Tuesday, June 2, 2015

গল্প নয়, সত্যি রাজ্যের বিনিময়ে গ্রন্থ

গল্প নয়, সত্যি রাজ্যের বিনিময়ে গ্রন্থ

রাসেদুল হাসান

পূর্বে রোমক সাম্রাজ্যের অধিপতিগণ বাগদাদে খলীফাগণকে বার্ষিক যে কর দিতেন, নয়েসফোরাস সিংহাসনে আরোহণ করেই তা বন্ধ করে দিলেন এবং খলীফা হারুন-অর-রশীদকে লিখে পাঠালেন:
“রোমক সম্রাট নয়েসফোরসের নিকট হতে আরব অধিপতি হারুনের প্রতি: আমার পূর্বে যে সম্রাজ্ঞী সিংহাসনে আসীন ছিলেন, তিনি তোমাকে শিকারীর পদ দিয়ে নিজে শিকারের পদ গ্রহণ করেছিলেন, এবং তোমাকে বিপুল ধনরাশি প্রদান করেছিলেন; আর এ সমস্তের কারণ তাঁর নারীসুলভ দুর্বলতা ও নির্বুদ্ধিতা। এখন লিখিত, আমার এই পত্র পাঠমাত্র তুমি সে সব ধনরাশি ফেরত পাঠাবে, অন্যথায় তলোয়ার তোমার-আমার মধ্যে মীমাংসা করবে।” পত্র পাঠ করে হারুন-অর-রশীদের চক্ষু হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হল। তিনি ঐ পত্রেরই অপর পৃষ্ঠায় লিখে দিলেন:
“আমি তোমার পত্র পড়েছি; এর উত্তর তুমি কানে শুনবে না, চোখে দেখবে।”
খলীফা সেই দিনই সৈন্যসামন্তসহ রোমক সম্রাটের পত্রের উত্তর দিতে যাত্রা করলেন।
হিরাক্লিয়াস নামক রোমক শহরের উপকণ্ঠে নয়েসফোরাসের সঙ্গে হারুন-অর-রশীদের সাক্ষাৎ হল। মুসলিম খ্রিষ্টানের অস্ত্র-সংঘাতে লড়াইর ময়দান মুখরিত হয়ে উঠল। কিন্তু আরব শৌর্যের সম্মুখে খ্রিষ্টানগর্ব অধিক্ষণ তিষ্ঠিতে পারল না; নয়েসফোরাস পরাজিত হলেন এবং পূর্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণ করদানে সম্মত হয়ে সন্ধিভিক্ষা করলেন। খলীফা সন্ধিপত্রে শর্ত দিলেন, তৎকর্তৃক বিজিত নয়েসফোরাসের রাজ্যাংশের বিনিময়ে নয়েসফোরাসের সাম্রাজ্যের যেখানে দর্শনবিজ্ঞানঘটিত যত গ্রন্থ আছে, তার এক এক প্রস্থ নকল হারুন-অর-রশীদকে পাঠাতে হবে। নয়েসফোরাস সম্মত হলেন, সন্ধি হয়ে গেল।
হারুন-অর-রশীদের প্রেরিত কয়েকজন পণ্ডিত এশিয়া মাইনরের যাবতীয় পুস্তকাগার তন্ন তন্ন করে তল্লাস করে বহু অমূল্য গ্রন্থ তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। এই গ্রন্থরাজির সঙ্গে একটি ফিরিস্তী পাওয়া গেল। ফিরিস্তীর সঙ্গে সংগৃহীত গ্রন্থরাজি মিলিয়ে দেখা গেল, ফিরিস্তীতে উল্লিখিত আরস্তু, আলাতুন, জালিনুস , সোকরাত প্রভৃতি মনীষীদের লিখিত বহু পুস্তক তখনও সংগৃহীত হয় নি। হারুন-অর-রশীদ এই সব গ্রন্থ সংগ্রহের আয়োজন করছিলেন, এমন সময় তাঁর ডাক পড়ল; তিনি মহাপ্রয়াণ করলেন।
হারুন-অর-রশীদের সুযোগ্য পুত্র মামুন পিতার অসমাপ্ত কাজে হাত দিলেন এবং রোমক সম্রাটকে লিখলেন:
“কনস্টান্টিনোপল, মকদুনিয়া ও এথন্স প্রভৃতি স্থানের প্রস্তাকাগার সমূহে এখনও বহু দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ আছে। গ্রন্থগুলি দয়া করে পাঠালে বিশেষ বাধিত হব।”
তখন এথেন্স নগরে একটি বিরাট গ্রন্থাগার ছিল এবং ঐ গ্রন্থাগার অখ্রিষ্টান গ্রীক ও রোমক পণ্ডিতদের অমূল্য গ্রন্থরাশিতে পূর্ণ ছিল। এই সকল গ্রন্থপাঠ খ্রিষ্টানধর্মের হানিকর, এই বিশ্বাসে সম্রাট কনস্ট্যানটাইন উক্ত লাইব্রেরীর দ্বার রুদ্ধ করে তালাবদ্ধ করে দেন এবং মৃত্যুকালে তিনি একটি ওসিয়ৎ করে যান যে, তাঁর পর যাঁরা সম্রাট হবেন তাঁরা প্রত্যেকে যেন লাইব্রেরীটির দরজায় একটি তালা লাগিয়ে দেন্ এইরূপে পুস্তকাগারটি সপ্ততালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছিল।
রোমক সম্রাট মামুনের পত্র পেয়ে বিচলিত হলেন; কারণ নিষিদ্ধ হলেও গ্রন্থাগারটির প্রতি তাঁর বিশেষ মমতা ছিল। তিনি মন্ত্রিগণকে ডাকলেন।
মন্ত্রিগণ বললেন, “এ আপদ পাঠিয়ে দেওয়াই উচিত; কারণ এসব গ্রন্থ মুসলমান দেশে প্রচারিত হলে তাদের ধর্মের সর্বনাশ ঘটবে।”
এ মন্ত্রণা সমীচীন বোধ হল। সম্রাট এই লাইব্রেরীর যাবতীয় গ্রন্থাদি বাগদাদে পাঠিয়ে দিলেন।
মামুন পরম আগ্রহে সেই গ্রন্থগুলি রাজকীয় পুস্তকাগারে রক্ষা করেন অল্পকাল মধ্যেই সে সবের আরবী অনুবাদের ব্যবস্থা করলেন।
মুসলিম জগতের জ্ঞানসাধনার ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূত্রপাত হল।
মকালাতে শিবলী
শিক্ষা: সমস্ত কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, যুক্তিহীনতার দুয়ার ভেদ করে নবতর আবিষ্কার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করেছিল যে মুসলিম জাতি সে আজ আবার সেই কূপমণ্ডূকতায় ডুবে অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ফতোয়াবাজীতে লিপ্ত। জ্ঞান-বিজ্ঞানে সকল জাতির নিুে অবস্থান করছে। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না ইনশাল্লাহ। আবার সত্য ইসলাম এসেগেছে, আবার শ্রেষ্ঠ জাতি হবে এই মুসলিম জাতি ইনশাল্লাহ।

No comments:

Post a Comment