Sunday, June 28, 2015

মুক্তমনা বিপ্লবীদের জন্য সমাজ পরিবর্তনের সঠিক পথ

মুক্তমনা বিপ্লবীদের জন্য সমাজ পরিবর্তনের সঠিক পথ

রিয়াদুল হাসান:
ইউরোপের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, ঈসা (আ:) এর বিদায় গ্রহণের কিছুদিন পর জনগণের উপর দেশগুলির রাজন্যবর্গ জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দিয়েছিল এবং চেয়েছিল খ্রিস্টধর্ম দ্বারা তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা কোরতে। সুতরাং রোমান ক্যাথেলিক ধর্মযাজকদের হাতে অর্পিত হোয়েছিল মানুষের ইহজীবন ও পরজীবনের ফায়সালা, যদিও রাজ্যগুলির অধীশ্বর ছিলেন রাজাই। যেহেতু ঈসা (আ:) আনীত শিক্ষায় জাতীয় জীবন পরিচালনার মত অর্থনৈতিক, বিচারিক, প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলি ছিল না, তাই ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতার উত্তরাধিকার’ ধর্মযাজকরা নিজেদের মনগড়া বিধানকেই ঈশ্বরের বাণী বোলে চালিয়ে দিত। অপরদিকে রাজারাও ছিলেন দুর্দান্ত অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী। এই উভয়প্রকার স্বৈরাচারী ব্যবস্থার নিষ্পেষণে সাধারণ মানুষের জীবন একেবারে ওষ্ঠাগত হোয়ে গিয়েছিল। চার্চ ও রাজারাও একে অপরের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হোয়েছিল। এই অবস্থার সমাধানকল্পে মাত্র দু’টি রাস্তাই সমাজচিন্তকদের দৃষ্টিগোচর হোয়েছিল। হয় ধর্মকে অস্বীকার কোরতে হবে, নয়তো তাকে জাতীয় জীবন থেকে আলাদা কোরে ব্যক্তিজীবনের ক্ষুদ্র পরিধিতে নির্বাসন দিতে হবে। যেহেতু ধর্মকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা তথা সম্পূর্ণ ইউরোপের জনগণকে নাস্তিক বানিয়ে দেওয়া তখনো সম্ভব ছিল না, তাই অষ্টম হেনরির সময়ে ১৫৩৭ সনে সিদ্ধান্ত গৃহিত হোল যে, মানুষের জাতীয় জীবনে ধর্মের কোনো জায়গা থাকবে না। চার্চ কেবলই মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভালোমন্দ, প্রার্থনা আর পরকাল নিয়ে কাজ কোরতে পারবে। স্রষ্টার বিধি-নিষেধকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় জীবন থেকে এই প্রথম বর্জন করা হোল। এ থেকেই ক্রমশ জন্ম নিলো এক চরম বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ দাজ্জাল যা ধীরে ধীরে সমগ্র পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু কোর। সেই দাজ্জালেরই সৃষ্ট ব্যবস্থা হল পুঁজিবাদী গণতন্ত্র। দাজ্জালের জন্মের খুব অল্প দিনের ভেতরেই সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রের জায়গা দখল করে নিল পুঁজিবাদী গণতন্ত্র। এই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের প্রভাবে সমাজ আরও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ল। দেখা গেল সমাজের এক শ্রেণির লোক রাতারাতি অসম্ভব অকল্পনীয় সম্পদ-অর্থবিত্তের মালিক বনে যাচ্ছে, আর এক শ্রেণির লোক অর্ধাহারে, অনাহারে থেকে জীবনযাপন কোরতে বাধ্য হচ্ছে। ইউরোপের এই বৈষম্য এত প্রকট আকার ধারণ করলো যে, আজকালকার আধুনিক যুগে সেটা চিন্তারও বাইরে। এ পরিস্থিতি দেখে ইউরোপের অনেক জ্ঞানী-গুণী, পণ্ডিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিদরা মানুষের মুক্তির পথ সন্ধান কোরতে লাগলেন। এদেরই অন্যতম হোলেন কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, হেগেলস, লেনিন, লুক্সেমবার্গ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। তারা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আবিষ্কার করলেন সমাজতন্ত্র। তাদের কিছু কিছু শ্লোগান ঔপনিবেশিক ও পুঁজিবাদী শাসনের বেড়িবদ্ধ শ্রমদাস শ্রেণিকে আলোড়িত কোরেছিল যেমন: কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না-তা হবে না, Workers of the world, unite! বিশ্বের লক্ষ-কোটি জনতা সমাজতন্ত্রকে আলিঙ্গন করে নিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়েকদিন পরেই সমাজতন্ত্রের অসারতাও প্রমাণিত হয়ে গেল। জেগে উঠলো নতুন শ্লোগান: Better dead than red অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের চেয়ে মৃত্যুও শ্রেয়। যারা এক সময় সাম্যবাদী আদর্শকে বুকে ধরে প্রবল প্ররাক্রমশালী শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন, যারা শোষণমুক্ত সমাজের কল্পনা করতেন, যারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জীবনকে শেষ করে দিয়ে গেছেন, মানুষের কল্যাণ সাধনকেই জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে জেনেছেন, যারা জীবনে ভালো খেতে-পরতে পারেন নি, সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারেন নি, এমনকী সমাজ পরিবর্তনের নেশায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন নি তারাই আজ পরাজিত শক্তি, তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। তাদের আদর্শের পতন তারা চেয়ে চেয়ে দেখেছেন এবং দেখছেন। এখন তাদের অনেকেই আন্দোলন সংগ্রামকে পরিত্যাগ কোরে গণতন্ত্র মেনে নিয়ে ঘোর পুঁজিবাদীতে পরিণত হোয়েছেন। বিশ্বে মাত্র চারটি দেশে যথা চীন, কিউবা, লাওস আর ভিয়েতনামে সমাজতন্ত্র টিকে আছে, তবে এটাকে টিকে থাকা বলে না। কেননা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র চীন সবচেয়ে বড় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সুতরাং মোড়ক পাল্টিয়ে আবার ফিরে এসেছে সেই পুঁজিবাদ যা মানবজাতিকে দিতে পারে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যা প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাল্প শ্রেণি কর্তৃক সংখ্যাগুরুদের দমনের একটা বিশেষ যন্ত্র। আর স্বভাবতই সংখ্যাল্প শোষক কর্তৃক সংখ্যাগুরু শোষিতদের নিয়মিত দমনের মতো একটি বিষম ব্যাপারে সফল হোতে হোলে দরকার দমনের চূড়ান্ত হিংস্রতা ও পাশবিকতা, দরকার রক্তের একটি সমুদ্র, মানবজাতিকে যেখানে খুঁড়িয়ে চলতে হয় সর্বপ্রকার দাসত্বে, মজুরি দাসত্বে। এটাই আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার চিত্র।
যারা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পথ দিয়ে মানুষের মুক্তি কামনা কোরে হতাশ হোয়েছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই মানুষের কল্যাণ চান তাদের প্রতি আমাদের কথা হলো- ‘আপনারা এতদিন যে ধর্মকে দেখে এসেছেন, যে ধর্মকে আপনাদের গুরু কার্ল মার্কস আফিম বলেছেন সেটা প্রকৃতপক্ষে আফিমই ছিল, কারণ সে ধর্ম মানুষকে বুঁদ করে দেয়। কিন্তু যেটা প্রকৃত জীবনব্যবস্থা- এসলাম, সেটা মার্কস দেখেন নি। সেটা কেবল গতিশীলই নয়, সেটা ছিল এমন এক সাইক্লোনের মত যার সৃষ্ট প্লাবন অতি সামান্য সময়ে অর্ধ দুনিয়াকে প্লাবিত করেছিল এবং তা শাসক আর শাসিতকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল। কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, মানবজীবনের প্রতিটি অঙ্গন থেকে সর্বপ্রকার অন্যায় অবিচার দূর কোরে চূড়ান্ত শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কোরেছিল। সেই প্রকৃত এসলাম আবার এসে গেছে। সেই মহামূল্যবান সত্যের সন্ধান দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সংকলনটি আমরা সাজিয়েছি। সত্যিকারের মুক্তমনা বিপ্লবীরা সমাজ পরিবর্তনের সঠিক পথ এতে খুঁজে পাবেন আশা করি।

নির্দিষ্ট কোন পোশাক এসলামের মানদণ্ড নয়

নির্দিষ্ট কোন পোশাক এসলামের মানদণ্ড নয়

^0245273963B5415B28B70562EE48AC5C0497282A18CB6C5CF1^pimgpsh_fullsize_distrরিয়াদুল হাসান:

