Tuesday, June 2, 2015

ইংরেজদের অন্যতম শাসননীতি

ইংরেজদের অন্যতম শাসননীতি: পদানত জাতির নৈতিক অধঃপতন ঘটানো

রিয়াদুল হাসান
আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে পৃথিবীর যে দেশগুলিই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউরোপীয় জাতিগুলির পদানত হয়েছিল সেই দেশগুলির বর্তমান জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে আমরা একটি সাধারণ দৃশ্য দেখতে পাই। আর তা হলো: এই জনগোষ্ঠী ভয়াবহ নৈতিক অধঃপতনের শিকার। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দেশপ্রেম ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলী ক্রমেই তাদের ভেতর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশের কথাই যদি ধরা হয়, তাহলে দেশে প্রস্তুত যাবতীয় পণ্যের ভেজালের কথা সর্বাগ্রে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রতিটি কর্মে ও বচনে আমাদের মধ্যে ভেজাল ঢুকেছে। আমরা নেহায়েত কিছু আর্থিক সুবিধার আশা করে সত্যকে মিথ্যা, আর মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করি। একারণে দেখা যায়, খাঁটি সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। দেশি পণ্য শুনলেই প্রত্যেকের মনে পণ্যের মান সম্পর্কে একটি সন্দেহের সৃষ্টি হয়। অথচ ইউরোপের যে কোন জিনিসে গধফব রহ ঊহমষধহফ বা এবৎসধহ লেখা থাকলেই অসংকোচে ধরে নেই যে, জিনিসটি খাঁটি হবে। এ বিষয়ে কেউ সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে আগ্রহ দেখায় না। কারণ সে ব্যাপারে সকলেই প্রায় একরকম নিশ্চিত থাকি যে, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের দ্বারা আর যাই হোক ভেজাল ব্যবসা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস কি এমন ছিল? আমরা যদি আমাদের পেছনের ইতিহাস দেখি তাহলে অবাক হতে হবে এই দেখে যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা অধিকাংশই কথা ও কাজে যথেষ্ট নির্ভেজাল ছিলেন। মিথ্যা বলা, কপটতার আশ্রয় নেওয়া বা মানুষের ক্ষতি হবে এমন কোন কাজ তারা কখনই করতেন না। বহু মানুষ সমাজে ছিলেন যারা মিথ্যা কথা বলতেই পারতেন না। কিন্তু আমরা তাদের এই সত্যবাদিতা, ন্যায়-পরায়ণতা ও সরলতা নিয়ে কটাক্ষ করতে দ্বিধা করি না, যদিও আমাদের উচিৎ ছিল তাদের মানবিক গুণাবলী নিয়ে গর্ব করা। মানুষ কতটা বড় তা বোঝা যায় তখনই যখন কথায় ও কাজে সে খাঁটি থাকে। আমাদের পূর্বপুরুষগণ সেই পরীক্ষায় বরাবরই উত্তীর্ণ ছিলেন। অথচ আজ আমাদের এত করুণ অবস্থায় দিনানিপাত করতে হচ্ছে। এর পেছনে বহু খ্যাতনামা পণ্ডিত বহু ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন, আলোচনা-সমালোচনা বা গবেষণা করে এক বা একাধিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন, তবে গোড়ার কথায় গেলে এটা সবাই মানতে বাধ্য থাকবেন যে, আমাদের যাবতীয় নৈতিক অধঃপতন শুরু হয়েছে এবং বিস্তার লাভ করেছে মূলত ইংরেজ শাসনামলে, আর তারই চূড়ান্ত বিস্তার আমরা প্রত্যক্ষ করছি বর্তমানে এসে। ইংরেজের শাসনে প্রায় দুইশ’ বছর থেকে আমরা আমাদের অনেক কিছুর সঙ্গে সত্যবাদিতাও হারিয়ে ফেলেছি। এটা কেবল সময়ের কালচক্রে সংঘটিত মানুষের সামাজিকীকরণের ফল নয়, এটা একটা ষড়যন্ত্রের ফসল। সাম্রাজ্যবাদীদের সাম্রাজ্যকে স্থায়ী করার নিমিত্তে প্রজাদের মনোবল বা আত্মিক শক্তি বিনষ্টকরণ হচ্ছে একটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত উপকরণ। ইতিহাসে এর যথেষ্ট ব্যবহার হয়েছে। এরই পুনরাবৃত্তি হিসেবে ইংরেজরা কিভাবে আমাদেরকে মিথ্যা বলার ও নানারূপ চরিত্রহীনতার দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে, তা এক হৃদয়বিদারক ইতিহাস।
আমাদের শিল্প-বাণিজ্য যেমন ইংরেজ শাসনে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, চরিত্রও তেমনি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ চালিত সরকারের উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে অমানুষ করা, মানুষ করা নয়। আর সে আশাও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী সরকারের কাছে করা যেতে পারে না। যারা ইংরেজ রাজত্বের মহিমা ও প্রশংসায় পঞ্চমুখ তারা যে জেনে বুঝে সত্যকে গোপন করছেন তাতে সন্দেহ নেই। তাদের কথা যে কতটা অযৌক্তিক, অসত্য, অমূলক, হীনম্মন্যতায় আচ্ছন্ন ও ভিত্তি-বর্জিত। প্রায় দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের গুণে, কোর্ট, কাছারি, অফিস, আদালত, রাজনৈতিক ইশতেহারে, বিজ্ঞাপনে, মঞ্চে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, চলনে-বলনে, ধর্মের নামে সবখানে আজ মিথ্যা আর দুর্নীতির ছড়াছড়ি। মিথ্যা দিয়ে মুষ্টিমেয় লোক লাভবান হতে পারে, কিন্তু দেশ ও জাতি চরিত্রহীনতার কারণে আজ সব দিক দিয়ে ক্ষতির মধ্যে নিপতিত।

No comments:

Post a Comment