Sunday, June 12, 2016

বাংলা ভাষায় প্রবিষ্ট আরবি শব্দের বিকৃতি


বাংলা ভাষায় প্রবিষ্ট আরবি শব্দের বিকৃতি


মোহাম্মদ রিয়াদুল হাসান
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বর্তমান বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বিদেশী ভাষার শব্দ যেমন- আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, চাইনিজ ইত্যাদির উচ্চারণ রীতিতে যথেষ্ট ভুল-ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হোচ্ছে। শুধু বলার সময় উচ্চারণে ভুল হোলে কথা ছিল না, লেখার বেলায়ও যদি ভুল হয় তবে তা কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হোতে পারে না। বর্তমানে ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা, সর্বত্র ইংরেজির জয়জয়কার। তাই ইংরেজি শব্দের বাংলা বানানের বিভ্রাট অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ কোরেছে। কিন্তু এটা ইতিহাস যে, এ দেশে ইংরেজি ভাষা প্রবেশের বহু পূর্বেই আরবি ও ফারসি ভাষাভাষীরা শত শত বছর এ দেশ শাসন কোরেছেন, তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি দিয়ে এদেশের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ কোরেছেন। তাদের ভাষা থেকে শত শত শব্দ বাংলা ভাষায় ঠাঁই কোরে নিয়েছে। কাজী রফিকুল হক এর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত অভিধানে ১৭১৭ টি আরবি শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়। ফার্সী ভাষা আছে এর চেয়েও বেশি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বাংলায় ব্যবহৃত অধিকাংশ আরবি শব্দের যথাযথ উচ্চারণ এবং বাংলা বানান এর মূল ভাষার ধারে-কাছেও রাখা হয় নি যেটা সম্পূর্ণ অনুচিত। কিছু কিছু শব্দ বানানের ক্ষেত্রে সঠিক থাকলেও ব্যবহারিকভাবে তার উচ্চারণ করা হোচ্ছে অশুদ্ধভাবে। অনেক শব্দ এই উভয় দোষেই দুষ্ট। ইংরেজি শব্দের সঠিক বানান নিয়ে যেমন কেউ কেউ লিখছেন, বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি শব্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে তেমন কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হোচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে সংস্কার সাধনের জন্য যিনি প্রথম উদ্যোগ নেন তিনি হেযবুত তওহীদের এমাম, এ যামানার এমাম, ঞযব খবধফবৎ ড়ভ ঃযব ঞরসব জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। তিনি এ সব শব্দের সঠিক বানান ও উচ্চারণ ব্যবহার কোরেছেন তাঁর লিখিত বইগুলিতে।
আরবি শব্দ সমূহের বাংলা বানানরীতির কয়েকটি নিয়ম যেমন (১) আরবি স্বরবর্ণ ‘যের’ এর জন্য বাংলায় ‘এ’-কার ব্যবহার হয়। যেমন বেসমেল্লাহ (২) ‘যবর’ এর জন্য ব্যবহার হয় ‘আ’-কার। যেমন আলহামদুলেল্লাহ (৩) ‘পেশ’ এর জন্য ‘ও’-কার ব্যবহার হয়। যেমন মোস্তাকেম, মোহাম্মদ (৪) ‘খাড়া যের’ এবং ‘যের এর পরে যদি ইয়া সাকিন’ থাকে তহলে ‘ি ’-কার ব্যবহার হয়, কোন কোন ক্ষেত্রে ‘ ী’-কার ব্যবহার হয়। যেমনÑ রহিম, দোয়াল্লিন, (৫) আরবি ব্যঞ্জনবর্ণ ‘ইয়া’ এর উচ্চারণ বাংলায় ‘ই’ হবে ‘এ’ হবে না। যেমন ‘ইয়াতিম’, ‘এতিম’ নয়, ‘ইয়ামেন’, ‘এয়ামেন’ নয়।
বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত আরবি, ফারসি, তুর্কি, হিন্দি, ও উর্দু শব্দের বাংলা ভাষার অভিধানে আরবি শব্দগুলির যে বানান রীতি প্রণয়ন কোরছে সেখান থেকে কয়েকটি শব্দ সুচিন্তিত পাঠকদের জন্য উল্লেখ করা হোল। এই বানানগুলিও বিকৃত আরবি বানান রীতির কবলে পড়ে এখন প্রায়সই ভুলভাবে লেখা হোচ্ছে এবং সেই ভুলগুলি রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ কোরেছে। বলা হোচ্ছে আরবিতে নাকি এ-কারের এবং ও-কারের উচ্চারণই নেই যা সম্পূর্ণ অসত্য। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
বাংলা একাডেমির “আরবি, ফারসি, তুর্কি, হিন্দি, ও উর্দু শব্দের বাংলা অভিধান” থেকে নিচের তালিকাটি দেওয়া হোল।
এমন উদাহরণ আমরা আরও বহু দিতে পারব কিন্তু যুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন পাঠকের জন্য এ ক’টি উদাহরণই যথেষ্ট। আরব বিশ্বে ও বিভিন্ন মোসলেম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে আরবি শব্দের উচ্চারণে যেরের স্থলে এ-কারের ন্যায় উচ্চারণ করার কয়েকটি নমুনা তুলে ধরছি। বর্তমানে পত্রপত্রিকায় মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃবৃন্দের ও কয়েকটি স্থানের নামের বানান লক্ষ্য কোরুন:
১. ওসামা বিন লাদেন, ‘লাদিন’ লেখা হয় না।
২. বেন আলী (তিউনেশিয়ার সাবেক প্রধান), ‘বিন আলী’ লেখা হয় না।
৩. বেন বেল্লাহ (আলজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট), ‘বিন বিল্লাহ’ লেখা হয় না।
৪. আলী আব্দাল্লাহ সালেহ (ইয়ামেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট), ‘সালিহ’ লেখা হয় না।
৫. বেন গাজী (লিবিয়ার শহর), ‘বিন গাজী’ লেখা হয় না।
৬. এল বারাদি (মিশরিয় কুটনীতিক), ইল বারাদি লেখা হয় না।
আবার খেয়াল কোরুন ইয়াকীন শব্দটি। আরবি ইয়া’র উপরে যবর। ইয়া একটি স্বরবর্ণ। এর উপরে যবর হওয়ার ফলে স্বভাবতই শব্দটির প্রথম অংশের উচ্চারণ ও বানান হবে ‘ইয়া’। তবে ক্বাফ-এর নিচে যের থাকায় এর উচ্চারণ এ-কার দিয়ে হবে। অর্থাৎ ইয়াকিন শব্দটির সঠিক উচ্চারণ হবে ইয়াকেন। ঠিক যেভাবে হয় ইয়ামেন, ইয়ামিন হয় না। একইভাবে ইয়াসির এর সঠিক উচ্চারণ ও বানান হবে ইয়াসের। আইন একটি স্বরবর্ণ। এর নিচে যের হোলেও ই-কার হবে। বর্তমানে লেখার ক্ষেত্রে ইয়া বর্ণের বেলায় ‘ই’ কার অর্থাৎ ‘ি ’ ব্যবহৃত হয়। আবার যের এর জন্যও ‘ই’ ব্যবহৃত হয় যা একেবারেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
মাত্র ৩০/৪০ বছর আগেও সর্বত্র আরবি ‘যের’ এর উচ্চারণ এ-কার দিয়েই করা হোত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মওলানা আকরাম খাঁ রচিত বিখ্যাত ‘মোস্তফা চরিত’ গ্রন্থটিতেও এসলামের বানান ‘এছলাম’। তার সমসাময়িক সবাই এভাবেই লিখতেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামও তার নামের বানানে ‘এসলাম’ লিখতেন। তখনকার একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার নাম ছিল ‘মোসলেম ভারত’, ‘মুসলিম ভারত’ নয়। এমনকি আমরাও অনেক আরবি শব্দ এ-কার এবং ও-কার দিয়ে উচ্চারণ কোরি যা অভিধান মোতাবেক শুদ্ধ উচ্চারণ। যেমন: কায়েম, মোবারক, মোকাবেলা, মেহরাব, কাফেলা, কাফের, মোশরেক, আলেম, জালেম, এবাদত, জামে মসজিদ, এজাহার, এতেকাফ, গায়েব, এশা, হাফেজ ইত্যাদি। কিছুদিন হোল আরবি থেকে এ-কার (ে ) এবং ও-কার (ে া) এর ব্যবহার বাদ দেওয়া হোচ্ছে। এ পদ্ধতি যারা চালু কোরেছেন তারা শুধু যে একটি ভুলই কোরেছেন তাই নয়, তারা পুরো আরবি ভাষা থেকে দু’টি উচ্চারণই বাদ দিয়ে দিয়েছেন। এমনিতেই আরবি ভাষা উচ্চারণের (Phonetics) দিক থেকে খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়; চ, ট, ঠ, থ, প, ড় ইত্যাদি অনেক উচ্চারণই এ ভাষায় নেই। তার মধ্যে এ ভাষা থেকে ‘এ’ (অ) এবং ও (ঙ)-কারের মত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ উঠিয়ে দিয়ে আরবি ভাষাকে আরো দরিদ্র করা হোচ্ছে।
বাংলাদেশে সম্প্রতি একটি আন্দোলনের নাম ‘হেফাজতে ইসলাম’ রাখা হোয়েছে। লক্ষণীয় এ আন্দোলনের উদ্যোক্তারা প্রায় সবাই বড় বড় মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তি। এই ক্ষেত্রে আলেমরা ‘হিফাজত-ই-ইসলাম’ না লিখে ‘হেফাজতে ইসলাম’ লিখেছেন অর্থাৎ একই শব্দের মধ্যে দুইটি এ-কার ব্যবহার কোরেছেন; প্রকৃতপক্ষে তারা ‘হেফাজত’ বানান ঠিকই লিখেছেন। কিন্তু যে কারণে তারা ‘হেফাজত’ লিখেছেন সেই একই কারণে তাদের ‘ইসলাম’ না লিখে ‘এসলাম’ লেখা উচিৎ ছিল। কারণ এখানেও আলিফের নিচে যের রয়েছে। হা-এর নিচে ‘যের’ থাকায় যদি ‘হেফাজত’ উচ্চারণ হয়, আলিফের নিচে যের থাকলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত হোতে পারে না। সুতরাং এখানেও ‘ইসলাম’ না হোয়ে সঠিক উচ্চারণ হবে ‘এসলাম’।
উচ্চারণ তত্ত্বে (Phonetics) এমনিতেই আরবি দরিদ্র ভাষা তার মধ্যে যদি নির্দিষ্ট উচ্চারণ বাদ দেওয়া হয় তবে কালক্রমে এই ভাষা আরো দরিদ্র হোয়ে পড়বে এবং এক সময় পূর্ণ বিকৃত হোয়ে যাবে। তাই এখনই সময় এসেছে আরবি ভাষাকে বাংলায় লেখা এবং বলার সময় সঠিকভাবে বলা এবং সঠিক উচ্চারণটি লেখা।

