জান্নাতি ফেরকা: মৃত জাতির আশার আলো-
মোহাম্মদ আসাদ আলী:
এক সময় সমস্ত পৃথিবীর একক পরাশক্তি ছিল মোসলেম নামক জাতিটি। তারা ছিল সীসাঢালা প্রাচীরের মত ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য অর্জনে আপসহীন। সংকল্পে, শৃঙ্খলায়, আত্মত্যাগে, মহত্ত্বে, সর্বোপরি যুদ্ধবিদ্যায় এতটাই দক্ষ ও পারদর্শী ছিল যে তাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর মত সাহস কোন জাতির ছিল না। তাদের নাম শুনলে শত্র“র অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো। তাদের পরশে অর্ধপৃথিবী শান্তিপুরীতে পরিণত হোয়েছিল। কিন্তু আজ তারা শতধাবিভক্ত, বিচ্ছিন্ন, পরাজিত আল্লাহর লা’নতপ্রাপ্ত একটা মৃত জাতি। সমস্ত পৃথিবীজুড়ে এরা আজ লাঞ্ছিত, অত্যাচারিত, অসহায় জীবন যাপন কোরছে। একসময়ের পরাশক্তি আজ পৃথিবীবাসীর ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হোয়েছে। ইহুদি-খ্রিস্টানরা এদেরকে নিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলছে। এই অবস্থার কারণ কি?
এ অবস্থার কারণ খুঁজতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। বর্তমানে মোসলেম নামক এই জনসংখ্যাটির ব্যক্তিগত জীবনের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার এলাহ (হুকুমদাতা) হোলেন আল্লাহ, আর জাতীয়, রাষ্ট্রীয় জীবনের এলাহ হোল দাজ্জাল তথা ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’। সমস্ত পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির মত এই মোসলেম নামধারী জাতিটিও আজ এই প্রতারক ‘সভ্যতা’র গোলামে পরিণত হোয়েছে, অর্থাৎ দাজ্জালকে প্রভু (রব) বোলে মেনে নিয়েছে। দাজ্জালের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিকে গ্রহণ কোরে এই জাতি আজ জাতীয় জীবন থেকে এসলামকে প্রত্যাখ্যান কোরে কার্যত কাফের মোশরেকে পরিণত হোয়েছে। তাই সমস্ত জাতীর উপর দিয়ে বোয়ে চোলেছে আল্লাহ এবং তাঁর মালায়েকের অভিশাপের ঝড়। এই জাতি পৃথিবীর যেখানেই আছে সেই দেশের মানুষ দিয়ে অত্যাচারিত হোচ্ছে, অপমানিত হোচ্ছে, লাঞ্ছিত হোচ্ছে। ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি বড় বড় জাতিগুলি দিয়ে নির্যাতিত কোরেও ক্ষান্ত না দিয়ে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন আল্লাহ ভারতের আসামের ছোট একটি গাছ পাথরের উপাসক পাহাড়ী উপজাতিকে দিয়েও এই জাতিকে গুলি কোরে, তীর দিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করাচ্ছেন, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছেন, উচ্ছেদ করাচ্ছেন। এ যদি আল্লাহর লান’ত না হয় তাহলে লা’নত কাকে বলে?
