Tuesday, April 5, 2016

শুধু ব্যক্তি জীবনে আল্লাহর হুকুম মানলেই মো’মেন থাকা যায় না

শুধু ব্যক্তি জীবনে আল্লাহর হুকুম মানলেই মো’মেন থাকা যায় না


রাকীব আল হাসান

কোন সন্দেহ নেই যে মুসলিম দাবিদার এই জাতিটা ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের দাসে পরিণত হবার পরও বহু লোক আল্লাহ ও তাঁর রসুলে (সা.) পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ছিল, কিন্তু সে বিশ্বাস ছিল ব্যক্তিগতভাবে, জাতিগতভাবে নয়। কারণ জাতিগতভাবে তাদের রাজনৈতিক আর্থ সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থা তো তখন ইউরোপীয়ান খ্রিষ্টানদের হাতে এবং তারা ইসলামী ব্যবস্থা বদলে নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা এই জাতির জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতীয় জীবন থেকে আল্লাহর দেয়া রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা কেটে ফেলে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে তা বজায় রাখলে আল্লাহর চোখে মুসলিম বা মো’মেন থাকা যায় কিনা এ প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর হচ্ছে- না, থাকা যায় না। কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন- তোমরা কি কোর’আনের কিছু অংশ বিশ্বাস কর, আর কিছু অংশ বিশ্বাস কর না? যারা তা করে (অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ সমূহের এক অংশ বিশ্বাস করে না বা তার উপর আমল করে না) তাদের প্রতিফল হচ্ছে এই পৃথিবীতে অপমান, লাঞ্ছনা এবং কেয়ামতের দিনে কঠিন শাস্তি। তোমরা কী করছ সে সম্বন্ধে আল্লাহ বেখেয়াল নন (সুরা আল বাকারা ৮৫)। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় কী বলেছেন। তাঁর আদেশ নিষেধগুলির কতকগুলি মেনে নেয়া আর কতকগুলিকে না মানার অর্থ আল্লাহকে আংশিকভাবে মানা অর্থাৎ শেরক। তারপর বলছেন এর প্রতিফল শুধু পরকালেই হবে না এই দুনিয়াতেও হবে আর তা হবে অপমান ও হীনতা। আল্লাহ মো’মেনদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উভয় দুনিয়াতে অন্য সবার উপর স্থান ও সম্মান। এ প্রতিশ্রুতি তার কোর’আনের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এখন যদি এই লোকগুলিকে তিনি বলেন, তোমাদের জন্য এই দুনিয়াতে অপমান ও কেয়ামতে কঠিন শাস্তি, শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘শাদীদ’ ভয়ংকর তবে আল্লাহ তাদের নিশ্চয়ই মো’মেন বলে স্বীকার করছেন না। যদিও তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর আইন-কানুন (শরীয়াহ) তারা পুংখানুপুংখভাবে মেনে চলেন।
আল্লাহ কোর’আনে আরো বলেছেন- হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সম্পূর্ণভাবে ইসলামে প্রবিষ্ট হও (কোর’আন, সুরা বাকারা- ২০৮)। আকিদা বিকৃতি হয়ে যাওয়ার ফলে আজ আল্লাহর এই আদেশের অর্থ করা হয় এই যে, ইসলামের খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলি পালন কর। আসলে এই আয়াতে আল্লাহ মো’মেনদের অর্থাৎ যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে তাদের বললেন যে, ইসলামকে অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানকে সম্পূর্ণ ও পূর্ণভাবে গ্রহণ কর এর কোন একটা অংশকে নয়। ব্যক্তিগত অংশকে বাদ দিয়ে শুধু জাতীয়, রাষ্ট্রীয় অংশটুকু নয়; কিম্বা জাতীয় অংশকে বাদ দিয়ে শুধু ব্যক্তিগত অংশটুকুও নয়। ঐ কথার পরই তিনি বলছেন- এবং শয়তানের কথামত চলো না। অর্থাৎ ঐ আংশিকভাবে ইসলামে প্রবেশ করলে তা শয়তানের অনুসরণ করা হবে, শয়তানের কথামত চলা হবে। শয়তান তা-ই চায়, কারণ আংশিকভাবে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে আল্লাহর আইন, বিধান প্রতিষ্ঠা না করে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে তা মেনে চললে সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে না এবং অন্যায়, অশান্তি ও রক্তপাত চলতেই থাকবে। যেমন আজ শুধু পৃথিবীতে নয়, মুসলিম নামের এই জাতিতেও নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও অন্যান্য খুঁটিনাটি পূর্ণভাবে পালন করা সত্ত্বেও পৃথিবীতে অশান্তির জয়জয়কার, বইছে রক্তের বন্যা। সুতরাং এই জাতি (উম্মাহ) যখন ইউরোপীয়ানদের কাছে যুদ্ধে হেরে যেয়ে তাদের দাসে পরিণত হলো এবং তাদের রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা যখন তাদের বিদেশী প্রভুরা পরিবর্তন করে তাদের নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা প্রবর্তন করলো, তখন আর এই জাতি মুসলিমও রইলো না, হয়ে গেল মোশরেক এবং কাফের।
ইউরোপীয়ান খ্রিষ্টানদের দাসে পরিণত হবার পরও এ জাতির চোখ খুললো না। মনে এ চিন্তাও এলো না যে, একি? আমার তো অন্য জাতির গোলাম হবার কথা নয়। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি তো এর উল্টো, আমাকেই তো পৃথিবীর সমস্ত জাতির উপর প্রাধান্য দেবার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়ে ছিলেন (সুরা নুর ৫৫)। আমরা যখন মুষ্টিমেয় ছিলাম তখন তো আমাদের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে নি। ঐ মুষ্টিমেয় যোদ্ধার কারণে আমরা পৃথিবীর একটা বিরাট অংশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলাম। কিন্তু কোথায় কি হলো? সেই মুষ্টিমেয়র কাছে পরাজিত শত্রু আজ আমাদের জীবন বিধাতা। এসব চিন্তা এ জাতির মনে এলো না কারণ কয়েক শতাব্দী আগেই তাদের আকিদা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। কোর’আন হাদীসে পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করে প-িতরা এ জাতির এক অংশের আকিদা এই করে দিয়েছিলেন যে, ব্যক্তিগতভাবে খুঁটিনাটি শরীয়াহ পালন করে চললেই “ধর্ম পালন” করা হয় এবং পরকালে জান্নাত লাভ হবে। অন্যদিকে ভারাসাম্যহীন বিকৃত তাসাওয়াফ অনুশীলনকারীরা জাতির অন্য অংশের আকিদা এই করে দিয়েছিলেন যে, দুনিয়াবিমুখ হয়ে নির্জনতা অবলম্বন করে ব্যক্তিগতভাবে আত্মার ঘষামাজা করে পবিত্র হলেই “ধর্ম পালন” করা হয় ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। জাতীয় জীবন কোন্ আইনে চলছে, কার তৈরি দণ্ডবিধিতে (Penal code) আদালতে শাস্তি হচ্ছে তা দেখবার দরকার নেই। এই আকিদা (Attitude, Concept) দৃষ্টিভঙ্গি যে বিশ্বনবীর (সা.) শিক্ষার বিপরীত তা উপলব্ধি করার শক্তি তখন আর এ জাতির ছিল না। কারণ ফতোয়াবাজীর জ্ঞানই যে একমাত্র জ্ঞান, পৃথিবীর অন্যান্য কোন জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, প-িতদের এই শিক্ষার ও ফতোয়ার ফলে এই জাতি একটি মূর্খ জাতিতে পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিল, দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্থানে স্থানে কিছু সংখ্যক লোক বাদে সমস্ত জাতিটাই এই অজ্ঞানতার ঘোর অন্ধকারের মধ্যে বসে ভারবাহী পশুর মতো ইউরোপীয়ান প্রভুদের পদসেবা করলো কয়েক শতাব্দী ধরে। এই কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের সময়ে এই জাতির একটি বড় অংশ অকৃত্রিম হৃদয়ে তার খ্রিষ্টান প্রভুদের সেবা করেছে। প্রভুরা যখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করেছে তখন এরা যার যার প্রভুর পক্ষ নিয়ে লড়েছে ও প্রাণ দিয়েছে। যে মহামূল্যবান প্রাণ শুধুমাত্র পৃথিবীতে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে উৎসর্গ করার কথা সে প্রাণ এরা দিয়েছে ইউরোপীয়ান খ্রিষ্টান প্রভুদের সাম্রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধে, প্রভুদের নিজেদের মধ্যে মারামারিতে। আল্লাহর শাস্তি কী ভয়ংকর!

