Saturday, June 13, 2015

গণতন্ত্র, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব

গণতন্ত্র, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব

আতাহার হোসাইন

কাউকে গণতন্ত্র বোঝানোর জন্য আশা করি নতুন করে আর কোন ধরনের তাত্ত্বিক আলোচনার দরকার নেই। কারণ নিত্যদিন আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের কাছে গণতন্ত্রের মহিমা শুনতে শুনতে, টেলিভিশনের পর্দায় বুদ্ধিজীবীদের গুরুগম্ভীর আলোচনা থেকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দেওয়া সংজ্ঞা থেকে এ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান যথেষ্ট পরিপক্ক হয়েছে। এমনকি আমাদের পিতামহের নাম ভাল করে স্মরণ না করতে পারলেও গণতন্ত্রের জনকের নামধাম আমরা এমনভাবে মুখস্ত করে ফেলেছি যে তা সর্বদা আমাদের ঠোটের আগায় থাকে। এ ব্যাপারে আমাদের পূর্ব প্রভু ব্রিটিশদেরকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। কারণ, তাদের হাত ধরেই আমাদের এ ভূ-খণ্ডে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু। সকল কৃতিত্ব তাদেরই পাওনা।
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ নবাব, নবাব সিরাজ উদ দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে মূলত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই উপমহাদেশে তাদের ভিত্তিকে শক্ত করে। তারাই আমাদেরকে গণতন্ত্র দিয়ে গেছে। যদিও দীর্ঘ দু’শো বছরের শাসনকালে তারা একটি বারের জন্যও আমাদের উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেনি। বন্দুকের নল আর চাবুকের ঘায়ের মাধ্যমেই তারা দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে তাদের শাসন কাজ চালিয়ে গেছে। কিন্তু যখন তাদের যাওয়ার সময় হয়েছে তখন তারা ষড়যন্ত্রমূলক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে গোলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা অংশটিকে গণতন্ত্র শিক্ষা দিয়ে নিজেদের দেশে চলে যায়। এদেশীয়দেরকে গণতন্ত্র শিক্ষা দেওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে যেন তারা প্রত্যক্ষভাবে এদেশ ছেড়ে চলে গেলেও মানসিকভাবে তাদের দাসত্ব করে যায় এবং তাদের কাক্সিক্ষত স্বার্থ রক্ষিত হয়। বাস্তবতাও তাই হয়েছে।
১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশকে দু’টি ভাগে ভাগ করে চিরস্থায়ী একটি দ্বন্দ্বের সূচনা করে দিয়ে তারা বিদায় নেয়। নতুন শাসকগণ দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে নতুন কিছু চিন্তা করতে ব্যর্থ হলো। একটি রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য যে সকল আইন-কানুন, অর্থনীতি, দণ্ডবিধিসহ অপরিহার্য বিষয় দরকার তা পূরণ করতে গিয়ে তারা পূর্বোক্ত প্রভুদের কেরানীমানের রেডিমেড বিষয়গুলোকেই ডান বাম না বুঝে পুনরায় এদেশীয়দের উপর চাপিয়ে দেয়। ব্যবধান এতটুকুই যে আগে হুকুম করতো সাদা চামড়ার বিদেশি প্রভুরা আর তখন হুকুম করা শুরু করলো এদেশীয় বাদামী চামড়ার অধিকারীরা। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা আমাদেরকে যে গণতন্ত্র উপহার দিয়ে গেছে তা দিয়ে তারা কখনোই আমাদের শাসন করেনি। যদি তাই করতো তাহলে তারা তৎক্ষণাত এদেশ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হতো। কিন্তু যখন ঐ গণতন্ত্র দিয়ে নতুন শাসকগণ আমাদেরকে শাসন করা শুরু করলো তখন দেখা গেল তা এদেশীয়দের চরিত্রের সাথ কিছুতেই খাপ খায় না। কিছুদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপরিচালকদের ব্যর্থতার কারণে সামরিক বাহিনী শাসন কাজে হস্তক্ষেপ করা শুরু করে। এর ফলে রাষ্ট্রপরিচালক এবং ব্যারাকের অধিবাসীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক নতুন দ্বন্দ্ব। এছাড়াও পূর্ব প্রভুদের ষড়যন্ত্র অর্থাৎ এ অঞ্চলটিকে দুইটি ভাগে ভাগ করে দিয়ে যাওয়ায় কিছুদিন পরপরই তাদের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে সংঘর্ষ একটি স্থায়ী সমস্যার জন্ম দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূ-খণ্ডটি পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ভারতের সহযোগিতায় ১৯৭১ সালে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে। এখানে বলা আবশ্যক যে ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক উপায়ে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করায় মূলত এদেশীয়রা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হয়। আরো মনে রাখা আবশ্যক- এখানেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়।
