Tuesday, June 2, 2015

তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো???

তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো???

রাকীব আল হাসান:
ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ- একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে হুকুমদাতা হিসাবে না মানা। তওহীদের বিপরীত হচ্ছে শিরক বা অংশীবাদ। আল্লাহ ছাড়া কাউকে হুকুমদাতা হিসাবে গ্রহণ করাই অংশীবাদ। এটা এমন একটি অপরাধ যার ফলে একজন মুসলিম মুশরিক হয়ে যায়। যতক্ষণ না সে শিরক থেকে মুক্ত হলো, তার সকল ইবাদত, আমল ব্যর্থ হবে। কোনো কিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তাই শিরককে কেবল একটি গোনাহ বলা ঠিক হয় না, শিরক হচ্ছে ইসলাম থেকে বহির্গত হওয়ার প্রথম পথ। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন  তিনি শিরক ক্ষমা করবেন না। এ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন (সুরা নিসা ৪৮, ১১৬)। তাহলে আল্লাহর ঘোষণা মোতাবেক বুঝা গেল শিরক ক্ষমার অযোগ্য, এবং এর একমাত্র প্রতিফল স্থায়ী জাহান্নাম। সুতরাং মানুষের একান্ত উচিত অন্তত শিরক থেকে মুক্ত হওয়া, শিরক থেকে মুক্ত থাকলেই জান্নাত নিশ্চিত- সেটা ছোট জান্নাত হোক আর বড় জান্নাতই হোক। এখন বোঝা দরকার এই শিরক কী?
বর্তমানের বিকৃত ইসলামে- মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকায়, ওয়াজ মাহফিলে আলোচনায় সর্বত্র অন্যান্য কবীরা ও সগীরা গোনাহ যেমন মিথ্যা বলা, চুরি করা, ব্যভিচার করা, ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি না করার জন্য ওয়াজ নসিহত করা হয়ে থাকে। কিন্তু যে গোনাহটি কোনভাবেই ক্ষমা করা হবে না অর্থাৎ শিরক এই বিষয়টি তেমন কোনই গুরুত্ব পায় না। এর একমাত্র কারণ আকিদার বিকৃতি। বর্তমান ইসলামের ধর্ম ব্যবসায়ী আলেমরা কেবল আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সামনে সেজদা করাকেই শিরক বলে মনে করেন, যেমন মূর্তি পূজা, মাজার পূজা, পীরকে সেজদা করা ইত্যাদি। তারা আরও প্রচার করে যে, যেহেতু মুসলিম দাবিদার কেউ মূর্তিপূজা করে না তাই তারা শিরকও করে না। মাজার ও পীরপূজার সঙ্গেও অধিকাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত নয়। তাই তাদেরকে শিরক সম্পর্কে ওয়াজ করার প্রয়োজনও পড়ে না। তাদের প্রায়ন্ধ দৃষ্টিতে ঐ ১৪০০ বছর আগেকার কাঠ পাথরের মূর্তির সামনে মাথা নোয়ানো ছাড়া আর কোনো কাজকেই শিরক হিসাবে দেখতে পান না। মূর্তিপূজা, মাজার পূজা শিরক বটে, কিন্তু প্রকৃত শিরক হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও হুকুম মানা অর্থাৎ অন্যকে ইলাহ হিসাবে মানা, যে শিরকে এই জাতি আকণ্ঠ ডুবে আছে। আল্লাহ বলেন, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো? সুতরাং তোমাদের যারা এরূপ করে তাহাদের প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা, অপমান এবং কেয়ামতের দিন কঠিনতম শাস্তি (সুরা বাকারা ৮৫)” এখানে আল্লাহ পার্থিব জীবনেই যে শাস্তির কথা বলছেন, আজ মুসলিম বলে পরিচিত এই জাতির অবস্থা কি ঠিক তাই নয়? আল্লাহর দেওয়া বিধান হলো আল কোর’আন। এই কোর’আনের কিছু মানা, কিছু না মানাই হলো শিরক। এ ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে -নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না; এটা ছাড়া সব কিছু তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন (সুরা নিসা ৪৮, ১১৬)। আল্লাহর দেওয়া বিধান কোর’আন থেকে নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত এই কয়েকটি বিধান এ জাতি ব্যক্তিগতভাবে পালন করে, তাও বিকৃতরূপে কিন্তু জাতীয় ও সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহর দেওয়া বিধান যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, দণ্ডবিধি, শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি বাদ দিয়ে মানুষের এবং ইহুদি-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের তৈরি বিধান মেনে চলছে। এই শিরকই হচ্ছে বড় জুলুম (সুরা লোকমান ১৩)। কাজেই এখন এ জাতির জন্য বিভিন্ন গোনাহ সংক্রান্ত ওয়াজ নসিহতের চাইতে জরুরি হচ্ছে শিরক মুক্ত হওয়া আর শিরক মুক্ত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো আল্লাহর তওহীদে আসা, এছাড়া আর কোনো পথ নেই।