Monday, April 4, 2016

রসুলাল্লাহর আবির্ভাবের আগে ও পরে

রসুলাল্লাহর আবির্ভাবের আগে ও পরে


রসুলাল্লাহর আগমনের পটভূমি:

রসুলাল্লাহর আবির্ভাবকালীন বিশ্বে পারস্য, রোম, চীন ও ভারতীয় সভ্যতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তন্মধ্যে পারস্য ও রোম সভ্যতা ছিল সর্বাপেক্ষা বিস্তৃত এবং পরাক্রমশালী (সুপার পাওয়ার)। সে সময়ের প্রতিটি সভ্যতার অধীনেই সীমাহীন অন্যায়, অশান্তি, রক্তপাত বিস্তার লাভ করেছিল। যেমন: ধর্মীয়ভাবে পারস্যের অধিবাসীরা ছিল অগ্নি উপাসক। কিন্তু সে ধর্ম সমাজে কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। ফলে পারাস্য সমাজে অনাচার, অবিচার, যুদ্ধ, বিগ্রহ লেগেই ছিল। নৈতিক অবক্ষয় তাদের মধ্যে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পিতা কন্যাকে, ভাই বোনকে পর্যন্ত বিয়ে করত। আর রোমানদের অবস্থাও পারস্যের চেয়ে খুব একটা ভাল ছিল না, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী হলেও তাদের মধ্যে ধর্ম সংক্রান্ত মতানৈক্য, দলাদলির দাবানল চরম আকার ধারণ করেছিল। রসুলাল্লাহর জন্মের মাত্র ছাপ্পান্ন বছর আগে ৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে একত্ববাদ থেকে ত্রিত্ববাদের সূচনাকে কেন্দ্র করে রোমীয় খ্রিষ্টানদের মধ্যে এক মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এ যুদ্ধের ফলে প্রায় পঁয়ষট্টি হাজার খ্রিষ্টান রোম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এদিকে ভারত উপমহাদেশ সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নানা রকম কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। বর্ণবাদের বৈষম্যের বেড়াজালে আটকে পুরো জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। বর্ণবাদের নিষ্পেষণে ভারত উপমহাদেশ চরমভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। অপর দিকে চীনের অধিবাসীরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম তখনো চীনকে শান্তি দিতে পারেনি বরং সামাজিক অবক্ষয়ে জাতিটা থিতিয়ে পড়েছিল। তৎকালীন বিশ্বের বড় বড় সভ্যতার যখন এই দূরাবস্থা তখন ছোট ছোট জাতিগুলির অবস্থা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এমন একটি ছোট্ট জাতি ছিল আরব জাতি। সে সময় আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল ভয়াবহ রকমের নৈরাজ্যকর। ব্যক্তিগতভাবে হিংসা-বিদ্বেষ; দলগতভাবে হানাহানি, যুদ্ধ; সামাজিকভাবে হত্যা, লুণ্ঠন, জুয়া, মদ ও ব্যভিচার সমগ্র আরবকে যেন গ্রাস করে ফেলেছিল। তারা আল্লাহকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে বিশ্বাস করলেও মানাত, লাত, ওযযা, হাবলসহ শতশত দেবতার উপাসনায় ছিল নিমগ্ন। কাঠ-পাথরের বিভিন্ন মূর্তি দিয়ে তারা কাবাকে কলঙ্কিত করেছিল। শুধু তাই নয়, হজ্ব উপলক্ষ্যে তারা কাবাকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছিল। সে সময় সবচেয়ে বর্বর, অসভ্য, হতদরিদ্র জাতি হিসাবে আরবরা সর্বত্র পরিচিত ছিল।
এক কথায় বলা যায় রসুলাল্লাহর আবির্ভাবের সময় সমস্ত বিশ্বে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজাধিরাজ পর্যন্ত সকলেই আকণ্ঠ ডুবে ছিল অন্ধকারের সাগরে।
পৃথিবীর এমন ক্রান্তিকালে মহান আল্লাহ সমস্ত মানব জাতির উপর সদয় হলেন। নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল বিষয়ে অধঃপতিত আরব জাতির মধ্যে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামনব, নবীকূলশিরমনি মোহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাব ঘটালেন।

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সাথে বর্তমানের মিল:

বর্তমানে সমস্ত পৃথিবীর একক কর্তৃত্বকারী ‘সভ্যতা’ হলো ইহুদি খ্রিষ্টান বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ যার প্রভাবাধীন সমস্ত পৃথিবী আজ চরম অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনায় পরিপূর্ণ। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় হত্যা, রাহাজানি, ধর্ষণ, ছিনতাই, যুদ্ধ, আত্মঘাতী বোমাহামলা ইত্যাদি নানা জঘন্য ঘটনায় পরিপূর্ণ আমাদের এই পৃথিবী। আজও পত্রিকার পাতায় তৎকালীন আরব সমাজের মতো দেখতে পাই “বাবার কাছে যৌন নিপীড়নের শিকার হলো নিজ কণ্যা”, “ভারতে বাবা ও ভাইয়ের পৈশাচিক যৌন নিপীড়নের শিকার হতভাগ্য এক নারী” ইত্যাদি আরও জঘন্য সব লোমহর্ষক সংবাদ। পাশ্চাত্য সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে গেছে যে, পৃথিবীর ইতিহাসের সমস্ত রকম যৌনতার রেকর্ড ভেঙ্গে সমলিঙ্গে যৌনতা আইনসিদ্ধ করে নিচ্ছে, ইতর প্রাণীর সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করছে এবং বিকৃত যৌনাচারের ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে সমগ্র পৃথিবীতে। আর আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র জাতিগুলি তাদের পদে পদে অনুসরণ করছে। অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক স্খলনসহ সকল ক্ষেত্রে বর্তমান সমাজ তৎকালীন আরবসমাজের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে।