আদম (আ:) থেকে শুরু কোরে শেষ নবী মোহাম্মদ (দ:) পর্যন্ত এসলামের অর্থাৎ দীনুল কাইয়্যেমার মর্মবাণী তওহীদ- এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো তৈরি জীবন-বিধান মানি না, স্বীকার করি না। এই সেরাতাল মোস্তাকীম, সহজ-সরল পথ ছেড়ে মহাপণ্ডিতরা দীনের চুলচেরা বিশ্লেষণ কোরে এই কোরলেন যে, সহজ-সরল পথটি হোয়ে গেলো একটি অত্যন্ত দুর্বোধ্য জীবন-ব্যবস্থা, খুঁটিনাটি মাসলা-মাসায়েলের জটিল জাল। এই জটিল জালে আটকা পড়ে সমস্ত জাতিটাই মাকড়সার জালে আটকা পড়া মাছির মতো অসহায়, স্থবির হোয়ে গেলো। ঐ স্থবিরতার অবশ্যম্ভাবী ফল হোয়েছে শত্র“র ঘৃণিত গোলামি ও বর্তমান অবস্থা; যেখানে অজ্ঞানতায়, অশিক্ষায়, কুশিক্ষায় এসলামের আগের জাহেলিয়াতের অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই জাতির এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী আলেম সমাজ আজ কুয়োর ব্যাঙ। দুনিয়ার খবর যারা রাখেন তাদের চোখে এরা অবজ্ঞার পাত্র, হাসির খোরাক। আসমানের মতো বিরাট উদাত্ত দীনকে এরা তাদের লম্বা কোর্তার পকেটে পুরে মিলাদ পড়ে, বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খেয়ে আর সুর কোরে ওয়াজ কোরে বেড়ান। তবু যদি তাদের ওয়াজের মধ্যে অন্তত কিছু সার কথা থাকতো! তাও নেই, কারণ দীনের মর্মকথা, এর উদ্দেশ্য, প্রক্রিয়া এ সবের কিছুই তাদের জানা নেই। আসল দিক অর্থাৎ জাতীয় জীবনের দিকটাকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তি দিকটার সামান্য যে বাহ্যিক অংশকে এরা আঁকড়ে ধোরে আছেন তা পর্যন্ত ভুল। দাড়ি রাখা, বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি এই দীনের বুনিয়াদী কোন ব্যাপার নয় এবং বুনিয়াদী নয় বোলেই কোর’আনে আল্লাহ কোথাও দাড়ি বা নির্দিষ্ট ধরণের কাপড়-চোপড় সম্বন্ধে কোন নির্দেশ দেন নি। বরং রসুলাল্লাহ বোলেছেন- আল্লাহ মানুষের কাপড়-চোপড়, পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেন না, দেখেন মানুষের অন্তর এবং তার কাজ [আবু হোরায়রা (রা:) থেকে মোসলেম]। আসলে এই শেষ দীনে কোন নির্দিষ্ট পোষাক হোতে পারে না, কারণ এটা এসেছে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য। পৃথিবীর মানুষ প্রচণ্ড গরমের দেশে, প্রচণ্ড শীতের দেশে, নাতিশীতোষ্ণ দেশে, অর্থাৎ সর্বরকম আবহাওয়ায় বাস করে, এদের সবার জন্য এক রকম পোষাক নির্দেশ করা অসম্ভব। তা কোরলে এ দীন সমস্ত মানব জাতির জন্য প্রযোজ্য হোতে পারতো না, সীমিত হোয়ে যেতো। তাই আল্লাহ ও তাঁর রসুল (দ:) তা করেনও নি। বিশ্বনবীর (দ:) সময়ে তার নিজের এবং সাহাবাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ও তখনকার আরবের মোশরেক ও কাফেরদের পরিচ্ছদ একই ছিলো। বর্তমানেও আরবে মুসলিম আরব, খ্রিস্টান আরব ও ইহুদি আরবদের একই পোষাক-পরিচ্ছদ। দেখলে বলা যাবে না কে মুসলিম, কে খ্রিস্টান আর কে ইহুদি। মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ বিশ্বনবীর (দ:) যে দৈহিক বিবরণ হাদিসে ও ইতিহাসে পাওয়া যায় তা লক্ষ্য কোরলে আমরা পাই একটি মানুষ- অতি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা, তাতে সুগন্ধ, খোশবু, আতর লাগানো (সুগন্ধি ও ফুল তাঁর অতি প্রিয় ছিলো) পরিপাটি কেশ, ঠিক মাথার মাঝখান থেকে সিঁথির দু’পাশ দিয়ে নেমে এসেছে কানের নিচে, কাঁধের একটু উপর পর্যন্ত, সুন্দর কোরে দাড়ি-মোচ ছাটা, সুন্দর দেখাবার জন্য চোখে সুরমা দেওয়া, মাঝে মাঝে গায়ে ইয়ামেনের প্রসিদ্ধ জোব্বা (জড়নব)। সব মিলিয়ে যাঁকে পাচ্ছি, তাঁকে যারা দেখেছেন তারা প্রভাতে উদিয়মান সূর্যের সাথে, পূর্ণ চন্দ্রের সাথে তুলনা কোরেছেন, তাঁকে কি কোনভাবেই একটি দুনিয়া বিমুখ, সংসার বিমুখ বৈরাগী বলা চলে? মোটেই না। কিন্তু বর্তমানের ‘ধার্মিক’দের মানসিকতা তাই- একেবারে উল্টো। এদের বাইরেও উল্টো, ভেতরেও উল্টো। ভেতরে উল্টো এই জন্য যে, ঐ বিশ্বনবীর (দ:) মাধ্যমে আল্লাহর দেয়া রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, বিচার ও দণ্ডবিধিকে বাদ দিয়ে অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার কোরে মানুষের তৈরি এই সব ব্যবস্থার মধ্যে বাস কোরে কার্যতঃ মোশরেক হোয়ে মাথা ন্যাড়া কোরে, মোচ কামিয়ে, টুপি পাগড়ী মাথায় দিয়ে কাঁধে চেক রুমাল ফেলে, টাখনুর উপর পাজামা পরে আর পাঁচবার মসজিদে দৌড়ে এরা আত্মপ্রসাদ লাভ কোরছেন এই ভেবে যে, তারা শুধু উম্মতে মোহাম্মদী নন, একেবারে নায়েবে নবী। তুচ্ছ মসলা-মাসায়েল নিয়ে সীমাহীন তর্কাতর্কি বাদানুবাদ কোরে কোরে এরা এই জাতির ঐক্য টুকরো টুকরো কোরে দিয়েছেন, যে ঐক্য ছাড়া একটা জাতি ধ্বংস হোয়ে যায়, এমন কি দুর্বল শত্র“র হাতেও পরাজিত হোয়ে যায়। আর তাই গিয়েছিলোও। কিন্তু তাতেও বোধোদয় হয় নি, অসীম অজ্ঞতায় তারা আজও ঐ খুঁটিনাটি মসলা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি কোরতে ব্যস্ত। টাখনুর উপরে পাজামা পরা নিয়েও বর্তমানের বিকৃত এসলামে অতি বাড়াবাড়ি করা হয়। বলা হয় যে টাখনুর (গোড়ালি) নিচে পাজামা পরলে পায়ের গোড়ালির নিচের অংশ আগুনে পোড়ানো হবে। এর অর্থ ঐ ব্যক্তি জাহান্নামী। অবশ্য যারা মনে কোরছেন একজন জান্নাতি ব্যক্তির পায়ের গোড়ালি থেকে কেটে নিয়ে জাহান্নামে ফেলা হবে তাদের মতো বে-আক্কেলদের প্রতি আমার কিছু বলার নেই। আসলে বিষয়টি কি তা বোঝার জন্য এ সংক্রান্ত হাদিসগুলি পড়–ন। (১) যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশে তার কাপড় ঝুলিয়ে দেয়, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি তাকাবেন না। আবু বকর (রা) বলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! আমার লুঙ্গি তো প্রায়ই ঝুলে যায়, যদি না আমি সচেতন থাকি। রসুলাল্লাহ তাঁকে বলেন: তুমি তাদের মধ্যে শামিল নও, যারা অহঙ্কার বশে কাপড় ঝুলিয়ে থাকে (আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বোখারী ও মোসলেম)। (২) তিনজন লোকের সাথে আল্লাহ কেয়ামতের দিন কথা বোলবেন না, তাদের প্রতি তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র কোরবেন না। উপরন্তু তাদের জন্য রোয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। রসুলাল্লাহ কথাগুলো তিন তিনবার বলেন। আবু যার (রা) বলেন, হে আল্লাহর রসুল! এসব বিফল মনোরথ ও ক্ষতিগ্রস্ত লোক কারা? তিনি বলেনঃ (ক) যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশে কাপড় ঝুলিয়ে দেয়, (খ) যে ব্যক্তি উপকার করে খোঁটা দেয় বা বলে বেড়ায় এবং (গ) যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে তার পণ্য বিক্রয় করে [আবু যার (রা) থেকে মোসলেম]। (৩) পাজামা, জামা ও পাগড়ীই ঝুলিয়ে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি অহঙ্কার বশে এরূপ কিছু ঝুলিয়ে দিবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি তাকাবেন না [আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকেআবু দাঊদ ও নাসায়ী]। এই তিনটি হাদিসেই রসুলাল্লাহ বোললেন, ‘অহঙ্কারবশত’ কাপড় ঝুলিয়ে দেয়। এখানে অহঙ্কারই হোচ্ছে মূল বিষয়। কাপড় ঝুলিয়ে দেওয়া কোন অপরাধ নয়, অপরাধ হোচ্ছে অহঙ্কার। দারিদ্র্যের কারণে অধিকাংশ আরবের পক্ষেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত দীর্ঘ পোশাক পরার সামর্থ্য ছিলো না। কেবল ধনী ও অভিজাত লোকদের মধ্যে কাপড় ঝুলিয়ে পরার রেওয়াজ ছিলো, ইউরোপের অভিজাত বংশীয় নারীরা এখনও বিশেষ অনুষ্ঠানে এত দীর্ঘ পোশাক পরে যে, কয়েক জন দাসীকে সেই লম্বিত অংশ বহন কোরতে হয়। এটা হোচ্ছে অহঙ্কারের প্রকাশ। একইভাবে তৃতীয় হাদিস মোতাবেক জামা, পাগড়িও যদি অহঙ্কার প্রকাশের উদ্দেশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তবে সেটাও নিষেধ। অহঙ্কারী ব্যক্তি যে জাহান্নামী সেটা তো কোর’আনের বহু আয়াত ও হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত, তাই অহঙ্কারবশত পোশাক ঝুলিয়ে দিলে যে কেউ জাহান্নামে যাবে এতে আর আশ্চর্য কি? আবু বকর (রা:) যেহেতু অহঙ্কারমুক্ত ছিলেন তাই তাঁর কাপড় ঝুলিয়ে পরায় কোন অপরাধ হয় নি। এখন কথা হোল, টাখনুর ‘উপরে’ কাপড় পরে কেউ যদি ভাবে যে, আমি মহা-পরহেজগার, রসুলের প্রকৃত উম্মত, নায়েবে নবী তবে এই ‘অহঙ্কারের কারণে’ সেও নিঃসন্দেহে জাহান্নামে যাবে। আমাদের সমাজে আলেম দাবিদার অনেকেই আরবিয় ধাঁচের পোশাক পরেন, দাড়ি রাখেন আলেম হিসাবে মানুষের কাছে সম্মান পাওয়ার উদ্দেশ্যে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রসুল বোলেছেন, যে ব্যক্তি খ্যাতির জন্য দুনিয়াতে বস্ত্র পরিধান কোরবে, কেয়ামতে আল্লাহ তাকে অপমানের বস্ত্র পরিধান করাবেন। [আব্দাল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে তিরমিজী, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ]।