মুসলিম জাতির ধ্বংসের কারণ

মুসলিম জাতির ধ্বংসের কারণ

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
কোর’আনে বর্ণিত বনি ইসরাইলদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে আমার এই লেখাটি শুরু করতে চাই। ঘটনাটি হলো আল্লাহ বনি ইসরাইলদের একটি গরু কোরবানি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই যদি তারা আল্লাহর হুকুম মোতাবেক একটি ভালো গরু কোরবানি করে দিত তাহলেই সব কাজ শেষ হয়ে যেত। কারণ কোরবানির গরুটা কেমন হবে আল্লাহ তার কোনো শর্ত উল্লেখ করেন নি। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে বলছেন- বনি ইসরাইল তা করে নি। তারা মুুসা (আ.) এর মাধ্যমে আল্লাহকে প্রশ্ন করতে লাগল- গরুটার বয়স কত হবে, গায়ের রং কী হবে, সেটা জমি চাষের জন্য শিক্ষিত কিনা, ওটার গায়ে কোনো খুঁত থাকতে পারবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি (কোর’আন- সুরা আল বাকারা ৬৭-৭১)। তারা প্রশ্ন করে যেতে লাগল আর আল্লাহ একটার পর একটা উত্তর দিয়ে যেতে থাকলেন। তারপর যখন প্রশ্ন করার মতো আর কিছুই রইল না তখন স্বভাবতঃই ঠিক অমন একটি গরু পাওয়া দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। একটা সহজ সরল আদেশ “একটা গরু কোরবানি কর” এটাকে খুচিয়ে খুচিয়ে এমন কঠিন করে ফেলা হলো যে, ঐ আদেশ পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে আমাদের ক্ষেত্রেও। বনি ইসরাইল আর আমাদের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। হ্যাঁ আছে, একটি ব্যাপারে আছে, আর তা হলো বনি ইসরাইল ৭২ ফেরকায় বিভক্ত হয়েছিল, আর এই মুসলিম নামধারী জাতিটি তাদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে ৭৩ ফেরকায় বিভক্ত হয়েছে ( হাদিস আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে তিরমিযি, মেশকাত )।
আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষনবী (সা.) পর্যন্ত আল্লাহ যে জীবন বিধান মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন, স্থান, কাল ভেদে সেগুলোর নিয়ম-কানুনের মধ্যে প্রভেদ থাকলেও সর্বক্ষণ ভিত্তি থেকেছে একটি মাত্র। সেটা হচ্ছে একেশ্বরবাদ (Monothism), তওহীদ, একমাত্র প্রভু, একমাত্র বিধাতা (বিধানদাতা) আল্লাহ। যার আদেশ নির্দেশ, আইন-কানুন ছাড়া অন্য কারো আদেশ, নির্দেশ, আইন-কানুন কিছুই না মানা। আর উদ্দেশ্য থেকেছে মানবতার কল্যাণ, মানবজাতির শান্তি। এই দীনকেই আল্লাহ কোর’আনে বলছেন দীনুল কাইয়্যেমা। আল্লাহ মানুষের কাছে এইটুকুই মাত্র চান। কারণ তিনি জানেন যে, মানুষ যদি সমষ্টিগতভাবে তিনি ছাড়া অন্য কারো তৈরি আইন কানুন না মানে, শুধু তারই আইন-কানুন মানে তবে শয়তান তার ঘোষিত উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে দিয়ে অশান্তি, অন্যায় আর রক্তপাত অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং মানুষ সুবিচারে, শান্তিতে (ইসলামে) পৃথিবীতে বসবাস করতে পারবে- অর্থাৎ আল্লাহ যা চান। কত সহজ। কাইয়্যেমা শব্দটা এসেছে কায়েম থেকে যার অর্থ চিরন্তন, শাশ্বত, সনাতন। আল্লাহ এই দীনুল কাইয়্যেমার কথা বলে বলছেন- এর বেশি তো আমি আদেশ করিনি ( কোর’আন সুরা আল বাইয়েনাহ্ – ৫)। ‘এর বেশি তো আমি আদেশ করিনি’ তিনি বলছেন এই জন্য যে, তিনি জানেন যে, ঐটুকু করলেই অর্থাৎ তাঁর বিধান ছাড়া অন্য কোনো বিধান মানুষ না মানলেই মানব জাতির মধ্যে পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সামান্য দাবিটুকুই তিনি মানুষের কাছে আদম থেকে আজ পর্যন্ত করে আসছেন। পূর্ববর্তী জীবন-ব্যবস্থাগুলিতেও আল্লাহর দাবি ছিল ঐ সহজ সরল দাবি- দীনুল কাইয়্যেমা, তওহীদ। ভারতীয় ধর্মের অনুসারীদের তারা কোন ধর্মে বিশ্বাসী জিজ্ঞাসা করলে তার জবাব দেবেন সনাতন ধর্ম। সনাতন এবং কাইয়্যেমা একার্থবোধক- যা চিরদিন প্রবাহমান, চিরন্তন ও শাশ্বত, এবং তা ঐ তওহীদ। এর গুরুত্ব এত বেশি যে একে আল্লাহ আমাদের জন্য শুধু প্রতি সালাতে নয় প্রতি রাকাতে অবশ্য করে দিয়েছেন সুরা ফাতেহার মধ্যে। “আমাদের সিরাতাল মুস্তাকীমে চালাও” মুস্তাকীম অর্থ সহজ, সরল ও শাশ্বত।