Saturday, June 11, 2016

তোমাদের উপর সওমকে ফরজ করা হলো

তোমাদের উপর সওমকে ফরজ করা হলো


রাকীব আল হাসান

মহান আল্লাহর বাণী
হে মো’মেনগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের মতো তোমাদের উপরও সওম ফরদ করা হয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার। (সুরা বাকারা-১৮৩)।
রসুলাল্লাহর (সা.) বাণী
আয়েশা (রা) বলেন: এক ব্যক্তি নবীর (সা.) নিকট এসে অনুতাপের সঙ্গে বলল, ‘এই বদ-নসিব ধ্বংস হয়েছে।’ নবী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’ সে বললো, ‘আমি সওম থাকা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে ফেলেছি।’ নবী বললেন, ‘তোমার কি একজন ক্রীতদাস মুক্ত করার ক্ষমতা আছে?’ সে বললো, ‘না;’ নবী (সা.) বললেন, ‘২ মাস রোযা থাকতে পারবে?’ সে বলল, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘৬০ জন গরিবকে খাওয়াতে পারবে?’ বলল,‘না।’ এমন সময় এক লোক বড় পাত্রভরা খেজুর নিয়ে আসল। তখন নবী (সা.) ঐ ব্যক্তিকে বললেন, ‘ঐ খেজুর নিয়ে যাও এবং স্বীয় গোনাহর কাফ্ফারা হিসেবে সদকা দাও।’ সে বলল,‘ এটা কি এমন লোককে দেব যে আমার চেয়ে অধিক গরিব? আমি কসম করে বলছি, আমার মতো গরিব এ এলাকায় আর কেউ নেই।’ তিনি এ কথা শুনে স্বভাবগত মৃদু হাসির চেয়ে একটু অধিক হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি তোমার পরিবারবর্গকেই খেতে দাও।’ (বোখারী, ২য় খ-, ৮ম সংস্করণ; আ. হক,পৃ: ১৭৫)।
সওম নিয়ে বাড়াবাড়ি
রসুলাল্লাহর (সা.) জীবনী ও হাদীস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কখনও কখনও তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছেন। সেই রিপুজয়ী মহামানব কি কারণে রেগে লাল হয়ে গেছেন? রাসুল (সা.) অক্লান্ত পরিশ্রম করে সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে অপরাজেয় জাতি তথা উম্মতে মোহাম্মদী সৃষ্টি করলেন; সেই জাতি বিনাশী কর্মকা- তাঁর সামনে ঘটলে তিনি অত্যন্ত ক্রোধন্বিত হতেন এবং ক্রোধান্বিত হওয়াটা অত্যন্ত যুক্তিসংগত। এই জাতিবিনাশী কাজগুলির একটি হচ্ছে দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি ও অতি বিশ্লেষণ।
একদিন আল্লাহর রসুলকে (সা.) জানানো হলো যে কিছু আরব রোযা রাখা অবস্থায় স্ত্রীদের চুম্বন করেন না এবং রমযান মাসে সফরে বের হলেও রোযা রাখেন। শুনে ক্রোধে বিশ্বনবীর (সা.) মুখ-চোখ লাল হয়ে গেলো এবং তিনি মসজিদে যেয়ে মিম্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হামদ বলার পর বললেন-সেই সব লোকদের কী দশা হবে যারা আমি নিজে যা করি তা থেকে তাদের বিরত রেখেছে? আল্লাহর কসম তাদের চেয়ে আমি আল্লাহকে বেশি জানি এবং বেশি ভয় করি (হাদীস-আয়েশা (রা.) থেকে বোখারী, মুশলিম, মেশকাত)। একদিন একজন লোক এসে আল্লাহর রসুলের (সা.) কাছে অভিযোগ করলেন যে ওমুক লোক নামায লম্বা করে পড়ান, কাজেই তার (পড়ানো) জামাতে আমি যোগ দিতে পারি না। শুনে তিনি (সা.) এত রাগান্বিত হয়ে গেলেন যে -বর্ণনাকারী আবু মাসউদ (রা.) বলছেন যে- আমরা তাকে এত রাগতে আর কখনও দেখিনি (হাদীস- আবু মসউদ (রা.) থেকে বোখারী।)।
অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কোন বিষয়ে মসলাহ জানতে চাইলে বিশ্বনবী (সা.) প্রথমে তা বলে দিতেন। কিন্তু কেউ যদি আরও একটু খুঁটিয়ে জানতে চাইতো তাহলেই তিনি রেগে যেতেন। কারণ তিনি জানতেন ঐ কাজ করেই অর্থাৎ অতি বিশ্লেণ ও ফতওয়াবাজী করেই তার আগের নবীদের জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। কিন্তু তার অত ক্রোধেও অত নিষেধেও কোনো কাজ হয় নি। পরবর্তীতে দুঃজনক ইতিহাস হচ্ছে তার জাতিটিও ঠিক পূর্ববর্ত্তী নবীদের (আ.) জাতিগুলির মতো দীন নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে অতি মুসলিম হয়ে মসলা-মাসায়েলের তর্ক তুলে বিভেদ সৃষ্টি করে হীনবল, শক্তিহীন হয়ে শত্রুর কাছে পরাজিত হয়ে তাদের গোলামে পরিণত হয়েছে।
সওমের গুরুত্বের ওলট পালট
সওমের মাস আসলে যেভাবে ব্যাপক আয়োজন শুরু হয়, মনে হয় যেন সওমই ইসলামের একমাত্র কর্তব্য। গণমাধ্যমগুলি ক্রোড়পত্র বের করে, প্রতিদিন পত্রিকায় বিশেষ ফিচার, প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখা শুরু হয়। টেলিভিশনে জাদরেল মওলানা, মৌলভীরা আলোচনার ঝড় তোলেন। কিছু ডাক্তার আসেন সওমের স্বাস্থগত উপকারিতা বোঝাতে। সারারাত চলে হামদ ও নাত, শেষরাতে সেহরী অনুষ্ঠান। সব মিলিয়ে যেন এক এলাহি কা-। এটা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য, কারণ ইসলামের একটি বিষয় যত বেশি আলোচিত হবে, সেটা মানুষের জীবনেও তত বেশি আচরিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যেখানে আল্লাহ কোর’আনে সওম ফরদ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন মাত্র একবার আর সওম পালনের নিয়ম কানুন উল্লেখ করেছেন আর দুই/তিনটি আয়াতে, আর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা জেহাদ ফরদ হওয়ার কথা বলা হয়েছে বহুবার আর এর বিবরণ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাতশ’র মতো আয়াতে। জেহাদ-কেতাল সংক্রান্ত সব আয়াত একত্র করলে আট প্রায় পারার মতো হয়ে যায়। মো’মেনের সংজ্ঞার মধ্যেও আল্লাহ জেহাদকে অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘মো’মেন শুধুমাত্র তারাই যারা আল্লাহ ও রসুলের প্রতি ঈমান আনার পর আর সন্দেহ পোষণ করে না এবং সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে (সূরা হুজরাত ১৫)।’ এ সংজ্ঞাতে আল্লাহ সওমকে অন্তর্ভুক্ত করেন নাই, জেহাদকে করেছেন। শুধু তাই নয়, সওম পালন না করলে কেউ ইসলাম থেকে বহিষ্কার এ কথা আল্লাহ কোথাও বলেন নি, কিন্তু জেহাদ না করলে আল্লাহ কঠিন শাস্তি দিবেন এবং পুরো জাতিকে অন্য জাতির গোলামে পরিণত করবেন (সূরা তওবা ৩৯)।