এক জাতি গড়ার চিরন্তন সূত্র

এক জাতি গড়ার চিরন্তন সূত্র

এম. আমিনুল এসলাম:
বর্তমান পৃথিবী এবং আমাদের এই জাতি স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের চাপিয়ে দেওয়া জীবনব্যবস্থা দিয়ে নিজেদের জীবন পরিচালনা কোরছে। পশ্চিমা বিশ্বের সেই মতবাদগুলির দ্বারা এই বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষও শত শত দলে-উপদলে বিভক্ত, খণ্ড-বিখণ্ড হোয়ে গেছে। প্রত্যেক দলই নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত কোরতে বদ্ধপরিকর। ফলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব একটি স্থায়ী রূপ লাভ কোরেছে। এই দ্বন্দ্ব মেটাতে, সহিংসতা রোধ করণার্থে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গলদঘর্ম হোচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা, এন.জি.ও.- ইত্যাদি বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠান সভা-সমিতি, সেমিনারের মাধ্যমে শান্তির জন্য বহু ওয়াজ নসিহত কোরছে। সুশীল সমাজের ধ্বজাধারীরাও চান শান্তি। যেসব পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলি সারা পৃথিবীতে এই অশান্তির দাবানল জ্বালিয়ে রেখেছে সেসব দেশের কর্ণধারেরাও নাকি শান্তি চান। মসজিদ, মন্দির, খানকা, প্যাগোডা, গীর্জা, সিনাগগে শান্তির জন্য চোলছে বিশেষ মোনাজাত। পৃথিবীজুড়ে রব উঠেছে–শান্তি চাই, শান্তি চাই। কিন্তু এই শান্তির শুকপাখি তাদের অধরাই থেকে যাচ্ছে। এই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন দল সরকারের কাছে নিজেদের মনগড়া দাবি-দাওয়া পেশ কোরছে। তাদের দফাওয়ারী দাবি পূরণের জন্য সভা সেমিনার মিটিং, মিছিল, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, জ্বালাও- পোড়াও ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক কার্যাবলী কোরতেও তারা দ্বিধা কোরছে না। ধর্মীয় দলগুলিও বিভিন্ন দফা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন কোরে যাচ্ছে যেমন ৫ দফা, কারো ৬ দফা, কারো ১০ দফা কারো বা ১৩ দফা। তারা কেউই আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলন কোরছে না, সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলির মতোই তাদেরও কর্মসূচি হোচ্ছে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, জ্বালাও- পোড়াও, হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি।
শান্তির একপথ, অশান্তির বহুপথ:
মহান আল্লাহ যখন আদমকে (আ:) পৃথিবীতে প্রেরণ কোরলেন খেলাফত দিলেন তখন পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন মানবজাতির কাছে দফা উপস্থাপন কোরেছেন একটি- “লা এলাহা এল্লাল্লাহ আদম শফিউল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নেই এবং আদম আল্লাহর প্রেরিত নিরাময়কারী”। পাপাচারে পূর্ণ পৃথিবীবাসীকে আল্লাহ যখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস কোরেছিলেন তখনও তাদের আল্লাহর দাবি ছিলো একটা, “লা এলাহা এল্লাল্লাহ নূহ নবীউল্লাহ”। এবরাহীমেরও (আ:) আহ্বান ছিলো, “লা এলাহা এল্লাল্লাহ এবরাহীম খলিলুল্লাহ।” আল্লাহর শেষ নবী শ্রেষ্ঠনবীকে যখন সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ আল্লাহ প্রেরণ করেন তখনও এই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার দফা দিয়েছেন একটি, “লা এলাহা এল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ (দ:)।” তিনিও আহ্বান জানিয়েছেন সেই একদফার উপর মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য বোলেছেন, “কুল লা এলাহা এল্লাল্লাহ, তুফলেহুন, বলো আল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নেই, তাহোলেই তোমরা সফল হবে।” মক্কার ১৩ বছরের জীবনে অসহনীয় অন্যায় অত্যাচার জুলুম নির্যাতন সহ্য কোরেছেন এই একদফা শান্তির বাণী প্রচারে। মদিনার ১০ বছর জীবনে তিনি নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা প্রচেষ্টা কোরেছেন আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচি প্রয়োগ কোরে একদফা প্রতিষ্ঠা কোরতে এবং আরব উপদ্বীপে প্রতিষ্ঠা কোরেছেনও। এই একদফা প্রতিষ্ঠায় তিনি সমস্ত মানবজাতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হোতে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশপ্রাপ্ত হোয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষায় শিক্ষিত আসহাবগণ তাই তাদের সহায় সম্পত্তি, স্ত্রী পুত্র, বাড়ি ঘর, ক্ষেত খামার ইত্যাদির মায়া ত্যাগ কোরে পৃথিবীর পানে বের হোয়েছিলেন সনাতন, চিরাচরিত সেই একদফা প্রতিষ্ঠা কোরতে। এবং তারা সেটিকে অর্ধ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠাও কোরছিলেন।
যখনই শেষনবীর অনুসারীরা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পরিত্যাগ কোরল এবং তাঁর আসহাবদের প্রতিষ্ঠিত অর্ধ পৃথিবীতে পরবর্তী শাসকরা রাজা বাদশাহদের মতো শান-শওকতের রাজত্ব কোরতে থাকলো। তাদের জেহাদ পরিণত হোল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে এবং অন্তর্কলহে। এই জেহাদ ত্যাগের পরিণতিতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের হাতে একদা পরাজিত খ্রিস্টান জাতিগুলির দাস বানিয়ে দিলেন। এখনও তারা সেই দাসই রোয়েছে। সেই দাসেরা এখন শত শত ফেরকায় বিভক্ত আর লক্ষ লক্ষ মাসলা মাসায়েল নিয়ে কুটতর্কে লিপ্ত। নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ রক্তপাতে নিপতিত। অন্যায় অত্যাচার অশান্তি নিরাপত্তাহীনতা তাদের উপর চেপে বোসে রোয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত এই নির্যাতিত জাতির নারী ও শিশুরা একজন উদ্ধারকর্তার আশা আকাক্সক্ষায় ক্রন্দনরত।
যামানার এমামের মাধ্যমে সেই এক দফার পুনরাবির্ভাব:
মিসরের জালেম সম্রাটের অধীনে দুর্দশাগ্রস্ত জাতি বনী এসরাইলকে উদ্ধার কোরতে মহান আল্লাহ সেই একদফা দিয়ে মুসাকে (আ:) প্রেরণ কোরছিলেন, সেই জাতি যখনই মুসার (আ:) শিক্ষার বাহ্যিক দিকটা রেখে আত্মার দিকটা হারিয়ে ফেলেছিল তখন আল্লাহ তাদের আত্মা ফিরিয়ে দেওয়ার মানসে ঈসা (আ:) কে প্রেরণ কোরেছেন। তেমনি আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য মহান আল্লাহ এই ঐতিহাসিক একদফা দিয়ে শেষ নবী মোহাম্মদকে (দ:) প্রেরণ কোরেছেন। উম্মতে মোহাম্মদীও যখন তাঁর শিক্ষাকে বাহ্যিকভাবে বই পুস্তকে সীমাবদ্ধ রেখে আত্মা হারিয়ে ফেলেছে ঠিক তেমনি মুহূর্তে মহান আল্লাহ অতীব দয়া কোরে এই জাতির উদ্ধারকর্তারূপে এই জাতিকে তাঁর নবীর শিক্ষার আত্মা ফিরিয়ে দিতে এ যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীকে মনোনীত কোরেছেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠা করা আন্দোলন হেযবুত তওহীদ গত ১৮ বছর ধোরে চলমান অন্যায় অত্যাচার জুলুম নির্যাতন অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় নিপতিত এই জাতিকে আল্লাহ প্রদত্ত সেই ঐতিহাসিক একদফার দিকেই আহ্বান কোরে যাচ্ছে। এই এক দফা মেনে নিলে জাতি কেমন স্বাধীনতা, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তায় বসবাস কোরতে পারবে তার রূপরেখাও আল্লাহ যামানার এমামকে দান কোরেছেন। সেই রূপরেখাও হেযবুত তওহীদ এ জাতির সামনে তুলে ধোরছে।
এখন আমাদের এই জাতির মুক্তির একটাই পথ, আল্লাহর নির্ধারিত সেই আদি-শাশ্বত-সনাতন একদফা অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া আর কারো বিধান মানি না” এই বাক্যের উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। তবেই আমরা ফিরে পাবো আমাদের হারানো গৌরব। আমরাই হোতে পারবো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠজাতি। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দারিদ্রতা, হীনতা, হতাশা, নিরাশার অন্ধকার থেকে মুক্ত হোয়ে উন্নতি, প্রগতি, সমৃদ্ধির মাঝে বড় হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

ভৌগোলিক স্বার্থচিন্তা যেভাবে ঐক্যের অন্তরায়

ভৌগোলিক স্বার্থচিন্তা যেভাবে ঐক্যের অন্তরায়

সমষ্টিগত জীবন বা রাষ্ট্র পরিচালনায় খ্রিস্ট ধর্মের ব্যর্থতায় উদ্ভূত সমস্যার ফলে পশ্চিমা সভ্যতা আবিষ্কৃত বিভিন্ন জীবনব্যবস্থা তথা তন্ত্র-মন্ত্র সারা বিশ্বজুড়ে গ্রহণ করার ফলে মানুষের নৈতিকতায় একটি সাঙ্ঘাতিক পরিবর্তন এসেছে। আর তা হলো ভৌগোলিক রাষ্ট্র ধারণা বা যার যার সীমানার স্বার্থ সংরক্ষণ। ফলে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা সীমাবদ্ধ হয়ে গেল একটি সীমার ভেতর। অর্থাৎ একটি ভূ-খণ্ডের মানুষ তাদের নিজস্ব গণ্ডি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এই সীমার বাইরে যারা রয়েছে তাদের প্রতি কোন প্রকার দায়বোধকে তারা অস্বীকার করে বসলো। এতে করে ভৌগোলিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করলো। অপরদিকে নিজস্ব ভূ-খণ্ডের স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে বাকি রাষ্ট্রের কতটুকু ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে তারা মোটেও ভাবছে না। ব্যাপারটা এমন যে আমাকে সুখে থাকতে হবে, সেটা যদি অন্যের মৃত্যুর মধ্য দিয়েও হয়। স্বাভাবিকভাবেই একেকটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের এই ধারণা তাদেরকে প্রচণ্ড স্বার্থপর করে তুললো। তাতে করে স্বার্থ উদ্ধারে যাই করা হোক না কেন, তার সবই নীতিগতভাবে সঠিক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, লুণ্ঠন, শক্তিশালী দেশ কর্তৃক দুর্বল দেশের প্রতি চাপিয়ে দেওয়া দাসখত চুক্তি সব কিছুই এর মধ্যে পড়ে। তাই কে কার চাইতে শক্তিশালী হতে পারে এই নিয়ে দেখা দেয় প্রতিযোগিতা। আবার ভিন রাষ্ট্রের আক্রমণে অন্তরায় সৃষ্টি কিংবা ভয় দেখানোর জন্যও তারা প্রতিযোগিতায় নামলো। যার ফলে পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারের প্রতিযোগিতা। এতে করে দেখা যায় সাধারণ জনগণকে না খাইয়ে রেখে হলেও বহু রাষ্ট্র পাল্লা দেওয়ার জন্য মারনাস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে। কৃষি, আবহাওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাখাতে কম অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে অস্ত্র ক্রয় ও নতুন নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কারের পেছনে।
এই যে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার পেছনে পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে চলা, এটা শেষ পর্যন্ত মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বা এর শেষ কোথায়? এটা কি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে তার সম্মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? মোটেও নয়। এই প্রতিযোগিতা মানুষকে পশুর কাতারে নামিয়ে দিচ্ছে।
অপরদিকে আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখতে পাব আমাদের হয়েছে ভিন্ন রোগ। অন্যরা যেখানে ভৌগোলিক রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজ করে না, তেমনি আমরা জাতীয় ঐক্যহীনতা ও যথার্থ শিক্ষার অভাবে আরো ক্ষুদ্র পর্যায়ে নেমে ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে আবদ্ধ হয়ে গেছি। আমরা জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে নিমজ্জিত হয়ে যা-ই করছি তাকেও বৈধ বলে জ্ঞান করা হচ্ছে। সার্বজনীন স্বার্থের পরিবর্তে ভৌগোলিক স্বার্থে আটকে যাওয়ার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থে নেমে যাওয়ার এই অবস্থাটি আরো মারাত্মক এবং বিপজ্জনক। এতে আগের অবস্থায় যে দ্বন্দ্বটা রাষ্ট্র পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিলো তা এখন ব্যক্তি পর্যায়ে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ববোধও ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে। তাই অন্যদের তুলনায় আমাদের অবস্থা আরো করুণ, আরো দুঃখজনক। তাই শুধু ব্যক্তিস্বার্থ নয়, আমরা কি পারি না ভৌগোলিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে? কেননা আমরা এই পৃথিবীর যে যে প্রান্তেই থাকি না কেন আমরাতো একই দম্পতি অর্থাৎ আদি পিতা আদম (আঃ) ও আদি মাতা হাওয়া (আঃ) থেকে আগত, সুতরাং সে হিসেবে আমরা সবাই ভাই-বোন, আমাদের প্রত্যেকের অনুভূতিও একই রকম। পৃথিবীর সব জায়গার পরিবেশ একরকম নয়। প্রাকৃতিক সম্পদও সব স্থানে সমপরিমাণে পাওয়া যায় না। সুতরাং আমরা একই পৃথিবীর মানুষ নিজেদের ভাই-বোন মনে করে কি পারি না সমবণ্টন করে মিলে মিশে শান্তিতে বসবাস করতে? পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই কি এ শিক্ষা দেয় না? তাহলে আমরা কোথায় চলেছি? কেনই বা পৃথিবীর বুকে কল্পিত সীমারেখা টেনে বিভক্তি বাড়াচ্ছি? আমরা কি সমষ্টিগত ঐক্যের কথা চিন্তা করতে পারিনা?