একটি জাতির মধ্যে চালাক, বোকা, শিক্ষিত, মেধাবী ইত্যাদি সব রকম লোকই থাকবে। তাই আল্লাহ ও তাঁর রসুল যে জাতি সৃষ্টি করলেন তার ভিত্তি করলেন অতি সহজ ও সরল- তওহীদ, একমাত্র প্রভু হিসাবে তাকেই স্বীকার করে নেওয়া। এরই নাম সিরাতাল মুস্তাকীম। আর সহজ বলেই বিশ্বনবীর সৃষ্ট অত্যন্ত অশিক্ষিত জাতিটি, যার মধ্যে লেখাপড়া জানা লোকের সংখ্যা হাতে গোনা যেত তারাও ভিত্তি ও লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা থেকে চ্যুত হননি। এতে করে তাদের মধ্যে যে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো একতা সৃষ্টি হয়েছিল তার সামনে অর্ধ পৃথিবী মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছিল। এভাবে চলেছে ৬০/৭০ বছর যে কথা আল্লাহর রসুল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে তাঁর উম্মাহর আয়ু। বাস্তবিকই ৬০/৭০ বছর পর থেকেই শুরু হলো এই জাতির মৃত্যুর পর্ব, ধ্বংসের পর্ব। এই জাতির মধ্যেও সৃষ্টি হলো পুরোহিত, আলেম- মাওলানা, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, পীর, মাশায়েখ ইত্যাদি শত শত ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণির। অতি বিশ্লেষণের বিষময় ফলে ঐ দীনুল কাইয়্যেমা, সিরাতাল মুস্তাকীম হয়ে গেল অত্যন্ত জটিল, দুর্বোধ্য এক জীবন বিধান, যেটা সম্পূর্ণ শিক্ষা করাই মানুষের এক জীবনের মধ্যে সম্ভব নয়- সেটাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তো বহু দূরের কথা। ফকিহ-মোফাস্সিরদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ফলে জাতির মধ্যে ভয়াবহ বিভেদ সৃষ্টি হয়ে, বিভিন্ন মাজহাব ও ফেরকা সৃষ্টি হয়ে যে অনৈক্য সৃষ্টি হলো তার ফলে পুনরায় একতাবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেল।
সিরাতাল মুস্তাকীমের সহজতার, সরলতার মহা গুরুত্ব উপলব্ধি করে রসুলাল্লাহ (সা.) এক হাদিসে বললেন- দীন সহজ, সরল (সিরাতাল মুস্তাকীম) একে নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করবে তারা পরাজিত হবে। অন্য হাদিসে বললেন, জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে ( হাদিস – আবু হোরায়রা (রা.) থেকে – মুসলিম )। এই সাবধান বাণীতেও আশ্বস্থ না হতে পেরে বিশ্বনবী (সা.) আরও ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনালেন। বললেন- কোর’আনের কোনো আয়াতের অর্থ নিয়ে বিতর্ক কুফর। এবং কোনো অর্থ নিয়ে মতান্তর উপস্থিত হলে আমাদেরকে কী করতে হবে তারও নির্দেশ তিনি আমাদের দিচ্ছেন। বলছেন, কোনো মতান্তর উপস্থিত হলে তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও ( হাদিস- মুসলিম, মেশকাত )। অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে যখনই মতান্তর উদ্ভব হবে তখনই চুপ হয়ে যাবে, কোনো তর্ক-বিতর্ক করবে না। অর্থাৎ বিতর্কে যেয়ে কুফরি করবে না, এবং যে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই সেই সিরাতাল মুস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমাকে আঁকড়ে ধরে থাকো, এখানে লক্ষ্য করার একটা বিষয় আছে, দীনের ব্যাপার নিয়ে বিতর্ককে আল্লাহর রসুল (সা.) কোন পর্যায়ের গুনাহ, পাপ বলে আখ্যায়িত করছেন। চুরি নয়, হত্যা নয়, ব্যভিচার নয়, বলছেন- কুফর। যার চেয়ে বড় আর গোনাহ নেই, শুধু তাই নয় যা একজনকে এই দীন থেকেই বহিষ্কৃত করে দেয়। এতবড় শাস্তি কেন? শেষ নবীর (সা.) হাদিস থেকেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। তিনি বলছেন- তোমরা কি জান, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে? এই প্রশ্ন করে তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছেন- শিক্ষিতদের ভুল, মুনাফিকদের বিতর্ক এবং নেতাদের ভুল ফতোয়া ( হাদিস- মেশকাত )। যে কাজ ইসলামকেই ধ্বংস করে দেয় সে কাজের চেয়ে বড় গোনাহ আর কী হতে পারে! তাই বিশ্বনবী (সা.) এই কাজকে কুফ্রি বলে সঠিক কথাই বলছেন।
এই জাতির মহা দুর্ভাগ্য। আল্লাহর ও তাঁর রসুলের (সা.) এতসব কঠোর সতর্কবাণী এই উম্মাহর পণ্ডিতদের কিছুই মনে নেই। তারা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোর’আন-হাদিসের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে বিরাট বিরাট ফেকাহ শাস্ত্র গড়ে তুলতে থাকলেন। এদের মনীষার, প্রতিভার, অধ্যবসায়ের কথা চিন্তা করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, কিন্তু তাদের ঐ কাজের ফলে এই উম্মাহ ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে গেল, শত্র“র কাছে পরাজিত হয়ে গেল। কাজেই বর্তমানের এই যে মুসলিমরা বিভিন্ন দলে- উপদলে, ফেরকা-মাজহাবে বিভক্ত হয়ে নিজেরা নিজেরা শতমুখী সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে, হানাহানি- মারামারি, বোমাবাজি করছে তার পেছনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে কে? তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ী আলেম-পুরোহিতরাই নয় কি?

