Saturday, June 13, 2015

মানবতার কল্যাণে আগত ধর্ম আজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের হাতিয়ার

মানবতার কল্যাণে আগত ধর্ম আজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের হাতিয়ার

মোখলেসুর রহমান
যুগে যুগে আল্লাহ পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে নবী-রসুলদের মাধ্যমে দীন তথা ধর্ম পাঠিয়েছেন মানবতার কল্যাণের জন্য। মানবতা যখন ভূ-লুণ্ঠিত, মানুষ যখন অধিকারবঞ্চিত, অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা, বিবাদ, বিভক্তি, হানাহানি ইত্যাদিতে লিপ্ত তখনই মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে মুক্তির বার্তা, কল্যাণময় দীন নিয়ে মহামানবদের আগমন ঘটেছে। আরবসমাজ যখন তদ্রুপ বর্বর জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত, সীমাহীন অনৈক্য, গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ, সংঘাতে লিপ্ত তখন সেখানে প্রেরিত হন এমনই একজন মহামানব, মানবতার মুক্তির দিশারী, মহানবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)। তিনি মিটিয়ে দিলেন আরবের সব অনৈক্য, ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত, রক্তপাত, যুলুম, অন্যায়, অবিচার। জাতিকে করলেন ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল। অধঃপতিত সেই সমাজকে রূপান্তরিত করলেন কল্যাণময় সমাজব্যবস্থায়। সমস্ত আরব উপসাগরীয় এলাকাকে ঐক্যবদ্ধ করে তিনি চলে গেলেও তার দায়িত্ব শুধু ঐ আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সমস্ত মানবজাতির জন্য প্রেরিত, যে জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে উপাধী দিয়েছেন রাহমাতাল্লিল আলামিন অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবীর জন্য রহমতস্বরূপ। সমস্ত মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যই তাঁর আগমন। তাঁর প্রয়াণের পর এই অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার জন্য তাঁর আসহাবগণ ছড়িয়ে পড়লেন সমস্ত পৃথিবীতে। মাত্র ৬০/৭০ বছরের ব্যবধানে অর্ধেক পৃথিবীর বিশাল জনগোষ্ঠীকে কল্যাণময় এই দীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করলেন। সেই অর্ধেক পৃথিবীতে তারা মানবতা, ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করলেন। সকল বৈষম্য দূর করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন। এর পর যা ঘটল তা একটি দুঃখজনক ইতিহাস যা সবারই জানা। রসুলাল্লাহর আসহাবদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই মহান দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে নেতৃত্ব ও অন্যান্য ক্ষুদ্র স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়লেন। সেই থেকে শুরু। সেই ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত আজও থামেনি। সেই অনৈক্যের ধারাবাহিকতায় বিশাল সেই জাতিটি আজ একেকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে যাদের অবস্থা আরবের সেই জাহেলিয়াতের সময়ের মতই। আর তার একটি ফল হয়েছে এই যে, মানবতার কল্যাণের জন্য যেই জীবনব্যবস্থাটির আগমন, আজ তা উদ্দেশ্য হারিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে। পূর্বাপর অন্যান্য বিকৃত দীনগুলোর মত এই দীনের অনুসারীদের মধ্যেও সৃষ্টি হল একটি আলেম শ্রেণি যারা দীনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, মতবিরোধ, ফতোয়াবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও অনৈক্যের বীজ বপন করে রেখেছে। সাধারণ মানুষের ধর্মের প্রতি অনুরাগ ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এহেন মিথ্যা নাই যার আশ্রয় তারা নেয় না। আর এই কাজটি তারা স্বাচ্ছন্দেই করতে পারে এই জন্য যে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি দুর্বলতা আছে। সাধারণ মানুষ তাদেরকে ধর্মের ধারক-বাহক বলেই মনে করে। মানুষের এই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তারা অনেক মিথ্যাকে সত্য বলে, অন্যায়কে ন্যায় বলে, কপটকে সাধু বলে বৈধতা দিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের উপর তাদের এই প্রচ্ছন্ন প্রভাব বিবেচনায় তারা বিভিন্ন সময়ে অনেকের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যদি চিন্তা করি তাহলে দেখা যায়, কতিপয় রাজনৈতিক দল ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণিটিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটে থাকে। ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই এমন অনেক দল ও ব্যক্তি এই বিশেষ শ্রেণিটির সমর্থন পেতে মরিয়া। কারণ এই শ্রেণিটির সমর্থন পেলে তাদের অনেক অবৈধ, অনৈতিক কর্মকাণ্ডও বৈধতা পেয়ে যায়, অসাধু ব্যক্তিরা সাধু বনে যায়। ধর্মজীবীদের অভিনব ফতোয়ায় প্রভাবিত হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার হল, সাধারণ মানুষের এই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে তারা অনেক সময়ই সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যখনই কর্তৃপক্ষের কোন সিদ্ধান্ত বা কাজ তাদের বিরুদ্ধে বা তাদের সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা ধর্ম গেল, ধর্ম গেল বলে একটা হৈ-চৈ ফেলে দেয়। আর সাধারণ মানুষকে নিয়ে সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। তাদেরই আরেকটি দল আছে যারা কর্তৃপক্ষের অনৈতিক সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিয়ে ফতোয়া দেয়।
মানবতার কল্যাণে যেই ধর্মের আগমন তা আজ হয়ে উঠেছে স্বার্থ উদ্ধারের একটি হাতিয়ার। ক্ষুদ্র এই দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীটি যখন পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত, অনৈক্য ও বিবাদে লিপ্ত, মানুষ যখন দিশেহারা তখন ইসলামের ধারক দাবিদার এই শ্রেণিটির উচিৎ ছিল জাতীয় স্বার্থে, মানবতার স্বার্থে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো। জাতির শান্তি কামনায় তাদের প্রচেষ্টা হওয়ার কথা সবচেয়ে অগ্রগামী, যেহেতু তারা মহামানবের আদর্শের অনুসারী বলে নিজেদের দাবি করে। কিন্তু জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের দেখা গেল মহামানবের ঠিক বিপরীত ভূমিকায়। মহামানবের আনীত দীনকে তারা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জাতির বিভক্তি আর সংঘাতকে আরো অবধারিত করে তুলছে। আজ বৃহত্তর স্বার্থে তাদের যেমন উচিৎ এই অনৈতিক পথ পরিহার করা, অন্যথায় সাধারণ মানুষেরও উচিৎ তাদের বয়কট করা। আর যারা বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিল করার জন্য এই বিশেষ শ্রেণিটির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন, তাদেরও এই মোহ থেকে বের হয়ে আসা উচিৎ

No comments:

Post a Comment