আল্লাহ প্রদত্ত পাঁচ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়ন বাঙালিকে কোরবে পরাশক্তিধর জাতি

আল্লাহ প্রদত্ত পাঁচ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়ন বাঙালিকে কোরবে পরাশক্তিধর জাতি

Mosih-amir5
মসীহ উর রহমান:
আল্লাহর শেষ রসুলের আগমন ও সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল সকল দল, মত, পথ, ভৌগোলিক ও ভাষাগত জাতীয়তার ব্যবধান ঘুঁচিয়ে পুরো মানবজাতিকে, আদম ও হাওয়ার সকল সন্তানকে একটি মহাজাতিতে পরিণত করা। সমগ্র মানবজাতির স্রষ্টা এবং ন্যায়সঙ্গত হুকুমদাতা (এলাহ) একজন, সুতরাং তাদের জীবনব্যবস্থাও হবে একটি। সেটার নাম আল্লাহ দিয়েছেন দীনুল হক বা সত্য জীবনব্যবস্থা। সমগ্র মানবজাতির জীবনকে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচারে পূর্ণ কোরে দিতে আল্লাহ তাঁর শেষ রসুলের মাধ্যমে এই জীবনব্যবস্থা দান কোরেছেন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে। সেটা প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতি হিসাবে আল্লাহ রসুলাল্লাহ এবং তাঁর জাতি উম্মতে মোহাম্মদীকে পাঁচ দফার একটি কর্মসূচি দান কোরেছিলেন। ঐ পাঁচ দফা হোল- ১) ঐক্য, ২) শৃঙ্খলা, ৩) আনুগত্য, ৪) হেজরত, ৫) জেহাদ (হাদীস- তিরমিযী, মুসনাদে আহমেদ, বাব-উল-এমারাত, মেশকাত)।
প্রকৃতপক্ষে এই পাঁচ দফাই হোচ্ছে মানবজাতিকে একটি জাতিতে পরিণত করার কর্মসূচি। আজ আমরা পৃথিবীর যে অংশে বসবাস কোরছি অর্থাৎ বাংলাদেশ। এখানে বর্তমানে ১৬ কোটি মানুষ বসবাস করে। এই ১৬ কোটি মানুষকেও যদি আজ ঐক্যবদ্ধ হোতে হয় তবে আল্লাহর দেওয়া এই পাঁচ দফার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোন পন্থা নেই, কারণ আল্লাহর দেওয়া পন্থা থেকে কোন পন্থা শ্রেষ্ঠ হওয়া সম্ভব নয়।
আল্লাহর রসুল তাঁর জাতিকে সঙ্গে নিয়ে ঐ কর্মসূচি মোতাবেক কঠিন সংগ্রাম কোরে আরব ভূখণ্ডে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা কোরলেন। ফলে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হোল চূড়ান্ত শান্তি ও নিরাপত্তা। এরপর বাকি পৃথিবীর দায়িত্ব তিনি তাঁর জাতিটির উপর অর্পণ কোরে আল্লাহর কাছে গেলেন। তাঁর জাতি সংগ্রাম কোরে, সর্বস্ব ত্যাগ কোরে ৬০/৭০ বছরের মধ্যে অর্ধ দুনিয়াতে সেই দীনকে প্রতিষ্ঠা কোরল। এই দীনটি প্রতিষ্ঠার ফলে অর্ধপৃথিবীতে মানুষের জীবন এবং সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হোল। সেই সমাজে একজন সুন্দরী যুবতী সারা গায়ে অলঙ্কার পরে একা শত শত মাইল পথ ভ্রমণ কোরতে পারতো, তার মনে কোন ক্ষতির আশঙ্কাও জাগ্রত হোত না। শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই সে তার ন্যায্য পারিশ্রমিক পেয়ে যেত, অর্থনৈতিক মুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, দান অথবা যাকাতের টাকা গ্রহণ করার কেউ ছিলো না। নারীরা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সাথে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ যে কোন ভূমিকা রাখতে পারতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তীতে আকিদা ভুলে যাওয়ার কারণে এই জাতি তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হোল, তারা সেই পাঁচ দফা কর্মসূচি এবং সংগ্রাম দুটোই ত্যাগ কোরল।
এভাবে আমরা প্রকৃত এসলাম এবং সেটি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত ছিলাম দীর্ঘ তেরশ’ বছর। আল্লাহর অশেষ দয়া যে তিনি আবার তাঁর প্রকৃত এসলাম এবং তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহর রসুলের দিয়ে যাওয়া সেই পাঁচ দফা কর্মসূচিও তাঁরই এক প্রিয় বান্দা এ যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর মাধ্যমে আবার আমাদেরকে দান কোরেছেন। আমরা চেষ্টা কোরে যাচ্ছি আবার এই শতধাবিচ্ছিন্ন জাতিকে সত্য ও ন্যায়ের উপরে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য। আসুন দেখা যাক এই কর্মসূচির প্রতিটি দফার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি।

ঐক্য

কর্মসূচির প্রথমটি হোচ্ছে ঐক্য। তাই এই উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটির এখন প্রথম কাজই হোচ্ছে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হোতে হবে। হুজুর পাক (স:) আরবের তৎকালীন আইয়্যামে জাহেলিয়াতের পরস্পর দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত ঐক্যহীন, ভ্রাতৃত্বহীন একটি জাতিকে আল্লাহর সত্যদীনের আওতায় এনে এমন একটি জাতিতে রূপান্তরিত কোরলেন যাদেরকে আল্লাহ কোর’আনে সীসাঢালা প্রাচীরের সঙ্গে তুলনা কোরেছেন। রসুলাল্লাহ (দ:) বিদায় হজ্বের ভাষণে জাতির ঐক্য বিনষ্টকারী কাজকে কুফর বোলে আখ্যায়িত কোরেছেন। আজ এই জাতির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানি, জ্বালাও পোড়াও চোলছে তার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের ঐক্যহীন হওয়ার প্রবণতা। ধর্মকে নিয়ে যারা ব্যবসা কোরছে, ধর্মকে যারা রুটি রুজির উপায় বানিয়ে নিয়েছে তারাই ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকম তরিকা, ফেরকা, মাজহাব, মত-পথ সৃষ্টি কোরে জাতিকে হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত কোরে রেখেছে, উম্মতে মোহাম্মদীর নামক জাতির ঐক্যকে ধ্বংস কোরে দিয়েছে। আর পশ্চিমা পরাশক্তিগুলি আমাদেরকে শোষণ ও শাসন করার উদ্দেশ্যে তাদের তৈরি করা কিছু রাজনৈতিক মতবাদ আমাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের চাপিয়ে দেওয়া সেই তন্ত্র, মন্ত্র, বাদ মতবাদের উপর ভিত্তি কোরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে, উপদলে আমরা বিভক্ত হোয়ে আছি। একটু আগেই বোলেছি, অনৈক্যের পরিণাম হোচ্ছে পরাজয়। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে হোলে এখন আমাদের সামনে একটাই পথ, আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হোতে হবে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হোই, তাহোলে পৃথিবীর বুকে আমরা হবো একটি পরাশক্তি। সমস্ত বিশ্বকে আমরা নেতৃত্ব দেবো এনশা’আল্লাহ।

শৃঙ্খলা

আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচির দ্বিতীয় দফা হোচ্ছে শৃঙ্খলা। আরবীতে এই দ্বিতীয় দফাটি হোচ্ছে ‘সামেয়ু’ বা শোনা। সতর্কতার সাথে কোন বিষয়ে সদা, সর্বদা সচেতন হোয়ে থাকা বোঝায়। যখন কিছু মানুষ কোন বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হবে তখন সর্বপ্রথম যেটা প্রয়োজন- তাদের মধ্য যিনি নেতা থাকবেন তার কথা প্রত্যেকে শুনবে। এই শৃঙ্খলা ছাড়া ঐ ঐক্য এক মুহূর্তও টিকবে না। জাতির লোকজন তাদের রুজি রোজগার, জীবিকা নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুন, অতন্দ্র প্রহরীর মত তাদের কান পেতে রাখতে হবে তাদের নেতা কখন কি আদেশ, কি নির্দেশ দেন। সকলকে উপলব্ধি কোরতে হবে যে, সৃষ্টিজগতের বিধাতা একজন হওয়ার কারণেই কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নেই। তেমনি সমগ্র মানবজাতিরও বিধাতা একজন থাকতে হবে, একজন নেতার হুকুম তাদেরকে শুনতে হবে, নয়তো কখনোই শৃঙ্খলা আসবে না।

