নামাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য (তৃতীয় পর্ব)
মাননীয় এমামুয্যামানের লেখা থেকে সম্পাদিত:
বিশ্বনবী (দ:) মানবজাতিকে যে জীবন বিধান দীন উল এসলাম দিয়ে গেছেন সেটা, আর আজ আমরা যেটাকে দীন উল এসলাম মনে কোরছি, নিষ্ঠাভরে পালন কোরছি, এই দুটো শুধু সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস নয়, দু’টো পরস্পর বিরোধী। মহানবী (দ:) তাঁর আসহাবদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, আজ আমাদের ওলামায়ে দীন, পীর মাশায়েখরা তার ঠিক উল্টো শিক্ষা দেন। এই জাতি যেটাকে এসলাম বোলে মনে করে, সেটা প্রকৃত এসলাম থেকে এত বিকৃত যে প্রকৃতটা বোঝানো অতি কঠিন হোয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের আজ যারা এসলাম শেখান তাদের এসলাম সম্বন্ধে আকিদা বিকৃত। এই দীনের উদ্দেশ্য কী, ঐ উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়া কী, দীনের মূল্যবোধের গুরুত্ব অর্থাৎ চৎরড়ৎরঃু কী এসব তাদের বিকৃত, উল্টাপাল্টা হোয়ে গেছে। এরা ওয়াজ করেন, শিক্ষা দেন-নামাজ পড়ো নামাজ পড়ো, যেন নামাজই উদ্দেশ্য। নামাজ উদ্দেশ্য নয়, নামাজ প্রক্রিয়া, উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়া। সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে আল্লাহর আইনের শাসনে আনার মত দুরূহ ও বিরাট কাজের দায়িত্ব যে জাতির উপর অর্পণ করা আছে তাদের যে চরিত্র প্রয়োজন, যে কোরবানি করার শক্তির প্রয়োজন, যে ঐক্য ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন তা সৃষ্টি করে এই নামাজ। কিন্তু আজ আর সেই উদ্দেশ্যে নামাজ (সালাহ) পড়া হয় না, এখন নামাজ পড়া হয় ধ্যাণ বা উপাসনার লক্ষ্যে। উদ্দেশ্য হারিয়ে গেছে বোলে নামাজ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের যে চরিত্র সৃষ্টি কোরতে পারতো তাও পারছেনা আকিদার বিকৃতির ফলে। ঠিক সময়ে নামাজ পড়তে হয় কাজেই নামাজ সময়ানুবর্তিতা শেখায়। নামাজ পড়েও যদি কেউ সময়ানুবর্তিতা না শেখে তবে নামাজের ঐ শিক্ষা থেকে সে বঞ্চিত হলো। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কালো-সাদা, পণ্ডিত-মুর্খ সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েও যদি মন থেকে ভেদাভেদ, অহংকার ধুয়ে না যায় তবে নামাজের ঐ শিক্ষা ব্যর্থ হোয়ে গেলো। একই দিকে মুখ করে সবার সাথে একই সঙ্গে ওঠাবসা, রুকু-সাজদা কোরেও মসজিদ থেকে বের হোয়েই নানা মুনির নানা মত হোলে নামাজের কর্মের-ঐক্যের-শিক্ষা ব্যর্থ হোয়ে গেলো। এমামের তকবিরের সাথে সাথে রুকু, এতেদাল, সাজদা কোরেও নামাজের পরই অন্যান্য জাতীয় ব্যাপারে এমামের হুকুমের তোয়াক্কা না কোরলে নামাজের শৃঙ্খলা শিক্ষা সম্পুর্ণ ব্যর্থ হোয়ে গেলো। নামাজ প্রকৃতপক্ষে কী তা বোঝাতে মহানবী (দ:) নামাজকে এসলাম নামক ঘরের একটি খুঁটির সাথে তুলনা কোরেছেন, আর ছাদের সাথে তুলনা কোরেছেন জেহাদকে (হাদিস – মো’য়াজ (রা:) থেকে আহমদ, তিরমিজি, এবনে মাজাহ, মেশকাত)। ঘরের উদ্দেশ্য কী? ঘরের উদ্দেশ্য হলো এই যে- ঐ ঘরের মাধ্যমে যাবতীয় রোদ্র-বৃষ্টি, প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা পাওয়া। এখন প্রশ্ন হলো – রোদ্র-বৃষ্টি থেকে আমাদেরকে বাঁচায় কিসে? অবশ্যই ঘরের ছাদ, খুঁটি নয়। কিন্তু ঐ ছাদকে উপরে ধরে রাখার জন্য আবার থাম বা খুঁটির কোন বিকল্প নেই। কাজেই ঘরের ছাদ, জেহাদই হলো উদ্দেশ্য, তবে যেহেতু খুঁটি বা নামাজ ছাড়া ঐ ছাদ আটকে থাকে না বা জেহাদ করা যায় না, জেহাদের চরিত্র- ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্য সৃষ্টি হয় না তাই নামাজের এত প্রয়োজনীয়তা, বাধ্যবাধকতা। এটা সর্বক্ষণ মনে রাখতে হবে – নামাজ উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান যোগায়। তাই রসুলাল্লাহ তাঁর উপরোক্ত বাণীতে