আল্লাহ যে বিষয়টি একবার মাত্র করার হুকুম দিলেও সেটা অবশ্যই ফরদ ও গুরুত্বপূর্ণ কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে বিষয়টি একইভাবে ফরদ করা হলো এবং সেই কাজের বিষয়ে শত শতবার বলা হলো সেটির গুরুত্ব আর দুই তিনটি আয়াতে যে বিষয়টি বলা হলো এই উভয় কাজের গুরুত্ব কি সমান? নিশ্চয়ই নয়। মহান আল্লাহ কোর’আনে শত শতবার জেহাদ কেতাল সম্পর্কে বলার পরও এ প্রসঙ্গে কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না। মিডিয়াতে তো প্রশ্নই ওঠে না, এমন কি যে এমাম সাহেব মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে সিয়ামের ফজিলত নিয়ে সুরেলা ওয়াজে শ্রোতাদের মোহিত করেন, তিনিও ভুলেও জেহাদের নাম উচ্চারণ করেন না।
এর কারণ কি? এর কারণ সওম অতি নিরাপদ একটি আমল যা করলে সুঁইয়ের খোঁচাও লাগার আশঙ্কা নেই। এতে জীবনের ঝুঁকি নেই, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ারও সম্ভাবনা নেই, কোন কোরবানীরও প্রশ্ন নেই। পক্ষান্তরে জেহাদ এমন একটি কাজ যা করতে গেলে জীবন ও সম্পদের সম্পূর্ণ কোরবানী প্রয়োজন। আরেকটি কারণ হলো আজকের, দুনিয়াময় যে ইসলাম চালু আছে এটা আল্লাহ ও রসুলের ইসলাম নয়। ব্রিটিশরা মাদ্রাসা বসিয়ে নিজেরা সিলেবাস পধৎৎরপঁষধস তৈরি করে এই জাতিকে যে বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে এটা সেই ইসলাম। এতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা তওহীদ নেই, দীনুল হক প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নেই, কোন জাতীয় আইন-কানুন নেই, দ-বিধি, অর্থনীতি নেই; অর্থাৎ নামাজ, রোযা আর ব্যক্তিগত আমলসর্বস্ব অন্যান্য ধর্মের মতোই একটি ধর্মে পরিণত হয়েছে। এই ধর্মের প-িতদের, আলেমদের কাছে দীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামাজ, রোযা, দাড়ি, টুপি, মিলাদ, মেসওয়াক ইত্যাদি আর জেহাদ একেবারেই নি®প্রয়োজন। এজন্য এই ইসলাম একটি মৃত, আল্লাহর রসুলের ইসলামের বিপরীতমুখী ধর্ম। এই বিকৃত ধমের্রর উপাসনা ও আনুষ্ঠানিকতাগুলি মানুষ পালন করে আল্লাহর কাছ থেকে বিনিময় ও জান্নাত পাওয়ার আশায়। পবিত্র রমজান মাসে এই সমস্ত আমলের প্রতিদান অন্য সব মাসের চেয়ে সত্তর গুণ হবে এই আশায় ধর্মপ্রাণ মানুষ ফরদ, ওয়াজেব, সুন্নাহ, নফল, মোস্তাহাব ইত্যাদি সর্বপ্রকার আমল প্রচুর পরিমাণে করে থাকেন এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করছেন বলে পরিতৃপ্ত থাকেন। কিন্তু সেই আমল গৃহীত হবে কী করলে সেটা কেউ ভেবে দেখে না। তওহীদহীন ইসলাম আল্লাহর কাছে গৃহীত নয় ফলে জাতিগতভাবে আমাদের মো’মেন থাকা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আরেকটি মারাত্মক বিষয় হচ্ছে গুরুত্বের ওলটপালট। আল্লাহ এবং তাঁর রসুল যে বিষয়ের অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, এই বিকৃত ইসলামে তাকে একেবারে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে; পক্ষান্তরে আল্লাহ-রসুল যে কাজের গুরুত্ব দিয়েছেন কম, সেটিকে মহাগুরুত্বপূর্ণ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জেহাদ সংক্রান্ত আলোচনা না করায় কী ক্ষতি হচ্ছে: জেহাদ সংক্রান্ত আলোচনা কোর’আন ও হাদিসের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে। এটা নিয়ে যখন মিডিয়া, রাষ্ট্র এমনকি আলেম সমাজ, মসজিদের ইমামগণ প্রায় নীরব ভূমিকা পালন করেন তখন জেহাদের সঠিক আকীদা সাধারণ মানুষ জানতে পারে না। জেহাদ যে আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, জেহাদ এবং সন্ত্রাস যে ভিন্ন বিষয়, জঙ্গিবাদী কর্মকা- ও জেহাদ যে সম্পূর্ণ বিপরীত- এ বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে যায়। এই অজ্ঞতার সুযোগই নেয় জঙ্গিরা। ধর্মপ্রাণ মানুষদেরকে জেহাদের আয়াত ও হাদিস দেখিয়ে নিজেদের দলে ভেড়ায়। তাদেরকে বোঝানো হয়- দেখ, দেখ জেহাদের কত গুরুত্ব, কত মাহাত্ম অথচ তোমার মসজিদের ইমাম তো কখনোই এই কথাগুলো তোমাকে শেখায়নি। তখন সেও এটাতে উদ্বুদ্ধ হয়। এজন্য সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে জেহাদ সংক্রান্ত আকিদা পরিষ্কার করা প্রয়োজন, তাদেরকে বোঝানো দরকার যে, জেহাদ এক বিষয় আর জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস অন্য বিষয়। হেযবুত তওহীদ ইসলামের যাবতীয় বিষয়গুলোর সঠিক আকীদা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
কাজেই ইসলামে জেহাদ এর মানে কী, কেন জেহাদ করবে, কার বিরুদ্ধে করবে, কী দিয়ে করবে ইত্যাদি শিক্ষা ধর্মপ্রাণ মানুষকে দিতেই হবে।

ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত জাতি গঠনের মূলমন্ত্র

ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত জাতি গঠনের মূলমন্ত্র


নিজাম উদ্দিন

শুষ্ক মরুভূমি, উত্তপ্ত বালুকারাশি। মাঝে মাঝেই সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যাচ্ছে মরুঝড়। মানুষের হৃদয়গুলিও শুষ্ক, মেজাজ উত্তপ্ত। কারণে অকারণে মানুষ-খুন, হানাহানি, দাঙ্গা, যুদ্ধ। একবার যুদ্ধ বেধে গেলে যেন আর থামেই না। মানুষগুলো কেমন যেন অসভ্য-জানোয়ার প্রকৃতির। কারো জীবনের নিরাপত্তা নেই এতটুকু। নারীদের ন্যূনতম সম্মানটুকু নেই। যুলুম-নির্যাতন সীমা ছাড়িয়েছে। আপন লোককে হত্যা করা, গোত্রে গোত্রে বছরের পর বছর যুদ্ধ করা, পরস¤পদ লুট করা, নারীদের অমর্যাদা করা- এগুলো যেন কোনো অপরাধই না।
ব্যক্তিজীবনে ন্যূনতম শৃঙ্খলা নেই। চুল-দাড়ি উস্কখুস্ক, মুখ দুর্গন্ধযুক্ত, পোশাকগুলো অপরিচ্ছন্ন। অযৌক্তিক অন্ধবিশ্বাসই তাদের ধর্ম। সত্য ধর্মকে বিকৃত করে কিছু প্রথার মধ্যে আবদ্ধ করে ব্যবসা করে খাচ্ছে এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ীরা। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত তাদের জীবন। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি তাদের অন্যতম পেশা। অশিক্ষিত, অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত বর্বর আরব বেদুইন জাতি। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সেই আরব বেদুইনদের মাঝেই শান্তির সুশীতল বাতাস ছড়িয়ে দিতে এসেছিলেন আমার প্রাণপ্রিয় নবী মোহম্মাদুর রসুলাল্লাহ (সা.)।
সেই জাতিকে আমার নবী (সা.) সারা জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর অটল অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এমন এক জাতিতে পরিণত করলেন যারা অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে অর্ধ-পৃথিবীতে অনাবিল শান্তি, পূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত করে শ্রেষ্ঠ জাতির আসনে আসীন হলো। সেই অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত, অবহেলিত, অশিক্ষিত আরব বেদুইনরাই হয়ে গেল শিক্ষকের জাতি। সেই জাতিকে রসুলাল্লাহ (সা.) এমন শিক্ষা দিলেন যে সমস্ত দিক দিয়ে তাঁরা উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করল। দুই-দুইটা পরাশক্তি রোমান ও পারস্যকে একই সাথে সামরিকভাবে পরাজিত করল। সারা পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল তাদের কীর্তি।
কিন্তু সেই জাতি গঠনের মূলমন্ত্র কী ছিল? কোন জাদুর কাঠির পরশে জাতির এমন পরিবর্তন হলো? খুব সহজ। রসুলাল্লাহ (সা.) আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত সেই জাতির কাছে প্রথম যে আহ্বান করেছিলেন, যে বালাগ দিয়েছিলেন তা হলো- তোমরা এই কথার উপর সাক্ষ্য দাও যে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ” (সা.) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই এবং মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসুল।” এটাই হলো সেই অপরাজেয় জাতি গঠনের মূলমন্ত্র, জান্নাতে যাওয়ার চাবি, মোমেন হওয়ার প্রথম শর্ত।
মহানবী (সা:) বলেছেন- “জান্নাতের চাবি হচ্ছে- আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই” (মুয়াজ বিন জাবাল থেকে আহমদ, মেশকাত)। অপর হাদীসে এসেছে- যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে “আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই এবং মোহাম্মদ (সা:) তাঁর প্রেরিত” তার জন্য জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে। (ওবাদাহ বিন সাবেত থেকে মুসলিম, মেশকাত)। এছাড়াও অনেক হাদীস থেকে দেখান যাবে যে, তওহীদই জান্নাতের চাবি। কালিমা তথা তওহীদের স্বীকৃতি না দিলে যেমন মুমিন মুসলিম থাকা যায় না ঠিক তেমনই স্বীকৃতি দানের পর আবার তওহীদের ওপর থেকে সরে গেলেও আর মুমিন মুসলিম থাকা যায় না, আর এটা সবাই জানে যে, মুমিন মুসলিম না থাকলে সে জান্নাতে যেতে পারবে না, সে যতই ইবাদত করুক। দীনুল হকের ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এই কালিমাটি, এ নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। তওহীদ ব্যতীত কোনো ইসলামই হতে পারে না, তওহীদই ইসলামের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সেই শিক্ষকের জাতি আজ আবার ঘৃন্য দাসে পরিণত হয়েছে। সারা পৃথিবীব্যাপী অন্য জাতিগুলোর কাছে মার খাচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে তবু একটু প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারছে না, অথচ এরা সংখ্যায় ১৬০ কোটি। এর মূল কারণ হচ্ছে সেই মূলমন্ত্র ছেড়ে দেওয়া। আল্লাহ তওহীদ থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে মুসলিম নামক এই জাতি। মুসলিম জাতিটি আজ তাদের সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য ছিল সেটাই ভুলে গিয়েছে। সেই উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত পৃথিবীময় আল্লাহর তওহীদভিত্তিক (সার্বভৌমত্ব) সত্যদীন, জীবনব্যবস্থা, দীনুল হক