তবে আশার কথা হোলো এই কালো অধ্যায়ের পরিসমাপ্তিও সন্নিকটে। কারণ অধঃপতিত মোসলেম নামধারী এই জাতি অচিরেই জেগে উঠবে এনশা’আল্লাহ। তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া আকিদা ফিরে পাবে। শত্র“র অন্তরে ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং নিজেদের মধ্যে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ চরিত্র তারা আবারো ফিরে পাবে। এর কয়েকটি যৌক্তিক এবং অকাট্ট কারণ রোয়েছে।
প্রথম কারণ: রসুলাল্লাহর উপাধি ‘রহমাতাল্লেল আলামিন’
আল্লাহ তাঁর রসুলকে কোর’আনে রহমাতাল্লিল আলামিন বোলেছেন। ‘রহমাতাল্লেল আলামিন’ শব্দের অর্থ হলো (পৃথিবীর) জাতি সমূহের উপর (আল্লাহর) রহমত। এখন প্রশ্ন হোচ্ছে আজ পৃথিবীর দিকে চেয়ে দেখুন দেখি। কোথায় সে রহমত? পৃথিবীর সর্বত্র অশান্তি, হাহাকার, অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত, বুক ভাঙা দুঃখ। মানুষের ইতিহাসে বোধহয় একত্রে একই সঙ্গে দুনিয়ার এত অশ্র“, এত অশান্তি কখনো ঘটেনি। নবী করিমের (দ:) আগেও বোধহয় পৃথিবীর একখানে অশান্তি থাকলে অন্যখানে খানিকটা শান্তি থাকতো। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ পৃথিবী ছোট, আজ একই সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যে রক্তারক্তি-অশান্তি হোচ্ছে তা ইতিহাসে বোধহয় আর কখনো হয় নি। ইতিহাসে ত্রিশ বছরের মধ্যে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ কোরে ষোল কোটি মানুষ এবং তারপর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কোটি মানুষ এত কম সময়ের মধ্যে কখনই হতাহত হয় নি। এত অন্যায়ও মানুষের ইতিহাসে আর কখনো হোয়েছে কিনা সন্দেহ। তার চেয়েও বড় কথা, মানব জাতি আণবিক যুদ্ধ কোরে আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা আজকের, বর্তমানের। রসুলাল্লাহর (দ:) পৃথিবীতে আসার চৌদ্দশ’ বছর পর। তাহোলে তিনি কেমন কোরে পৃথিবীর মানুষের জন্য রহমত? এর জবাব হোচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাকে (দ:) যে জীবন ব্যবস্থা, দীন দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সেই দীন মানব জাতির উপর সমষ্টিগতভাবে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা কোরলে যে শান্তি, সুবিচার, নিরাপত্তা মানুষের জীবনে নেমে আসবে সেটা হলো আল্লাহর রহমত, তার দয়া। কারণ তিনি ঐ জীবন ব্যবস্থা না দিলে মানুষ কখনই তা নিজেরা তৈরী কোরে নিতে পারতো না, যদি কোরত তবে তা সীমাহীন অশান্তি আর রক্তপাত ডেকে আনতো, যেমন আজ কোরছে। সেই জীবন ব্যবস্থা, দীন, সংবিধান তিনি যার মাধ্যমে মানুষকে দিলেন তাকে তিনি উপাধি দিলেন ‘রহমাতাল্লেল আলামিন’। কিন্তু যতদিন না সমগ্র মানব জাতি নিজেদের তৈরী জীবন ব্যবস্থা সমূহ পরিত্যাগ কোরে মোহাম্মদের (দ:) মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োগ কোরবে ততদিন তারা সেই অশান্তি, অন্যায় (ফাসাদ) ও যুদ্ধ, রক্তপাতের (সাফাকুদ্দিমা) মধ্যে ডুবে থাকবে, আজকের মত এবং ততদিন বিশ্বনবীর (দ:) ঐ উপাধি অর্থবহ হবে না, অর্থপূর্ণ হবে না এবং আজও হয় নি। তার উম্মাহ ব্যর্থ হোয়েছে তার (দ:) উপাধিকে পরিপূর্ণ অর্থবহ কোরতে। তবে এনশা’আল্লাহ সেটা হবে, সময় সামনে। স্রষ্টার দেওয়া উপাধি ব্যর্থ হোতে পারে না, অসম্ভব। সুতরাং আজ হোক আর কাল হোক সমস্ত মানবজাতি তাঁকে আল্লাহর রসুল হিসাবে মেনে নেবে। এবং তাঁর মাধ্যমে পাঠানো দীনুল হক কে তাদের সমষ্টিগত জীবনে কার্যকর কোরবে।
