলিম)।”
সব দান সমান নয়: কারও দুঃসময়ে দান আর সুসময়ে দান এক নয়। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর পথে কেন ব্যয় করবে না? আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মালিকানাতো আল্লাহরই। তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে তারা এবং পরবর্তীরা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যারা পরবর্তীকালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন (সুরা হাদীদ- ১০)।”
দানকারীর প্রতিদান ও কৃপণের সর্বনাশ: রসুলাল্লাহ বলেছেন, “যখনই আল্লাহর বান্দাগণ ভোরে জাগ্রত হয় তখন আকাশ হতে দুজন মালায়েক অবতীর্ণ হন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! তুমি দাতাকে প্রতিদান দাও এবং অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! তুমি কৃপণকে সর্বনাশ দাও (আবু হুরায়রাহ (রা:) থেকে বোখারী ও মুসলিম)।”
কৃপণতা মুমিনের স্বভাব নয়: মর্যাদাবান প্রত্যেকটি বিষয়ের সাথে আল্লাহ এবং তাঁর রসুল যেমন সম্পর্কিত তেমনি আল্লাহর মুমিন বান্দাও সম্পর্কিত। কৃপণতা আল্লাহর স্বভাব নয়, রসুলের স্বভাব নয় তেমনি আল্লাহ ও রসুলের অনুগত কোনো মুমিনেরও স্বভাব নয়। তাই রসুলাল্লাহ বলছেন, “এ দু’টি স্বভাব মুমিনের মধ্যে একত্রিত হতে পারে না, কৃপণতা ও দুর্ব্যবহার (আবু সাইদ খুদরী থেকে তিরমিযি)। আমি কি তোমাদের বলব না সর্বপেক্ষা মন্দস্তরের ব্যক্তি কে? সে ব্যক্তি যার কাছে আল্লাহর নামে কিছু চাওয়া হয় আর সে তাঁর নামে কিছু দেয় না (ইবনে আব্বাস রা. থেকে আহমদ)।”
দান কাকে করবে: দানের মধ্যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয়কৃত দানকেই আল্লাহ ও তাঁর রসুল সর্বত্তোম দান হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এই দানকে আল্লাহ করযে হাসানা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এই দানকারীকেই আল্লাহ বহুগুণে বৃদ্ধি করা, পাপ মোচন করা, আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা, আল্লাহর ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রদানের ওয়াদা দিয়েছেন। কারণ, এই দানের কারণে আল্লাহ এবলিসের চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হন, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, আল্লাহর মহা-পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়, সর্বোপরি আল্লাহর অতি আদরের সৃষ্টি মানুষ সুখে শান্তিতে নিরাপত্তায় বসবাস করতে পারে। একারণে আল্লাহ দান পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যিনি আল্লাহর পথে সংগ্রামে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত, আয় রোজগার করার সুযোগ নেই এবং মানুষের কাছে ভিক্ষাও করে না, আল্লাহর ভাষায়, “ইহা প্রাপ্য অভাবগ্রস্ত লোকদের; যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, দেশময় ঘোরাফেরা করতে পারে না। যাঞ্চা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলিয়া মনে করে। তুমি তাহাদের লক্ষণ দেখিয়া চিনিতে পারিবে। তারা মানুষের নিকট নাছোড় হয়ে যাঞ্চা করে না (সুরা বাকারা- ২৭৩)।”