নবুয়্যত পূর্ববর্তী জীবন:

অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোকিত করতে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ১২ই রবিউল আউয়াল অর্থাৎ আজকের এই দিনে আরব মরুর বুকে ঝর্ণাধারার মত আবির্ভূত হলেন মানবতার মুক্তির দূত, মানবজাতির আদর্শ মোহাম্মদুর রসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম। রসুলাল্লাহ এই অন্ধকার যুগে জন্মগ্রহণ করলেও আল্লাহ তাঁকে সবধরণের দোষত্রুটি, নোংরামী থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্কলুষ রেখেছিলেন। ফলশ্রুতিতে যৌবনে তিনি হলেন আরবের সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, সবচেয়ে সত্যবাদী, সর্বাধিক বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। সকল গুণের সমাহারে মহান আল্লাহ তাঁকে এমন সুমহান চরিত্রের অধিকারী করলেন যে আরবদের কাছে তিনি ‘আল আমিন’ বলে পরিচিত হয়ে গেলেন।
মানুষের বিপদাপদ, সামাজিক সংস্কার নবুয়ত প্রাপ্তির আগেও রসুলাল্লাহর স্বাভাবজাত ছিল। ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি সমাজ কল্যাণে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রত হয়েছিলেন। যদিও হেদায়াহ্হীন ‘হিলফুল ফুজুল’ এর কার্যক্রম বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আর স্থায়ী হলেও রসুল্লাহর জন্য এর কোন প্রয়োজন ছিল না। কারণ আল্লাহ তাকে সমাজ সংস্কারের মত ছোখাট কোন দায়িত্ব দিয়ে পাঠাননি। তাঁকে আল্লাহ দায়িত্ব দিলেন সব রকমের কুসংস্কার, অতীতের বিকৃত ধর্ম ও মানুষের মনগড়া বিধান সম্বলিত জীবনব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ‘সত্যদীন’ প্রতিষ্ঠার কাজ।

নবুয়্যতের দায়িত্ব পালন:

রসুলাল্লাহ তৎকালীন সমাজের অন্যায়, অবিচার, জুলুম, যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখে সর্বদা চিন্তা করতেন কিভাবে এই অশান্তি থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। চল্লিশ বছর বয়সের মোহাম্মদ (সা.) এই চিন্তাগুলি নিয়ে যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন তখন পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক আল্লাহপাক তাঁকে বিশাল এক দায়িত্ব দিয়ে মনোনীত করলেন শেষ নবী ও রসুল হিসেবে। রসুলাল্লাহকে আল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন কেন আজ সমাজ এত অশান্তিতে পূর্ণ এবং কিভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। রসুলাল্লাহ বুঝলেন সমাজে সমস্তরকম অশান্তির মূল কারণ আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে না মানা। লাত, মানাত, ওয্যা, হাবল ইত্যাদি দেবদেবীর নামে নিজেদের মস্তিষ্কপ্রসূত আইন-কানুন দিয়ে সমাজ পরিচালনার জন্যই সমাজে চরম অশান্তি বিরাজ করছিল যেমন বর্তমান সমাজেও আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইন-বিধান দিয়ে সমাজ পরিচালিত হয় বলে সমাজে এত অশান্তি বিরাজ করছে। তাই রসুলাল্লাহ প্রথমেই আরবজাতিকে বোললেন, “তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নাই, তাহোলে আল্লাহ তোমাদের জান্নাতে দাখিল করবেন।” তিনি দীর্ঘ ১৩বছর অর্থাৎ মক্কার জীবনের সম্পূর্ণ সময় শুধু এই কলেমার দাওয়াত বা আল্লাহর তওহীদের দাওয়াত দিয়ে গেলেন। এই সময়ে তিনি নানা রকম নির্যাতনের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ে সবর করেছেন এবং তওহীদের বালাগ চালিয়ে গেছেন, একটি বারের জন্যও নির্যাতন কারীদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন নি। মক্কার জীবনে তিনি কোন কেতাল অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম করেন নি।
রসুলাল্লাহর দায়িত্বকে পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই বলে হেদায়াহ (সঠিক দিক নির্দেশনা) ও সত্যদিনসহ আপন রসুলকে প্রেরণ করেছি এজন্য যে তিনি যেন অন্য সমস্ত দিনের ওপর একে বিজয়ী করেন। (আল কোর’আন- সুরা ফাতাহ-২৮, তওবা-৩৩, সফ-৯)। রসুলাল্লাহ তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব এবং এর ফলাফল সম্পর্কে ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন। মক্কায় যখন রসুলাল্লাহ ও তাঁর সাহাবীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চলছিল, সে সময় একদিন তিনি কাবার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। হঠাৎ কাফেরদের নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের শিকার খাব্বাব (রা.) এসে বোললেন, ‘হে আল্লাহর রসুল! এই অত্যাচার নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আমাদের বিরোধীরা সব যেন ধ্বংস হয়ে যায়।’ তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং খাব্বাব (রা.)-কে বোললেন, ‘তুমি কী বোললে? সাহাবা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। শুনে আল্লাহর রসুল তাকে বোললেন, ‘শোন, শীঘ্রই সময় আসছে যখন কোন যুবতী মেয়ে গায়ে গহনা পরে একা সা’না থেকে হাদরামাউদ যাবে। তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য জন্তু ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ না এটা খাব্বাব (রা.) কে দেয়া রসুলের কোন অভয় ছিল না, বরং তিনি সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই কথাটি বোলেছেন।
মক্কাবাসীর সকল বিরোধিতা উপেক্ষা করে রসুল তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি বোলতে থাকলেন ‘লা এলাহ এল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা-বিধানদাতা নাই। কালেমার এই বাক্য অর্থাৎ জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের হুকুমের স্থলে অন্য কারো হুকুম মানব না। মাত্র কয়েকশজন ব্যতীত সমস্ত মক্কাবাসী রসুলকে প্রত্যাখান কোরল একই সাথে দমন, নিপীড়ন চালাতে আরম্ভ কোরল। তাদের অত্যচার চরম সীমায় পৌঁছুলে রসুলাল্লাহ তাঁর আসহাবদের সঙ্গে নিয়ে মদীনায় হেজরত করলেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, মক্কার তের বছর অবস্থান করলেও রসুলাল্লাহ সে সমাজের কোন অন্যায়কে সংস্কার করতে এগিয়ে জাননি, কারণ বিষবৃক্ষের ফল একটি একটি করে না ছিঁড়ে তিনি বিষবৃক্ষটি সমূলে উপড়ে ফেলার কাজে হাত দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন আল্লাহর দেয়া সত্যদীনের বিধান প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সমাজকে পুরাতন বিল্ডিংএর মত পরতে পরতে সংস্কার করার প্রয়োজন থাকবে না।
যা হোক, আল্লাহ তাঁর অসীম রহমতে মদিনাকে রসুলাল্লাহর হাতে তুলে দিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই দীনুল হকের সত্যের আলোকচ্ছটা মদিনাকে আলোকিত করে ফেলল। যে সমাজে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, হত্যা, লুন্ঠন, জুয়া, জেনা, সুদ ইত্যাদি ছিল নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়, যেখানে মেয়েদের কোন নিরাপত্তা ছিল না, দীনুল হক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন ঠিক তার বিপরীত হয়ে গেল, নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা হলো। সে সমাজের পুরাতন কোন সমস্যা আলাদাভাবে রসুলকে সংস্কার করতে হলো না। কিন্তু শুধুমাত্র মদীনায় দীনুল হক প্রতিষ্ঠা রসুলের দায়িত্ব ছিল না ছিল দুনিয়াব্যাপী। তথাপি চতুর্থ হেজরী পর্যন্ত বদর, ওহদ, খন্দক যুদ্ধ এবং ইহুদিদের সন্ধি ভঙ্গের দরুন তাদের দমনে রসুলাল্লাহর সময় ব্যয় হয়ে গেল। পঞ্চম হেজরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মদীনায় স্থিরতা আসলে রসুল মোটেই কালক্ষেপণ করলেন না। তিনি ঝড়ের বেগে সাহাবীদের নিয়ে বহির্গত হলেন। আল্লাহর সাহায্যে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে আরব উপদ্বীপেবর বাকি সবটুকু দীনুল হকের ছায়াতলে চলে এলো। আরববাসী এবার প্রত্যক্ষ করল দীনুল হকের নির্যাস ‘ইসলাম’ শান্তি। মক্কায় অবস্থানকালে খাব্বাব (রা.) কে বলা সে কথা বাস্তবে পরিণত হলো। রসুল এমন এক শান্তির সমাজ গড়লেন যে সত্যই একজন যুবতী স্বর্ণ অলঙ্কার পরে নির্ভয়ে দু-তিনশত মাইল এককি পথ চলল। কেউ ভুল করে চুরি করে ফেললে, বা রিপুর তাড়নায় ব্যভিচার করে ফেললে সে এসে বলল আমি ব্যভিচার করেছি, আমাকে শাস্তি দিন। এমনকি সমাজে সকলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত কিন্তু পাহারা দেওয়ার জন্য কোন পুলিস রাখা হলোনা এবং সমাজে কোন অন্যায়ও সংঘটিত হলো না। এমনও হলো যে, আদালতে বিচারক বসে অপেক্ষা করতেন কিন্তু তার কাছে কোন অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসতো না। এর চেয়ে শান্তি, আর কি হতে পারে?
শুধু আরব উপদ্বীপে দীনুল হক প্রতিষ্ঠার পর রসুলাল্লাহ প্রত্যক্ষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। বিদায়ের আগে তিনি বাকি দুনিয়ায় আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্ব দিয়ে গেলেন নিজ হাতে গড়া জাতিটির উপর, যার নাম উম্মতে মোহাম্মদী।