প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মানবজীবন থেকে যাবতীয় অন্যায় অবিচার অশান্তি দূর করার সংগ্রাম করা। যতদিন না মানবজীবন থেকে যাবতীয় অশান্তি দূরীভূত না হয়, ততদিন মুসলিম জাতির উপর আল্লাহর অর্পিত এই পবিত্র দায়িত্ব বহাল থাকবে। সেই দায়িত্ব এই জাতি ভুলে গিয়ে ব্যক্তিগত আমল করে জান্নাতে যাওয়ার কোশেশ করছে। আর আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রত্যাখান করে পশ্চিমা সভ্যতার সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করে নিয়েছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটি তওহীদ সম্পর্কে যে ধারণা করে (আকীদা) তা ভুল। তাদের কাছে তওহীদ মানে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা এবং তাঁর ইবাদত বা উপাসনা করা। ‘তওহীদ’ এবং ‘ওয়াহদানিয়াহ্’ এই আরবী শব্দ দু’টি একই মূল থেকে উৎপন্ন হলেও এদের অর্থ এক নয়। ‘ওয়াহদানিয়াহ্’ বলতে বোঝায় মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ যে একজন তা বিশ্বাস করা (একত্ববাদ-গড়হড়ঃযবরংস), পক্ষান্তরে ‘তওহীদ’ মানে ঐ এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া, তাঁর ও কেবলমাত্র তাঁরই নিঃশর্ত আনুগত্য করা। আরবের যে মুশরিকদের মধ্যে আল্লাহর শেষ রাসুল এসেছিলেন, সেই মুশরিকরাও আল্লাহর একত্বে, ওয়াহদানিয়াতে বিশ্বাস করতো, কিন্তু তারা আল্লাহর হুকুম, বিধান মানতো না অর্থাৎ তারা আল্লাহর আনুগত্য করতো না। তারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন নিজেদের মনগড়া নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালনা করতো। এই আইনকানুন ও জীবন ব্যবস্থার উৎস ও অধিপতি হিসাবে ছিল বায়তুল্লাহ, কা’বার কুরাইশ পুরোহিতগণ। মূর্তিপূজারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের এই ঈমান ছিল যে, এ বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ একজনই এবং তাদের এই ঈমান বর্তমানে যারা নিজেদেরকে মুমিন মুসলিম বলে জানে এবং দাবি করে তাদের চেয়ে কোনো অংশে দুর্বল ছিল না (সুরা যুখরুফ ৯, আনকাবুত ৬১, লোকমান ২৫)। কিন্তু যেহেতু তারা আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম মানতো না, তাই তাদের ঐ ঈমান ছিল অর্থহীন, নিষ্ফল এবং স্বভাবতঃই আল্লাহর হুকুম না মানার পরিণতিতে তাদের সমাজ অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা, সংঘর্ষ ও রক্তপাতে পরিপূর্ণ ছিল, এ জন্য আরবের ঐ সময়টাকে আইয়্যামে জাহেলিয়াত বলা হয়। আল্লাহর হুকুমের প্রতি ফিরিয়ে আনার জন্যই তাদের মধ্যে প্রেরিত হয়েছিলেন শেষ রসুল মোহাম্মদ (সা.)। রাসুলও (সা.) সে কাজটিই করেছিলেন, ফলশ্রুতিতে অন্যায় অশান্তিতে নিমজ্জিত সেই সমাজটি নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুখ-সমৃদ্ধিতে পূর্ণ শান্তিময় (ইসলাম অর্থই শান্তি) একটি সমাজে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং আল্লাহর আনুগত্য না করাই ছিল তাদের কাফের মুশরিক হওয়ার প্রকৃত কারণ। বর্তমানের মুসলিমরা উপলব্ধি করতে পারছে না যে প্রাক-ইসলামিক যুগের আরবের কাঠ পাথরের মূর্তিগুলিই এখন গণতন্ত্র, সাম্যবাদ, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদির রূপ ধরে আবির্ভূত হয়েছে এবং মুসলিম জনসংখ্যাটি আল্লাহর পরিবর্তে এদের তথা এদের প্রবর্তক ও পুরোধা ‘পুরোহিতদের’ আনুগত্য করে যাচ্ছে। এই প্রতিটি তন্ত্র আলাদা আলাদা একেকটি দীন (জীবনব্যবস্থা), ঠিক যেমন দীনুল হক ‘ইসলাম’ও একটি জীবনব্যবস্থা। পার্থক্য হলো, এই মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত দীনগুলি মানবজীবনের বিশেষ কিছু অঙ্গনের, বিশেষ কিছু বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে, কিন্তু সঠিক সমাধান দিতে পারে না আর ইসলাম মানবজীবনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় থেকে শুরু করে সামষ্টিক অঙ্গনের সকল বিষয়ে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা দিয়ে থাকে। আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দীন ইসলাম। এটা ছাড়া আল্লাহ কোনো কিছুই গ্রহণ করবেন না। আল্লাহ বলেছেন, “ আজ আমি তোমাদরে জন্যে তোমাদরে দ্বীনকে র্পূনাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদরে প্রতি আমার নিয়ামত সর্ম্পূণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদরে জন্যে দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম” (সুরা মায়েদা- ৩)। অথচ বর্তমানের মুসলিম নামক জনসংখ্যাটি এই সকল মানবরচিত তন্ত্রের প্রতিমার আনুগত্য করে সেই পৌত্তলিক আরবদের মতই জাতিগতভাবে শিরক ও কুফরে নিমজ্জিত। এখন হেযবুত তওহীদ এই শতধাবিচ্ছিন্ন জাতিকে এক কলেমার উপরে, তওহীদের ভিত্তির উপরে ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য আহ্বান করছে, অর্থাৎ সবাই বলবে আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম, সার্বভৌমত্ব মানবো না। ইসলামের বহু বিষয়ে বহু মতভেদ থাকলেও ১৬০ কোটি মুসলিম আজও এক কলেমার উপরে বিশ্বাসী। আর কলেমার উপরে ঐক্যবদ্ধ করাই আল্লাহর হুকুম ও রসুলাল্লাহর (সা.) সুন্নাহ। হেযবুত তওহীদ সেই চেষ্টাই করছে।

