Thursday, June 11, 2015

সিস্টেমের বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলার এখনই সময়

সিস্টেমের বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলার এখনই সময়

মসীহ উর রহমান

মা সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ ও বড় আশ্রয়। মা মারা গেলে বাবার কাছে আশ্রয় নেয় সন্তান। মা-বাবার অবর্তমানে বড় ভাই বাবার ভূমিকা নেয়, ছোট ভাই বোনদেরকে সন্তানের মত ছায়া দিয়ে লালন পালন করে। বড় বোনের ভূমিকাও মায়ের তুল্য, পরম মমতায় মায়ের আদর দিয়ে সে বড় করে ছোট ভাই-বোন কে। স্বামীর আশ্রয়ে শত দারিদ্র্য ও দুঃখেও সুখ খুঁজে পায় স্ত্রী। এই হলো মানব সমাজের চিরন্তন চিত্র, মানুষের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সমাজ ও মানুষের যখন এমন একটা অবস্থা এসে দাঁড়ায় যে তার একান্ত নিরাপদ এ আশ্রয়টুকুও হয়ে উঠে বিপজ্জনক তখন আর মানুষের পালাবার জায়গা থাকে না। মানুষ হয়ে পড়ে চরম অসহায়। আমাদের এই সমাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য, চুরি, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ড রোধ করার জন্য সরকার রাস্তায়, হাটে বাজারে, বহিরাঙ্গণে কোটি কোটি টাকা খরচ করে। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সু-প্রশিক্ষিত আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়োজিত রাখা হয়। তারা না হয় রাস্তাঘাটে খুন রাহাজানী নিয়ন্ত্রণ করলেন (যদিও বাস্তবে পারছেন না), কিন্তু মা যদি সন্তানকে হত্যা করে, সন্তান যদি বাবা-মাকে হত্যা করে সেটাকে আইন-রক্ষাকারী বাহিনী কিভাবে ফেরাবেন? অথচ এটা এখন প্রায় রোজকার সংবাদ। অতি-দারিদ্র্য, অতি-বিত্ত বৈভব, মাদকাসক্তি, পরকীয়া, সম্পদের ভাগাভাগি, অপকর্মে বাধা দেওয়া ইত্যাদি নানাবিধ প্রেক্ষাপটে এ ঘটনাগুলি ঘোটছে। প্রায় প্রতিদিনের পত্রিকায় আমরা পড়ছি ছেলে-মেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বাবা-মাকে হত্যা করছে, বাবা-মা সন্তানকে হত্যা করছে, ভাই ভাইকে-বোনকে হত্যা করছে, স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়গুলি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ সময়েই এ জাতীয় সংবাদ আমাদের হৃদয়ে রেখাপাত করে না, কেবল পত্রিকার পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাই।
মানব ইতিহাসে এ জাতীয় ঘটনা আগেও ঘোটেছে কিন্তু সব সময়ই এগুলি ব্যাতিক্রম হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও এই নৃশংসতা হচ্ছে। এ ঘটনাগুলো জাতির জন্য ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের অশনিসংকেত। সেই অশনিসংকেত অনুধাবন করার মত মানুষও সমাজ থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে। সরকার ও গণমাধ্যম ব্যস্ত আছে কেবল অপরাধীর শাস্তিবিধানের কলাকৌশল নিয়ে; যেন শাস্তি দিলেই এসবের সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষ কিভাবে এমন দানবীয় পশু হয়ে গেল, কিসের অভাবে তাদের আত্মা মরে গেল, তারা কেন দিন দিন নীতি নৈতিকতা, দয়ামায়া, ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতাহীন নির্দয়, নিষ্ঠুর হয়ে গেল তা নিয়ে কাউকে চিন্তিত দেখা যাচ্ছে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগেও তো এমন পরিস্থিতি ছিল না। আমরা স্কুলের বইতে পড়েছি, “শিক্ষাহীন মানুষ পশুর সমান”। প্রশ্ন হলো শিক্ষিতের হার ৫০ বছর আগে যা ছিল এখন তার থেকে বেড়েছে না কমেছে? নিশ্চয়ই বহুগুণ বেড়েছে। এই অপরাধগুলি যারা করছে তারাও বেশিরভাগ শিক্ষিত শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। অনেকে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ঘটাচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডগুলি। দারিদ্র্যের যন্ত্রণা দুর্বিসহ হয়ে ওঠায় অনেক বাবা-মা সন্তানকে খেতে দিতে পারছে না, বিক্রী কোরে দিচ্ছে, অনেক সময় হত্যা কোরে ফেলছে। মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতন যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন øেহময়ী মা সন্তানের খুনী হিসাবে আবির্ভূত হয়। হত্যাকাণ্ড ছাড়াও দুর্নীতি, চোরাকারবারী, সন্ত্রাস (রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক), মাদকব্যবসাসহ সব অপরাধেই এখন জড়িত আছে শিক্ষিত এবং উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণী। উন্নত দেশগুলিতে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডগুলি বেশিরভাগই হয় শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিটির দ্বারা। তাহলে এখন স্কুলে কি শেখানো উচিত- “শিক্ষিত মানুষ পশুর সমান”?
হ্যাঁ এর উত্তর দিচ্ছি। আমরা, এই আমরাই এই পশুর রাজত্ব কায়েম করেছি। পশ্চিমা সভ্যতার থেকে ধার করা বস্তুবাদী, আত্মাহীন যান্ত্রিক প্রগতি সর্বস্ব জীবনপদ্ধতি আমাদেরকে দিন দিন পশুতে (অথবা যন্ত্রদানবে) পরিণত করছে। স্রষ্টার দেওয়া দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে, আইন ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে ভারসাম্যযুক্ত (Ballanced) জীবনব্যবস্থাকে আমরা প্রতিপদে প্রত্যাখ্যান করেছি, নীতি-নৈতিকতা, আত্মিক ও মানবিক গুণাবলীর একমাত্র উৎস মহান আল্লাহর প্রদত্ত শিক্ষা ও মূল্যবোধ সেগুলিকে প্রাচীনপন্থী আখ্যা দিয়ে ‘আধুনিক’ হয়েছি। যার ফল এখন চোখে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা সভ্যতা থেকে বিষবৃক্ষ এনে নিজের আঙিনায় রোপণ করেছি। আমার সন্তান এখন গাছের নিচে মরে পড়ে আছে। আমিই আমার সন্তানের হত্যাকারী।
সুতরাং এখনই সময় সিস্টেমের এই বিষবৃক্ষকে শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলার। অস্তিত্ব রক্ষার এটাই একমাত্র উপায়।

No comments:

Post a Comment