এবারে নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার পরপরই পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হাত ধরে যখন নতুন যাত্রার সূচনা করে তখন আবারও জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সেই গণতন্ত্রকেই বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক বছর পার না হতেই বঙ্গবন্ধুর মত একজন শাসকও গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে, প্রায় সকল গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করে এদেশের একচ্ছত্র অধিপতি বনতে বাধ্য হন। অথচ এদেশের মানুষ এমনিতেই বঙ্গবন্ধুর হাতে নির্দ্বিধায় এদেশের মালিকানা তুলে দিয়েছিল। এর অবধারিত ফলাফল দেখা দেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালো রাত্রিতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার ফিরে যায় ১৯৪৭ সাল পরবর্তী পাকিস্তানের ধারায়। সামরিক বাহিনীর নানা ধরনের হস্তক্ষেপে বিভিন্ন উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে দেশ খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে থাকে। ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মেজর জিয়া ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্টিত হন। তার হাত ধরেই পরে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে শেখ মুজিব আমলের আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো আবার স্বমূর্তিতে ফিরে আসে। ফলে জাতি আবার বিভিন্ন দল, মত ও আদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এরপর ১৯৮১ সালে একদল বিপথগামী সামরিক সদস্যের হাতে মেজর জিয়াউর রহমান নৃশংসভাবে নিহত হন। এরপরে ফিরে আসে আরেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমল। দীর্ঘ ৯ বছর মূলত সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় তিনি স্বৈরশাসকের ভূমিকা পালন করেন। নানাবিধ আন্দোলন ও দমনপীড়নের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালে তার পতন হলে আবার ফিরে আসে সংসদীয় গণতন্ত্রের যুুগ। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর এই গণতন্ত্রের নানাবিধ পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে দেশ পার করে এসেছে। এই সময়টাতে আমরা দেখেছি গণতন্ত্রের নামে দু’টি প্রধান বৃহৎ দল মূলত ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করার জন্য একে অপরকে কোনঠাসা ও নির্মূল করতে গিয়ে পারস্পরিক লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে। দীর্ঘ এই ২৪ বছরেও দেশ পরিচালনার জন্য সুষ্ঠু ও স্থায়ী কোন পদ্ধতি তারা ঠিক করতে পারেনি। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য হেন কোন কাজ নেই যা তারা করেনি। টার্গেট ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে যার যার আখের গোছানো। অপরদিকে নামে সংসদীয় গণতন্ত্র হলেও বাস্তবে দেখা গেছে নির্বাচিত কোন বিরোধী দলই সংসদে তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। সংসদে লাগাতার অনুপস্থিতি, রাজপথে আন্দোলনের নামে জনগণের জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি, হরতাল-অবরোধ করে তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। এটা বিরোধী দলে যখন যে দলই গিয়েছে সে দলই করেছে। সর্বশেষ গত জাতীয় নির্বাচনের প্রায় তিন চার বছর আগে থেকেই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন করার আইনী প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করে বিগত আমলের আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাক্কালেই ধারণা করা হয়েছিল এর ফলে নির্বাচনকালে একটি সাংঘাতিক জটিলতার সৃষ্টি হবে। সেই ধারণাকে বাস্তবায়ন করে গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই শুরু হয় সহিংস কর্মকাণ্ড। ধারাবাহিক আন্দোলন, হরতাল- অবরোধ, রাজপথে মানুষ হত্যা, চলন্ত গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মানুষ দগ্ধ করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আন্দোলনকারীদের নিহত হওয়া এই ছিল নিত্য- নৈমত্তিক ঘটনা। কিন্তু এসব বিষয়কে পাত্তা না দিয়ে সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানেই বদ্ধপরিকর থাকে। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে বিজয়ী হওয়ার মত বিশ্বাস না থাকায় ১৮ দলসহ বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে নির্বাচন প্রতিরোধ করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই যা হওয়ার তাই হয়েছে। কিন্তু যৎসামান্য ভোটারের উপস্থিতি হলেও সেই ফলাফল নিয়েই আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আরোহন করে।