ইংরেজদের অন্যতম শাসননীতি

ইংরেজদের অন্যতম শাসননীতি: পদানত জাতির নৈতিক অধঃপতন ঘটানো

রিয়াদুল হাসান
আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে পৃথিবীর যে দেশগুলিই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউরোপীয় জাতিগুলির পদানত হয়েছিল সেই দেশগুলির বর্তমান জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে আমরা একটি সাধারণ দৃশ্য দেখতে পাই। আর তা হলো: এই জনগোষ্ঠী ভয়াবহ নৈতিক অধঃপতনের শিকার। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দেশপ্রেম ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলী ক্রমেই তাদের ভেতর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশের কথাই যদি ধরা হয়, তাহলে দেশে প্রস্তুত যাবতীয় পণ্যের ভেজালের কথা সর্বাগ্রে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রতিটি কর্মে ও বচনে আমাদের মধ্যে ভেজাল ঢুকেছে। আমরা নেহায়েত কিছু আর্থিক সুবিধার আশা করে সত্যকে মিথ্যা, আর মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করি। একারণে দেখা যায়, খাঁটি সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। দেশি পণ্য শুনলেই প্রত্যেকের মনে পণ্যের মান সম্পর্কে একটি সন্দেহের সৃষ্টি হয়। অথচ ইউরোপের যে কোন জিনিসে গধফব রহ ঊহমষধহফ বা এবৎসধহ লেখা থাকলেই অসংকোচে ধরে নেই যে, জিনিসটি খাঁটি হবে। এ বিষয়ে কেউ সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে আগ্রহ দেখায় না। কারণ সে ব্যাপারে সকলেই প্রায় একরকম নিশ্চিত থাকি যে, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের দ্বারা আর যাই হোক ভেজাল ব্যবসা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস কি এমন ছিল? আমরা যদি আমাদের পেছনের ইতিহাস দেখি তাহলে অবাক হতে হবে এই দেখে যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা অধিকাংশই কথা ও কাজে যথেষ্ট নির্ভেজাল ছিলেন। মিথ্যা বলা, কপটতার আশ্রয় নেওয়া বা মানুষের ক্ষতি হবে এমন কোন কাজ তারা কখনই করতেন না। বহু মানুষ সমাজে ছিলেন যারা মিথ্যা কথা বলতেই পারতেন না। কিন্তু আমরা তাদের এই সত্যবাদিতা, ন্যায়-পরায়ণতা ও সরলতা নিয়ে কটাক্ষ করতে দ্বিধা করি না, যদিও আমাদের উচিৎ ছিল তাদের মানবিক গুণাবলী নিয়ে গর্ব করা। মানুষ কতটা বড় তা বোঝা যায় তখনই যখন কথায় ও কাজে সে খাঁটি থাকে। আমাদের পূর্বপুরুষগণ সেই পরীক্ষায় বরাবরই উত্তীর্ণ ছিলেন। অথচ আজ আমাদের এত করুণ অবস্থায় দিনানিপাত করতে হচ্ছে। এর পেছনে বহু খ্যাতনামা পণ্ডিত বহু ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন, আলোচনা-সমালোচনা বা গবেষণা করে এক বা একাধিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন, তবে গোড়ার কথায় গেলে এটা সবাই মানতে বাধ্য থাকবেন যে, আমাদের যাবতীয় নৈতিক অধঃপতন শুরু হয়েছে এবং বিস্তার লাভ করেছে মূলত ইংরেজ শাসনামলে, আর তারই চূড়ান্ত বিস্তার আমরা প্রত্যক্ষ করছি বর্তমানে এসে। ইংরেজের শাসনে প্রায় দুইশ’ বছর থেকে আমরা আমাদের অনেক কিছুর সঙ্গে সত্যবাদিতাও হারিয়ে ফেলেছি। এটা কেবল সময়ের কালচক্রে সংঘটিত মানুষের সামাজিকীকরণের ফল নয়, এটা একটা ষড়যন্ত্রের ফসল। সাম্রাজ্যবাদীদের সাম্রাজ্যকে স্থায়ী করার নিমিত্তে প্রজাদের মনোবল বা আত্মিক শক্তি বিনষ্টকরণ হচ্ছে একটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত উপকরণ। ইতিহাসে এর যথেষ্ট ব্যবহার হয়েছে। এরই পুনরাবৃত্তি হিসেবে ইংরেজরা কিভাবে আমাদেরকে মিথ্যা বলার ও নানারূপ চরিত্রহীনতার দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে, তা এক হৃদয়বিদারক ইতিহাস।
আমাদের শিল্প-বাণিজ্য যেমন ইংরেজ শাসনে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, চরিত্রও তেমনি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ চালিত সরকারের উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে অমানুষ করা, মানুষ করা নয়। আর সে আশাও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী সরকারের কাছে করা যেতে পারে না। যারা ইংরেজ রাজত্বের মহিমা ও প্রশংসায় পঞ্চমুখ তারা যে জেনে বুঝে সত্যকে গোপন করছেন তাতে সন্দেহ নেই। তাদের কথা যে কতটা অযৌক্তিক, অসত্য, অমূলক, হীনম্মন্যতায় আচ্ছন্ন ও ভিত্তি-বর্জিত। প্রায় দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের গুণে, কোর্ট, কাছারি, অফিস, আদালত, রাজনৈতিক ইশতেহারে, বিজ্ঞাপনে, মঞ্চে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, চলনে-বলনে, ধর্মের নামে সবখানে আজ মিথ্যা আর দুর্নীতির ছড়াছড়ি। মিথ্যা দিয়ে মুষ্টিমেয় লোক লাভবান হতে পারে, কিন্তু দেশ ও জাতি চরিত্রহীনতার কারণে আজ সব দিক দিয়ে ক্ষতির মধ্যে নিপতিত।