দ্বিতীয় কারণ: আসছে নবুয়তের আদলে খেলাফত
আল্লাহর রসুল ভবিষ্যদ্বাণী কোরেছিলেন, “আল্লাহ যতদিন চান ততদিন তোমাদের মাঝে নবুওয়াত থাকবে (অর্থাৎ তিনি নিজেই), তারপর আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর আসবে নবুওয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত। যতদিন আল্লাহ চান ততদিন তা থাকবে তারপর আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর আসবে মুলকান (রাজতন্ত্র), যতদিন আল্লাহ চান ততদিন তা থাকবে অতপর আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর আসবে জাবারিয়াত (শক্তি প্রয়োগ, জোর-জবরদস্তিমূলক শাসন)। এরপর আবারো আসবে নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত।” (দালায়েলুম নবুয়াত, বায়হাকী, মুসনাদ-আহমদ বিন হাম্বল, মেশকাত)
রসুলুল্লাহর এই ভবিষ্যদ্বাণীটি এখন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হোচ্ছে। প্রথম তিনটি ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হোয়ে গেছে। বর্তমানে চোলছে জাবারিয়াত অর্থাৎ জোর-জবরদস্তিমূলক শাসন। এর পরেই সামনে আসছে নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত। আল্লাহর রসুলের এই কথা থেকেই বোঝা যায় যে, আখেরী যুগে, অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে এই জাতি আবারো জাগবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন এসে যায় যে, কাদের দ্বারা জাগবে? কারা এই ঘুমন্ত জাতির কালঘুম ভাঙ্গাবে?
আল্লাহর রসুল বোলেছেন, “আমার উম্মাহর মাঝে সকল সময়ই একদল লোক থাকবে যারা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ নিষেধ বলবৎ কোরবে।” এই ফেরকা সম্পর্কেই আল্লাহর রসুল বোলেছেন তেহাত্তর ফেরকার মাঝে একমাত্র জান্নাতি ফেরকা। এই জান্নাতি ফেরকাকেই এখন মাঠে নামতে হবে। জাতির কালঘুম ভাঙ্গানের জন্য তাদের চেতনায় যতবড় আঘাত করার দরকার তাই কোরতে হবে। এই জান্নাতি ফেরকার কোন মানুষকে যদি বাকি বাহাত্তর ফেরকার কেউ প্রশ্ন করে যে, আপনি শিয়া না সুন্নি, না আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত, না আহলে হাদিস, হানাফি না শাফেয়ী, মালেকী না হাম্বলী না অন্য কিছু? তবে তার জবাব হবে ভাই, আমি ওসবের কোনটাই নই। আমি তো শুধু প্রাণপণে চেষ্টা কোরছি মো’মেন ও উম্মতে মোহাম্মাদী হোতে। একটা বিল্ডিং বা এমারতের ভেতরে থাকলেই তো প্রশ্ন আসে কোন কামরায় আছি। আমরা এসলামের এমারতের ভেতরেই নেই, কোন কামরায় আছি সে প্রশ্ন তো অবান্তর।
জান্নাতি ফেরকার অন্যতম কর্তব্য হবে মোসলেম নামধারী জাতিটিকে প্রশ্ন করা যে, সর্বদা আল্লাহর রসুলের সঙ্গে থেকে, তাঁর সাথে প্রতিটি সংগ্রামে সঙ্গী হোয়ে সরাসরি তার কাছে থেকে যারা এসলাম কি, তা শিখেছিলেন তারাই ঠিক এসলাম শিখেছিলেন, নাকি আজকের মাওলানারা, মৌলবীরা, পীর মাশায়েখরা যে এসলাম শেখাচ্ছেন সেটা ঠিক? রসুল (সা:) বর্ণিত জান্নাতি ফেরকার কর্তব্য হবে এই জাতিকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা দেখা যায় তা আসলে যথেষ্ট নয়। আসল বিষয় হোল চরিত্র এবং আকিদা। একজন পবিত্র চরিত্রের উচ্চ স্তরের মানুষ আর একজন জঘন্য চরিত্রের খুনি অপরাধের মানুষের বাহ্যিক দৃশ্য, চেহারা প্রায় একই রকম। দুজনেরই হাত, পা, মাথা, মুখ সবই আছে। এমনকি ঐ দুশ্চরিত্র খুনীর বাহ্যিক চেহারা ঐ সচ্চরিত্র মানুষের চেহারার চেয়েও সুন্দর হোতে পারে। শুধু ভেতরের চরিত্রের জন্যই একজন জান্নাতি আর একজন জাহান্নামী। এমনকি পৃথিবীর বিচারেও একজন সম্মানিত, অন্যজন জেল ফাঁসির উপযুক্ত। বর্তমানে আমরা এসলাম মনে কোরে যে দীনটাকে আঁকড়ে আছি এটার বাইরের চেহারা মোটামুটি আল্লাহর রসুলের মাধ্যমে আসা দীনের মতই। বাইরে থেকে যেগুলি দেখা যায় যেমন যেকের, আসকার, নামাজ, রোজা, হজ, দাড়ি, টুপি, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি নানাবিধ কার্যকলাপ; কিন্তু ভেতরের চরিত্র নবীজীর এসলামের একেবারে বিপরীত, সরাসরি বিপরীত। এছাড়াও জান্নাতি ফেরকার অন্যতম কাজ হবে এই জাতির ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন বাহাত্তর ফেরকাকে ডেকে বলা যে, আপনারা যত ফেরকা, মাজহাবে বিভক্ত হোয়ে থাকুন আপনারা এক আল্লাহয়, এক নবীতে এবং এক কোর’আনে বিশ্বাসী তো? তাহলে জাতির এই দুঃসময়ে, যখন ঐক্য এতো প্রয়োজনীয়, এখন শুধু এর উপর সবাই একত্র হোয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। মাজহাবের ফেরকার যে অনৈক্য আছে তা যদি বিলুপ্ত কোরতে না পারেন, তবে ঐক্যের খাতিরে তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিন। বাইরে আনবেন না। শিয়া শিয়াই থাকুন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, এমনকি সামাজিক ক্ষেত্রে আপনারা আপনাদের মযহাব মেনে চোলুন, যত ইচ্ছা মাতম করুন, কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রে, জাতীয় ঐক্যের খাতিরে সুন্নিদের পাশে এসে দাঁড়ান। সুন্নি সুন্নিই থাকুন ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক ব্যাপারে, কিন্তু জাতীয়ভাবে শিয়ার পাশে এসে দাঁড়ান। এমনভাবে হানাফি, শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী ইত্যাদি যত রকমের দুর্ভাগ্যজনক জাতি ধ্বংসকারী বিভক্তি আছে সব ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এক আল্লাহর, এক নবীতে বিশ্বাসী হিসাবে, এক জাতি হিসাবে এক মঞ্চে এসে দাঁড়ান ও আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম আরম্ভ কোরুন। শিয়া-সুন্নী উভয়কে বোলতে চাই, বর্তমানে আপনারা এই যে পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, বাহরাইন, ইয়েমেন, সৌদিআরবসহ প্রায় সমগ্র মোসলেম বিশ্বে জুড়ে দাঙ্গা চালাচ্ছেন, একে অপরকে গুলি কোরে হত্যা কোরছেন; আপনাদের মধ্যে কারা জান্নাতে যাবেন বলুন দেখি? আসলে মহানবীর ভাষ্যমতে কেউই জান্নাতি না। কাজেই আর না, এবার দয়া কোরে থামুন, যথেষ্ট হোয়েছে। এক আল্লাহই, এক রসুলে এবং এক কোর’আনে বিশ্বাসী এই জাতি যদি জান্নাতি ফেরকার এই ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জান্নাতি ফেরকার কিছুই করার নেই। তারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কাছে সাফ থাকবেন। তবে ডাকের মত ডাক দিতে হবে। যেমন কোরে নবী রসুলরা চিরকাল ডাক দিয়ে এসেছেন। তাঁদের প্রচণ্ড বিরোধিতা করা হোয়েছে, অপমান করা হোয়েছে, নিপীড়ন করা হোয়েছে। কিন্তু তাদের ডাক বন্ধ করা যায় নি। শত অত্যাচার সহস্র বিরোধিতা তাদের নিবৃত্ত কোরতে পারে নি। এই ফেরকার নিরাশ হবার কোন কারণ নেই। এই ফেরকা জান্নাতি কেন? রসুলুল্লাহর প্রকৃত সুন্নাহ পালনকারী বোলেই তো। তাহলে তিনি কত অত্যাচার, কত বিরোধিতা, কত অপমান ও নিগ্রহ সহ্য কোরেছেন সে সুন্নাহ তো, সে উদাহরণ তো, তাদের সামনেই আছে। তবে ভয় কিসের? জান্নাতি ফেরকা তো আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না।