আসহাবদের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীদের উদাসীনতা:

রসুলের এন্তেকালের পর এ জাতিটি মোটেই কালক্ষেপণ কোরল না, তাঁরা খরোস্রোতা নদীর মত প্রচ- গতিতে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়লো। ফলশ্রুততি মাত্র ষাট সত্তর বছরের মধ্যে তৎকালীন পরাশক্তি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য সে খরস্রোতে বিলীন হয়ে গেল। অর্ধেকেরও বেশি দুনিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা হলো। তারপর হঠাৎ এ খরোস্রোতা নদীর স্রোত গতিহীন হতে থাকলো। এ জাতি ভুলে যেতে থাকলো যে কেন তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা বাকি দুনিয়াতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ কোরল। শুরু কোরল বাদশাহী, ভোগ বিলাস আর দীন নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও মাসলা ফতোয়া নিয়ে গবেষণা। তখন থেকে বর্তমানের ইতিহাস সবারই জানা।

মুমিন না হলে সকল আমল অর্থহীন

মুমিন না হলে সকল আমল অর্থহীন


হেযবুত তওহীদ

‘‘যে কোন আমলের পূর্বশর্ত হচ্ছে ঈমান। অর্থাৎ সকল আমলই মুমিনদের জন্য। একজন কাফের, মোশরেক ঈমান আনয়নের পূর্বে যতই আমল করুক এতে তার কোনো পুণ্য হয় না। যেমন- আবু জেহেল, আবু লাহাবরাও অনেক ভালো কাজ করেছে কিন্তু তাদের কোনো আমলই কি কাজে আসবে?
এখন এই মুমিন কারা? যারা সত্যকে ধারণ করে এবং সেই সত্যকে মানবজীবনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যক্তিস্বার্থকে কোরবান করে দেয় তারাই হলো মুমিন, আর যারা সত্য অস্বীকার করে, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, মিথ্যাকে ধারণ করে, সমাজে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করে রাখে তারাই মূলত কাফের। অর্থাৎ যারা সত্যের পক্ষে তারাই হলো মুমিন আর যারা মিথ্যার পক্ষে তারাই হলো কাফের।
সত্যের উৎস হচ্ছেন আল্লাহ। আল্লাহর আদেশ, নিষেধ, তাঁর দেওয়া মানদ- ও রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শই হলো সত্যের চূড়ান্ত রূপ। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক এক কথায় জীবনের সর্ব অঙ্গনে সত্যকে স্বীকার করতে হবে। আর স্বীকৃতির পরবর্তী কাজ হলো জীবন ও সম্পদ দিয়ে এই সত্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম। এটিই হলো সর্বপ্রথম এবং প্রধান আমল। এটি ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না। (সুরা হুজরাত-১৫)। যখন জাতীয়, আন্তর্জাতিক জীবনে আল্লাহর হুকুম তথা চূড়ান্ত সত্য প্রত্যাখ্যান করে পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের দেওয়া হুকুম বিধান প্রতিষ্ঠিত এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ অন্যায়, অবিচারে পরিপূর্ণ তখন সার্বিক জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায় অবিচার দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাদ দিয়ে যত আমলই করা হোক তা নিরর্থক হবে। কিন্তু আজ এই নিরর্থক আমলই করা হচ্ছে সর্বত্র। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আজ পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের হুকুম বিধান প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমরা একটা দৃশ্য সর্বত্র দেখতে পাই, শহর-গ্রাম, পাড়া-মহল্লাসহ সব জায়গাতেই মানুষ টুপি-পাঞ্জাবী পরে টাখনুর উপর পাজামা তুলে মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছে, কোরবানি করছে, হজ্ব করে আসছে, ওয়াজ-মাহফিল শুনছে, কোর’আন তেলাওয়াত করছে, যিকির-আসগর করছে। অর্থাৎ আমরা বুঝাতে চাইছি আমরা পাক্কা মুসলমান। কিন্তু কিভাবে? এই যে নামাজ পড়ছি, কোর’আন পড়ছি, টুপি পাঞ্জাবী পরছি, কেউ কেউ হজ্ব করে আসছি। আমাদেরকে কে বলে দেবে এই জাতি আল্লাহর হুকুম, বিধান বাদ দেওয়ার কারণে এরা মুমিনই না মুসলিমই না? এই সরল প্রশ্নের উত্তর কে দেবে যে, তাদেরকে আল্লাহ মুমিন, মুসলিম এর খাতা থেকে বাদ দিয়েছেন বহু আগে। বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে সত্য প্রত্যাখ্যান করে এই জাতি কার্যত কাফের, জালেম, ফাসেক হয়ে গিয়েছে। (সুরা মায়েদা- ৪৪,৪৫,৪৭)
কাজেই এখন আগে চূড়ান্ত সত্য আল্লাহর তওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে মুমিন হওয়া জরুরি। তারপরে যত পারা যায় ঐসব আমল। আমরা মুখে দাবি করি মুসলমান, আইন-বিধান, হুকুম মানি এবং অনুসরণ করি পাশ্চাত্য সভ্যতা দাজ্জালের। এজন্য আল্লাহ এই জাতির উপর লানৎ দিয়েছেন। এখন এই লানৎ, শাস্তি থেকে পরিত্রাণের একটাই পথ আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। সেই প্রকৃত, অনাবিল, শান্তিদায়ক, নিখুঁত, ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা কোথায় পাওয়া যাবে?
সেটা আল্লাহ হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। আজ সারা পৃথিবীতে যে ইসলামটি চর্চা করা হচ্ছে, মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তবে, খানকায় যে ইসলামটা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে সেটা আল্লাহর দেওয়া প্রকৃত ইসলাম নয়। এই ইসলাম ১৬০ কোটির এই জনসংখ্যাকে শান্তি দিতে পারে নি, অন্য জাতির গোলামি থেকে রক্ষাও করতে পারে নি। আমরা এমন এক ইসলামের কথা বলছি, যে ইসলাম সমস্ত মানবজাতিকে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারবে, সমস্ত মানবজাতিকে একটি পরিবারে পরিণত করবে, ইনশা’ল্লাহ।

