Sunday, June 7, 2015

মানব কল্যাণে ধর্মের সঠিক ব্যবহারের উপায়

মানব কল্যাণে ধর্মের সঠিক ব্যবহারের উপায়



ইউরোপের মধ্যযুগে খ্রিষ্টধর্মের ব্যর্থতা প্রকট আকার ধারণ করায় সে সময় ধর্ম মানুষের পার্থিব জগতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এর মূল কারণ হচ্ছে, খ্রিষ্ট ধর্ম আলাদা কোন পরিপূর্ণ ধর্ম ছিল না। মূলত ইহুদিদের আত্মিক দিক সংশোধন করার জন্য ঈসা (আ.) এর আগমন ঘটে। কেননা, সে সময়টিতে ইহুদিরা মুসার (আ.) আনীত আইন-কানুন ঠিকই প্রতিষ্ঠা রাখলেও সেটা প্রাণহীন অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্মে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। সে সময় ধর্মের অতি পণ্ডিত এবং একশ্রেণির ধর্মব্যবসায়ীদের অপব্যাখ্যার কারণে মানুষের মৌলিক সমস্যা সমাধানের চেয়ে স্রষ্টার এবাদত-উপাসনাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ধর্ম সমাজকে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল। ধর্মকে মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য ঈসা (আ.) কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেই সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদীরা চিন্তা করে দেখল যে, ঈসা (আ.) এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সমাজে তাদের আর কোন প্রয়োজন থাকবে না। তারা যে সম্মান, প্রতিপত্তি ভোগ করছে তারও ইতি ঘটবে। এ কারণে তারা সম্মিলিতভাবে ঈসা (আ.) এর বিরোধিতা শুরু করল। কিন্তু নিজেরা কুলোতে না পেরে তারা শরণাপন্ন হলো তৎকালীন রোমান শাসকদের। এর পরে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এ সম্বন্ধে কম- বেশি জানা আমাদের সকলেরই আছে।

এদিকে ঈসা (আ.) এর অনুপস্থিতিতে তাঁর অনুসারীরা কোণঠাসা হয়ে গেল। কিন্তু জীবিতকালে বিরোধিকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন (পল) তাঁর শিক্ষাকে মেনে নিয়ে সে আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে নামলেন। ঈসা (আ.) এর জন্মস্থানে ইহুদিরা সেটা কোনভাবেই মেনে নিলনা। ব্যর্থ হয়ে পল সেটাকে দূরবর্তী এলাকায় প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করলেন। যাই হোক, দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলসহ নানাবিধ কারণে ইউরোপের একটি বিশাল এলাকা সে ধর্মটিকে গ্রহণ করে নিল। কিন্তু সেই ধর্ম দিয়ে পার্থিব জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে সে সময়ের রাজা-বাদশাহরা পড়ে গেলেন মহা মুশকিলে। কেননা, আংশিক সে ধর্মটিতে পার্থিব জীবন পরিচালনার জন্য কোন আইন-কানুন বিদ্যমান ছিল না। কেননা, ঈসা (আ.) আনীত শিক্ষাটুকু ছিল জুডাই ধর্মের সংশোধনী মাত্র। এটা কখনোই পরিপূর্ণ ধর্ম নয়।

ইউরোপ এই ধর্ম গ্রহণ করায় মধ্যযুগে সে সমস্যাটি ভয়ানক আকার ধারণ করল। ফলে সৃষ্টি হলো ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ এক সংঘাত। এ সংঘাতের ফলে ধর্ম পরাজিত হয়ে ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে গেল। ধর্ম এবং রাষ্ট্রের সংঘাত সৃষ্টির অন্যতম কারণ ছিল খ্রিষ্ট ধর্মের নানাবিধ কুসংস্কার, যা ধর্মটিতে প্রক্ষিপ্ত হয় নানাভাবে। এই কুসংস্কারের কারণে পুরো ইউরোপবাসীর মনে ধর্ম সম্বন্ধে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়। পরবর্তীতে ইউরোপে রেঁনেসা ও শিল্পবিপ্লবের ফলে তারা সারা পৃথিবীর উপর কর্তৃত্ব লাভ করতে সক্ষম হয়। বিজয়ী জাতি হিসেবে তাদের সভ্যতা, ধ্যান-ধারণা তাদের অধীনস্ত বিশ্বেও প্রতিষ্ঠিত হয়।