এ অবস্থার কারণ খুঁজতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। বর্তমানে মোসলেম নামক এই জনসংখ্যাটির ব্যক্তিগত জীবনের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার এলাহ (হুকুমদাতা) হোলেন আল্লাহ, আর জাতীয়, রাষ্ট্রীয় জীবনের এলাহ হোল দাজ্জাল তথা ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’। সমস্ত পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির মত এই মোসলেম নামধারী জাতিটিও আজ এই প্রতারক ‘সভ্যতা’র গোলামে পরিণত হোয়েছে, অর্থাৎ দাজ্জালকে প্রভু (রব) বোলে মেনে নিয়েছে। দাজ্জালের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিকে গ্রহণ কোরে এই জাতি আজ জাতীয় জীবন থেকে এসলামকে প্রত্যাখ্যান কোরে কার্যত কাফের মোশরেকে পরিণত হোয়েছে। তাই সমস্ত জাতীর উপর দিয়ে বোয়ে চোলেছে আল্লাহ এবং তাঁর মালায়েকের অভিশাপের ঝড়। এই জাতি পৃথিবীর যেখানেই আছে সেই দেশের মানুষ দিয়ে অত্যাচারিত হোচ্ছে, অপমানিত হোচ্ছে, লাঞ্ছিত হোচ্ছে। ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি বড় বড় জাতিগুলি দিয়ে নির্যাতিত কোরেও ক্ষান্ত না দিয়ে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন আল্লাহ ভারতের আসামের ছোট একটি গাছ পাথরের উপাসক পাহাড়ী উপজাতিকে দিয়েও এই জাতিকে গুলি কোরে, তীর দিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করাচ্ছেন, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছেন, উচ্ছেদ করাচ্ছেন। এ যদি আল্লাহর লান’ত না হয় তাহলে লা’নত কাকে বলে?
তবে আশার কথা হোলো এই কালো অধ্যায়ের পরিসমাপ্তিও সন্নিকটে। কারণ অধঃপতিত মোসলেম নামধারী এই জাতি অচিরেই জেগে উঠবে এনশা’আল্লাহ। তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া আকিদা ফিরে পাবে। শত্র“র অন্তরে ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং নিজেদের মধ্যে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ চরিত্র তারা আবারো ফিরে পাবে। এর কয়েকটি যৌক্তিক এবং অকাট্ট কারণ রোয়েছে।
প্রথম কারণ: রসুলাল্লাহর উপাধি ‘রহমাতাল্লেল আলামিন’
আল্লাহ তাঁর রসুলকে কোর’আনে রহমাতাল্লিল আলামিন বোলেছেন। ‘রহমাতাল্লেল আলামিন’ শব্দের অর্থ হলো (পৃথিবীর) জাতি সমূহের উপর (আল্লাহর) রহমত। এখন প্রশ্ন হোচ্ছে আজ পৃথিবীর দিকে চেয়ে দেখুন দেখি। কোথায় সে রহমত? পৃথিবীর সর্বত্র অশান্তি, হাহাকার, অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত, বুক ভাঙা দুঃখ। মানুষের ইতিহাসে বোধহয় একত্রে একই সঙ্গে দুনিয়ার এত অশ্র“, এত অশান্তি কখনো ঘটেনি। নবী করিমের (দ:) আগেও বোধহয় পৃথিবীর একখানে অশান্তি থাকলে অন্যখানে খানিকটা শান্তি থাকতো। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ পৃথিবী ছোট, আজ একই সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যে রক্তারক্তি-অশান্তি হোচ্ছে তা ইতিহাসে বোধহয় আর কখনো হয় নি। ইতিহাসে ত্রিশ বছরের মধ্যে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ কোরে ষোল কোটি মানুষ এবং তারপর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কোটি মানুষ এত কম সময়ের মধ্যে কখনই হতাহত হয় নি। এত অন্যায়ও মানুষের ইতিহাসে আর কখনো হোয়েছে কিনা সন্দেহ। তার চেয়েও বড় কথা, মানব জাতি আণবিক যুদ্ধ কোরে আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা আজকের, বর্তমানের। রসুলাল্লাহর (দ:) পৃথিবীতে আসার চৌদ্দশ’ বছর পর। তাহোলে তিনি কেমন কোরে পৃথিবীর মানুষের জন্য রহমত? এর জবাব হোচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাকে (দ:) যে জীবন ব্যবস্থা, দীন দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সেই দীন মানব জাতির উপর সমষ্টিগতভাবে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা কোরলে যে শান্তি, সুবিচার, নিরাপত্তা মানুষের জীবনে নেমে আসবে সেটা হলো আল্লাহর রহমত, তার দয়া। কারণ তিনি ঐ জীবন ব্যবস্থা না দিলে মানুষ কখনই তা নিজেরা তৈরী কোরে নিতে পারতো না, যদি কোরত তবে তা সীমাহীন অশান্তি আর রক্তপাত ডেকে আনতো, যেমন আজ কোরছে। সেই জীবন ব্যবস্থা, দীন, সংবিধান তিনি যার মাধ্যমে মানুষকে দিলেন তাকে তিনি উপাধি দিলেন ‘রহমাতাল্লেল আলামিন’। কিন্তু যতদিন না সমগ্র মানব জাতি নিজেদের তৈরী জীবন ব্যবস্থা সমূহ পরিত্যাগ কোরে মোহাম্মদের (দ:) মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োগ কোরবে ততদিন তারা সেই অশান্তি, অন্যায় (ফাসাদ) ও যুদ্ধ, রক্তপাতের (সাফাকুদ্দিমা) মধ্যে ডুবে থাকবে, আজকের মত এবং ততদিন বিশ্বনবীর (দ:) ঐ উপাধি অর্থবহ হবে না, অর্থপূর্ণ হবে না এবং আজও হয় নি। তার উম্মাহ ব্যর্থ হোয়েছে তার (দ:) উপাধিকে পরিপূর্ণ অর্থবহ কোরতে। তবে এনশা’আল্লাহ সেটা হবে, সময় সামনে। স্রষ্টার দেওয়া উপাধি ব্যর্থ হোতে পারে না, অসম্ভব। সুতরাং আজ হোক আর কাল হোক সমস্ত মানবজাতি তাঁকে আল্লাহর রসুল হিসাবে মেনে নেবে। এবং তাঁর মাধ্যমে পাঠানো দীনুল হক কে তাদের সমষ্টিগত জীবনে কার্যকর কোরবে।
দ্বিতীয় কারণ: আসছে নবুয়তের আদলে খেলাফত
আল্লাহর রসুল ভবিষ্যদ্বাণী কোরেছিলেন, “আল্লাহ যতদিন চান ততদিন তোমাদের মাঝে নবুওয়াত থাকবে (অর্থাৎ তিনি নিজেই), তারপর আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর আসবে নবুওয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত। যতদিন আল্লাহ চান ততদিন তা থাকবে তারপর আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর আসবে মুলকান (রাজতন্ত্র), যতদিন আল্লাহ চান ততদিন তা থাকবে অতপর আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর আসবে জাবারিয়াত (শক্তি প্রয়োগ, জোর-জবরদস্তিমূলক শাসন)। এরপর আবারো আসবে নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত।” (দালায়েলুম নবুয়াত, বায়হাকী, মুসনাদ-আহমদ বিন হাম্বল, মেশকাত)
রসুলুল্লাহর এই ভবিষ্যদ্বাণীটি এখন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হোচ্ছে। প্রথম তিনটি ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হোয়ে গেছে। বর্তমানে চোলছে জাবারিয়াত অর্থাৎ জোর-জবরদস্তিমূলক শাসন। এর পরেই সামনে আসছে নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত। আল্লাহর রসুলের এই কথা থেকেই বোঝা যায় যে, আখেরী যুগে, অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে এই জাতি আবারো জাগবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন এসে যায় যে, কাদের দ্বারা জাগবে? কারা এই ঘুমন্ত জাতির কালঘুম ভাঙ্গাবে?