প্রযুক্তির কালো দিক এবং আপনার সন্তান

প্রযুক্তির কালো দিক এবং আপনার সন্তান

কাজী আবদাল্লাহ আল মাহফুজ
ইদানিং স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহী দেখা যায়। এটা ঠিক যে বর্তমান যুগের সাথে তাল মেলাতে গেলে তাদের এমন আগ্রহ থাকা খুব স্বাভাবিক। তাদের বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষতার জন্য কমপিউটার খুবই জরুরি এটাও ঠিক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অভিভাবকগণ আদরের সন্তানকে অনেকটা আগ্রহ করেই কম্পিউটার কিনে দিচ্ছেন। অভিভাবকগণ নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন সন্তানকে কম্পিউটার কিনে দেয়ার পর তার একটি নতুন বায়না- ইন্টারনেট সংযোগ। হ্যাঁ, ইন্টারনেট ছাড়া সে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে পা রাখতে পারবে না এটাও ঠিক। আবার দেখা যাচ্ছে আপনার আদরের ছেলে বা মেয়ে বায়না ধরেছে একটি স্মার্ট ফোন বা ভিডিও দেখা যায় এমন মোবাইল সেট কিনে দেয়ার জন্য। আপনি অনেক খেটে খুটে বাজারের খরচ থেকে পয়সা বাঁচিয়ে তার আবদার হয়তো পূরণ করেছেন। এর সবই আপনি করেছেন সন্তানের ভাল বিবেচনা করে; আপনার সন্তান যেন আধুনিক যুগের একজন সুনাগরিক হয় এ কথা ভেবে।
সন্তানের মঙ্গল কামনায় এই যে এতকিছু করলেন, এসব আপনার সন্তানকে সুনাগরিক হতে কতটুকু সাহায্য করছে তা কি একবার খোঁজ নিয়ে দেখেছেন? যে ছেলে বা মেয়েটি একসময় সবার সাথে হেসে খেলে বেড়াত, এখন সে মহাব্যস্ত কম্পিউটার অথবা মোবাইল ফোন নিয়ে। যাকে একসময় ধরে বেঁধে পড়ার টেবিলে বসানো যেতো না সে এখন তার পড়ার টেবিল অর্থাৎ কম্পিউটার থেকে উঠতেই চায় না, বরং গভীর রাত পর্যন্ত সে অনেক ‘লেখাপড়া’ করে। যে ছেলে বা মেয়েটি এক সময় সবাইকে অস্থির করে ফেলত সে এখন একাকী চিলেকোঠায় বা নির্জনে বসে মোবাইল ফোন ঘাটাঘাটিতে ব্যস্ত। আপনি হয়তো তার এই অভূতপূর্ব পরিবর্তে খুব সস্তিতে আছেন যাক আমার সন্তান খুব শান্তশিষ্ঠ হয়ে গেছে! কিন্তু… একবারও কি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন আপনার আদরের সন্তানটি রাতের পর রাত কম্পিউটারে বসে অথবা মোবাইল ফোন হাতে নির্জনে বসে কতটুকু সুনাগরিক হয়েছে? আমি হলফ করে বলতে পারি আপনার ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে ছেলে বা মেয়েটি দিনের পর দিন কম্পিউটার বা মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে সে স্ত্রী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে আপনাদের চেয়ে বেশী জ্ঞানার্জন করে ফেলেছে। অনেকটা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পি.এইচডি করে ফেলার মত। সে হতে পারে আপনার কাছে পুচকে সন্তান সিক্স, সেভেন, এইট বা ইন্টারমিডিয়েটে পড়ুয়া।
শুধু ইন্টারনেট নয়, আপনার বাড়ির আশপাশেই অলি-গলির মোবাইলে ডাউনলোড করা হয়, অথবা ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া দেওয়া হয় এমন দোকানগুলোতেও নষ্ট ছবির ছাড়াছড়ি। এবং হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন সেসব দোকানে বালক, কিশোর, তরুন ছেলেমেয়েদের খুব বেশী আনাগোনা, আড্ডার স্থল। আপনার ছেলে বা মেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার না করলেও খুব সহজে সেখান থেকে খারাপ সিনেমা, ছবি ইত্যাদি পেয়ে যাচ্ছে।
যে সকল অভিভাবক ইন্টারনেট বা আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা আমার সাথে অবশ্যই একমত হবেন, অন্তত সত্যের খাতিরে। কিন্তু যারা এসবের কোন জ্ঞান রাখেন না, তারা হয়তো আমার কথা বিশ্বাস করবেন না অথবা আশ্চর্য হবেন। আমি বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করে দিই যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা কিভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?
ইন্টারনেট এমন একটা মাধ্যম, যাতে ভালোর চেয়ে খারপ জিনিস (সাইট) বেশি এবং যারা এর নিয়ন্ত্রক তারা ইচ্ছে করেই এমনটি করে রেখেছে। আপনি চান আর না চান, খারাপ জিনিস (সাইট) গুলো আপনার সামনে এমনিতেই এসে হাজির হবে। যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয় তাহলে আমার কথামতো পরখ করে দেখুন।
প্রথম পরখ: যে কোন কারণে হোক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি দরকার এবং যে ছবি ইন্টারনেট থেকে আপনি খুব সহজেই পেতে পারেন। মনে রাখুন আমরা একটি ভাল উদ্দেশ্যে যাত্রা করছি। এবার ইন্টারনেটের যে কোন একটি ব্রাউজার ওপেন করুন এবং গুগল সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে ওসধমব ট্যাব সিলেক্ট করুন। এবার hasina লিখে এন্টার দিন। আপনার ইন্টারনেট স্পিড ভালো থাকলে দেখবেন প্রধানমন্ত্রীর ছবি, সাথে সাথে আরো অনেক হাসিনার ছবি কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে উঠবে। মাউস স্ক্রল করে এবার দেখতে থাকুন। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না নিশ্চয়ই। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া যদি একবার অন্য কোন হাসিনার ছবির উপর ক্লিক করেন তাহলে দেখবেন সে হাসিনা আপনাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয় পরখ: গুগল সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে বাংলা করে নিন। আপনি বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চান। নিশ্চয়ই একটি ভাল কাজ, দেশ সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনি ইন্টানেটের সহায়তা নিতেই পারেন। অতি উত্তম কাজ। এজন্য আপনি ইরেজিতে বাংলাদেশ বানান করে লিখুন বেশীদূর লিখতে হবে না- শুধু নধ লিখুন এবং দেখুন সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাল কিছু পান না খারাপ কিছু পান। এত খারাপ কিছু পাবেন যা আপনি জীবনে কল্পনাও করতে পারেন নি।
এবার ভাবুন আপনার আদরের সন্তানকে আধুনিক যুগের আধুনিক নাগরিক হাওয়ার জন্য তার হাতে কি তুলে দিয়েছেন। রাতের পর রাত জেগে বা নির্জনে বসে কম্পিউটার বা মোবাইলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনার স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া ছেলে বা মেয়েটির পড়াশুনার বিষয়বস্তু কী হতে পারে এবার ভেবে দেখুন। হয়তো ভাবছেন আপনার ছেলেমেয়ে এমন নয় শুধু একটি কথা বলবো আমাদের সমাজে এমন কোন নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয় না যে আপনার ছেলেমেয়ে চরিত্রবান ও সুশিক্ষিত হয়েছে।
এবার আসি যাদের কম্পিউটারে ইন্টারনেটের বালাই নেই। তাদের সন্তানদের কাছে যদি স্মার্ট ফোন বা ভিডিও দেখা যায় এমন কোন ফোন থাকে তাহলে? জেনে রাখুন এখনকার মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো কলরেটের চেয়ে কম রেটে ইন্টারনেট সুবিধা দেয় আর এখনকার বেশীরভাগ ফোনেই ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর সুবিধা আছে। আর আগেই বলেছি মহল্লার ভিডিও সিডি যারা ভাড়া দিয়ে থাকে অথবা যে সকল দোকানে মোবাইলে, গান ছবি ইত্যাদি ডাউনলোড করা হয় লেখা থাকে, নিজে না পারলেও অন্যদের মারফৎ খোঁজ-খবর নিয়ে দেখুন আপনার ছেলেমেয়েরা কিভাবে নষ্ট ছবি, সিনেমা তার মোবাইলে বা কম্পিউটারে লোড করে নিচ্ছে।