কিন্তু নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের কঠোরতার কারণে বিরোধী দল আপাতত কিছুটা চুপ থাকলেও তারা যে এ সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবে না তা তাদের কথাবার্তায় ইতোমধ্যেই পরিষ্কার করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই সরকারকে অবৈধ ও স্বৈরাচারী আখ্যা দিয়ে সরকারকে উচ্ছেদ করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতাকর্মীদেরকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে ক্ষমতাসীন সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হাস্যকর হয়ে পড়ায় এখন গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবিরা দেশের স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে বিভিন্ন যু্িক্ত-তর্কের মাধ্যমে সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী বিরোধী দল যা খুশি করে দেশের উন্নয়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং তাদের এই নৈরাজ্য বন্ধ করার জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে এবং প্রয়োজনে ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’ প্রতিষ্ঠা করে দেশকে স্থিতিশীলতা দান করতে হবে। সরকারের আচার-আচরণ থেকে মনে হয় সরকার বিরোধী দলের সাথে কোন ধরনের সমঝোতা না গিয়ে সেই পথেই হাটছে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশালের নামে একই ধরনের শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর ফলাফল মোটেই আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর হয়নি। তাদেরকে এর জন্য দীর্ঘ ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছিল। একইভাবে বর্তমান আওয়ামী লীগ একদিকে গণতন্ত্রের বকচ্ছপ রূপ অর্থাৎ ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’র দিকে হাটছে এবং সেই সাথে বিরোধী মতকে নির্মূল করার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে যা তাদের ক্ষমতাকে নিস্কন্টক করার পরিবর্তে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভোগান্তিত টেনে আনতে পারে। বিএনপির পক্ষ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশনা থেকে অন্তত তাই ধারণা করা যায়।
শেষ কথা হচ্ছে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটা, এই তিনটি ধাপের কোথাও গণতন্ত্র তার অনিবার্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। বরং স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪২ বছরে আমরা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আরো বিভক্তি, আরো মতভেদে জড়িয়ে আটকে মাকড়সার জটিল জালে আবদ্ধ হয়ে গেছি। সামান্য সময়ের জন্যও এই জীবনব্যবস্থাটি আমাদেরকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয়নি। এর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একদিকে গুটিকয় মানুষকে অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছে অপরদিকে বৃহত্তর জনসংখ্যাকে দারিদ্রের নিুসীমায় ফেলে দিয়েছে। সামাজিকভাবে অনৈতিকতা প্রশ্রয় পেয়ে মানুষ পশুত্বের পর্যায়ে নেমে গেছে। ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা গণতন্ত্রের এই যাত্রা থেকে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, পাশ্চাত্যের তৈরি করা গণতন্ত্র এদেশীয় জনগণের জন্য কাছে মোটেই উপযুক্ত কোন শাসনব্যবস্থা নয়। এ ব্যবস্থা আমাদেরকে স্থায়ী কোন সমাধান দিতে অক্ষম। বরং এ ব্যবস্থা যুগের যুগের পর সমস্যাকে শুধু জিইয়েই রাখবে।