আল্লাহর রসুল বোলেছেন, “আমার উম্মাহর মাঝে সকল সময়ই একদল লোক থাকবে যারা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ নিষেধ বলবৎ কোরবে।” এই ফেরকা সম্পর্কেই আল্লাহর রসুল বোলেছেন তেহাত্তর ফেরকার মাঝে একমাত্র জান্নাতি ফেরকা। এই জান্নাতি ফেরকাকেই এখন মাঠে নামতে হবে। জাতির কালঘুম ভাঙ্গানের জন্য তাদের চেতনায় যতবড় আঘাত করার দরকার তাই কোরতে হবে। এই জান্নাতি ফেরকার কোন মানুষকে যদি বাকি বাহাত্তর ফেরকার কেউ প্রশ্ন করে যে, আপনি শিয়া না সুন্নি, না আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত, না আহলে হাদিস, হানাফি না শাফেয়ী, মালেকী না হাম্বলী না অন্য কিছু? তবে তার জবাব হবে ভাই, আমি ওসবের কোনটাই নই। আমি তো শুধু প্রাণপণে চেষ্টা কোরছি মো’মেন ও উম্মতে মোহাম্মাদী হোতে। একটা বিল্ডিং বা এমারতের ভেতরে থাকলেই তো প্রশ্ন আসে কোন কামরায় আছি। আমরা এসলামের এমারতের ভেতরেই নেই, কোন কামরায় আছি সে প্রশ্ন তো অবান্তর।
জান্নাতি ফেরকার অন্যতম কর্তব্য হবে মোসলেম নামধারী জাতিটিকে প্রশ্ন করা যে, সর্বদা আল্লাহর রসুলের সঙ্গে থেকে, তাঁর সাথে প্রতিটি সংগ্রামে সঙ্গী হোয়ে সরাসরি তার কাছে থেকে যারা এসলাম কি, তা শিখেছিলেন তারাই ঠিক এসলাম শিখেছিলেন, নাকি আজকের মাওলানারা, মৌলবীরা, পীর মাশায়েখরা যে এসলাম শেখাচ্ছেন সেটা ঠিক? রসুল (সা:) বর্ণিত জান্নাতি ফেরকার কর্তব্য হবে এই জাতিকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা দেখা যায় তা আসলে যথেষ্ট নয়। আসল বিষয় হোল চরিত্র এবং আকিদা। একজন পবিত্র চরিত্রের উচ্চ স্তরের মানুষ আর একজন জঘন্য চরিত্রের খুনি অপরাধের মানুষের বাহ্যিক দৃশ্য, চেহারা প্রায় একই রকম। দুজনেরই হাত, পা, মাথা, মুখ সবই আছে। এমনকি ঐ দুশ্চরিত্র খুনীর বাহ্যিক চেহারা ঐ সচ্চরিত্র মানুষের চেহারার চেয়েও সুন্দর হোতে পারে। শুধু ভেতরের চরিত্রের জন্যই একজন জান্নাতি আর একজন জাহান্নামী। এমনকি পৃথিবীর বিচারেও একজন সম্মানিত, অন্যজন জেল ফাঁসির উপযুক্ত। বর্তমানে আমরা এসলাম মনে কোরে যে দীনটাকে আঁকড়ে আছি এটার বাইরের চেহারা মোটামুটি আল্লাহর রসুলের মাধ্যমে আসা দীনের মতই। বাইরে থেকে যেগুলি দেখা যায় যেমন যেকের, আসকার, নামাজ, রোজা, হজ, দাড়ি, টুপি, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি নানাবিধ কার্যকলাপ; কিন্তু ভেতরের চরিত্র নবীজীর এসলামের একেবারে বিপরীত, সরাসরি বিপরীত। এছাড়াও জান্নাতি ফেরকার অন্যতম কাজ হবে এই জাতির ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন বাহাত্তর ফেরকাকে ডেকে বলা যে, আপনারা যত ফেরকা, মাজহাবে বিভক্ত হোয়ে থাকুন আপনারা এক আল্লাহয়, এক নবীতে