প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন

প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন

ওবাইদুল হক বাদল
ব্রিটেনের বিচার মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পরিসংখ্যান বিভাগ কিছুদিন আগে এক ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর ইংল্যান্ডে ৮৫ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া আরও ৪ লাখ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, ২০১২/১৩ সালে ৩৫ ভাগ যৌন অপরাধ ঘটেছে শিশুদের বিরুদ্ধে, যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের ৯০ ভাগ নারীই পরিচিত লোকদের লালসার শিকার। শুধু খোদ ব্রিটেন নয় পশ্চিমা সভ্যতার ধারক-বাহক প্রায় দেশেই একই অবস্থা। আমেরিকার জাতীয় আইন বিভাগের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতি বছর ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৮৬৮ জন নারী ধর্ষিত হয়। উপরোক্ত পরিসংখ্যান যে কোন সুস্থ ও চিন্তাশীল মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আর মানবজাতির জন্য এ এক বিরাট লজ্জা। এই অবস্থার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্মার্ট ফোন ও ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। ৫৪ ভাগ কিশোর পর্নোগ্রাফিতে মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক প্রযুক্তি একদিকে যেমন জীবনকে সহজলভ্য করছে অন্যদিকে এর অপব্যবহার মানুষকে পশুবৎ আচরণ করতে বাধ্য করছে। কোন জিনিস ভালো কি মন্দ তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই জিনিসের ব্যবহারের ওপর। একটা অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি বা খুন করা যায়, সেই অস্ত্রই খুনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে অসহায়কে রক্ষা করা যায়। অস্ত্র নিজে দায়ী নয়, যে সেটাকে ব্যবহার করবে সে দায়ী। পাশ্চাত্য সভ্যতা বর্তমানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে অন্যায়ভাবে। রেডিও-টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মানুষকে ভালো অনেক কিছুই শিক্ষা দিতে পারত কিন্তু এগুলি বর্তমানে মানুষকে হত্যা, সহিংসতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপরাধ, নগ্ন যৌনতা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে তাকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে দিচ্ছে। এই যৌনতা, নগ্নতা, বেহায়পনা, শিশু নির্যাতন-এক কথায় সমস্ত রকম অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধের জন্য অনেক সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র্যালি, সমাবেশ, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টকশো প্রভৃতি করা হচ্ছে, বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, প্রচলিত আইন কঠোর থেকে কঠোরতর করা হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে দিন দিন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলোচকগণের সামনে ভয়ঙ্কর রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তারা প্রচলিত মূল্যবোধের বাইরে কোন কথা বলেন না। প্রচলিত মূল্যবোধে কখনও বর্তমানের এ সমস্ত অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধ হবে না। তার প্রমাণ পরিসংখ্যান। অথচ আমরা যদি একটু পিছন দিকে তাকাই, যে সময় স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ পৃথিবীতে কার্যকর ছিল তখন যুবতী নারী গায়ে স্বর্ণের অলঙ্কার আচ্ছাদিত করে শত শত মাইল নির্ভয়ে অতিক্রম করত। বর্তমানে যা কল্পনাও করা যায় না। কল্পনা করা যাক বা না যাক, স্বীকার করা হোক বা নো হোক- এর পরিণতি থেকে আমরা রেহাই পাচ্ছি না। বাইরে আমরা খুবই চাকচিক্য চেহারা আর সুখী সুখী ভাব দেখালেও অন্তরের দিক থেকে চূড়ান্ত দৈন্যতায় ভুগছি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর আত্মহত্যার তালিকার দিকে তাকালেই আমরা এই বাস্তবতা টের পাই। মানুষ সাধারণত পরিসংখ্যান দেখে চোখ ছানাবড়া করে ফেলে, কিন্তু পরিবেশের সাথে মিশে থাকায় উপলব্ধি করে কম। যার কারণে মানুষের ঐ শক্তিটুকু ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যায়। কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে এই সভ্যতার ভেতরটা এতই ফাঁপা হয়ে গেছে যে সামান্য বাতাসেই এটি যে কোন সময় ধূলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে নৈতিকতাহীনতার এই নারকীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে, সভ্যতাকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রচলিত মূল্যবোধ ত্যাগ করে মানুষের সামনে স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সামাজিক অবক্ষয়