আনুগত্য

কর্মসূচির অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোচ্ছে আনুগত্য। আনুগত্য হোচ্ছে একটি পরিবার, গোষ্ঠী বা জাতির মেরুদণ্ড, এটা যেখানে দুর্বল সেখানেই অক্ষমতা এবং ব্যর্থতা। আল্লাহ কোর’আনে আদেশ কোরেছেনÑ আল্লাহর আনুগত্য করো, তাঁর রসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্য থেকে আদেশকারীর (নেতার) আনুগত্য করো (সুরা নেসা ৫৯)। নেতার আনুগত্যের ব্যাপারে রসুলাল্লাহ বলেন, ‘কোন ক্ষুদ্রবুদ্ধি, কান কাটা, নিগ্রো, ক্রীতদাসও যদি তোমাদের নেতা নিয়োজিত হয়, তবে তার কথা বিনা প্রশ্নে, বিনা দ্বিধায় শুনতে ও মানতে হবে।’ কারণ ঐ ব্যক্তি আল্লাহ এবং রসুলের প্রতিনিধি। তার আদেশ প্রকারান্তরে আল্লাহরই আদেশ। নির্দেশ পালন না করা হোলে ঐক্য ও শৃঙ্খলা যতই নিখুঁত হোক সেটা অর্থহীন। কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই বিরোধিতা অপ্রত্যাশিত বা অবৈধ কিছু নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত। এর পরিণতিতে প্রায়শই দেখা যায়, কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যখনই তার জাতিকে কোন আদেশ বা বিধান দেন, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এর বিরুদ্ধাচারণ ও সমালোচনা, ফলে সর্বক্ষণ সমাজে চোলতে থাকে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা ও রাষ্ট্রের অবাধ্যতা।

হেজরত

হেজরত শব্দের অর্থ শুধু দেশ ত্যাগ করা নয়। হেজরত শব্দের অর্থঃ- “সম্পর্কচ্ছেদ করা, দল বর্জন করা, স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া ভিন্নদেশে গমন করা” (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ)। আল্লাহয় বিশ্বাসী অথচ মোশরেক আরবদের মধ্যে আবির্ভূত হোয়ে বিশ্বনবী যখন প্রকৃত তওহীদের ডাক দিলেন তখন যারা তাঁর সাথে যোগ দিলেন তারা আরবদের ঐ র্শেক ও কুফর থেকে হেজরত কোরলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টিকারী বিভিন্ন দল, মত ও তন্ত্র-মন্ত্র থেকে আমাদের হেজরত কোরতে হবে। পরাশক্তিগুলির চাপিয়ে দেওয়া এই তন্ত্র-মন্ত্রগুলি আমাদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবর্তে অন্যায়, অবিচার, মারামারি, অনৈক্য, বিভেদ, হানাহানি ইত্যাদি বাড়িয়েই চলেছে। আমরা যদি শান্তি চাই তাহোলে এই সব মতবাদগুলি থেকে আমাদের হেজরত কোরতে হবে। আল্লাহর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজের একটি শ্রেণি ধর্মকে রুটি রুজির মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে। আরেকটি দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ধর্মকে নিজেদের ইচ্ছামত রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার কোরছে, এই সমস্ত ধর্মব্যবসায়ীদের থেকেও আমাদের হেজরত কোরতে হবে।

জেহাদ

কর্মসূচির প্রথম চারটি দায়িত্বের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যই হোল জেহাদ করা। জেহাদ শব্দের অর্থ হোচ্ছে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। আল্লাহর রসুল এসেছেন মানবজাতিকে শান্তিময় জীবনব্যবস্থার অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য। তাই আমাদেরকে মানবজাতির জীবনে শান্তি আনার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকে জেহাদ কোরতে হবে সমাজে প্রচলিত সকল অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, মিথ্যা ইত্যাদির বিরুদ্ধে। এই সংগ্রাম চালানোই আমাদের উদ্দেশ্য আর কর্মসূচির প্রথম চার দফা এই সংগ্রামের জন্য অপরিহার্য। জেহাদ বাদ দিয়ে কর্মসূচির প্রথম চারটি দফা পালন করা অর্থহীন।
আমরা সত্যিই যদি একটি শান্তিময় পার্থিব ও পরকালীন জীবন পেতে চাই, তবে আমাদেরকে আল্লাহর দেওয়া এই পদ্ধতি গ্রহণ কোরতে হবে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে যে, কোন অজুহাতেই আমরা অন্যের বা দেশের সম্পদের ক্ষতি কোরব না; আমরা অন্যের সম্পত্তি নষ্ট কোরব না; আমরা অন্যায় উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার কোরব না, কারও প্ররোচণায় জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও সহিংসতা কোরব না। আমরা আমাদের জীবনে, কাজে কর্মে চিন্তায় ব্যবহারে হবো সুশৃঙ্খল। আমরা আল্লাহর হুকুমের আনুগত্য কোরব। আমরা সকল প্রকার মিথ্যা, অন্যায় মতবাদের অপ-রাজনীতি পরিত্যাগ কোরব। আমরা মৃত্যু পর্যন্ত সকল অন্যায় অবিচার ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোরে যাবো এনশা’আল্লাহ।