মানবজাতির মুক্তির পথ

মানবজাতির মুক্তির পথ


রাকীব আল হাসান

আমাদের স্রষ্টা মহান আল্লাহ চান তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষ যেন অন্যায়, অবিচার, অশান্তির মধ্যে পতিত না হয়। তারা যেন সুখ-শান্তির মধ্যে বসবাস করতে পারে। মানুষের জন্যই তিনি এই পৃথিবীকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত করেছেন আর নিয়ামত স্বরূপ দিয়েছেন আলো, পানি, বাতাস, বৃক্ষরাজি, তরুলতা, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, নদী, পশু-পাখি, ফুল-ফল, শস্য ইত্যাদি। মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু দেওয়ার পর এই পৃথিবীকে ন্যায়, সুবিচার, শান্তি ও শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার দায়িত্ব আল্লাহ পাক এই মানুষকেই দিলেন। মানুষকে আল্লাহ বানালেন তার প্রতিনিধি, খলিফা। (সুরা বাকারা- ৩০)।
কিন্তু এই পৃথিবী পরিচালিত হবে কীভাবে? কোন নীতি অনুসরণ করে চললে অন্যায়, অবিচার, অশান্তি হবে না? পৃথিবী পরিচালনার বিধান কী হবে? মানবসমাজ পরিচালনার বিধান কি মানুষ নিজেই তৈরি করে নেবে, নাকি আল্লাহ পাক এই পৃথিবী পরিচালনার জন্য মানুষকে একটি নিখুঁত বিধান দিবেন?
এ কথা সকল যুক্তির ঊর্ধ্বে যে, কোনো জিনিসের স্রষ্টাই ঐ জিনিসের ন্যায়সঙ্গত বিধাতা। কারণ যিনি সেটা সৃষ্টি করেছেন তার চেয়ে ঐ জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহার, পরিচালনা-পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এইজন্য তিনি একটি জীবনবিধান পাঠিয়েছেন। আল্লাহর প্রদত্ত এই জীবনব্যবস্থারই নাম হচ্ছে দীনুল হক বা সত্য দীন অর্থাৎ ইসলাম। ইসলামের সর্বশেষ সংস্করণ আল্লাহ পাঠিয়েছেন তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল মোহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে। আল্লাহ তাঁকে এই দীনটি সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁকে এই দায়িত্ব অর্পণের পর ধারণাগতভাবে এই পৃথিবীতে প্রচলিত সকল জীবনব্যবস্থা, বিধি-বিধান মানবজাতির ন্যায়সঙ্গত বিধাতা আল্লাহ কর্তৃক বাজেয়াপ্ত (Banned) ঘোষিত হয় এবং রসুলাল্লাহ হয়ে গেলেন পৃথিবীতে তখন আল্লাহ’র পক্ষ থেকে একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ। এজন্যই আল্লাহ তাঁর রসুলকে বলেছেন এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য যে, ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসুল’ (সুরা আরাফ ১৫৮)। যেহেতু এই সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা ও মালিক (রাজা) আল্লাহ, কাজেই এখানে স্রষ্টা ও মালিকের বিধানই কার্যকরী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যখনই মানুষ আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের মনমতো চলবে, নিজেদের তৈরি করা বিধান দিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তখনই অন্যায়-অবিচারে-অশান্তি সৃষ্টি হবে। যেমন আজ পৃথিবীব্যাপী হচ্ছে।
মানুষের প্রতি মানুষের স্রষ্টা, প্রভু ও বিধাতা আল্লাহর কথা, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, তাঁর রসুলের আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো তোমাদের আদেশকারীর (আমীর)’ (সুরা নিসা ৫৯)। তাহলে, “তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে (সুরা আহযাব ৭১)”।
দ্বিতীয়ত আল্লাহ বলেন, “সৃষ্টি যার বিধান তার (সুরা আরাফ-৫৪)।” অতএব যারা আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীতে বসবাস করে আল্লাহকে বিধাতা মানতে চায় না, তাদের প্রতি আল্লাহর কথা, “নভোম-ল ও ভূম-লের প্রান্ত অতিক্রম করো যদি তোমাদের সাধ্যে কুলায় (সুরা রহমান ৩৩)। প্রভুর এই ঘোষণা মোতাবেক পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আর কারও বিধান বৈধ নয়। যেহেতু আল্লাহই সকলকে সৃষ্টি করে তাদের আহার, বাসস্থান, আলো, পানি, বায়ু সমস্তকিছু নিরন্তরভাবে যোগান দিয়ে যাচ্ছেন, তাই এখানে তিনি ছাড়া আর কারও বিধান বৈধ হতে পারে না। যারা অন্য কোন বিধান দিয়ে পৃথিবী চালাতে চায় তাদের উচিত নিজেরা একটি অনুরূপ নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করা, সেখানে মানবজাতির বিকাশ ঘটানো এবং তাদের লালন পালনের যাবতীয় বন্দোবস্ত করা, আলো, পানি, বায়ু, খাদ্য সরবরাহ করা, অতঃপর তাদের বিধাতা হিসাবে নিজেদের তৈরি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি দিয়ে তাদেরকে শাসন করা। এখানে যারা আল্লাহর হুকুম দিয়ে শাসন করবে না তারা আল্লাহর ভাষায় কাফের জালেম ও ফাসেক অর্থাৎ হুকুম অস্বীকারকারী, অন্যায়কারী, অবাধ্য (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। একজন প্রতাপশালী সম্রাট তার হুকুম অমান্যকারী, অবাধ্য প্রজাদের বেলায় যে কাজটি করে থাকেন আল্লাহও সেটাই করবেন, সেটা হচ্ছে তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া। এটাই আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি যখন কোন জনপদ ধ্বংস করতে চাই তখন তার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎকর্ম (আল্লাহর বিধান মানা) করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেখানে অসৎকর্ম (আল্লাহর বিধান অমান্য করা) করে; অতঃপর ঐ জনপদের প্রতি দণ্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমি সেটা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি (সুরা বনী এসরাঈল ১৬)।
যারা বলে যে, ‘না। আমরা স্রষ্টার বিধান মানবো না’, স্রষ্টার ঘোষণা (সুরা রহমান ৩৩) মোতাবেক তাদের উচিত হবে এই পৃথিবীর অনুরূপ আরেকটি গ্রহ এবং আরেকটি মানবজাতি সৃষ্টি করে সেখানে গিয়ে তাদের তৈরি সব জীবনব্যবস্থা, আইন-কানুন, তন্ত্রমন্ত্র, মতবাদ (Ism, Cracy) ইত্যাদি কায়েম করা। এই সব তন্ত্রমন্ত্রের ধারকদের এই পৃথিবী শাসনের অধিকার নেই। কারণ:
(১) যেহেতু তারা মানুষের স্রষ্টা নয়, একটি অনু পরমাণুরও স্রষ্টা নয়। [তারা কি এমন কাউকে শরীক সাব্যস্ত করে, যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি, বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা আরাফ ১৯১)। তারা একটি খেজুর বিচীর খোসারও মালিক নয় (সুরা ফাতির ১৩)]
(২) যেহেতু তারা এই সৃষ্টিকে লালন পালন করে না। [আমি তোমাদের জন্যে জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করছি এবং তাদের জন্যেও যাদের অন্নদাতা তোমরা নও।…আমিই জীবনদান করি, মৃত্যুদান করি এবং আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী। (সুরা হেজর ২১-২৪)]
(৩) যেহেতু তারা তাদের তৈরি হুকুম ও বিধান দ্বারা মানবসমাজে আজ পর্যন্ত শান্তি আনতে পারে নি। বরং তাদের তৈরি বিধানগুলিই সকল অন্যায় ও অশান্তির কারণ। [তাদেরকে যখন বলা হয় তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তারা বলে, আমরা সংস্কারক মাত্র। সাবধান! তারাই হল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অথচ তারা তা বুঝছে না।” – সুরা বাকারা (১১-১২), “জলে স্থলে যতো বিপর্যয়, এ সবই মানুষের নিজেদের কর্মের ফল” (সুরা রুম; আয়াত-৪১)।]
তাই বিধান দেওয়ার এখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লাহরই (সুরা আহযাব ৪০)। কাজেই আমরা যদি চাই পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ করতে ও পরকালে জান্নাতে যেত তবে অবশ্যই আল্লাহর হুকুম, বিধান দিয়ে পৃথিবী পরিচালনা করতে হবে, আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে মানতে হবে। আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে মানাই হলো কলেমার দাবি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই এবং মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসুল। এটা কেবল যিকিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, সার্বিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই কলেমার দিকে, তওহীদের দিকে, আল্লাহর হুকুম তথা সত্য ও ন্যায়ের দিকে আহ্বান করছে হেযবুত তওহীদ। এটাই মানবজাতির মুক্তির পথ।