অন্ধত্ব কী?

অন্ধত্ব কী?

ওবাইদুল হক:

পড়ব না, জানব না, দেখব না, চিন্তা করব না-
এটার নামই অন্ধত্ব বা কূপম-ূকতা
ইউরোপিয়ানরা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় বিচরণ শুরু করল, তখনই তাদের ঝুলি নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সমৃদ্ধ হতে লাগল। আধুনিক বিজ্ঞানের প্রায় সকল উদ্ভাবনের কৃতিত্ব তাই তাদের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু এসব আবিষ্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন স্বর্ণযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীরা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় শীর্ষে আরোহণকারী মুসলিমরা পরবর্তীতে যখন ধর্মবেত্তাদের অতি-বিশ্লেষণের ফাঁদে পড়ে এলেমকে কেবলমাত্র ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলল, তখনই এ জাতি সর্ববিষয়ে পিছিয়ে পড়তে লাগল। এক সময় তারা পাশ্চাত্য জাতিগুলির গোলামে পরিণত হলো। পরাধীন হওয়ায় জাতির মানসিক বিকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রত্যেক ধর্মেই একটি ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি আছে যারা তাদের সংকীর্ণতা দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে অব্যাহতভাবে জগৎ সংসারের অকল্যাণ করে চলেছে। এরাই সৃষ্টি করছে ধর্মীয় বিভেদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, অশ্রদ্ধা, পরিণামে হচ্ছে দাঙ্গা, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ। ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণের জন্য, মুক্তির জন্য। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে বিকৃত করে তারা ধর্মকে বানিয়ে নিয়েছে বাণিজ্যের মূলধন, স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। সাধারণ মানুষ ধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য, ধর্মীয় নানা কার্য সম্পাদনের জন্য এই পুরোহিত শ্রেণিটির শরণাপন্ন হয় আর এরা স্বার্থ-রক্ষার্থে নিজেদের মনগড়া কথা ধর্মের নামে চালিয়ে দেয়। নিজেদের প্রভাব ও রোজগার টিকিয়ে রাখার জন্য এরা চায় মানুষের অন্ধত্ব যেন টিকে থাকে, যেন মানুষ কোর’আন, হাদিস না খুঁজে একমাত্র তাদের উপরই নির্ভরশীল থাকে। তারা বলে, ‘আপনারা কেতাব পড়লে বুঝবেন না। এর মধ্যে অনেক কিছু আছে। ইসলাম বুঝতে আমাদের কাছে আসতে হবে।’
তাদের এই ধ্বংসাত্মক বুলি জাতিকে অন্ধত্বের এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, আমরা যামানার এমামের অনুসারীরা যখন তাদের সামনে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরার চেষ্টা করছি, সাধারণ মানুষ সেটা যাচাই বাছাই করার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেরা সেই ধর্মব্যবসায়ীদের কাছেই ছুটে যাচ্ছেন। আর তারা নিজেদের গদি বজায় রাখার জন্য হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা দ্বারা সাধারণ মানুষের কান ভারি করে তুলছে। ঈসা (আ.) ইহুদি আলেমদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘হে মোনাফেক ফরিশি ও আলেমরা! কী ঘৃণ্য আপনারা। আপনারা জান্নাতে নিজেরাও ঢোকেন না, অন্যদেরকেও ঢুকতে দেন না।’
আমরা যখন বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ধর্মে স্রষ্টা প্রেরিত নবী-রসুল, অবতার, মহামানবদের নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা আমাদের পত্রিকায় তুলে ধরছি তখন এই শ্রেণিটি অপপ্রচার করছে এটা খ্রিষ্টানদের পত্রিকা, এটা বিধর্মীদের পত্রিকা, এই পত্রিকা যেন কেউ স্পর্শ না করে, স্পর্শ করলে তার ঈমান চলে যাবে। অথচ আল্লাহ বলেছেন- ‘যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ করে, তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই বোধশক্তি সম্পন্ন (সুরা যুমার ১৮)।’ আল্লাহ মনোযোগ-সহকারে সব বিষয় শুনতে বলেছেন, অতঃপর যাচাই করে যেটা উত্তম সেটা গ্রহণ করতে বলেছেন। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও এটা অত্যন্ত যৌক্তিক যে, কোনো নাগরিক স্বাধীনভাবে, আইনসঙ্গতভাবে তার বক্তব্য, মতামত ইত্যাদি প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে। এই বক্তব্য, মতামত কেউ গ্রহণও করতে পারে আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। এটা শ্রোতা বা পাঠকের স্বাধীনতা। তাই সকল মানুষের প্রতি আমাদের কথা হচ্ছে, আমরা কিছু মহাসত্য মানুষের সামনে তুলে ধরেছি। কারণ সংবাদ পৌঁছে দেয়া পর্যন্তই আমাদের কাজ। নবী-রসুলদেরও এর চেয়ে বেশি দায়িত্ব ছিল না। আমরা কাউকে আমাদের বক্তব্য মেনে নেওয়ার জন্য জোর করছি না। আল্লাহ ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করার জ্ঞান প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন। আমাদের কথাগুলি যদি বর্তমানের জন্য প্রযোজ্য, উত্তম এবং যৌক্তিক মনে হয় তাহলে আপনারা সেটা গ্রহণ করুন। গ্রহণ বা বর্জন করা একান্তই আপনাদের সিদ্ধান্ত। তবে সিদ্ধান্তের আগে আমাদের বক্তব্য সঠিক না ভুল যাচাই করুন, কারণ এটা একদিকে যেমন স্রষ্টার নির্দেশ, অন্যদিকে যুক্তির মানদ-েও করণীয়।’
আর ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের কথা হচ্ছে, ‘আমাদের কোনো বক্তব্য সম্পর্কে যদি আপনার আপত্তি থাকে তবে সেটা আমাদেরকে অবহিত করুন। আমরা চেষ্টা করব আপনাকে সদুত্তর দিতে। আমাদের কোন কাজের অসঙ্গতি যদি আপনাদের দৃষ্টিগোচর হয় সেটা আমাদেরকে জানান, ভুল সংশোধনের মানসিকতা আমাদের আছে। কিন্তু আপনারা সত্যবিমুখ হবেন না, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন না। কারণ আপনার কারণে যে পথভ্রষ্ট হবে তার দায়িত্ব আখেরাতে আপনাকেই নিতে হবে। আর মানুষকে সত্য থেকে ফিরিয়ে রাখার কারণে সমাজ থেকে অন্যায় অশান্তি দূর হবে না, সেটার দায়ও আপনার উপরই বর্তাবে।’
তাছাড়া কাউকে কোনো কিছু পড়তে না দেওয়া, জানতে না দেওয়া, গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা করতে না দেওয়া চরম মূর্খতা, অন্ধত্ব। এটা ধর্মীয় বিধানে যেমন অনৈতিক ও অবৈধ তেমনি রাষ্ট্রীয় আইনেও অবৈধ ও তথ্য জানার অধিকার পরিপন্থী।