যে কারণে আমরা স্বজাতি

যে কারণে আমরা স্বজাতি

011রিয়াদুল হাসান:
আজকের পৃথিবীতে প্রধান প্রধান ধর্মীয় জাতিগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে যতগুলো অমিল লক্ষ্য করা যায়, তার চেয়ে বহু বেশি মিল পরিদৃষ্ট হয়। অথচ রাজনৈতিক কারণসহ বিভিন্ন কারণে কেবলমাত্র জাতিগুলোর অমিল বা মতদ্বৈততা আছে এমন বিষয়গুলোকেই বারংবার সামনে আনা হয়, আর মিলগুলোকে সুচতুরভাবে দূরে সোরিয়ে রাখা হয়। ধর্মব্যবসায়ী ও স্বার্থবাদী রাজনীতিকদের এই কপটতার বলী হয় সকল ধর্মের সাধারণ মানুষেরা। তাই ধর্মব্যবসায়ীরা যাতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত কোরে কোনোরূপ অনর্থ ঘটাতে না পারে তার জন্য সকল ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় অতি প্রয়োজনীয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং মোসলেমরা কিভাবে স্বজাতি?
আমাদের এই উপমহাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রায় ১১০ কোটি সনাতন ধর্মের অনুসারী রোয়েছেন। ধর্মীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মগ্রন্থের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ এই জাতিটি বরাবরই ধর্মানুরাগী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। পৃথিবীতে সম্ভবত তাদের মতো প্রাচীন গ্রন্থের অধিকারী দ্বিতীয় কোনো নৃ-গোষ্ঠী নেই। বহু নবী-রসুল অবতারের আগমন ঘটেছে এই ভারতবর্ষে যারা সকলেই ছিলেন সনাতন ধর্মের ধারক। সনাতন শব্দের অর্থ যা নিত্য, চিরসত্য, স্বতঃসিদ্ধ, শাশ্বত। আল কোর’আনে এসলামকে বলা হোয়েছে ‘দীনুল কাইয়্যেমা’। এই কাইয়্যেমাহ শব্দের অর্থও ঐ একই- যা সনাতন, নিত্য, শাশ্বত। সে হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আর মোসলেমরা শুধু যে স্বজাতি তা-ই নয়, তাদের উভয়ের ধর্মের নাম পর্যন্ত অভিন্ন। কিন্তু অতি সুচতুরভাবে সনাতন ধর্ম থেকে এসলাম ধর্মকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য ‘হিন্দু’ শব্দটিকে সনাতন ধর্মের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হোল। এই এলাকার মানুষের ধর্মকে হিন্দু ধর্ম কখনোই বলা হোত না। হিন্দু ধর্ম বা Hinduism এই শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা যা ছিলো তাদের সুচতুর ষড়যন্ত্রের একটি পদক্ষেপমাত্র। আমার এ কথায় কারো সন্দেহ থাকলে দয়া কোরে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ২০ খণ্ডের ৫১৯ পৃষ্ঠায় Hinduism অধ্যায়টি দেখে নিতে পারেন। সেখানে বলা হোয়েছে,  “The term Hinduism … [ was] introduced in about 1830 by British writers.” এর ফল হোল এটাই যে, হিন্দু ও মোসলেম দুটো দুই জাতি হোয়ে গেল। একে অপরের থেকে দূরে সরে গেলো। সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানো সহজ হোয়ে গেলো। হিন্দু কাকে বলে? ইতিহাস থেকে জানা যায়, সিন্ধু নদের অববাহিকা অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বোলে আখ্যায়িত কোরত পারস্যে মোসলেমরা। অর্থাৎ এটি ছিলো একটি ভৌগোলিক পরিচয়ের বিষয়, ধর্মীয় পরিচয় নয়। এখন কথা হোচ্ছে, হিন্দুস্তানের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে যদি কোন জনগোষ্ঠীকে হিন্দু বোলে আখ্যা দেওয়া হয়, তাহোলে সিন্ধুর অববাহিকায় আরও যতো নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে এবং কোরবে তাদেরকেও হিন্দু বলা অযৌক্তিক হবে না।
সকল মানুষ একই পিতা-মাতা আদম হাওয়ার সন্তান, সকলেই ভাই-বোন। সনাতন ধর্মের গ্রন্থে এই আদি পিতা-মাতাকে আদম ও হব্যবতী বোলে উল্লেখ করা হোয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রাথমিকভাবে মহর্ষী মনুর (আ:) অনুসারী। মহর্ষী মনুই (আ:) হোচ্ছেন কোর’আনে বর্ণিত নূহ (আ:)। সুতরাং মোসলেম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আদিতে একই নবীর অনুসারী। নূহ (আ:) এর মাধ্যমেই মানবজাতির বংশ রক্ষিত হয়, তাই পৃথিবীতে বিরাজমান সকল মানুষের পূর্বপুরুষগণ একসময় নূহের (আ:) অনুসারী এতে কোন সন্দেহ নেই। পরবর্তীতে ভারতবাসীকে পথ দেখাতে এবং ধর্মকে প্রতিষ্ঠা কোরতে আবির্ভূত হোয়েছেন আরও বহু নবী-রসুলগণ যাঁদেরকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় অবতার। শ্রীকৃষ্ণ (আ:), যুধিষ্ঠির (আ:), বুদ্ধ (আ:), মহাবীর (আ:) এঁরা সকলেই ছিলেন আল্লাহর সত্য নবী। সত্য কখনো পৃথক হয় না, সত্যের একরূপ। তাই সকল সত্যনবীর অনুসারীদেরও এক জাতি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
খ্রিস্টানদের সাথে মোসলেমদের শত্র“তার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থবাদীদের চক্রান্তই প্রধান হোলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের তারতম্যও যথেষ্ট বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু আদতে খ্রিস্টান ও মোসলেম ভিন্ন জাতি নয়। মোসলেমরা যেমন আল্লাহ তথা ঈশ্বরের প্রেরিত নবী মোহাম্মদের (দ:) অনুসারী, তেমনি খ্রিস্টানরাও ঐ ঈশ্বরেরই প্রেরিত অপর এক নবী যিশুর (আ:) অনুসারী দাবিদার। খ্রিস্টান ও মোসলেম উভয়েই একই স্রষ্টার সৃষ্টি, একই মাতা-পিতার সন্তান। এসলাম ধর্মে তাদেরকে বলা হোয়েছে আদম-হাওয়া, আর বাইবেলে বলা হোয়েছে অ্যাডাম-ইভ। খ্রিস্টানরা যাকে বলেন জেসাস-ক্রাইস্ট, মোসলেমরা তাঁকেই বলেন ঈসা (আ:)। যিশু খ্রিস্টকে (আ:) সম্মান করা, তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু একজন মোসলেমের কর্তব্যই নয়, ঈমানী দায়িত্ব। কোন মোসলেম যদি তাঁকে অস্বীকার করে তবে সে কাফের হবে, কারণ তাঁকে অস্বীকার কোরলে প্রকারান্তরে স্রষ্টাকেই অস্বীকার করা হয় (সুরা নেসা- ১৫১)। ঈসা (আ:) আল্লাহর তওহীদ তথা একত্ববাদ শিক্ষা দিয়েছেন। বাইবেলে আমরা পাই, একদিন একজন লোক তাঁর কাছে জানতে চাইলো, সকল অনুশাসনের মধ্যে সর্বপ্রথম অনুশাসন কি? ঈসা (আ:) উত্তরে বোললেন, “শোন হে বনী ইসরাইল। সর্বপ্রথম অনুশাসন হোচ্ছে আমাদের প্রভু আল্লাহ হোচ্ছেন একমাত্র প্রভু [“The first of all the commandments is, Hear, O Israel; The Lord our God is one Lord.” (The 12th chapter of Mark) মোসলেমদের বিশ্বাসও তাই। যারা খ্রিস্টান নামধারী কিন্তু না মানে ইঞ্জিলের বিধান, না মানে ঈসা (আ:) এর উপদেশ এক কথায় যারা স্রষ্টার বিধান মানে না তারা আসলে ঈসা (আ:) এর অনুসারী নয়, যতোই তারা দাবী কোরুক। তেমনিভাবে যারা না মানে কোর’আনের বিধান, না অনুসরণ করে শেষ নবীর আদর্শ, তারা মোসলেম বংশোদ্ভূত হোলেও মোসলেম নয়, উম্মতে মোহাম্মদী নয় যতোই দাবি কোরুক না কেন। বাইবেল বলছে যিশু খ্রিস্ট আবার আসবেন, হাদিসেও বলা আছে তিনি আবার আসবেন এবং এসে দাজ্জাল ধ্বংস কোরবেন। খ্রিস্টানরা অপেক্ষা কোরছেন- যিশু খ্রিস্ট এসে এন্টি ক্রাইস্ট ধ্বংস কোরবেন, ‘কিংডম অব হ্যাভেন’ প্রতিষ্ঠা কোরবেন; মোসলেমরাও অপেক্ষা কোরছেন- ঈসা (আ:) পৃথিবীতে এসে দাজ্জালকে ধ্বংস কোরে এমন শান্তি প্রতিষ্ঠা কোরবেন যে, নেকড়ে আর ভেড়া এক সাথে থাকবে। তাহলে মোসলেম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে পার্থক্য রোইল কোথায়? উভয় জাতির মধ্যে শত্র“তার কোনো ভিত্তি রোইল কি?
পবিত্র কোর’আনে সুরা নেসার ১৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, “আহলে কিতাবদের প্রত্যেকে তাদের মুত্যুর পূর্বে তাঁহার [ঈসা (আ:) এর] উপর ঈমান আনবেই।” আবার সুরা আল এমরানের ৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, “ তামার [ঈসা (আ:) এর] অনুসারীদেরকে কেয়ামত পর্যন্ত কাফেরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি।” ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাংলায় অনুদিত কোর’আনের ফুটনোটে ঈসার (আ:) অনুসারী বলতে মোসলেমদেরকেই বোঝানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে মোহাম্মদ (সা:) এর আবির্ভাবের পর থেকে ঈসা (আ:) এর প্রকৃত অনুসারী তো তারা যারা মোসলেম অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর সকল রসুলগণের উপরই বিশ্বাস রাখে। মোসলেম শব্দের অর্থ বিনা দ্বিধায় আত্মসমর্পণকারী। সুতরাং যারাই আল্লাহর হুকুমের প্রতি বিনা দ্বিধায় আত্মসমর্পণ কোরবে তারাই মোসলেম, তার বংশপরিচয় এখানে বিবেচ্য নয়। তাই উপরোক্ত আয়াতগুলিতে মহান আল্লাহ পাকের কথা ও তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যার আলোকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, কেয়ামতের পূর্বে সমগ্র মানবজাতি স্রষ্টার সিদ্ধান্তের প্রতি আত্মসমর্পণ কোরবে এবং মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ কোরে একজাতিতে পরিণত করার জন্যই ঈসা (আ:) এর পুনরাগমন হবে। সুতরাং এটাই যদি তাঁর কাজ হয় তবে কেন আমরা মিছেমিছি সেই ঐক্যকে বিলম্বিত কোরছি, আজই কেন আমরা এক জাতিতে পরিণত হোতে পারছি না? যেহেতু ঈসা (আ:) এসে বাইবেলে বর্ণিত Anti-Christ, The Beast, হাদীসে বর্ণিত দাজ্জালকে ধ্বংস কোরে সমস্ত মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ কোরবেন যার ফলস্বরূপ পৃথিবী হবে Kingdom of Heaven, সেহেতু আমরা সেই ঐক্যপ্রক্রিয়া এখনই কেন শুরু কোরি না?
এটা প্রসিদ্ধ ইতিহাস যে, রসুলাল্লাহ মক্কা বিজয়ের পর যখন কাবা ঘরে স্থাপিত বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি ভেঙে ফেলছিলেন তখন কাবার অভ্যন্তরভাগের দেওয়ালে যিশু খ্রিস্ট ও মাতা মেরির ছবিও ছিল। আল্লাহর রসুল সকল মূর্তি ভাঙলেও, সকল ছবি ধুয়ে ফেললেও ঐ ছবিটা নষ্ট কোরলেন না। কয়েক শতাব্দী ঐ ছবি সেখানেই ছিলো। পরে কাবাঘর পুনসংস্কার করার সময় সেই ছবিগুলি নষ্ট হোয়ে যায় (সূত্র: সিরাত ইবনে ইসহাক)। যে ছবি আল্লাহর ঘর ক্বাবায় ছিলো সে ছবি কারও ঘরে কেউ যদি রাখতে চায় তবে অন্যের আপত্তি থাকবে কেন? তিনি তো কেবল খ্রিস্টানদেরই নবী নন, মোসলেমদেরও নবী। নবী-রসুলগণ কোনো নির্দিষ্ট জাতির একার সম্পদ হোতে পারেন না। তাঁরা সমগ্র পৃথিবীর সম্পদ, সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। তাঁরা যে বিধান এনেছেন স্থান-কাল-পাত্রভেদে সেগুলোতে শরিয়াহর কিছু রদ-বদল থাকলেও মূল শিক্ষায় কোনো পার্থক্য ছিলো না। কারণ, পৃথিবীর সত্য, শাশ্বত, সনাতন নিয়ম-নীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। এই শাশ্বত শিক্ষা যেমন আল কোর’আনে আছে, তেমন বাইবেলেও আছে। কাজেই মোসলেমরা কোর’আনের পাশাপাশি বাইবেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ কোরবেন, ইঞ্জিলের বহু কথা আল্লাহ কোর’আনেও উল্লেখ কোরেছেন। খ্রিস্টানরা বাইবেলের পাশাপাশি কোর’আন থেকে শিক্ষাগ্রহণ কোরবেন এমনটাই হওয়া উচিৎ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মোসলেম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কার্যত হিংসা, বিদ্বেষ, যুদ্ধ, হানাহানি তথা শত্র“তার যুক্তিসঙ্গত ধর্মীয় কোন কারণ নেই।
তাছাড়াও এব্রাহীম (আ:) তথা আব্রাহাম কে মোসলেমরা যেমন জাতির পিতা বোলে মান্য করেন। আল্লাহ উম্মতে মোহাম্মদীর উদ্দেশে পবিত্র কোর’আনে বোলছেন, “এটাই (এসলাম) তোমাদের পিতা এব্রাহীমের দীন। আল্লাহ্ তোমাদের নাম রেখেছেন “মুসলিম”। পূর্বের গ্রন্থাবলীতেও আবার এই গ্রন্থেও (কোর’আন) ঐ নামই দেয়া হোয়েছে। (সুরা আল-হাজ্জ ৭৮)।
তেমনি খ্রিস্টানরাও তাঁকে জাতির পিতা বোলেই মান্য করেন। বাইবেলে বলা হোচ্ছে: Abraham is “the father of all those who believe”, both of the circumcised and the uncircumcised (Rom 4:9-12). অর্থাৎ আব্রাহাম খাৎনাকারী এবং খাৎনা বিহীন নির্বিশেষ সকল বিশ্বাসী মানুষের পিতা। ঈসা (আ:) তাঁর অনুসারীদের বোলছেন, “If you were Abraham’s children, then you would do what Abraham did. (John 8:39) অর্থাৎ যদি তোমরা এব্রাহীমের সন্তান হোয়ে থাকো তবে সেই কাজই তোমাদের কর্তব্য যা এব্রাহীম কোরেছেন। সুতরাং এদিক দিয়েও মোসলেম খ্রিস্টান একই পিতার দুই পূত্র।
এই যদি হয় মোসলেমদের সাথে খ্রিস্টানদের সম্পর্ক তাহলে এ দুই জাতির মধ্যে এত বিভেদ কেন? আমরা কি আজও এক সাথে বসতে পারি না? শত শত বছর ধরে বহু সংঘাত হোয়েছে, শত্র“তা হোয়েছে, ক্রুসেড সংঘটিত হোয়েছে, কিন্তু কী লাভ হোয়েছে? শান্তি এসেছে কি? শান্তি তো আসেই নি, মাঝখান থেকে ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানবতাটাই হারিয়ে গেছে। তাই আসুন আমরা একসাথে বসি, আমরা ভাই ভাই হোয়ে যাই। যে নবী-রসুলগণ একজন আরেকজনকে ভাই বোলে সম্বোধন কোরেছেন, সেই নবীদের অনুসারী হোয়ে আমরা কেন একে অপরের সাথে শত্র“তা কোরবো?