এই অবস্থা থেকে ফিরে আসতে হলে বর্তমানে সরকারি দল, বিরোধী দলসহ ছোট দল, বড় দল এবং সাধারণ মানুষকে একটি কঠিন সত্যকে স্বীকার করে আমাদের আগামী দিনের পথ চলা নির্ধারণ করতে হবে। একথা অনস্বীকাকার্য যে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই দাবি করে থাকে যে তারা সাধারণ মানুষের উন্নতির জন্যই সবকিছু করে থাকে। যদি সত্যই তাই হয় অথবা ঐ কথায় নিজেদেরকে সত্যবাদী প্রমাণ করতে হয় তবে তাদেরকে বুঝতে হবে যে বিদেশিদের শেখানো ওসব কাগুজে তত্ত্ব এ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না এবং তা এদেশের মানুষ মনেপ্রাণে কখনোই মেনে নেবে না। কারণ, এদেশের মানুষ দীর্ঘকাল থেকেই ধর্মীয় আদেশ নিষেধের প্রতি শ্রদ্ধাভাবাপন্ন এবং অনুগত। সুতরাং তাদের ধারণকৃত বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে মূল্যায়ন করেই আমাদের ভবিষ্যত সমাজব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। আর সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কিংবা জোর করে কখনোই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এমনকি সীমাহীন প্রাচুর্যে ডুবিয়ে রাখলেও মানুষ কাক্সিক্ষত সুখ পাবে না। কারণ যা তাদের বিশ্বাসের সাথে খাপ খায় না তা বল প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠা করলেও আত্মার ক্ষুধা রয়েই যাবে। এই অভাব তাদেরকে বার বার বিক্ষুব্ধ করে তুলবে। বার বার বিদ্রোহী করে তুলবে। এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ আজকের পাশ্চাত্য সমাজ। কি নেই তাদের? বিত্ত-বৈভব, সুন্দর স্ন্দুর বাড়ি-গাড়ি কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু ওসব থাকা সত্ত্বেও তারা মনের দিক থেকে, আত্মার দিক থেকে উ™£ান্ত। বিলাসবহুল আলীশান বাড়ি-গাড়ি নিয়ে বসবাস করলেও তারা নিজেদেরকে সুখী মনে করতে পারে না। তাই যে কোন দারিদ্রপীড়িত দেশ থেকেও তাদের খুন, ধর্ষণ ও বিশেষ করে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। অথচ অর্থবিত্তের কল্যাণে তার উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে মনে রাখতে হবে যে সকল রাজনৈতিক দল মুখে বড় বড় কথা বলে মানুষকে দলে ভেড়াতে চায় তাদের কথায় প্রলুদ্ধ না হয়ে নিজেদেরকে আরো অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও আরো বেশি সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতা তাদর হাতে তুলে দিয়ে নিজেদের অর্জিত সহায়-সম্পদ তাদের ভোগ্যপণ্যে পরিণত করে কোনভাবে প্রকৃত কল্যাণ পাওয়া যাবে না। তাই সত্যিকার অর্থেই যারা গণমানুষের ভাষা বুঝবে, তাদের চাওয়া পাওয়া ও বিশ্বাসকে মূল্যায়ন করবে তাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে, তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তি অর্জন করতে হবে। খেয়াল করতে হবে কারা জনকল্যাণের কথা বলে কয়েক দিনের ব্যবধানে একটা বাড়ি-গাড়ি থেকে দশটা বাড়ি-গাড়ি বানায় আর কারা জনকল্যাণে কাজ করতে গিয়ে নিজেদের বাড়ি-গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের সর্বশান্ত করে। কারা বড় বড় কথা বলে, প্রতিশ্র“তির ফুলঝুড়িতে ভাসিয়ে দিয়ে সেই কথা ও প্রতিশ্র“তির খেয়ানত করে আর কারা প্রতিশ্র“তি পূরণার্থে নিজেদের জীবন-সম্পদ বাজি রাখে। আরো খেয়াল করতে হবে কারা নেতৃত্বের লোভে, অবৈধ পথে সম্পদ লাভের আশায় রাজনীতি করে আর কারা মানবতার কল্যাণে সততার সাথে উপার্জন করে। খুব সহজেই এই পার্থক্য বোঝা যাওয়ার কথা। এতটুকু পার্থক্য বুঝতে না পারলে সারা জীবন প্রতারিত হয়ে সবাইকে এমনি করেই গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে।
এখন সময় এসেছে এসব গুণসমূহ বিচার করে যোগ্য লোকেদের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করার। যারা এই ঐক্যবন্ধনীর মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে নেবে তাদের সকলের অভিপ্রায় হতে হবে এই যে, জাতির উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আর অনৈক্য নয়, বিভেদও নয়। বিদেশিদের সৃষ্ট মানদণ্ড দিয়ে নয় বরং আল্লাহ ও রসুলের দেওয়া মানদণ্ড দিয়ে আমাদের জীবনকে পরিচালনা করতে হবে। সততা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা হবে আমাদের চরিত্রে অন্যতম প্রধান গুণ। আমরা জানি শয়তান আমাদেরকে দিয়ে সকল প্রকার বিভক্তি বিভাজন সৃষ্টি করায়। ঘৃণা, সহিংসতা, পরধনে লোভ, আমানতের খেয়ানত, ক্ষমতার মোহ ইত্যাদি খারাপ দিকগুলোর দিকে ধাবিত করে। অপরদিকে যাবতীয় সদগুণগুলো আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। সুতরাং কোন তন্ত্র-মন্ত্র নয়, আমাদের হৃদয়ের গহীনে থাকা চেতনা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে জাগ্রত করে তারই আলোকে আমাদের ভবিষ্যত পথ নির্ধারণ করতে হবে। স্রষ্টা আমাদেরকে তা দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তা গ্রহণ না করে আমরা কোন পথে চলেছি আর বিনিময়ে কি পাচ্ছি তা কি ভেবে দেখার সময় এখনও হয় নি?

No comments:

Post a Comment