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সামাজিক অবক্ষয়

মোখলছেুর রহমান
ইংরেজদের শাসন প্রতিষ্ঠার আগে উপমহাদেশ শাসন করতেন মুসলিম বাদশাহ, সুলতান ও নবাবরা। তার আগে ছিল হিন্দু রাজাদের শাসন। তারও আগে এদেশে বৌদ্ধদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল বলে জানা যায়। ইংরেজদের আগ পর্যন্ত যারাই উপমহাদেশ শাসন করেছেন মূলত ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশাসনের উপর ভিত্তি করেই তা করেছেন। ইংরেজদের আগমনের পরে রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের নিজেদের আইনে পরিচালিত হলেও সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থা পরিচালিত হত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন দিয়েই। বহু বছরের শাসনে তারা তাদের তৈরি শাসনব্যবস্থা, আইন ও দণ্ডবিধি, অর্থনীতি ইত্যাদি আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেও এদেশীয় সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তখনো বিদ্যমান ছিল। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনটা ঘটেছে একেবারে ইদানীংকালে। ৩০০ বছরের শাসনে যে কাজটি তারা করতে পারে নি, তাই ঘটেছে বিগত কয়েক দশকে, স্বাধীনতার পর। আর তারা এই কাজটি করেছে মূলত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পশ্চিমাদের প্রাচীন অসভ্য সংস্কৃতি তথা নগ্নতা, অশ্লীলতা, ও বেহায়াপনা। এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তা চেতনাকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে যে আজ এই অশ্লীলতাই সবার কাছে আধুনিকতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা পাশ্চাত্যের সুদূরপ্রসারী এক ষড়যন্ত্র।
কোন জাতির উপর কর্তৃত্ব করার একটি অন্যতম উপায় হল তার উপর নিজেদের সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়া বা গ্রহণযোগ্য করে তোলা। উপমহাদেশসহ সারা পৃথিবীতে পশ্চিমা বিশ্ব এই কাজটি করেছে অত্যন্ত সুচতুরভাবে। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট ও অন্যান্য তথ্য ও বিনোদন মাধ্যম দিয়ে তারা এই দেশের যুব সমাজকে প্রভাবিত করেছে। আর আমাদের অসতর্কতা, উদাসীনতা ও অনেকক্ষেত্রে আগ্রহী মনোভাব ধীরে ধীরে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আমাদের চলচ্চিত্রে নগ্নতা ঢুকেছে বহু বছর আগেই। ইদানীং বিজ্ঞাপনচিত্রগুলো বিশেষ করে মোবাইল অপারেটর বা প্রসাধনী কোম্পানিসহ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনচিত্রেও খুবই সতর্কভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই অশ্লীলতা। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি কার্টুনগুলোতে যেসব নারী চরিত্র সৃষ্টি করা হয় তাও এই ষড়যন্ত্রের বাইরে নয়, যা শিশুদের মাঝে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগে তরুণ-তরুণীদের কাছে এই অপসংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই। পশ্চিমাদের এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তপ্রায়। এর ফলও আমরা পাচ্ছি হাতেনাতে। বাংলাদেশ, ভারতসহ এই অঞ্চলে যেখানে এক সময় মানুষের জীবন পরিচালিত হত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের উপর ভিত্তি করে, আজ সেখানে স্থান করে নিয়েছে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো সাংঘাতিক ঘটনাগুলো। এটা বর্তমানে এতটা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে যে বিভিন্ন সময়ে সুশীল, মুক্তচিন্তার অধিকারী বলে পরিচিত যে ব্যক্তিরা পশ্চিমা সংস্কৃতির আগমনকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, তারাও এখন আতংকিত হয়ে উঠেছেন।
একটা বিষয় আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধসমূহের মূল কারণ আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের অবক্ষয় এতটা মারাত্মক রূপ লাভ করেছে যে তা আইন জারি করে বা শাস্তি দিয়ে দূর করা যাবে না। কারণ এই সমস্যাটি যতটা না শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক। এই ব্যাধি দূর করতে হলে অবশ্যই আমাদের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এই অবাধ আগ্রাসন রোধ করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে আমাদের ঐতিহ্যময় ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধ। তবে এক্ষেত্রে সরকারই পারে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে। কারণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা কেবল রাষ্ট্রশক্তির পক্ষেই সম্ভব।