ঈসা (আ:) সম্পর্কে আল্লাহর শেষ রসুল (দ:) বোলেছেন, “মানবজাতির মধ্যে সবার চেয়ে ঈসা ইবনে মারিয়ামের (আ:) ভাই হবার ক্ষেত্রে আমি সর্বাধিক দাবিদার, তাঁর ও আমার মধ্যে আর কোন নবী নেই” (কানজুল উম্মাল, ১৭ খণ্ড, হাদিস ১০৩৩)। অন্যত্র বোলেছেন, “দুনিয়ায় এবং আখেরাতে আমি ঈসা ইবনে মারিয়ামের (আ:) সবচেয়ে নিকটতম। সকল নবীরাই ভাই ভাই, কেবল তাদের মা আলাদা। তবে তাদের সবাই একই ধর্মের অনুসারী। (হাদীস- আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী)। আবার ঈসা (আ:) শেষ নবীকে কতখানি সম্মান কোরেছেন তা বাইবেলে বর্ণিত আছে। ঈসা (আ:) তাঁর আসহাবদেরকে বোলেছেন, “বিশ্বাস করো আমি তাঁকে দেখেছি এবং তাঁকে সম্মান জানিয়েছি। এভাবে সকল নবী তাঁকে দেখেছেন। তাঁর রূহকে দর্শনের মাধ্যমে নবীগণ নব্যুয়তপ্রাপ্ত হোয়েছেন। আমি যখন তাঁকে দেখলাম আত্মা প্রশান্ত হোয়ে গেল। আমি বোললাম, O Muhammad;, God be with you, and may he make me worthy to untie your shoelatchet; for obtaining this I shall be a great prophet and holy one of God. হে মোহাম্মদ! আল্লাহ আপনার সহায় হোন। আমাকে তিনি আপনার জুতার ফিতা বাঁধার যোগ্যতা দান কোরুন। কারণ আমি যদি এই মর্যাদা লাভ কোরি তাহলে আমি একজন বড় নবী হবো এবং আল্লাহর একজন পবিত্র মানুষ হোয়ে যাবো। (The Gospel of Barnabas, Chapter 44)”. এই ছিল একজন নবীর নিকটে অপর একজন নবীর সম্মান, মর্যাদা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, নবী-রসুল-অবতারগণ একে অপরকে কতখানি সম্মান কোরতেন, ভালোবাসতেন। অথচ তাদেরই অনুসারী দাবি করে আমরা জেহাদ-ক্রুসেডের নামে একে অপরের সাথে বংশ পরম্পরায় শত্র“তা কোরে যাচ্ছি, উপাসনালয় ভাঙছি, মূর্তি ভাঙছি, দাঙ্গা কোরছি, রক্তপাত কোরছি। কী নিষ্ঠুর পরিহাস।
খ্রিস্টানদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হোয়ে থাকে কোর’আনে বহু আয়াত আছে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে। এটা একটা বিভ্রান্তি। বস্তুত কোর’আনে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে কোনো আয়াত নেই। কোর’আনে বলা আছে- তুমি অবশ্যই মুমিনদের জন্য মানুষের মধ্যে শত্র“তায় অধিক কঠোর পাবে ইহুদি ও মুশরিকদেরকে। আর মুমিনদের জন্য বন্ধুত্বে তাদেরকে নিকটে পাবে যারা বলে, ‘আমরা নাসারা (খ্রিস্টান)’ (মায়েদা, ৮২)।
নাজ্জাশী ছিলেন খ্রিস্টান শাসক। তিনি রসুলাল্লাহকে সত্য প্রচারে সহযোগিতা কোরেছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত এসলাম গ্রহণ কোরেছেন বোলে কোনো সহিহ হাদিস বা ইতিহাস পাওয়া যায় না। কিন্তু এসলাম গ্রহণ না কোরলেও রসুলাল্লাহ তাঁকে একজন মোসলেমের সম্মানে সম্মানিত কোরেছেন। তাঁকে মোসলেমদের ভাই হিসেবে উল্লেখ কোরেছেন।
নাজ্জাশী ইন্তেকাল কোরেছিলেন তাবুক যুদ্ধের পর নবম হিজরীতে। আল্লাহর রসুল নাজ্জাশীর এন্তেকালের তারিখেই তার মৃত্যু সংবাদ সাহাবাদের জানান এবং জামায়াতবদ্ধ হোয়ে গায়েবানা জানাযার ব্যবস্থা করেন। তিনি সাহাবাদেরকে বলেন- ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা পড় যিনি তোমাদের দেশ ব্যতীত অন্য দেশে মৃত্যুবরণ কোরেছেন।’ নাজ্জাশী যে মোসলেম ছিলেন না তার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল পাওয়া যায় এখানেই। রসুলাল্লাহ যখন জানাযায় দাঁড়ালেন তখন কয়েকজন মোনাফেক মন্তব্য করে যে, রসুলাল্লাহ একজন কাফেরের জানাযা পড়াচ্ছেন। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ সুরা আল ইমরানের ১৯৯ নং আয়াত নাজেল কোরলেন, যেখানে বলা হোয়েছে- ‘আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রোয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হোয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে স্বল্পমূল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রোয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন।’ নাজ্জাশী যে মোসলেম ছিলেন না, আহলে কিতাব অর্থাৎ খ্রিস্টান ছিলেন এবং আহলে কিতাবরাও দীন প্রতিষ্ঠার কাজে সাহায্য করে মোসলেমদের সমান মর্যাদার অধিকারী হোতে পারে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই আয়াতটিই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোচ্ছে নাজ্জাশী ধর্মব্যবসায়ী ছিলেন না, ধর্মকে তিনি স্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে পরিণত করেন নি। প্রায় সকল মোফাসসের ও হাদিস বিশারদগণ স্বীকার কোরেছেন যে, এই আয়াতটি নাজ্জাশীর মৃত্যু ও মোনাফেকের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত নাজেল হোয়েছিল।
এই ঘটনার দ্বারা আল্লাহর শেষ রসুল তাঁর জাতির জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন যে, তোমরা একে অপরের শত্র“ নও, আলাদা নও, তোমরা যাঁদের অনুসারী তাঁরা একই স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত, সুতরাং অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তির প্রাচীর তুলে রাখার কোন বৈধতা নেই, যুক্তিও নেই। এই ছিলো মোসলেমদের সাথে খ্রিস্টানদের সম্পর্ক। প্রশ্ন হোতে পারে, তাই যদি হবে তাহলে পরবর্তীতে তিনি খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোরলেন কেন?
পরবর্তীতে খ্রিস্টানদের সাথে মোসলেমদের যে যুদ্ধের ইতিহাস পাওয়া যায় তার পেছনে বহু কারণ নিহিত রোয়েছে। প্রধান কারণ ছিলো রাজনৈতিক। রসুলাল্লাহ যখন মদীনার রাষ্ট্রপ্রধান, তখন মক্কাবাসী মোশরেকরা পৃথিবী থেকে সত্যদীনকে মুছে ফেলার অভিপ্রায় নিয়ে অনেকবার তাঁকে আক্রমণ কোরেছে। সে আক্রমণে যারা যারা সাহায্য কোরেছে তাদের বিরুদ্ধে তিনি পরবর্তীতে অভিযান পরিচালনা কোরেছেন। সেটা ছিলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেটা কোনো আন্তঃধর্মীয় যুদ্ধ ছিলো না। পবিত্র জেরুসালেম শহর মোসলেম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর খলিফা ওমর বিন খাত্তাব (রা:) ঘুরে ঘুরে শহরের দর্শনীয় বস্তুগুলি দেখার সময় যখন খ্রিস্টানদের একটি অতি প্রসিদ্ধ গির্জা দেখছিলেন তখন সালাতের সময় হওয়ায় তিনি গির্জার বাইরে যেতে চাইলেন। জেরুজালেম তখন সবেমাত্র মোসলেমদের অধিকারে এসেছে, তখনও কোন মসজিদ তৈরিই হয় নি, কাজেই সালাহ খোলা ময়দানেই কায়েম করা হতো। জেরুজালেমের প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ বিশপ সোফ্রোনিয়াস ওমরকে (রা:) অনুরোধ কোরলেন ঐ গির্জার মধ্যেই তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নামাজ পড়তে। ভদ্রভাবে ঐ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান কোরে ওমর (রা:) গির্জার বাইরে যেয়ে সালাহ কায়েম করলেন। কারণ কি বোললেন তা লক্ষ্য কোরুন। বললেন- আমি যদি ঐ গির্জার মধ্যে নামাজ পড়তাম তবে ভবিষ্যতে মোসলেমরা সম্ভবতঃ একে মসজিদে পরিণত কোরে ফেলতো। একদিকে এসলামকে পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠিত কোরতে সর্বস্ব পণ কোরে দেশ থেকে বেরিয়ে সুদূর জেরুজালেমে যেয়ে সেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসলাম প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে খ্রিস্টানদের গির্জা যেন কোন অজুহাতে মোসলেমরা মসজিদে পরিণত না করে সে জন্য অমন সাবধানতা। উম্মতে মোহাম্মদী যতো যুদ্ধ কোরেছিলো সেগুলির উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর বিধান জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা (আজ যেমন জাতীয়ভাবে ব্রিটিশের আইন-বিধান মেনে নেওয়া হোয়েছে)। কিন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে একটি মানুষকেও তার ধর্ম ত্যাগ কোরে এই দীন গ্রহণে বাধ্য করেন নি। শুধু তাই নয়, যেখানেই তারা আল্লাহর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কোরেছেন সেখানেই অন্য ধর্মের চার্চ, সিনাগগ, মন্দির ও প্যাগোডা রক্ষার দায়িত্ব তো নিয়েছেনই তার উপর ঐ সব ধর্মের লোকজনের যার যার ধর্ম পালনে কেউ যেন কোন অসুবিধা পর্যন্ত না কোরতে পারে সে দায়িত্বও তারা নিয়েছেন। একটি উদাহরণ দিই। আমর ইবনুল আস (রা:) এর মিসর বিজয়ের পর আলেকজান্দ্রিয়ায় কে একজন একদিন রাত্রে যিশু খ্রিস্টের প্রস্তর নির্মিত প্রতিমূর্তির নাক ভেঙ্গে ফেলেছে। খ্রিস্টানরা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। তারা ধরে নিলো যে, এটা একজন মোসলেমেরই কাজ। আমর (রা:) সব শুনে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তিনি প্রতিমূর্তিটি স¤পূর্ণ নতুন কোরে তৈরি কোরে দিতে চাইলেন। কিন্তু খ্রিস্টান নেতাদের প্রতিশোধ নেবার বাসনা ছিলো অন্যরূপ। তারা বললো, “আমরা চাই আপনাদের নবী মোহাম্মদের (দ:) প্রতিমূর্তি তৈরি করে ঠিক অমনিভাবে তাঁর নাক ভেঙে দেব।”
এ কথা শুনে বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন আমর (রা:)। প্রাণপ্রিয় নবীজির প্রতি এত বড় ধৃষ্টতা ও বেয়াদবি দেখে তাঁর ডান হাত তলোয়ার বাটের উপর মুষ্টিবদ্ধ হয়। ভীষণ ক্রোধে তাঁর মুখমণ্ডল উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজেকে সংবরণ কোরে নিয়ে বোললেন, “আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যে কোন প্রস্তাব করুন আমি তাতে রাজি আছি।” পরদিন খ্রিস্টানরা ও মোসলেমরা বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হোল। আমর (রা:) সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বোললেন, “এদেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের ধর্মের হোয়েছে, তাতে আমার শাসন দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে। তাই তরবারি গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাক কেটে দিন।” এই কথা বলেই তিনি বিশপকে একখানি তীক্ষèধার তরবারি হাতে দিলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রিস্টানরা স্তম্ভিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সহসা সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মোসলেম সৈন্য এলো। চিৎকার করে বললো, “থামুন! আমি ঐ মূর্তির নাক ভেঙ্গেছি। অতএব আমার নাক কাটুন।” বিজিতদের উপরে বিজয়ীদের এই উদারতায় ও ন্যায়বিচারে মুগ্ধ হোয়ে সেদিন শত শত খ্রিস্টান এসলাম কবুল কোরেছিলেন।
সুতরাং উম্মতে মোহাম্মদীর যুদ্ধগুলি ছিলো রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কোন সম্প্রদায় বিশেষের বিরুদ্ধে নয়। খ্রিস্টান শাসকরা যুদ্ধগুলোর মধ্যে ধর্মীয় চেতনাকে ব্যবহার কোরেছেন। মুসা (আ:) যুদ্ধ কোরেছেন ফেরাউনের বিরুদ্ধে, কৃষ্ণ (আ:) যুদ্ধ কোরেছেন আপন মামা কংসের বিরুদ্ধে, যুধিষ্ঠির (আ:) যুদ্ধ কোরেছেন আপন চাচার বিরুদ্ধে, আখেরী নবীও যুদ্ধ কোরেছেন আপন চাচার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ বহু নবীকেই যুদ্ধ কোরতে হোয়েছে। কারণ একটাই- অসত্যের বিরুদ্ধে প্রথমে ঘৃণা, তারপর প্রতিবাদ, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ কোরতে হোয়েছে। এটাই সনাতন রীতি। রসুলাল্লাহ ও তাঁর প্রকৃত অনুসারীরা মাত্র ৬০/৭০ বছরের মধ্যে অর্ধপৃথিবী অধিকার কোরেছিলেন। বস্তুত অন্যায়-অবিচার, অশান্তি নির্মূল কোরে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ছিলো এর উদ্দেশ্য, কোনো জাতি বা ধর্মকে আঘাত করা নয়।
বর্তমানে প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন স্রষ্টা কেবল আমাদের সাথেই আছেন। আমরা স্রষ্টার প্রিয় জাতি, অন্যরা অবাধ্য, তারা নরকে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি তাতে স্রষ্টা আমাদের কারও প্রতিই খুশি নন। মানুষে মানুষে বিভেদের অভেদ্য প্রাচীর তৈরি কোরে এবং মানবতাকে উপেক্ষা কোরে নিত্য অশান্তির সৃষ্টি কোরে আমরা নিজেদের হাতেই আল্লাহর অভিশাপ ক্রয় কোরে নিয়েছি। এখন প্রতিনিয়ত তার ফল ভোগ কোরছি। কিন্তু স্রষ্টার অপার মহিমা যে, তিনি এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর মাধ্যমে এ অভিশাপ থেকে বাঁচার রাস্তা দেখিয়েছেন। তাই আসুন আমরা ভাই ভাই হোয়ে যাই। সকল প্রকার অনৈক্যকে পেছনে ফেলে নবী-রসুল-অবতারদের প্রকৃত শিক্ষা মোতাবেক ঐক্যবদ্ধ হোই। নিজ নিজ ধর্মের সত্য ও শাশ্বত বিধানের আশ্রয় গ্রহণ কোরে স্রষ্টাহীন, বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের সৃষ্ট অশান্তির অনল থেকে নিজেদের মুক্ত কোরি।