Thursday, April 28, 2016

ওদের জীবনে কবে আসবে বসন্ত?

ওদের জীবনে কবে আসবে বসন্ত?


রাকীব আল হাসান
দিনপঞ্জীর শুকনো পাতা দেখে হিসেব মিলালাম বসন্তের আগমন ঘটেছে। ঋতুরাজের সাক্ষাৎ লাভের আশায় বেরিয়েছিলাম রাস্তায়। গ্রামে ফেলে আসা বসন্তের অতীত স্মৃতি মনে মনে ভাবছিলাম- প্রকৃতি দক্ষিণা দুয়ার খুলে দিয়েছে। দুয়ারে বইছে ফাগুনের হাওয়া। বসন্তের আগমনে কোকিল গাইছে গান। ভ্রমরও করছে খেলা। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এত বর্ণিল সাজ।
মনে মনে আবৃত্তি করছিলাম রবিঠাকুরের সেই কবিতার লাইনগুলো-
ফালগুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল,
ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল।
চঞ্চল মৌমাছি গুঞ্জরি গায়,
বেণুবনে মর্মরে দক্ষিণবায়।
এতো কেবলই স্মৃতিগাঁথা। বাস্তবতা যা দেখলাম তা তো সম্পূর্ণ উল্টো। কোথাও পেলাম না বসন্তের ছোঁয়া। ফুলের সুবাস নেই, আছে নর্দমার দুর্গন্ধ। কোকিলের কুহু কলতান শুনতে পাইনি, কেবলই কর্কশ কাকা ধ্বনি আসছিলো কানে। পলাশ-শিমুলের গাছ কোথায়, বিল্ডিং এর পর বিল্ডিং, সামান্য অক্সিজেন প্রদান করবার মতো সাধারণ বৃক্ষও খুঁজে পাওয়া যায় না। খাচায় বন্দী পাখির মতো কিছু ফুলগাছ দেখেছি বড় বড় বিল্ডিঙের বারান্দায়, ছাদে। খাচায় বন্দী পাখিকে কিছু দিয়ে কি আনন্দিত করা যায়? প্রকৃতি ক্রন্দন করছে মানুষের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য। প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া কোথায়?
দেখলাম বস্তির ছেলেগুলোকে ডাস্টবিনের নোংরা খাবার খেতে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে গার্মেন্টস কর্মীদের ছোটাছুটি, দরিদ্র মানুষগুলোর করুণ দৃষ্টি, রিক্সাওয়ালাদের ঘামা শরীর আর খিটখিটে মেজাজ, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক, খাদ্যের সন্ধানে ছুটেছে ক্ষুধার্ত কুকুরগুলো, সাথে মানুষও। বসন্ত শব্দটি তাদের কাছে হয়ত অপরিচিত। ফুল আর কোকিলের ডাক তাদের হৃদয় কাড়বে না, তাদের চাই একটুখানি ভাত, এক টুকরো রুটি। গাছে গাছে যদি রুটি ধরত আর কোকিল যদি ভাত ছিটিয়ে বেড়াত তবে হয়ত তারা বসন্তের নামটা জানত ভালোমতোই।
মার্সিডিস গাড়িতে ছুটে চলা মানুষকেও দেখলাম, সাথে কুকুরও। মসজিদ পানে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া নির্বিকার মুসল্লিদের দেখলাম, বসন্তকে বরণ করতে বাসন্তীরং শাড়ি পরা রমণীদেরও দেখলাম, কপোত-কপোতীদের নির্লজ্জতা দেখলাম— ফুল ফুটুক বা নাই ফুটুক বসন্ত এদের জীবনে সবসময় লেগে থাকে কিন্তু সবার জীবনে বসন্ত কবে আসবে জানি না। আমি বসন্ত খুঁজে পাইনি, আমি যে ক্ষুধার্ত, হাড্ডিসার মানুষগুলো দলে। মার্সিডিস গাড়িতে বসে থাকা সাহেববাবু, মসজিদে ছুটে চলা মুসল্লি, বাসন্তী রং এর পোশাক পরাদের দলে এখনো ভিড়তে পারিনি।