এবং এক কোর’আনে বিশ্বাসী তো? তাহলে জাতির এই দুঃসময়ে, যখন ঐক্য এতো প্রয়োজনীয়, এখন শুধু এর উপর সবাই একত্র হোয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। মাজহাবের ফেরকার যে অনৈক্য আছে তা যদি বিলুপ্ত কোরতে না পারেন, তবে ঐক্যের খাতিরে তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিন। বাইরে আনবেন না। শিয়া শিয়াই থাকুন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, এমনকি সামাজিক ক্ষেত্রে আপনারা আপনাদের মযহাব মেনে চোলুন, যত ইচ্ছা মাতম করুন, কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রে, জাতীয় ঐক্যের খাতিরে সুন্নিদের পাশে এসে দাঁড়ান। সুন্নি সুন্নিই থাকুন ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক ব্যাপারে, কিন্তু জাতীয়ভাবে শিয়ার পাশে এসে দাঁড়ান। এমনভাবে হানাফি, শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী ইত্যাদি যত রকমের দুর্ভাগ্যজনক জাতি ধ্বংসকারী বিভক্তি আছে সব ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এক আল্লাহর, এক নবীতে বিশ্বাসী হিসাবে, এক জাতি হিসাবে এক মঞ্চে এসে দাঁড়ান ও আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম আরম্ভ কোরুন। শিয়া-সুন্নী উভয়কে বোলতে চাই, বর্তমানে আপনারা এই যে পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, বাহরাইন, ইয়েমেন, সৌদিআরবসহ প্রায় সমগ্র মোসলেম বিশ্বে জুড়ে দাঙ্গা চালাচ্ছেন, একে অপরকে গুলি কোরে হত্যা কোরছেন; আপনাদের মধ্যে কারা জান্নাতে যাবেন বলুন দেখি? আসলে মহানবীর ভাষ্যমতে কেউই জান্নাতি না। কাজেই আর না, এবার দয়া কোরে থামুন, যথেষ্ট হোয়েছে। এক আল্লাহই, এক রসুলে এবং এক কোর’আনে বিশ্বাসী এই জাতি যদি জান্নাতি ফেরকার এই ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জান্নাতি ফেরকার কিছুই করার নেই। তারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কাছে সাফ থাকবেন। তবে ডাকের মত ডাক দিতে হবে। যেমন কোরে নবী রসুলরা চিরকাল ডাক দিয়ে এসেছেন। তাঁদের প্রচণ্ড বিরোধিতা করা হোয়েছে, অপমান করা হোয়েছে, নিপীড়ন করা হোয়েছে। কিন্তু তাদের ডাক বন্ধ করা যায় নি। শত অত্যাচার সহস্র বিরোধিতা তাদের নিবৃত্ত কোরতে পারে নি। এই ফেরকার নিরাশ হবার কোন কারণ নেই। এই ফেরকা জান্নাতি কেন? রসুলুল্লাহর প্রকৃত সুন্নাহ পালনকারী বোলেই তো। তাহলে তিনি কত অত্যাচার, কত বিরোধিতা, কত অপমান ও নিগ্রহ সহ্য কোরেছেন সে সুন্নাহ তো, সে উদাহরণ তো, তাদের সামনেই আছে। তবে ভয় কিসের? জান্নাতি ফেরকা তো আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না।
No comments:
Post a Comment