রসুলাল্লাহ এবং তাঁর আসহাবদের উল্লেখযোগ্য দান: মানব জাতির দুনিয়াতে শান্তি ও আখেরাতে মুক্তির জন্য আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন রসুলাল্লাহ সেটিই তাঁর নিজের ও আসহাবদের সামগ্রিক জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন যে, ইসলাম এটা, ইসলামের এই কাজ এভাবে করতে হয়। রসুলাল্লাহ একজন উৎকৃষ্ট দানশীল ছিলেন এ কথাটা অন্যভাবে বললে বলতে হয়, রসুলাল্লাহর মাধ্যমে তাঁর জাতি দানশীলতা দেখতে পেয়েছে এবং এই বিরল গুণটা অর্জন করতে পেরেছে। যিনি নিজের অর্জিত সহায় সম্পত্তি, তাঁর প্রথম স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা:) এর সম্পত্তি, নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য, ইজ্জত, সম্মান, গুরুত্বপূর্ণ সময়, অক্লান্ত পরিশ্রম, অপরিসীম মেধা, আল্লাহর থেকে দেয়া যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, এমনকি যুদ্ধের ময়দানে পবিত্র দেহের রক্ত ঝরানোসহ সকলকিছু দান করে গেছেন মানবতার কল্যাণের জন্য, মুক্তির জন্য, শান্তির জন্য। তাঁর পৃথিবী থেকে চলে যাবার সময়ে নয়টি তরবারিসহ কয়েকটি যুদ্ধের উপকরণ ছাড়া পার্থিব কোনো সম্পদ তিনি রেখে যান নি। দানের ক্ষেত্রে এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। যারা আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রসুলের সাহাবী হয়েছেন তাদের চরিত্রেও একই ধারা প্রবাহিত হয়েছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। যেমন, রসুলের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযান হয়েছে তাবুক অভিযান। এই অভিযানে রসুলাল্লাহ তাঁর জাতির কাছে আল্লাহর রাস্তায় পূর্ণভাবে জান মাল দিয়ে অংশগ্রহণ করার প্রস্তাব দিলেন। সাহাবীদের সকলেই যথাসাধ্য রসুলাল্লাহর প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন কিন্তু আবু বকর (রা:) রসুলাল্লাহর এই প্রস্তাবে সাড়া দিলেন ভিন্ন আঙ্গিকে যা পরবর্তীদের জন্য একটি কালজয়ী উদাহরণ হয়ে থাকলো। তিনি ঘরে ব্যবহার্য পার্থিব যে সম্পদ ছিল (কয়েকটি হাড়ি পাতিল, থালা-বাসন ইত্যাদি) সবগুলো নিয়ে রসুলাল্লাহর দরবারে হাজির হলেন এবং বললেন যে, ঘরে আল্লাহ এবং তাঁর রসুলকে রেখে এসেছেন। যার আর্থিক মূল্যমান ছিল নগণ্য কিন্তু আত্মিক মূল্যমান ছিল বিশাল। এই দানের প্রকৃত মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন রসুলাল্লাহ। যে কারণে অন্যান্য সাহাবীরা অনেক বেশি সম্পদ দিলেও দানে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন আবু বকর (রা:)। অথচ আমাদের সমাজে যারা রসুলের উত্তরসূরী (ওরাসাতুল আম্বিয়া) দাবী করেন, তাদের স্থাবর অস্থাবর অন্যান্য সম্পদের হিসাব যাই হউক না কেন শুধু শরীরে জড়িয়ে থাকা জামা কাপড়ের দামই কয়েক হাজার টাকা, তবুও তারা দান গ্রহণ করেন।
দান ব্যবসা-ধর্মব্যসার একটি শাখা: এখন যদি কোনো মানুষকে দানের মহিমা বোঝানো হয় তাহলে প্রথমেই সে চিন্তা করবে কোথায় দান করা যায়। এর জন্য তার সামনে যে বিকল্পগুলি দেখবে সেগুলি হচ্ছে, মসজিদ, এতিমখানা, মাদ্রাসায় ইত্যাদি। বর্তমানে ইসলাম ধর্মের পুরোহিতরা এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে দানের খাত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। কিন্তু এগুলি আসলে তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এখানে দান করলে আল্লাহর দরবারে যায় না, যায় ধর্মজীবীদের পেটে। কিন্তু ইসলাম কোনো ব্যবসায়িক পণ্য নয়, কোর’আন হাদীসের কোনো একটা শব্দের বিনিময়েও দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ হাসিল করা নিষিদ্ধ, হারাম। যারা এই গর্হিত কাজ করবে তাদের জন্য আল্লাহ কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন (সুরা বাকারা- ১৭৪, ১৭৫সহ বহু আয়াত ও হাদিস)। মসজিদ নির্মাণের জন্য এক মুষ্টি বালুর টাকা, একটি ইটের টাকা দিয়ে আখেরাতে জান্নাত লাভের প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে। এই অর্থ যুগ যুগ ধরে তোলা হয়, মসজিদ আর হয় না। একইভাবে এতিমখানা, হেফজখানার নামেও চলে ভিক্ষাবৃত্তি। রমজান মাস বা কোরবানীর ঈদ যেন ধর্মব্যবসায়ীদেরই