আমাদের সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য:

আমাদের সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য:



মসীহ উর রহমান, আমীর, হেযবুত তওহীদ

মানবজাতির বর্তমান সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ স্রষ্টার বিধান। মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটিসহ সমস্ত মানবজাতি আজ তার সমষ্টিগত জীবন মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা দিয়ে পরিচালনা করছে। ফলে সমস্ত পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই, মানুষের জীবন সংঘর্ষ, রক্তপাত, অন্যায়, অবিচারে পূর্ণ হয়ে আছে। মানুষের তৈরি এই বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র এ সমস্যাগুলোর সমাধান করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। হেযবুত তওহীদের বক্তব্য এই যে, শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ বর্তমান জীবনব্যবস্থা (System) বাদ দিয়ে স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং তা সমষ্টিগত জীবনে কার্যকরী করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম নামে যে ধর্মটি চালু আছে সেটা প্রকৃত ইসলাম নয়। গত ১৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম কিছু স্বার্থান্বেষী শ্রেণির দ্বারা বিকৃত ও বিপরীতমুখী হয়ে গেছে। এই বিকৃত ইসলাম অনুসরণ করে এই জাতি না পারছে দুনিয়াতে শান্তি কায়েম করতে, না পাবে আখেরাতে জান্নাত। এই বিকৃত ইসলামের ধারক-বাহক ধর্মব্যবসায়ী একটা শ্রেণি সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক করে মানবতার কল্যাণের পরিবর্তে জাতি ধ্বংসের কাজে, জাতীয় সম্পত্তি বিনষ্টের কাজে লাগাচ্ছে। এখন যদি মানুষকে প্রকৃত ইসলাম শিক্ষা দেওয়া যায় তবে ঐ ধর্মবিশ্বাসই জাতির উন্নতি, প্রগতির পথে সহায়ক ও প্রধান নিয়ামক হবে।
ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। ধর্মের কোন বিনিময় চলে না। বিনিময় নিলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। কাজেই ধর্মের কাজ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে করতে হবে এবং বিনিময় নিতে হবে কেবল আল্লাহর কাছ থেকে।
 সহজ সরল সেরাতুল মোস্তাকীম দীনুল হক, ইসলামকে পণ্ডিত, আলেম, ফকীহ, মোফাস্সেরগণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বহু মতের সৃষ্টি করেছে। ফলে একদা অখ- উম্মতে মোহাম্মদী হাজারো ফেরকা, মাজহাব, দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন সুফিরা জাতির সংগ্রামী চরিত্রকে উল্টিয়ে ঘরমুখী, অন্তর্মুখী করে নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ করে দিয়েছে। ফলে একদা অর্ধ্ব-বিশ্বজয়ী দুর্বার গতিশীল যোদ্ধা জাতিটি আজ হাজার হাজার আধ্যাত্মিক তরিকায় বিভক্ত, স্থবির উপাসনাকেন্দ্রিক, স্বার্থপর জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই উভয় শ্রেণির কাজের ফলে ইসলামের উদ্দেশ্যই পাল্টে গেছে। নিস্বার্থভাবে সংগ্রাম করে সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে ধর্মের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মার উন্নয়ন এবং জীবনের ব্যক্তিগত অঙ্গনের ছোট খাটো বিষয়ের মাসলা মাসায়েল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা।
 ব্রিটিশরা এই জাতিকে পদানত করার পর এরা যেন কোনদিন আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে এজন্য একটি শয়তানি ফন্দি আঁটে। তারা এ জাতির মানুষের মন ও মগজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য দু’টি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করে, যথা: মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা। তাদের অধিকৃত সকল উপনিবেশেই তারা মুসলমানদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার নাম করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে তারা নিজেদের মনগড়া একটি বিকৃত-বিপরীতমুখী ইসলাম শিক্ষা দেয়। মাদ্রাসাগুলির অধ্যক্ষপদ তারা নিজেদের হাতে রেখে দীর্ঘ ১৪৬ বছর এই উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে তাদের তৈরি ‘ইসলাম’ শিক্ষা দিয়েছে। এখানে অংক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির কিছুই রাখা হলো না, ফলে মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসে আলেমদের রুজি-রোজগার করে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই দীন, ধর্ম বিক্রি করে রোজগার করা ছাড়া আর কোনো পথ রইল না। খ্রিষ্টানরা এটা এই উদ্দেশ্যে করল যে তাদের মাদ্রাসায় শিক্ষিত এই মানুষগুলো যাতে বাধ্য হয়ে ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে বিকৃত ইসলামটা এই জনগোষ্ঠীর মন-মগজে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে; এ উপমহাদেশসহ খ্রিষ্টানরা তাদের অধিকৃত সমস্ত মুসলিম দেশগুলিতে এই একই নীতি কার্যকরী করেছে এবং সর্বত্র তারা একশ’ ভাগ সফল হয়েছে।
 ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাটি তারা চালু করল স্কুল কলেজের মাধ্যমে। এ ভাগটা তারা করল এই জন্য যে, এ বিরাট এলাকা শাসন করতে যে জনশক্তি প্রয়োজন তা এদেশের মানুষ ছাড়া সম্ভব ছিল না; সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কেরাণীর কাজে অংশ নিতে যতটুকু শিক্ষা প্রয়োজন তা দেওয়ার জন্য তারা এতে ইংরেজি ভাষা, সুদভিত্তিক অংক, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক, ইতিহাস (প্রধানতঃ ইংল্যান্ড ও ইউরোপের রাজা-রাণীদের ইতিহাস), ভূগোল, প্রযুক্তিবিদ্যা অর্থাৎ পার্থিব জীবনে যা যা প্রয়োজন হয় তা শেখানোর বন্দোবস্ত রাখলো; সেখানে আল্লাহ, রাসুল, আখেরাত ও দীন সম্বন্ধে প্রায় কিছুই রাখা হলো না, সেই সঙ্গে নৈতিকতা, ত্যাগ মানবতা, আদর্শ, দেশপ্রেম ইত্যাদি শিক্ষাও সম্পূর্ণ বাদ রাখা হলো। তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হলো যাতে তাদের মন শাসকদের প্রতি হীনমন্যতায় আপ্লুত থাকে এবং পাশাপাশি তাদের মন-মগজে, আল্লাহ, রসুল, দীন সম্বন্ধে অপরিসীম অজ্ঞতাপ্রসূত হীনম্মন্যতা, বিদ্বেষ (A hostile attitude) সৃষ্টি হয়। বিশ্ব-রাজনৈতিক কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের খ্রিষ্টান শক্তিগুলি তাদের উপনিবেশগুলিকে বাহ্যিক স্বাধীনতা দিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় তারা ক্ষমতা দিয়ে যায় এই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিটির উপর যারা চরিত্রে ও আত্মায় ব্রিটিশদের দাস। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সেই শিক্ষাব্যবস্থা আজও চালু আছে। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী নামে খ্রিষ্টান হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে ঈসা (আ.) এর অনুসারী ছিলো না। ঈসা (আ.) এর শিক্ষাকে বহু পূর্বেই তারা বাদ দিয়ে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
আল্লাহর শেষ রসুল আখেরি যামানায় যে এক চক্ষুবিশিষ্ট দানব দাজ্জালের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যাকে ঈসা (আ.) Anti-Christ বলে আখ্যায়িত করেছেন, মাননীয় এমামুয্যামান সেই দাজ্জালকে হাদিস, বাইবেল, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী সভ্যতাই হচ্ছে সেই দাজ্জাল। বর্তমানে সমগ্র মানবজাতি সেই দাজ্জালের তৈরি জীবনবিধান মেনে নিয়ে তার পায়ে সেজদায় পড়ে আছে। পরিণামে তারা একদিকে যান্ত্রিক প্রগতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও মানুষ হিসাবে তারা পশুর পর্যায়ে নেমে গেছে। সমগ্র মানবজাতি ঘোর অশান্তি, অন্যায়, অবিচারের মধ্যে ডুবে আছে। দাজ্জালের হাত থেকে পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। আল্লাহর রসুল বলেছেন যে, যারা দাজ্জালকে প্রতিরোধ করবে তারা বদর ও ওহুদ দুই যুদ্ধের শহীদের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে (আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী মুসলিম)। হেযবুত তওহীদের যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে তাদেরকেও আল্লাহ দুই শহীদ হিসাবে কবুল করে নিয়েছেন। যার প্রমাণস্বরূপ তিনি একটি বিরাট মো’জেজা হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। তা হলো: এই দাজ্জাল প্রতিরোধকারীরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের দেহ শক্ত (রাইগরমর্টিস) ও শীতল হয়ে যায় না। জীবিত মানুষের ন্যায় নরম ও স্বাভাবিক থাকে।