নামাজকে ছাদও বলেন নি, ঘরের ভিত্তিও বলেন নি, দরজা জানালাও বলেন নি, নির্দিষ্ট কোরে বোলেছেন থাম-খুঁটি। এই কথাটি তিনি একবার বলেন নি একাধিকবার বোলেছেন, কোন বারই নামাজকে খুঁটি ছাড়া অন্য কিছু বলেন নি। আর ঘরের ছাদ ঐ খুঁটি ছাড়া রাখা সম্ভব নয় বোলেই ঐ খুঁটির জন্য- খুঁটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এত তাগিদ, জেহাদি চরিত্র ছাড়া জেহাদ সম্ভব নয় বোলেই ঐ জেহাদি চরিত্র সৃষ্টির জন্য এত তাগিদ। কিন্তু যদি ছাদ না থাকে তবে ঐ থামের যেমন প্রয়োজন নেই- তেমনি জেহাদ ও সর্বাত্মক সংগ্রাম যদি না থাকে তবে নামাজেরও প্রয়োজনীয়তা নেই। বিশ্বনবীর (দ:) সময়ে আরব জাতি কেমন ছিলো তা বলার দরকার করে না; তা ইতিহাস। গোত্রে গোত্রে পরিবারে পরিবারে এত বিভক্তি এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ-রক্তপাত, বংশানুক্রমে হত্যা ও তার প্রতিশোধ, বিশৃঙ্খলা এমন একটা পর্যায়ে ছিলো যে, বোধহয় পৃথিবীর আর কোথাও ঐ পর্যায়ে ছিলো না। কিন্তু মাত্র কয়েকটি বছরের মধ্যে সেই বিশৃঙ্খল জাতিকে নিয়ামানুবর্তিতা, ঐক্য ও শৃঙ্খলার চূড়ান্তে নিয়ে গিয়েছিলো এই নামাজ। নামাজের ছাঁচে (গড়ঁষফ) ফেলে পৃথিবীর সবচেয়ে শৃঙ্খলা বিরোধী জাতিকে কিসে রূপান্তর করা হোয়েছিলো তার উদাহরণ এই জাতির ইতিহাসে বহুবার পেয়েছি। ওমরের (রা:) আদেশে মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম চির অপরাজিত সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা:) তার পদ ছেড়ে একেবারে সাধারণ সৈনিক হোয়ে গেলেন; খলিফা সোলায়মানের আদেশে সিন্ধু-বিজয়ী সেনাপতি মহাবীর মোহাম্মদ বিন কাসেম বিনা বাক্যব্যয়ে তার পদ ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলেন। এদের দু’জনেরই সেনাবাহিনীর মধ্যে এত সমর্থক ছিলো যে তারা যদি খলিফার আদেশ অমান্য কোরতেন তবে তা জাতির ঐক্য ও শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্থ কোরত। আরও একটি অন্য রকমের উদাহরণ দেয়ার লোভ সংবরণ কোরতে পারছি না। এটা মহান সাহাবা আবু যরের (রা:) জীবনী থেকে। হজ্বের সময় মহানবী (দ:) মিনায় চার রাকাতের জায়গায় কসরের দু’রাকাত সালাত পড়তেন। স্বভাবতঃই পরে আবু বকর (রা:), ওমর (রা:) এরাও রসুলের (দ:) অনুসরণ কোরে মিনায় কসরের দু’রাকাত সালাত পড়তেন। ওসমানের (রা:) খেলাফতের সময় ওসমান (রা:) মিনায় কসর না পড়ে পুরা চার রাকাত সালাত পড়লেন, অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে সুন্নাহর খেলাপ কোরলেন। অবশ্য পরে তিনি তার ঐ কাজ করার কারণ সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা ছিলো এই যে, মিনার কাছেই তার কিছু জমি-সম্পদ ছিলো, কাজেই তার জন্য মিনায় কসর হয় না। সে যাই হোক আবু যর (রা:) এই খবর শুনে প্রথমতঃ খুব চটে গেলেও পরে নিজেই ওসমানকে (রা:) অনুকরণ কোরে মিনায় সেই চার রাকাত নামাজ পড়লেন। কারণ হিসেবে বোললেন, “রসুলাল্লাহ (দ:) বলে গেছেন যে, এমামকে – নেতাকে বিনা বাক্যব্যয়ে অনুসরণ কোরতে হবে। যদি সে নেতা কান কাটা নিগ্রো ক্রীতদাসও হয় (হাদিস – ইরবাদ বিন সরিয়াহ (রা:) থেকে আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজি, এবনে মাজাহ, মেশকাত)।” সেই নামাজের শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও ঐক্য শিক্ষার ফল। জাতির ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আবু যরের (রা:) মত উচ্চ স্থরের সাহাবীও রসুলাল্লাহর (দ:) নির্দেশ পালন করার জন্য তারই (দ:) সুন্নাহ পর্যন্ত— অমান্য কোরলেন, যদিও ওসমানের (রা:) মত মিনার কাছে তার কোন জমি ছিল না। চার পাঁচ লাখ লোকের একটি জাতির ঐ চরিত্রের আরও অনেক লোক ছিলেন। কিন্তু গত হাজার বছরের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের নামাজ আর একটিও খালেদ (রা:), একটিও মোহাম্মদ বিন কাসেম বা