মৌসুম। ভিক্ষা করা হারাম, এক ভিক্ষুককে রসুলাল্লাহ কম্বল বিক্রি করিয়ে কুঠার কিনে কাঠ কাঠতে পাঠিয়েছেন, এই ঘটনা তারাই বর্ণনা করেও ধর্মজীবীরা দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেন। আজকের সমাজে যারা হাজারো অপকর্ম করে, সুদের কারবার করে সমাজে প্রভাবশালী হন তারাই এই ধর্মব্যবসায়ীদের পোষক। কিন্তু এদের অপকর্মের ব্যাপারে কিন্তু ধর্মব্যবসায়ীরা নিশ্চুপ বরং পার্থিব সুবিধার (যেমন দাওয়াত খাওয়া) আশায় তাদের জন্য এরা দোয়াও করে। এই সকল ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি কথা যে, আপনারা নিজের হাতকে উপরে স্থাপন করুন, রসুলাল্লাহর আসহাবদের মতো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করুন। কেননা, একদিন রসুলাল্লাহ বলেন, “উপরের হাত নীচের হাত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ (ইবনে ওমর রা. থেকে বোখারী ও মুসলিম)।”

মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায় ঢিলেঢালাভাবে

মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায় ঢিলেঢালাভাবে


মাহবুব আলী:
এই দীনের নেতারা, ওলামা, আল্লামা, ফুকাহা, মোহাদ্দেসিন, মুফাস্সেরিন সবাই একমত যে আকিদা সহীহ অর্থাৎ সঠিক না হলে ঈমানেরও কোন দাম নেই এবং স্বভাবতই ঈমান ভিত্তিক সব আমল অর্থাৎ সালাহ্ (নামাজ), যাকাহ, হজ্ব, সওম (রোজা) এবং অন্যান্য কোন ইবাদতেরই আর দাম নেই, সব অর্থহীন। তাদের এই অভিমতের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু বর্তমানের এই বিকৃত ইসলামে আকিদার অর্থ করা হয় ঈমান। এটা ভুল। আকিদার প্রকৃত অর্থ হলো কোন বিষয় সম্বন্ধে সঠিক ধারণা। কোন জিনিস দিয়ে কী হয়, ওটার উদ্দেশ্য কী, ওটাকে কেন তৈরি করা হয়েছে তা সঠিক ভাবে বোঝা। সালাহ্ সম্বন্ধে সঠিক আকিদা কী? অত্যন্ত সংক্ষেপে সঠিক আকিদা হলো: আল্লাহ তাঁর শেষ রসুলকে পাঠালেন এই দায়িত্ব দিয়ে যে, তিনি যেন আল্লাহর দেয়া হেদায়াহ ও সত্যদীন পৃথিবীর অন্য সব দীনের ওপর প্রতিষ্ঠা করেন, এবং নিজে এই কথার সাক্ষী রইলেন (কোরান- সুরা ফাতাহ ২৮)। এই হেদায়াতই হলো তওহীদ, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, সিরাতুল মুস্তাকীম; এবং সত্যদীন হলো ঐ তওহীদের ওপর ভিত্তি করা জীবন-ব্যবস্থা, শরিয়াহ, দীনুল ইসলাম, দীনুল কাইয়্যেমাহ। এই কাজের অর্থাৎ এই সত্যদীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার তরিকা, প্রক্রিয়া অর্থাৎ কোন্ নীতিতে এই কাজ করা হবে তাও আল্লাহ নির্ধারিত কোরে দিলেন এবং সেটা হলো কেতাল, সশস্ত্র সংগ্রাম, যুদ্ধ। প্রশিক্ষণ ছাড়া, চরিত্র গঠন ছাড়া যুদ্ধ কোরে জয়লাভ সম্ভব নয়, থাম-খুঁটি, পিলার ছাড়া ছাদ রাখা সম্ভব নয়, কাজেই সেই চরিত্র গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত কোরে দিলেন সালাহ্ এবং এই সালাহ্-কেও ফরদে আইন অবশ্য কর্তব্য, (Must) কোরে দিলেন (সুরা বনি এসরাঈল ৭৮)।
আজ মুসলিম দুনিয়ায় সালাতের সম্বন্ধে আকিদা কী? সালাহ্ চরিত্র গঠনের মুখ্যত দুর্ধর্ষ, অপরাজেয় যোদ্ধার চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া; এই আকিদা বদলে একে অন্যান্য ধর্মের মতো ইবাদতের, উপাসনার শুধু আত্মিক উন্নতির প্রক্রিয়া বলে মনে করার ফলে আজ সেই যোদ্ধার চরিত্র গঠন তো হয়ই না এমন কি সালাতের বাহ্যিক চেহারা পর্যন্ত বদলে গেছে। আল্লাহর রসুলের বহুবারের দেওয়া তাগীদ- সাবধান বাণী- তোমাদের সালাতের লাইন ধনুকের ছিলার মতো সোজা কর, নাহলে আল্লাহ তোমাদের মুখ পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেবেন, তাঁর আদেশ- তোমাদের মেরুদণ্ড, ঘাড় সোজা কোরে সালাতে দাঁড়াও এ সমস্ত