Saturday, April 2, 2016

মানুষের পরিবর্তন





সমস্ত পৃথিবীতে চলমান অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, এক কথায় অশান্তি থেকে পরিত্রাণের আশায় মানুষ একের পর এক জীবনব্যবস্থা পরিবর্তন করে চলেছে। কিন্তু কোনো মানবসৃষ্ট জীবনব্যবস্থাই মানুষকে শান্তির সন্ধান দিতে না পারায় মানবজাতির সামনে এখন একটাই পথ দাঁড়িয়েছে- আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা দ্বীনুল হক্ব, কার্যকরী করা, যেটা আল্লাহ পাঠিয়েছেন শেষ নবীর উপর।
.
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই দ্বীনুল হক্ব প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বা কর্মসূচি কী হবে? একেকজন একেকভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতিতে, কেউ জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, এছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রচেষ্টা চলছে। আমাদের কথা হলো- দ্বীন যেহেতু দিয়েছেন আল্লাহ, কাজেই কীভাবে সেই দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেটাও আল্লাহ বলে দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। আমরা কি দ্বীন প্রতিষ্ঠার আল্লাহপ্রদত্ত কর্মসূচির সন্ধান করেছি কখনও? করলে জানতাম- আল্লাহ কীভাবে পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া দ্বীনুল হক্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে তার পাঁচ দফা কর্মসূচি রসুলাল্লাহকে দান করেছিলেন এবং রসুল তা এই জাতিকে দান করে গেছেন।
.
হজরত হারিস আল আশয়ারী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ দিচ্ছি, যে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তা হলো (১) ঐক্যবদ্ধ হবে (২) নেতার কথা শুনবে (৩) আনুগত্য করবে (৪) হিজরত করবে ও (৫) জিহাদ (দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা) করবে।
যে ব্যক্তি (কর্মসূচির) এই ঐক্যবন্ধনী থেকে এক বিঘত পরিমাণও দূরে সরে গেল, সে যেন নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলল। অবশ্য যদি ফিরে আসে তা হলে ভিন্ন কথা। আর যে ব্যক্তি জাহিলিয়াতের (মানব রচিত মতবাদ, অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার) দিকে আহ্বান জানাবে সে জাহান্নামের জ্বালানি পাথরে পরিণত হবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) সালাত ও সিয়াম আদায় করলেও কি সে জাহান্নামী ? রাসূল (সা.) বললেন-হ্যাঁ, যদি সে সালাত ও সিয়াম পালন করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে, তবুও সে জাহান্নামী’ (তিরমিযী ও আহমদ-হাকেম)।
এটাই শেষ নবীর উম্মতদের জন্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার আল্লাহ প্রদত্ত কর্মসূচি।
.
এই কর্মসূচি মোতাবেক এখন একটাই করণীয়- জাতিকে আল্লাহর তওহীদ তথা সার্বভৌমত্বের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা। সেই কাজটিই করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। এর বাইরে অন্য কোনো মনগড়া কর্মসূচি দিয়ে সফলতা আসবে না এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে।

Friday, April 1, 2016

ধর্মের আত্মা কোথায়???

ধর্মের আত্মা কোথায়???


রিয়াদুল হাসান
ন্যায় ও সত্যকে আংশিক পরিত্যাগ করা যায় না, ধর্মের পরিত্যাগ মানেই স¤পূর্ণ ধর্মত্যাগ। এক মণ দুধকে অপেয় করতে এক ফোটা গোমুত্রই যথেষ্ট। অর্ধসত্য যা মিথ্যাও তা। ইসলামে শেরক হচ্ছে তেমনই একটি বিষয় যা ধর্মবিশ্বাস ও যাবতীয় সৎকর্মকে বিনষ্ট করে দেয়। কিন্তু সেটা কীভাবে দেয়?
সুরা বাকারা ৮৫ নম্বর আয়াতটি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও চমকপ্রদ ধারণা প্রদান করে। বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও আয়াতটি প্রাসঙ্গিক। আল্লাহ বলেন, “তোমরাই পরস্পর খুনাখুনি করছ এবং তোমাদেরই একদলকে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করছ। তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে আক্রমণ করছ। আর যদি তারা কারও বন্দী হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তবে বিনিময় নিয়ে তাদের মুক্ত করছ। অথচ তাদের বহিষ্কার করাই ছিল তোমাদের জন্য অবৈধ।” বোঝা যাচ্ছে মানুষকে আটক করে বা বহিষ্কার করে বাণিজ্য করা বর্তমান সময় যেমন হচ্ছে ২০০০ বছর আগের ইহুদিদের মধ্যেও ছিল।
এর পরের অংশটি শেরকের সংজ্ঞা। আল্লাহর বিধানের (সত্যের) আংশিক মানা আর আংশিক অস্বীকার করাই হচ্ছে শেরক। কেননা সেই সত্যের শূন্যস্থান অনিবার্যভাবে মিথ্যা দ্বারাই পুরণ করতে হয়। আল্লাহ বলছেন, “তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম স¤পর্কে বে-খবর নন।”
আমাদের পার্থিব দুর্গতি তো দৃশ্যমান বাস্তবতা, বাকি অংশ সময়ের অপেক্ষা। ধর্মের কোন অংশ না মানার কারণে আল্লাহ এই আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন সেটা আমাদের বোঝা প্রয়োজন আছে।
লক্ষ্য করুন, ইহুদি জাতি কেতাবে (ধর্মের) কোন অংশকে অমান্য করেছিল, যে অংশটি পুনরায় জাতির মধ্যে প্রতিস্থাপন করতে আল্লাহ ঈসাকে (আ.) পাঠিয়েছিলেন। সেটা হচ্ছে ধর্মের আধ্যাত্মিক ভাগ, মানবতা, মায়া, দয়া, করুণার ভাগ। নির্জীব উপাসনাভিত্তিক ধর্মচর্চা থেকে প্রাণময় ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মের দিকে বনি ইসরাইলকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই করুণার অবতার ঈসার (আ.) আবির্ভাব হয়।
পূর্ববর্তী আয়াতে তা সুস্পষ্ট। আল্লাহ বলেন, “যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও প্রতিনিধিত্ব করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, সালাহ প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।” (বাকারা ৮৩) ধর্মের নির্দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে তওহীদের উপর বিশ্বাস যার মর্মার্থ হচ্ছে সর্বাবস্থায়, জীবনের সর্ব অঙ্গনে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার অঙ্গীকার। এর পরে আসে আমল বা কাজ। সেই আমলগুলোর সবই হচ্ছে সামাজিক শান্তির লক্ষ্যে যেমন পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার, মানুষকে সদুপদেশ দান, অর্থ দান কেবল একটি কাজ অর্থাৎ সালাহ প্রতিষ্ঠাকে আনুষ্ঠানিক উপাসনা হিসাবে মনে করা হয়। কিন্তু আসলে সালাহ হচ্ছে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে পারার জন্য যে চরিত্র লাগে, আত্মীক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য লাগে তা অর্জনের প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ আমলের প্রশিক্ষণ।
ইহুদিরা যেটা করেছিল তা হচ্ছে, তারা কেবল সাবাথের দিনে এবাদতগাহে সালাহ করত, আর অন্যান্য আনুষ্ঠানিক উপাসনাগুলোর মধ্যেই ধর্মকে সীমিত করে ফেলেছিল। ধর্মের যে মূল কাজ তথা সমাজে শান্তি, করুণার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সেই অংশটুকুই তারা পরিহার করেছিল। আর সেটা পূরণ করাই ছিল ঈসা (আ.) একমাত্র সংগ্রাম। তিনি সাবাথের দিনে অন্ধকে দৃষ্টিদান করে, অবশরোগীর হাত ভালো করে ইহুদি রাব্বাইদের দৃষ্টিতে ধর্মদ্রোহ (ব্লাসফেমি) করেছিলেন। কারণ ঐ দিনের কাজ শুধুই উপাসনা আর উপাসনা। আর ঈসা (আ.) প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, মানুষের কল্যাণ করাই স্রষ্টার উপাসনা।
আজকে যে ইসলামটি আমরা দেখছি সেটাও প্রাচীন ইহুদি ধর্মের মতোই আচারসর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মসজিদের পাশেই বর্ষায় শীতে কষ্ট করে বস্তিবাসী মানুষ, কিন্তু মসজিদগুলো প্রাসাদোপম। সেখানে আগত মুসল্লিদের লক্ষ্য হচ্ছে নামাজ পড়া আর নামাজ পড়া, আর আলেম ওলামাদের লক্ষ্য হলো মসজিদকে ব্যবহার করে অর্থোপার্জন করা। তারা রমজান মাসের কতই না ফজিলত বর্ণনা করেন, কিন্তু সবকিছুর উদ্দেশ্য সেই স্বার্থ। যারা নিত্য উপবাসী তাদের প্রতি করুণাপ্রদর্শন কেবল ওয়াজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যাকাত হয়ে দাঁড়িয়েছে ধনীর খ্যাতিবৃদ্ধির মাধ্যম। যাকাতের সস্তা কাপড় নিতে এসে পদপিষ্ট হয়ে অমানবিক মৃত্যুবরণ করে বহু গরীব মানুষ। প্রকৃত ইসলামের যুগে কি এমন দৃশ্য কল্পনা করা যেত? ধনীরা স¤পদ, খাদ্য বোঝাই উট নিয়ে শহরের পথে, মরুর পথে ঘুরত একজন গ্রহণকারীর সন্ধানে। আর আজ বিরাট ধনী, বিরাট পরহেজগার কিন্তু চরম স্বার্থপর, ঘোর বস্তুবাদী।
এভাবে ধর্মের আত্মাকে পরিহার করে কেবল আচারসর্বস্ব লেবাসি ধর্মকেই ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে- এটাই হচ্ছে কেতাবের কিছু মানা আর কিছু না মানা। উপরস্তু ব্যক্তিগত জীবনের সংকীর্ণ পরিসরে আল্লাহকে মান্য করে রাষ্ট্রীয় জাতীয় জীবনে পুরোপুরি তাঁর বিধানকে অস্বীকার করা হয়েছে। স্রষ্টার পরিবর্তে ইলাহ তথা হুকুমদাতার আসনে বসানো হয়েছে পশ্চিমা সভ্যতাকে। এই সামষ্টিক শেরক আমাদের জীবনকে চরম অশান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করে রেখেছে, আখেরাতকেও ধ্বংস করছে।
এই অংশটুকু আমাদের ইসলামী চিন্তাবিদগণ অনেকেই অনুধাবন করেন আর যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান তারাও ঐ শরিয়তের অংশটুকুরই গুরুত্ব দেন। এ কারণে দেখা যায় জঙ্গিবাদীরা যেখানে তাদের শাসন কায়েম করতে পেরেছে, সেখানে শরিয়াহ কায়েম হলেও মানুষ শান্তি পায় নি, কারণ আত্মাহীন মানুষ যেমন মৃত, তেমনি মানবতাহীন ধর্মও মৃত।