আবুযর (রা:) সৃষ্টি কোরতে পারে নি। এর জন্য নামাজ দায়ী নয়। এর কারণ হলো, নামাজ সম্বন্ধে বিকৃত আকিদা, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশিক্ষণ ও প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্যের স্থান দেয়া। বিশ্বনবী মোহাম্মদ (দ:) এবং সরাসরি তাঁর কাছে থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত আসহাব (রা:) যে আকিদা নিয়ে নামাজ পড়তেন সেই আকিদা নিয়ে নামাজ পড়লে আজও নামাজ আবার আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, খালেদ, আবু ওবায়দা, আবু যর (রা:) সৃষ্টি কোরবে। আসলেই ভবিষ্যতে নামাজ আবার তা কোরবে। যেদিন এই উম্মাহ আবার তার প্রকৃত আকিদা ফিরে পাবে, রসুলাল্লাহর (দ:) শিক্ষার বিপরীত দিকে সে যে আজ চোলছে তা ছেড়ে আবার তাঁর দেখানো পথে চোলতে শুরু কোরবে, সেদিন নামাজ আবার সেই আসহাবদের মতই চরিত্র সৃষ্টি কোরবে, আবার সেই দুর্জয় যোদ্ধা সৃষ্টি কোরবে।
অন্যান্য ধর্মে যে উদ্দেশ্যে উপাসনা করা হয় নামাজও তেমনি উপাসনা- এবাদত, এই আকিদা যে ভুল তার আর এক প্রমাণ এই যে, চোখ বন্ধ কোরে নামাজ পড়া নিষেধ। খোলা চোখের চেয়ে চোখ বন্ধ কোরলে একাগ্রতা, নিবিষ্টতা বেশি আসে এটা সাধারণ জ্ঞান, সবাই জানে। তাই উপাসনা কোরতে সর্ব ধর্মের মানুষই চোখ বন্ধ করে। এমন কি উপাসনা ছাড়াও কোন কিছু গভীরভাবে চিন্তা কোরতে গেলেও মানুষের চোখ আপনা থেকে বুঁজে আসে। অথচ চোখ বন্ধ কোরে নামাজ পড়া নিষেধ। কেন? এইজন্য যে একাগ্রতা-নিবিষ্টতা এখানে লক্ষ্য নয় এখানে লক্ষ্য হোচ্ছে ট্রেনিং, শৃঙ্খলা শিক্ষা, সামরিক বাহিনীর সৈন্যরা কুচকাওয়াজ কোরে যে ট্রেনিং প্রশিক্ষণ নেয়। কোন সামরিক বাহিনীর কমান্ডার যে কারণে তার সৈন্যদলকে চোখ বন্ধ কোরে কুচকাওয়াজ কোরতে দেবেন না, ঠিক সেই কারণে চোখ বুঁজে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। নামাজের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভুল আকিদার অধিকারী বর্তমান মোসলেম জাতি নামাজে নিবিষ্টতার যে দাবি করেন- নামাজের চৌদ্দটি ফরয, চৌদ্দটি ওয়াজেব, সাতাশটি সুন্নাত আর বারটি মোস্তাহাব খেয়াল রেখে সেই নিবিষ্টতা অসম্ভব এ কথা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। নামাজ যদি অন্যান্য ধর্মের উপাসনার উদ্দেশ্যেই বাধ্যতামূলক (ফরজ) করা হতো, তবে এক পায়ে একটু বেশি ভর দিয়ে দাঁড়ালে নামাজ ত্র“টিযুক্ত হোয়ে যেতো না। কারণ, এক পায়ে বেশি ভর দিয়ে দাঁড়ালে আল্লাহর প্রতি মনসংযোগ কোরতে কোন প্রতিবন্ধকতা হয় না। আসল কথা হোচ্ছে, যে সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য সমস্ত জীবনব্যবস্থা রদ, বাতিল কোরে দীনুল এসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য এই জাতি ‘উম্মাহ’কে সৃষ্টি করা হোয়েছে সেই কাজ সফলভাবে করার জন্য যে মহান চরিত্র ও দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা দরকার তা তৈরি করার ট্রেনিং-প্রশিক্ষণ হোচ্ছে নামাজ। তাই এই উম্মাহর স্রষ্টা পরিষ্কার বোলে দিয়েছেন এসলামের ঘরের থাম খুঁটি হোচ্ছে নামাজ, ছাদ হোচ্ছে জেহাদ, সর্বাত্মক সংগ্রাম। তাঁর কথার উপর আর অন্য কোন কথা নেই। নামাজের ঐ বুনিয়াদী অর্থ ছাড়াও নামাজ মানুষের দৈহিক, মানসিক, আত্মিক এক কথায় মানুষের পূর্ণ জীবনের প্রত্যেকটি দিকের উপর প্রভাব বিস্তার করে। শুধু তাই নয়, নামাজের মাধ্যমে জাতির রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ও নীতি-নির্দেশনা পর্যন্ত— রোয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে অত গুরুত্বপূর্ণ হোলেও নামাজ উদ্দেশ্য নয় নামাজ প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ। নামাজ যে উদ্দেশ্য নয়-উদ্দেশ্য পূরণের প্রশিক্ষণ, তার আরও সরাসরি প্রমাণ আছে। নামাজের প্রশিক্ষণের যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ জেহাদ যখন এসে যেতো তখন মোসলেমরা নামাজ পড়তেন না, এটা ইতিহাস এবং একবারের ইতিহাস নয়, বহুবারের ইতিহাস। পৃথিবীর কোন সৈন্য বাহিনীই যুদ্ধের সময় প্যারেড-কুচকাওয়াজ করে না, ট্রেনিং নেয় না, তখন তারা যুদ্ধ করে, একথা জানেনা এমন অজ্ঞ বোধহয় কোথাও নেই। কারণ, সৈন্যবাহিনী তখন কোরছে সেই কাজ- যে কাজের জন্য তারা এতদিন এত প্রশিক্ষণ নিয়েছে- যেটা তাদের আসল উদ্দেশ্য। মোসলেমরাও তা’ই কোরেছেন, কারণ তারা জানতেন নামাজের উদ্দেশ্য কী? নামাজ সম্বন্ধে তাদের আকিদা সঠিক ছিলো। ইয়ারমুকের যুদ্ধ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত— ছয়দিন যাবৎ চোলেছে। এই ছয়দিন মোসলেম বাহিনী সারাদিন কোন নামাজ পড়েছে বোলে কোন ইতিহাসবেত্তা উল্লেখ করেন নি। যদিও প্রত্যেক দিনের যুদ্ধের বি¯তৃত বিবরণ, এমনকি বহু ছোট ছোট ঘটনার উল্লেখ আছে- কে কি বোলেছেন তা পর্যন্ত— লেখা আছে। ইয়ারমুকে এক হাজারের বেশি আসহাব (রা:) উপস্থিত ছিলেন, যারা আল্লাহর রসুলের (দ:) কাছ থেকে সরাসরি এসলাম শিক্ষা কোরেছিলেন, এমন কি আশরাতুল মুবাসশারা থেকে অন্ততঃ একজন- আবু ওবায়দা (রা:) উপস্থিত ছিলেন। এদের একজনও একথা বলেন নি যে নামাজের সময় হোয়েছে যুদ্ধ থামাও। বলেন নি, কারণ এখনকার ধর্মীয় নেতাদের মতো তাদের গুরুত্ব (চৎরড়ৎরঃু) উল্টো হোয়ে যায় নি। আজ যারা নামাজ পড়ো, নামাজ পড়ো বোলে গলা ফাটান, নামাজকেই উদ্দেশ্য মনে করেন, তাদের কাছে নিবেদন এই যে- প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বাদ দেন, যুদ্ধের শুধু প্রস্তুতিমূলক কাজেও নামাজ বাদ দেয়ার শিক্ষা স্বয়ং মহানবী (দ:) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে অন্যদের সঙ্গে পরিখা খননকালে তিনি (দ:) আসরের নামাজ পড়েন নি এবং অবশ্যই অন্য আর কেউই পড়েন নি। মনে রাখবেন শত্র“ সৈন্যবাহিনী তখনও এসে পৌঁছায়নি। বিশ্বনবী (দ:) কি দশ মিনিটের জন্য কাজ বন্ধ রেখে আসরের মাত্র চার রাকাত নামাজ পড়ে নিতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু পড়েন নি। পড়েন নি আমাদের জন্য উদাহরণ রেখে যাওয়ার জন্য, যেন আমরা যে জিনিসের যে গুরুত্ব তাই যেন দেই, যেন উল্টা-পাল্টা না কোরে ফেলি, প্রক্রিয়া প্রশিক্ষণকে যেন উদ্দেশ্যের আসনে না বসাই। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে তো পরের কথা, সামান্য পাহারা দেওয়ার কাজেও মহানবী (দ:) বোলেছেন এক রাত্রির পাহারা বহু বছরের নফল নামাজের চেয়ে বড়। নামাজ বড় না যুদ্ধ বড়, অগ্রাধিকারের এই প্রশ্নের জবাব আমরা পাই আল্লাহর রসুলের (দ:) জীবনী থেকেই। খন্দকের যুদ্ধের পর বিশ্বাসঘাতক ইহুদি বনু-কুরাইজা গোত্রকে অবরোধ করার জন্য যখন তিনি মোজাহেদদের পাঠিয়ে দিলেন তখন আসরের নামাজের সময় হোতে কিছু বাকি। মোজাহেদদের তিনি রাস্তায় আসরের নামাজ পড়তে নিষেধ কোরে দিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য। আমরা ঠিক তাই কোরেছি। উদ্দেশ্য-জেহাদকে বাদ দিয়ে প্রশিক্ষণকেই উদ্দেশ্য বানিয়ে তাই নিয়ে হুলুস্থুল কোরছি। এর ফল কী হোয়েছে তা এই দুর্ভাগা জাতির ইতিহাস। ফল হোয়েছে শত্র“র দাসত্ব, দাসত্বের ফল হোয়েছে তাদের অনুকরণে এসলামকে জাতীয় জীবন থেকে নির্বাসন দিয়ে মোশরেকে পরিণত হওয়া, মোশরেক হওয়ার ফল হোয়েছে এই যে আজ মসজিদে নামাজ নামে যে প্রহসন হয় তাতে অশিক্ষিত বা অর্দ্ধশিক্ষিত কয়েকশ’ টাকার বেতনভোগী ‘ধর্মীয়’ এমাম সাহেবের পেছনে তার তকবিরের (আদেশের) শব্দে ওঠ-বস করেন সমাজের ‘অধর্মীয়’ অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। সালাহ (নামাজ) শেষ হোলেই কিন্তু ঐ ‘অধর্মীয় নেতারা’ আর ‘ধর্মীয় নেতার দিকে চেয়েও দেখেন না’। কারণ তারা জানেন যে ঐ ‘ধর্মীয়’ নেতার দাম কয়েকশ টাকা বেতনের বেশি কিছুই নয়, জাতীয় জীবনে তার কোন দাম নেই। ঐ ‘ধর্মীয় নেতারা’ অর্থাৎ এমামরা যদি ‘অধর্মীয় নেতাদের’ সামনে কোন ধৃষ্টতা-বেয়াদবি করেন তবে তখনই তাদের নেতৃত্ব অর্থাৎ মসজিদের এমামতির কাজ শেষ। খ্রিস্টানদের পায়রবি কোরতে কোরতে এই জাতি এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, ঐ খ্রিস্টানদের পাদ্রীদেরও তাদের জাতির উপর যেটুকু সম্মান ও প্রভাব আছে, এই ‘এমাম’দের তাও নেই।
আমাদের আজ যারা এসলাম শেখান তাদের এসলাম সম্বন্ধে আকিদা বিকৃত। এই দীনের উদ্দেশ্য কী, ঐ উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়া কী, দীনের মূল্যবোধের গুরুত্ব অর্থাৎ চৎরড়ৎরঃু কী এসব তাদের বিকৃত, উল্টাপাল্টা হোয়ে গেছে। এরা ওয়াজ করেন, শিক্ষা দেন-নামাজ পড়ো নামাজ পড়ো, যেন নামাজই উদ্দেশ্য। নামাজ উদ্দেশ্য নয়, নামাজ প্রক্রিয়া, উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়া। সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে আল্লাহর আইনের শাসনে আনার মত দুরূহ ও বিরাট কাজের দায়িত্ব যে জাতির উপর অর্পণ করা আছে তাদের যে চরিত্র প্রয়োজন, যে কোরবানি করার শক্তির প্রয়োজন, যে ঐক্য ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন তা সৃষ্টি করে এই নামাজ। কিন্তু আজ আর সেই উদ্দেশ্যে নামাজ (সালাহ) পড়া হয় না, এখন নামাজ পড়া হয় ধ্যাণ বা উপাসনার লক্ষ্যে। উদ্দেশ্য হারিয়ে গেছে বোলে নামাজ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের যে চরিত্র সৃষ্টি কোরতে পারতো তাও পারছেনা আকিদার বিকৃতির ফলে। ঠিক সময়ে নামাজ পড়তে হয় কাজেই নামাজ সময়ানুবর্তিতা শেখায়। নামাজ পড়েও যদি কেউ সময়ানুবর্তিতা না শেখে তবে নামাজের ঐ শিক্ষা থেকে সে বঞ্চিত হলো। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কালো-সাদা, পণ্ডিত-মুর্খ সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েও যদি মন থেকে ভেদাভেদ, অহংকার ধুয়ে না যায় তবে নামাজের ঐ শিক্ষা ব্যর্থ হোয়ে গেলো। একই দিকে মুখ করে সবার সাথে একই সঙ্গে ওঠাবসা, রুকু-সাজদা কোরেও মসজিদ থেকে বের হোয়েই নানা মুনির নানা মত হোলে নামাজের কর্মের-ঐক্যের-শিক্ষা ব্যর্থ হোয়ে গেলো। এমামের তকবিরের সাথে সাথে রুকু, এতেদাল, সাজদা কোরেও নামাজের পরই অন্যান্য জাতীয় ব্যাপারে এমামের হুকুমের তোয়াক্কা না কোরলে নামাজের শৃঙ্খলা শিক্ষা সম্পুর্ণ ব্যর্থ হোয়ে গেলো। নামাজ প্রকৃতপক্ষে কী তা বোঝাতে মহানবী (দ:) নামাজকে এসলাম নামক ঘরের একটি খুঁটির সাথে তুলনা কোরেছেন, আর ছাদের সাথে তুলনা কোরেছেন জেহাদকে (হাদিস – মো’য়াজ (রা:) থেকে আহমদ, তিরমিজি, এবনে মাজাহ, মেশকাত)। ঘরের উদ্দেশ্য কী? ঘরের উদ্দেশ্য হলো এই যে- ঐ ঘরের মাধ্যমে যাবতীয় রোদ্র-বৃষ্টি, প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা পাওয়া। এখন প্রশ্ন হলো – রোদ্র-বৃষ্টি থেকে আমাদেরকে বাঁচায় কিসে? অবশ্যই ঘরের ছাদ, খুঁটি নয়। কিন্তু ঐ ছাদকে উপরে ধরে রাখার জন্য আবার থাম বা খুঁটির কোন বিকল্প নেই। কাজেই ঘরের ছাদ, জেহাদই হলো উদ্দেশ্য, তবে যেহেতু খুঁটি বা নামাজ ছাড়া ঐ ছাদ আটকে থাকে না বা জেহাদ করা যায় না, জেহাদের চরিত্র- ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্য সৃষ্টি হয় না তাই নামাজের এত প্রয়োজনীয়তা, বাধ্যবাধকতা। এটা সর্বক্ষণ মনে রাখতে হবে – নামাজ উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান যোগায়। তাই রসুলাল্লাহ তাঁর উপরোক্ত বাণীতে নামাজকে ছাদও বলেন নি, ঘরের ভিত্তিও বলেন নি, দরজা জানালাও বলেন নি, নির্দিষ্ট কোরে বোলেছেন থাম-খুঁটি। এই কথাটি তিনি একবার বলেন নি একাধিকবার বোলেছেন, কোন বারই নামাজকে খুঁটি ছাড়া অন্য কিছু বলেন নি। আর ঘরের ছাদ ঐ খুঁটি ছাড়া রাখা সম্ভব নয় বোলেই ঐ খুঁটির জন্য- খুঁটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এত