আজ আমরা কার ইবাদত করছি


আজ আমরা কার ইবাদত করছি

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
পবিত্র কোর’আনে আল্লাহর ঘোষণা, আমি জ্বীন এবং ইন্সানকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি (সুরা যারিয়াত ৫৬)। এই ইবাদত বলতে প্রায় সবাই সালাহ, সওম প্রভৃতি মনে করে। এই ধারণা সঠিক নয়। সালাহ, সওম ইত্যাদি হচ্ছে প্রকৃত ইবাদতের আনুষাঙ্গিক কাজ। আল্লাহ কোর’আনে এরশাদ করেছেন, আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাহ কায়েম কর (সুরা ত্বাহা, আয়াত-১৪)। পবিত্র কোর’আনের এই আয়াতে আল্লাহ প্রথমে তাঁর সার্বভৌমত্বের মালিক, নিজেকে মানবজাতির একমাত্র হুকুমদাতা হিসাবে ঘোষণা দিলেন। ইলাহ বলতে বর্তমানে মনে করা হয় উপাস্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। ইলাহ হচ্ছেন সেই সত্তা যার হুকুম শুনতে হবে এবং পালন করতে হবে। এক কথায় জীবনের যে কোন অঙ্গনে যেখানে আল্লাহর কোন বক্তব্য আছে সেটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজৈেনতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি যে বিভাগেই হোক না কেন সেখানে আর কারও কোন বক্তব্য গ্রহণ করা যাবে না অর্থাৎ তওহীদ; আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। এরপর এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর ইবাদত করার কথা বললেন এবং পরিশেষে তাঁর স্মরণার্থে সালাহ কায়েমের কথা বললেন। আলোচ্য আয়াতে এটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ইবাদত ও সালাহ অর্থাৎ উপাসনা এক জিনিস নয়।
তাহলে ইবাদত কী? ইবাদত হচ্ছে যে জিনিসকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেই কাজ করাই হচ্ছে ঐ জিনিসের ইবাদত। প্রশ্ন হলো- আল্লাহ আমাদের কি কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন? এর উত্তর আমরা পবিত্র কোর’আন থেকেই পাচ্ছি। কোর’আনের সুরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহর ঘোষণা, আমি মানুষকে আমার খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছি। খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধির কাজ হচ্ছে একজনের কাজ তিনি না কোরে তার হয়ে আরেকজন করা। তাহলে কোর’আনে আল্লাহ বললেন তিনি আমাদেরকে খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ পৃথিবীতে আল্লাহ নিজে যে কাজটি করতেন সেই কাজটি তিনি না কোরে তা আমাদের দিয়ে করাবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর কী কাজ? তিনি কি নামাজ, রোজা করেন? নিশ্চয় না। তাঁর কাজ হলো: তাঁর সৃষ্টজগতকে শাসন করা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এ কাজটি নিজে না কোরে মানুষকে দিয়ে করাবেন। তাই তিনি কোর’আনে ঘোষণা করেছেন আমি মানুষকে আমার খলিফা হিসাবে সৃষ্টি করেছি। তাহলে ইবাদতের সংজ্ঞা অনুযায়ী আল্লাহ্র খেলাফত করাই হচ্ছে মানুষের ইবাদত। অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া বিধান দিয়ে পৃথিবী শাসন করাই হচ্ছে খেলাফতের কাজ, কিন্তু মানুষ আজ এই খেলাফতের কাজ করছে না অর্থাৎ আল্লাহ্র ইবাদত করছে না। অথচ আল্লাহ্ আমাদেরকে মূলত: তাঁর ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এই মুসলিম নামক জাতিটি আল্লাহর প্রকৃত ইবাদত কী তা না জেনে, না বুঝে নামাজ রোজা কোরে ভাবছে খুব ইবাদত করছি।
প্রকৃতপক্ষে তারা কার ইবাদত করছে, কার প্রতিনিধিত্ব বা খেলাফত করছে? সত্য হচ্ছে এই যে, মুসলিম নামধারী জনসংখ্যাটিসহ গোটা মানবজাতি এখন ইহুদি-খ্রিস্টানদের তৈরি আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থাৎ সামগ্রিক জীবন পাশ্চাত্যদের, তথা ইহুদী-খ্রিস্টান সভ্যতার বিধান, মতবাদ অনুযায়ী পরিচালিত করছে। সুতরাং মানুষ এখন ইহুদি-খিস্টান ‘সভ্যতা’ তথা দাজ্জালেরই ইবাদত কোরে চোলেছে।