কিছুই আজ ভুলে যাওয়া হয়েছে। এসব হুকুম না মুসুল্লীদের মনে আছে, না ইমামদের মনে আছে। কাজেই ঐ সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের সালাহ্ আজ নুব্জ, বাঁকা লাইনের; বাঁকা পিঠের মুসুল্লী ও ইমামদের মরা সালাহ্। আল্লাহ কোর’আনে সুরা নিসার ১৪১-১৪২ নং আয়াতে মুনাফিকদের সালাতের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন- মুনাফিকরা শৈথিল্যের সাথে সালাতে দাঁড়ায়। আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘কুসালা’ যার অর্থ সাহস হারিয়ে ফেলা, অলসতা, ঢিলা-ঢালা ভাবে। বর্তমান বিশ্বের মুসলিম নামের এ জাতির সালাতের দিকে তাকালে কুসালা শব্দের অর্থ বুঝতে কারও কষ্ট হবে না। খুশু, খুজুর নামে এ জাতি ‘কুসালা’ শব্দের যথাযথ প্রয়োগ করছে। সমস্ত বিশ্বে বর্তমানে এই সাহসহীন সালাহ্-ই চলছে। এই মরা প্রাণহীন সালাতের পক্ষে বলা হয়- খুশু-খুজুর সাথে নামাজ পড়া উচিত। এই খুশু-খুজু কী? বর্তমানে বলা হয় সমস্ত কিছু থেকে মন সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন কোরে আল্লাহর প্রতি মন নিবিষ্ট করা হচ্ছে খুশু-খুজু; অর্থাৎ এক কথায় ধ্যান করা।
প্রশ্ন হচ্ছে, সালাতে আল্লাহকে ধ্যান করাই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে আল্লাহ সালাতের প্রক্রিয়া, নিয়ম-কানুন এমন কোরে দিলেন কেন যাতে ধ্যান করা অসম্ভব। খুশু-খুজুু অর্থাৎ ধ্যান করাই আল্লাহর উদ্দেশ্য হলে সালাতের নিয়ম হতো পাহাড়-পর্বতের গুহায়, কিম্বা খানকা বা হুজরায় অথবা অন্ততপক্ষে কোন নির্জন স্থানে ধীর-স্থিরভাবে একাকী বোসে চোখ বন্ধ কোরে মন নিবিষ্ট কোরে আল্লাহর ধ্যান করা। সালাহ্ কি তাই? অবশ্যই নয়, সালাহ্ এর ঠিক উলটো। বহু জনসমাবেশের মধ্যে যেয়ে সেখানে ধনুকের ছিলার মতো সোজা লাইন কোরে দাঁড়িয়ে সৈনিকের, যোদ্ধার মতো ঘাড়, মেরুদণ্ড লোহার রডের মতো সোজা কোরে, ইমামের তকবিরের (আদেশের) অপেক্ষায় সতর্ক, তটস্থ, থাকা তারপর তকবিরের সঙ্গে সঙ্গে সকলে একত্রে রুকু, সাজদায় যাওয়া, ওঠা, সালাম দেয়া অর্থাৎ ইমামের (নেতার) আদেশ পালন করা। সালাতের প্রায় ১১৪ টি নিয়ম-পদ্ধতির প্রতি লক্ষ্য রেখে, সেগুলি যথাযথভাবে পালন কোরে ঐ খুশু-খুজুর সাথে অর্থাৎ ধ্যানের সাথে সালাহ্ সম্পাদন করা যে অসম্ভব তা সাধারণ জ্ঞানেই (Common sense) বোঝা যায়। অথচ ঐ নিয়ম-পদ্ধতি সঠিক ভাবে, যথাযথ ভাবে পালন না কোরে যেমন-তেমন ভাবে সালাহ্ পড়লে তা আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। আল্লাহর রসুল বলেছেন- তোমরা পূর্ণভাবে সালাহ্ কায়েম করো, কেননা আল্লাহ পূর্ণ ব্যতীত সালাহ্ কবুল করেন না [আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে]। তিনি আরও বলেছেন- তোমাদের কাহারও সালাহ্ পূর্ণ (সঠিক) হবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ যেভাবে আদেশ করেছেন ঠিক সেইভাবে কায়েম করবে (আবু দাউদ)। আল্লাহ-রসুলের আদেশ মোতাবেক সমস্ত নিয়ম-কানুন যথাযথ পালন কোরে অর্থাৎ পূর্ণ সঠিকভাবে সালাহ্ কায়েম করলে বর্তমানে মুসুল্লীরা খুশু-খুজু বলতে যা বুঝেন তা অসম্ভব। খুশু-খুজুর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে- মুমিন যখন সালাতে দাঁড়াবে তখন তার মন পৃথিবীর সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাগ্র হবে সালাতে; সে সমস্ত ক্ষণ সচেতন থাকবে যে সে মহামহীম আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আল্লাহর বিরাটত্ব ও তার নিজের ক্ষুদ্রতা সম্বন্ধে সে থাকবে সর্বদা সচেতন, আর সেই সঙ্গে একাগ্র হয়ে থাকবে ইমামের (নেতার) তকবিরের (আদেশের) প্রতি, সালাহ্ সঠিকভাবে, নিখুঁতভাবে সম্পাদন করতে। এই হলো খুশু-খুজু।