তাগিদ, জেহাদি চরিত্র ছাড়া জেহাদ সম্ভব নয় বোলেই ঐ জেহাদি চরিত্র সৃষ্টির জন্য এত তাগিদ। কিন্তু যদি ছাদ না থাকে তবে ঐ থামের যেমন প্রয়োজন নেই- তেমনি জেহাদ ও সর্বাত্মক সংগ্রাম যদি না থাকে তবে নামাজেরও প্রয়োজনীয়তা নেই। বিশ্বনবীর (দ:) সময়ে আরব জাতি কেমন ছিলো তা বলার দরকার করে না; তা ইতিহাস। গোত্রে গোত্রে পরিবারে পরিবারে এত বিভক্তি এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ-রক্তপাত, বংশানুক্রমে হত্যা ও তার প্রতিশোধ, বিশৃঙ্খলা এমন একটা পর্যায়ে ছিলো যে, বোধহয় পৃথিবীর আর কোথাও ঐ পর্যায়ে ছিলো না। কিন্তু মাত্র কয়েকটি বছরের মধ্যে সেই বিশৃঙ্খল জাতিকে নিয়ামানুবর্তিতা, ঐক্য ও শৃঙ্খলার চূড়ান্তে নিয়ে গিয়েছিলো এই নামাজ। নামাজের ছাঁচে (গড়ঁষফ) ফেলে পৃথিবীর সবচেয়ে শৃঙ্খলা বিরোধী জাতিকে কিসে রূপান্তর করা হোয়েছিলো তার উদাহরণ এই জাতির ইতিহাসে বহুবার পেয়েছি। ওমরের (রা:) আদেশে মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম চির অপরাজিত সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা:) তার পদ ছেড়ে একেবারে সাধারণ সৈনিক হোয়ে গেলেন; খলিফা সোলায়মানের আদেশে সিন্ধু-বিজয়ী সেনাপতি মহাবীর মোহাম্মদ বিন কাসেম বিনা বাক্যব্যয়ে তার পদ ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলেন। এদের দু’জনেরই সেনাবাহিনীর মধ্যে এত সমর্থক ছিলো যে তারা যদি খলিফার আদেশ অমান্য কোরতেন তবে তা জাতির ঐক্য ও শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্থ কোরত। আরও একটি অন্য রকমের উদাহরণ দেয়ার লোভ সংবরণ কোরতে পারছি না। এটা মহান সাহাবা আবু যরের (রা:) জীবনী থেকে। হজ্বের সময় মহানবী (দ:) মিনায় চার রাকাতের জায়গায় কসরের দু’রাকাত সালাত পড়তেন। স্বভাবতঃই পরে আবু বকর (রা:), ওমর (রা:) এরাও রসুলের (দ:) অনুসরণ কোরে মিনায় কসরের দু’রাকাত সালাত পড়তেন। ওসমানের (রা:) খেলাফতের সময় ওসমান (রা:) মিনায় কসর না পড়ে পুরা চার রাকাত সালাত পড়লেন, অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে সুন্নাহর খেলাপ কোরলেন। অবশ্য পরে তিনি তার ঐ কাজ করার কারণ সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা ছিলো এই যে, মিনার কাছেই তার কিছু জমি-সম্পদ ছিলো, কাজেই তার জন্য মিনায় কসর হয় না। সে যাই হোক আবু যর (রা:) এই খবর শুনে প্রথমতঃ খুব চটে গেলেও পরে নিজেই ওসমানকে (রা:) অনুকরণ কোরে মিনায় সেই চার রাকাত নামাজ পড়লেন। কারণ হিসেবে বোললেন, “রসুলাল্লাহ (দ:) বলে গেছেন যে, এমামকে – নেতাকে বিনা বাক্যব্যয়ে অনুসরণ কোরতে হবে। যদি সে নেতা কান কাটা নিগ্রো ক্রীতদাসও হয় (হাদিস – ইরবাদ বিন সরিয়াহ (রা:) থেকে আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজি, এবনে মাজাহ, মেশকাত)।” সেই নামাজের শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও ঐক্য শিক্ষার ফল। জাতির ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আবু যরের (রা:) মত উচ্চ স্থরের সাহাবীও রসুলাল্লাহর (দ:) নির্দেশ পালন করার জন্য তারই (দ:) সুন্নাহ পর্যন্ত— অমান্য কোরলেন, যদিও ওসমানের (রা:) মত মিনার কাছে তার কোন জমি ছিল না। চার পাঁচ লাখ লোকের একটি জাতির ঐ চরিত্রের আরও অনেক লোক ছিলেন। কিন্তু গত হাজার বছরের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের নামাজ আর একটিও খালেদ (রা:), একটিও মোহাম্মদ বিন কাসেম বা আবুযর (রা:) সৃষ্টি কোরতে পারে নি। এর জন্য নামাজ দায়ী নয়। এর কারণ হলো, নামাজ সম্বন্ধে বিকৃত আকিদা, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশিক্ষণ ও প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্যের স্থান দেয়া। বিশ্বনবী মোহাম্মদ (দ:) এবং সরাসরি তাঁর কাছে থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত আসহাব (রা:) যে আকিদা নিয়ে নামাজ পড়তেন সেই আকিদা নিয়ে নামাজ পড়লে আজও নামাজ আবার আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, খালেদ, আবু ওবায়দা, আবু যর (রা:) সৃষ্টি কোরবে। আসলেই ভবিষ্যতে নামাজ আবার তা কোরবে। যেদিন এই উম্মাহ আবার তার প্রকৃত আকিদা ফিরে পাবে, রসুলাল্লাহর (দ:) শিক্ষার বিপরীত দিকে সে যে আজ চোলছে তা ছেড়ে আবার তাঁর দেখানো পথে চোলতে শুরু কোরবে, সেদিন নামাজ আবার সেই আসহাবদের মতই চরিত্র সৃষ্টি কোরবে, আবার সেই দুর্জয় যোদ্ধা সৃষ্টি কোরবে।
অন্যান্য ধর্মে যে উদ্দেশ্যে উপাসনা করা হয় নামাজও তেমনি উপাসনা- এবাদত, এই আকিদা যে ভুল তার আর এক প্রমাণ এই যে, চোখ বন্ধ কোরে নামাজ পড়া নিষেধ। খোলা চোখের চেয়ে চোখ বন্ধ কোরলে একাগ্রতা, নিবিষ্টতা বেশি আসে এটা সাধারণ জ্ঞান, সবাই জানে। তাই উপাসনা কোরতে সর্ব ধর্মের মানুষই চোখ বন্ধ করে। এমন কি উপাসনা ছাড়াও কোন কিছু গভীরভাবে চিন্তা কোরতে গেলেও মানুষের চোখ আপনা থেকে বুঁজে আসে। অথচ চোখ বন্ধ কোরে নামাজ পড়া নিষেধ। কেন? এইজন্য যে একাগ্রতা-নিবিষ্টতা এখানে লক্ষ্য নয় এখানে লক্ষ্য হোচ্ছে ট্রেনিং, শৃঙ্খলা শিক্ষা, সামরিক বাহিনীর সৈন্যরা কুচকাওয়াজ কোরে যে ট্রেনিং প্রশিক্ষণ নেয়। কোন সামরিক বাহিনীর কমান্ডার যে কারণে তার সৈন্যদলকে চোখ বন্ধ কোরে কুচকাওয়াজ কোরতে দেবেন না, ঠিক সেই কারণে চোখ বুঁজে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। নামাজের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভুল আকিদার অধিকারী বর্তমান মোসলেম জাতি নামাজে নিবিষ্টতার যে দাবি করেন- নামাজের চৌদ্দটি ফরয, চৌদ্দটি ওয়াজেব, সাতাশটি সুন্নাত আর বারটি মোস্তাহাব খেয়াল রেখে সেই নিবিষ্টতা অসম্ভব এ কথা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। নামাজ যদি অন্যান্য ধর্মের উপাসনার উদ্দেশ্যেই বাধ্যতামূলক (ফরজ) করা হতো, তবে এক পায়ে একটু বেশি ভর দিয়ে দাঁড়ালে নামাজ ত্র“টিযুক্ত হোয়ে যেতো না। কারণ, এক পায়ে বেশি ভর দিয়ে দাঁড়ালে আল্লাহর প্রতি মনসংযোগ কোরতে কোন প্রতিবন্ধকতা হয় না। আসল কথা হোচ্ছে, যে সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য সমস্ত জীবনব্যবস্থা রদ, বাতিল কোরে দীনুল এসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য এই জাতি ‘উম্মাহ’কে সৃষ্টি করা হোয়েছে সেই কাজ সফলভাবে করার জন্য যে মহান চরিত্র ও দুর্দ্ধর্ষ যোদ্ধা দরকার তা তৈরি করার ট্রেনিং-প্রশিক্ষণ হোচ্ছে নামাজ। তাই এই উম্মাহর স্রষ্টা পরিষ্কার বোলে দিয়েছেন এসলামের ঘরের থাম খুঁটি হোচ্ছে নামাজ, ছাদ হোচ্ছে জেহাদ, সর্বাত্মক সংগ্রাম। তাঁর কথার উপর আর অন্য কোন কথা নেই। নামাজের ঐ বুনিয়াদী অর্থ ছাড়াও নামাজ মানুষের দৈহিক, মানসিক, আত্মিক এক কথায় মানুষের পূর্ণ জীবনের প্রত্যেকটি দিকের উপর প্রভাব বিস্তার করে। শুধু তাই নয়, নামাজের মাধ্যমে জাতির রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ও নীতি-নির্দেশনা পর্যন্ত— রোয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে অত গুরুত্বপূর্ণ হোলেও নামাজ উদ্দেশ্য নয় নামাজ প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ। নামাজ যে উদ্দেশ্য নয়-উদ্দেশ্য পূরণের প্রশিক্ষণ, তার আরও সরাসরি প্রমাণ আছে। নামাজের প্রশিক্ষণের যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ জেহাদ যখন এসে যেতো তখন মোসলেমরা নামাজ পড়তেন না, এটা ইতিহাস এবং একবারের ইতিহাস নয়, বহুবারের ইতিহাস। পৃথিবীর কোন সৈন্য বাহিনীই যুদ্ধের সময় প্যারেড-কুচকাওয়াজ করে না, ট্রেনিং নেয় না, তখন তারা যুদ্ধ করে, একথা জানেনা এমন অজ্ঞ বোধহয় কোথাও নেই। কারণ, সৈন্যবাহিনী তখন কোরছে সেই কাজ- যে কাজের জন্য তারা এতদিন এত প্রশিক্ষণ নিয়েছে- যেটা তাদের আসল উদ্দেশ্য। মোসলেমরাও তা’ই কোরেছেন, কারণ তারা জানতেন নামাজের উদ্দেশ্য কী? নামাজ সম্বন্ধে তাদের আকিদা সঠিক ছিলো। ইয়ারমুকের যুদ্ধ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত— ছয়দিন যাবৎ চোলেছে। এই ছয়দিন মোসলেম বাহিনী সারাদিন কোন নামাজ পড়েছে বোলে কোন ইতিহাসবেত্তা উল্লেখ করেন নি। যদিও প্রত্যেক দিনের যুদ্ধের বি¯তৃত বিবরণ, এমনকি বহু ছোট ছোট ঘটনার উল্লেখ আছে- কে কি বোলেছেন তা পর্যন্ত— লেখা আছে। ইয়ারমুকে এক হাজারের বেশি আসহাব (রা:) উপস্থিত ছিলেন, যারা আল্লাহর রসুলের (দ:) কাছ থেকে সরাসরি এসলাম শিক্ষা কোরেছিলেন, এমন কি আশরাতুল মুবাসশারা থেকে অন্ততঃ একজন- আবু ওবায়দা (রা:) উপস্থিত ছিলেন। এদের একজনও একথা বলেন নি যে নামাজের সময় হোয়েছে যুদ্ধ থামাও। বলেন নি, কারণ এখনকার ধর্মীয় নেতাদের মতো তাদের গুরুত্ব (চৎরড়ৎরঃু) উল্টো হোয়ে যায় নি। আজ যারা নামাজ পড়ো, নামাজ পড়ো বোলে গলা ফাটান, নামাজকেই উদ্দেশ্য মনে করেন, তাদের কাছে নিবেদন এই যে- প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বাদ দেন, যুদ্ধের শুধু প্রস্তুতিমূলক কাজেও নামাজ বাদ দেয়ার শিক্ষা স্বয়ং মহানবী (দ:) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে অন্যদের সঙ্গে পরিখা খননকালে তিনি (দ:) আসরের নামাজ পড়েন নি এবং অবশ্যই অন্য আর কেউই পড়েন নি। মনে রাখবেন শত্র“ সৈন্যবাহিনী তখনও এসে পৌঁছায়নি। বিশ্বনবী (দ:) কি দশ মিনিটের জন্য কাজ বন্ধ রেখে আসরের মাত্র চার রাকাত নামাজ পড়ে নিতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু পড়েন নি। পড়েন নি আমাদের জন্য উদাহরণ রেখে যাওয়ার জন্য, যেন আমরা যে জিনিসের যে গুরুত্ব তাই যেন দেই, যেন উল্টা-পাল্টা না কোরে ফেলি, প্রক্রিয়া প্রশিক্ষণকে যেন উদ্দেশ্যের আসনে না বসাই। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে তো পরের কথা, সামান্য পাহারা দেওয়ার কাজেও মহানবী (দ:) বোলেছেন এক রাত্রির পাহারা বহু বছরের নফল নামাজের চেয়ে বড়। নামাজ বড় না যুদ্ধ বড়, অগ্রাধিকারের এই প্রশ্নের জবাব আমরা পাই আল্লাহর রসুলের (দ:) জীবনী থেকেই। খন্দকের যুদ্ধের পর বিশ্বাসঘাতক ইহুদি বনু-কুরাইজা গোত্রকে অবরোধ করার জন্য যখন তিনি মোজাহেদদের পাঠিয়ে দিলেন তখন আসরের নামাজের সময় হোতে কিছু বাকি। মোজাহেদদের তিনি রাস্তায় আসরের নামাজ পড়তে নিষেধ কোরে দিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য। আমরা ঠিক তাই কোরেছি। উদ্দেশ্য-জেহাদকে বাদ দিয়ে প্রশিক্ষণকেই উদ্দেশ্য বানিয়ে তাই নিয়ে হুলুস্থুল কোরছি। এর ফল কী হোয়েছে তা এই দুর্ভাগা জাতির ইতিহাস। ফল হোয়েছে শত্র“র দাসত্ব, দাসত্বের ফল হোয়েছে তাদের অনুকরণে এসলামকে জাতীয় জীবন থেকে নির্বাসন দিয়ে মোশরেকে পরিণত হওয়া, মোশরেক হওয়ার ফল হোয়েছে এই যে আজ মসজিদে নামাজ নামে যে প্রহসন হয় তাতে অশিক্ষিত বা অর্দ্ধশিক্ষিত কয়েকশ’ টাকার বেতনভোগী ‘ধর্মীয়’ এমাম সাহেবের পেছনে তার তকবিরের (আদেশের) শব্দে ওঠ-বস করেন সমাজের ‘অধর্মীয়’ অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। সালাহ (নামাজ) শেষ হোলেই কিন্তু ঐ ‘অধর্মীয় নেতারা’ আর ‘ধর্মীয় নেতার দিকে চেয়েও দেখেন না’। কারণ তারা জানেন যে ঐ ‘ধর্মীয়’ নেতার দাম কয়েকশ টাকা বেতনের বেশি কিছুই নয়, জাতীয় জীবনে তার কোন দাম নেই। ঐ ‘ধর্মীয় নেতারা’ অর্থাৎ এমামরা যদি ‘অধর্মীয় নেতাদের’ সামনে কোন ধৃষ্টতা-বেয়াদবি করেন তবে তখনই তাদের নেতৃত্ব অর্থাৎ মসজিদের এমামতির কাজ শেষ। খ্রিস্টানদের পায়রবি কোরতে কোরতে এই জাতি এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, ঐ খ্রিস্টানদের পাদ্রীদেরও তাদের জাতির উপর যেটুকু সম্মান ও প্রভাব আছে, এই ‘এমাম’দের তাও নেই।
No comments:
Post a Comment