কে মুসলমান? কে জান্নাতি
প্রথমত, মুসলমান আজ অখণ্ড কোনো জাতি নেই। মুসলমানের নামের আগে উচ্চারিত হয় তার ফেরকার নাম, মাজহাবের নাম, মতবাদের নাম। শিয়া মুসলমান, সুন্নি মুসলমান, মোহাম্মদী মুসলমান, আহলে হাদীস মুসলমান ইত্যাদি ইত্যাদি। শত শত ফেরকা-মাজহাব সৃষ্টি করে তারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে তর্ক, বাহাস, মারামারি, রক্তারক্তি, যুদ্ধ, খুনাখুনি করতে। পৃথিবীব্যাপী ভিন্নজাতির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এদের যতজন প্রাণত্যাগ করছে, নিজেদের মধ্যে রক্তপাত করে প্রাণত্যাগের ঘটনা তার চেয়ে কম নয়। সে যাই হোক, মুসলমান জান্নাতে যাবে এই যদি তাদের বিশ্বাস হয় তাহলে প্রশ্ন হলো- কোন দল, কোন মত, কোন ফেরকা বা মাজহাবের মুসলমান জান্নাতে যাবে? আল্লাহ কিন্তু বলেছেন, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই (সুরা হুজরাত ১০) এবং রসুলাল্লাহ বলেছেন, ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে নিহত উভয়ই জাহান্নামী (বুখারী ও মুসলিম)।
দ্বিতীয়ত, যে কোর’আনকে তারা এত সম্মান করছে, যতœ করছে, মুখস্থ করছে, নিয়মিত তেলাওয়াত করছে, তাফসীর করছে, ওয়াজ-মাহফিলে উদ্ধৃত করছে সেই কোর’আনের ব্যবহারিক অবস্থান কোথায়? আল্লাহ কোর’আন নাযেল করেছেন মুসলিমদের জীবন-বিধান হিসেবে। অথচ গত কয়েক শতাব্দী থেকে প্রায় পৃথিবীব্যাপী এই জাতির জাতীয় জীবন পরিচালিত হচ্ছে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী জীবনদর্শন মোতাবেক। যারা ব্যবহারিক জীবন থেকে কোর’আনকে প্রত্যাখ্যান করে কেবল ব্যক্তিগত জীবনে তেলাওয়াত করার সংকীর্ণ পরিধিতে আবদ্ধ করে রেখেছে তারা নিজেদের যতই খাঁটি মুসলমান ভাবার চেষ্টা করুক, আল্লাহর চোখে তারা কি মুসলমান বলে বিবেচিত হবেন?
তৃতীয়ত, পৃথিবীর সিংহভাগ প্রাকৃতিক সম্পদ আজ এই জাতির হাতে। এদের রপ্তানিকৃত তেল গ্যাস পুড়িয়ে ইউরোপের কলকারখানা ও যানবাহনের চাকা ঘুরছে। আরবের প্রাকৃতিক সম্পদশালী মুসলিম রাষ্ট্রের নেতারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে শুধু তেল-গ্যাস-সোনা রপ্তানি করে। ফলে হাজার বছর যে আরবরা দারিদ্র্যের কষাঘাত সহ্য করে এসেছে, হঠাৎ তারা ধনে-সম্পত্তিতে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। তাদের বহু মূল্যবান বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ইমারত, যানবাহন অর্থাৎ জীবনমান আজ পশ্চিমাদেরকেও বিস্মিত করে। অর্থব্যয় করার কত পন্থা আছে তা এরা জানে। সাগরের উপর বিশ্রামগৃহ নির্মাণ বা শত তলার ইমারতের উপর আকর্ষণীয় সুইমিং পুল তৈরি করাসহ অতল সম্পদের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া এই আরবদের বিলাসিতা ক্ষেত্রবিশেষে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যা তাদের মানসিক ভারসাম্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ এই জাতিরই অপর অংশে দেখুন, কতই না করুণ পরিস্থিতি বিরাজমান। এদেরই মুসলিম ভাই পেটের ক্ষুধাবৃত্তি নিবারণ করার জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাবার প্রচেষ্টায় নৌকাডুবি-লঞ্চডুবিতে হাজারে হাজারে প্রাণ হারাচ্ছে। এছাড়াও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শুধু কর্মসংস্থানের অভাবে লাখো মানুষকে বুভুক্ষ থাকতে হচ্ছে। গরীব দেশগুলোর এই মুসলিম ভাইদের এতটুকু সাহায্য করতে পাশবিক ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত আরবদের যদি আত্মসম্মানে বাধা লাগে, অন্তত ইউরোপ-আমেরিকার পরিবর্তে এই গরীব দেশগুলোয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করে হলেও এবং ফলশ্র“তিতে কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে হলেও তো সাহায্য করতে পারে। এতটুকু জাতীয় চেতনা যাদের নেই, তারা কি মুসলিম? জাতির এক অংশ লিপ্ত কদর্য বিলাসিতায়, অন্য অংশ বুভুক্ষ কঙ্কালসার- এটা তো মুসলিম জাতির চিত্র নয়।
চতুর্থত, রাজনীতিক বিভক্তি। পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে রাজনীতিক সিস্টেম ধার করে এই জাতির ভেতরেও বিবিধ রাজনীতিক মতবাদকে কেন্দ্র করে সৃস্টি হয়েছে বিবিধ রাজনীতিক দল। জাতীয়তাবাদী, সাম্যবাদী, ইসলামিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ইত্যাদি মতবাদভিত্তিক রাজনীতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বদাই প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। শুধু রাজনীতিক মতবাদের ভিন্নতার দরুন একজন আরেকজনকে পেট্রল বোমায় জ্বালিয়ে দিচ্ছে, গুলি করে হত্যা করছে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করছে। আল্লাহর রসুলের শিক্ষা হচ্ছে- এই জাতিতে কোনো মতভেদ বা অনৈক্য থাকতে পারবে না। মতভেদকে তিনি কুফর আখ্যায়িত করেছেন। অথচ আজ সেই মতভেদকে রাজনীতিক অঙ্গনে শুধু বৈধতাই দেওয়া হয় নি, অনুপ্রাণিত করা হয়। এটা কি প্রকৃত মুসলিম জাতির চিত্র?
কখনই না। বস্তুত এরা কেউই প্রকৃত মুসলিম নয়। বিশ্বের ১৬০ কোটি জনসংখ্যা, যারা বর্তমান পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত, অবহেলিত ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠী, আল্লাহর হুকুম অমান্য করে এবং রসুলের শিক্ষাকে উপেক্ষা করার শাস্তিসরূপ যাদেরকে ইতোমধ্যেই ভিন্ন জাতির দাসত্বগ্রহণ করতে হয়েছে, তাদেরকে প্রকৃত ইসলামের অনুসারী প্রকৃত মুসলিম বলার অর্থই হলো রসুলাল্লাহর শিক্ষাকে অবমাননা করা। কারণ প্রকৃত মুসলিমরা অন্য জাতির দাসত্ব করতে পারে না, অনৈক্যকে প্রশ্রয় দিতে পারে না, আল্লাহ-রসুলের নির্দেশ অমান্য করে পাশ্চাত্যের ধর্মবর্জিত সিস্টেম গ্রহণ করতে পারে না, কদর্য বিলাসিতায় গা ভাসাতে পারে না। এরা মুসলিম নয়। এদের কোনো জান্নাত নাই। বহু আগেই এদের জান্নাতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এদের এই লোক দেখানো মেকি ধর্মকর্ম আল্লাহ আখেরাতে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবেন।
No comments:
Post a Comment