সব বাদ-মতবাদ ভুলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হোতে হবে

সব বাদ-মতবাদ ভুলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হোতে হবে

-হেযবুত তওহীদ:
বর্তমানে কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল সাধারণ জনগণের সাথে প্রতারণা কোরছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে নানা ভাগে বিভক্ত করে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে বোলছে, ওদের চেয়ে আমরা ভালো। যারা নানা অজুহাতে নিরীহ জনসাধারণকে একে অপরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে, বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে টান টান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাদের সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম কোরেছি ঐক্যবদ্ধ হোয়ে, এক জাতি, এক মত হোয়ে। তখন কিন্তু আমাদের মধ্যে এত দল-মতের প্রভাব ছিলো না। নিজেদের মধ্যে দল-মতের প্রভাব থাকলে আমরা কিন্তু স্বাধীন জাতি হোতে পারতাম না। কিন্তু অতি দুর্ভাগ্যের বিষয় হোল এক সময় আমাদেরকে নানা দলে, নানা তাবুতে বিভক্ত কোরতেই এখানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা চালু করা হয়। তারপর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য লড়াই কোরেছে, এতে বলি হোয়েছে সাধারণ জনগণের জীবন ও সম্পদ। ফলে কেউ নিহত হোয়েছে, আবার কেউ আহত হোয়ে সারাজীবন পঙ্গুত্ব বরণ কোরেছে, অনেকেই হারিয়েছে তাদের সম্পদ। কিন্তু নেতা বা নেত্রীদের কী হোয়েছে? নেতৃবৃন্দের সর্বোচ্চ শাস্তি বলতে গেলে জরিমানা, কাউকে বা জেলের ভিতর ভিআইপি মর্যাদায় কিছু সময় কাটাতে হোয়েছে। কিন্তু রাস্তায় যারা আন্দোলন সংগ্রাম কোরেছে তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ অর্থাৎ মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছে। তাহোলে এই নেতাদের আসল উদ্দেশ্য কী? শুধু ক্ষমতার মসনদে বসা আর রাতারাতি অর্থ বিত্তের মালিক হওয়া, জাতিকে নিয়ে ভাববার সময় তাদের কোথায়? প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় এই সুবিধাভোগী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার কতভাগ? মূলত সুবিধা ভোগ করে মোট জনসংখ্যার শতকরা তিন ভাগের মতো, যে দল যখন ক্ষমতাসীন হন সেদল বা দলের নেতৃস্থানীয়রাই অকল্পনীয় সুবিধা ভোগ করেন। পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসতে না পারলেও গচ্ছিত অর্থ দিয়ে বাকি সময়টা আরাম আয়েশে পার করে দিতে পারেন। সাধারণ রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। বিভিন্ন সভা-সমাবেশের নামে বিদেশ ঘুরে আসেন। এই অর্থ কোথা হতে আসে? তাদের অর্থের যোগান দেন সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ যা ট্যাক্সের মাধ্যমে আদায় করা হয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করার জায়গা হিসাবে তারা বেছে নেন বিদেশ ভ্রমণ! উন্নয়নের নামে হাজার হাজার প্রকল্প কাগজে কলমে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যেখানে প্রতিটা শিশু জন্ম নেয় সীমাহীন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে, যে দেশের মানুষ দু’বেলা খেয়ে পরে কোন মতে বেঁচে আছে সে দেশের নেতা-নেত্রীরা কি করে বিলাস ব্যসনে মত্ত থাকেন অথচ জনগণের কল্যাণের কথা বলেই সভা-সমাবেশ করেন, জনতার নামেই সব চালান। কিন্তু যেই জনতার নামে চোলছে সব সেই জনতার খবর তারা রাখেন না। ১৬ কোটি জনতার মধ্যে তখন শুধুমাত্র দলীয় লোকেরাই হন প্রকৃত জনগণ। কি অদ্ভুত রাজনীতি! পাঁচ বছর পর পর আসে ভোট, যতো প্রকার ছলচাতুরী করা যায় ততোই ভালো, ভোটের বাক্স ভরে দিবে জনতা, কোন মতে পাস কোরলে পরবর্তী ৫ বছরে সাধারণ জনতা তাদের চৌকাট পার হবার ক্ষমতা থাকে না, নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে নেতার নিকট পৌঁছা বড়ই দুরূহ হোয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ জনতার ক্ষমতা ঐ ভোটের দিন আর বাকি ৫ বছর ঐ একজনের, কি অদ্ভুত রাজনীতি! ভোটের আগে শত সহস্র প্রতিশ্র“তি থাকে সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে, ভোট শেষ হলে প্রতিশ্র“তির কথা বেমালুম ভুলে যান নেতা-নেত্রীরা- এভাবেই চলছে যুুগের পর যুগ। আম জনতা বুঝেও কিছুই কোরতে পারছে না। কারণ সিস্টেমটাই এমন। আপনাকে যদি বলা হয়, আপনি বাঁচবেন, না মরবেন? তবে নিশ্চয় আপনি উত্তর দিবেন, “আমি বাঁচব” কিন্তু আপনাকে যখন প্রশ্ন করা হোচ্ছে- আপনি কি গলায় ফাঁস দিয়ে মরবেন? গুলি খেয়ে মরবেন? আগুনে ঝলসে মরবেন? নাকি পানিতে ডুবে মরবেন? তখন মৃত্যুর সহজ পথ বেছে নেওয়া ছাড়া আপনার আর উপায় থাকে না। গণতন্ত্র নামক এমনই এক সিস্টেমের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত আমরা যে, পাঁচ বছর পর পর আমাদের শুধু বেছে নিতে বলা হয় মৃত্যুর পন্থা। এভাবেই বহুদিন ধরে আমরা জাতিগতভাবে ধুকে ধুকে মরছি। কিন্তু আর না, সাধারণ জনগণের ভাববার সময় এসেছে, সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে। গণতন্ত্র নামক প্রচলিত এই ব্যর্থ, অকার্যকর, ভোগবাদী, নীতি-নৈতিকতাহীন সিস্টেম বা ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে ১৬ কোটি মানুষকে একটি জাতিতে পরিণত হোতে হবে। সকল বাদ-মতবাদ ভুলে, মত-পথ ভুলে, দল-গোষ্ঠী ভুলে, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ার ডাক দিচ্ছে যামানার এমামের অনুসারী তথা হেযবুত তওহীদ।