আধুনিক বিশ্বে ইউরোপীয়দের আধিপত্যকে অস্বীকার করা যায় না। কম-বেশি সবাই আজ তাদেরকে অনুসরণ করছে। এর ফলে ইউরোপীয়দের মতই বিশ্বজুড়ে ধর্মকে কোণঠাসা করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ধর্মের অবস্থান কি মানব সভ্যতার উন্নতির অন্তরায়? ধর্ম কি সভ্যতা বিনির্মাণে, মানুষকে মানবিক দিক দিয়ে উন্নত করতে কোন ভূমিকাই রাখেনি? মানবজাতির ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ধাপে ধাপে তাদের আজকের প্রগতি ও উন্নতিতে ধর্মই মূলত প্রধান ভূমিকা পালন করে এসেছে। এখন সেই ধর্মকে মানুষের জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কি সঠিক কোন পদক্ষেপ হতে পারে? অথবা ধর্মকে সত্যিকার অর্থেই কি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব? না, মোটেও নয়। ধর্ম মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রোথিত হয়ে আছে। এর বহিঃপ্রকাশ পৃথিবী জুড়েই লক্ষ্য করা যায়। গণতন্ত্রের বিজয়ের এই রমরমা যুগেও ধর্মকে আশ্রয় করা দলগুলোকেই মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে। গণতন্ত্র যদি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র হতো, ইউরোপ-আমেরিকা ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর উপর বিরূপ প্রভাব না ফেলতো, কোন ধরনের হস্তক্ষেপ না করত তবে নিশ্চিত করে বলা যায় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ শাসন করত ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোই।

সুতরাং বোঝা যায়, কোনভাবেই ধর্মকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বরং জোর করে তা করতে গেলে হিতে বিপরীত অবস্থার জন্ম দিচ্ছে। সচেতন মানুষ মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, বর্তমান পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির প্রধান কারণই হচ্ছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে এর নেতিবাচক দিকটি প্রকট আকার ধারণ করলেও সঠিক শিক্ষা দিয়ে মানুষের এই ধর্মবিশ্বাসকে ইতিবাচক রূপ দেওয়া যায়। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত প্রধান প্রধান ধর্মগুলোই আজ দুনিয়াবিমুখ হয়ে গেছে। অর্থাৎ ধর্ম শুধু পরকালীন বিষয়, পার্থিব জগতের উন্নতিতে এর তেমন কোন প্রয়োগ নেই। মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা আর সিনাগগের চার দেয়ালে ধর্মের কার্যক্রম বন্দি হয়ে গেছে। কিন্তু এটা ধর্মের সঠিক প্রয়োগ ক্ষেত্র নয়। ধর্মের মূলবাণীই হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। স্রষ্টার উপাসনার চেয়ে আর্তপীড়িতের সেবা করা, মানবজাতিকে শান্তিময় একটি পৃথিবী উপহার দেওয়াই ধর্মের সার্থকতা। ধর্ম প্রথমত পার্থিব কল্যাণ বয়ে আনবে এবং দ্বিতীয়ত এরই ধারাবাহিকতায় আসবে পারলৌকিক কল্যাণ। পার্থিব কল্যাণ বাদ দিয়ে পারলৌকিক কল্যাণ সম্ভব নয়। কারণ, প্রতিটি ধর্মই একটি স্থানে একমত যে, দুনিয়া হচ্ছে পারলৌকিক জীবনের শষ্যক্ষেত্র। কিন্তু আজকে ধর্মব্যবসায়ী কূপমণ্ডূক ও স্বার্থান্বেষীরা ধর্মগুলোকে সেভাবে প্রয়োগ না করে প্রয়োগ করছে ব্যক্তিগত স্বার্থে। এছাড়াও সঠিক শিক্ষার অভাবে ধর্ম সম্বন্ধে এদের অধিকাংশ মানুষেরই সঠিক ধারণা নেই। তাই ধর্মকে বর্জন নয়, বরং মানবজাতির বৃহৎ সমস্যা, অর্থাৎ অশান্তি দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করাই সঠিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

No comments:

Post a Comment