শুধু প্রার্থনা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়

শুধু প্রার্থনা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়


শেখ মনিরুল ইসলাম

পৃথিবী আজ অন্যায়, অবিচার, অশান্তিতে পরিপূর্ণ। এক ইঞ্চি মাটি নেই যেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করছে। এই অশান্তি থেকে পরিত্রাণের জন্য চেষ্টাও করা হচ্ছে। গঠন করা হচ্ছে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত শক্তিশালী বাহিনী, খরচ করা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। আবার একদল মানুষ শান্তির জন্য মসজিদ, মন্দির, সিনাগগ, প্যাগোডায় ঢুকছে, প্রার্থনা করছে। কিন্তু শান্তি কি মিলেছে? পরিসংখ্যান বলছে দিন দিন অন্যায়-অবিচার, অশান্তির মাত্রা ধাঁ ধাঁ করে বাড়ছে। কারণ, শুধু প্রার্থনা করে, দোয়া চেয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এটা নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লাগবে প্রচেষ্টা, সংগ্রাম। যুগে যুগে মানুষ যখন স্রষ্টার দেওয়া বিধান প্রত্যাখ্যান করে নিজেরাই আইন-কানুন বিধান তৈরি করে সেই মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে তখনই তারা অশান্তিতে পতিত হয়েছে। আর যখন সামগ্রিক জীবন পরিচালনায় মানুষ স্রষ্টার বিধানের আশ্রয় নিয়েছে তখন শান্তিতে বসবাস করতে পেরেছে। এটাই মানবজাতির প্রকৃত ইতিহাস। যুগে যুগে এটাই ঘটেছে। রামরাজত্বের ইতিহাস আমরা সকলেই জানি। বলা হয় রামরাজত্বে এতই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, বাঘে ও ছাগে এক ঘাটে জল খেত। রাজ্যের নামই হয়েছিল অযোধ্যা। কারও অধিকারে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করত না। সকলে সুখে-শান্তিতে বসবাস করত। একই পরিবেশ বিরাজ করছিল আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে আরবে, যখন আরবরা শেষ নবীর মাধ্যমে আসা সত্য জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নিয়েছিল। অনাবিল শান্তির ধারা বয়ে গিয়েছিল মানবজীবনে। সমাজ থেকে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, অপহরণ, হানাহানি, রক্তারক্তি, অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার, বৈষম্য ইত্যাদি লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মানুষ যাকাতের অর্থ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত কিন্তু তা গ্রহণের লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। এমন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, মানুষ রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত না। স্বর্ণালঙ্কার পরিহিতা একজন যুবতী মেয়ে একা শতশত মাইল পথ পাড়ি দিত তার মনে কোনো প্রকার ভয় জাগ্রত হতো না। এমন সমাজ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? সেই অভিন্ন পদ্ধতি, তথা স্রষ্টার পাঠানো বিধানের আশ্রয় নেবার ফলে। তাই শান্তি পেতে হলে মানুষকে স্রষ্টার বিধানে ফিরে যেতে হবে।’
শান্তির জন্য আমাদেরকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, কিন্তু আজ আমরা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-মতবাদে বিভক্ত হয়ে অনৈক্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছি। একশত ঐক্যহীন লোকের উপরে মাত্র দশজন ঐক্যবদ্ধ লোক বিজয়ী হয়। অনৈক্যের প্রধান কারণ ধর্মব্যবাসায়ীরা। তারা ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে হাজার হাজার মতবাদ, ফেরকা-মজহাব তৈরি করে জাতিকে শত শত ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। এদের তৈরি ফেরকা-মজহাবের জালে আটকা পড়ে জাতি ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে? মানুষকে ঐক্যের পথে আহ্বান জানাতে হবে। ধর্মব্যবসায়ীদের প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানাতে হবে। আজকে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি তাহলে ঐ ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। ১৯৭১ সালে যেমন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই যুদ্ধ করেছিল। আজও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হব এই ভিত্তির উপরে যে, আমরা একই পিতা মাতার সন্তান, আমরা একই স্রষ্টার সৃষ্টি এবং সমস্ত মহামানব, অবতার, নবী-রসুল সেই একই স্রষ্টার পক্ষ থেকে এসেছেন। কাজেই আমরা সকল ধর্মের অনুসারীরা প্রকৃতপক্ষে একে অপরের ভাই। এই সূত্রে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

আল্লাহর নবীরা প্রকাশ্য কিন্তু জঙ্গিরা গোপন


আল্লাহর নবীরা প্রকাশ্য কিন্তু জঙ্গিরা গোপন



....
জঙ্গিবাদীরা তাদের আদর্শ জনগণের সামনে তুলে ধরেন না কেন? কে তাদেরকে বোঝাবে যে, একজন যোদ্ধার সাথে সন্ত্রাসীর যতটুকু পার্থক্য, আল্লাহর দৃষ্টিতে একজন মোমেনের সাথে একজন জঙ্গির ততটুকুই পার্থক্য? 
.
একটি আদর্শ যতদিন না জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে এবং জনগণ সেটাকে তাদের মুক্তির পথ বলে গ্রহণ করছে ততদিন সেটাকে সশস্ত্র পন্থায় জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে লাভ নেই। সেটা সাম্রাজ্যবাদ হবে যেটা হালাকু খান চেঙ্গিস খান করেছেন। সেটা কখনো সভ্যতায় রূপ নেবে না।
.
কিন্তু ইসলাম একটি সভ্যতার নাম, জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় না। তাই ইসলামে জবরদস্তি করা নিষিদ্ধ এবং নবী সেটা করেন নি। আল্লাহ মানুষকে প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন, সে দাসত্ব করা পছন্দ করে না। তিনি মক্কায় যে পরিমাণ সাহাবী পেয়েছিলেন তারা চাইলে সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে হয়তো প্রথম ১৩ বছরেই মক্কা দখল করে নিতে পারতেন। কিন্তু মুখ বুঁজে নির্যাতন, গালিগালাজ সহ্য করেছেন। একটা মানুষকেও হত্যা করেন নি, সহিংসতার পথেই হাটেন নি।
.
তাতে কি ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয় নি। হয়েছে এবং গত ১৪০০ বছর ধরে যেভাবেই হোক তার একটা অস্তিত্ব টিকে আছে। কিন্তু হালাকু খানরা ইতিহাসের চোরাবালিতে হারিয়ে গেছেন। যারা এককালে রসুলকে হত্যার জন্য পাগলপারা ছিল তারাই ইসলামের খলিফা ও সেনাপতি হয়েছেন যখন তারা রসুলের আদর্শকে জানতে পেরেছেন। মদীনার মানুষ ইসলামকে জানতে ও বুঝতে পেরে রসুলকে নিজেদের দেশে ডেকে এনেছেন এবং তাকে রাষ্ট্রপ্রধান করেছেন। রসুলাল্লাহ যদি নিরবচ্ছিন্ন প্রচার না চালাতেন এটা কি সম্ভব হতো? তিনি তো নবী হয়েই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সবাইকে ডেকে উচ্চস্বরে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। পূর্ববতী নবীরাও প্রকাশ্যে জনগণের সাথে কাজ করেছেন।
.
আজকে জঙ্গিবাদীরা চোরাগোপ্তা হামলা করে ইসলামের খেদমত করছেন, আল্লাহ-রসুলের বিরুদ্ধতাকারীদের শায়েস্তা করছেন বলে ভাবছেন। তারা কখনোই গণমানুষের সম্মুখে তাদের আদর্শকে উপস্থাপনই করছেন না। গোপন পন্থায় কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে তাদের প্রতি জনগণের মনে একটি আতঙ্ক বিরাজ করছে যেটা রসুলের জাতির বেলায় ছিল না। জনগণই রসুলকে নিরাপত্তা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল। রসুলাল্লাহর নীতি ছিল এমন প্রকাশ্য যে তাঁর ব্যক্তিজীবনের খুটিনাটি বিষয় পর্যন্ত সবাই জানে।
.
পক্ষান্তরে আজকের সময়ের জঙ্গিবাদীরা জনগণকে গোনতেই ধরছেন না, জনগণ তাদেরকে চায় কিনা, ভালোবাসে কি না, তারা যে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করতে চায় সেই বিধানের প্রতি জনগণের মন অনুকূল কিনা কিছুই তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। তারা হালাকু খানের পথে হাটছেন। তারা যে কোনো উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায়, জনগণকে দাবিয়ে রেখে শাসন করতে চায় যেটা মধ্যপ্রাচ্যে চলছে।